তিন
বিখ্যাত রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক শশধর ধর খাটে শুয়ে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে প্লট ভাবছিলেন। কাজের লোক মাধাই এসে বলল, বাবু দু’জন ছোকরাবাবু এয়েছেন আপনার কাছে।
বিরক্ত ভাবে উঠলেন শশধর বাবু। শশধরবাবু ছোটখাটো মানুষ। রোগা। বাটারফ্লাই গোঁফ। ময়লা রং। বয়স বছর চল্লিশ। ছটফটে। এমন নিরীহ চেহারার মানুষের কলম দিয়ে এমন দুর্ধর্ষ অ্যাডভেঞ্চার বেরোয় দেখলে বিশ্বাস হয় না।
বৈঠকখানায় বসেছিল দেবু আর শিব। শশধর ঘরে ঢুকতেই হুমড়ি খেয়ে পায়ে পড়ে প্রণাম করল।
শশধরবাবু বললেন, থাক থাক। কে তোমরা? কী দরকার?
দু’খানা অটোগ্রাফের খাতা এগিয়ে দিয়ে দেবু বলল,—আজ্ঞে অটোগ্রাফ। আমরা আপনার ভীষণ ভক্ত। আপনার সব বই পড়েছি। খুব ইচ্ছে ছিল, কলকাতায় এলে আপনাকে দর্শন করব। আপনার অটোগ্রাফ নেব।
এমন দুই ভক্তের সাক্ষাৎ পেয়ে শশধরের মনে বিরক্তি কেটে যায়। হেসে বলেন, তোমরা কোত্থেকে এসেছ?
আজ্ঞে বীরভূম। লাভপুরের কাছে ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে, আমাদের গ্রামের নাম চন্দনা। আসল নাম ফুলডাঙা-চন্দনা। আগে বলত ফুলডাঙা। এখন বদলে হয়ে গেছে চন্দনা।
বাঃ বেশ নাম। তোমরা কী কর? অটোগ্রাফ দিয়ে খাতা দুটো ফিরিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করেন শশধর।
আজ্ঞে কলেজে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার।
দেবু উচ্ছ্বসিত ভাবে বলে উঠল,—জানেন আমাদের গ্রামের কাছে একটা নীলকুঠি আছে। প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। বিরাট এলাকা জুড়ে ঠাসা জঙ্গল। তার মাঝে প্রকাণ্ড ভাঙাচোরা কুঠিবাড়ি। সাহেবদের তৈরি। এখন থাকে না কেউ। একটা মস্ত দিঘি আছে জঙ্গলে। কতকালের পুরনো সব গাছ। উঃ, দিনের বেলাতেই কুঠিবাড়ির জঙ্গলে ঢুকতে গা ছমছম করে। আমার খুব ইচ্ছে হয়, আপনাকে নিয়ে গিয়ে নীলকুঠিটা একবার দেখাই। কত যে গল্প আছে কুঠিবাড়ি নিয়ে। ভীষণ সব নাকি কাণ্ড হয়েছে ওখানে।
নীলকুঠি। দেড়শো বছরের পুরনো। ভাবেন শশধরবাবু। এমন জঙ্গলঘেরা পোড়ো তিনি কখনো স্বচক্ষে দেখেননি। যদিও গল্পে কয়েকবার বর্ণনা করেছেন। রহস্যের ফাঁদ পেতেছেন অমন বাড়িতে। একবার নিজের চোখে দেখে নিলে মন্দ হয় না। পুজো সংখ্যার উপন্যাসের জন্য খাসা একটা প্লট পেতে পারেন। ছেলেটা বাড়িয়ে বলছে না তো? তাই প্রশ্ন করেন, ঠিক বলছ, অত পুরনো!
আজ্ঞে হ্যাঁ। এই একটা ফোটো এনেছি আপনাকে দেখাব বলে।
দেবু ঝোলা থেকে একটা খাম বের করে। তার ভিতর থেকে একটা বিঘৎখানেক লম্বা চওড়া ফোটো বের করে দেয় শশধরবাবুর হাতে।
সত্যিই দেবুদার গ্রামের মাইল দুই দূরে একটা পুরনো নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ আছে। এখন জঙ্গল ঘেরা বিরাট এলাকা। একেবারে নির্জন। দিনে ঢুকলেও রাতে কেউ যায় না সেখানে। দেবুর এক আত্মীয় নীলকুঠির একটা ফোটোগ্রাফ তুলেছিল। তার কপি ছিল দেবুর বাড়িতে। দেবু সেটা সঙ্গে এনেছে –
ফোটোতে প্রাচীন জীর্ণ অট্টালিকার একাংশ দেখা যাচ্ছে। পিছনে পাশে ঘন গাছপালা। সত্যি রহস্যময়। বাড়িটা স্বচক্ষে একবার দেখার লোভে শশধরবাবু উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
তাঁর গল্পের ভিলেন ভিমরুল যদি আস্তানা গাড়ে ওই বাড়িতে কোনো দুষ্কর্মের উদ্দেশ্যে, সেখানে খুঁজতে খুঁজতে হাজির হবে তাঁর গোয়েন্দা রবি রায়। তারপর একটা মরণপণ লড়াই। আদর্শ জায়গা হতে পারে। শশধরবাবু খানিক আনমনা হয়ে গেলেন। একটা দারুণ প্লট বাড়িটা ঘিরে আবছাভাবে ভেসে যায় মাথায়। হুঁ, এখন শুধু জায়গাটা দেখে নিলেই জমে যাবে লেখাটা। তাঁর চটক ভাঙে দেবুর কথায়।
ওই নীলকুঠিতে মাঝে মাঝে চোর ডাকাতেও আস্তানা গাড়ে।
তাই নাকি?—শশধর রোমাঞ্চিত।
হ্যাঁ, এই তো বছর দুই আগে এক দল ডাকাত লুকিয়েছিল ওখানে। পুলিশ টের পেয়ে, জঙ্গল ঘিরে ফেলে ওদের ধরল। গুলিও চলেছিল। জানেন, খবরটা সাপ্লাই করে আমাদের গ্রামেরই একটা ছেলে।
বটে। কী ভাবে? শশধর কৌতূহলী।
আমরা তো মাঝে মাঝে ঢুকি ওই জঙ্গলে, দিনের বেলায়। অনেক ভালো ভালো ফলের গাছ আছে জঙ্গলে, আম, জাম, সপেদা, কুল লিচু। সাহেবদের লাগানো বোধহয়। গাছে চড়ে ফল পাড়তে গিয়ে সেই ছেলেটা দেখে একটা অচেনা লোক ঢুকল কুঠিবাড়িতে। সন্দেহ হতে সে গিয়ে জানায় পুলিশকে।
জানেন একবার একটা বাঘ এসে লুকিয়েছিল কুঠিবাড়ির জঙ্গলে।
এবার শিব মুখ খোলে।
বল কী! তারপর?
শশধরবাবু চমকান
সে অনেক আগে। আমরা তখন ছোট।
দেবুর ঢঙেই বলে শিব জমিয়ে : একজন
শিকারি এসে গুলি করে মারে বাঘটাকে, জঙ্গলে ঢুকে।
সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে শশধরবাবু বললেন, ওখানে যাওয়ার রুটটা কী?
দেবু বলল, বোলপুর বা সাঁইথিয়া অবধি ট্রেনে। তারপর বাস বা গাড়িতে। আবার আহমেদপুর থেকে ছোট ট্রেনও আছে। লাভপুর অবধি তাতে যাওয়া যায়। তারপর গাড়ি।
ছোট ট্রেন?
হ্যাঁ, ছোট লাইনের ট্রেন। ছোট গাড়ি আস্তে আস্তে চলে।
ওঃ, বুঝেছি। ন্যারো গেজ।
ওই ট্রেনগুলো একটু স্পিড কমালে দিব্যি লাফিয়ে নামা যায়।
দেবু জানায়।
চকিতে শশধরবাবুর মাথায় খেলে যায় ভিমরুল ছোট ট্রেনে খুন বা ছিনতাই করে লাফিয়ে নেমে উধাও হচ্ছে। লাইনের কাছে দাঁড় করানো মোটর সাইকেলে চেপে। ওঃ গ্র্যান্ড!
শশধরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ওখানে গেলে থাকব কোথায়?
আপনি যাবেন? সত্যি? কী মজা।—দেবু গদগদ : সেসব আপনাকে ভাবতে হবে না। সব ব্যবস্থা আমরা করব। আপনাকে নিয়ে যাব। নীলকুঠি দেখাব। ফিরিয়ে দিয়ে যাব।
শশধরবাবু মনে মনে নিশ্চিন্ত হলেও ভদ্রতা
না না, তোমরা অত হ্যাঙ্গামা করবে কেন? করে মৃদু আপত্তি তোলেন।
আপনি আমাদের অতিথি হবেন, এ তো আমাদের পরম সৌভাগ্য। আশপাশের সব গাঁয়ে আপনার কত ভক্ত। একটা কাজ করি। আমাদের গাঁয়ের ক্লাবের সেক্রেটারি এখন কলকাতায় এসেছেন। ওঁকে গিয়ে ধরি। ক্লাবের তরফ থেকে আপনাকে নেমন্তন্ন করা হোক।
উঃ আপনাকে স্বচক্ষে দেখলে ওখানকার ছোটরা যা খুশি হবে! হয়তো আপনাকে সংবর্ধনা দিয়ে ফেলবে।
না না ওসব নয়। শশধর আপত্তি জানান : আমি যাব শুধু নীলকুঠি দেখতে।
দেবু বলল,—সে তো দেখবেনই গোটা দিন। তবে বিকেল তিনটে চারটের পর তো ওই জঙ্গলে থাকা যাবে না। অন্ধকার হয়ে যায়। সাপখোপ আছে। তখন আমাদের না হয় কিছু বলবেন।
বেশ বেশ সে তখন দেখা যাবে।—শশধরবাবু নিমরাজি হন।
শশধরকে আর এক দফা পেন্নাম ঠুকে দেবুরা বিদায় নেয়।
বেচুদা শুনে বললেন,—আবার সাহিত্যিক কী হবে?
দেবু বলল, দু’জন থাকলে ক্ষতি কী? উনি দারুণ পপুলার লেখক। মথুরাপুর একজন এনেছিল। আমরা দু’জন আনব। প্রেস্টিজ বাড়বে।
পরদিন দেবুকে সঙ্গে নিয়ে বেচুদা এসে শশধরকে সাড়ম্বরে আমন্ত্রণ করে গেলেন চন্দনায়। বিকেলে দেবু শিব বেড়াতে বেরল। বেচুদা গেলেন অন্য জায়গায়।
দেবুরা হাজির হল সাহিত্যিক কালীকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি।
কালীকিঙ্কর প্রৌঢ় ব্যক্তি। দশাসই চেহারা। রং কালো। মোটা গোঁফ জোড়ায় মুখে কেমন রাগী রাগী ভাব। গোল সরু ফ্রেমের চশমা ঝুলে থাকে নাকের ডগায়। লুঙ্গি ও ফতুয়া পরে তিনি একখানা বই পড়ছিলেন বৈঠকখানায়। দেবু ও শিব দরজার কাছে দাঁড়াতে মুখ তুলে গম্ভীর গলায় বললেন, কী চাই?
দেবুরা ঘরে ঢুকে তাঁকে প্রণাম করল। কালীকিঙ্করের মুখ প্রসন্ন হল না। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন।
দেবু হাত কচলাতে কচলাতে বলল,—আজ্ঞে আমরা চন্দনা গ্রাম থেকে আসছি। আপনার যেখানে যাওয়ার কথা। কলকাতায় এসেছিলাম। আপনি কেমন আছেন খবর নিতে এলুম।
চন্দনা? হুঁ। কালীকিঙ্কর ব্যাজার মুখে বললেন : ওখানে আমার থাকার ব্যবস্থা ঠিকমতো হয়েছে তো?
দেবু হাসি মুখে বলল,—সে হয়েছে। ফাসক্লাস ব্যবস্থা। আপনি যেখানে থাকবেন, মস্ত বাড়ি। অনেক ঘর। মোটে চারজন থাকে। আর চারটে কুকুর। দুটো গরু। আর দু’জন কাজের লোক। কোনো অসুবিধা হবে না।
চারটে কুকুর?—কালীকিঙ্কর খাড়া হয়ে বসেন। চশমা ঠেলে দেন নাকের ওপর। ভুরুতে আরও জট পাকায়। তিক্ত কণ্ঠে বলেন, সে বাড়িতে চারটে কুকুর আছে?
আজ্ঞে। দেবু থতমত খেয়ে জানায়।
ব্যস্ ব্যস্, ওখানে আমি থাকব না। বলে দিও–কড়া গলায় জানালেন কালীকিঙ্কর।
আজ্ঞে, ও কুকুরগুলো কামড়ায় না। শুধু কাছে কাছে ঘোরে। অচেনা লোককে একটু শুঁকে যায় বড়জোর।
না। কোনো কথা নয়। ওখানে আমি থাকব না।—দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করলেন কালীকিঙ্কর। দেবু ভুল বলেনি। তবে ‘ইতি গজ’র মতো একটু চেপে গেছে। মিত্তির বাড়িতে একজোড়া দেশি সারমেয় থাকে ঠিকই এবং তাদের দুটি ছানা। কিন্তু তারা বাড়ির ভিতর ঢোকে না। বাইরে উঠোনে থাকে। দেবু বললে,
স্যার, তবে তো আপনার থাকার মতো আর একটা মাত্র বাড়ি আছে কিন্তু তাদেরও যে একটা কুকুর আছে।
তবে সে বাড়িতেও থাকব না। কুকুর আছে এমন বাড়িতে আমার ব্যবস্থা করা চলবে না। কালীকিঙ্কর সাফ জানিয়ে দিলেন।
মুসকিল। আমাদের গাঁয়ে সব বাড়িতেই প্রায় কুকুর পোষে।
দেবু মাথা চুলকোয়।
তবে ওখানে যাচ্ছি না। প্রোগ্রাম ক্যানসেলড।—কালীকিঙ্কর তেতে ওঠেন।
দেবু সহানুভূতির সুরে বলল, বুঝেচি স্যার, আপনি কুকুর পছন্দ করেন না। আমার মামারও এমনই কেস হয়েছিল।
তিনিও কি কুকুর দেখতে পারতেন না?
কুকুর নয়। বাঁদর। মামা ভালো গান করেন। এক জায়গায় তাঁর গান গাইবার কথা। ফাংশনের দিন চারেক আগে জানতে পারলেন যে সেখানে পাল পাল বাঁদর ঘোরে। ব্যস মামা এক বুদ্ধি করে কাটিয়ে দিলেন। বাঁদরের কথা তো আর বলা যায় না।
কী বুদ্ধি?—আগ্রহে ঝুঁকে পড়েন কালীকিঙ্কর।
একখানা টেলিগ্রাম ছাড়লেন সেখানে দু’দিন আগে আঙ্কল সিরিয়াস। ক্যানসেল মাই প্রোগ্রাম। সরি।
পার্টি খোঁজ করেনি?
করেছিল। মামা তাঁর বোনের বাড়ি লিলুয়ায় গিয়ে বসে রইলেন তিন দিন। বাড়িতে বলে গিছলেন, বলবে অসুস্থ কাকাকে দেখতে বম্বে চলে গেছে।
হুম্।—বুদ্ধিটা কালীকিঙ্করের মনে ধরে।
কিন্তু আপনি না গেলে আমাদের প্রধান অতিথির কী হবে? দেবু কাতরস্বরে বলে।
সে আমি কী জানি? একে তো কোন্ ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুর। আবার কুকুরের দেশ। নেহাত গজা মানে আমার ছোটভাইয়ের জন্যে রাজি হয়েছিলুম। ফের ও রিকোয়েস্ট করতে এলে ধমকে দেব।
দেবু বলল, আপনার প্রবলেম বুঝছি স্যার। তবে কুকুরের ভয়ের কথাটা বাইরে না বেরুলেই ভালো। লোকে হাসাহাসি করবে। আপনি মানী লোক।
রাইট। ঠিক বলেছ। তোমার বুদ্ধি আছে ছোকরা। ভাগ্যিস তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নইলে ওখানে গিয়ে খুব বিপদে পড়তুম।
দেবু হাতজোড় করে বলল, সরল মনে কুকুরের কথাটা বলে ফেলেছি। স্যার এটা কাউকে বলবেন না। জানলে গাঁয়ের লোক আমাদের আস্ত রাখবে না।
না না। বলব না। অভয় দিলেন কালীকিঙ্কর।
কালীকিঙ্করের বাড়ি থেকে বেরিয়ে শিব বলল, তুই জানলি কী করে ওঁর কুকুরে এত ভয়?
দেবু বলল, এই পাড়ার লোকের কাছে ওঁর সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতেই বেরিয়ে গেল। পথে কুকুর দেখলে সাত হাত দূর দিয়ে হাঁটেন। কুকুর আছে এমন বাড়িতে কক্ষনো যান না। একবার কুকুরে কামড়েছিল, ফলে চোদ্দোটা ইংজেকশন নিতে হয়। তারপর থেকে কুকুরে আতঙ্ক।
ফেরার সময় ট্রেনে দেবু বেচুদাকে বলল, কালীকিঙ্কর যেতে পারবেন কিনা সন্দেহ
কেন? বেচুদা অবাক।
কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় গিছলাম কাল। এক বইয়ের দোকানে বলাবলি করছিল যে কালীকিঙ্করবাবুর কোনো আত্মীয়ের ভারি অসুখ। খুব ব্যস্ত আছেন।
খেয়েছে! দেবু চিন্তিত।
ঘাবড়াচ্ছ কেন? দেবু সাহস দেয় : শশধর ধরকে প্রধান অতিথি বানিয়ে দেব তাহলে। কিছু খারাপ হবে না।
ফাংশানের তিনদিন আগে বেচুদার নামে কালীকিঙ্করের টেলিগ্রাম এল, আঙ্কল সিরিয়াস। নট গোয়িং চন্দনা। সরি।
বেচুদা টেলিগ্রামটা প্রথমে দেখালেন দেবুকে।
দেবু বলল,—যা ভেবেছি। আটকে গেছেন। আপনি আর ননীকে সাধাসাধি করবেন না। শশধর ধর তো থাকছেন।
টেলিগ্রাম দেখে ননী শুকনো মুখে বলল,
কাকাকে জানাই?
কোনো দরকার নেই। – বাধা দেন বেচুদা : বাড়িতে অসুবিধা। জোর করা উচিত নয়।
কিন্তু প্রধান অতিথি?
সে যাহোক ম্যানেজ করতে হবে।
১ মার্চ। দুপুর। একখানা মোটর এসে থামল চন্দনায়। নামলেন বিখ্যাত গায়ক দূরদর্শন এবং বেতার শিল্পী গোরাচাঁদ মল্লিক। তাঁর সঙ্গীও হেলাফেলার নয়। মিন্টু সাহা। রেডিও আর্টিস্ট।
ক্লাবের অভ্যর্থনা কমিটি এগিয়ে এল গাড়ির কাছে। কলকাতার দুই বিখ্যাত শিল্পীকে দেখে কমিটি মেম্বাররা অবাক হলেন। তাদের চেহারা চুল জামাকাপড় শিল্পীসুলভ শৌখিন বটে কিন্তু উভয়েরই হাতে ছিপ কেন?
বেচুদা আনতে গিয়েছিল গোরাচাঁদ ও মিন্টু সাহাকে। অন্যদের দায়সারা নমস্কার ঠুকে গোরাচাঁদ বললেন বেচুদাকে, আজ কি বসা যাবে?
বেচুদা বললেন, না স্যার। আজ বসতে বসতে বেলা পড়ে যাবে। চার ফেলে মাছ টানতে খানিক সময় লাগে। কাল সক্কালে বসব।
বেশ। তবে পুকুরটা একবার দেখে নিই।
চলুন। বেচুদা অতিথিদের নিয়ে এগোল। গ্রামের অন্যরা একটু ক্ষুণ্ণ হলেন আলাপ করতে না পেরে।
ঘণ্টাখানেক বাদে পৌঁছলেন শশধর। সংগীত শিল্পীদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি চলে গিছল ধরমশাইকে আনতে।
শশধর খুব মেজাজে আছেন। ছোট লাইনের ট্রেনে দিড়ে দারুণ লেগেছে। অবশ্য লাভপুর অবধি যাননি। মাঝামাঝি নেমে মোটরে ওঠেন। নইলে দেরি হয়ে যেত চন্দনায় পৌঁছতে। দেবু ও শিব তাঁকে আনতে গিয়েছিল।
শশধরের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বিশাল এক ছোটদের দঙ্গল তাঁর গাড়ি ঘিরে ফেলে। শশধরবাবু নামলেন তড়বড় করে। পরনে চাপা পাজামা ও রঙিন পাঞ্জাবি। কাঁধে ঝুলছে ক্যামেরা।
এমন ভক্ত সমাগমে শশধর অভ্যস্ত। সস্নেহ দৃষ্টি ছুড়ে দিলেন ছোটদের দিকে। চন্দনা স্পোর্টিংয়ের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে নমস্কার বিনিময় করলেন। তারপর দেবুকে বললেন, চলো নীলকুঠিটা একবার দেখে আসি। ফিরে এসে চা-টা খাব। তাঁর আর তর সইছে না।
দেবু শিবুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি হাঁটা দিলেন। গ্রাম ছাড়িয়ে, মাঠ পেরিয়ে, নীলকুঠির দিকে। দেখে চন্দনার লোক হাঁ। সাহিত্যিকরা খেয়ালি হয় বটে।
নীলকুঠির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে দেবুরা। দেখায়–ওই যে।
ধু ধু মাঠের মাঝে একখণ্ড জমাট অরণ্য। দেখে, শশধরবাবু মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বললেন,—এখন তো ঢোকা রিস্কি?
আজ্ঞে হ্যাঁ।—জানায় দেবু।
তাহলে কাল সক্কালে ঢুকব। তোমরা আসবে তো সঙ্গে?
ওই শিব যাবে। আমার একটা কাজ আছে। এই নীলকুঠি আর জঙ্গল শিবের দারুণ চেনা। ওর চেয়ে ভালো গাইড পাবেন না।
সকাল হতেই কলকাতার অতিথিরা দু’দিকে রওনা দিলেন।
সকাল ন’টা নাগাদ বেচুদাদের শ্যামপুকুরে ছিপ ফেলেছিলেন গোরাচাঁদ এবং মিন্টু সাহা। উপস্থিত ছিলেন ভোলানাথ সাধুখাঁ। গ্রামের তিনি সেরা মেছুরে। গোটা অঞ্চলে তাঁর নামডাক। আশ্চর্য সব চার এবং টোপ জানেন। বেশিরভাগই তাঁর নিজের আবিষ্কার। দীর্ঘদিনের সাধনায়। সে সব গোপন বিদ্যা কাউকে ফাঁস করেন না।
প্রৌঢ় ভোলানাথ রাশভারী মানুষ। পাকানো মোটা গোঁফ এবং এক মাথা ধবধবে চুল সমেত লম্বা দোহরা গড়ন। কথা বলেন খুব কম।
বেচুদার একান্ত অনুরোধে তিনি শ্যামপুকুরে চার ছড়িয়েছেন। গোরাচাদদের বড়শিতে টোপ লাগিয়ে দিচ্ছেন। তারপর খানিক দূরে বসে বসে গম্ভীরভাবে দেখছেন কলকাতার বাবুদের কেরামতি।
দেবুও রয়েছে সেখানে। অতিথিদের তদারকি করছে।
দু ঘণ্টা কাটল।
গোরাচাঁদের ছিপে একটিও মাছ উঠল না।
এদিকে মিন্টু সাহা একটা মাছ তুলে ফেলল। প্রায় আধ কিলো ওজন। আনন্দে মিন্টু দিশাহারা। এত বড় মাছ সে কখনো ধরেনি।
গোরাচাঁদের মুখ থমথমে।
ভোলানাথ হঠাৎ উঠে গটগট করে ফিরে চললেন পুকুর পাড় ছেড়ে। দেবু অমনি দৌড়ল ভোলাদার পিছু পিছু।
দেবু কাছে যেতেই ভোলানাথ গোঁফের ফাঁকে চাপা গর্জন ছাড়েন, কোত্থেকে সব আনাড়ি জুটিয়ে এনেছিস? ফাতনা ডোবার কামাই নেই। টোপের ভোজ খাচ্ছে মাছগুলো। একটা টানও কি ঠিক মতো মারতে পারে না? আবার মাছ ধরার শখ আছে। আমি আর এই ছেলেখেলায় নেই। চললাম।
দেবু হাতজোড় করে তাঁর পথ আগলে বলল, প্লিজ ভোলাদা, রাগ করবেন না। সত্যি এরা কিসসু জানে না। আসলে গাঁইয়ে মানুষ। এই একটা শখ খুব। তবে চর্চা নেই। কিন্তু একটাও মাছ না পেলে যে গোরা মল্লিকের মুড খারাপ হয়ে যাবে। হয়তো গাইবে না ভালো করে। তোমার নাম করে, বড় মুখ করে বলে নিয়ে এসেছি, ঠিক একটা বড়সড় মাছ ধরিয়ে দেব। সেই লোভেই এসেছে। প্রায় বিনা দক্ষিণায়। নইলে কি আর এত নামী গাইয়েকে এই অজ পাড়াগাঁয়ে আনা যেত? উনি ভালো করে না গাইলে গাঁয়ের সম্মান যাবে। মথুরাপুর হাসবে।
মথুরাপুর হাসবে? বটে।—ভোলানাথ কটমট করে তাকিয়ে থাকেন।
হ্যাঁ ভোলাদা। আপনি একটু চেষ্টা করলে ঠিক পারবেন। এই কেজি খানেকের যদি একটা উঠে যায় গোরা মল্লিকের ছিপে। ব্যস্।
ভোলানাথ খানিক গুম মেরে থেকে বললেন, বেশ করব চেষ্টা। এখন ওদের ছিপ গুটিয়ে চলে যেতে বল। ঘণ্টা দুই বাদে এসে ফের বসবেন। ভোলানাথ হনহন করে চলে গেলেন নিজের বাড়ি।
দেবু গিয়ে গোরাচাঁদকে বলল, আপনারা এখন চলুন। চান খাওয়া করবেন। ঘণ্টা দুই বাদে ফের এসে বসবেন। ভোলাদা আরও কড়া ডোজের চার আর টোপের ব্যবস্থা করবেন বলে গেছেন। দেখবেন তখন ঠিক মাছ উঠবে।
গোরাচাঁদ উঠলেন বটে, তবে আষাঢ়ে মেঘের মতন মুখ। কোনোও কথা নেই। দেখে প্রমাদ গোনে দেবু। মিন্টু সাহা কিন্তু বেজায় খোশমেজাজ। যেন রাজ্য জয় করে ফেলেছে। ওর মাছটা জিয়ানো রয়েছে পুকুরে। ঘাড়ের কাছে শক্ত সুতো বেঁধে, সুতোর অপর প্রান্ত খুঁটিতে বেঁধে মাছটাকে জলে ছেড়ে রেখেছে দেবু। পুকুরধারে জলে। কাল যাওয়ার সময় তুলে নিয়ে যাবে। এখন জল থেকে তুললে খানিক বাদেই মরে যাবে। কাল আর গোটা মাছ হাতে বাড়ি ফেরা হবে না। আগেই পচে যাবে মাছ। তাই এই ব্যবস্থা।
গোরা মল্লিক এবং মিন্টু সাহা ফের শ্যামপুকুরে ছিপ ফেলল দুপুর প্রায় দেড়টায়।
দেখা যাক শ্রীশশধর ধর ইতিমধ্যে কী করছেন? সকাল আটটায় শশধরবাবু নীলকুঠির জঙ্গলে ঢুকেছিলেন। সঙ্গে ছিল শিব এবং শিবের শাকরেদ রতিয়া। রতিয়ার হাতে একটা বড় ধারালো কাটারি। শিবের হাতে একটা লম্বা বাঁশের লাঠি।
জঙ্গলে ঢুকেই শশধরবাবু থ।
এ যেন আলাদা এক জগৎ। কী নির্জন ছমছমে পরিবেশ। প্রাচীন সুউচ্চ সব মহীরুহ আকাশ ঢেকে ডালপালা মেলেছে। মোটা মোটা লতা জড়িয়ে উঠছে গাছে। বড় বড় গাছের তলায় ঘন ঝোপঝাড়। বুনো গাছের সঙ্গে মিশে আছে কত ভালো ভালো ফলের গাছ। পোড়ো কুঠিবাড়ি ঘিরে অন্তত বিঘে দশকের জঙ্গল। এই জঙ্গল যা একসময় বাগান ছিল, ইটের পাঁচিলে ঘেরা। তবে এখন সে পাঁচিল ভেঙে গেছে বেশিরভাগ জায়গায়।
এখানে প্রাণীর অভাব নেই। কত রকম আওয়াজ কানে ভাসছে। পাখির কুজন। নানান কীটপতঙ্গের ডাক। গাছের ডালে ডালে পাতায় পাতায়, গাছের তলায় ঝোপের ভিতর কেবলই খসখস সরসর ধ্বনি। অদৃশ্য জীবের চলাফেরার শব্দ।
শিব জানাল যে সন্ধের পর এ জঙ্গলে কেউ ঢোকে না। ধারে কাছেও কেউ মাড়ায় না এ অঞ্চলের লোক। দিনের বেলাও কদাচিৎ কেউ কুঠিবাড়ির জঙ্গলে ঢোকে।
তবে আশেপাশের গ্রামের ডাকাবুকো ছেলেরা ভয় তুচ্ছ করে এবং বাড়ির লোকের নিষেধ অগ্রাহ্য করে মাঝে মাঝেই এই জঙ্গলে হানা দেয়, মুখরোচক ফলের লোভে।
সাহেবরা চলে গেছে প্রায় একশো বছর আগে। তারপর কয়েকবার হাত বদল হয়ে এই সম্পত্তির মালিক এখন রামপুরহাটের মুখুজ্যেরা। অনেক শরিকের ভাগ। ফলে কেউ এদিকে নজর দেয় না। দিনে দিনে তাই কুঠিবাড়িতে জঙ্গল বাড়ছে। জায়গাটা ভূতুড়ে হচ্ছে। পাহারাদার নেই তাই যে খুশি জঙ্গলে ঢোকে, গাছের ফল পাড়ে।
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে শুঁড়ি পথ বেয়ে কুঠিবাড়ির দিকে এগিয়ে চলল তারা। সামনে চলেছে রতিরা। কাটারির কোপে পথ সাফ করতে করতে। উড়িয়ে দিচ্ছে কাঁটাগাছ, বিছুটির ডাল। তীক্ষ্ণ নজর রাখছে পথে সাপখোপ যদি পড়ে? মাঝে শশধরবাবু। পিছনে শিব। এমন জায়গায় সশস্ত্র সঙ্গী পেয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করেন শশধরবাবু।
তারা কুঠিবাড়িতে পৌঁছয়। প্রকাণ্ড বাড়ি ছিল। দোতলা। ইট বের হওয়া চওড়া দেয়ালগুলো আজও খাড়া রয়েছে। তবে বেশিরভাগ ঘরের ছাদ ভেঙে পড়েছে। পাকা মেঝে ফেটে আগাছা ও ঘাস জন্মেছে। কোথাও ভাঙা ইটের স্তূপ।
শশধরবাবু রোমাঞ্চিত উত্তেজিত। উঃ এমনটা সত্যি তিনি কল্পনা করেননি। ক্যামেরা দিয়ে নানান অ্যাঙ্গেলের অনেকগুলো ফোটো নিলেন কুঠিবাড়ির। তুললেন জঙ্গলের ছবি। উঁকিঝুঁকি মারলেন অট্টালিকার ভিতরে। ভিতরে ঢুকতে মানা করে শিব। বিষাক্ত সাপ আর বিছের ডিপো এই বাড়ি।
কাঁধের ঝোলা থেকে বাঁধানো খাতা বের করে ঘন ঘন নোট নিচ্ছেন শশধরবাবু। কুঠিবাড়ি সম্বন্ধে প্রশ্ন করছেন শিবদের।
জঙ্গলের মাঝে মস্ত এক পুকুর। তার চারদিকে বাঁধানো ঘাট। কালচে সবুজ নিথর জল। গাছের ছায়া পড়েছে জলে। পুকুরের জলে কয়েক জায়গায় শালুক বন। গোল গোল পাতা ভাসছে। জলের ওপর মাথা তুলে আছে প্রচুর কুঁড়ি আর লাল পাঁপড়ি মেলা শালুক ফুল। পুকুরের কিনারে বড় বড় ঘাস আর নানান শাকের ঝাড়। দিঘিরও ফোটো নিলেন শশধরবাবু।
বহু শুঁড়ি পথ জঙ্গল ভেদ করে গেছে নানান দিকে। ঘুরতে ঘুরতে মাঝে মাঝে জিরোচ্ছেন শশধরবাবু। জল খাচ্ছেন। গুমোট গরমের দিনে এমনি ঘুরতে ঘুরতে বেলা বারোটা নাগাদ বেদম হয়ে পড়লেন শশধর ধর। পা ছড়িয়ে বসলেন মাটিতে গাছে ঠেস দিয়ে।
এই সময় শিব দেবুর শেখানো প্ল্যানটা কাজে লাগাল। বলল শশধরবাবুকে—নীলকুঠির গল্প আমরা আর কী জানি? জানে বটে রহিমচাচা। কত গপ্পো যে ওঁর স্টকে আছে।
কে রহিমচাচা? শশধর কৌতূহলী হন।
আমাদের গাঁয়ে থাকেন। এই নীলকুঠির নাড়িনক্ষত্র জানেন। রহিমচাচার পূর্বপুরুষ ছিল নীলকুঠির কর্মচারী। শুনেছি, এই নীলকুঠিতে আছে চোরকুঠুরি, গুপ্তপথ। কত যে গুম খুন হয়েছে। গুপ্তধনও পাওয়া গেছে। সে সব গপ্পো রহিমচাচার মুখ থেকে শুনতে হয়। চাচা যা বর্ণনা দেয়, ওফ্। ভয়ংকর সব কাণ্ড ঘটেছে এখানে। আমি কিছু কিছু শুনেছি। তবে অত ডিটেলস্ জানি না।
বিষম আগ্রহে শশধর বললেন, তোমাদের রহিমচাচার সঙ্গে দেখা করতে চাই। একটু ব্যবস্থা কর ভাই।
শিব বলল,
সেই সন্ধ্যার আগে তো চাচার সাথে দেখা হবে না। লাভপুরে যান চাকরি করতে। ফেরেন সন্ধ্যায়।
তাহলে উনি গাঁয়ে ফিরলেই আমায় তার কাছে নিয়ে যাবে। অথবা তিনি যদি আমার কাছে আসেন।
শিব চিন্তিত ভাবে বলল, চাচা ভারি মেজাজি মানুষ। সহজে নীলকুঠি নিয়ে মুখ খুলতে
চান না। তবে একবার খুললে দারুণ।
দেখো ভাই চেষ্টা করে।—শশধর উদগ্রীব। এই দুর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ডে রহিমচাচার কিছু গল্প নিজের মতো ঘষামাজা করে ভিমরুল বনাম রবি রায়ের কাণ্ডকারখানা বলে চালিয়ে দিলে কয়েকখানা রোমহর্ষক উপন্যাস নামিয়ে দেওয়া যাবে।
হঠাৎ শিব লাজুক হেসে বলল,—স্যার, একটা কথা বলব? মানে অনুরোধ।
কী? শিবের এই সঙ্কুচিত ভাব দেখে অবাক হন শশধর। এই শক্ত সমর্থ সপ্রতিভ ডানপিটে ছেলেটিকে তাঁর বেশ লেগেছে।
শিব বলল,
আমাদের গাঁয়ে একটা সভা হবে আজ বিকেলে। আপনি যদি প্রধান অতিথি হন? বলতে পারেন, আপনার অনারেই এই সভা।
কী রকম? শশধর জানতে চান।
মানে আমাদের ক্লাবের দশবছর পূর্তি উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠান হওয়ার কথা হচ্ছিল। আপনি এসেছেন দেখে ক্লাবের মেম্বাররা ঝটপট সেই সভা লাগিয়ে দিয়েছে। যাতে আপনাকে বক্তা হিসেবে পাওয়া যায়। এখানকার দশ গাঁয়ের লোক আপনার ভীষণ ভক্ত। তারা আপনাকে একটু দেখতে চায়, কথা শুনতে চায় আপনার। আমাকে বলেছে, ক্লাবের তরফ থেকে আপনাকে অনুরোধ জানাতে।
না না এসব ঝামেলা কেন? আমি তো আগেই বলেছি যে শুধু নীলকুঠি দেখার প্রোগ্রাম। তোমার রহিমচাচার সঙ্গে কথাবার্তা হলেই আমার প্রোগ্রাম শেষ।
আজ্ঞে রহিমচাচার মুখ খোলাতেই তো আপনার মঞ্চে উঠে কিছু বলা দরকার।—জানায় শিব।
কেন?
কারণ? রহিমচাচার নাতি বাহাদুর আপনাকে দেখবে বলে, আপনার সাহিত্য জীবনের দুটো কথা শুনবে বলে কাল থেকে ছটফট করছে। ক্লাস নাইনে পড়ে। আপনার সাংঘাতিক ফ্যান। ভাবছি, বাহাদুরকে দিয়ে রিকোয়েস্ট করাব চাচাকে, নীলকুঠির গল্প বলতে। তাহলে
আর চাচা না করতে পারবে না।
শশধরবাবু ভেবে দেখলেন, এখন আর নীলকুঠি দেখার কিছু নেই। এবার শুধু রহিমচাচার গল্প বাকি। তাহলেই সোনায় সোহাগা। যদি সভায় প্রধান অতিথি হলে রহিমচাচার গল্প শোনা নিশ্চিত হয়, আপত্তির কী? তিনি বললেন, সভা কটায়?
আজ্ঞে চারটেয়।
কখন শেষ হবে?
সন্ধের আগে।
ফিরে এসে গল্প শোনা যাবে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ। চাচাকে আমরা বলে রাখব।
অলরাইট। বলে দিও প্রধান অতিথি হব।—জানালেন শশধর।
শিবের হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে ওঠে ফূর্তিতে। বলে, এখন তবে ফেরা যাক। দুপুরে রেস্ট নেবেন। বিকেলে সভা।
হুঁ চল। শশধরবাবু ফিরলেন সদলে।
শিব রহিমচাচা সম্বন্ধে একটু চেপে গেছে।
রহিমচাচার পূর্বপুরুষ নীলকুঠিতে কাজ করত, এটা ঠিক। তাঁর নাতি বাহাদুর, এটা ঠিক। বাহাদুর শশধরের পরম ভক্ত, এটাও ঠিক। তবে রহিমচাচা নীলকুঠি সম্বন্ধে মুখ খোলেন না সহজে, এটা ঠিক নয়। নীলকুঠি নিয়ে অজস্র গল্প ফাঁদা রহিমচাচার নেশা। একবার প্রসঙ্গটা তুললেই হল। রহিমচাচা গল্প শুরু করবেন। যা বলেন, তার বেশিরভাগটাই যে রং চড়ানো, এটা বোঝে গাঁয়ের লোক। তবে বলে দারুণ। রীতিমতো অ্যাকটিং করে। সে সব ভয়াবহ কাহিনি শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।
ভোলানাথ সাধুখাঁ এবার আর দূরে রইলেন না। গোরাচাঁদের পাশে বসে নির্দেশ দিয়ে চলেন, যখন বলব ঠিক তখন ছিপে টান মারবেন। আগে নয়। পরে নয়। যা যা বলব ঠিক তাই করবেন। বেশি জোরে হ্যাঁচকা নয় মাঝারি টান।
ভোলানাথ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গোরাচাঁদের ফাতনার ওপর রেখে অপেক্ষা করেন।
সহসা ভোলানাথ চাপা হুংকার দিলেন,—টানুন
অমনি ছিপে টান দিলেন গোরাচাঁদ।
অমনি বঁড়শিতে গেঁথে একটা মস্ত মাছ লাফিয়ে ওঠে জলের ওপর। তারপর সে জলে ডুবে ছুট দিল। সরসর করে হুইলের সুতো ছোটে। ভোলানাথ নির্দেশ দিতে থাকেন, ছাড়ুন ছাড়ুন এবার আস্তে। আস্তে। ব্যস ছাড়া বন্ধ এবার টানুন। টানুন। আবার ছাড়ুন। টানুন। গুটোন গুটোন…।
এইভাবে ভোলানাথের হুকুম মতো সুতো ছাড়া-টানা-ছাড়া-টানা করতে করতে ক্রমে হুইলের সুতো গুটিয়ে গুটিয়ে মাছকে এনে ফেলা হল পুকুরের ধারে। দেখা গেল স্বল্পজলের স্বচ্ছতায় মস্ত একটা লালচে রুই মাছ। বঁড়শিবন্দি ক্লান্ত মাছটা ধীরে ধীরে সাঁতরাচ্ছে।
ভোলানাথ ঝপ্ করে জলে নেমে একটা হাত জাল দিয়ে মাছটাকে ছেঁকে তুললেন। তারপর দু’বার ঝাঁকিয়ে হেঁকে বললেন প্রায় আড়াই কিলো। কী মশাই, গোটাটা বাড়ি নিয়ে যাবেন না, খাবেন কেটেকুটে ভেজে?
গোরাচাঁদ নিজের কীর্তিতে এমন স্তম্ভিত হয়ে গেছলেন যে তাঁর মুখে কিছুক্ষণ বাক্য সরে না।
কী বলুন? তাড়া দেন ভোলানাথ। মাছ তখন ছটফট করছে জালে।
আজ্ঞে গোটা নেব।—গোরাচাঁদ থতমত খেয়ে জবাব দেন। ভোলানাথ চটপট বঁড়শি খুলে মাছটাকে ঘাড়ের কাছে শক্ত সুতো দিয়ে বেঁধে তাকে জলে ছেড়ে দেয়। ছোট মাপের সুতোটার অন্য প্রান্ত বাঁধা হয় পুকুর পাড়ে একটা গাছের গুঁড়িতে।
একটা ফোটো তুলতাম মাছ নিয়ে। – গোরাচাঁদ আবেদন জানান।
আজ নয় কাল। কাল যত খুশি ফোটো খিঁচবেন। ভোলানাথ দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করলেন : এই দেবু, কাল মাছটাকে জল থেকে তুলে দিস। আর তখন ফোটো তোলাস। ব্যস, আজ আর মাছ মারা নয়। আমার এই টোপ এক মৎস্যঘাতিনী। দিনে একটা মরবেই। বেশি মারা গুরুর নিষেধ। বলেই ভোলানাথ ঘরমুখো রওনা দিলেন। বোধহয় এই আনাড়িদের কবল থেকে নিস্তার পেতে।
গোরাচাঁদ মল্লিক জলের মধ্যে সঞ্চরমাণ নিজের বিস্ময়কর শিকারটির পানে অনেকক্ষণ মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থেকে দেবুকে ডেকে নিয়ে আড়ালে গেলেন। অতঃপর বললেন, ভাই, ভোলাবাবুর এই চার আর টোপের ফর্মুলাটা আমায় জোগাড় করে দিতে পারবে? ওঃ ওয়ানডারফুল।
দেবু ইতস্তত করে বলল, পেতে পারেন, তবে আগে আপনাকে গান গেয়ে ভোলাদাকে
ভেজাতে হবে। উনি গান পাগল। বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত আর নজরুলের গান।
আজ একটা সভা হবে গ্রামে। আমাদের ক্লাবের দশবছর পূর্তি উৎসব। ভোলাদা যাবেন সভায়। চলুন, সেখানে গান শোনাবেন আপনারা দুজনেই। গান শুনে খুশি হলে ভোলাদার থেকে ফর্মুলা পাওয়া অসম্ভব হবে না।
গোরাচাঁদ তাড়াতাড়ি বললেন, মিন্টুকে কিন্তু এই ফর্মুলার কথা বলার দরকার নেই।
কিন্তু উনি গাইবেন তো? দেবুর প্রশ্ন।
আলবাত গাইবে। আমি বললে গাইতেই হবে। তাছাড়া ও জীবনে কখনো হাফকিলো মাছ ধরেছে? গুরুদক্ষিণা দেবে না ভোলাবাবুকে? সভা কটায়? বেচুবাবু ওখানে থাকবেন কি?
দশক পূর্তি উপাখ্যান
বেচুদা থাকবেন বইকি। গ্রামের প্রায় সবাই থাকবে। বিকেল চারটেয় সভা। চলুন চা-টা খেয়ে নিয়ে যাবেন।
চলো। দেখি তোমাদের ভোলাদাকে ভিজতে পারি কিনা?
গোরাচাঁদ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
চন্দনা ক্লাবের দশক পূর্তি অনুষ্ঠান ঠিক সময়েই শুরু হয়েছিল। প্রধান অতিথি শশধর ধর পাঁচ মিনিট আগেই উপস্থিত হয়েছিলেন।
সভাপতি ও প্রধান অতিথি বরণের সময় ছোট্ট ফুটফুটে একটি মেয়েকে নিয়ে থালায় মালা চন্দন হাতে মঞ্চে উঠেছিল রানু। ননীর ওপর চটেছিল বেচুদা। কালীকিঙ্কর আসেননি। সুতরাং ননীও বাদ।
গোরাচাঁদ ও মিন্টু সাহার সভায় হাজির হতে আধঘণ্টাটাক লেট হল। তাতে কী? চটাপট হাততালির মাঝে তাঁরা মঞ্চে আসন নিলেন। বেচুদা সগৌরবে ঘোষণা করলেন কলকাতার এই দুই প্রখ্যাত শিল্পীর পরিচয়।
একটির পর একটি প্রোগ্রাম চলে।
এলো কবিতা কম্পিটিশনের প্রাইজ দেওয়ার পালা।
বেচুদা একখানা সিল বন্ধ খাম নিয়ে মঞ্চে উঠে ঘোষণা করলেন, আমাদের বিচারক কবিশেখর সত্যসাধন রেজাল্ট পাঠিয়েছেন। সকলের সামনে তা খোলা হবে। উনি প্ৰশংসা করে জানিয়েছেন যে সাত-আটটি কবিতা বেশ উঁচু মানের ছিল। তাদের মধ্য থেকে তিনটি স্থান নির্ণয় করা হয়েছে।
বেচুদা খাম খুললেন।
ইতিমধ্যে হাসি হাসি মুখে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ননী। সে জানে, তার ফার্স্ট প্রাইজ বাঁধা। বেচুদা কবিশেখরের লেখা দেখে ঘোষণা করলেন : প্রথম : সিরাজুল শেখ। দ্বিতীয় : ভোম্বল দাস। তৃতীয় : বটকৃষ্ণ হাজরা।
হই হই উঠল সভায়। হাততালি ও উল্লাসধ্বনি।
ননীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
সভা ভঙ্গের পর শিব রহিমচাচাকে হাজির করে দিল শশধর ধরের কাছে। আর দেবু গোপনে গোরাচাঁদকে দিয়ে এল ভোলাদার চার ও টোপের স্পেশাল ফর্মুলা। অবশ্য যে ফর্মুলার জোরে ভোলাদা দশ মিনিটের মধ্যে গোরাচাঁদের বড়শিতে মাছ খাইয়েছিলেন, সেটা দেওয়া হয়নি। অনেক হেরফের করা আছে। তবে তাই কলকাতার আনাড়িদের পক্ষে যথেষ্ট। সে রাতেই শিব ধরল দেবুকে, বটকেষ্ট কবিতায় থার্ড! ইম্পসিবল। আমি জানি না ওর দৌড়? তুই লিখে দিয়েছিস? ও তোর বাড়ি গিছল লুকিয়ে। কবিতা জমা দেওয়ার দুদিনে আগে। তোর বোন আমায় বলেছে। কেন?
দেবু মিচকে হেসে বলল, দূর আমি কি কবিতা লিখি? সেই কবে ছেড়ে দিয়েছি। পরখ করে দেখলাম, কার এলেম বেশি? ননীর মামার, না কামিনীদার? তা কামিনীদা ননীর মামাকে তো একদম আউট করে দিলেন।
কে কামিনীদা?
চন্দননগরে থাকেন। আমার পিসতুতো দাদার বন্ধু। একেবারে স্বভাব কবি। দিনে পাঁচ-ছ’খানা যে কোনোও সাবজেক্টে ফাসকাস পদ্য নামিয়ে দেওয়া ওঁর কাছে নস্যি।
তার মানে কী, সিরাজ ভোমলা বটর কবিতা তোর কামিনীদার লেখা? শিব জানতে চায়।
আজ্ঞে হ্যাঁ। ননীর মামা থাকতে পারে। আমাদের কি কেউ নেই? মুচকি হেসে জানায় দেবু।
পরদিন সকালে কলকাতার অতিথিরা বিদায় নিলেন। তিনজনই একসঙ্গে মোটরে যাবেন বোলপুর। সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা। বেচুদা সঙ্গে যাচ্ছে।
যাওয়ার আগে শশধর ধর ফূর্তিতে দেদার অটোগ্রাফ বিলোলেন। রহিমচাচার গল্পে তাঁর তিনখানা নোট বই ভর্তি হয়ে গেছে।
গোরাচাঁদ ও মিন্টু সাহা ছিপ হাতে, গোটা গোটা মাছ থলিতে ভরে সগৌরবে মোটরে উঠলেন। মিন্টু সাহার ক্যামেরায় ভরা রিলে ধরা আছে জলজ্যান্ত শিকার নিয়ে তাদের দু’জনের ফোটো।
চন্দনা ক্লাবের দশকপূর্তি অনুষ্ঠান চমৎকার উতরেছে। গ্রামের সবাই খুশি। শুধু দু-চারজন বাদে।
[১৯৯১, কিশোর ভারতী শারদীয়া ]
