উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

সাজ ধরার সাজা – ১

এক

বটতলা বাস স্টপেজে দাঁড়ালে চোখ পড়ে, পিচঢালা রাস্তাটা উত্তর দক্ষিণ বরাবর চলে গেছে বহুদুরে। তারপর ঢাকা পড়ে গেছে গাছপালার আড়ালে।

বটতলা-স্টপেজের ঠিক গায়েই কোনো গ্রাম নেই। কাছে দূরের তিন-চারটি গ্রামের লোক এখানে আসে বাস ধরতে। একটি অতি প্রাচীন বটগাছের পাশে বাস থামে। স্টপেজের নাম তাই বটতলা-স্টপেজ।

ডালপালা মেলা ছাতার মতো গাছ। তপ্ত রোদের দিনে লোকে তার ছায়ায় বসে অপেক্ষা করে। এ সব মফস্বল লাইনে বাসের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। মর্জিমতো আসে যায়।

বসে থাকতে থাকতে যাত্রীদের খিদে পায়, তেষ্টা পায়। তারা কেউ কোঁচড় খুলে মুড়ি বের করে কিংবা বংশীর দোকান থেকে আসে মুড়ি, তেলেভাজা, গরম চা। বটতলায় বংশীর ঝুপড়ি চায়ের দোকান। দোকানে একটি বেঞ্চি আছে কাঠের। কিন্তু খদ্দের খোলা আকাশের তলে ঘাসে বা বটের শিকড়ের আসনে বসে চা খেতে ভালোবাসে।

মাঘ মাসের সকাল। বটতলায় মুখোমুখি বসেছিল নারাণ আর মদন। দু-জনের হাতেই চায়ের গেলাস।

নারাণ কদমপুরের লোক। মদনের বাড়ি নবগ্রাম। বয়সে দু-জনেই যুবক। বাসরাস্তার পুবে কদমপুর আর পশ্চিমে নবগ্রাম।

হাতে সময় আছে। বাস আসতে অন্তত আধঘণ্টা দেরি। একই দিকে যাবে দু-জনে। অবশ্য নামবে আলাদা আলাদা জায়গায়। প্রথমে খোসগল্পই হচ্ছিল। হঠাৎ কথাবার্তা বাঁকা পথে মোড় নিল।

নারাণ একজন বহুরূপী। আর মদন করে যাত্রা থিয়েটার। লম্বা-চওড়া কথা বলার অভ্যেস মদনের।

অভিনয় নিয়ে কথা হচ্ছিল। কে কেমন ছদ্মবেশ ধরতে ওস্তাদ। সাজ-পোশাক, হাব-ভাব পালটে কে কেমন লুকোতে পারে নিজেকে।

বড়বড় গুণীদের গুণকীর্তন করতে করতে একসময় মদন নিজের গুণ-গান শুরু করল :

যাত্রাথিয়েটারের মেকআপ আর অ্যাকটিং অনেক শক্ত জিনিস রে নারাণ। এ তোর কালি লেপে, নকল হাত, জিব লাগিয়ে মা-কালী সাজা নয় বা লেজ লাগিয়ে হনুমান সাজাও নয়। এ সব অ্যাকটিং হবে এক্কেবারে স্বাভাবিক। লোকে আসল না নকল ধরতে পারবে না।

একবার বুঝলি প্লে-র আগে পার্টটা পরখ করতে নিজে নিজে মেকআপ নিয়ে বাড়ির সামনে হাজির হলাম। সন্ন্যেসীর পার্ট। হেঁকে বললাম—জয় হোক। বউদি বেরিয়ে এল। চিনতে তো পারলই না উলটে গড় হয়ে এক প্রণাম। তখন লাফ দিয়ে পিছিয়ে গিয়ে আসল গলায় কথা বলতেই একেবারে হই হই কাণ্ড!

আর একবার বুঝলি, এমন ফিমেল সেজেছিলেম যাত্রায় যে নিজের বউ-ই চিনতে পারেনি। ঘরে এসে বলল, হ্যাঁ গা, তোমায় তো দেখলেম না পালায়। তবে যে শুনতাম রিহারসেল দিচ্ছ। বোঝ ব্যাপারখানা। কী পার্ট করেছিলাম বললেও কিছুতে বিশ্বাস করতেই চায় না।

মদনের জাঁক হজম হল না নারাণের। বহুরূপী সাজে বলে যাত্রা-থিয়েটারের লোকে তাকে একটু হীন চোখে দেখে, তা সে জানে। ম্যারাপ খাটিয়ে অভিনয় করে কিনা তাই ওদের গুমোর।

সে বলে বসল,–আমিও পারি।

—কী পারিস?

—এমন সাজব আর অ্যাকটিং করব যে লোকে চিনতেই পারবে না। একবার এমন দারোগা সেজেছিলাম যে একটা দাগা চোর আমার দেখে ছুটে পালিয়েছিল।

হুঁ!—নাক দিয়ে একটা অবজ্ঞাসূচক আওয়াজ ছাড়ল মদন : বেটা চোরের কি মুখ দেখার সাহস ছিল? পুলিশের ড্রেস দেখেই চম্পট দিয়েছে। আমি দেখলে একনজরেই চিনে ফেলতাম

তোকে।

এমন তাচ্ছিল্যে চটে যায় নারাণ। বলে,—আমিও ফেলতাম।

—বটে! চিনে ফেলতিস?

—হুঁ-উ।

গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল মদন,—তোর ক্ষমতায় কুলবে না রে নারাণ। বাড়ির লোকেই পারেনি।

হুঁ, পারবই।—দৃঢ় গলায় জানাল নারাণ।

বেশ। বাজি।—চোখ কুঁচকে কড়া দৃষ্টিতে তাকাল মদন।

অ্যা!—থতমত খেল নারাণ।

হ্যাঁ। সাহস থাকে ফেল বেট।

—কী বেট?

—একদিন আমি ছদ্মবেশ ধরব, তোকে চিনতে হবে। আর একদিন তুই মেকআপ নিবি আমি ধরব। দশ টাকা বাজি। যে হারবে দিতে হবে। আর দু-জনাই পারলে কাটাকাটি।

রোগো চেপে গেল নারাণের,—বেশ রাজি। কোথায় সাজব?

কপালে ভাঁজ ফেলে চায়ে চুমুক দিতে দিতে মিনিট খানেক ভাবল মদন। তারপর বলল,—হুঁ, হয়েছে! মেলায়।

—মেলা!

—ফকির-ডাঙার মেলা শুরু হচ্ছে আজ থেকে। সেখানেই পরীক্ষা হবে।

—মেলা সে তো খুব ভিড়!

মদনের ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফোটে। বলে,—ভিড়ের মাঝে থেকেই তো চিনে নিতে হবে। নইলে কি তোর বাড়ি বয়ে গিয়ে ডেকে বলব—মশাই চিনতে পারেন? আর গাঁয়ের ভিতর একজন অচেনা লোককে দেখে বলে দিবি—ওঃ বুঝেচি। তুই মদন। না চিনলেও স্রেফ আন্দাজেই মেরে দিবি। আমি কিন্তু তোকে এক নজর দেখেই বুঝে ফেলব। তা সে যে মেকআপই নিস না, আর যত ভিড়ের মাঝেই হোক না কেন। তা যাকগে, তোর যদি ভরসা না থাকে দরকার নেই হ্যাঙ্গামায়।

আঁতে ঘা লাগল নারাণের। বলল, কে বলেছে আমি পিছোচ্ছি? বেশ রইল বাজি। কবে হবে?

—আগামী পরশু আমার দিন। আমি মেকআপ নিয়ে যাব মেলায়। তুই আমায় ধরবি। পর দিন তুই মেকআপ নিয়ে আসবি আমি ধরব। ঠিক আছে?

বেশ। কিন্তু দূরে দূরে থাকিস যদি? কাছে না এলে দেখব কী করে? মুখখানা তো দেখতে হবে তোর।

—নারাণের ভয়, চতুর মদনটা ধোঁকা দিয়ে না বাজি জেতে।

—না। দূরে দূরে থাকব কেন? একবার এসে তোর সঙ্গে কথাও বলে যাব। অন্তত দুটো কথা। ওরই ভিতর বুঝে ফেলতে হবে। শুধু বুঝলেই চলবে না, তখুনি ডেকে জানাতে হবে তুই বুঝেছিস। তোর বেলাতেও ওই শর্ত।

ঠিকঠাক মানবি তো নিয়ম। শেষে যদি ধাপ্পা দিয়ে বাজি হারাস?—সন্দেহ যায় না—নারাণের।

দেখ নারাণ!—ধমকে থামাল মদন : মদন ঘোষ কথার খেলাপ করে না। এই মায়ের নামে দিব্যি গালছি। হল তো?

হ্যাঁ হ্যাঁ, হয়েছে হয়েছে।—লজ্জা পেল নারাণ।

শর্তটা নিয়ে আরও দু-চার কথা হল।

মদন বলল,—হুঁ, সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটে অবধি। এর মধ্যে যা খোঁজাখুঁজি। ব্যস্।

দুরে বাস আসছে দেখা গেল। উঠে দাঁড়াল দুজনে। মদন মিচকে হেসে বলল,—কি থাকবে বাজি? ভেবে দেখ। আমি কিন্তু জোর কচ্ছি না।

হ্যাঁ বাজি রইল।—তেজের সঙ্গে বলল নারাণ?

বাস এসে থামল! বাসের দিকে এগোতে এগোতে নিচুস্বরে বলল মদন,—থাকগে, দিলি গচ্চা দশটা টাকা।

রাগে চিড়বিড় করে নারাণ। বাসে উঠে সে আর একটিও কথা বলল না মদনের সঙ্গে। শুধু তার গন্তব্যে পৌঁছে নামতে নামতে বলল মদনকে,– পরশু দিন দেখা হচ্ছে মেলায়, মনে রাখিস।