মেজকর্তার সাপ শিকার
সাপ সাপ। মাথার ওপর তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে ছিটকে সরে গেল ডুলু।
সঙ্গে সঙ্গে অন্য ছেলেরা লাফ দিয়ে, দৌড়ে, যে যেদিকে পারল পালাল খানিক তফাতে। তারপর ডুলুর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল ছাদের দিকে। দেখল, বারান্দার ছাদে একটা কাঠের বরগার খাঁজে লম্বালম্বি ভাবে শুয়ে আছে মস্ত এক সাপ। যেখানে তারা খেলছিল ঠিক তাদের মাথার ওপরে। উঃ খুব বেঁচে গেছি।
বিশাল চৌধুরীবাড়ির এক অংশে দোতলায় টানা চওড়া লোহার গ্রিলের রেলিং দেওয়া বারান্দায় ছয়জন খুড়তুতো জ্যাঠতুতো ভাই মিলে রবারের বলে ফুটবল খেলছিল মহা আনন্দে। বয়স তাদের বারো থেকে ষোলোর মধ্যে। এই বারান্দার লাগোয়া তিনখানা বড় বড় ঘরই আপাতত তালা বন্ধ। ঘরগুলোর বাসিন্দারা কেউই এখন থাকে না গ্রামে, এই দেশের বাড়িতে স্থায়ীভাবে। তারা বাইরে থাকে শহরে। তারা কেউ পড়ছে, কেউ বা চাকরি করছে। মাঝেমাঝে তারা দেশে আসে। এই নিরালা বারান্দাটা তাই বাড়ির ছোট ছেলেদের নির্বিঘ্নে খেলার জায়গা। স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। সকালের পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বাড়ির কজন ছোট ছোট ছেলে অন্য দিনের মতো বারান্দায় মেতেছিল খেলায়। হঠাৎ এই বিপত্তি।
ছেলেগুলো ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকে। দেখে সাপটাকে। খেলা মাথায় ওঠে। ওর নিচে কি খেলা যায়? কখন ওটা ধপ্ করে খসে পড়বে ঘাড়ে। সাপটা বিষাক্ত না নির্বিষ কে জানে? তবে যা আকার, দেখে বুক গুরগুর করে। সাপটাকে তাড়ানো যায় কীভাবে?
ছেলেরা চিৎকার করে, হাততালি দেয়। সাপ নির্বিকার নট নড়নচড়ন। যেন আরামে ঘুমুচ্ছে লম্বা হয়ে।
সাপ-টাপ দেখা চৌধুরীবাড়ির ছেলে-বুড়োর অভ্যেস আছে। দেড়শো বছরের বেশি প্রাচীন গাছপালা ঘেরা চৌধুরীবাড়িতে কত গর্ত, কত ফাটল। তাতে কত সাপ বিছে ইঁদুর ছুঁচো ইত্যাদি প্রাণীর বাস। বাড়ির ঘুলঘুলিগুলোয় ঘর বেঁধেছে অজস্র পায়রা। সাপেরা মানুষদের পারতপক্ষে এড়িয়ে চলে। তবে দৈবাৎ কখনো-সখনো সাপে মানুষে মুখোমুখি হলে, যদি সেটা বিষহীন সাপ হয়, তাকে লাঠি ঠুকে আওয়াজ করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ির ভিতরে বিষাক্ত সাপ ঘোরাঘুরি করলে তাকে মারতে বাধ্য হয় লোকে।
খুদু ঢিল ঢিল তুলল।
খবরদার। খুদুর হাত চেপে ধরে ভুলু, ঢিল লেগে রেগে গিয়ে যদি লাফ মেরে মেঝেয় পড়ে তাড়া করে, মরব যে। দেখচিস কী সাইজ! ওর সঙ্গে ছুটে পারবি?
নাঃ, এটার কপালে মৃত্যু আছে।
সিনিয়ার-মোস্ট বুলু দার্শনিক ভাবে মন্তব্য করে, নইলে এত ডিসটার্ব করছি তাও পালাচ্ছে না কেন? আমাদের খেলাটা মাটি করল ব্যাটা।
ওটা কি বিষাক্ত সাপ?—সব চাইতে কনিষ্ঠ বুধু সভয়ে প্রশ্ন তোলে।
বুলু বলল, তাই হবে। নইলে এত সাহস! আমাদের কেয়ারই করছে না।
খুদু বলল, তবে তো এটাকে মারা উচিত।
ডুলু বলল, তাহলে কালী সর্দারকে খবর দিই। বল্লম নিয়ে আসুক। কালী সাপ মারায় ওস্তাদ। অ্যাই বুধু যা তো—কালী সর্দারকে ডেকে নিয়ে আয়।
বুধু হুকুম পেয়ে দৌড়ল। কালী সর্দার চৌধুরীবাড়ির পাইক। এ সময়টা কাছারি বাড়িতে থাকে।
খুদু ডুলুদের চেঁচামেচিতে ইতিমধ্যে আরও কিছু ছোট ছেলেমেয়ে এসে জুটেছে বারান্দায়। ফলে বারান্দায় কলরব বাড়ছে। আশপাশ থেকে কাকিমা জেঠিমার মতো কয়েকজন বড়দের গলাও সাড়া দিচ্ছে, কী ব্যাপার? কী হয়েছে রে?
বুধু ছুটতে ছুটতে এসে রিপোর্ট করল, কালী সর্দার নেই, হাটে গেছে। ফিরতে দেরি হবে।
এখন কী হবে? ভারি চিন্তায় পড়ে ছেলেরা।
বুলু বলল, চ মেজকাকাকে ডেকে আনি। বন্দুক নিয়ে এসে সাপ মেরে দেবেন। খুদু আমতা আমতা করে, বাবা? বাবা কি পারবেন?
কেন, না পারার কি আছে? ওই তো সাপ দেখা যাচ্ছে। এক গুলিতেই ঘায়েল হয়ে যাবে।
না, মানে বাবাকে তো কখনো দেখিনি শিকার করতে।
সে হয়তো অনেক দিন শিকার করেননি। কিন্তু গল্প তো করেন কত শিকারের। বাঘ মেরেছেন, বুনো শুয়োর মেরেছেন, উড়ন্ত হাঁস মেরেছেন—কত জঙ্গলে ঘুরেছেন শিকার করতে। এ তো ঘুমন্ত সাপ। স্রেফ হাতের নাগালে। কোনও ব্যাপারই নয়। বন্দুকটা আমায় দিলে কাকাকে আর করতে হয় না। আমিই খতম করে দিতাম।—গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করে বুলু। ছোটদের দলে একমাত্র বন্দুক চালাতে জানে। তার ছোটকাকার কাছে শিখেছে।
তবে চ, বাবাকে ডেকে আনি।
খুদু বুলু ভুলু চলল মেজকর্তাকে ডাকতে। অন্যরা রইল পাহারায়।
সাপ মারার জন্য মেজকর্তার শরণ নেওয়ার। কারণ আছে। চৌধুরীবাড়িতে খুদু বুধুর বাবা অর্থাৎ মেজকর্তাই আপাতত একমাত্র বন্দুকধারী এবং সাপটা দর্শন দিয়েছে মেজকর্তার মহলে। সুতরাং মেজকর্তাকেই ডাকতে হয়।
চৌধুরীবাড়িতে দুটো বন্দুক আছে। একটা মেজকর্তার। দ্বিতীয়টার মালিক ছোটকর্তা অর্থাৎ খুদু বুধু বুলুদের ছোটকাকা। কিন্তু ছোটকাকা এখন উপস্থিত নেই এই বাড়িতে—মেদিনীপুর শহরে গেছেন একটা কাজে।
ছেলেরা ছোটকাকাকে মাঝেমধ্যে দেখেছে তোড়জোড় করে শিকারে বেরোতে। কিন্তু মেজকর্তাকে ছোটরা কস্মিনকালেও বন্দুক দিয়ে শিকার করতে বা শিকারে বেরতে দেখেনি। বছরে কয়েকবার ছাদে উঠে তিনি বন্দুকে ফাঁকা আওয়াজ করেন ব্যস্।
গোপন রহস্যটা হল, যৌবনে পাঁচজনের পাল্লায় পড়ে বন্দুক ছোড়া শিখেছিলেন মেজকর্তা, তবে দু-চারটে ছোটখাটো শিকার করার পরেই তাঁর শিকারের শখ মিটে যায়। বন্দুক একটা কিনেছিলেন বটে লোক দেখাতে। কয়েকবার শিকার পার্টির সঙ্গে ঘুরেছেনও বনে। কিন্তু স্বয়ং বন্দুক চালাতে মোটেই ভরসা পেতেন না। গুলি ছুড়ে হিংস্র জন্তু শিকারের নামে রীতিমতো নার্ভাস লাগে তাঁর। তবে সেটা বাইরে প্রকাশ করতে চান না। বরং বানিয়ে বানিয়ে বয়সকালে শিকার করার রোমহর্ষক সব গল্প ছাড়েন সুযোগ পেলেই।
একতলায় বৈঠকখানা ঘরে ফরাস পাতা তক্তপোশে বসে মেজকর্তা নিবিষ্ট চিত্তে দাবা খেলছিলেন গ্রামের এক সমবয়সি জগন্নাথবাবুর সাথে।
খুদু বুলু ডুলু এসে তাঁদের কাছে দাঁড়াল মিনিট চার-পাঁচ বাদে জগন্নাথবাবুই প্রথম খেয়াল করলেন ছেলেদের। জিজ্ঞেস করলেন কী চাই?
বুলুরা ইশারায় মেজকর্তাকে দেখায়। জগন্নাথবাবু মেজকর্তাকে বললেন, চৌধুরীমশাই দেখুন কী বলচে ছেলেরা।
বড়কর্তা ঘুঁটির ওপর চোখ রেখেই বললেন, হুঁ কী?
খুদু উত্তেজিত স্বরে জানাল, বাবা, একটা সাপ বেরিয়েছে আমাদের দোতলায়। বন্দুকটা নিয়ে চলুন না, মেরে দেবেন।
সাপ!—দাবা বোর্ড থেকে নজর না সরিয়েই মেজকর্তা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, বন্দুক কী হবে? লাঠি দিয়ে মার।
লাঠি গায়ে লাগবে না। বারান্দার ছাদে কাঠের বরগায় শুয়ে আছে। বিরাট সাপ!
এবার মেজকর্তা মুখ তুললেন। প্রশ্ন করলেন, কী সাপ?
তা জানি না। এই অ্যাত্তো বড়। অ্যাত্তো মোটা।
কী রঙের?
বুলু বলল, কালচে?
খুদু বলল, না হলদেটে।
মেজকর্তা ভুরু তুলে খানিক চিন্তা করে বললেন, কালী সর্দারকে ডাক। ও বল্লম দিয়ে গেঁথে ফেলবে।
কালী সর্দার নেই। হাটে গেছে।
তবে নবকে বল্।
ছোটকাকা নেই। মেদিনীপুর শহরে গেছেন।
দোতলায় সাপ উঠল কী করে? মেজকর্তার প্রশ্ন।
বুলু বলল, বোধহয় গাছ দিয়ে। আমগাছের ডাল লেগে আছে বারান্দায়।
হয়তো সিঁড়ি দিয়ে।–খুদুর অভিমত।
উঁহু। মানুষের মতো সাপ সিঁড়ি দিয়ে ওঠে না। মেজকর্তা ধমকে ওঠেন।
তোরা ওখানে কী করছিলি?
ওখানে খেলি যে রোজ।
মেজকর্তা নীরবে গোঁজ মেরে থাকেন।
জগন্নাথবাবু হাঁ করে সব শুনছিলেন। এবার ছেলেদের হয়েই ওকালতি করেন, চৌধুরীমশাই সাপটা মেরে দিয়ে আসুন না। ছেলেগুলো ভয় পাচ্ছে। তাছাড়া পরে কোনো ঘরে না ঢুকে পড়ে। বিষাক্ত সাপ হলে তো বিপদ।
হুম্। ফোস্ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেজকর্তা হতাশ কণ্ঠে বলেন,—ঠিক আছে, যাচ্ছি। একটা মোক্ষম চাল এসেছিল মাথায়। যত উটকো ঝামেলা। বেশ। বন্দুকটা নিয়ে আয় আমার ঘর থেকে। আর টোটা। কিন্তু টোটা তো আলমারিতে আছে, তালা বন্ধ। ঠিক আছে, বন্দুকটা নিয়ে হরশংকরকে বলল, গুলি ভরে দিতে। আর একটা এক্সট্রা গুলি দিতে।
হরশংকরবাবু চৌধুরীদের জমিদারিতে চাকরি করেন। চৌধুরীবাড়ির একতলায় একটা ঘরে একা থাকেন। তিনি আবার চৌধুরীদের বন্দুকগুলোরও দেখভাল করেন। প্রতি মাসে বন্দুকদুটো দুই কর্তার থেকে চেয়ে নিয়ে নিজের ঘরে বসে সেগুলো সযত্নে পরিষ্কার করেন, তেল দেন, কলকব্জা পরীক্ষা করেন। দু এক রাউন্ড গুলিও ছোড়েন বন্দুক চালু রাখতে। তাঁর কাছে কয়েকটা গুলি গচ্ছিত রাখা হয় হঠাৎ প্রয়োজনে পাওয়ার জন্য। ছেলেরা তাঁর নাম দিয়েছে gun বাবু।
হরশংকরবাবু নিজের ঘরে তক্তপোশে শুয়ে একখানা চটি ডিটেকটিভ বই পড়ছিলেন গোগ্রাসে। খুদু ডুলু বুলু মেজকর্তার বন্দুক নিয়ে হাজির হতে ভুরু কুঁচকে বললেন, কী ব্যাপার?
খুদু বলল, বাবা বন্দুক দিয়ে সাপ মারবেন। একটা টোটা ভরে দিতে বললেন। আর একটা এক্সট্রা গুলি নিতে বলেছেন।
সাপ? তবে তো ছররা।—বলে বই মুড়ে রেখে উঠে চাবি দিয়ে নিজের তোরঙ্গ খুললেন ‘গান’ বাবু।
টোটা ভরা বন্দুক পেয়ে মেজকর্তা উঠলেন বটে। তবে নেহাতই অনিচ্ছায়। জগন্নাথবাবুকে বললেন, বোর্ড যেমন আছে থাক। ফিরে এসে বাকি চাল দেব। চা বলে দিচ্ছি। খান। এই যাব আর আসব।
সদর্পে সাপ মারতে চলেছেন মেজকর্তা। হাতে বন্দুক, গায়ে ফতুয়া, ধুতির কোঁচা লুটোচ্ছে মাটিতে, চটি ফটর ফটর, পিছনে খুদুরা তিন মূর্তি।
দোতলায় ওঠার সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছবার আগে দেখা হয়ে গেল সেজকর্তার সঙ্গে। বেঞ্চিতে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, কী ব্যাপার মেজদা,
বন্দুক হাতে চললে কোথা?
মেজকর্তা জবাব দিলেন, – সাপ মারতে। দোতলায় একটা সাপ বেরিয়েছে।
কী সাপ?
তা বলতে পারছে না। বলছে বিরাট।
দোতলায় উঠল কী করে?
বলছে গাছ বেয়ে।
ও! উদ্বিগ্ন ভাবে মাথা ঝাঁকান সেজকর্তা।
মেজকর্তা কিন্তু না এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ননী, সেই যে একবার দোতলায় একটা সাপ উঠেছিল মস্ত বড়। উঃ কী কাণ্ড তাই নিয়ে। তুই তখন কলেজে থার্ড ইয়ারে। এমনি গরমের ছুটির সময়। মনে আছে?
সেজবাবু বললেন, হুঁ। কিন্তু সেটা তো ঢোঁড়া ছিল। বিষ নেই।
আরে তা তো আগে বুঝিনি। তোর মেজ বউ তখন নতুন বউ। দ্যাখে যে দোতলায় বারান্দা দিয়ে সড়সড় করে চলেছে প্রকাণ্ড সাপ। দেখেই তার হয়ে গেছে। সাপ সাপ—বলে চিৎকার দিতে দিতে পালিয়েছে উল্টোদিকে। সব ছুটে এল চারদিক থেকে লাঠি-সোটা নিয়ে। বড়কাকা বন্দুক নিয়ে হাজির। এসে দেখি সাপ বেপাত্তা। তুইও এসেছিলি মনে আছে?
হুঁ–সায় দেন সেজকর্তা।
ছেলেরা উসখুস করে। খুদু মৃদস্বরে ডাকে বাবা, যাবে না?
মেজকর্তা ছেলের কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত না করে তেড়ে গল্প চালালেন।
ওঃ, মনে আছে তারপর কী হই হই। ঘরে না বারান্দায় কোথায় যে ঢুকেছে সাপটা। ভয়ে কেউ আর ঘরে ঢুকতে পারে না। ঝাড়া দুটি ঘণ্টা তন্নতন্ন করে খোঁজার পর শেষে বেরুল বারান্দায় একটা বস্তার পিছন থেকে। খোঁচা খেয়েই টেনে দৌড় যা মারল। সোজা রেলিং গলে নিচে লাফ মারল জবা গাছের ওপর। তারপর হাওয়া। এক ঘা লাঠিও কেউ কষাতে পারেনি। হোক ঢোঁড়া। সাইজ কী ছিল! যেন বাচ্চা অজগর।
কাকু চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে।—বুলু তাড়া দেয়।
হ্যাঁ হ্যাঁ যাও। দেরি কোরো না। – সেজকর্তা খবরের কাগজ হাতে ওঠার ভঙ্গি করেন। মেজদার বকবকানি বোধহয় আর তাঁর পছন্দ হচ্ছিল না। অগত্যা মেজকর্তা ফের রওনা দিলেন সাপের উদ্দেশে।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠেই মেজকর্তা দেখা পেলেন খুদুর জ্যাঠামশাই অর্থাৎ বুলুর বাবার। চৌধুরীবাড়িতে একজনের অংশ থেকে অন্য জনের অংশে যেতে হলে টানা টানা বারান্দা পেরতে হয়। এই অংশটা জ্যাঠামশায়ের। জ্যাঠা বারান্দার কোণে চেয়ারে বসে সামনে টেবিলে খাতা রেখে কিছু হিসেব লিখছিলেন। মেজকর্তাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, বন্দুক নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস রবি?
মেজকর্তা দাঁড়িয়ে পড়ে গম্ভীরভাবে জানালেন, আমার দোতলার বারান্দায় একটা সাপ বেরিয়েছে। ছেলেরা ধরল। তাই যাচ্ছি মারতে।
সাপ? বড়কর্তা কিঞ্চিৎ শঙ্কিত দৃষ্টিতে ছোট ভাইয়ের হাতে বন্দুকটা দেখতে দেখতে বললেন, তা লাঠি দিয়ে মারলেই হয়। বন্দুক কী দরকার?
মেজকর্তা বললেন, লাঠি চলবে না। মাথার ওপর ছাদের বরগায় উঠেছে।
কী সাপ?
বলতে পারছে না। বলছে বিরাট।
সাবধানে গুলি ছুড়িস।
হ্যাঁ হ্যাঁ সে আর বলতে। বিষাক্ত হলে মারব। নইলে তাড়িয়ে দেব।
প্রসঙ্গ শেষ। এরপরও কিন্তু মেজকর্তার সেখান থেকে নড়বার মতলব দেখা গেল না। বন্দুকটা মেঝেতে নামিয়ে লাঠির মতন পাকড়ে ধরে তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে জানালেন, দাদা মনে আছে সাপের কী উৎপাত হয়েছিল সেবার বন্যার সময়? ওঃ! নবর বয়স তখন বারো-চোদ্দো হবে।
বড়কর্তা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দেন, হুম।
মেজকর্তা পরম উৎসাহে চালিয়ে যান, মনে আছে, গ্রামে বন্যার জল ঢুকে গেছল সেবার। তখন থেকে শুরু। জল তো সরে গেল দুদিন বাদে আরও দিন পনেরো সাপের উপদ্রবে কী ভীষণ আতঙ্ক। গাঁয়ের সব বাড়িতে সাপ আর সাপ। যেখানে সেখানে।
বড়কর্তা বললেন, হবেই তো। কত সাপ ভেসে এসেছিল জলে। সাপের গর্ত সব ভরে গিছল জলে। তখন ওরা শুকনো ডাঙা খুঁজবে। উঁচু জায়গায় উঠবে।
তা বটে। মেজকর্তা যোগ দেন, মনে আছে কত গাছের ডালে ডালে সাপ ঝুলছে। কী ভয়ানক দৃশ্য! গোখরো কেউটের মতো বাঘা বাঘা সাপ ফণা ধরে গজরাচ্ছে ডালে ডালে। আমাদের এই বাড়িতেই একতলা দোতলা মিলিয়ে অন্তত বিশ-পঁচিশটা বিষধর সাপ মারা হয়েছিল।
বড়কর্তা মাথা নাড়েন, বিশ-পঁচিশ নয়। তবে সাত-আটটা মারা হয়েছিল।
ওই হল আর কী। মেজকর্তা চাপা দেন, অনেকগুলোকে তো মারাই গেল না। দেখা দিয়ে কোথায় যে সেঁধুল।
খুদুরা প্রথমে খানিক আগ্রহ নিয়ে শুনছিল বন্যার সময় সাপের গল্প। গল্প আর না থামার লক্ষণে তারা এবার চঞ্চল হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে একজন কাজের লোক এক কাপ গরম চা এনে বড়কর্তার সামনে টেবিলে রাখল। বড়কর্তা জিজ্ঞেস করলেন ভাইকে, চা খাবি
চা? তা খেলে হয়। এখন একবার খাই চা। ছেলেগুলো হঠাৎ ডাকতে চলে এলাম। দাও চটপট।
ছেলেরা দেখল সর্বনাশ। এ যে জমিয়ে বসলেন। খুদু মৃদু কণ্ঠে বলে, বাবা, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
দাঁড়া বাপু। মেজকর্তা খিঁচিয়ে উঠলেন।—এখন একবার চা না খেলে আমার মাথা ধরে। আর শরীর ফিট না থাকলে নিশানা ঠিক হয় না। চট করে চা-টা খেয়ে যাচ্ছি।
বুলু বলে বসল, আমিও মারতে পারি। বন্দুকটা পেলে।
নো। শুনেই ধমকে উঠলেন মেজবাবু। অভিজ্ঞতা চাই, প্র্যাকটিস চাই, টিপ চাই। নইলে ভেরি রিস্কি।
বড়কর্তা অর্থাৎ বুলুর বাবাও চোখ পাকালেন, বেশি পাকামি হচ্চে? খবরদার বন্দুক চালাবি না। শেষে মানুষ খুন করে জেলে যাবি।
বুলু মিইয়ে যায় জোড়াদাবড়ানিতে।
মেজকর্তা ধীরেসুস্থে চা-য়ে চুমুক দেন। সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার সাপের গল্প চলে। আবার খুদু তাড়া দেয়, বাবা চল।
আঃ! অত ব্যস্ত কীসের? নজর রাখতে বলেছিস তো? পালাবে কোথা? যাচ্ছি, যাচ্ছি।
ঝাড়া পনেরো মিনিট তরিবৎ করে চা পানে কাটিয়ে মেজকর্তা উঠলেন অবশেষে। বড়কর্তা সাবধান করে দেন আবার, দেখে শুনে ফায়ার করিস কিন্তু।
যেখানে সাপের দর্শন মিলেছিল সেই বারান্দায় তখন ছোটদের ভিড় আরও বেড়েছে। শুধু ছোটরা নয়, কয়েকজন বউ-ঝিও হাজির। সবাই উত্তেজিত কণ্ঠে কথা বলছে–কারও কথাই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
মেজকর্তা গটগট করে বন্দুক ঘাড়ে করে এসে বারান্দার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হুংকার দিলেন–কই সাপ?
বুধু এবং আরও কয়েকটি ছোট ছেলেমেয়ে এক যোগে চেঁচিয়ে উঠল, সাপ নেই। পালিয়েছে।
পালিয়েছে? ইস্। একটু আগে ডাকবি তো। গেল কোথায়? মেজকর্তা বুঝি বেজায় নিরাশ।
বুধু দেখায়, ওই ছাদের কাঠ দিয়ে গিয়ে ওই বাঁশটা রয়েছে কোণে, ওটা বেয়ে নেমে ছুটে গিয়ে বারান্দার রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে গলে মারল লাফ আম গাছের ডালে। তাপ্পর গাছ দিয়ে মাটিতে নেমে পালাল।
বুধুদা ওকে একটা ইট মারল যে ছাদে। তাপ্পরেই পালাল।—একটি ছোট মেয়ে ফাঁস করে দেয়।
কী! ইঁট মেরেছিলি? যদি তেড়ে এসে ছোবল দিত? কাণ্ডজ্ঞান নেই। মেজকর্তা ধমকে উঠলেন।
বুধু কাঁচুমাচু। কিন্তু বড়বউঠান বুধুর হয়ে ঝেঁজে উঠলেন, ছোবলাবে কী? ঢোঁড়া সাপ ভয়ে ওটা নিজেই আধমরা। কী দৌড়টা দিল!
অ্যাঁ টোঁড়া! ধুস। মিছিমিছি সময় নষ্ট করালি। যাই
মেজকর্তা নিশ্চিন্ত মনে হেলে-দুলে ফিরে চললেন বন্দুক কাঁধে। ফের দাবায় বসতে।
[২০০০, কিশোর ভারতী, শারদীয়া ]
