পাঁচ
এক জায়গায় নাগরদোলা বসেছে পাশাপাশি চারটে। মানুষসুদ্ধ নাগরদোলাগুলো বন বন করে ঘুরছে। দুলাল বলল—চ নাগরদোলা চড়বি?
বেশ।—রাজি হয়ে গেল তিনজনে। অনেকদিন নাগরদোলায় চড়েনি নারাণ।
তিনজনে উঠল একটা দোলায়। পাক খাওয়া শুরু হল। ওপর থেকে নীচে নামার সময় নারাণের পেটের ভিতর গুড়গুড়ুনি—এই জন্যেই নাগরদোলা চড়তে ভয়, আবার মজাও। ঘোরার সময় যখন টঙে ওঠে, গোটা মেলাটা দেখা যায়। শুধু মাথা আর মাথা।
মনটা হালকা লাগছে। মদনের চিন্তাটা আপাতত দূরে থাকুক। যতক্ষণ নাগরদোলায় বসে আছে ছদ্মবেশী মদনও দূরে রইল।
পঁচিশ পয়সায় কুড়ি পাক ঘোরা।
এক দফা পঁচিশ পয়সার মেয়াদ শেষ হল। কেউ নামতে চায় না। চলুক আরও।
দ্বিতীয় দফার পাক শুরু হয়েছে। চারপাশে কিছু লোক দাঁড়িয়ে মুখ উঁচু করে নাগরদোলার পাক খাওয়া দেখছিল। হয়তো তাদেরও ইচ্ছে হচ্ছে চাপতে কিন্তু ভরসায় কুলচ্ছে না। যারা দোলায় উঠেছে তারা অনেকে নানান উদ্ভট কাণ্ড করছে—কেউ ভয় পেয়ে, ভয় ঢাকতে চিৎকার করে হাসছে। কেউ পেট চেপে ধরে উবুড় হয়ে বসেছে। কেউ চেঁচাচ্ছে—বাবা গো। মরে যাব। নামব। থামাও। থামাও—
মাটিতে দাঁড়িয়ে অনেকেই দেখছিল এই তামাশা।
দাদা চাদর সামলে।—একজনের গলা শোনা গেল এবং একটা হাত উঁচু হয়ে দেখাল নারাণের দোলার দিকে।
রোদে গরম লাগছিল তাই নারণরা চাদর পাট করে কাঁধে রেখেছিল। কথাকটা কানে যেতেই তিনজনেই চমকে উঠে যে যার চাদর সামলাল। ঘুরপাকের সময় সবারই চাদর খানিক বেশি ঝুলে পড়েছিল, আর একটু ঝুললেই নাগরদোলার চাকায় জড়িয়ে যেতে পারত বা পড়ে যেত কাঁধ থেকে।
চাদর তুলে কোলে রাখার পর নারাণের খেয়াল হল।
ফণীকে জিজ্ঞেস করল, কোন লোকটা বলল আমাদের লক্ষ করেছিল।
ফণী মাথা নাড়াল,—ওই চারজনের মধ্যেই হবে কেউ।
—তুই দেখেছিলি দুলাল?
বোধহয় ওই গোঁফওয়ালা লোকটা। না না, তার পাশেরটা।—দুলাল দেখাল। বলতে বলতেই গোঁফওলার পাশের লোকটা পিছন ফিরে চলতে শুরু করল।
ওই লোকটা ঠিক?—বলল নারাণ।
মনে তো হল।
কাকে বলল রে, আমাকে না? নারাণ জিজ্ঞেস করল।
কে জানে হতে পারে।—ফণী তখন ঘূর্ণিপাকের ফূর্তিতে মশগুল।
বাঁই বাঁই করে ঘুরছে নাগরদোলা পুরোদমে। কোনোরকমে ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁক ছাড়ল নারাণ—মদন।
অ্যাই কাকে ডাকছিস?—বলল ফণী।
মদনকে।
আমাদের মদন পাল?
—না, নবগ্রামের মদন ঘোষ।
—কই রে?
—ওই যে যাচ্ছে।
ওই লোকটা! ভ্যাট। ও কক্ষনো মদন ঘোষ নয়। আমি দেখেছি।—বলল ফণী।
কী করে বোঝাবে নারাণ মদন ঘোষকে দেখলে কি আর চেনার উপায় থাকবে। নিরুপায় সে চুপ করে রইল। সন্দেহজনক লোকটি মিলিয়ে গেল ভিড়ে।
নারাণের মনে কেবলই খচ্ খচ্ করে—কথাটা কি আমায় বলেছিল? তাই তো মনে হল। আমিই তো ছিলাম ওই ধারে। যদি সত্যি মদন হয়? স্রেফ বেকায়দায় ফেলে বাজিটা জিতে নিল। ইস্! ওই লোকটাই বলল, না পাশের গুঁফোটা? অরে গুঁফোটাও যে কেটে পড়েছে! এখুনি নেমে গিয়ে ভালো করে ওর মুখখানা দেখারও জো নেই। নারাণের নাগরদোলা চড়ার আনন্দ প্রায় মাটি হল।
নাগরদোলা ঘোরা শেষ করে যখন সে নামল তখন সন্দেহভাজন সেই চারজনের কারোরই আর পাত্তা পেল না।
তিনজনে মেলায় টহল দিল খানিক।
খিদে পেয়েছে। একটা ভাত খাওয়ার দোকানে ঢুকল তারা।
দোকানে আরও লোক খাচ্ছে। লোক ঢুকছে বেরচ্ছে। কথাবার্তা হচ্ছে। ‘ও দাদা, মশাই’—ইত্যাদি কোনো সম্বোধন কানে এলেই চমকে চমকে ওঠে নারাণ। চারধারে তাকায়। কথাটা আমায় বলল নাকি? অমন ফার্স্ট ক্লাস রুই মাছের মুড়োটা নিশ্চিন্ত হয়ে উপভোগ করতে পারছে না বেচারা। নিজের ওপর রাগ হতে থাকে বাজি ফেলার জন্যে। এর ফল যে এমন শোচনীয় দাঁড়াবে কে ভেবেছিল!
বেঞ্চিতে বসে মাথা নিচু করে খাচ্ছিল নারাণ। হঠাৎ শোনা গেল—দাদা মাছ ভাত কত?
ঝট্ করে ফিরে তাকাল নারাণ। দেখল একটি বেঁটে রোগা লোক ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে আছে, বোধহয় উত্তরের আশায়।
নাঃ মদন নয়। কিন্তু বিষম খেয়ে কাঁটা ঢুকে গেল গলায়। অতঃপর শুকনো ভাতের ডেলা গেলা। জল টল খেয়ে অনেক কষ্টে সে সুস্থির হল।
ফণী বলল,—কীরে অমন করছিস কেন, কাকে খুঁজছিস? মদন ঘোষ?
—হুঁ।
—কী দরকার?
—এই মানে—
—টাকা কড়ি পাবি নাকি?
—হ্যাঁ, মানে—
ও আর পেয়েছিস। লোকটা মহাপাজি। ধার দেওয়ার আর লোক পেলি না? তা মেলায় খুঁজে কী করবি, বরং ভোরে ওর বাড়িতে গিয়ে ধরিস।
হুঁ।—নারাণ মাথা নাড়ল।
সার্কাস দেখবি?—বলল দুলাল : ম্যাটিনি শো-তে? তাহলে চ শিগগিরি আরম্ভ হয়ে গেছে।
ফণীও রাজি হয়ে গেল।
তাই ভালো, ভাবল নারাণ। মেলায় ঘুরলে কেবল দুশ্চিন্তা। তার চেয়ে সার্কাস দেখি বসে বসে। মেলার মধ্যেই থাকছি। মদন বলতে পারবে না যে কথার খেলাপ করেছি।
তিনজনে টিকিট কেটে ঢুকল সার্কাসে। বসল গ্যালারিতে, তক্তার ওপর। খেলা ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। গ্যালারি প্রায় ভর্তি। একেবারে নীচের থেকে দু থাক ওপরে বসার জায়গা পেল।
খাসা জমেছে খেলা। ছোট সাকার্স। তাঁবুর বাহার নেই। ব্যান্ড পার্টিটা চলনসই। কিন্তু খেলাগুলো দেখাচ্ছে বেশ।
ট্র্যাপিজের খেলা। দড়ির ওপর মেয়েদের ছাতা নিয়ে ব্যালান্স। একজন পুরো এক বালতি জল খেল ঢক ঢক করে। জলে খুদে খুদে রঙিন মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছিল। সবসুদ্ধ গিলল। একটু পরেই সে হাঁ করে হোস্-পাইপের তোড়ে জল বের করে বালতি ভর্তি করে ফেলল। দেখা গেল মায় মাছগুলো অবধি জ্যান্ত বেরিয়ে এসেছে। দুটো জোকার কিম্ভুত সাজ করে দারুণ হাসাচ্ছে দর্শকদের।
দেখতে দেখতে একটা বুদ্ধি খেলে গেল নারাণের মাথায়। কাল তো তার পালা। সে মেক-আপ করে আসবে এবং মদনকে ধরতে হবে তার ছদ্মবেশ।
সার্কাসের লোক সাজলে কেমন হয়? দুপুরে দেখে ছিল একজন জোকার হ্যাট-কোট পরা মাথায় চোঙার মতো লম্বা টুপি, রং মেখে মুখখানা মুখোশের মতো বানানো, একটা বিড়ির জ্বলন্ত দিকটা মুখের ভিতরে পুরে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঘুরছিল মেলায় আর সার্কাসের হ্যান্ডবিল বিলোচ্ছিল। ঠিক ওই রকম ড্রেস করা যায় যদি? বিড়ির জ্বলন্ত দিকটা মুখে নিয়ে টানতে আমিও পারি। মদনের সামনে গিয়ে ওর হাতে একটা হ্যান্ডবিল গুঁজে দিয়ে বললেই হবে মর্নিং স্যার।
টুপিতে লেখা থাকবে–‘দি গ্রেট রয়াল সার্কাস।’ মদনের সাধ্যি কি সন্দেহ করে। সার্কাসের লোকেরাও ধরতে পারবে না চট করে। ভাববে ওদেরই কেউ। তবে সার্কাসের তাঁবু থেকে যতটা সম্ভব দূর দূর থাকাই নিরাপদ।
কাজটা হাসিল হলেই টুক করে বেরিয়ে যাবে মেলা থেকে। মুখে রং না মেখে একখানা রঙচঙে মুখোশ পরে নেবে। মেলা থেকে বেরিয়ে খুলে ফেলবে মুখোশ আর টুপি। সার্কাস থেকে বেরবার সময় বেশ কটা হ্যান্ডবিল হাতিয়ে নেব দরজায় দাঁড়ানো লোকটার কাছ থেকে। বলতে হবে গ্রামে বিলোব। ফণী আর দুলালকেও বলতে হবে, কটা হ্যান্ডবিল নিয়ে নিতে।
খেলা দেখার ফাঁকে ফাঁকে প্ল্যানখানা বাগিয়ে ফেলছিল নারণ। হঠাৎ কানে এল—এই নারাণ।
চমকে মাথা তুলে ওপরে পাশে দেখতে লাগল নারাণ।
কে ডাকল আমায়?–একবার প্রশ্ন করল ওপরের এবং ডান পাশের দর্শকদের উদ্দেশে।
কিন্তু কেউ জবাব দিল না। তাদের চোখ তখন দড়ি ঘেরা গোল খেলা দেখানোর জায়গায়।
সেখানে তখন একটা কাঠের বড় তক্তা খাড়া করে রাখা হয়েছে। তক্তাটার সামনে বেঁধে দাঁড়িয়েছে ঝলমলে পোশাক পরা একটি সুন্দরী মেয়ে। কিছু দূরে এক চীনা সাহেবের চোখ বাঁধা হচ্ছে। তার হাতে অনেকগুলো বড় বড় ঝকঝকে ছোরা। চোখ বাঁধা অবস্থায় সে নাকি ওই ছোরাগুলো ছুড়বে একটার পর একটা—আর সেগুলো নাকি পরপর গেঁথে যাবে মেয়েটির গা ঘেঁষে ঘেঁষে তক্তার ওপর। দর্শক তাই রুদ্ধশ্বাস।
কে ডাকল নারাণ বলে?–চারপাশের গ্যালারিগুলো দেখতে দেখতে আবার জিজ্ঞেস করল নারাণ।
এবারও সাড়া মিলল না।
কী ছটফট কচ্ছিস!—ফণী ধমকে দিল নারাণকে।
–কে ডাকল আমায়।
–কেউ না। খেলা দেখ্।
–হুঁ মনে হল যে।
হারান বলে ডেকেছে। তোর নাম হারান?–ফণী খিঁচিয়ে ওঠে।
তর্ক করতে ভরসা না পেয়ে নারাণ সোজা হয়ে বসল। কিন্তু ফের অশান্ত হয়ে ওঠে মন। সত্যি হারান, না নারাণ! মদনের চালাকি নয় তো? হয়তো পিছনে পিছনে ঘুরছিল এতক্ষণ। এইবার বাগে পেয়েছে।
খানিক ডানধারে এক ধাপ ওপরে চাদরে মুখ ঢেকে একটা লোক বসে আছে, ও নয়তো? খেলা শেষ হলেই ধরতে হবে ওকে।
খেলা দেখতে আর মন বসল না নারাণের।
শো ভাঙতেই সবাই হুড়মুড় করে নামতে লাগল গ্যালারি থেকে। সেই সন্দেহজনক লোকটা যে কোথায় হারিয়ে গেল নারাণ হদিশই পেল না। মনটা এমন খিঁচড়ে গেল যে বেরবার সময় সার্কাসের বিজ্ঞাপন নেওয়ার কথাটাও সে বেমালুম ভুলে গেল।
