উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

শিবের মাথায় গোয়েন্দাগিরির ভূত

শিবের মাথায় গোয়েন্দাগিরির ভূত চেপেছে।

শিব ছিল অ্যাডভেঞ্চার-কাহিনির ভক্ত। গল্পের বই পড়ার ঝোঁক থাকলেও বেশি সময় পেত না। খেলাধুলো আর নানান ডানপিটেমি করেই তার সময় যেত। ক্লাসের পড়াও রয়েছে। অন্তত মোটামুটি পাশ তো করা চাই। ডিটেকটিভ বই কিছু পড়লেও তা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায়নি আগে। কিন্তু পুজোর ছুটিতে দেবুর কল্যাণে খানকয়েক ঘোরালো গোয়েন্দা কাহিনি পড়ে ফেলে। মনে ধরে যায় গোয়েন্দাদের ব্যাপার স্যাপার। তারপর ক্লাসের বাৎসরিক পরীক্ষা হয়ে যেতে চুটিয়ে পড়ে প্রচুর গোয়েন্দা গল্প—গ্রামের লাইব্রেরি এবং এর-ওর কাছ থেকে চেয়ে এনে। ফলে আপাতত তার মাথায় গজগজ করছে নানা গোয়েন্দাদের কীর্তিকলাপ। বিচিত্র রকম অপরাধের বৃত্তান্ত এবং সেই সব কুকীর্তি ধরে ফেলার রকমারি উপায়।

পুরনো ও আধুনিক, দেশি ও বিদেশি গল্পের বহু নামজাদা গোয়েন্দার হালচাল তার নখদর্পণে। জয়ন্ত মানিক, ব্যোমকেশ, কিরীটি, পরাশর, ফেলুদা ইত্যাদি দেশি গোয়েন্দাদের যেমন সে গুলে খেয়েছে তেমনি অনুবাদের মাধ্যমে বা ইংরেজিতে পড়ে ফেলেছে শার্লক হোমস্, হারকিউল পয়রো, মিস মারপল প্রমুখ বিদেশি ডিটেকটিভদের ইতিবৃত্ত।

এমন বেদম পড়ে পড়ে মাথা গরম হয়ে গেল শিবের। ঠিক করে ফেলল যে শুধুমাত্র ছাপার অক্ষরে অন্যদের বাহাদুরি জেনে সন্তুষ্ট থাকা নয়, হাতে কলমে কাজে নামতে হবে। থিওরি থেকে প্র্যাকটিস। অতএব সে স্বয়ং গোয়েন্দাগিরিতে নামবে এবার। ওই সব বিখ্যাত গোয়েন্দাদের সঙ্গে শিব দত্তর নামটাও হয়তো যোগ হবে ভবিষ্যতে।

মনের এই প্রবল বাসনাটা দেবুকে জানানো নিতান্ত প্রয়োজন। কারণ দেবু শিবের প্রাণের বন্ধু। লোকে তাদের ডাকে মানিকজোড়। দুজনে একই সঙ্গে পড়ে ক্লাস টুয়েলভে।

বই পড়ার নেশাটা আসলে দেবুর। শুধু ডিটেকটিভ বই নয়, সব ধরনের গল্পের বইয়ের সে পোকা। লেখাপড়ায় দেবু দারুণ। পরীক্ষায় ফার্স্ট সেকেন্ড হয়। তবে সে গোবেচারি ভালোমানুষ নয় মোটেই। ডানপিটেমিতেও পিছপা হয় না। ক্লাসের রেজাল্ট এবং বাইরে গুড়ি গুডি ভাব দেখে লোকে ধরতে পারে না তার আসল রূপ। সে খবর রাখে কেবল শিব।

হাতেকলমে গোয়েন্দাগিরিতে দেবুর মোটেই উৎসাহ নেই। দু-একবার খুঁচিয়ে দেখেছে শিব। দেবু সাড়া দেয়নি। তা ও না করুক শিবই নেমে পড়বে কাজে। সিদ্ধান্তটা সে জানাতে চলল দেবুকে।

উত্তম গোয়েন্দা হওয়া কি তার পক্ষে সম্ভব নয়? যেতে যেতে প্রশ্নটা উদয় হয় শিবের মনে। কেন নয়? কার কোথায় প্রতিভা লুকিয়ে থাকে বোঝা দুষ্কর। সুযোগ আর সময় মানুষ চেনায়। এসব কথা দেবুরই। উদাহরণস্বরূপ সে বলেছিল, তাদের গাঁয়ের জগন্নাথের কথা। মুখচোরা একটু যেন বোকা টাইপ জগার ভেতর যে এমন ব্যবসার প্রতিভা লুকিয়ে ছিল কে জানত! নেহাতই চাকরি পাচ্ছে না দেখে বাপ তাকে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান খুলে দেয় লাভপুর বাজারের কাছে। সেটাই ফুলে-ফেঁপে এখন মস্ত রেস্টুরেন্ট। জগার ভোল পাল্টে গেছে। এখন তার চোখে মুখে কথা। দোকানের কর্মচারী চালায়। খদ্দের সামলায় সমান দক্ষতায়।

আর মথুরাপুরের গোবিন্দ ঢোল যে একদা মিলিটারি হয়ে ইউনিফর্ম গায়ে, বুট মশমশিয়ে গাঁয়ে ঢুকবে ভেবেছে কেউ? হ্যাঁ, লম্বা চওড়া চেহারাখানা ছিল বটে। কিন্তু অতি গোবেচারা। আবার ভূতের ভয়। গ্রামে কঞ্চির মতন লিকলিকে ছোঁড়াগুলো অবধি গোবিন্দর ওপর মাতব্বরি ফলাত। সৎ মায়ের তাড়নায় বেচারা বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়ে এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে মিলিটারিতে নাম লেখায়। কোনো মতে টিকেও যায়। এখন তাকে দেখলে উল্টে স্যালুট করে গাঁয়ে তার সমবয়সিরা। কী স্মার্ট আর ভারিক্কি চাল ওর। তলোয়ারের মতো মোচ। বাংলা হিন্দি ইংরিজি বুলি ছোটায়। সত্যি সত্যি একটা যুদ্ধে লড়েছে কামান বন্দুক নিয়ে। ছুটিতে দেশে এলে সবাই ভিড় করে যায় ওর মিলিটারি জীবনের গল্প শুনতে।

গোবিন্দর সৎমা এখন একদম টাইট। বাড়ি এলে বাবা-বাছা ছাড়া কথাটি নেই। যতবার চা চায়, তক্ষুণি বানায়।

দেবু বাড়ি ছিল। শিব ডাকল,—বাইরে চ। কথা আছে। সিরিয়াস্।

দুজনে গিয়ে বসল অশ্বত্থতলার বাঁধানো বেদিতে। দেবু পকেট থেকে হজমিগুলির শিশিটা বের করে একটা ধরিয়ে দেয় শিবকে,

–নে খা। বল কী বলবি?

শিব মনে মনে খানিক জুৎসই কথা হাতড়ায়। ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারে না যেন। শেষমেশ দুম করে বলে বসে,—আমি কী ঠিক করেছি জানিস?

—কী?

—আমি ডিটেকটিভ হব।

অ্যাঁ ডিটেকটিভ! তুই!—দেবু চমকায়।

কেন? পারব না?—শিবের কণ্ঠে উত্তাপ।

না না তা বলছি না। চেষ্টায় কিনা হয়।—দেবু সামাল দেয় : মানে তোর তো অন্য অ্যাম্বিশন ছিল। হয় নামকরা ফুটবল প্লেয়ার অথবা মেল ট্রেনের ইঞ্জিন ড্রাইভার। মত বদলালি যে?

এই লাইনটা আরও পছন্দ হচ্ছে।—সংক্ষিপ্ত উত্তর।

—অলরাইট। তা কিছু ট্রেনিং-ফেনিং। মানে তদন্তের পদ্ধতি শিক্ষা?

—ট্রেনিং আবার কী? আমার মোটামুটি সব জানা আছে।

কার কাছে শিখলি?—দেবু অবাক।

—কারও কাছে নয়। বই পড়ে। বড় বড় ডিটেকটিভদের কাজের ধারা আমার মুখস্থ।

বটে। এইজন্যে গোয়েদা গল্প গিলছিলি? দেবু মনে মনে ভাবে। ওই করেই মাথাটি বিগড়েছে। বাইরে অবশ্য সে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলে,—তারা তো গল্পের ডিটেকটিভ। সত্যি ডিটেকটিভ কারও কাছে কিছু ট্রেনিং নিলে সুবিধে হত না।

—সে পরে দেখা যাবে। আরে, অনেক গল্পের ডিটেকটিভের কাছে আসল ডিটেকটিভরা লাগে না। জানিস, শার্লক হোমস-এর লেখক কোনান ডয়েলের কাছে বিলেতে গোয়েন্দারা অবধি বুদ্ধি নিত। তারা শার্লক হোমস-এর গল্প পড়ে অনেক কিছু শিখেছে।

–ও। তাহলে তোতার ট্রেনিং প্রায় কমপ্লিট।

—তা বলতে পারিস। সব গোয়েন্দারা একটি মোদ্দা বাণী দিয়েছেন—চোখ কান খোলা রাখ। গ্রে সেল অর্থাৎ মগজের বুদ্ধিকে খেলাও তাহলে রহস্যের সন্ধান পাবে এবং তার সমাধানের সূত্র। অবশ্য এই গ্রে সেল-এর কোয়ালিটিটা একটু উঁচু দরের হওয়া চাই।

দেবুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শিবের মগজ যেন ফোঁড়ে। বোধহয় বুঝতে চায় ওর গ্রে সেল-এর মান। শিব কিঞ্চিৎ বিব্রতভাবে বলে, তবে সত্যি কোনো গোয়েন্দাকে পেলে শেখা যাবে। শেখার কি শেষ আছে?

–বেশ কাজে নেমে পড়। আপিস কোথায় করবি? কলকাতায়?

—মানে এখন তো কলকাতায় যাওয়া সম্ভব নয়, থতমত খায় শিব, আগে পড়া শেষ হোক। ভাবছি আপাতত এখানেই—

—ঠিক বলেছিস। এখানেই হাতেখড়ি হোক। পাড়াগাঁ বলে অবহেলা করিসনি। ময়ূরাক্ষীর ধারে আমাদের এই ফুলডাঙা আর কাছাকাছি গ্রামগুলোয় কি রহস্যের অভাব? কত অপরাধ ঘটে। তার কিনারা হয় কই? বড় শহরে কিছু ঘটলে খবরের কাগজে বেরয়। তাই লোকে জানতে পারে। আমাদের গ্রাম দেশের অনেক খবরই কাগজে ছাপে না। গ্রামদেশে বহু রহস্যই রীতিমতো জটিল। অপরাধ বিদ্যায় এখানকার লোকের মাথা কি আর কম খেলে? না এখানে অদ্ভুত ঘটনা কম ঘটে? ট্রেনিং পিরিয়ডে সেসব রহস্য ভেদ করলে তোর ভিত খুব পোক্ত হবে।

হুঁ, ঠিকই বলেছিস।—শিব নিশ্চিন্ত হয়। এ নিয়ে তার মনে একটু খটকা ছিল।

দেবু একটা হজমিগুলি নিজের মুখে পুরে আর একটা শিবকে দিয়ে বলল,—তা অ্যাসিস্ট্যান্ট কাকে নিবি?

—অ্যাসিস্ট্যান্ট?

হ্যাঁ। একজন উপযুক্ত সহকারী ছাড়া কি গোয়েন্দাকে মানায়? সে দেশি হোক কি বিদেশি। বিদেশি ডিটেকটিভ দুএকজন আছে বটে সরকারী ছাড়া, কিন্তু কোনো নামকরা বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভের কথা পড়েছিস যার সহকারী নেই? অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্ট। নইলে গোয়েন্দার দর কমে যায়?

তা বটে।—কথাটা মনে ধরে শিবের : কিন্তু আমি আবার সহকারী পাব কোত্থেকে?

আমায় দিয়ে কাজ চলবে?—গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করে দেবু।

–যাঃ ইয়ার্কি হচ্ছে?

—ঠাট্টা নয়। সিরিয়াসলি বলছি।

–তুই আমার সহকারী হবি কেন? তোর যা মাথা আর এ লাইনে পড়াশুনা, তুই বরং আমার সহযোগী হতে পারিস। আমরা হব পার্টনার। একসঙ্গে কাজ করব। জোড়া ডিটেকটিভের কথাও তো পড়েছি।

—না ভাই। আমার সহকারী হওয়াই ভালো। পার্টনার হলে দায়িত্ব বাড়বে। গোয়েন্দাগিরিতে অত শখ নেই আমার। সহকারী হওয়াই সুবিধে। তোর নাম হলে লোকে আমার নামটাও জানবে। অথচ দায়িত্ব কম। তা সহকারী হিসেবে কী কী করতে হবে আমায়?

সে তো তুই জানিসই,—বলল শিব।

—হ্যাঁ, দুরূহ অভিযানে তোর সঙ্গী হওয়া এবং কখনো সখনো পরামর্শ দেওয়া। সে পরামর্শ তুই নিতেও পারিস, নাও নিতে পারিস। এই তো?

তা যা বলেছিস।—হেসে বিষয়টা হাল্কা করে শিব। সে মনে মনে হাঁপ ছাড়ে। পার্টনার হয়ে দেবু এ লাইনে সিরিয়াসলি আসতে চাইলে সে কি আর পাত্তা পেত? শিবকেই বরং অ্যাসিস্ট্যান্ট বনে যেতে হত। নামে দেবু সহকারী থেকে, কাজে পার্টনার হলেও শিবের লাভ ক্ষতি নেই। তবে লোকে হয়তো ডাকবে গোয়েন্দা মানিকজোড়। তাতে অন্তত দুজনেই সমান প্রেস্টিজ পাবে।

.