উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

যাত্রা বিভ্ৰাট – ৬

ছয়

নিউ চন্দনার বেশিরভাগ স্থানীয় শিল্পী ও কর্মকর্তাদের বাড়ি চন্দনার দক্ষিণ পাড়ায়। গোলকপতি সমেত তারাও দৌড়ল আগুনের দিকে। কোথায় আগুন লেগেছে? আগুন কি ছড়াচ্ছে? যে যেমন অবস্থায় ছিল ছুটল উদ্‌ভ্রান্তের মতো।

—এই যে দাদা।

সাজঘর অর্থাৎ গ্রিনরুমের দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন নবকুমার। ভুতোর সাড়া পেয়ে বললেন :—আগুন লেগেছে বুঝি?

—হ্যাঁ এই দক্ষিণ পাড়াতেই। কী করে যে লাগল কে জানে! হয়তো ডাকাতের কাজ!

—ডাকাত!

—হতে পারে। পাড়াগাঁয়ে অনেক সময় এমনি আগুন লাগিয়ে ওই দিকে লোক টেনে নিয়ে বাকি গ্রামে চুরি ডাকাতি হয়। তবে অ্যাকসিডেন্টও হতে পারে।

নবকুমার আর ঝুঁকি নেন না। পটলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি অন্ধকারে ডুব মারেন, নিরাপদে আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে।

পরনে পাট ভাঙা ধুতি চাদর। বিবেকের সাজে সুধাকণ্ঠ গুরুদাস মঞ্চের একধারে শুকনো মুখে তাকিয়েছিলেন আগুন রাঙা আকাশের পানে। ভুতোকে সামনে দেখে কম্পিত স্বরে বললেন,

—আগুন লেগেছে কোথাও?

আজ্ঞে হ্যাঁ।—জানায় ভুতো : কে জানে ওরাই লাগাল কিনা!

অ্যাঁ।—চমকে ওঠেন গুরুদাস : এধারেও হ্যাঙ্গামা হবে নাকি?

—হতে পারে। দেখি।

গুরুদাস দ্রুত পায়ে বেরিয়ে পড়েন অন্ধকার গ্রামের পথে।

বাইরের ফিমেল আর্টিস্টদের জন্যে স্পেশাল ব্যবস্থা। আলাদা সাজঘর। সেখানে উঁকি দেয় ভুতো। দুটি মহিলা শিল্পী ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে রয়েছে।

দিদি এখানে আপনারা?—ভুতো ডাকে।

কী হয়েছে ভাই? আগুন লেগেছে বুঝি?— মন্দাকিনী শুধায়।

—হ্যাঁ। কি করে যে লাগল? ডাকাতের কীর্তি নাকি কে জানে!

—অ্যা! ডাকাত!

—হ্যাঁ। গাঁয়ে অনেক সময় এমনি আগুন লাগিয়ে, লোককে আগুনের কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে বাকি ফাঁকা গ্রামে চুরি ডাকাতি করে বদলোকে। তবে অ্যাকসিডেন্টও হতে পারে।

ডাকাত! ওরে বাবাগো! —হাউমাউ করে ওঠে যুবতীরা : এদিকে আসে যদি ডাকাত?

তা আসতে পারে।—গম্ভীর ভাবে জানায় ভুতো : দামি গয়নাগাটি পরে কত মেয়ে এসেছে পালা দেখতে।

ও বাবা! আমরা কোথা যাই?—হাপুস কান্নায় ভেঙে পড়ে দুই নারী।

কোনো অন্ধকারে লুকিয়ে পড়তে পারেন। ওই পথে গিয়ে কারও বাড়িতে যদি। দেখি আমি!—বলতে বলতে ভুতো অদৃশ্য।

ব্যস! ভুতোর দেখানো পথে দুটি মেয়ে ছুট দিল দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। মিস মন্দাকিনীর নিজের বাড়িতে একবার ডাকাত পড়ার সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা আছে। তাই তার আতঙ্কটাই বেশি।

ভুতো এবার পুরুষদের সাজঘরে উঁকি মারল। দরমার বড় ঘেরা টিনের চালার ঘরটি বেবাক ফাঁকা। কেউ নেই সেখানে। শুধু ছড়িয়ে আছে কিছু যাত্রার সাজপোশাক, অস্ত্রশস্ত্র। বাক্স-প্যাঁটরা, মেকআপের সরঞ্জাম ইত্যাদি। ভুতো ঘরের পিছনের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।

একটু পরেই খানিক দূরে ঝোপের আড়ালে থেকে বেরিয়ে এল একজন। চাদর মুড়ি দেওয়া কোনও পুরুষ। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। দ্রুত পায়ে এসে ভুতোর পাশ কাটিয়ে ঢুকল সাজঘরে। ভুতো দরজায় দাঁড়িয়ে রইল।

মিনিট চারেক বাদে সেই রহস্যময় ব্যক্তি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মিলিয়ে গেল আঁধারে। ভুতো এবার ছুটল আগুন দেখতে।

আগুনটা লেগেছে গোলকপতি সাহার দুটো বাড়ি পরে সরকার বাড়ির উঠোনে রাখা খড়ের গাদায়। হু-হু করে জ্বলছে আগুন। যে কোনো মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে আশপাশে। হতভম্ব দর্শকদের মধ্য দিয়ে ছুটে এসে গুটেই প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়ল আগুন নেভাতে। সে কাছেই গোয়াল থেকে গরুগুলো খুলে বের করে দিল। তারপর বাঁশ দিয়ে ধপ পিটিয়ে খড় সরিয়ে দিতে লাগল যাতে আগুন না ছড়ায়। চেঁচাতে লাগল জল জল!

গুটের দেখাদেখি অনেকেই এগিয়ে যায় আগুন নেভাতে। বালতি বালতি জল ঢালা হয় আগুনে। ক্রমে আয়ত্তে আসেন অগ্নিদেব। ধিকিধিকি জ্বলছে বটে খড় তবে আর ছড়াবার ভয় নেই।

কিন্তু আগুন লাগল কী ভাবে? এই নিয়ে আলোচনায় মুখর হয় জনতা।

সরকারদের বৃদ্ধ মুনিষ গোয়ারের দেখভালো করে। লোকটি রাতকানা। আবার গাঁজা খায় সন্ধ্যে থেকে। নির্ঘাৎ তার গাঁজার জ্বলন্ত কলকে খড়ের গাদায় পড়ে গিয়ে এই দুর্ঘটনা। অথবা জ্বলন্ত কুপি থেকে। যা কম দেখে লোকটা। মুনিষটিকে পাওয়া গেল বহু খোঁজাখুঁজির পর। আগুন দেখে আর বিপুল হট্টগোল শুনে নেশা সহসা চটে যেতে ও ভাবে যে ডাকাত পড়েছে। ভয়ে লুকিয়ে ছিল পাশের বাড়িতে।

গুটে হিরো বনে গেল। লোকে তারিফ করে বলল,—ছোঁড়াটার বদনাম আছে বটে। তবে আজ একটা কাজের কাজ করেছে।

আগুন নিভেছে। এবার জনতা ফিরে চলে। কেউ পুবপাড়ায়। কেউ দক্ষিণ পাড়ায়। খানিক—চ চ এবার পুবপাড়ায়। ওরা টফি দেবে বলেছে। দক্ষিণপাড়ার

গিয়েই রতিয়া হল্লা তোলে, লবেঞ্জুস তো পেয়ে গেছি।

রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ পুবপাড়ায় চন্দনা স্পোর্টিংয়ের আসরে কনসার্ট বেজে উঠল। খানিক বাদেই কনসার্ট বাজল নিউ চন্দনার আসরে।

মিনিট দশেক কনসার্ট বেজেই চন্দনার পালা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু নিউ চন্দনার অভিনয় শুরু হচ্ছে না কেন? আধঘণ্টার ওপর কনসার্ট শুনে লোকের কান ভালোাপালা।

কিন্তু শুরু করবে কী ভাবে? নিউ চন্দনার তখন শিয়রে সংক্রান্তি। প্রথমত বেশ খানিকটা সময় নষ্ট হচ্ছে শিল্পীদের মেক আপ ঠিকঠাক করতে। ধোঁয়ার কালিতে, ঠেলাঠেলির ধাক্কায় বেশিরভাগ শিল্পীর মেকআপের বারোটা বেজে গেছে। মুখে, গায়ের রং গেছে চটে। নকল চুল দাড়ি গোঁফ খুলে গেছে অনেকের। তাই নতুন করে সাজতে হচ্ছে। একেবারে কেঁচে গণ্ডুষ

এর ওপর নিউ চন্দনার আর এক বিপদ! সুধাকণ্ঠ গুরুদাস এবং মন্দাকিনী ও ছায়ারানীর হদিস মিলছে না।

গোছগাছ করে থতিয়ে বসে বেশ খানিক বাদে নিউ চন্দনার খেয়াল হয় যে ভাড়াটে বাইরের শিল্পীদের কয়েকজনের পাত্তা নেই। শুরু হয় ডাকাডাকি খোঁজাখুঁজি।

নটসূর্য নবকুমার কাছেই ছিলেন গা ঢাকা দিয়ে। ডাক শুনে বেরিয়ে এলেন পটল সমেত। ক্রমে আরও কয়েকজন এল। কিন্তু গুরুদাস মন্দাকিনী ও ছায়ারানি কই?

ভুতোর নেতৃত্বে সার্চ পার্টি বেরল। মন্দাকিনীদের ভুতো যে পথটা দেখিয়েছিল সেটা বাদ দিয়ে বহু ঘোরাঘুরি চিৎকারের পর অবশেষে তারা পৌঁছল ভুতোর নির্দেশিত পথে। ওই পথের ধারেই এক গোয়াল থেকে সাড়া মিলল মেয়েলি গলায়। দুটি মেয়ে লুকিয়ে ছিল ওই গোয়ালে। গরুগুলোর ফোঁসফোঁসানিতে এতক্ষণ কাঁটা হয়েছিল। তবু বেরুতে ভরসা পায়নি। কারণ ডাকাতের হাতে পড়ার চেয়ে গরুর গুঁতোও ভালো।

ভুতোদের পেয়ে মেয়ে দুটি আর এক দফা কেঁদে ভাসায়। তারা গোড়ায় বলল, আজ আর আসরেই নামবে না। প্রচুর সাধ্যসাধিতে মন গললেও বলে যে ভালো করে স্নান করে তবেই ফের মেকআপ নেবে। সত্যি বেচারিদের সারা গায়ে কাপড়ে গোবর ও চোনার বিকট গন্ধে ভুরভুর।

কিন্তু বিবেক সুধাকণ্ঠ কই?

তার খোঁজ মিলল আরও দূরে। একটা বাড়ির দাওয়ায় অন্ধকারে থামের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। টর্চের আলো পড়তে হাতজোড় করে কাতর স্বরে বলে ওঠেন, বাবা আমি গায়ক মানুষ।

—আহা ভয় পাচ্ছেন কেন? আমরা নিউ চন্দনার লোক। সুধাকণ্ঠ বেরিয়ে আসেন।