উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

সাজ ধরার সাজা – ৬

ছয়

সার্কাসের বাইরে এসে নারাণ ভাবল দূর ছাই। চুলোয় যাক বাজি। হারি হারব, আর এই অশান্তি সহ্য হয় না। চারটে বেজে গেছে। এবার গাঁয়ে ফেরা যাক। যাওয়ার আগে বউয়ের জন্যে একটা মালা কিনে নিই। একটু কায়দা করে ফণী আর দুলালকে ছেড়ে দিয়ে নারাণ একলা হল।

এক জায়গায় পর পর কয়েকটা শৌখিন গয়নার দোকান। সাজানো রয়েছে রঙিন কাচে তৈরি নানারকম মালা। নকল সোনা বা রুপোর হার, দুল, চুরি। গালার গয়না। সবই মেয়েলি জিনিস। ছেলেদের পক্ষে কিছু একটা পছন্দ করা কঠিন কাজ।

খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে কয়েকবার ভাবল নারাণ—থাক আজ। আর একদিন আসবখন বউকে নিয়ে। ও নিজেই পছন্দ করে কিনবে। কাল হবে না। পরশু? না! পরপর তিনদিন মেলায় আসার ধকল পোষাবে না। একদিন অন্তত বিশ্রাম চাই।

ফিরলেই বউ ঠিক বায়না ধরবে, কাল মেলায় নিয়ে চলো। কোনো রকমে ঠেকিয়ে রাখতে হবে দুটো দিন। আজ যে সে মেলায় যাচ্ছে বলেনি বাড়িতে। তবে ঠিক জানতে পারবে বউ। আর জানলেই চটে যাবে, একা একা গেছে বলে। একটা পছন্দসই কিছু হাতে নিয়ে গেলে বেশি গোলমাল করবে না।

এক ফাঁকে একটা দোকানে ঢুকে তাড়াতাড়ি সে কিনে ফেলল একছড়া মালা—ঝুটো মুক্তোর মালা। কাচের পুঁতি মুক্তোর মতো দেখতে। বেশ দামি জিনিস কিনতে সাহস হল না। যা মালুম হচ্ছে, বাজি তো হারবে। দশটি টাকা যাবে গচ্চা! লোকসানটা হিসেব করে তহবিলের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিল।

নারাণ ভাবল—মদনের ছদ্মবেশ তো আজ ধরতে পারলাম না, এখন আসচে কাল যদি মদনকে ফাঁকি দিতে পারি নিজের ছদ্মবেশের জোরে তবে কিছুটা উসুল হয়। কাটাকাটি হয়ে যাবে বাজি। টাকাটা লোকসান যাবে না অন্তত। তখন নাহয় বউকে দেওয়া যাবে আরও একটা কিছু

নারাণ দোকানিকে দাম চুকিয়ে মালাটা পকেটে পুরছে, কানে এল– কী গো জামাই, কেমন আছ? আমাদের বকুলরানী ভালো?

সে চেয়ে দেখল, সামনে একটা মাঝবয়সি বউ। কপালের আধখানা ঘোমটা ঢাকা। তার নিচেই আধুলির সাইজের সিঁদুরের টিপ। নাকে নাকছাবি। ঠোঁট পানের রসে লাল। গায়ে জমকালো শাড়ি। তার ওপর হলুদ রঙের পাতলা চাদর জড়ানো। দুই হাতে গোছাভরা রঙিন কাচের চুড়ি।

নারাণ আমতা আমতা করে বলল,–আজ্ঞে আপনি?

চিনতে পারলে না তো ভাই। তোমার শ্বশুরবাড়ির লোক। তোমার বিয়েতে কত খাটলাম। এখন আর গরিব দিদিকে চিনবে কেন? আচ্ছা চলি ভাই। পুজোয় শ্বশুরবাড়ি গেলে দেখা হবে।–বউটি একটু অভিমানভরেই বিদায় নিতে যায়।

হুঁ, খুব চেনা চেনা। দেখেছি কোথায়! বুঝেছি।–এক পা এগিয়ে বউটির সামনে গিয়ে বলল নারাণ : মনে পড়েছে, তুমি, মানে আপনি মদন। মানে মদনদি।

মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হেসে উঠল বউটি। ঘাড় নেড়ে জানাল,–হয়নি।

চালাকি হচ্ছে? হয়নি। নির্ঘাৎ মদন। তাই চেনা চেনা ঠেকছে।

.

ঠিক ওরমই মতো নাক চোখ হাইট। রঙটা একটু ময়লা করেছে মেকআপে। আমার শ্বশুর বাড়ির গাঁ থেকে এদ্দূর এসেছে মেলা দেখতে! ভাঁওতা মারার আর জায়গা পাননি। এর গাল দুটো একটু টেবো টেবো। নিশ্চয় আলুর টুকরো পুরেছে গালে। তাই গলার স্বরও পালটে গেছে।

কী করি? কী করি? এরকম নাকের ডগা দিয়ে কলা দেখিয়ে ভেগে পড়বে তাই বা ছাড়ি কী করে? কিন্তু যদি না মেলে?

বউটির চাদরে ঢাকা হাত দুটির আধখানা করে দেখা যাচ্ছে। চেনবার অছিলায় ওর হাত ভালো করে লক্ষ করতে থাকে নারাণ।

—কীগো দাঁড়ালে কেন?

একটি গমগমে কণ্ঠ শোনা গেল ধুতি-জামা-চাদর গায়ে এক দশাসই পুরুষ হনহন করে এদিকে আসছেন। এক হাতে বিরাট এক লোহার কড়াই, অন্য হাতে বছর দশেকের একটি ছেলেকে টানতে টানতে আনছেন।

একে চিনতে পার?—বউটি মিচকে হেসে নারাণকে দেখিয়ে আঙুল তোলে।

মেটে হাঁড়ির মতো মুখখানায় মোটা গোঁফ জোড়াটি নাচিয়ে, রসগোল্লার মতো চোখ দুটি মিটমিট করতে করতে বোকা বোকা হাসি ফুটিয়ে ভদ্রলোক নারাণকে দেখতে থাকেন।

–আমাদের গাঁয়ের জামাই গো, বকুলের বর।

তা খবর সব ভালো তো? কেনাকাটি কী হল? এইটে কিনলেম।– কড়াইটা তিনি নারাণের নাকের সামনে ঝুলিয়ে দিলেন : খাসা, পেটা জিনিস। কেমন!

শিরশিরে হিমেল হাওয়াতে নারাণের কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমে। বাপরে খুব বেঁচেছি। যা ভাবছিলাম, কাজে তাই করে ফেলিনি ভাগ্যিস।

নারাণ মিনমিন করে প্রশ্ন করল,–অ্যাদ্দুরে এলেন কী করে?

আরে ওখান থেকে কি আসা যায়। কাছেই এসেছি শ্যামপুকুর গাঁয়ে। আমার বোনপোর অন্নপ্রাশনে। তাই ভাবলেম মেলাটা দেখে যাই। পরশু ফিরব।—বললেন ভদ্রলোক!

বিদায় নেওয়ার সময় বউটি বলল,–বকুলকে বোলো, তার পুঁটিদির সঙ্গে দেখা হয়েছে। ফের দেখা হলে চিনো কিন্তু ভাই।

নিজের জন্যে একটা বেতের লাঠি কিনল নারাণ। অনেক দিনকার শখ। হাত তিনেক লম্বা, বেশ মোটা লাঠিটা। চকচকে। ডগায় লোহার খাপ পরানো। সাপ-খোপ মারতে কাজে দেবে।

নারাণের গ্রামের অনেকেই ফিরছিল মেলা দেখে। চেনা-শোনাদের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছিল না নারাণের। মনটা বেজায় দমে গেছে। আল ভেঙে গিয়ে সে একটা অন্য পথ ধরল। এই পথে গাঁয়ে পৌঁছতে খানিক ঘুর হবে। তা হোক। একটু চিন্তা করা দরকার নিরিবিলিতে নিজের মনে।

মেলায় কয়েকজন তার সঙ্গে কথা বলে সরে পড়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কি মদন? হতে পারে। কিন্তু কে?

সার্কাসের লোকটা যে নারাণ (বা হারান) বলে ডেকেছিল। বসেছিল চাদর মুড়ি দিয়ে?

না যখন চা খাচ্ছিল—‘দাদা এট্টু সরে’ বলে পালাল।

না, যে লোকটা নাগরদোলার নিচ থেকে ডেকে কথা কইল?

হয়তো আজ রাতেই হাজির হবে মদন। এসে বলবে, ধরতে পারলি না তো? বাজি জিতে গেছি। এবার টাকা ছাড়

তখন সে দুম করে বলে বসবে—‘হ্যাঁ চিনেছি বইকি।’ ওই জন তো তুই।’ যদি লেগে যায় বরাত জোরে।

পিছনে সাইকেলের আওয়াজ। এক সাইকেলওলা এসে পড়ল ঠিক ঘাড়ের কাছে। নারাণ সরে গেল।

দাদা কটা বাজে?–হেঁড়ে গলায় শুধাল সাইকেলওলা।

হাত ঘড়ি দেখে উত্তর দিল নারাণ–পৌনে পাঁচটা। পাশ কাটিয়ে হুস্ করে বেরিয়ে গেল সাইকেল।

সাইকেলওলা হাত কুড়ি-পঁচিশ এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ তার দিকে মনোযোগ দিল নারাণ। ওর মুখটা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু গায়ে সবুজ রঙের আলোয়ান। মদনের এমনি একটা আলোয়ান আছে না?

তৎক্ষণাৎ সে হাঁক ছাড়ল অ্যাই মদন। থাম্ বলছি।

সাইকেলওলা আধখানা ঘাড় বাঁকিয়ে একবার দেখল পিছনে। তারপরই সোজা তাকিয়ে ঝুঁকে পড়ে বন্ধন করে প্যাডেল ঘোরাল।

মদন ভালো হবে না। পালাচ্ছিস কোথা? তবে রে!– বলতে বলতে উত্তেজনায় ধেয়ে গেল নারাণ।

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলল সাইকেল।

থেমে পড়ল নারাণ। ওকে ধরার চেষ্টা বৃথা। খুব সম্ভব ও মদন। জব্বর প্ল্যান ঠাউরেছিল। মেলায় সুবিধে করতে পারেনি কথা বলার, তাই পিছনে পিছনে এসেছে। সময় জিজ্ঞেস করার ফাঁকটুকুতে দিব্যি এগিয়ে যাবে। ওর মুখ দেখার সুযোগ পাবে না নারাণ। ঠিক আছে পালিয়ে কী হবে? বাজির টাকা চাইতে এলেই বলবে সে–চিনেছি তোকে। সাইকেলওলা।

সাইকেলওলা তখন বাঁ পাশে গ্রামের ভিতর অদৃশ্য হয়েছে। পথের ডান দিকে একটা প্রকাণ্ড বাগান। সেখানে আম, জাম, কাঁঠাল, তেঁতুল ইত্যাদি নানা বড় বড় গাছ গায়ে গায়ে ঘন আছে। বড় গাছগুলোর তলা সাফসুফ নয়। আগাছা ঝোপে ভর্তি। এই বাগানের পাশ দিয়ে ঘুরে গেছে রাস্তাটা।

হঠাৎ নারাণের নজর পড়ল গ্রামের দিকে।

পাঁচ-ছয় জন লোক বেরিয়ে আসছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে লাঠি সোটা, চকচকে বল্লম বা দা। তাদের সঙ্গে সেই সাইকেলওলা আরোহী। নারাণ থমকে দাঁড়াল।

লোকগুলো চিৎকার করে উঠল। তারপর চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়ে আসতে লাগল নারাণকে লক্ষ্য করে।

মুহূর্ত ভাবল নারাণ—পালানোই উচিত। তাকে ঠিক ভেবেছে চোর-ডাকাত কিছু। হাতের লাঠিটাই কাল হয়েছে। এদের বোঝাতে গিয়ে লাভ নেই। কে বিশ্বাস করবে এই উদ্ভট বাজির কথা। তার আগেই সে উত্তম-মধ্যম খেয়ে যাবে। নারাণ ডানধারের বাগান ভেদ করে সবেগে ছুট দিল।

বাগানের প্রায় অপর প্রান্তে এক ঘন ঝোপের ভিতর গা ঢাকা দিয়ে বসে রইল নারাণ। অনেকক্ষণ ধরে কানে এল গ্রামের লোকের উত্তেজিত কোলাহল। কিন্তু তারা বাগানের বেশি গভীরে ঢুকতে সাহস পেল না।

নারাণ যখন বাগান ছেড়ে বেরোল তখন রাত নেমে গেছে। আকাশে চাঁদ নেই। কুয়াশায় পথ-ঘাট দেখা যাচ্ছে খুব আবছা। পা টিপে টিপে এগোল সে। যখন সে বাড়ি পৌঁছল আর দাঁড়াতে পারছে না।

ঘণ্টাখানেক বিছানায় টান হয়ে শুয়ে থাকার পর খেতে উঠল নারাণ।

বউ বলল,—জানো, তুমি বেরিয়ে যাওয়ার পরই নবগ্রাম থেকে একখান চিঠি দিয়ে গেল একটা ছেলে। বললাম, রেখে যাও, বাবু আসবেন এখুনি। তা তুমি যে মেলায় যাচ্ছ কও নি তো আমায়। আমি ভাবলেম, কাজে গেছ কোথায়। আসবে ঘুরে একটু পরে চা খেতে।

কই চিঠি?–নারাণ লাফিয়ে উঠল।

—ওই টেবিলের ওপর রেখেছি।

নারাণ চিঠির ভাঁজ খুলে ঝুঁকে পড়ল—

ভাই নারাণ, আজ আর মেকআপ করে যেতে পারব না মেলায়। ঘরে হঠাৎ কুটুম এসেছে। কিছু মনে কোরো না। কাল কুটুমকে নিয়ে মেলা দেখতে যাব। কাল তো তোমার ছদ্মবেশ ধরার দিন। কথা মতো সাজ করে এসো মেলায়। ও আমি ঠিক ধরে ফেলব। শর্ত মনে আছে নিশ্চয়ই। আমার সঙ্গে কথা বলতে হবে কিন্তু। পরদিন হবে আমার পালা। আমি সাজব। আশাকরি এ ব্যবস্থায় আপত্তি হবে না। কুশলান্তে শ্রীমদনচন্দ্র ঘোষ।

পুঃ—যদি কাল ছদ্মবেশ করে মেলায় না যাও তবে অবশ্যই নিজে বা লোক মারফত খবরটা আজ আমায় জানিয়ে দেবে।

কটা লম্বা লম্বা দম টানল নারাণ। বটে আজ যায়নি মদন। সে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল–হারু আছে?

আছে।—উত্তর দিল বউ।

একটা খাতা টেনে কলম খুলে নারাণ লিখতে শুরু করল :

শ্রীমদনচন্দ্র ঘোষ সমীপেষু—

তারপর একটুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে সে খাতাটা বন্ধ করল। কলমটাও রেখে দিল।

ভাবল সে, নাঃ কাল সে যাচ্ছে না মেলায় সাজ করে। ঢের হয়েছে। ফের পরশু ছদ্মবেশী মদনের খোঁজে ঘুরতে হবে নাকি। উরিব্বাস্! আর নয়। থাগে বাজি। চিঠিতে জানিয়ে দেব পরশু আমার জরুরি কাজ আছে, তাই বাজি নাকচ এ যাত্রা।

তবে হ্যাঁ, চিঠিটা পাঠাচ্ছি না আজ মদনকে আমার না যাওয়ার খবর জানিয়ে। পাঠাব কাল হারুকে দিয়ে, একটু দেরিতে। যখন মদন কুটুমকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে মেলায়। খুঁজুক ও। খুঁজে মরুক ছদ্মবেশী নারাণকে। নারাণের আজকের অভিজ্ঞতার কিছু ভাগ, আজকের হয়রানির কিছুটা, আশাকরি ওর বরাতেও জুটবে।

[১৯৮১, কিশোর ভারতী শারদীয়া ]