উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

নীলকুঠির জঙ্গলে – ১

এক

সকালে আটটা নাগাদ।

শিব যেতে যেতে দেখতে পেল, উল্টো দিক থেকে দূরে হনহন করে নিমাইচরণ মান্না আসছে। নিমাই মান্না থামল ভোলানাথ সাধুখাঁর বাড়ির সামনে। ভোলানাথ তাঁর দাওয়ায় বসেছিলেন বাবু হয়ে, হাতে চায়ের গেলাস। নিমাই মান্নার সঙ্গে কী জানি কথা হল ভোলানাথের। ভোলানাথ উঠে পড়লেন। দুজনে গিয়ে ঢুকলেন ভোলা সাধুখাঁর বৈঠকখানা ঘরে।

এই চওড়া কাঁচা পথটা গ্রামের বুক চিরে সোজা চলে গেছে। দু’ধারে বাড়ি। গেরস্থ চাষিবাসী লোকের বাস। বেশিরভাগ বাড়ির দেয়াল মাটির, খড়ের চাল। কয়েকখানা পাকা বাড়িও রয়েছে।

বাড়ি অর্থাৎ সাধুখাঁদের বাড়ির সদর দরজার পাশেই বৈঠকখানা ঘর। দুটো দরজাই বন্ধ। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শিব একটু ইতস্তত করে।—নেলোকে ডাকব কি এখন?

বৈঠকখানার ভিতরে গলার আওয়ার পাওয়া যাচ্ছে। জরুরি কথা হচ্ছে হয়তো। এখন চেঁচিয়ে ডাকলে ভোলাদা চটে না যায়? যা তিরিক্ষি মেজাজ। শিব ওকে এড়িয়ে চলে।

নিচু সুরে কথা বলছে নিমাইচরণ। হঠাৎ ভোলানাথের উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা গেল,—অ্যাঁ বল কী হে! ঠিক বলছ?

হ্যাঁ হ্যাঁ। নইলে কি আর সাতসকালে ছুটে আসি।—জবাব দিল নিমাইচরণ।

কী ব্যাপার! শিবের বেজায় কৌতূহল হল। সে বৈঠকখানার দরজার কাছে এগিয়ে গেল।

ভোলানাথ বললেন,—ওঃ, তা হলে দারুণ ব্যাপার। যা একখানা দাঁও মারা যাবে। ওফ্। কী ভোলাদা পারবে তো?—নিমাইচরণের গলা।

—আলবৎ। দেখই না আমার এলেম।

জানি জানি ওস্তাদ। তাই তো তোমার কাছে এলাম।—নিমাইচরণের উল্লসিত কণ্ঠ।

—কিন্তু খুব সাবধান। কেউ যেন টের না পায়। হারু আবার বলে ফেলবে না তো আর কাউকে। একবার আঁচ পেলেই আর রক্ষা নেই। সব ছুটে আসবে। লাভের গুড় পিঁপড়েয় খাবে।

—আরে না না। হারুকে আমি সাবধান করে দিয়েছি—খবরদার এ খবর যেন আর কাউকে না বলে। ওর সাহস কি আমার কথা অমান্য করে। তা কবে যাবে বল? কাল?

—উঁহু কাল হবে না। পরশু যাব। তুমি ভোরে আমার এখানে চলে এসো।

নিমাই বলল—না না, আমি বরং নীলকুঠির সামনে অপেক্ষা করব তোমার জন্যে। বটগাছটার তলায়। দেরি কর না বেশি। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বে। গাঁয়ের লোক যেন দেখতে না পায় আমরা জঙ্গলে ঢুকছি। সেদিন আবার বৃহস্পতিবার। হাটের দিন। একটু বেলা বাড়লেই ও পথে লোক চলবে খুব। সন্দেহ করে কেউ যদি পিছু নেয়, সব কেঁচে যাবে।

ঠিক আছে, তাই হবে।—ভোলানাথ জানালেন।

কিন্তু, দাদা, বখরা ওই যা বলেছি তার কম হলে চলবে না। এমন জব্বর খবর।—নিমাইচরণের গলা।

পাবে পাবে, তাই পাবে।—জানালেন ভোলানাথ।

মচমচ আওয়াজ হল। মনে হল ঘরে খাট থেকে কেউ নামছে। নিশ্চয় কাঠের তক্তাপোশে বসে কথা হচ্ছিল। শিব ছিটকে নেমে এল বারান্দা থেকে। দ্রুত পা চালাল। তার বুক তখন ধড়াস ধড়াস্ করছে। দূর থেকে সে লুকিয়ে দেখল, আধঘণ্টাটাক বাদে নিমাই মান্না ভোলা সাধুখাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ধীরেসুস্থে ফিরে চলল।

কী ব্যাপার! কীসের দাঁও? কেন এত সাবধানতা? শিবের মাথায় চক্কর মারতে শুরু করে।

ভোলানাথ সাধুখাঁ লোকটি একটু খামখেয়ালি ধরনের। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। লম্বা রোগা। মাঝে মাঝে উনি গ্রাম থেকে উধাও হন। বলেন নাকি দেশ বেড়াতে যান। খুব ব্যবসার শখ। নানান ফিকিরে থাকেন। তবে ওঁর সম্বন্ধে তেমন খারাপ কিছু কানে আসেনি। কিন্তু নিমাই মান্না লোক মোটেই সুবিধের নয়। পাশের গ্রাম মথুরাপুরে বাড়ি। পেশায় স্যাকরা। একবার পুলিশ ওর বাড়ি সার্চ করেছিল চোরাই মালের সন্ধানে। লোকে বলে, চোর ডাকাতের সঙ্গে সাট আছে নিমাইয়ের। তাদের থেকে চোরাই সোনা-দানা কেনে সস্তায়। ওর চেহারাটাও গুন্ডার মতন। এমন লোকের সঙ্গে ভোলাদার ভাব কেন? তবে কি ভোলাদাও? কীসের খোঁজ পেয়েছে নিমাইচরণ? তাই ভোলাদা উত্তেজিত। নীলকুঠির ধারে অপেক্ষা করবে—তারপর জঙ্গলে ঢুকবে। নিশ্চয়ই ওই কুঠিবাড়ির জঙ্গলে।

এখান থেকে মাইল দুই দূরে ফাঁকা মাঠের মধ্যে একটা নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। পোড়ো কুঠিবাড়ি ঘিরে সাত-আট বিঘার জঙ্গল। একদা যা বাগান ছিল, এখন যত্নের অভাবে আগাছায় ভরা।

বদনাম আছে কুঠিবাড়ির। কোনো কোনো রাতে ওখান থেকে ভেসে আসে অদ্ভুত অদ্ভুত আওয়াজ আর বিকট হাসির শব্দ। ভয়ে লোকে সন্ধ্যার পর ও তল্লাট মাড়ায় না। দিনের বেলাতেও কদাচিৎ কেউ কুঠিবাড়ির জঙ্গলে ঢোকে।

তবে শিব কুঠিবাড়ির জঙ্গলে ঢুকেছে কয়েকবার। ওখন বুনো জংলা গাছের সঙ্গে মিশে আছে কিছু ভালো ফলের গাছ। যেমন, আম-গাব-পেয়ারা, চমৎকার টোপা কুল। এদের কয়েকটা খুব পুরনো গাছ। কিছু জন্মেছে পুরনো গাছের বীজ থেকে। ওইসব মুখরোচক ফলের লোভে গ্রামের ডাকাবুকো ছেলেরা ভয় তুচ্ছ করে এবং বাড়ির লোকের চোখরাঙানি অগ্রাহ্য করে মাঝে মাঝে ওই জঙ্গলের ভিতর হানা দেয়।

নীল সাহেবরা চলে গেছে একশো বছরেরও বেশি আগে। তারপর কয়েকবার হাত বদল হয়ে এই সম্পত্তির মালিক আপাতত রামপুরহাটের মুখুজ্যেরা। অনেক শরিকানার বিষয়। ফলে কেউ এদিকে নজর দেয় না। দেখাশোনা করে না। তাই দিনে দিনে কুঠিবাড়ি ঘিরে জঙ্গল বাড়ছে। জায়গাটা ভূতুড়ে হচ্ছে। পাহারাদার নেই, ফলে গাছের ফল যে পারে খায়।

ওই নীলকুঠির জঙ্গলে কী মতলবে ঢুকবে ভোলাদা আর নিমাই মান্না? রহস্য! একটা গভীর রহস্যের আভাস পায় শিব। কিন্তু রহস্যটা যে কী হতে পারে হদিশ করতে পারে না। দেবুকে চাই দেবু। তার প্রাণের বন্ধু। দুজনে একসঙ্গে পড়ে ক্লাস ইলেভেন-এ। সবসময় একসঙ্গে থাকে। তাই তাদের লোকে ডাকে মানিকজোড়।

দেবুর চোখা বুদ্ধি। ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়। রহস্য ও গোয়েন্দা গল্পের পোকা। এসব ব্যাপারে ওর মাথা দারুণ খেলে। শিব খেলাধুলোয় চৌকস। হাতে পায়ের ডান পিটেমিতে ওর জুড়ি নেই। কিন্তু মাথা খেলানোর ব্যাপার হলেই

—কীরে?—শিব ডাকতে দেবু তার ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি দিল : এত সকালে!

—একটা কথা আছে, বাইরে আয়।

হুঁ।—শিবের চোখ মুখের অবস্থা দেখে দেবু কিছু আন্দাজ করে বলল : দাঁড়া যাচ্ছি।

একটু বাদেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। বলল,—কোথায় বসবি? চল তেঁতুলতলায়।