উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

নীলকুঠির জঙ্গলে – ৪

চার

রবিবার। গঞ্জের হাট বসেছে। আশপাশের আট-দশখানা গ্রামের লোক আসে বেচাকেনা করতে।

দেবু ও শিব হাটে পৌঁছল সকাল দশটা নাগাদ। পথে হাটমুখো একটা গরুর গাড়ি পেয়ে দু’জনে চড়ে বসেছিল। তাই পুরোটা হাঁটতে হয়নি।

গমগম করছে হাট। দেবুরা একধারে দাঁড়িয়ে এদিক-সেদিক লক্ষ করে। হঠাৎ দেবু বলল,—ওই দেখ শিব, পলাশগাঁয়ের হরি মোড়ল। যা ধর ওকে।

হরিপদ মণ্ডল ওরফে হরি মোড়লের বয়স প্রায় পঞ্চাশ। মাথায় খাটো, নাদুস-নুদুস শ্যামবর্ণ। অতি ধীর স্থির। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাছের আশায় ফাতনার দিকে তাকিয়ে বসে সারাটা দিন কাটিয়েও যদি শূন্য হাতে ফিরতে হয় তখনো দিব্যি হাসি মুখে থাকেন। হরি মোড়ল বাজারের থলি হাতে ধীরে সুস্থে চলছিলেন। তাঁর নজর মাটিতে নামানো ব্যাপারিদের আনাজের ঝাঁকায়—কচি পটলের খোঁজে।

—হরি কাকা।

ডাক শুনে হরি মোড়ল ফিরে দেখলেন ফুলডাঙার অভয় দত্তর ছেলে শিব। তার হাতে একটা ছোট ছিপ।

হরি মোড়ল বললেন,—কি রে?

আচ্ছা কাকা, বঁড়শি কোথায় কিনতে পাওয়া যায়? মানে বড় মাছ ধরার মতো বঁড়শি। উদ্‌গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল শিব।

—কেন রে, বড় মাছ ধরার বঁড়শি নিয়ে কী করবি?

একটা মস্ত মাছ ধরব। এই এতো বড়।—শিবু-দু-হাত ছড়িয়ে মাপ দেখায়।

বটে বটে, তা অত বড় মাছ পেলি কোথায়? দেবে তোকে ধরতে?–হেসে বললেন হরি মোড়ল।

কেন দেবে না? বলল শিব : ওই নীলকুঠির পুকুরে আছে। ওখানে ধরলে তো কেউ নিষেধ করে না।

—নীলকুঠির পুকুরে, অত বড় মাছ! ঠিক জানিস?

–হ্যাঁ হ্যাঁ।

–কে বলল?

–আমার বন্ধু দেখেছে নিজের চোখে। জল ছেড়ে লাফিয়ে উঠেছিল মাছটা। আমি তখন অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ছিলাম তাই দেখতে পাইনি, তবে শব্দটা শুনেছি। খুব জোরে ঝপাং করে আওয়াজ।

—ওখানে গিয়েছিলি কী কত্তে?

শিব মাথা চুলকে বলল,—গাব পাড়তে।

ও! মোড়লমশাইয়ের মুখে সেই তাচ্ছিল্য মাখানো হাসি উবে গেছে। বেশ গম্ভীর হয়ে বললেন,—কবে গিছলি?

–আজ্ঞে কাল।

হরি মোড়ল একটু চিন্তা করে জানালেন,–বড় মাছ ধরার বঁড়শি তো এখানকার দোকানে পাওয়া যায় না। আমি কামারকে দিয়ে গড়াই। তা তোর জন্যে একটা গড়িয়ে রাখব’খন। আসছে শনিবার আসিস আমার বাড়ি।

বলতে বলতে তিনি পা বাড়ালেন অন্যমনস্ক ভবে। কচি পটলের দিকে আর তাঁর মন নেই।

হাটের এক কোণে অপেক্ষা করছিল দেবু। শিব ফিরতেই জিজ্ঞেস করল—কী?

শিব এক গাল হেসে জানাল,–মনে হল টোপ গিলেছে।

গুনুটি গ্রামের বজ্রপাণি ফৌজদার বেশ দশাসই পুরুষ। তাঁর গলার আওয়াজ যেমন বাজখাঁই, মেজাজটিও তেমনি চড়া। বজ্রপাণির মাছ ধরার নেশা। তবে সারাদিন ঠায় জলের ধারে বসে যেদিন তাঁর শিকার মেলে না সেদিন বেজোদা ওরফে বজ্রপাণির ধারে কাছে কেউ ঘেঁষে না অনর্থের ভয়ে। বেজোদা ছিপ ফেললে সেই পুকুর পাড়ে তিনি ছাড়া আর কারও কথা বলার উপায় নেই।

অনেক দর কষাকষির পর একটা মস্ত পাকা কুমড়োকে সস্তায় কব্জা করে, থলিতে পুরে বজ্রপাণির মনটা যখন ভারি খুশি ঠিক তখনই ডাক শুনলেন–বেজোদা।

মুখ ফিরিয়ে কে ডাকছে দেখে বেজোদা বললেন,—তুই শিব না? অভয়দার ছেলে? ভাল ফুটবল খেলিস?

–আজ্ঞে হ্যাঁ বেজোদা।

–কী ব্যাপার, ডাকলি কেন?

একটু আমতা আমতা করে শিব বলল,—আচ্ছা বেজোদা, খুব বড় মাছ ধরতে কীসের চার ছাড়া হয় জলে? আর টোপ কী দেব?

খু-উ-ব বড় মাছ। তুই ধরবি? অ্যাঁ!—শিবের হাতে পুঁটি মাছ ধরার ছোট্ট ছিপখানার দিকে তাকিয়ে বেজোদা হো হো করে অট্টহাসি জুড়লেন। পাশের লোক চমকে তাকাল তাদের দিকে।

বেজোদা গাঁক গাঁক করে বললেন,—তা তোর কাকাকে জিজ্ঞেস করলেই তো বলে দিত।

–না না, ছোটকাকা আমায় মাছ ধরতে দেয় না। বলে, সময় নষ্ট। পড়াশুনোর ক্ষতি। কিন্তু এ মাছটা আমি ছাড়ছি না।

কোন্ মাছটা? কোথায়?–বেজোদা কৌতূহলী হলেন।

—নীলকুঠির পুকুরে। এই এত্তো বড়ো রুইমাছ। দশ পনেরো সেরের কম নয়।

অ্যাঁ!—বেজোদার গলার স্বর হঠাৎ নেমে এল। জিজ্ঞেস করলেন, কে বলল?

আমার এক বন্ধু দেখেছে। নিজের চোখে। কাল আমরা গাব পাড়তে গিছলাম ওই জঙ্গলে, তখন। ঘাই মেরে লাফিয়ে উঠেছিল মাছটা।

—তুই দেখিসনি?

—আমি? না। আমি তখন অন্য দিকে চেয়েছিলাম। কিন্তু মাছটার জলে পড়ার আওয়াজ শুনেছি—ঝপাং করে, কী জোর শব্দ হল।

এই মাছটার কথা আর কেউ জানে নাকি?—উদ্বিগ্ন সুরে প্রশ্ন করলেন বেজোদা।

—কে আর জানবে? কেই বা যায় ওখানে। আমরা দেখে ফেলেছি দৈবাৎ।

হুম্! গোঁফ চোমরাতে চোমরাতে বেজোদা মাতব্বরি ঢঙে বললেন : তা তোর কাকা বলে ঠিকই। মাছ ধরায় বড্ড সময় নষ্ট হয়। বড় বাজে নেশা। তোরা এখন স্টুডেন্ট। তোদের এখন এ শখ না করাই উচিত। তবে ইচ্ছে যখন হয়েছে, একবার চেষ্টা করতে পারিস। কিন্তু ভালো চার বা টোপ তো বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। ঘরে বানাতে হয়। অনেক হ্যাঙ্গাম। এর পরের রোববার আসিস হাটে। তোকে আমার বানানো খানিকটা চার আর টোপ দেব। ঠিক আছে, এখন যা।

বেজোদা ব্যস্ত ভাবে বিদায় নিলেন।

সালামপুরের আকবর আলি প্রবীণ লোক। বয়স ষাট পেরিয়েছে। একহারা দীর্ঘ চেহারা। ফর্সা রং। লম্বাটে নাকের ওপর গোল পিতলের ফ্রেমের চশমা। থুতনিতে একগুচ্ছ সাদা ধবধবে দাড়ি। মুখখানা হাসি হাসি। মেছুরে হিসেবে আলিসাহেবের খুব নাম ডাক। তবে আজকাল আর স্পেশাল মাছের সন্ধান না পেলে শিকারে যান না। ধকল পোষায় না শরীরে। আলিসাহেব অনেকক্ষণ হাটে ঘুরছেন। রোদ চড়ছে। বগলের ছাতাখানা খুলবেন কিনা ভাবছেন, এমন সময় ডাক শুনলেন,—চাচা।

একটু ঝুঁকে ছেলেটিকে দেখে আলিসাহেব বললেন, তুই ফুলডাঙার মাখন মজুমদারের ছেলে না? আগের বছর দেখেছি! তোদের বাড়িতে গিছলাম যখন। কী নাম জানি তোর? ভুলে গেছি।

উত্তর হল,—আজ্ঞে, আমার নাম দেবু।

—হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক। মনে পড়েছে। তা ডাকলি কেন?

—আচ্ছা চাচা, হুইল ছিপ কিনতে কত লাগে? কোথায় পাওয়া যায়?

—কেন রে হুইল ছিপ নিয়ে কী করবি?

—একটা খুব বড় মাছ ধরব। হুইল ছিপ ছাড়া তো ধরা যাবে না। আমার তেমন ছিপ নেই। আমার জমানো পয়সা আছে, তাই দিয়ে কিনব।

—বড় মাছ! কোথায় রে?

—ওই নীলকুঠির পুকুরে।

—নীলকুঠির পুকুরে বড় মাছ আছে, কে বলল?

আমি নিজের চোখে দেখেছি।—অম্লান বদনে জানায় দেবু : ওই জঙ্গলে আম পাড়তে গিছলাম পরশু, তখন দেখলাম। এই বিরাট! টকটকে রং। পাকা রুই। পনেরো-বিশ সেরের কম হবে না। জল থেকে লাফিয়ে উঠেছিল মাছটা।

আলিসাহেবের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল। বললেন,—ঠিক দেখেছিস?

—আজ্ঞে হ্যাঁ চাচা, স্পষ্ট।

আলিসাহেব তাঁর দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,—বড় মাছ কিছু ধরেছিস আগে?

—আজ্ঞে না।

—কী ধরেছিস?

—আজ্ঞে পুঁটি আর চারাপোনা।

—ব্যস্, এবার এক লাফে বিশ সেরে উঠবি—হুইল ছিপে। তোর আশা বলিহারি। ওরে, অত সোজা নয়। শুধু দামি ছিপ কিনলেই হয় না। সাধনা চাই। একটু একটু করে রপ্ত করতে হয় এই বিদ্যে। অনেক আঁটঘাট জানতে হয়। কেবল হুইল ছিপে কী হবে? তেমন মাছের পাল্লায় পড়লে আনাড়ির হাত থেকে এক টানে ছিপ নিয়ে চলে যাবে জলে।

দেবু হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।  

আলিসাহেব দেবুর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন,— মাছ ধরা শিখতে চাস তো আসচে রোববার কালী সায়রে আয়। ওখানে বসব সেদিন। তোকে দেখিয়ে-টেখিয়ে দেব হাতে কলমে। যা যা বাড়ি যা। এখনই হুইল টুইল কিনে মিছিমিছি পয়সা নষ্ট করিসনি। মন খারাপ করিসনি। চেষ্টা থাকলে একদিন ঠিক পারবি।

দেবুর গায়ে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে আকবর আলি বিদায় নিলেন।