বুলামাসির বাড়িতে
বুলামাসিকে দেখে অন্তু মুগ্ধ হয়ে গেল। কী সুন্দর দেখতে। কী সুন্দর কথা! বুলা মাসি অন্তুকে বার বার বলে গেলেন, একদিন তাঁদের বাড়ি যেতে।—’তোমায় এই এতটুকু দেখেছি। কত বড় হয়ে গেছ। কলেজে পড়ছ! অন্তুর অবশ্য বুলামাসিকে মনে নেই, তবে মার মুখে তাঁর অনেক কথা শুনেছে।
বুলামাসি মায়ের দূর সম্পর্কের বোন হন। এতদিন দিল্লিতে ছিলেন। মাত্র মাসখানেক হল বুলামেসো কলকাতায় চাকরি নিয়ে এসেছেন।
বুলামাসি চলে যেতে অন্তুর মা আর এক প্রস্থ তাঁর গুণপনা শোনাতে লাগলেন।
বুলামাসি নাকি বিয়ের আগে কবিতা লিখতেন, নাচতে পারতেন, সেতারও শিখেছিলেন। এখনও একটু আধটু রেওয়াজ করেন। বিশ্বম্ভরবাবু অর্থাৎ বুলামেসো ভারি গোপ্পে লোক। দু বছর আগে একবার কলকাতায় এসেছিলেন তখন অন্তুর মায়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সেবার ওরা এসেছিলেন অন্তুদের বাড়ি। অন্তু অবশ্য সেদিন বাড়ি ছিল না।
কান ভরে বুলামাসির গুণকীর্তন শুনতে শুনতে অন্তু ভাবল বুলামাসির জন্য কিছু একটা করতে হবে। ঠিক আছে গোলাম হোসেনের জলসায় ওঁকে নেমন্তন্ন করবে।
অন্তুর পাড়ায় আসছে রবিবার বিখ্যাত সেতার বাজিয়ে ওস্তাদ গোলাম হোসেন সেতার বাজাবেন চৌধুরি বাড়িতে। ঘরোয়া আসর। শুধু বাছাবাছা লোকেদের নেমন্তন্ন করা হচ্ছে। ওস্তাদজি কদাচিৎ কলকাতায় আসেন। এবার মাত্র দুদিন থাকবেন কলকাতায়। তাই বাজনা প্রেমিক সকলেই ওই আসরে নেমন্তন্ন পাওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে আছে।
অন্তুর সঙ্গে চৌধুরী গিন্নি বাণীদির বেজায় খাতির। আসরের ব্যবস্থাপনার কাজে ক’দিন ধরে সে খুব খাটাখাটি করছে। তাই অন্তু দু-চারজনকে তার ইচ্ছেমতো জলসা শুনতে নেমন্তন্ন করতে পারে বইকি।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অন্তু মাকে বলল, ‘বুলামাসির কাছ থেকে উলের ডিজাইন বইটা আনবে না?’
মা বললেন, ‘আনব তো। সময় পাচ্ছি কই? তুই এনে দে না?’
‘আচ্ছা দেখি। আজ যাব ওই পাড়ায় একটা কাজ আছে,’ অন্তু জানাল।
বুলামাসি অন্তুকে দেখে হই হই করে উঠলেন বস বস।‘
‘আরে কী ভাগ্যি। ওগো অন্তু এসেছে।
ফরসা, মোটাসোটা, দাঁতে পাইপ কামড়ানো বিশ্বম্ভরবাবু হাসিমুখে ড্রইং রুমে ঢুকলেন।
‘আরে থাক থাক প্রণাম নয়। তোমরা মডার্ন ছেলে। তারপর বাড়ি খুঁজতে অসুবিধা হয়নি তো?’ মেসো জাঁকিয়ে বসলেন।
অন্তু একটু ইতস্ততঃ করে বলল, ‘মাকে একটা ডিজাইন বই দেবেন বলেছিলেন?’
ও তাই বুঝি মশায়ের আগমন ঘটল? বেশ দিচ্ছি বই, এখুনি ভাগো।’ বুলামাসি তেড়ে ওঠেন।
‘না না তা কেন? অমনিই আসব প্ল্যান করেছিলাম, মা কাজটা চাপিয়ে দিল।’
অন্তুর বেশ লাগছে। বাড়ি থেকে সে ইচ্ছে করেই চা খেয়ে বেরোয়নি। জানে এখানে নিশ্চয় পাবে। গোলাম হোসেনের কথাটা পাড়বে একদম শেষে। ঠিক ওঠার মুখে চমক দেবে।
‘পিংকু পিংকু’, বুলামাসি সজোরে ডাকতে থাকেন।
পিংকুর নাম শুনেছে অন্তু। বুলামাসির চার বছরের ছেলে।
একটু পরে দরজার গোড়ায় ছোট্ট এক মূর্তি আবির্ভূত হল। তার মাথায় কোঁকড়া চুল। মুখখানা বেশ মিষ্টি। কিছু একটা চুষছে। কারণ গাল আর ঠোঁট নড়ছে। তার এক হাতে একটা রবারের বল, অন্য হাতে প্যান্টটা আঁকড়ানো। গোল গোল চোখে পিংকু আগন্তুককে লক্ষ করতে লাগল।
‘পিংকু এখানে এসো। তোমার অন্তদা।’ বুলা মাসি ডাকল।
পিংকু নড়ল না।
অন্তু নিজেই উঠে গিয়ে পিংকুর গাল টিপে আদর করে তাকে কোলে তুলে নিল। অমনি পিংকু, ‘আঁ আঁ’ করে বিকট চিৎকার দিয়ে হাত পা ছুড়তে শুরু করল।
ঘাবড়ে গিয়ে অন্তু তাকে মেঝেতে নামিয়ে দিল।
‘ছিঃ অমন করে না, অন্তুদা আদর করছে।’ বুলামাসি অনুযোগ করেন। নিজের অপ্রস্তুতি ভাবটা সামলাতে অন্তু পিংকুকে জিজ্ঞাসা করল ‘তোমার ভালো নাম কী?’
পিংকু জড়িয়ে জড়িয়ে কী জানি একটা বলল।
বুলামাসি বুঝিয়ে দিলেন, ‘দিব্যেন্দুপ্রকাশ মুখার্জি। কেমন নাম? সুন্দর না? ওর কাকা রেখেছে।’
বুলামাসি পিংকুকে বলল, ‘অন্তুদাকে তোমার ছবির খাতা দেখাবে না? যাও নিয়ে এসো।’
পিংকু মায়ের কথায় কান না দিয়ে ডান মুঠোর তর্জনীটি মুখে পুরে অন্তুর দিকে তাকিয়ে রইল।
বুলামাসি নিজেই উঠে গিয়ে খাতাগুলো নিয়ে এসে অন্তুর কোলে ফেলে দিল। তিনটে গাবদা গাবদা খাতা। অন্তু পিংকুর দিক থেকে চোখ সরিয়ে খাতার পাতায় মন দিল।
স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার থাকলে অন্তু ঠিক বলত এগুলো স্রেফ কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং। কিন্তু আপাতত প্রাণপণে ছবিগুলির মর্ম উদ্ধারের চেষ্টা করতে লাগল। অবশ্য চেষ্টা করেও লাভ হত না যদি না বুলামাসি প্রত্যেকটি ছবির ব্যাখ্যা করে দিতেন। বুলামাসি বলতে লাগলেন ‘এটা হরিণ। এটা মানুষ। এটা হাতি –’।
কতগুলো খোঁচা খোঁচা দাগ আর ফুটকি দেখিয়ে বললেন, ‘এটা শজারু। কি ব্রাইট রং দিয়েছে, না? জান অন্তু ওর চোখ খুব শার্প। চিড়িয়াখানা দেখে এসে দু-দিনে এই খাতাটা শেষ করে ফেলল।’
অন্তু মাথা নেড়ে সমানে বলে চলল, ‘বাঃ চমৎকার। সুন্দর। বিউটিফুল।’
আরও দুটো খাতা অন্তুকে খুঁটিয়ে দেখতে হল। দুনিয়ার হেন জিনিস নেই বোধহয় যার দিকে শ্রীমান পিংকুর চোখ পড়েনি।
পিংকু তখন ঘরময় দাপিয়ে ফুটবল খেলছে। সে শুধু একবার চেয়ারের পিছনে উঠে অন্তুর প্যান্টের ওপর আধখানা পা রেখে তার ঘাড়ের পাশ দিয়ে ডিঙি মেরে নিজের শিল্পকীর্তি দর্শন করেছিল। অন্তু আলতো ভাবে প্যান্টটা ঝেড়ে ফেলল।
একবার দুম করে বলটা লাগল অন্তুর পিঠে। চমকে অন্তু হাত থেকে খাতাখানা ফেলে দিল। বুলামাসি বললেন, ‘পিংকু বারান্দায় খেল গিয়ে। অন্তুদাকে দেখতে দাও।’ পিংকু মায়ের কথা গ্রাহ্যই করল না। ফলে বাকি ছবিগুলো দেখবার সময় অন্তু আড় চোখে ছুটন্ত বলটার ওপর নজর রাখল।
ছবির পর্ব শেষ হল। অন্তু ঘড়ি দেখল চল্লিশ মিনিট কাবার। চায়ের অভাবে গলাটা শুকিয়ে আসছে। কোনো আশাও তো দেখছে না।
মেসো বোধহয় ছবির তেমন সমঝদার নন। এতক্ষণ তিনি চুপচাপ হাসি হাসি মুখে পাইপ টানছিলেন। বুলামাসি থামতে তিনি মুখ খুললেন।
‘বুঝলে অন্তু ওকে ট্রেনিং দিলে দারুণ ফুটবলার হবে। কী কিকের জোর! ন্যাচরাল ট্যালেন্ট। দেখবে? পিংকু কিক কর তো!’
মেসো রবারের বলটা পিংকুর দিকে গড়িয়ে দিলেন।
পিংকু মিস কিক করল। বল আলমারির তলায় ঢুকে গেল।
মেসো হামাগুড়ি দিয়ে বল বের করে আনলেন। এবং সেটা পিংকুর পায়ের গোড়ায় ধরলেন।
পিংকু সজোরে লাথি কষাল।
বল দেওয়ালে লেগে রিবাউন্ড করে মেসোর নাকে লাগল তারপর একটা ফুলদানি উল্টে দিল। ‘উঃ’ মেসো নাকে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘দেঁখচ কী কিক্! হবে না, বাপকা বেটা। পিংকু আর নয় অনেক খেলেচ। এবার রেস্ট।’
‘না।’
‘লক্ষ্মীছেলে কাল একটা চকলেট দেব।’
চকলেটের লোভে পিংকু খেলা বন্ধ করল। মেসো বলটা আলমারির মাথায় রেখে দিলেন।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে অন্তু বলল, ‘আপনি বুঝি ভালো ফুটবল খেলতেন?’
‘হুঁ। কলেজটিমে রাইট ব্যাক। আচ্ছা তুমি কোথায় খেল?’
অন্তু মাথা চুলকে বলল, ‘এই পাড়ার ক্লাবে।’
মেসো হতাশ ভাবে মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ ওখানে চলবে না।
‘ডিজাইন বইটা দেবেন নাকি বুলামাসি?’ অন্তু জিজ্ঞেস করল।
‘দেব দেব। তুমি কি এখুনি উঠবে! বস চা খেয়ে যাও।’
অন্তু আরাম করে বসল। বুলামাসি চা বানাতে রান্নাঘরে গেলেন। একটু বাদে বুলামাসি চা নিয়ে এলেন। সঙ্গে প্লেটে দুটি বিস্কুট।
চা খেতে খেতে অন্তু বলল, ‘বুলামাসি আপনি এখনও সেতার বাজান?’
‘কই আর সময় পাই। হাঁ পিংকু অন্তুদাকে তোমার ব্রতচারী নাচ দেখাবে না? দেখ কী সুন্দর তুলেছে নাচটা, মাত্র একবার দেখে। ওর চমৎকার তালজ্ঞান!’
পিংকু তখন রেলগাড়ির এঞ্জিন হয়ে ঘরময় ছুটছে।
তাকে নাচে উৎসাহ দিতে বুলামাসি নিজেই শাড়ি কোমরে জড়িয়ে, মুঠো পাকিয়ে শরীর ঝাঁকিয়ে শুরু করলেন,
‘চল্ কোদাল চালাই
ভুলে মানের বালাই …
পিংকু থমকে দাঁড়িয়ে মায়ের নাচ দেখতে লাগল। যেন মায়ের নকল করতেই একবার পা ঠুকল। বুলামাসি ভীষণ উৎসাহ দিলেন ‘এই তো বেশ হচ্ছে। কর কর।’
‘কু-উ-উ’—পিংকু আবার এঞ্জিন হয়ে গেল।
বুলামাসি ঘেমেটেমে বসে পড়লেন। বললেন, ‘নাঃ আজ ওর মুড নেই। সেদিন মিসেস ব্যানার্জির সামনে কী সুন্দর দেখাল!’
পিংকু হঠাৎ চ্যা করে উঠল, ‘ম্যা খিদে পেয়েছে।’
অন্তু অমনি লাফিয়ে উঠল
‘ইস্, রাত হয়ে গেল। আমি যাই।’
‘আরে বস না একটু। মোটে আটটা বাজে। তোমায় একটা মজার জিনিস দেখাব। লক্ষ্মীর মা পিংকুকে খেতে দাও।’ বুলামাসি অন্য ঘরে গেলেন। অন্তুকে আবার বসতে হল।
‘কী মজা?’ বিশ্বম্ভরবাবুর মুখের দিকে চেয়ে অন্তু জানতে চাইল। কিন্তু তিনি শুধু ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে নাকে হাত বুলতে বুলতে পাইপ টানতে লাগলেন।
বুলমাসি ফিরে এলেন। এক হাতে ডিজাইনের বই অন্য হাতে একটা বাক্স। বললেন, ‘জান অন্তু পিংকু মজার মজার ছড়া শিখেছে বাংলা, হিন্দি, ইংরিজি। ভারি লাজুক কিনা বাইরের লোকের সামনে তাই বলতে চায় না। সব টেপ করে রেখেছি। ওগো চালাও না রেকর্ডারটা।’
আরও মিনিট কুড়ি অন্তুকে বসে বসে পিংকুর কণ্ঠস্বর শুনতে হল। প্রত্যেক কবিতার শেষে তাকে বলতে হল ‘বাঃ বাঃ চমৎকার।’
তবে একটা কবিতাও ওর কানে ঢোকেনি। গলাটা ফের শুকিয়ে গেছে। পেট খিদেয় চোঁ চোঁ করছে। আশা করে অল্প খেয়ে এসেছিল। মাত্র দুটি বিস্কুটে পোষাবে কেন?
রেকর্ড শোনা শেষ হওয়া মাত্র অন্তু তড়াক করে উঠে দরজার দিকে এগোতে লাগল। বুলামাসি বললেন, ‘আসবে কিন্তু মাঝে মাঝে।’
বুলামেসো বললেন, ‘হাঁ সময় পেলেই চলে এসো। বেশ আড্ডা দেওয়া যাবে।’
অন্তু দরজার বাইরে পা দিয়েছে বুলামাসি বললেন, ‘অন্তু তোমাদের পাড়ায় নাকি গোলাম হোসেন বাজাচ্ছেন রোববার? রমাদি বলছিল। কোনো দিন আসরে বসে ওঁর বাজনা শুনিনি। একটু ব্যবস্থা করে দাও না ভাই।’
অন্তু উদাস ভাবে বলল, ‘দেখি, চেষ্টা করে।’
[১৯৮১ পক্ষীরাজ শারদীয়া]
