উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

সাজ ধরার সাজা – ৩

তিন

মেলায় দোকানপাটের চৌহদ্দির মাঝখানে ঢুকে থামল নারাণ। দেখল চারপাশ।

সরু সরু রাস্তা গেছে সোজা সোজা—দু ধারে দোকান। পথের ওপরেও পসরা সাজিয়ে বসেছে কেউ কেউ।

ঘুরে দেখা যাক। ধীর পায়ে হাঁটতে লাগল নারাণ। চোখ কান সতর্ক। ঘেঁষাঘেঁষি করে সারি দিয়ে লোক চলেছে। একসারের পাশ দিয়ে অন্য সার চলেছে উল্টো মুখে।

বাসনের দোকানের সারি—ছিট কাপড়ের সস্তা জামাকাপড়—খেলনা—পাথরের জিনিস—দেখতে দেখতে চলল নারাণ। কোনো দোকানের সামনে কখনও থামে একটু। পিছন থেকে কোনো আওয়াজ বা ডাক শুনলেই চট করে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নেয় সঙ্গে সঙ্গে।

উঃ! খুব ভিড় হয়েছে আজ! কে কার সঙ্গে কথা বলছে বোঝা দায়। ফট করে কেউ দুটো কথা বলে চলে গেলেও হয়তো খেয়াল করতে পারবে না। ফকিরডাঙার ফকির ছিলেন সাধক মানুষ। হিন্দুমুসলমান সবাই শ্রদ্ধা করে ফকিরকে।

তাই সবরকম লোক আসছে। মুসলমানদের অনেকেরই দাড়ি আছে। হিন্দুদের মধ্যেও দাড়ি গোঁফওলা লোক নেহাত কম নয়। এই মেলায় ছদ্মবেশ চেনার ব্যাপারটা যে এত কঠিন, নারাণ আন্দাজ করেনি আগে। দুত্তেরি, মেলা দেখা মাথায় উঠেছে—কেবল মানুষের গলার আওয়াজে চমকে চমকে উঠছে।

দু-চারজন কদমপুরের লোকের দেখা হল। ডাকল কেউ কেউ। নারাণ কিন্তু এড়িয়ে গেল। সঙ্গী থাকলেই গল্প হবে। এবং সেই ফাঁকে মদন যদি দুটো কথা শুনিয়ে দিয়ে ভিড়ের মধ্যে সটকে পড়ে টেরই পাবে না সে।

শর্ত হয়েছে, মদনকে বলতে হবে কোথায়, কী কথা সে শুনিয়ে গেছে নারাণকে। তখন কী করছিল নারাণ। কী পোশাক ছিল তার গায়ে। অবশ্য যদি না তখুনি ধরা পড়ে যায়। যদি নারাণ বোঝে মদন ঠিক বলছে, মেনে নিতে হবে তাকে। নারাণ যেদিন ছদ্মবেশ ধরবে তার বেলাতেও ওই একই কড়ার।

একা একা ঘুরতে ভালো লাগছে না। নারাণ ভাবল, জুটিয়ে নিই কোনো বন্ধু। এভাবে মুখ বুজে মেলায় ঘোরা ভারি যন্ত্রণা। একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে ইতস্তত তাকায় নারাণ। চেনা কারও দেখা মেলে যদি। একটা বিড়ি ধরাল সে। চা খেতে হবে, গলাটা শুকিয়ে গেছে।

—দাদা, আগুনটা এট্টু, দেবেন?

ভাঙা সদিবসা ফ্যাসফেসে গলায় কথা শুনে চমকে পাশে তাকায় নারাণ। কান ঢেকে, মাথা ও মুখের অর্ধেক পেঁচিয়ে কম্ফটার জড়ানো। হাঁটু অবধি ঝোলা কালো ওভারকোট। মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। চোখে মোটা কাচের চশমা। এক বিচিত্র মূর্তি। ডান হাতের দু আঙুলে একটা বিড়ি উঁচিয়ে নারাণের দিকে চেয়ে আছে।

নারাণ দেশলাই বের করে লোকটির হাতে দিল। অমনি ধাঁ করে মাথায় এল-এ ঠিক মদন।

কালোকোটের সামনে ঘুরে দাঁড়িয়ে নারাণ বলল,—বাবা মদন, চিনে ফেলেছি।

লোকটি বেজায় অবাক ভাবে বলল,—অ্যাঁ।

চিনে ফেলেছি। তুই মদন।—নারাণ বলল ফের।

কী বলছেন মশাই যা-তা!—ভাঙা কাঁসি বাজল যেন।

নারাণ থতমত খেয়ে বলল, তুই, মানে তুমি, মানে আপনি মদন না?

কে আপনার মদন?—কালোকোট গর্জন ছাড়ল।

—আজ্ঞে নবগ্রামের মদন ঘোষ। আমার চেনা লোক।

—চিনি না মশাই কস্মিন কালে। আমার নাম সুধাকান্ত সাধুখাঁ। নিবাস মকরন্দপুর। নবগ্রামে গেছলাম একবার হালের বলদ কিনতে। ব্যস্। হ্যাঁ, আমার এক ভাইপো আছে মদন হুগলিতে থাকে।

তবু নারাণের সংশয় যায় না। সত্যি মদন নয়? মদন মহাধুর্ত। হয়তো অ্যাকটিং করছে। পরে বলবে—ও তো আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছিলি। যদি ঠিক চিনেছিলি তবে ছাড়লি কেন? এর দাড়িটা একবার টেনে দেখব নাকি? না, যদি ভুল হয়?

শুধু সে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল—ঠিক বলছেন?

—আলবাত। গলার জোরে আমার নাম পালটে দেবেন নাকি! ইঃ, আবদার।

রাগের চোটে লোকটা হুস্হুস্ করে টেনে বিড়িটা অর্ধেক করে ফেলে। এমনি সময় দু-জন লোক এসে কালো-কোটের কাছে দাঁড়াল। একজন বলল,—এই সুধা চেল্লাচ্ছিস্ কেন?

—আরে, দেখ, না হুজ্জুতি। কোথাকার এক পাগলের পাল্লায় পড়েছি। বলে কিনা আমি হচ্ছি মদন। নবগ্রামে বাড়ি। মানছে না কিছুতেই।

সুধানন্দের সঙ্গী দুটি বেশ গাট্টাগোট্টা। তারা কটমট করে দেখে নিল নারাণকে। একজন বলল, মশাইয়ের মদন কি এইরকম দেখতে?

হ্যাঁ, মানে—নারাণ তোতলায়।

অন্যজন রসিকতা করল—সুধা তোর যমজ ভাই আছে জানতাম না তো!

ঘোড়ার ডিম আছে। বেটা আহাম্মুক। চ-চ-সঙ্গীদের ঠেলে নিয়ে সুধানন্দ সাধুখাঁ ভিড়ে মিশে গেল।

বাপ্ রে!—হাঁপ ছাড়ল নারাণ।

এভাবে যাকে-তাকে হুট্ করে মদন বলে ডাকার বিপদ সে টের পায়। সাবধানে বুঝে শুনে এগোতে হবে। নইলে ফ্যাসাদে পড়তে পারে।

যাঃ, লোকটা যে তার দেশলাইটা নিয়ে চলে গেল। যাক গে। ওই বদরাগী সুধানন্দকে খুঁজে বের করে দেশলাই ফেরত চাইতে নারাণের সাহসে কুলল না।

মিষ্টির দোকানগুলো দেখতে দেখতে চলছিল নারাণ। রকমারি মিষ্টি সাজানো থরে থরে। ল্যাংচার দোকান এসেছে একটা। একেবারে খাস শক্তিগড়ের মাল। দেখলেই জিভে জল আসে। বাড়ির জন্যে এক হাঁড়ি নিয়ে গেলে হয়। বাজিটা জিতে ফেললে নিয়ে যাবে ঠিক। গোটা দুই এখন চেখে দেখলে কেমন হয়?

—বাবু দুটো ভিক্ষে দেবেন?

কাতর আবেদন শুনে পাশে তাকিয়ে দেখল নারাণ, এক বুড়ো ভিখিরি। মুখে খামচা-খামচা দাড়ি-গোঁফ। বাঁ পায়ে হাঁটুর নিচে মস্ত এক পট্টি জড়ানো। কোনো ঘা-টা আছে হয়তো। গায়ের চামড়াই ছোপছোপ ময়লা। পরনে একটা ছেঁড়া আলখাল্লা। মাথার চুল রুক্ষ, জট পাকানো। এক হাতে ধরা লাঠির ওপর কুঁজো হয়ে ভর দিয়ে আছে। অন্য হাতে একটা টিনের বাটি—এগিয়ে দিয়েছেন নারাণের সামনে।

নারাণ পকেট হাতড়াতে লাগল একটা পাঁচ পয়সার খোঁজে! পয়সাটা বের করে বাটিতে ফেলতে মাথা নুইয়ে কৃতজ্ঞতা জানাল ভিখিরিটি।

চলে যাবে বলে সে পিছনে ফিরেছে, অমনি নারাণ তড়াক করে গিয়ে তার মুখোমুখি হল, —কে মদন না? হুঁ, ঠিক চিনেছি।

অ্যাঁ!—ভয়ার্ত একটা চাপা আওয়াজ বেরোল ভিখিরির গলা দিয়ে। সে সজোরে মাথা নাড়ল।

ফের না! চাপা গর্জন ছাড়ল নারাণ,—আমার চোখে ধুলো দিবি! ওটা তোর আসল চুল? আমায় পরচুলা চেনাবি?

সঙ্গে সঙ্গে ভিখিরিটি হনহন করে একদিকে হাঁটকে শুরু করল। পা টেনে টেনে চলা অক্ষম বৃদ্ধের চলন নয়, রীতিমতন দ্রুত পদক্ষেপ।

কয়েক মুহূর্ত থ হয়ে রইল নারাণ। একী পালাচ্ছে কেন মদন!

রেগে নারাণ হাঁক ছাড়ল—মদন, পালাচ্ছিস কোথা?

ভিখিরি প্রায় দৌড়তে শুরু করল। ভিড়ের ফাঁকে ফাঁকে পুরো ছোটা অবশ্য সম্ভব নয়—খুব জোরে হাঁটাই বলা উচিত।

মিষ্টির দোকানের একজন খদ্দের দুর থেকে লক্ষ করছিল ব্যাপারটা। সে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে বলল নারাণকে—কী দাদা পালাল যে! পকেটমার?

নারাণ ততক্ষণে মদনকে ধরতে ধাওয়া করেছে। সে হাত নেড়ে জানাল না।

প্রশ্নকর্তা ভাবল তাকে ডাকছে সাহায্য করতে—নির্ঘাৎ পকেটমার।

সে বিকটস্বরে চিৎকার দিল ‘চোর চোর’—এবং উৎসাহের চোটে ছুটল নারাণকে

টপকে, লোকজনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে, ভিখিরির পিছু পিছু।

এমনি মুহূর্তে বহুকণ্ঠের গর্জন উঠল চোর চোর।

ভিড়ের একটা অংশ ধেয়ে গেল একদিকে। হই হই মারমার রব। চারদিক থেকে লোক ছুটে আসছে। অনেক দোকানী চটপট দোকানের ঝাঁপ ফেলে দিল লুটপাটের ভয়ে।

এক জায়গায় কুণ্ডলী পাকাচ্ছে ভিড়টা। ভিতরে যে কী ঘটছে ঠিক বোঝার জো নেই। তবে তর্জন-গর্জন ও হুঙ্কারের আওয়াজে মনে হচ্ছে ধরা পড়ে মার খাচ্ছে চোরটা।

নারাণ তখন সেই জমাট ভিড়টার বাইরে নিজের চুল ছিঁড়ছে আফশোসে। হায় হায় এ কী কাণ্ড হল! কী বোকামি করল মদন। চোরের মার এই মেলার মাঝে। মরে যাবে ও। বাঁচাতেই হবে ওকে।

পাগলের মতো নারাণ ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকতে চেষ্টা করে। কিন্তু বিনি পয়সায় হাতের সুখের লোভ অনেকেরই। যারা চোরের কাছে পৌঁছতে পারেনি, ঠেলাঠেলি করছে ভিতরে ঢুকতে। তাদের গুঁতোয় ঢুকতে পারে না নারাণ।

অ্যাই। হট্ যাও। হটো হটো।—দুই জাঁদরেল পাহারাওলা রুল ঘোরাতে ঘোরাতে ছুটে এল। তাদের রুলের ঘা থেকে গা বাঁচাতে একটু সরে গেল জনতা। সিপাই দুজন এগোল। তাদের পিছনে পিছনে নারাণও ঢুকে পড়ল ভিতরে।

ভিড়ের ফাঁক দিয়ে ওর অবস্থা দেখে শিউরে উঠল নারাণ।—উবুড় হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। আলখাল্লা কুটিকুটি। গায়ে জামায় রক্তের ছোপ। পরচুলা উধাও। একজন মুঠো করে ধরেছে তার চুল।

নারাণের হাত-পা কাঁপতে লাগল। দুঃখে অনুশোচনায় যেন ক্ষণকালের জন্য বোবা হয়ে গেল। কী করবে সে? কী করে বোঝাবে এই অবুঝ উন্মত্ত জনতাকে—ও মদন। আমার বন্ধু। চোর নয়।

পুলিশের অধিকারে অন্যে ভাগ বসিয়েছে দেখে চটল পাহারাওলারা। যে লোকটি ভিখিরির চুল পাকড়েছিল তাকে ধমক লাগাল এক সেপাই অ্যাই ছোড়।

লোকটি চুল ছেড়ে সরে দাঁড়াল।

ভূপতিত লোকটি যে চোর তাতে সন্দেহ ছিল না সেপাইদের। তাদের একজন গদাম করে এক সবুট লাথি লাগাল চোরটাকে এবং হুকুম করল অ্যাই ওঠ।

এবং সঙ্গে সঙ্গে চোরের জামা ধরে হেঁচকা টানে তাকে খাড়া করিয়ে দিল।

একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে আসতে আটকে গেল নারাণের গলায়। নিপীড়িত লোকটার মুখ দেখতে পেল সে। একী এ তো মদন নয়!

জনতার হিংস্র টান পরচুলার সঙ্গে সঙ্গে নকল দাড়ি-গোঁফও খুলে গেছে লোকটার। বেরিয়ে পড়েছে আসল রূপ। ও চেহারা মদনের নয়, হতে পারে না। তাহলে কে!

রহস্য তখুনি উন্মোচিত হল।

সিপাহিজি লোকটার মুখ একবার ভালো করে দেখে নিয়ে তার ঘাড়ে মোক্ষম রদ্দা কষিয়ে দিয়ে হুংকার ছাড়ল আরে বেটা মদনা। আভি তু মিলা। আবে চল।

ভ্যাবাচ্যাকা নারাণ পাশের জনকে জিজ্ঞেস করল,—ও কে দাদা, ওই যে মার খেল?

উত্তর এল,—চেনেন না, ও মদন। দাগি চোর। ফেরারি হয়েছিল।

দুই সিপাই চোর মদনের দুই হাত পাকড়ে বীর দর্পে এগোল। ভিড়ের একটা বড় অংশ চলল তাদের পিছনে পিছনে।

শীতের সকালেও ঘাম মুছল নারাণ। উঃ ভাগ্যিস ও মদন নয়। নবগ্রামের মদন ঘোষের এই পরিণতি দেখার চেয়ে সে বরং বাজি হারতে রাজি আছে। ওঃ তাই লোকটা অমন পালাচ্ছিল। তাকে হয়তো ভেবেছিল পুলিশের চর।

গলাটা একদম শুকিয়ে গেছে। একটু চা খেতেই হবে। চটের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটা চায়ের দোকান থেকে এক ভাঁড় চা কিনল সে।