খ্যাপা
উল্টোদিক থেকে হঠাৎ মধুর কণ্ঠে গানের আওয়াজ ভেসে আসতেই বাপি ভাবল–যাঃ, এবার খ্যাপার দফারফা। ঠিক আছে। ব্যাটা বড্ড জ্বালাচ্ছিল।
খ্যাপাও ওই গান শুনে থমকে গেল কয়েক পলক। খানিক বুঝি সে হতচকিত। তারপর ফের গলা ছেড়ে এগুতে লাগল বটে। কিন্তু আগের সেই দাপট আর নেই। যেন কোনোরকমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কেবলই নজর তার সামনের দিকে। অজানা প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্দেশে।
ওরা মুখোমুখি হওয়ার আগে স্থান কাল পাত্র’র হদিশ একটু জানিয়ে রাখি।
সকাল আটটা নাগাদ। চলেছে লোকাল ট্রেনটা রামপুরহাট টু হাওড়া। চলছে থামছে, চলছে থামছে। ট্রেনটায় ডেইলি প্যাসেঞ্জাররা যায়, তাই ভিড় হয় বেশ। বহু লোক এই ট্রেনে বর্ধমান কলকাতায় অফিস-কাছারি করতে যায়, ফেরে সন্ধ্যার ট্রেনে।
লোকাল ট্রেনে প্যাসেঞ্জারের ভিড় থাকলে তাদের ল্যাজে ল্যাজে আরও অনেক কিছু জোটে। সেটাই রীতি। এই যেমন রকমারি হকার, ভিখিরি, গায়কের দল। গেরস্থালির প্রয়োজনীয় আর মানুষের শখের হাজারো টুকিটাকি জিনিস, নানান রকম খাবারদাবার, অসুখের দাওয়াই ইত্যাদি পসরা নিয়ে খদ্দের টানতে উচ্চৈঃস্বরে হেঁকে হেঁকে হকাররা
ক্রমাগত আনাগোনা করে এক কামরা থেকে অন্য কামরায়।
ভিখিরিদের বৈচিত্রও কম নয়। গাইয়েরা পয়সা চায় বটে, কিন্তু তাদের ভিখিরি বলা উচিত নয়। কারণ, রীতিমতো গান গেয়ে গলা ফাটিয়ে মেহনত করে তারা রোজগার করে। হরেক রকম গান শোনা যায় এই ট্রেনে—বাউল, শ্যামা সঙ্গীত, কীর্তন। বাজার মাত করা আধুনিক বাংলা গানও চলে।
ট্রেনের গান বাপির বেশ লাগে। হকারদের কর্কশ চিৎকার যাত্রীদের হট্টগোল আর তর্কের মাঝে মিঠে গলায় গান শুনলে মনে একটু আরাম হয়। সত্যি এক এক জনের গলা এত ভালো। বাপির দুঃখ হয় যে এরা হয়তো কোনো দিনই কোনো আসরে গান গাইবার সুযোগ পাবে না, বাইরে এদের নাম ছড়াবে না। এইরকম অবিশ্রান্ত ট্রেনে গেয়ে গেয়েই একদিন এদের গলা নষ্ট হয়ে যাবে।
তবে সবার গান শুনে যে মেজাজ শরিফ হয়ে যায় তা নয়। এই যেমন খ্যাপা। বাপি এই ট্রেনে চাপে কদাচিৎ। আগে সে কখনো খ্যাপার সাক্ষাৎ পায়নি।
বর্ধমান প্রায় এসে পড়েছে। উসখুস করছিল বাপি। আজ একটাও গান শোনা হল না। হঠাৎ সে চমকে ওঠে। বরং বলা উচিত আঁতকে ওঠে। কারণ তার একটু পেছনে বিকট গলায় তারস্বরে কেউ গেয়ে উঠল
দোষ কারও নয় গো মা। সঙ্গে সঙ্গে খপাখপ খপাখপ শব্দ। ঘাড় ঘুরিয়ে বাপি দেখে, পেছনে দু সারি সিটের মাঝে দাঁড়িয়ে গাইছে এক বিচিত্র মূর্তি। বেঁটে নাদুসনুদুস চেহারা। বয়স বছর তিরিশ হবে। পরনে পুরনো ছেঁড়া ফুলপ্যান্ট, নিচের দিকে বিঘতখানেক গোটানো। ময়লা একখানা শার্ট কাঁধে ফেলা। অতএব খালি গা। শ্যাম বর্ণ। তাতে সারা গায়ে ধুলো ময়লার গাঢ় প্রলেপ। গোল মুখখানায় কয়েক দিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি। গোঁফ নেই। মাথায় কদমছাঁট চুল।
লোকটি গদগদ মুখে হলদেটে এবড়োখেবড়ো দত্তসারি বের করে ঊর্ধ্বমুখে ঘাড় নেড়ে নেড়ে গাইছে, আর দু হাতে দুটো মাটির খুরি ঠুকে ঠুকে তাল দিচ্ছে—খপাখপ খপাখপ্প।
শ্যামা সঙ্গীত। কথাগুলিও দিব্যি। কিন্তু বাপরে কী গলা! বেসুরো হেঁড়ে ভাঙা ভাঙা। শুনলে ভক্তির উদয়ের বদলে ভক্তি চটে যায়। কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে গানের দাপটে। বাপির গান শোনার মেজাজটাই গেল খিঁচড়ে।
ভুরু কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে বিরক্ত বাপি মাঝে মাঝে গায়কটিকে দেখতে লাগল।
গায়কের অবশ্য ওসবে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে এক পা আধ পা করে এগুচ্ছে আর ভাব ঢেলে ঢেলে প্রাণপণে গলা খেলাচ্ছে, দোষ কারও নয় গো মা
নাঃ কাউকে দোষ দিচ্ছে না বাপি। দোষ তার বরাতের। নইলে অ্যাদ্দিন বাদে এই ট্রেনে চড়ে এমন বিটকেল বউনি হবে কেন?
দেখা গেল, ওই ট্রেনের নিয়মিত প্যাসেঞ্জাররা এবং হকাররা এই গায়ককে বিলক্ষণ চেনে। এক ঝালমুড়িওলা গায়কটির পাশ কাটাতে কাটাতে কনুইয়ের মৃদু গোঁত্তা সহযোগে ওকে ধমকে দিয়ে গেল, অ্যাই খ্যাপা, পথ ছাড়।
বাপির সামনের দুই যাত্রী দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিলেন এতক্ষণ। গানের গুঁতোয় তাঁদের কথায় ছেদ পড়তে লাগল বারবার। মহা খাপ্পা হয়ে তাঁদের একজন বলে উঠলেন,—উঃ খ্যাপাটা আচ্ছা জ্বালালে! গাঁজা খেয়ে খেয়ে তো গলার বারোটা বাজিয়েছে।
অপর লোকটি মন্তব্য করলেন, ওর গলায় আবার ন’টা দশটা বাজল কবে? যদ্দিন শুনছি এই এক ফর্ম। এক দিন ওকে অ্যাডভাইস দিয়েছিলাম গানটা ছেড়ে অন্য লাইন ধর না বাপু। গাড়িতে একটু স্বস্তিতে যাই। তা সেয়ানাটা বলল কিনা– মায়ের নাম নিই, সেটাই তো আসল। গলার দোষটা কি বড় হল স্যার? মায়ের নাম না নিয়ে আমি যে থাকতে পারি না।
বুঝুন ঠ্যালা। আহা কি আমার ভক্তরে! আসলে ব্যাটা কুঁড়ের হদ্দ। অন্য কাজে উৎসাহ নেই। দেখুন না, কেউ শুনছে ওর গান? কেউ না।
বিরক্তিতে দুজনেই মুখ ভেটকে কথা বন্ধ করে বসে রইলেন।
খ্যাপা গাইতে গাইতে এগোচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। গানের ফাঁকে ফাঁকেই খুরি পাতছে দু’ধারে যাত্রীদের কাছে দক্ষিণার আশায়। কিন্তু সুবিধা হচ্ছে না মোটেই। ওর গানে কারও মন ভিজছে বলে মালুম হচ্ছে না।
খ্যাপা বাপির সামনে খুরি পাততেই বাপি আনমনা হওয়ার ভান করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। নেহাতই কৃপাবশে কয়েকজন অবশ্য পয়সা ঠেকাচ্ছে খ্যাপাকে, তবে তা যৎসামান্য। এমন সময় কানে আসে অন্য গানের আওয়াজ। সঙ্গে খোল করতাল বাজছে। ওরা এগিয়ে আসছে, খ্যাপা যেদিকে যাচ্ছিল সেই দিক থেকে।
বাপি বসেছিল কামরার মাঝামাঝি জায়গায়। এই ট্রেনে চলন্ত অবস্থায় এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যাওয়া যায়। যাতায়াতের যোগ আছে কামরাগুলোর মধ্যে। এই কামরায় ঢোকার সরু প্যাসেজের দিকে উৎসুক নজর রাখে বাপি
এক এক করে ঢুকল তারা। পুরো একটা দল। দেখে গোটা কামরা চমৎকৃত। প্রথমে একজন পুরুষ। তিনিই মূল গায়েন। সুন্দর তাঁর চেহারাটি। মাঝবয়সি। গৌরবর্ণ। নধর দিব্যকান্তি। নাকের ওপর কপাল ছুঁয়ে রসকলি কাটা। পরনে সাদা পাঞ্জাবি ও চওড়া কালো পেড়ে ধুতি। মিহি করে কোঁচানো ধুতির কোঁচাটি ঝুলছে সামনে। কাঁধে ফেলা পাট করা উড়নি। ঘন কালো ঘাড় ছোঁয়া মাথার চুল সযত্নে আঁচড়ানো। ভদ্রলোকের গলা থেকে ঝোলানো কোলের কাছে একটি শ্রীখোল।
ভদ্রলোকের ঠিক পেছনে এলেন এক মহিলা। তিনি সুশ্রী গৌরবর্ণা। সিঁথিতে সিঁদুর। টিকলো নাকের ওপর চন্দনের রসকলি টানা। মাথায় আধা-ঘোমটা। ধরন গিন্নিবান্নি গোছের। পরনে লাল পাড় সাদা খোলের শাড়ি। ফরসা সুগোল হাতে শাঁখা আর কয়েক গাছি কাচের চুড়ি। হাসি হাসি মুখখানি। মহিলার গলায় ঝুলছে হারমোনিয়াম।
ভদ্রমহিলার পিছু পিছু এল ছোট ছোট দুটি ফুটফুটে ছেলেমেয়ে।
ছেলেটির বয়স বছর দশেক। হাতে তার খঞ্জনি। মেয়েটি বছর সাত-আটের। তার এক হাতের মুঠোয় ঘুঙুর। ছেলেটির পরনে ধুতি ও হলুদ রঙা শার্ট। মেয়েটি সাদা ফ্রক পরা। দলের সবারই পোশাক ফরসা ধোপদুরস্ত। সবার পায়েই চটি।
ভাবে বিভোর হয়ে ভদ্রলোক গাইছিলেন কীর্তন। ‘ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম-ও-রে।’ আর তালে তালে চাঁটি মারছিলেন খোলে।
মহিলা গানের সঙ্গে হারমোনিয়ামের সুর মেলাচ্ছিলেন।
ঝমাঝম্ খঞ্জনি বাজিয়ে আর ঝুমঝুম্ ঘুঙুর ঝাঁকিয়ে সঙ্গত করছিল ছেলেমেয়ে দুটি। চমৎকার কনসার্ট। বোঝা যায়, স্বামী স্ত্রী ছেলেমেয়ে নিয়ে এরা গোটা একটি পরিবার।
ভদ্রলোকের গলাটি খাসা। শুনলেই মন মজে। তাঁর গানের সঙ্গে মাঝে মাঝে ধুয়ো ধরছিল দলের অপর তিনজন সুরেলা কণ্ঠে।
প্যাসেঞ্জাররা নড়েচড়ে বসে। আগ্রহ ভরে শুনতে থাকে এদের গান। দেখতেও থাকে এই নয়ন মনোহর দৃশ্য।
বাচ্চা ছেলেটি খঞ্জনি বাজানোর ফাঁকে ফাঁকে তার হাতে ঝোলানো একটা ছোট থলির মুখ খুলে এগিয়ে ধরছিল প্যাসেঞ্জারদের সামনে। তাতে টুপটাপ পয়সাও পড়ছিল কম নয়।
কীর্তন পার্টি এই কামরায় প্রবেশ করার পরেই খ্যাপার গলা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে থেমে গিয়ে হাঁ করে দেখছিল নতুন দলটাকে।
গাইতে গাইতে কীর্তনের দল যেই না খ্যাপার মুখোমুখি হয়েছে, অমনি খ্যাপা অ্যাবাউট টার্ন। সে গান ভুলে খুরিসুদ্ধু দু’হাত তুলে গৌরাঙ্গ নৃত্য শুরু করে দিল কীর্তনের সঙ্গে, এবং চলল দলটার সামনে সামনে নেচে নেচে। আর তাল মাফিক সে ‘হরি হরি’ রব ছাড়তে লাগল।
ব্যস্, জমে গেল ব্যাপারটা। গান বাজনা তো হচ্ছিলই চমৎকার, ওর সাথে ভজ গৌরাঙ্গ নাচটুকুরই যেন খামতি ছিল। সেই অভাবটুকু মিটে যেতে দর্শক কাম শ্রোতারা ভারি খুশি।
বাপি নজর করল যে খ্যাপার আসল ট্যালেন্ট কিন্তু নাচে। বৃথাই ও অ্যাদ্দিন গান গেয়ে এনার্জি নষ্ট করেছে। দারুণ নাচে বটে খ্যাপা। আহা কী ভাব! কী ভঙ্গি! প্যাসেজের মধ্যে ওইটুকু জায়গায় সে দুলে দুলে নাচছে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে।
বাপি খ্যাপার চোখে চোখ রেখে বলল, ফাসক্লাস। আচ্ছা নাচছিস!
খ্যাপা নাচতে নাচতে একগাল হাসল উৎসাহ পেয়ে।
কিন্তু সমস্যা একটা দেখা দিল। ঘোরতর সমস্যা।
নাচের ফাঁকে ফাঁকেই খ্যাপা খুরি বাড়িয়ে ধরছে প্যাসেঞ্জারদের সামনে–অর্থাৎ পয়সা দাও।
যাত্রীরা অনেকেই এদের গানে এবং নাচে খুশি হয়ে পয়সা বের করছে। খ্যাপা দলটার গোড়ায়। কেউ কেউ অতশত না ভেবে খ্যাপার খুরিতেই পয়সা ফেলে দিতে লাগল। কেউ কেউ আবার পয়সা হাতে দোনামনা করতে থাকে, পয়সাটা ঠিক কার ভাগে লাগবে এই চিন্তায়। কারণ খ্যাপা তো ঠিক এই পার্টির মেম্বার নয়। দু’একজনকে এত চিন্তা ভাবনার সুযোগ না দিয়ে খ্যাপা টুক করে তাদের হাত থেকে পয়সাটি টেনে নেয়। প্যান্টের পকেটে পয়সা চালান করে দিয়ে খ্যাপা ফের নাচে।
কীর্তন পার্টির বাচ্চা ছেলেটি আসছে অনেক পেছনে। সে এসে যখন হাতের থলি ফাঁক করে যাত্রীদের সামনে, খুব কম পয়সাই তার ভাগ্যে জোটে। কারণ ইতিমধ্যে বেশিরভাগ লোকই তো আগেভাগে খ্যাপাকে দান করে ফেলেছে। সুতরাং তারা আর দুবার দেবে কেন?
কীর্তন পার্টির সবাই খ্যাপার এই কাণ্ড দেখে চটছে, কিন্তু কী যে করবে ভেবে পাচ্ছে না। খ্যাপা খুরি পাততে পেছন থেকে ছোট ছেলেটি একবার একটু জোরেই বলে উঠল, অ্যাই কী হচ্ছে?
খ্যাপা কেয়ারই করল না।
কীর্তন পার্টি পড়ল মহা মুশকিলে। এ যে লাভের গুড় পিঁপড়েয় খায়। গান থামালে পয়সা বন্ধ। আবার গান চালালে খ্যাপাই বেশিরভাগটা টেনে নিচ্ছে খুরি পেতে। এই নিয়ে এখন একটা রাগারাগি করলে লোকে ভাববে কী? অমন ভক্ত গাইয়ে দলের নাম খারাপ হয়ে যাবে যে।
তাই গান চলল বটে তবে আগের সেই মুড আর রইল না।
খ্যাপার নাচে কিন্তু ভাটা পড়ে না। পয়সাও সে কামাচ্ছে মন্দ নয়।
বাপি সিট ছেড়ে উঠল বাথরুমে যাওয়ার ছুতোয়। খ্যাপার পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে ওর কানের গোড়ায় ফিসফিসিয়ে বলে গেল,—লেগে থাক্। এই পার্টিতে ঢুকে পড়।
খ্যাপা নাচের পোজেই দাঁত বের করে মাথা নেড়ে সায় দিল বাপির প্রস্তাবে।
বর্ধমান স্টেশন ইয়ার্ডে ট্রেন ঢুকল। বহু যাত্রী নড়াচড়া, হাঁকাহাঁকি, মালপত্র টানাটানি শুরু করে দিল। কীর্তন পার্টি এবার গান বন্ধ করে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ফলে তখন খ্যাপার নাচও বন্ধ হল।
স্টেশনে গাড়ি থামাতে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে কীর্তন পার্টিও নেমে গেল বর্ধমানে।
বাপি বর্ধমান শহরে যাবে। তাই সেও নামল ট্রেন থেকে।
হঠাৎ তার নজরে পড়ল যে খ্যাপা প্ল্যাটফর্মের এক কোণে কীর্তন দলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কীর্তনিয়া ভদ্রলোকের সঙ্গে খ্যাপার কী কথাবার্তা হচ্ছে। বিষম কৌতূহলে বাপি তখুনি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে না বেরিয়ে যথাসম্ভব ধীরে ধীরে ওদের কাছে গিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ওদের দিকে পিঠ ফিরে দাঁড়ায়। কান খাড়া করে ওদের কথা শোনার চেষ্টা করে এবং আড়চোখে নজর রাখে ওদের ওপর।
আগে ওদের মধ্যে কদ্দূর কী কথাবার্তা হয়েছে জানে না বাপি। এখন যেটুকু কানে আসে, কীর্তন গাইয়ে লোকটি বলছে,—তাই হবে বাপু। তোমার নাচ মন্দ নয়। এখন একটু চা-টা খেয়ে এস’খন। আমরা ওই বেঞ্চিতে বসছি। চল্লিশ মিনিট বাদে রামপুরহাটের দিকে ফিরতি লোকালটা ধরব।
খ্যাপা দু’হাত কচলাতে কচলাতে বিগলিত বদনে বলল, হ্যাঁ স্যার, আসচি ঘুরে। আজ্ঞে আমার রেটটা একটু বাড়াতেন যদি।
না না ওর বেশি দিলে আমাদের পড়তা পোষাবে না। আমরা তো চারজন বটি। কীর্তনিয়া আপত্তি জানাল।
ঠিক আছে, তাই দেবেন স্যার।—বলল খ্যাপা : দেখবে কেমন কালেকশান করি। খুশি হলে পরে না হয় কিছু উপরি বকশিশ করবেন।
এবার মহিলা বলে ওঠে সন্দেহের সুরে, হাঁ বাবা, শেষে সব পয়সাকড়ি নিয়ে সটকে পড়বে নাতো? তেমন চেনাজানা তো নেই।
ছি ছি মা, কী যে বলেন! – খ্যাপার কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ : গান গেয়ে ভিক্ষে করি বলে খ্যাপা ঠকবাজ, এমন অপবাদ কেউ দিক দেখি! একটি পয়সাও যদি ফাঁকি দিই আমার যেন সব্বোনাশ হয়!
ঠিক আছে, ঠিক আছে।–গাইয়ে ভদ্রলোক খ্যাপাকে শান্ত করে : দেখি আরও দু’চার দিন, তারপর না হয় তোমায় দলে পার্মানেন্ট করে নেব। যাও এখন ঘুরে এসো। আমরা একটু জিরোই বসে।
কীর্তন পার্টি বেঞ্চির দিকে এগলো। খ্যাপা গেল চা-টায়ের উদ্দেশে। বাপিও রওনা দিল প্ল্যাটফর্ম থেকে।
খ্যাপা ওই কীর্তন দলে ভিড়তে পেরেছিল কিনা, সে খবরটা বাপির আর জানার সুযোগ হয়নি। আর সে দেখাই পায়নি–খ্যাপার, না সেই কীর্তন পার্টির।
[১৯৯৮, কিশোর ভারতী শারদীয়া ]
