এক
বৈশাখের দুপুর। অশ্বত্থ গাছের গোড়া ঘিরে বাঁধানো প্রিয় বেদিটিতে বসেগাছে ঠেস দিয়ে একটা গল্পের বই পড়ছিল দেবু। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল চারপাশে। শিব এখনো এল না যে? তিনটে নাগাদ আসবে বলেছিল। ঝাঁ ঝাঁ রোদ। গ্রামের পথ এখন জনহীন। আজকেই একটা কিছু ঠিক করা চাই। ফাইনাল। বৃথা সময় বয়ে যাচ্ছে।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে দিন পনেরো আগে। দেবু শিব দুজনেই পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার খাটুনি আর কয়েকমাস নাগাড়ে পড়াশুনার একঘেয়েমি কাটাতে সপ্তাহখানেক তারা স্রেফ ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। তারপরই শুরু হয়েছে অস্থিরতা। দুজনে ছটফট করছে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছেয়। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? তাই নিয়ে আর কিছুতেই মতে মিলছে না দুজনের।
শিবের ইচ্ছে কলকাতা। বছর তিনেক আগে শিব একবার কলকাতা গিয়েছিল চার দিনের জন্য। ওই ক’টা দিনে ওই বিরাট শহরের কতটুকুই বা দেখা হয়েছে? বীরভূম জেলার ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে তাদের গ্রাম। মাঝেসাঝে দু চারটে উত্তেজনার স্বাদ মিললেও জীবন এখানে প্রায় নিস্তরঙ্গ। খবরের কাগজে প্রতিদিনই কলকাতা সম্বন্ধে কত্ত খবর থাকে। কত আকর্ষণের রসদ! শিবের এক মামা থাকেন কলকাতায়। দুই বন্ধু অনায়াসে সেখানে কাটাতে পারে কিছু দিন। মামাতো ভাই শিবেরই বয়সি। সেই তাদের ঘুরিয়ে দেখাবে।
কিন্তু দেবুর লক্ষ্য আরও দূরে। কাশী অর্থাৎ বারণসী। তাদের বেড়ানোর সুযোগ হয় কদাচিৎ। যদি বেরোতেই হয় দুরে যাই। লম্বা পাড়ি। বাংলার বাইরে পা দেওয়ার স্বাদ। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে যাব কেমন বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির রূপ, মানুষজনের ধরনধারণ, চেহারা। কলকাতা তো পরেও দেখা যাবে অনায়াসে। আর কাশীর সঙ্গে কলকাতার তুলনা হয়? ধুর ধুর। কলকাতা কাশীর কাছে বয়সে স্রেফ শিশু। মাত্র শতিনেক বছরের কলকাতা। আর কাশীর বয়স অন্তত কয়েক হাজার। দেবু কখনো যায়নি কাশী। তবে গল্প শুনেছে সেখানকার। দেবুর এক দাদু বাস করেন কাশীতে। এখানে এসেছিলেন গতবছর। তাঁর মুখে শুনেছে কাশীর বর্ণনা। মুগ্ধ হয়েছে।
বিচিত্র সে নগর। অতি প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র। শিবকে রাজি করাতেই হবে। কাশীর বিখ্যাত কুলপিমালাই,কচুরি আর পেঁড়ার টোপেই ঘায়েল হবে পেটুক শিব। এখন যত তাড়াতাড়ি বেরোনো যায়।
বেড়াতে যে যাবে তারা সে আভাস দু’জনেই দিয়ে রেখেছে বাড়িতে। তাদের বাড়িও অরাজি নয়। এখন শুধু গন্তব্যস্থানটির ঘোষণার অপেক্ষা।
দেখা গেল শিব আসছে।
শিব এসে দেবুর পাশে বসল। তার সদা হাসিহাসি মুখ কেমন গোমড়া। কিছু একটা ঘটেছে। দেবু আড়চোখে নজর রেখে পকেট থেকে হজমিগুলির শিশি বের করে শিবের দিকে এগিয়ে দিল। শিব যথারীতি কয়েকটা হজমিগুলি নিয়ে ফেলল মুখে, কিন্তু তার থমথমে ভাবটা কাটল না। ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে বিড় বিড় করল—আমার কি হবে না। হোপলেস।
দেবু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
শিব ফের বলে চলে,—আমি একটা অলস। ঘরকুনো। ভিতু। ও! ভাব দেখি, কী বিশাল এই জগৎ। আর কী বিচিত্র।
দেবু বলল, হুম্।
কিন্তু তার কতটুকু আমি দেখেছি? এই ভারতবর্ষের? এমনকী আমাদের আশপাশের মানুষজন প্রকৃতি। নাঃ আমিও বেরব। কেউ আটকাতে পারবে না আমায়।
দেবু বলল,—কী ব্যাপার?
শিব খানিক গুম মেরে থেকে বলল,—সকালে লাভপুরে গিছলাম একটা জিনিস কিনতে। ওখানে বলাই দাসকে দেখে এলাম।
বলাই দাস? মানে যে যুবকটি সাইকেলে ভারত পর্যটন করছে?
হ্যাঁ হ্যাঁ সেই।
বলাই দাস সম্পর্কে বসুমতী পত্রিকায় একটুকরো খবর বেরিয়েছিল। দেবু তা পড়েছে। সে মহা আগ্রহে জিজ্ঞেস করল, কেমন দেখলি? ওর মুখে শুনলি কিছু? ইস্ লাভপুরে এসেছে জানলে আমিও যেতাম।
শিব বলল,—লাভপুর স্পোর্টিংক্লাবের ছেলেরা ওকে সংবর্ধনা দিচ্ছিল। পাতলা ছোটখাটো চেহারা, নেহাতই সাধারণ দেখতে। আমাদের চেয়ে বছর চারপাঁচ মাত্র বড় হবে। দেখলে ভাবাই যায় না ওর ভেতরে এমন দুঃসাহস। কয়েকটা অভিজ্ঞতা যা বলল দুর্দান্ত। ছমাস ধরে অর্ধেক ইন্ডিয়া চষে ফেলেছে একা একা সাইকেলে চেপে। ভারতবর্ষ শেষ করে নাকি বিদেশে পাড়ি দেবে এমনই সাইকেলে। লাভপুরের ছেলেরা ওকে কিছু চাঁদা তুলে দিল পথ খরচা হিসেবে।
বলাই দাস কী করে? মানে পড়ে টড়ে না? অ্যাদ্দিন ধরে যে ঘুরছে?
বি.এ. পাশ করে বেরিয়ে পড়েছে। বলল, ভ্রমণের নেশা সাঙ্গ হলে তখন ঠিক করবে। হ্যাঁ, আমিও বেরিয়ে পড়ব। পরীক্ষার পর মাত্র মাস দুই হাতে, তাই সই। যদ্দুর ঘুরে আসা যায়। একটা শক্তপোক্ত সাইকেল চাই কেবল।
একাই যাবি?—জানতে চায় দেবু।
হুঁ তাই।—তারপর একটুক্ষণ ভেবে বলল : অবশ্য তুই যদি সঙ্গে আসিস বেশ হয়।
একটু থেমে হেসে ফের বলল, –লোকে আমাদের মানিক জোড় বলে। জোড় ভেঙে একা বেরুলে ঠিক জমবে না। তুই ভেবে দেখ। আমি কিন্তু রেডি হচ্ছি।
কদ্দূর যাবি?—জিজ্ঞেস করে দেবু।
বেরিয়ে তো পড়ি। দুর্গাপুর অবধি গিয়ে জিটি রোড ধরে যাব উত্তর ভারতে। রেজাল্ট বেরোনোর আগে অবধি যতটা ঘোরা যায়।
পরদিন বিকেলে দেবুর কাছে এসে ফুঁসে উঠল শিবু,—হোপলেস। এ জাতের কি হবে না। সাধে কি কবি বলেছেন—রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।
শিবের গনগনে মুখের দিকে চেয়ে দেবু বলল, হয়েছেটা কী?
জানিস যতরকমে পারে ব্যাগড়া দিচ্ছে বাড়িতে।
কী রকম?
জানতে চায় দেবু। অবিশ্যি শিবের বাড়িতে কী ঘটছে অনেকখানি তার জানা। কারণ আজ সকালেই শিবের ছোটকাকা এসে দেখা করেছিল দেবুর সঙ্গে।
শিবু বলল,—প্রথমে বলছে বি.এ. পরীক্ষা দিয়ে তারপর বেরুতে। কারণ নাকি বলাইদাস বি.এ. দিয়ে তবে বেরিয়েছে।
তা বটে সায় দেয় দেবু—বেশ, তখনই নাহয় বেরুনো যাবে।
মোটেই নয়।—হুংকার দিল শিব : আমি বলে দিয়েছি এখনই বেরব। কারণ মুড এসে গেছে। অতদিন অপেক্ষা করতে পারব না। যখন বুঝল আমায় রোখা যাবে না। তখন অন্য প্যাঁচ কষেছে। বলছে, সাইকেল দেবে না। বাড়িতে দু দুখানা সাইকেল—একটা বাবার, একট ছোটকাকার। দুজনেই স্রেফ না বলে দিয়েছে। নতুন সাইকেল কিনে দেবে না। মা ঠাকুমাকে কত জপালাম একটা সাইকেল কেনার পয়সা ধার দিতে। বড় হয়ে চাকরি করে শোধ করে দেব। কেউ রাজি নয়।
দেবু মাথা চুলকে বলল,—তা বটে, সাইকেল ছাড়া সাইকেলে ভ্ৰমণ-
তোর বাড়িতে কী বলছে?—জিজ্ঞেস করে শিব।
দেবু বলল, আমি তো বাড়িতে এ বিষয়ে এখনও কিছু বলিনি। তোর লাইন ক্লিয়ার হলে তখন জানাব আমি তো আর একা যাচ্ছি না, তুই গেলে সঙ্গে যাব।
না, না যাব আমরা। ঠিক যাব। পেছনোর প্রশ্নই না।—বিষম ভুরু কুঁচকে দিগন্তে বিলীন মেঠো পথের পানে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করল শিব : সাইকেল না জোটে আমরা তবে হেঁটেই বেরব। কত বিখ্যাত পায়ে হেঁটে সারা পৃথিবী প্রায় ঘুরেছেন। তাতে ক্লেশ আরও বেশি। বাড়িতে তাই জানিয়ে দিয়েছি।
হেঁটে!
দেবুর কথায় অপ্রসন্নতার সুর বাজতে শিব রেগে গিয়ে বলল, কেন পায়ে হেঁটে যেতে তোর আপত্তি আছে?
না। মানে একটু সময় বেশি লাগবে। তাই ভাবছিস ততটা ঘোরা যাবে না একচোটে।
তা হোক।
পায়ে হেঁটে তোর টার্গেট কদ্দুর?
কেন আগেরই মতো। এখান থেকে বাস রাস্তা ধরে লাভপুর কীর্ণাহার নানুর বোলপুর ইসলামপুর পানাগড় হয়ে দুর্গাপুর। দুর্গাপুর থেকে জি.টি রোড যতদূর যাওয়া যায়। পারি তো দিল্লি অবধি।
একটু ভেবে নিয়ে দেবু বলল, আমি বলি আমরা বরং প্রথমে সোজা কলকাতা যাই। কলকাতায় দুদিন ঘুরে দেখব। মানে পায়ে হেঁটে। তারপর ঠিক করা যাবে কোন্ দিকে যাওয়া যায়।
কলকাতা?
কলকাতার নামে শিবের মনটা একটু নরম হয়। নয়, এক ঢিলে দুই পাখি বধ। সে সম্মতি জানায়- তাই হবে। কবে বেরুনো যায় বল?
দেবু বলল,—হুট করে তো আর বেরুনো যাবে না! জোগাড়যন্ত্র চাই। একটা কাজ কর। স্কুল আর গ্রামের লাইব্রেরি থেকে পর্যটকদের স্মৃতিকথা যা পাওয়া যায় সব পড়ে ফেলি। সঙ্গে কী কী নেওয়া উচিত। কী ভাবে চলা উচিত তার একটা আইডিয়াও পাওয়া যাবে।
বইটই পড়া শিবের ধাতে নেই। গল্পের বই যা মাঝে সাঝে পড়ে সবই রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি। সে হাতেপায়ে ডানপিটে এবং নামকরা খেলোয়াড়। দেবু ভালো ছাত্র, বইয়ের পোকা। তাই শিব বল,—ওসব তুই পড়ে নে। তবে তাড়াতাড়ি। চটপট বেরুতে হবে।
পর্যটকদের স্মৃতিকথা পড়ে চারদিন কাটিয়ে দিয়েছে দেবু। শিব নাগাড়ে তাড়া লাগাচ্ছে, ব্যস, ব্যস, ঢের হয়েছে, এবার লিস্ট করে ফেল কী কী নিতে হবে-
পঞ্চমদিনে লিস্ট করল দেবু।
ছুরি, দড়ি, টিনের থালা গেলাস, কিছু জামাকাপড়, ওয়াটার বটল্ ইত্যাদি নানান খুঁটিনাটি। লিস্টটায় একবার চোখ বুলিয়ে শিব বলল, এসব একদিনেই জোগাড় হয়ে যাবে। কিন্তু বিছানা?
মশারি তোশক ঘাড়ে করে হাঁটব কী ভাবে? স্রেফ হাভ্যারস্যাকে যতটুকু আঁটে। ফু দিয়ে ফোলানো রবারের বালিশ নেব। আর একটা পাতলা চাদর, মুড়ি দিয়ে শোব মশার হাত থেকে রক্ষা পেতে। যেখানে রাতে থাকব, একটা শতরঞ্চি বা মাদুর জোগাড় করে নেব পেতে শুতে। ভালো হোটেলে তো আর থাকা চলবে না বেশি। গাঁয়েগঞ্জে কোনো বারান্দায় বা বড়জোড় কোনো েঘরের মেঝেতে শুতে হবে। আজ থেকে দুটো জিনিস প্র্যাকটিস করতে হবে—রোজ কয়েক মাইল হন্টন এবং বিনা মশারিতে শতরঞ্চি পেতে রবারের বালিশ মাথায় দিয়ে শোয়া। কদিন অভ্যেস করে না নিলে বেরিয়ে খুব অসুবিধা হবে। পুরু সোলের ভালো কেডস্ জুতো চাই, নতুন একজোড়া। আছে?
উঁহু।—শিব মাথা নাড়ে : সে ম্যানেজ হয়ে যাবে। আচ্ছা টাকাকড়ি কি নেব সঙ্গে?
বেশি নয়। প্রত্যেকে মাত্র কুড়ি টাকা। দু’তিন দিনের খরচ। বেশি পয়সা সঙ্গে থাকলে চোর-ছ্যাচড়ের পাল্লায় পড়ার রিস্ক। আমাদের মতন পর্যটকরা নামমাত্র টাকা সঙ্গে রাখে। পথে যেখানে থাকব সেখানকার লোকের দয়ায় ফ্রি থাকা খাওয়া। আর যদি কিছু নগদ সাহায্য মেলে এই ভরসা। বলাই দাসের কথা যা শুনলি ওই টেক্নিক। যাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে বক্তৃতা করব। তাতে লোকে খুশি হয়ে হয়তো সাহায্য করবে।
শিব ইতস্তত করে বলে,—বলাই দাস তো অনেক ঘুরেছে। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। তাই সবাই শুনল। মাত্র ক’দিন হেঁটে আমরা আর কী এমন বলতে পারব?
সে ঠিক হয়ে যাবে—আশ্বাস দেয় দেবু : আপাতত কাল থেকে প্র্যাকটিস শুরু করে দে।
কদিন প্র্যাকটিস?
যদ্দিন না ব্যাপারগুলো সড়গড় হয়। মানে মশারি ছাড়া ঘুম এবং একনাগাড়ে হাঁটা।
