হত্যাপুরীর হাতছানি অন্তর্ধান রহস্য
হালদার বাড়ির কেসটা মিটে যাওয়ার কয়েকদিন বাদে এক ছুটির দিন সকালে শিব হাজির হল দেবুর কাছে। তার চোখমুখ থমথম করছে। দেবু বুঝল, গুরুতর কিছু ঘটেছে। কারণটা জানতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। শিব গম্ভীর গলায় বলে, পরশু আমাদের গ্রামের লাইব্রেরি থেকে একটা বই হারিয়েছে। হয়তো চুরিই গেছে! কেসটা আমি তদন্ত করব ঠিক করেছি।
কি বই?—জিজ্ঞেস করে দেবু।
—হত্যাপুরীর হাতছানি। লেখক—ইন্দ্রজিৎ। পড়েছিস বইটা?
—না।
—উঃ! দারুণ বই! গা শিউরে ওঠে পড়তে পড়তে। মাত্র দু মাস আগে বইটা কেনা হয়েছে। গ্রাহকদের মধ্যে মানে আমাদের মতো ছেলেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে গিছল বইটা নিয়ে। এত ডিমান্ড দেখে লাইব্রেরিয়ান ভবেশবাবু নিয়ম করেন যে একজন পাঁচ দিনের বেশি রাখতে পারবে না বইটা। আমার সঙ্গে ভবেশদার একটু খাতির আছে। তাই লাকিলি আসা মাত্র বইখানা পড়তে পেয়েছিলাম। ফের পড়ব বলে ডিমান্ড দিয়ে রাখি চার দিন আগে। ভেবেছিলাম এবার পেলে তোকেও পড়াব।
কীভাবে হারাল বইটা?—দেবুর জিজ্ঞাসা।
—গতকাল একজন বইটা ফেরত দেয়। এরপর বিজয়ের নেওয়ার পালা। লাইব্রেরিয়ান বইখানা ওঁনার টেবিলের একপাশে রেখে দেন। ঘণ্টাখানেক বাদে বিজয় এসে বই চাইতে দেখা গেল বই লোপাট। অনেক খুঁজেও পাওয়া যায়নি। অগত্যা ভবেশদা খাতায় বইখানার পাশে লিখে রাখেন—লস্ট। বললেন, অনেক বই-ই হারায় এমনিভাবে। বিশেষত যেগুলোর চাহিদা বেশি। কখন যে টুক্ করে তুলে নিয়ে যায়। কত আর নজর রাখব, একা মানুষ। যাহোক আমি কিন্তু সহজে ছাড়ছি না।
কীভাবে এগুবি, ভেবেছিস?—দেবুর কৌতূহল।
—শুধু ভাবিনি। কাজেও এগিয়েছি খানিকটা। ভবেশদার থেকে হত্যাপুরীর ডিমান্ড লিস্টটা নিয়েছি। ওটা দেখলেই বোঝা যাবে, কার কার ওই বইটা সম্বন্ধে বিশেষ আগ্রহ ছিল। খুব সম্ভব তাদেরই কেউ সরিয়েছে। এদের পেছনেই আমি তদস্ত করব। মানে ইনভেস্টিগেশন।
—কজন বইটা চেয়ে নাম লিখিয়েছে?
—গত পরশু অবধি তেরোজন ছিল ডিম্যান্ড লিস্টে। এর মধ্যে দুজনকে বাদ দিচ্ছি। বিজয় এবং আমি। বাকি এগারো জনের যে কেউ অপরাধী হতে পারে।
—কীভাবে ইনভেস্টিগেশন করবি?
উপায় একটা ভেবেছি।—শিব রহস্যময় হাসে মাত্র। বোঝা গেল সে তার তদন্ত পদ্ধতি আপাতত গোপন রাখতে চায়।
দেবুও এনিয়ে আর জোরাজুরি করে না। শুধু বলে, বইটা ফেরত দেওয়ার ঘণ্টাখানেক বাদে আবিষ্কার হয় যে বই উধাও। তাই তো?
তাহলে ওই সময়ের মধ্যে যারা যারা বই নিয়েছেন তাদের কাছে একবার খোঁজ করে দেখা যাক, যদি কেউ ভুল করে বইটা নিয়ে গিয়ে থাকে।
শিব বলল,—ভুল করলে নিশ্চয়ই দু একদিনের মধ্যে ভুলটা ধরা পড়বে এবং বইখানা ফেরত দিয়ে যাবে।
অত চাড়াতাড়ি ভুল দরা নাও পড়তে পারে।– দেবুর সংশয় অনেকে লাইব্রেরি থেকে বই এনে অনেকদিন স্রেফ ফেলে রাখে, না উল্টিয়েই।
বেশ তাদের কাছেও খোঁজ করব।—শিবের সায়।
এরপর কয়েকদিন দুই বন্ধুতে আর এ বিষয়ে কথা হয়নি। শিবের সদাই কেমন ব্যস্তসমস্ত ভাব। দেবু অপেক্ষায় থাকে ও নিজেই বলবে তদন্তের ফলাফল।
পাঁচদিন বাদে স্কুল ছুটির পর শিব দেবুর সঙ্গ ধরল। খানিক নীরবে পাশে পাশে হাঁটে দুজনে।
খোঁজ পেলি বইটার?-দেবু নিজেই জানতে চায়।
—নাঃ। বই চেয়ে যারা নাম লিখিয়ে রেখেছিল তাদের এগারোজনকে বাজিয়ে দেখলাম। কিন্তু তেমন কোনো ক্লু পেলাম না। অবশ্য একটা কেস বাদে।
—কীভাবে বাজালি? সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলি নাকি?
—মোটেই না। আমি কি তেমন বুদ্ধু! সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলে কি চোর স্বীকার করবে? আমি অন্য কথা বলতে বলতে হঠাৎ ওই গল্পের বইয়ের প্রসঙ্গে যাই। বইয়ের গল্পটা ওরা জানে কিনা পরখ করি। যে বইটা পড়েনি তার পক্ষে গল্পটা না জানাই স্বাভাবিক। তাই না?
—হুঁ।
—কারও সঙ্গে খেজুরে আলাপ করতে করতে এই ধর হঠাৎ বলি, আচ্ছা ডক্টর মুস্তাফির কোন্ চোখটা কাচের ছিল?
—ড: মুস্তাফি কে?
রতনগড় অর্থাৎ হত্যাপুরীর মালিক। এক উন্মাদ নিষ্ঠুর কিন্তু অতি প্রতিভাবান বৈজ্ঞানিক যে মানুষ জাতটাকে নতুন করে গড়ার স্বপ্ন দেখে এবং রতনগড়ে নিয়ে গিয়ে তার অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্টের খাতিরে একটার পর একটা মানুষের প্রাণ বলি দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।
—কাউকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছি, ডঃ মুস্তাফির সেই ভয়ংকর শিকারি কুকুরটার নাম কী ছিল যেন?
এমনই সব ছোটখাটো কিন্তু অব্যর্থ ফাঁদ পাতা প্রশ্ন। যা কিনা গল্পটা ভালো মতো না জানলে উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
বাঃ, বেশ কৌশল করেছিলি তো।—দেবু সপ্রশংস : কী রেজাল্ট পেলি?
—দশজন আমার প্রশ্নের জবাবই দিতে পারেনি। থতমত খেয়েছে। তাদের ভেতরে সাতজন বলেছে যে গল্পটার কিছুই জানে না, তবে শুনেছে বইটা দুর্দান্ত। আর তিনজন বলেছে, গল্পটা মোটামুটি শুনেছে অন্যের মুখ থেকে। এখন নিজে পড়তে চায়। কিন্তু লম্বু খোকন ঠিক উত্তরটা দিয়ে দিল।
কী করে জানলি তুই? এই বলে চেপে ধরতে বলে কিনা, বইটা ও একবার পড়ে ফেলেছে ছোটনের বাড়িতে বসে, খুব তাড়াহুড়ো করে কিন্তু নিজের বাড়িতে আনতে পারেনি—দেয়নি ছোটন। তাই ডিমান্ড দিয়ে রেখেছে। বলল, শুনেছে যে বইটা নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ও খুব আপশোস দেখাল। আমার ধারণা ওটা ওর ভান। ওই অপরাধী। চুরি করে নিয়ে পড়েছে বইখানা। আমার প্রশ্নে জবাবটা বেফাঁস বেরিয়ে যেতে সন্দেহ ঢাকতে ওইসব বানিয়ে বলল। আবার বলে কিনা লাইব্রেরিয়ানকে বলিনি যে আমি বইটা পড়ে ফেলেছি। তাহলে বই পেলে আমায় এখন দিতে চাইবে না। যারা পড়েনি মোটে তাদের আগে দেবে।
দেবু ভেবে বলল,—একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না ওর কথা তুইও তো একবার পড়েছিস। সাধ মেটেনি। তাই ফের পড়তে চাইছিস।
শিব দৃঢ়কণ্ঠে বলল,—উঁহু, খোকনটা মিটমিটে শয়তান। ও একবার তপনের স্ট্যাম্পের অ্যালবাম দেখতে দেখতে দুটো স্ট্যাম্প সরিয়েছিল। পরে ধরা পড়ে যায়। চুরি বিদ্যেয় বেটা দিব্যি পোক্ত। আমি ওকে নজরে রাখছি। আর সুযোগ পেলেই ওর ঘরে গিয়ে ওর বই-খাতা সার্চ করে দেখব লুকিয়ে। জানিস, সেদিন বই হারানোর সময় ও লাইব্রেরিতে ছিল।
তাই নাকি?—দেবুও সিন্দিগ্ধ। তারপর বলে,– আচ্ছা, যারা ওই সময় বই ইস্যু করেছিল তাদের কাছে খোঁজ নিয়েছিলি? মানে যদি কেউ ভুল করে নিয়ে থাকে?
—হ্যাঁ করেছি। মোট বারো জনের কাছে। লাভ হয়নি। পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে তো আচ্ছা ধ্যাতানি খেলাম।
—কেন?
—পণ্ডিতমশাইকে জিজ্ঞেস করতেই রেগে উঠে বললেন, ভুল করে বেশি বই আনিনি। বরং ভুল করে একটা ইস্যু করা বই ফেলে এসেছিলুম। পরে গিয়ে নিয়ে আসি। তোমায় কে পাঠিয়েছে? লাইব্রেরিয়ান? এমন ভুল করলে কি ফাইন দিতে হয়? নতুন নিয়ম হয়েছে বুঝি?
—উনি বই ফেলে এসেছিলেন ভুলে?
—হ্যাঁ। লাইব্রেরিয়ান ভবেশদা বললেন, পণ্ডিতমশাই প্রায়ই বই ইস্যু করে, তারপর পত্রিকাটত্রিকা পড়ে, বই ভুলে লাইব্রেরিয়ানের টেবিলে ফেলে রেখেই চলে যান। কখনো একটা, কখনো দুটো বই-ই ফেলে রেখে গেছেন। পরে খেয়াল হলে এসে নিয়ে যান। এই নিয়ে ভবেশদা একবার অনুযোগও করেছেন, বই হারিয়ে যাবার ভয়ে। তাই পণ্ডিতমশাই শুনেই চটে গিছলেন। আমার ওপর ঝাল ঝাড়লেন।
যাকগে, লম্বু খোকনকে আমি ওয়াচ্ করব। আর ভাবছি, যারা আগে বইখানা পড়েছে ইস্যু করে তাদের মধ্যে যাদের চুরিটুরির রেকর্ড আছে, তাদের ওপরই নজর রাখতে হবে। মোটকথা হত্যাপুরীর হাতছানি অন্তর্ধান রহস্য আমি উদ্ঘাটন করবই।
দৃঢ়স্বরে নিজের সঙ্কল্প জাহির করে বিদায় নেয় শিব।
শীতের সন্ধ্যায় ছটার মধ্যে গ্রাম একটু নিঝুম হয়ে আসে। দেবু পড়ছিল তাদের বৈঠকখানায় বসে। শিবের ডাক শুনে বেরিয়ে এল। আজ স্কুলে শিবের সঙ্গে বিশেষ কথা হয়নি। এমন সময় হঠাৎ!
দুজনে বৈঠকখানায় ঢোকে। ফাঁকা ঘরে একখানা চেয়ারে ধপ করে বসে, শিব বলে ওঠে,—হত্যাপুরীর হাতছানি পাওয়া গেছে। কিন্তু এমন দারুণ খবরটা ঘোষণা করার সময় তার চোখে মুখে কোনও উচ্ছ্বাস উত্তেজনা ফোটে না।
কী করে? কে নিয়েছিল?—দেবু উত্তেজিত।
পণ্ডিতমশাই।—শিবের নিস্পৃহ জবাব : ভুল করে নিয়ে গেছলেন বইটা। আজ বিকেলে ফেরত দিয়ে গেলেন লাইব্রেরিতে।
—ভুল করে! কিন্তু তোকে যে বলেছিলেন?
—হ্যাঁ, সে বইটা ভুলে ফেলে গিছলেন ঠিকই। আর গতকাল রাতে নিজের বইপত্তর ঘাঁটতে ঘাঁটতে আবিষ্কার করেন হত্যাপুরী। কী করে যে বইটা ওখানে এল উনি বুঝেই উঠতে পারছেন না। তবে মনে করছেন যে ওঁনারই ভুল। কারণ যে বইটা ফেলে গিছলেন তার আর হত্যাপুরীর সাইজ ও বাঁধাইয়ে ভীষণ মিল।
—হত্যাপুরী বাঁধানো বই?
—হুঁ। মাসখানেকের ভেতর অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ওর মলাট ছিঁড়ে যায়। তখন বাঁধানো হয়।
—কীভাবে ভুলটা হল?
—পণ্ডিতমশাই বলছেন যে লাইব্রেরির বইয়ের সঙ্গে আরও কিছু বইখাতা ঘরে পড়ার টেবিলে নামিয়ে রেখেই উনি একবার মুদির দোকানে যান দেশলাই কিনতে। ফিরে এসে লাইব্রেরির বই দুটো আলাদা করতে গিয়ে দেখেন দুটোর মধ্যে একটা বই রয়েছে। অন্য বইটার জন্যে তেমন খোঁজাখুজি না করেই সোজা ছুটে যান লাইব্রেরিতে। পেয়ে যান দ্বিতীয় বইটা। ফলে ভাবেন, দুটোর বদলে একখানা বই-ই এনেছিলেন। এখন অবশ্য তাঁর মনে হচ্ছে যে প্রথমবার সংস্কৃত কাব্যটির বদলে হত্যাপুরীই এনেছিলেন এবং তাড়াহুড়োয় রাখার সময় হত্যাপুরী ওপর থেকে গড়িয়ে গিয়ে অন্য বইয়ের ভেতর মিশে যায়।
পণ্ডিতমশাই কৌতূহলী হয়ে কাল রাতে হত্যাপুরীর হাতছানি পড়েও ফেলেছেন। আজ ফেরত দেওয়ার সময়-—এমন বিদঘুটে যাচ্ছেতাই, বাল্যশিক্ষার অনুপযুক্ত বই লাইব্রেরিতে রাখা উচিত নয়—ইত্যাদি কিছু উপদেশ ঝেড়ে গেলেন মিষ্টি মিষ্টি করে। তবে বইখানা ভুল করে নিয়ে গিছলেন বলে লজ্জাপ্রকাশও করেছেন। তখন আমি লাইব্রেরিতে ছিলুম, তাই শুনলুম সব।
দেবু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,—পণ্ডিতমশাই প্রথমবার ভুলে হত্যাপুরী নিয়ে গিছলেন হতে পারে। তাড়াতাড়ি রেখে বেরুনোর ঝোঁকে বইটা পাশে সরে গিছল, তাও সম্ভব। কিন্তু সাত দিনের মধ্যে বইখানা পণ্ডিতমশাইয়ের নজরে এল না, যখন ওটা টেবিলেই ছিল, এটা কেমন জানি অদ্ভুত ঠেকছে। উঁহু, মনে হচ্ছে ব্যাপারটা অন্য।
আচ্ছা, পণ্ডিতমশাইয়ের ছেলে সন্তু কি হত্যাকারীর জন্য ডিমান্ড দিয়ে রেখেছিল?
হ্যাঁ। ওর নম্বর ছিল আট।—জানাল শিব
—তুই ওর কাছে বইটার কথা পেড়েছিলি?
—হ্যাঁ।
—কী বলেছিল, বইখানা ও দেখেছে কিন্তু হাতে পায়নি। গল্পটাও জানে না। তবে শুনেছে দারুণ বই।
দেবু বলল,—দেখ শিব, আমার মনে হচ্ছে সন্তুই বইটা সরিয়েছিল পণ্ডিমশাইয়ের টেবিল থেকে। পণ্ডিতমশাই বইটই রেখে দোকানে যেতেই ও নিশ্চয়ই ঘরে ঢোকে। হত্যাকারীর হাতছানি চিনতে পারে এবং না বলে সরায়। তাই পণ্ডিতমশাই দোকান থেকে ফিরে আর বইটা দেখেননি। পড়া হয়ে গেলে কদিন বাদে সন্তু ফের বইখানা বাবার টেবিলে রেখে দেয়। বইটা দেখে সন্তু লোভ সামলাতে পারেনি। আর হয়তো আঁচ করেছিল যে বাবা ভুল করে বইটা এনেছে।
শোন্ শিব, তুই সন্তুকে চেপে ধর। দেখ ও অপরাধ কবুল করে কিনা? দরকার হলে ভয় দেখাবি যে নন্দপুরের সাধুবাবা গুণে বলেছিলেন যে একটা ছেলে হত্যাপুরীর হাতছানি চুরি করেছে। আর সাধুবাবার দেওয়া চোরের বর্ণনার সঙ্গে সন্তুর চেহারা একদম মিলে যাচ্ছে।
এই অস্ত্রেও কাজ না হলে সন্তুকে ভয় দেখাবি, পণ্ডিতমশাইকে বলে দেব যে তুই ওই বইটা পড়ার জন্যে নাম লিখিয়ে রেখেছিস। ওতে ঘাবড়ে যাবে। সব্বাই জানে পণ্ডিতমশাই রহস্য গল্পের ওপর কী ভীষণ খাপ্পা! আর সন্তু তার বাবাকে যমের মতন ভয় করে।
পরদিন বিকেলে নদীর ধারে বালির চড়ায় বসেছিল দেবু। দেখল হনহন করে আসছে শিব। এমনিই সে আশা করেছিল।
শিব কাছে এসেই উৎফুল্ল স্বরে জানাল,—তুই ঠিক ধরেছিস। সন্তুই হাতিয়েছিল বইটা পণ্ডিতমশাই বই রেখে যেই দোকানে গেছেন সেই ফাঁকে। বইয়ের চেহারা দেখেই ওর সন্দেহ হয়। দু-দুবার পড়েছে। আমি যখন গিয়ে বইটার কথা তুলি তখন নার্ভাস হয়ে বইটা রেখে দেয় বাবার টেবিলে, অন্য বইয়ের ভিতর গুঁজে। সেইদিনই। তবে পণ্ডিতমশাই হত্যাপুরী আবিষ্কার করেন আরও তিনদিন বাদে।
—স্কুলে ওকে জিজ্ঞেস করলি বুঝি?
—হ্যাঁ। টিফিনে ধরেছিলাম। সাধুবাবার নাম করতেই ঘাবড়ে গিয়ে কবুল করে ফেলল। সন্তু কাল আলুর চপ খাওয়াবে বলেছে। মানে ঘুষ আর কী, মুখ বন্ধ করতে। যাতে পণ্ডিতমশাইকে বলে না দিই।
—এ্যাঁ, আলুর চপ! শুধু তোকে? আর আসিস্ট্যান্ট বুঝি বাদ?
না, না, তোকেও খাওয়াতে হবে বলে রেখেছি।—জানায় শিব।
যাক এবার তোর গোয়েন্দাগিরিতে কাজ হয়েছে।—দেবু উৎসাহ দেয়।
ধ্যুৎ! কোথায়?—শিবের আক্ষেপ : আমি ধরতে পারলেম কই? পণ্ডিতমশাই ভুল করলেন। আবার নিজেই নিজের ভুল ধরলেন। আমার ক্রেডিট কোথায়?
দেবু বলল,–তোর ক্রেডিট আছে বইকি। আরে তুই সন্তুকে ওই বইটা নিয়ে জিজ্ঞেস না করলে ও ঠিক মেরে দিত হত্যাপুরী।
তা হতে পারে।—শিব কিঞ্চিৎ প্রফুল্ল হয়।
আর কেস করে এই প্রথম তোর ফিজও মিলল।—দেবু শিবের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে। ফীজ! ফীজ আবার কোথায়?—শিব ভুরু কোঁচকায়।
—কেন, আলুর চপ। অবশ্য ওটা লাইব্রেরি কমিটিরই খাওয়ানো উচিত ছিল। যাকগে প্রথম প্রথম এ নিয়ে অত খুঁতখুঁত না করাই ভালো।
তা বটে।—শিব একগাল হাসে।
