উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

ফ্যাসাদ – ৩

তিন

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ার কথা। শিব ভোরে উঠে চটপট তৈরি হয়ে নিজের বাড়ির লোকের কাছে বিদায় নিয়ে দেবুর বাড়িতে পৌঁছে থ। গ্রামের গাদা ছেলে জড়ো হয়েছে দেবুদের বাড়ির আশেপাশে। একটুবাদে দেবু বেরিয়ে এল তৈরি হয়ে। চারধারের ব্যাপার দেখে মন্তব্য করল, বেচুদার কাণ্ড।

লাভপুরে যাওয়ার রাস্তার দুধারে ছেলেদের সার করে দাঁড় করিয়ে দিল বেচুদা। তাদের মধ্য দিয়ে মানিকজোড় হাঁটতে শুরু করতেই—অ্যাটেসন।

বেচুদার গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে স্যালুট জানাল ময়ূরাক্ষী স্পোর্টিং। অমনি ঘোর রবে বাজতে শুরু করল একটি ঢাক এবং একখানা কাঁসি। বীরু ঢাকির ছেলে ছিরু বাজাচ্ছে ঢাক। আর তার বন্ধু কানুর হাতে কাঁসি।

এই ছিরু বাজনা থামা। ধমক লাগায় দেবু।

ছিরু একগাল হেসে বলল,—আহা তোমরা এমন কীর্তি করতে চলেছ আর বিদায়বেলায় একটু বাজনা বাদ্যি হবে না?

কী কীর্তি শুনি। বলল দেবু।

জানি গো, তোমরা পায়ে হেঁটে বিলাত যাচ্ছ, ধন্যি সাহস বটে!

বেচুদা প্লিজ ওদের থামতে বলুন,—অনুনয় জানায় দেবু।

বেচুদা উদার হাসলেন,—হোক্‌ না একটু পাবলিসিটি। আশপাশের গাঁয়ের লোক জানুক।

ক্ষিপ্ত শিব তেড়ে গেল,—ছিরু তোর ঢাক ফাঁসিয়ে দেব।

ছিরু ঢাক আঁকড়ে হাউমাউ করে খানিক তফাতে গিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে লাফিয়ে লাফিয়ে বাজাতে লাগল। সঙ্গে চলে কানুর সঙ্গত।—ট্যাং ট্যাং ট্যাং।

শিব দেবু আর কথা না বাড়িয়ে হনহনিয়ে এগোয়।

বেশ কিছুটা জোর কদমে গিয়ে শিব পিছন ফিরে চমকে বলল, –এইরে! ভোলা সঙ্গে আসচে।

ভোলা শিবদের বাড়ির কুকুর। ইয়া তাগড়া মেটে রঙের মদ্দা কুকুর। শিবের বেজায় ন্যাওটা। কোন ফাঁকে সঙ্গ ধরেছে।

দুজনে দাঁড়ায়। শিব ধমকাতে লাগল,

এই ভোলা, পালা বলছি।

ভোলা যায় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। শিব ভোলাকে তাড়াতে ঢিল ছোড়ে। ভোলা কিছু দূরে সরে গিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকোয়। শিবরা ফের হাঁটা দিল। যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল যে ভোলা ঠিক সঙ্গে আসছে।

আচ্ছা জ্বালা! কদ্দূর যাবে আমাদের সাথে? বিব্রত শিব মাঝে মাঝেই থেমে ভোলাকে তাড়া দেয়। ভোলা নাছোড়বান্দা। লুকিয়ে পড়ে। ফের পিছু ধরে। যেন খেলা পেয়েছে।

ভাবিত দেবু বলে,—কীরে শিব, আর এগুবি না এখন ফিরে যাবি গ্রামে? সঙ্গে কুকুর থাকলে কোথাও আশ্রয় জোটানো মুশকিল।

না না ফেরাফিরি নেই।—আপত্তি জানায় শিব : অচেনা জায়গায় পৌঁছলে ও ঠিক ফিরবে। এ পথ ওর চেনা কিনা তাই চলেছে সঙ্গে।

একা বাড়ি ফিরতে বাধ্য হলে তোর শোকে যদি খাওয়া বন্ধ করে, সুইসাইড করে?—দেবুর দুর্ভাবনা যায় না। না তেমন কিছু করবে না। তবে মন খারাপ করে থাকবে যদ্দিন না আমি ফিরি।—ভোলার ব্যাপারে শিব যেন কিঞ্চিৎ বিচলিত, তবে সে মন শক্ত করে। শুধু ভোলা কেন, বাড়িতে মা ঠাকমা বাবা কাকা ভাইবোনরাও কি আর কম দুশ্চিন্তায় থাকবে তার জন্যে। উপায় কী?

চলতে চলতে দেবু জিজ্ঞেস করে,—লিস্ট মতো সব নিয়েছিস?

হ্যাঁ। এক্সট্রাও কিছু জুটেছে।—জানায় শিব।

কী রকম?

মা দিয়েছে একডজন পোস্টকার্ড। ঠাম্মা দিয়েছে, এক শিশি আচার আর গন্ডা দশেক নারকেল নাড়ু। বাবা একটা গীতা দিয়েছিলেন, ইচ্ছে করেই ফেলে এসেছি। আর কাকাটা ফের একটা ছিপ গছাবার তালে ছিল নিইনি।

নারকেল নাড়ু! বাঃ দে বের কর।—দেবু হাত বাড়ায়। কিছুক্ষণের ভিতর দুজনে অর্ধেকের বেশি নাড়ু সাফ করে দেয়।

খানিক চলার পর একটা গ্রাম পড়ল। গ্রামের বুক চিরে পথ ধরে এগোয় দুজনে। হঠাৎ পিছনে অনেক কুকুরের গর্জনে ফিরে দেখে চারপাঁচটা কুকুর পথ আগলে চেঁচাচ্ছে। ভোলা এগুতে পারছে না, তবে পিছু হটারও লক্ষণ নেই। তার গায়ের লোম খাড়া। ভয়ঙ্কর গর্জাচ্ছে।

এই, তোর ভোলা মরেছে।—দেবু ঢিল খোঁজে।

শিব বাধা দিল,—এই সুযোগ। চ এগিয়ে। ওই নেড়িগুলোর সাধ্যি কি ভোলার গায়ে হাত দেয়। এই ঝগড়ার ফাঁকে আমরা পালাই। নইলে ওর সঙ্গ ছাড়ানো মুশকিল হবে।

অনেকটা দূরে গিয়ে শিবরা দেখল ভিন গাঁয়ের আরও কুকুর ছুটে আসছে ভোলাকে লক্ষ্য করে। সেই শত্রুব্যূহ ভেদ করে আর এগুবার সাধ্য নেই ভোলার। শিবদের অনুসরণ করার চেয়ে ভোলা এখন নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত। দাঁত খিঁচিয়ে শত্রুদের ভয় দেখিয়ে তফাতে রাখছে এবং ক্রমেই পেছোচ্ছে। পথের বাঁক ঘুরতে ভোলা চোখের আড়াল হয়।

শিবের কল্পনায় ভাসে হয়তো ভোলা ওই শত্রু এলাকার বাইরে দাঁড়িয়ে করুণ চোখে অপেক্ষায় থাকবে কখন শিব ফেরে। শেষে হতাশ হয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে যাবে। মনটা শিবের বিষণ্ণ হয়ে যায়। ভোলাকে সঙ্গে নিলে বেশ হত। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বইয়ে তো পড়েছে, বিমলকুমার তাদের প্রিয় কুকুর বাঘাকে সঙ্গে নিয়ে কত দেশ বিদেশে অ্যাডভেঞ্চার করে বেরিয়েছে।

লাভপুরে চা-টা খেয়ে দুজনে ফের চলল পিচ রাস্তা ধরে। রোদের তেজ খুব। ঘামছে তারা। পথের ধারে একটা পুকুরে চান করে নিল। দেবু বলল—বেড়াবার সিজনটা ঠিক হয়নি। শীতকালই আইডিয়াল।

দুপুরে সেদিন ভাত জুটল না। পথের ধারে এক গ্রাম্য চায়ের দোকানে পাঁউরুটি ও ভীষণ ঝাল আলুরদম খেয়ে খিদে মেটানো হল। গাছের ছায়ায় খানিক জিরিয়ে নিয়ে ফের হন্টন। রোদের ঝাঁজে চলার গতি শ্লথ হয়। বিকেল হতে না হতেই দুজনে বেদম হয়ে পড়ে। ঠিক হয় সামনের গ্রামেই থামবে, রাতে আশ্রয় নেবে।

গ্রামে একটু ঢুকে দেবুরা দেখল এক কুটিরসংলগ্ন উঁচু দাওয়ায় একটি বৃদ্ধ পা ঝুলিয়ে বসে বিড়ি খাচ্ছেন। বৃদ্ধের মুখখানা শুকনো হর্তুকির মতন। চাউনিতে রাগী রাগী ভাব।

শিব দেবু বৃদ্ধের সামনে গিয়ে নমস্কার করে বলল,—আজ্ঞে আমরা দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছি, এখানে কি–  

দেশ ভ্রমণ? কোত্থেকে আসা হচ্ছে?—শিবের কথা থামিয়ে দিয়ে খটখটে গলায় প্রশ্ন করেন বৃদ্ধ।

আজ্ঞে চন্দনা গ্রাম। লাভপুরের কাছে। বলল শিব।

ও তাহলে টাইম আছে। লাস্ট বাস যাবে সন্ধে সাড়ে ছটায়।

আজ্ঞে, আমরা পায়ে হেঁটে বেরিয়েছি। বাসে চড়ি না।

বৃদ্ধ আকাশের পানে তাকিয়ে নিয়ে বললেন,—হেঁটে কি ফিরতে পারবে? রাত হয়ে যাবে না?

আজ্ঞে আমরা আজ ফিরব না গ্রামে। মানে এখন ফিরব না কিছুদিন। হেঁটে হেঁটে নানান দেশ দেখার ইচ্ছে। তাই ভাবছিলাম, আজ রাতে এই গ্রামে যদি আশ্রয় মেলে? এখানে কি কোনো ক্লাব আছে?

বৃদ্ধের কপালে কটা বাড়তি ভাঁজ পড়ে। দৃষ্টি খর হয়। শিবদের আপাদমস্তক বারকয়েক চোখ বুলিয়ে নিয়ে অর্থপূর্ণভাবে উচ্চারণ করলেন, বটে।

ফের কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর প্রশ্ন করলেন,—কী করা হয় শুনি?

আমরা এ বছর উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছি।—জানায় দেবু।

হুঁ। তা’লে ফেল মারার আশঙ্কাতেই আগেভাগে সটকেছ বাড়ি থেকে।–ঠোঁটে ব্যাঁকা হাসি নিয়ে বৃদ্ধের মন্তব্য।

নিজের পাস ফেল সম্বন্ধে সংশয় থাকলেও দেবুকে ওই পর্যায়ে ফেলছে দেখে, শিব দেবুকে দেখিয়ে বলল, জানেন ও ক্লাসের ফার্স্ট বয়।

বটে! মার্কশিট আছে?—বৃদ্ধের কণ্ঠে চ্যালেঞ্জ।

দেবু দেখল ব্যাপার ঘোরালো হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আরও লোক এসে জুটেছে। শুনছে কথাবার্তা। সে নরম সুরে বুঝিয়ে বলল,—আজ্ঞে আপনি ভুল করছেন। আমরা পালাচ্ছি না। বলেকয়েই বেরিয়েছি। এই দেখুন সার্টিফিকেট। আমাদের গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের। আমাদের হেডমাস্টারের। এতে আমাদের পরিচয় আর ভ্রমণের কথা লেখা আছে। তাছাড়া ফোটোসহ আইডেন্টিটি কার্ড রয়েছে আমাদের। লাভপুর থানার দারোগার সই আর সিল দেওয়া।

দেবু ব্যাগ থেকে সবকটি পরিচয়পত্র বের করে বৃদ্ধের হাতে দেয়। চারপাশের অন্যরাও খুঁটিয়ে দেখে সেগুলি।

গ্রামের একজন মন্তব্য করে,—ব্রজখুড়ো, এদের কেসটা সত্যিই মনে হচ্ছে।

হুঁ তাই ঠেকছে বটে।—ব্রজখুড়ো ওরফে সেই রাগী বৃদ্ধ বিড়বিড় করেন : তবে শুধু মুখের কথায় আমরা বিশ্বাস করি নে। আমার নাতি বদনও মাধ্যমিক ফেল করে বাড়ি থেকে লম্বা দিয়েছিল, মনে আছে। তিন মাস পরে তার খোঁজ পেলাম। সে বেটাও বলে বেড়াত দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছি।

তোমাদের এখানে আগমনের উদ্দেশ্য?—মাতব্বর গোছের একজন জিজ্ঞেস করেন দেবুকে।

আজ্ঞে রাতের মতন একটু আশ্রয়।—জবাব দেয় দেবু। যে কোনো একটা ঘর পেলেই হবে।

আর খাওয়া দাওয়া?—জানতে চাইলেন প্রৌঢ়।

সঙ্গে চিঁড়ে আছে। – জানাল দেবু।

পাকামি হচ্ছে।—প্রৌঢ় চটে ওঠেন : এই গুটে এদের দুজনকে রাতে আমার বাড়িতে নিয়ে যাবি। যাহোক মুঠো ডালভাতের ব্যবস্থা করা যাবে। আর আমার বাড়িতে থাকবে।

ব্রজখুড়ো গজগজ করেন,—এদের গার্জেনদের বলিহারি। এই কচি ছেলে দুটোকে একা একা ছাড়ল কি আক্কেলে? হ্যাঁেের, কানু রায়ের ছোট মেয়ের বিয়ে দিয়েছে ময়ূরাক্ষীর তীরে চন্দনা গাঁয়ে সরকার বাড়িতে।

কী নাম?

রানু।

জিজ্ঞেস করে দেবু

ওঃ, রানুদিকে খুব চিনি।—বলল শিব।

ব্রজখুড়ো বললেন,—কানু রায়কে বলিস এই গোঁয়ার গোবিন্দ দুটোকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়িতে ফেরত পাঠা, নইলে কোথায় বেঘোরে মরবে। আমার বদনকে যখন পাওয়া গেল, পেটের অসুখে ভুগে ভুগে এক্কেবারে কাঠি।

ব্রজখুড়োর নির্দেশে সে রাতে কানু রায় এসেছিল দেবুদের বোঝাতে। নবীন পর্যটকরা কান দেয়নি।

পরদিন ভোরে শিব দেবু সেই গ্রাম ছাড়ল। খানিক গিয়ে দেবু বলল,—এই যাঃ, আমার সার্টিফিকেট দুটো, হেডমাস্টার আর প্রধানের, ব্রজখুড়ো নিয়েছিলেন, ফেরত দেননি।

শিব বলল,—বাদ দে, আর ফেরত আনতে হবে না। ফের ব্রজখুড়োর পাল্লায় পড়লে আমাদের যাত্রাই ভন্ডুল হয়ে যাবে। আমার কপি দুটো তো আছে। একই তো সার্টিফিকেট। ওতে দুজনেরই নাম রয়েছে। ওতেই কাজ হয়ে যাবে।

দেবু বলল,—আর একটা ভুল হয়ে গেছে। ওই গ্রামের গণ্যমান্য কাউকে দিয়ে আমার নোট বইয়ে লিখিয়ে নিতে হত। আমরা এই গ্রামে এসেছি তার প্রমাণ। এরপর থেকে খেয়াল রাখবি এটা।