সাত
নিউ চন্দনার পালা যখন ফের আরম্ভ হল তখন সেখানে দর্শক প্রায় অর্ধেক সাবাড় হয়ে গেছে। অপেক্ষা করে করে বিরক্ত হয়ে বহুলোক চলে গেছে পুবপাড়ার পালা দেখতে।
রতিয়া কিন্তু চন্দনা স্পোর্টিংয়ের আসর থেকে আবার টুক করে উঠে ফের এসে নিউ চন্দনায় জাঁকিয়ে বসেছে মঞ্চের সামনে। সঙ্গে গুটিকয় বাছা বাছা হাড়-বজ্জাত সাথী। দেবুও রয়েছে নিউ চন্দনার আসরে। পিছন দিকে ভিড়ের মাঝে।
সেকেন্ড সিনেই এক বিপত্তি।
ভীম দুর্যোধনের মধ্যে আস্ফালন শুরু হয়েছে গদা হাতে। হঠাৎ ভীমের গদার গায়ে কাপড়ের মোড়কটা খুলে গেল জায়গায় জায়গায়।
গদাটা তৈরি হয়েছিল লম্বা একখণ্ড হালকা গোল কাঠের ওপর পুরু করে খড় জড়িয়ে। সুতলি দিয়ে খড় বাঁধা ছিল। তার ওপর জড়ানো রঙিন কাপড়। কাপড়টা সেলাই করা ছিল যাতে খুলে না যায়।
ভীমবেশী হরলাল সবেগে সগর্জনে বারকয়েক গদা ঘোরাতেই কাপড়ের মোড়ক খুলতে লাগল। শেষমেশ কালো কাপড়ের লম্বা ফালিটা আলগা হয়ে ঝুলতে লাগল। ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়ল ভিতরের খড়।
ব্যাপার দেখে ভীম ও দুর্যোধন দু’জনেই থ। মায় দর্শকরা অবধি। হরলাল বুদ্ধিতে কিঞ্চিৎ খাটো। তার হঠাৎ সন্দেহ হল, এটা নরাধম দুর্যোধনের চক্রান্ত। সে হুংকার ছেড়ে নিজের খড় বের হওয়া গদাটা কেড়ে নিয়ে, খপ্ করে দুর্যোধনের হাত থেকে তার গদাটা ফেলে দিয়ে দুর্যোধনকেই ঘা কতক কষিয়ে দিল তাই দিয়ে।
খেপে গিয়ে দুর্যোধন জাপটে ধরল ভীমকে। সে এক হুলস্থুল কাণ্ড।
অনঙ্গবাবু ছুটে এসে দুজনকে ধমকে ছাড়িয়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন সাজঘরে। উল্লসিত দর্শকদের করতালিতে তখন আকাশ ফাটছে।
পরক্ষণেই আবার দুর্যোগ।
অর্জুনরূপী নটসূর্য নবকুমার তির লাগিয়ে গাণ্ডীবে টান দিতেই কট্ করে ছিলা গেল ছিঁড়ে। অর্জুন বেইজ্জত। নটসূর্য দৃশ্যটা কোনো রকমে ম্যানেজ করে গ্রিনরুমে ফিরে ফেটে পড়লেন রাগে,—ছি ছি পচা দড়ি দিয়ে ছিলা বানিয়েছেন। সিন মার্ডার।
গোলকপতি ভালো ঝাড়লেন ড্রেস মেকারদের ওপর। সবার মুখ চুন।
গাণ্ডীবে ফের শক্ত দড়ির ছিলা পরানো হল।
দুর্ভাগ্যের এখানেই শেষ নয়। আবার ছিলা ছিঁড়ল দ্রোণাচার্যের ধনুকের। সহদেবের ধনুকের বাঁশটাই মট্ করে ভেঙে গেল টান দিতে। একী ব্যাপার! ভৌতিক কাণ্ড নাকি?
দর্শক বেজায় মজা পেয়ে গেছে। যুদ্ধের সিন এলেই তারা চেঁচায়,
—আহা, টেনো না। ছিঁড়ে যাবে। ভেঙে যাবে!
অভিনেতারা এমন নার্ভাস হয়ে পড়ল যে তারা আর ধনুকে বাণ জুড়ে টানার চেষ্টাই করে না।
যুধিষ্ঠিরবেশী গোলকপতি তরবারির হাতল ধরতেই তার এমন তালু চুলকোতে লাগল যে তিনি সমানে পোশাকে হাত ঘসতে লাগলেন। যেন হাতে বিছুটি লেগেছে। তার সংলাপ গুলিয়ে গেল। সিন শেষে সাজঘরে গিয়ে ডান হাতের তালুতে তেল লাগিয়ে তবে কিছুটা স্বস্তি মেলে। গোলকপতি ভয়ে আর ওই তরবারি ছুঁলেন না। অন্য, এক সৈনিকেরটা ধার করলেন।
দ্রৌপদী মন্দাকিনীকে রতিয়ার দল সমানে টিপ্পনি কাটে,
—শুনতে পাচ্ছি না। ঘুরেফিরে ঘুরেফিরে।
ফলে ঘাবড়ে গিয়ে দ্রৌপদী কেবলই মঞ্চে চক্কর খেতে থাকে। ডায়ালগ আরও শোনা যায় না। পার্টের দফারফা। সাজঘরে এসে রাখে দুঃখে কেঁদে ফেলে মন্দাকিনী।
গুরুদাসেরও নিস্তার নেই। সবে প্রথম গানটা ধরেছেন। ঠুক করে কী একটা বেশ জোরে এসে লাগল তাঁর গালে। চমকে বিবেক গান থামায়। অবশ্য তখুনি ধরে। কিন্তু তাল কেটে গেল।
মিসাইলটা একটি ছোলা ভাজা। রতিয়া দু আঙুলে লুকিয়ে ছুড়েছে।
দ্বিতীয় গানের সময় আর একটি ছোলা ভাজা আঘাত করল গুরুদাসের নাকে। আবার গান থামে ও তাল কাটে।
রতিয়া পরম বিরক্তিতে বিড়বিড় করে, —ধুত্তেরি। টিপ একদম গেছে। একটাও হাঁ—য়ে ঢোকাতে পারছি না।
সুধাকণ্ঠের গান মাথায় উঠল। উনি বুঝলেন যে কেউ কিছু ছোট্ট মতন ছুড়ছে তাক করে। ভয়ে আর তিনি কিছুতেই মঞ্চের সামনের দিকে আসেন না। গলাও খোলে না উৎকণ্ঠায়।
সমস্ত নামী শিল্পীদের মুড অফ্ হয়ে গেল। কোনো রকমে দায়সারা পার্ট বলে স্টেজ ছেড়ে পালিয়ে আসতে পারলে যেন বাঁচে তারা।
এটা কি যাত্রা হচ্ছে? বোগাস্! — দেবুর সজোর মন্তব্য শোনা যায় : স্রেফ সময় নষ্ট। যাই পুব পাড়ায় দেখিগে।
একদল দর্শকও দেবুর সঙ্গ ধরল পুব পাড়ার দিকে।
খানিক বাদেই ‘দুত্তেরি’ বলে উঠে পড়ল রতিয়া তার দলবলসহ,
—চ চ পুব পাড়ায় দেখিগে চ। রতিয়ার পিছু পিছু আরও কিছু লোক খসে পড়ল আসর থেকে। চলল পুব পাড়ায়।
এই ভাবে মাঝেমাঝেই কিছু কিছু দর্শক খসে পড়তে লাগল দক্ষিণ থেকে পুবে।
চন্দনা স্পোর্টিংয়ের যাত্রা ভাঙল রাত আড়াইটে নাগাদ। নিউ চন্দনার পালা ভাঙে আরও ঘণ্টাখানেক বাদে। তখন ওই আসরের হাল অতি করুণ। দক্ষিণ পাড়ার কিছু লোক এবং শিল্পীদের আত্মীয়-স্বজন ছাড়া সেখানে তখন বাইরের লোক প্রায়ই নেই। অনেকে আবার ফাঁকা শতরঞ্চি পেয়ে আরামে শুয়ে ঘুমুচ্ছে।
.
পরদিন সন্ধ্যায়।
সাধুচরণ নিজের ঘরের সামনে একা বসে কীর্তন গাইছিল দোতারা বাজিয়ে। অন্ধকার ফুঁড়ে একটি লম্বা রোগা মূর্তি সড়াৎ করে তার পায়ে এসে পড়ল সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতে।
চমকে তাকিয়ে সাধু বলল, —আরে গুটে, ওঠ ওঠ।
গুটে উঠে বসে হাতজোড় করে বলল, —উঃ গুরু! কাল কি খেলটাই দেখালে জবাব নেই। আহা কী সূক্ষ্ম কারুকাজ!
সাধুচরণ গুটের উচ্ছ্বাসে কোনো ভাবান্তর না দেখিয়ে বলল :
তোর কাজটিও উত্তম হয়েছে। ঠিক সময়ে আগুনটা লাগিয়েছিলি। তোকে সন্দেহ করেনি তো?
না গুরু। কেউ না। বরং সরকারবাবু আজ আমায় বকশিশ করছেন।—গুটে মিচকি হাসে। তারপর বলে : গুরু একটি নিবেদন আছে।
—কী?
—তোমার ওই বিদ্যে একটু দান কর আমায়। আহা কী ভাবে কেটে কমজোরী করে রাখলে অমন সরু দড়ির ছিলে আর মোটা কঞ্চির ধনু। দু’তিন টান সহ্য করেই পটাং। আমি লক্ষ করেছি। সবকটা স্রেফ এক টানেই যায়নি। কী মাপা কাজ! আর গদাটা উ:!
—সাধু খুশি মুখে বলে—অনেক দিন আগে শেখা বিদ্যে রে। রাজাবাজারের লালু ওস্তাদ নিজে হাতে ধরে শিখিয়েছিল। সেই যৌবনে। ব্লেড আর ছুরির কারিকুরি। তবে এ বিদ্যে তো তোকে আমি দিতে পারব না। ওসব পথ ছেড়ে দিয়েছি।
প্রায় একই সময়ে। দেবুর ঘরে এসে শিব বলল,—তুই ঠিকই বলেছিলি, ওদেরটা জমবে না। শুনলাম যে ওদেরটা যা তা হয়েছে। লোক উঠে চলে গেছে। আমাদেরটায় কিন্তু যা ভিড় হয়েছিল। দারুণ জমেছিল পালা। আমাদেরটা পরে করে ভালোই হয়েছে। নইলে আগুনের জন্যে ভেস্তে যেত মাঝপথে।
দেবু মিচকে হেসে শুধু বলল, —হুঁ হুঁ বলেছিলাম না। ডরো মৎ। সব ঠিক হো জায়েগা। দেবুর হাবভাবে শিবের কেমন সন্দেহ হয় যে নিউ চন্দনার বিড়ম্বনার পিছনে হয়তো দেবুর হাত আছে। কথাটা সে তুলবে ভাবছে এমন সময় নিঃসাড়ে যে ঘরে ঢুকল তাকে দেখেই তার পিত্তি জ্বলে গেল। ভুতো।
ভুতো দেবুকে জাপটে ধরে হি হি করে হেসে বলে উঠল, ওঃ তোর বুদ্ধি আছে বটে। সবকটা প্যাঁচ এমন খেটে যাবে ভাবতেই পারিনি।
দেবু শিবের দিকে ফিরে বলল, —কীরে অমন স্ট্যাচু মেরে গেলি যে! ভুতোকে দেখে? তুই ঠিকই বলেছিলি, ওটা ঘরের শত্রু বিভীষণ। তবে কাদের জানিস? নিউ চন্দনার।
মানে?—শিব হতভম্ব।
—আরে ওর জন্যেই তো কাত হল নিউ চন্দনা।
কীরকম? —শিব থৈ পায় না।
—সে অনেক বৃত্তান্ত। পরে বলব সব। হ্যাঁরে ভুতো, গোলক সাহার খবর কী?
ফায়ার হয়ে গেছে। জানায় ভুতো : এতগুলো টাকা গচ্চা গেল। বলছিল যে থানায় ডায়েরি করবে। অঘটনগুলো সব নাকি চন্দনা স্পোর্টিংয়ের ষড়যন্ত্র। অন্যরা ওকে বলে কয়ে ঠেকিয়েছে। প্রমাণ কী? মাঝ থেকে আরও কেলেংকারি বাড়বে। ঢোলকপতি ঘোষণা করেছেন যে কালী পুজোর পরই তিনি এই গ্রাম ছাড়বেন। এখানে আর থাকবেন না। এ গাঁয়ের নাকি কিস্সু হবে না।
তা বটে! —গম্ভীর বদনে সায় দেয় দেবু।
তারপর তিন বন্ধুই হেসে গড়িয়ে পরে।
[১৯৯১, কিশোর ভারতী শারদীয়া ]
