তিন
নিউ চন্দনা যে কাকে ভাড়া করে আনছে তা কয়েকদিনের মধ্যেই রটে গেল। গোলকপতি এবং তার সঙ্গীসাথীরা গর্বভরেই বলে বেড়ালেন নামগুলো।
বিবেক হচ্ছে কীর্ণাহারের সুধাকণ্ঠ গুরুদাস হাজরা। এই তল্লাটের সেরা গলা। ওঁর গানে শ্রোতা যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়। যেমন চড়ায় ওঠে, তেমনি খাদে নামে গলা। ভরাট নিটোল স্বর।
দ্রৌপদী করবেন, মিস মন্দাকিনী (TV)। একবার তিনি টি.ভি.তে কী একটা অভিনয় করেছেন। এছাড়া আসবেন ছায়ারানি (বেতার)।
নটসূর্য নবকুমার আসছেন কাটোয়া থেকে। ইনি রীতিমতো খ্যাতনামা এক বছর কলকাতার নামী দলে অভিনয় করেছেন। এছাড়া ফুলুটে আসছেন ওস্তাদ তানসেন আলি। বোলপুর থেকে।
বাকিরা অবশ্য তেমন নামী কেউ নয়।
নামগুলো প্রচার হতে হৈচৈ পড়ে গেল।
চন্দনা স্পোর্টিংয়ের কর্মকর্তারাও ছোটাছুটি শুরু করলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই জানা গেল, তাদের বাইরে থেকে ভাড়া করা নামী শিল্পীদের খবর। নামগুলো প্যামফ্লেটে ছাপিয়ে বিলি করে ফেললে চন্দনা স্পোর্টিং।
চন্দনা বিবেক হিসেবে আনছে নানুরের নিতাই সাধুখাঁকে। যিনি উপাধি পেয়েছেন সুরসাগর। গুরুদাসের দরের না হলেও সাধুখাঁমশাই বড় কম যান না।
আর একটা নাম দেখা গেল—যাত্রা সম্রাজ্ঞী বীণা গুপ্তা। ইনি কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন তার উল্লেখ নেই।
ক্ল্যারিওনেট বাজাবেন। কেতু গ্রামের সুখ্যাত তারক মাল। নির্দেশনায় : শ্রীকেষ্ট মিত্র (ক্লাভারতী)। মিত্তিরমশাই যে এককালে কোনো এক নাট্যগোষ্ঠী কর্তৃক এই উপাধিটি পেয়েছিলেন তা গ্রামের বেশির ভাগ লোক কেন, তাঁর নিজের আত্মীয়রাই ভুলে গেছিল।
চন্দনা স্পোর্টিংয়ের স্থানীয় শিল্পীরা অবশ্য অনেকেই বেশ উঁচু দরের। মেল-ফিমেল বিবেকরানি ওরফে শ্রীযুক্ত বিবেক দাস। নগেন সরকার। এদের কি সোজা নামডাক।
শুধু চন্দনা নয় আশেপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ল উত্তেজনা। কার পালা ভালো হবে? চন্দনা না নিউ-চন্দনা? তবে একটা অসুবিধা দেখা দেয়। দুটো পালাই হচ্ছে একই দিনে। কালীপুজার দু’দিন আগে। চন্দনার পালা শুরু হচ্ছে রাত ন’টায়। আর নিউ-চন্দনার রাত আটটায়। ইচ্ছে করেই গোলকপতি একঘণ্টা আগে শুরু করছেন। যাতে বেশিরভাগ দর্শক তাদের আসরে টেনে নিতে পারেন। নিউ চন্দনার আসরে একবার জমে গেলে আর দর্শক উঠবে চন্দনা স্পোর্টিং কেমন করছে দেখতে? এছাড়াও কিছু প্যাঁচ খেলতে থাকে গোলকপতির ঠিকেদারি মগজে।
শিব একদিন দেবুকে জানিয়ে গেল মহা খাপ্পা হয়ে, —দেখ ভুতো কিন্তু বাড়াবাড়ি করছে। দিনভোর ওদের জন্য ছুটোছুটি করছে। দাঁড়া ওকে একদিন পাই সুবিধেমতো।
দেবু বলল—তা একটু কড়কে দিতে চাস দে। বেশি বাড়াবাড়ি করছে বটে। তবে যা করবি মুখে। গায়ে হাত তুলবিনে। ওতে তোদের বদনাম হবে। বলা যায় না থানা পুলিশও হয়ে যেতে পারে। গোলকপতি ঘোড়েল লোক। ওদের রিহার্সাল কেমন চলছে জানিস?
শিব ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল—হুঁ! যা ছিরির রিহার্সাল চলছে। নিজে দেখেই আয় না। রামু বলছিল যে অনঙ্গ ঘোষ নাকি প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছেন। বড়জোর দু একটা পার্ট উতরে যাবে। ওই বাইরের আর্টিস্টরাই যা ভরসা। গোলকপতি নাকি রিহার্সাল জমাতে প্রত্যেকদিন খুব টিফিন খাওয়াচ্ছে। আর ঘন ঘন চা। এমনকী রিহার্সাল দেখতে গেলে তাদেরও খাওয়ায়।
অ্যাঁ তাই নাকি? —দেবু উৎফুল্ল : তবে তো দেখতে যেতে হচ্ছে ওদের রিহার্সাল।
শিব কটমটিয়ে তাকাতে দেবু হেসে বলল আহা চটছিস কেন? সব সরেজমিনে তদন্ত করা দরকার। নইলে কেস বুঝব কী করে? আমি দুদলেরই রিহার্সাল দেখব।
দু’দিন বাদে দেবু গুটিগুটি গিয়ে গোলকপতির বাড়ির বৈঠকখানায় নিউ চন্দনার রিহার্সালে হাজির হল। বসল এক কোণে।
দেবুকে দেখে হরলাল গিয়ে তাকে ঠাট্টার সুরে বলল, — কী ব্যাপার হে। তুমি এখানে?
দেবু হেসে বলল—আমি রিহার্সাল দেখতে ভালোবাসি। চন্দনার রিহার্সাল একদিন দেখেছি। আপনাদেরটাও দেখতে ইচ্ছে হল। কেন আপত্তি আছে?
না না আপত্তির কী? —হরলাল কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত : ভাবছি যে তোমার প্রিয় বন্ধু শিব না চটে যায়?
দেবু গম্ভীর ভাবে বলল— এতে শিবের চটার কোনো মানে হয় না।
—বেশ বেশ। দেখ দেখ।
এরপর থেকে দেবু মাঝে মাঝে, কোনও দিন চন্দনা স্পোর্টিংয়ের আবার কোনওদিন নিউ চন্দনার রিহার্সালে হাজির হতে লাগল। তবে ঘণ্টা খানেকের বেশি থাকত না কোথাও। চুপচাপ বসে থাকত দু’জায়গাতেই।
দেবু এই অঞ্চলের সেরা ছাত্র। ভালো বাড়ির ছেলে। সবাই ওর মতামতের মূল্য দেয়। নিউ চন্দনার নির্দেশক অনঙ্গবাবু দেবুকে বিলক্ষণ চিনতেন। একদিন তিনি দেবুকে একান্তে জিজ্ঞেস করলেন,
—দেবু কেমন বুঝছ?
কেন ভালোই তো হচ্ছে।—দেবুর সংক্ষিপ্ত জবাব।
—মানে, চন্দনার চেয়ে ভালো না খারাপ?
—প্রায় একই স্ট্যান্ডার্ড। তবে ওদের দু একটা পার্ট বেটার হচ্ছে। অবশ্য আপনারা তো বাইরে থেকে কয়েকজন ভালো আর্টিস্ট আনাচ্ছেন শুনেছি!
—তা আনাচ্ছি। তবে এদের সঙ্গে তারা কেমন খাপ খাবে বুঝচি না।
—তারা রিহার্সালে আসবেন।
—নবকুমার, বিবেক গুরুদাস, মন্দাকিনী, ছায়ারানি বলেছে যে রিহার্সালে আসতে পারবে না। তাদের সময় নেই। তবে অন্য হায়াররা কয়েকদিন রিহার্সালে আসবে বলেছে।
একই ধরনের প্রশ্ন বেচুদাও করেছিল দেবুকে চন্দনা স্পোর্টিংয়ের রিহার্সালে— কেমন হচ্ছে আমাদের? ওদের চেয়ে ভালো না খারাপ?
দেবু ভাসা ভাসা উত্তর দিয়ে এড়িয়ে গেছে।
অবশ্য রিহার্সাল নিয়ে গোলকপতির বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই। তার ধারণা ফাইনালে নিউ চন্দনা ঠিক মেরে বেরিয়ে যাবে। পালা যেমনই হোক, বেশি দর্শক টানতে পারলেই তিনি খুশি।
ইতিমধ্যে শিব একদিন ভুতোকে খুব শাসিয়ে দিল।
কিছুতেই ও ভুতোকে একলা নিরালায় পাচ্ছিল না। মরিয়া হয়ে একদিন গ্রামের পথে একা যেতে দেখে ডাক দিল—এই ভুতো শোন্।
ভুতো ঘাড় ফিরিয়ে দেখল কিন্তু থামল না। চেঁচিয়ে বলল—এখন নয় পরে।
শিব দৌড়ে গিয়ে ভুতোর পথ আগলে দাঁড়াল। ভুতোর পানে তীব্র চোখে চেয়ে সে বলল—ছি ছি এই করলি? ভাবতে পারিনি।
কেন কী করলাম? —ভুতো নির্বিকার ভাবে জবাব দেয়।
—কেন আবার। আমাদের এতদিনের ক্লাব ছেড়ে ওদের সঙ্গে ভিড়লি। লজ্জা করল না?
—আমি মোটেই ক্লাব ছাড়িনি। কেন অন্য দলে অভিনয় করা কি ক্লাবের বারণ?
—ওরা আমাদের দিনে পালা করছে কেন?
—সেটা ওদের খুশি। ইচ্ছে হলে তোরা দিন পাল্টা।
আমরা কেন পাল্টাব। আমরা আগে ডেট ঠিক করেছি।
—সেসব কর্তাদের ব্যাপার। আমি কর্তা নই। পার্ট পেয়েছি। করছি।
শুধু পার্ট? না আরও কিছুর লোভ দেখিয়েছে ঢোলকপতি?
—মোক্ষম অস্ত্রটি ছাড়ে শিব।
সে তুই যা খুশি আন্দাজ কর।—বলতে বলতে পাশ কাটিয়ে এগোয় ভুতো।
শিবের হাত তখন নিশপিশ করছে। নেহাতই দেবুর বারণ, তাই।
—ঠিক আছে। পরে বুঝবি ঠেলা
ভুতো ভ্রূক্ষেপই করে না।
লম্বু খোকা দূর থেকে লক্ষ করছিল। শিবের সামনে যেতে তার সাহসে কুলোয়নি। ভুতো কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করল—শিব কী বলছিলরে?
—বলছিল। আমি কেন নিউ চন্দনায় পার্ট করছি?
—তুই কী বললি?
—বললাম। ভালো পার্ট পেয়েছি তাই করছি। বাইরে কোথাও অভিনয় করতে পাব না, এমন দাসখৎ লিখে দিয়েছি ক্লাবে?
এই ঘটনার পর নিউ চন্দনায় ভুতোর খাতির খুব বেড়ে গেল।
কয়েকদিন বাদে ভোরবেলায় দেবু গিয়ে ডাকল শিবকে ওর বাড়িতে। শিব বেরিয়ে আসতে ওকে একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলল,—রতিয়া তোর কথা শোনে?
—শোনে বইকি।
—বেশ তাহলে রতিয়াকে বলবি, আজ যেন আমার সঙ্গে দেখা করে সন্ধ্যের পর তালপুকুরে ঘাটে। আর বলে দিবি, আমি যা যা বলব তাহ করতে। করবে তো?
—আমি হুকুম দিলে আলবাৎ করবে। কিন্তু কি ব্যাপার?
দেবু বলল,—সেটা এখন সিক্রেট। পরে বলব সব। আপাতত রতিয়াকে চাই।
বায়েনদের ছেলে রতিয়া, দেবুদের থেকে কিছু ছোট। গরীবের ছেলে। তাই স্কুল শেষ না করেই রোজগারে নেমেছে। কাঠ মিস্ত্রির কাজ করে। ছেলেটা শিবের দারুণ ভক্ত। শিবের দুঃসাহসিক ডানপিটেমিতে রতিয়া পয়লা নম্বর চেলা।
শিব গুম মেরে থাকে তারপর বলে—জানিস ঢোলকপতি কি জঘন্য প্যাঁচ কষেছে? ওর লোক কাল চোঙা ফুঁকে, রটিয়েছে যে নিউ চন্দনার পালায় ছোটদের লজেন্স দেওয়া হবে। ফ্রি। এসব কি? ঘুষ দিয়ে, দর্শক টানা?
দেবু বলল, —হুঁ বাজে ব্যাপার। যাহোক তোদেরও উল্টো প্যাঁচ কষতে হবে। তোরাও জানিয়ে দে যে চন্দনা স্পোর্টিংয়ের যাত্রায় ছোটদের টফি বিলোনো হবে বিনা পয়সায়। আরও ধর্, মেয়েদের ফ্রি পান। বেচুদাকে বুদ্ধিটা দেব আজ। তবে এখন নয়। এক্কেবারে পালার আগে রটাবি। নইলে বেশি আগে জানলে, ওরা ফের ঘুষ বাড়াবে।
সহসা দেবু শিবের আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল,
—হুঁ, তোকে দিয়েই চলতে পারে।
—কী?
—কীর্ণাহার যেতে পারবি কাল? গুরুদাস হাজরার সঙ্গে একবার মোলাকাত করতে?
—গুরুদাস হাজরা! মানে নিউ চন্দনায় বিবেক হবে। হায়ার করেছে?
—হ্যাঁ তিনি। একটু মেক আপ করে যাবি। যাতে তোকে চিনতে না পারে। গুরুদাসকে কটা কথা বলে আসবি।
