উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

ফ্যাসাদ – ৪

চার

দুজনে কীর্ণাহার পৌঁছল সকাল দশটা নাগাদ। হাঁটতে খাসা লাগছে। দুধারে দিগন্তবিস্তৃত চাষের খেত। তখনো চাষের মরশুম তেমন শুরু হয়নি। শুধু যেখানে সেচের সুবিধে তেমনি অল্প কিছু জায়গায় ধান ফলেছে। এবড়ো-খেবড়ো পাঁশুটে রঙের মাঠের মাঝে কোথাও কোথাও সবুজের ছোপ। লম্বা লম্বা পায়ে বকেরা তীক্ষ্ণ নজর ফেলে ঘুরছে খেতের পাশে, কেউ বা আলের ওপর এক ঠ্যাং তুলে যেন ধ্যানমগ্ন।

যেতে যেতে ছোট গ্রাম পড়েছে কয়েকটি। থামেনি তারা। কোথাও গাছের ছায়ায় বসে একটু জিরিয়ে নিয়েছে।

কীর্ণাহার ছোট গঞ্জশহর। দোকানপাট অনেক। খিদে পেয়েছিল তাই দেবুরা এখানে কিঞ্চিৎ চা-টা খেয়ে নেবে ভাবল। একটা সস্তা দরের খাবারের দোকানে ঢুকল তারা।

দোকানের ভিতরে এবং বাইরে চার পাঁচটি কাঠের বেঞ্চি পাতা। দোকানের বাইরে বেঞ্চে বসল দুজনে। সেখানে তখন আরও পাঁচ ছয় খদ্দের। দোকানের শো-কেসে সাজানো রয়েছে জেলিপি জিভেগজা মন্ডা ইত্যাদি। আবার চা মুড়িরও ব্যবস্থা আছে।

শিবের লোভী দৃষ্টি মিষ্টিগুলোর ওপর ঘুরছে দেখে দেবু বলল,—খাওয়া একটু কমে সারতে হবেরে। টুপিটা না কিনলে চলছে না।

ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল শিব।

বৈশাখের চড়া রোদে দুপুরে অন্তত যে মাথায় টুপি থাকলে আরাম লাগে এই সত্যটি বেরনোর সময় তাদের খেয়াল হয়নি। তাই কীর্ণ হারে একটা করে কাপড়ের কাউন্টিক্যাপ জাতীয় টুপি কিনে নেবে ঠিক করেছে। অতএব প্রত্যেকের জন্য এক ঠোঙা মুড়ি এবং চারটে জিলিপি অর্ডার হল।

শিবদের সাজগোজ, পিঠে হ্যাভারস্যাক, চালচলন অন্য খদ্দেরদের কৌতূহল জাগিয়েছিল। একজন থাকতে না পেরে প্রশ্ন করল,—আপনারা আসছেন কোত্থেকে?

সুযোগটা খুঁজছিল দেবু। সে চটপট বলে গেল নিজেদের পরিচয় এবং দেশ ভ্রমণের কথা।

প্রশ্ন হয়,—অ্যাঁ! পায়ে হেঁটে! কদ্দুর যাবে ভাই? দিল্লি অবধি ইচ্ছে আছে।—উত্তর দেয় দেবু : মাস খানেকে যতদূর যেতে পারি।

দেবু কলকাতার কথা তুলল না বলে শিব অবাক হয়। বুঝল দূরত্বটা বাড়িয়ে দিয়ে ভ্রমণের মর্যাদা বাড়ানোর কায়দা। দোকানি এবং অন্য খরিদ্দারগুলি তখন গল্প জুড়ল। বিষয়—কে কতদূর পায়ে হেঁটে ঘুরেছে।

দেবুর ইচ্ছে ছিল এঁদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে কিছু পথ খরচ জোগাড় করে। কিন্তু বুঝল সে আশা নেই। সে জিজ্ঞেস করল,—এখানে কোনো ক্লাব আছে ছেলেদের?

ক্লাব! আছে বইকি। পুজোটুজো করে।

কোথায়?

দোকানের সবাই মাথা নাড়ল,—ঠিকানা আবার কিছু আছে নাকি? বাজারের কাছে বসে ছেলেগুলো আড্ডা দেয় দেখেছি।

দেবুরা কিঞ্চিৎ নিরাশ হয়ে পথে বেরল। দেবু বলল,—ক্লাব-টাবের খোঁজ করে দরকার নেই। টুপিটা কিনে হাঁটা দিই।

দুজনে এদিক সেদিক দেখতে দেখতে চলেছে। ‘এই যে ভায়া’– ডাক শুনে তারা ফিরে দেখল একটি মাঝবয়সি লোক তাদের ডাকছে। লোকটি মাঝারি লম্বা। রোগা। শ্যামবর্ণ। পরনে আধময়লা ধুতি হাফহাতা শার্ট। পায়ে রবারের চটি। এই লোকটিকে তারা খাবার দোকানে দেখেছিল। চুপচাপ বসেছিল পিছনে।

লোকটি হাসি হাসি মুখে বলল, — তোমরা ভাই থাকছ আজ এখানে?

দেবু বলল,—নাঃ। ফের হাঁটব।

দুপুরের খাওয়া দাওয়া? -জানতে চায় লোকটি।

এই বারোটা একটা নাগাদ থামবে কোথায়ও, সেখানেই খেয়ে নেব যাহোক।

এত লম্বা ট্যুরে, যথেষ্ট টাকাকড়ি নিয়ে বেরুতে হয়েছে, না?

টাকাকড়ি সামান্যই নিয়েছি।—জানায় দেবু : দু-তিন দিনের খাওয়া খরচ, ব্যস।

তাহলে চলবে কী উপায়ে?–লোকটি অবাক!

পথে যেখানে সম্ভব অন্যদের অতিথি হব।—বোঝায় দেবু : তাঁরা যা দেবেন খাব, যেখানে রাত কাটাতে শুতে দেবেন, শোব। মানে ফ্রিতে যতটা জোটে। অনেক টাকাকড়ি নিয়ে আরামে দেশ দেখা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। দেখলেন না কত সস্তায় টিফিন সারলাম। পকেট প্রায় খালি যে।

তা বটে তা বটে।—লোকটি ঘাড় নাড়ে : এ একটা নতুন অভিজ্ঞতা বটে। কিন্তু এমন চেয়েচিত্তে ভিক্ষে করে কি আর বেশি দূর যাওয়া যাবে?

হয়ে যাবে।—আশ্বাস দেয় দেবু : লোকে ঠিক সাহায্য করবে দরকারমতো। তাছাড়া শুধুমাত্র ভিক্ষে কেন, পথে কত ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা হচ্ছে, সেই সব শুনিয়ে বক্তৃতা দিয়ে লোককে আনন্দ দেব। এইভাবে আমাদের ঋণ খানিকটা শোধ হবে। কত বিখ্যাত পর্যটক এইভাবে সারা দুনিয়া ঘুরেছেন।

বটে বটে, তেমন অভিজ্ঞতা কিছু হয়েছে নাকি?—লোকটির চোখ চকচক করে।

তা হয়েছে!—গতকাল ব্রজখুড়োর খপ্পরে পড়ার ঘটনা রসিয়ে বলে দেবু। শুনে লোকটির কী হাসি।

হাসির পর্ব শেষ হলে লোকটি বলল,—পথে যেতে যেতে কিছু কাজকম্ম করে ন্যায্য উপায়ে কিছু পথখরচা রোজগারে তোমাদের আপত্তি আছে নাকি?

দেবু বলল,—বিন্দুমাত্র নেই। তবে বেশিদিন কোথাও আটকে থাকতে চাই না।

লোকটি মুখ কুঁচকে একটু ভেবে বলল,—ঠিক আছে, এসো আমার সঙ্গে। দেখি সেরকম কিছু ব্যবস্থা করতে পারি কিনা। হ্যাঁ, ভাই আমার পরিচয়টা দিই। অধমের নাম গৌড়হরি দে।

শিব দেবুও নমস্কার করে নিজেদের নাম বলল।

এক জায়গায় গৌড়হরি থমকে গিয়ে বলল,—তোমরা এখানে একটু অপেক্ষা কর, আসচি আমি।

সে সামনে একতলা বাড়িতে ঢুকে গেল। প্রায় মিনিট পনেরো কেটে যায়। পথে দাঁড়িয়ে দেবুরা ভাবে, কী ব্যাপার?

গৌড়হরি বেরিয়ে এল। কাছে এসেই দেবু শিবের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে খুশির সুরে বলল,—তোমাদের কিঞ্চিৎ সুবিধের ব্যবস্থা করে ফেলেছি। বেশ বুঝেশুনে দরদস্তুর করবে। চানা দাসু মহা কিপটে।

হতভম্ব শিবুদের নিয়ে সে ঢুকল যে বাড়ি থেকে সে এখুনি বেরিয়ে এসেছে।

ঢুকেই একখানা বড় ঘর। সেখানে দেয়াল ঘেঁষে চৌকিতে বসে এক ভদ্রলোক। পরনে তাঁর হাতাওলা গেঞ্জি ও ধুতি। স্থূলকায়। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। হাঁড়িপানা মুখখানায় একজোড়া মোটা পাকানো গোঁফ। তার সামনে একটা খোলা খেড়োর খাতা। মনে হয় লোকটি হিসেব কষছিলেন।

ঘরে অনেকগুলি পুরনো কাঠের চেয়ার। একধারে কাচের পাল্লা দেওয়া আলমারিতে বিস্তর খাতাপত্তর ক্যাশমেমো। মেঝেতে কয়েকটা বড় বড় ঢাকা দেওয়া ঝুড়ি এবং পিচবোর্ডের বাক্স। গোটা ঘরে কেমন জানি তেল মেশানো ভাজা মশলার বিটকেল গন্ধ ভাসছে। চৌকিতে বসা লোকটি লালচে চোখে দেবুদের একপ্রস্থ দেখে নিয়ে চেয়ার দেখিয়ে বললেন—বসুন।

দেবু শিব বসল সামনে। গৌড়হরি পাশে দাঁড়িয়ে বলে উঠল লোকটিকে দেখিয়ে,– ইনি হচ্ছেন বিখ্যাত কুড়মুড় চানাচুর কোম্পানির মালিক শ্রীদাসরথি দাস। আর এই দুজনের কথা তো বলেছি। বিখ্যাত পর্যটক।

শিবদের মনে পড়ল, এই দাসরথি দাসকে তারা দেখেছিল খাবার দোকানে। তারা চা মুড়ি শেষ করার আগেই ইনি উঠে যান।

দু পক্ষে নমস্কার বিনিময় হল। দাসমশাই গোঁফ চোমড়াতে চোমড়াতে হিসেবের খাতার ওপর চোখ রেখে কিছু ভাবছেন। দেবুদের মাথাতেই আসছে না তাদের এখানে হাজির করার কারণ।

অবশেষে দাসরথি কথা বললেন গম্ভীর চালে,—আপনারা যাচ্ছেন পায়ে হেঁটে?

হুঁ। সায় দেয় দেবু।

কোন্ পথে?

নানুর বোলপুর পানাগড় হয়ে দিল্লি অবধি। অবশ্য কলকাতাও ঘুরে যেতে পারি।

উত্তম। আমার একটি প্রস্তাব আছে।—জানালেন দাসমশাই : পথে যেতে যেতে আপনারা যদি কুড়মুড় চানাচুরের কিছু পাবলিসিটি দেন তাহলে কোম্পানি আপনাদের কিছু পারিশ্রমিক দিতে প্রস্তুত।

কী রকম?—শিবের প্রশ্ন।

কোনো খাটুনির ব্যাপার নয়। শুধু আপনাদের ব্যাগের গায়ে কুড়মুড়ের বিজ্ঞাপনের একখানা করে হ্যান্ডবিল সেঁটে দেব। আর শ’দুই হ্যান্ডবিল দেব, পথে যেতে যেতে জায়গা মতো বিলোবেন। এর বদলে আপনারা পাবেন প্রত্যেকে দশ প্যাকেট স্পেশাল সাইজ কুড়মুড়।

না না।—দেবু মাথা নাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গৌড়হরি আরও বেগে ঘাড় নেড়ে বলে উঠল,—কী বলছেন দাসমশাই। এটা কি একটা ন্যায্য লেনদেন হল? অতগুলো চানাচুরের প্যাকেট নিয়ে ওরা করবেটা কী? দু প্যাকেট কুড়মুড় খেলেই তো কাত, আর হাঁটতে হবে না। আপনি নগদে আসুন।

দাসরথি খাপ্পা হয়ে ধমকালেন,—তুমি চুপ কর গৌড়হরি। সবাই তোমার মতো পেটরোগা নয়। ঠিকআছে, পাঁচ টাকা নগদ আর পাঁচ প্যাকেট কুড়মুড় দিতে পারি।

দেবু উঠে দাঁড়াল,—মাপ করবেন, আমরা এসব পারব না।

গৌড়হরি খপ্ করে দেবুর জামা খিমচে ধরে বলল, আহা উত্তেজিত নয়। দরাদরি ব্যবসার দস্তুর। দাসমশাই নগদটা দশ করুন। বুঝচেন, কী দারুণ প্রচার হবে কুড়মুড়ের। একবারে কলকাতা দিল্লি অবধি। আপনার ফ্যাক্টরিতে তখন তিনজনের বদলে পনেরোজন ওয়ার্কার নিয়ে সামলাতে পারবেন না।

মাপ করবেন, আমাদের দ্বারা এসব হবে না। চ শিব। শিবকে নিয়ে দেবু সবেগে বেরিয়ে পড়ল কুড়মুড়ের আপিস থেকে।

হনহন করে চলেছে দুজনে। পিছন থেকে গৌড়হরির ডাক শোনা গেল,—আরে ভাই রসো রসো।

দেবু ফিরে দাঁড়িয়ে চটে বলল,—এরকম ঝামেলা জোটাবার মানে?

ঝামেলা! ঝামেলা কেন?—গৌড়হরি অবাক। তোমাদের উপকার করতে চাইলাম। তোমাদের দেশ ভ্রমণে বাধা পড়ছে না অথচ কিছু রোজগার হয়ে যেত।

শিব বলল,—হ্যাঁ, আর লোকে ভাবত আমার চুড়মুড়ের সেলম্যান।

গৌড়হরি বলল,—আহা বিজ্ঞাপন দেনেওয়ালাদের থেকে কিছু খরচ তুলে নিয়ে সৎকাজে লাগালে দোষের কী? বিজ্ঞাপনের টাকায় কত আচ্ছা আচ্ছা ফাংশান হয়, ম্যাচ খেলা হয়। তাতে কি লোক খারাপ বলে? তাছাড়া কুড়মুড়ের হ্যান্ডবিল সেঁটে বেশি দূর যাবেন কেন? খানিক দূর গিয়ে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে দিলে কে জানছে। আর হ্যান্ডবিল রইল ব্যাগে। চায়ের জল গরম করবে।

দেবু ফের ঘাড় নাড়ে,– নাঃ দরকার নেই।

গৌড়হরি হতাশভাবে বলল,—এই জন্যেই বলে বাঙালিদের ব্যবসা বুদ্ধি নেই। তা যাকগে, বাদ দাও কুড়মুড়। তোমরা তো এখন নানুরের দিকে যাবে। ওই পথে আমার গ্রাম নিশাপুর। মাইল চারেক দুরে। আমার বাড়িতে আজ দুপুরে তোমাদের নেমন্তন্ন। আমি বাবা তোমাদের সঙ্গে হাঁটতে পারব না। আমি চলে যাচ্ছি বাসে। তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করব বাস রাস্তার ধারে। গরিবের ঘরে দুমুঠো যা পারি খাওয়াব। ব্রজখুড়োর গপ্পো শুনে ভারি আনন্দ পেয়েছি। তারই ঋণ শোধ বলতে পার।

গৌড়হরি বিদায় নিল। টুপি কিনে শিব দেবু রওনা দেয় নানুরের দিকে।

শিব বলল,—কুড়মুড়ের অফারটা অ্যাকসেপ্ট করলে মন্দ হত না। বেশ চানাচুর খেতে খেতে যাওয়া যেত। ওঃ গৌড়হরির প্যাঁচখানা দারুণ।

দেবু মিচকে হেসে বলল,—শুনলি তো কুড়মুড়ের গুণ। পথে পৈটিক গোলযোগ ঘটলে তখন কী অবস্থা হত?

পথের ধারে এক পুকুরে দেবুরা স্নান করে নিল।

একটি লোক মাঠ থেকে এসে রাস্তায় উঠল। শিব জিজ্ঞেস করে তাকে,—দাদা নিশাপুর আর কতদূর?

ওই সামনের গাঁ।—উত্তর হয় : নিশাপুরে যাবেন? কার বাড়ি?

গৌড়হরি দে।

কেন?

ওঁর বাড়িতে আজ দুপুরে আমাদের নেমন্তন্ন।

লোকটি ভুরু কুঁচকে বলে,—আপনারা কোত্থেকে আসছেন?

দেবু সংক্ষেপে নিজেদের পরিচয় দেয়।

লোকটি ব্যাঁকা হেসে বলল,—নেমন্তন্ন! বটে বটে। গৌড়হরির নিজের খাওয়া জোটে না, আবার নেমন্তন্ন করে লোক খাওয়াবে! তা খাওয়া-খরচ কী রকম নেবে বলেছে কিছু?

খাওয়া খরচ কেন?—দেবু অবাক।

লোকটি তেমনি সুরে বলল,—আপনারা ছেলেমানুষ, তাই সাবধান করে দিচ্ছি। গৌড়হরি মানুষ সুবিধের নয়। লোক ঠকিয়ে খায়। ওই যে ও আসছে ইদিকে

লোকটি অর্থপূর্ণভাবে একবার দৃষ্টি হেনে মেঠো পথ ধরে চলে গেল নিশাপুরের দিকে। দেবু চাপা স্বরে বলল,—এই জন্যেই গৌড়হরি আমাদের টাকাপয়সার খোঁজ নিচ্ছিল। কি যাবি ওর বাড়ি? ফ্যাসাদে পড়া গেল দেখছি।

গৌড়হরি ততক্ষণে কাছে এসে পড়েছে। হাসি মুখে ডেকে বলল,—তোমাদের যে দেরি হল ভাই। বাঃ স্নান সেরে নিয়েছ। চল চল।

দেবু ইতস্তত করে বলল, এখন থামব না। ভাবছি আরও এগোই।

গৌড়হরির চাউনি তীক্ষ্ণ হয়। গম্ভীর সুরে বলে,—ও, আমার বাড়ি যেতে বুঝি আপত্তি? বুঝেছি, রামপদ লাগিয়েছে আমার নামে। কী বলেছে? আমি ঠক জোচ্চোর, তাই না?

দেবু শিব নীরব।

গৌড়হরি হেসে উঠে বলল,- নেহাৎ মিথ্যে বলেনি। হ্যাঁ অভাবের সংসার চালাতে অনেক কুকর্ম আমায় করতে হয় ঠিকই। যাদের অনেক সম্পদ, সুযোগ পেলে তাদের ঠকিয়ে দুপয়সা কামাই। তবে তোমাদের ভয় নেই। তোমাদের আছেটা কী যে হাতাব। তাছাড়া তোমাদের আমার ভালো লেগেছে। আমারও পাপপুণ্য বিচার আছে ভাই। কি যাবে আমার বাড়ি?

হ্যাঁ যাব।—শিব এবার জোর গলায় বলল, দেবুও সমর্থনে ঘাড় নাড়ে।

গৌড়হরির বাড়ির চৌহদ্দি বেশ বড়। তবে খড়ে ছাওয়া মাটির ঘরগুলির জীর্ণ দশা দেখে বোঝা যায় গৃহস্বামী খুবই অভাবী। দাওয়ায় চাটাই পেতে বসল তারা।

দুটি পাঁচ-ছয় বছরের ছেলে এবং একটি বছর দশেকের মেয়ে এসে কাছে দাঁড়াতে গৌড়হরি জানাল,—আমার ছেলে মেয়ে। ওদের কাছে তোমাদের গল্প বলেছি। কী দুঃসাহস, খালি হাতে ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছে পায়ে হেঁটে। দেখছ না কেমন থ হয়ে দেখছে তোমাদের। হাঃ হাঃ-

একটু একটু করে আরও অনেক ছোট ছেলেমেয়ে এসে জুটল গৌড়হরির উঠোনে। তাদের বিস্ময়মুগ্ধ দৃষ্টি দুই পর্যটকের ওপর নিবদ্ধ। দু চারটি বয়স্কলোকও উঁকি দিয়ে গেল, তবে ঢুকল না। গৌড়হরিও তাদের আহ্বান জানাল না।

ক্ষীণকায়া স্নিগ্ধদর্শন কপাল অবধি ঘোমটাটানা গৌড়হরির স্ত্রী খাবার পরিবেশন করলেন। ভাত, ডাল,আলু ভাজা, শাক ভাজা, কচুর তরকারি, পুঁটি মাছের ঝোল, টক—এমনি সাদাসিদে আয়োজন, তবে চমৎকার স্বাদ রান্নার। শিবরা খেয়ে ভারি তৃপ্তি পেল।

খাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে রওনা হবার পালা। দেবু গৌড়হরির ছেলেমেয়েদের হাতে একটি টাকা দিতে গেল মিষ্টি খেতে। হাঁ হাঁ করে উঠল গৌড়হরি—তোমরা কেন? আমারই বরং অতিথি ভোজন করিয়ে দক্ষিণা দেওয়া উচিত। এই নাও ভাই কটা মুড়ির মোয়া। তোমাদের বউদির উপহার। আমাদের সাধ্যি তো বুঝচ।

তারপর অল্প ইতস্তত করে দেবুর হাতে একটা চিরকুট গুঁজে দিয়ে গৌড়হরি বলল,—ঠিকানাটা রাখ ভাই। বর্ধমান শহরে আমার এক পরিচিতের। একটু দুর্নাম আছে বটে তার। গুন্ডামির কেসে একবার জেল খেটেছে। তবে মনটা দরাজ। দাপটও আছে। আমার ফ্রেন্ড শুনলে ঠিক সাহায্য করবে। বিদেশ ভুঁইয়ে কাকে কখন প্রয়োজন হয়।

পিচ রাস্তায় পাশাপাশি নীরবে চলতে চলতে দেবু বলে,—বাইরে থেকে শুনে সবসময় মানুষ ঠিক চেনা যায় না, তাই নারে? কে বলবে, গৌড়হরিবাবুর মনটা এমন—শিব সমর্থনে ঘাড় দোলায়।