উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

নীলকুঠির জঙ্গলে – ৩

তিন

বৃহস্পতিবার। সকাল সাতটা নাগাদ ভোলানাথ সাধুখাঁ সাইকেল সমেত বাড়ি থেকে বেরোলেন। তার সাইকেলে বাঁধা লম্বা হুইল ছিপ এবং কাঁধে একটা ঝোলা। একবার রাস্তার দু-পাশটা দেখে নিয়ে ভোলানাথ সাইকেলে উঠে জোর প্যাডেল মারলেন।

শিব তাদের দোতলার জানলা থেকে ঠায় লক্ষ রাখছিল। সে ভাবল, বাঃ খাসা বুদ্ধি। ভোলাদার মাছ ধরার শখ আছে সবাই জানে। ভাবখানা যেন, মাছ শিকারে চলেছেন কোথাও। নীলকুঠির জঙ্গলে ঢুকতে দেখলেও কৈফিয়ৎ দেওয়া যাবে। ওখানকার পুকুরে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাবা, আমাদের ফাঁকি দিতে পারবে না।

ভোলানাথ চলে যাওয়ার দশ মিনিটের মধ্যে শিব দেবুর বাড়ি হাজির হল এবং আধঘণ্টার মধ্যে তারা গ্রামের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল।

আকাশটা মেঘলা করেছে। অনেক দূরে দুটি লোক সাইকেলে চেপে নীলকুঠির গা ঘেঁষে ঘুরে অদৃশ্য হল। দেবুরাও রওনা হল নীলকুঠির উদ্দেশে।

মাঠে মাঠে, আলের নিচ দিয়ে, যতটা সম্ভব গা ঢাকা দিয়ে ওরা নীলকুঠিতে পৌঁছল। জঙ্গলে ঢুকে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে এগোল। প্রথমে তারা যাচ্ছিল কুঠিবাড়ির দিকে। কানে এল পুকুরের দিক থেকে কথাবার্তার আওয়াজ। ওরা তখন পথ বদলে পুকুরের দিকে চলল।

বড় বড় গাছের তলা দিয়ে, ঝোপের ফাঁক দিয়ে এগোয় দুজনে। শেয়ালকাঁটায় নাক মুখ ছড়ে যাচ্ছে। গা চুলকাচ্ছে। ক্রমে পুকুরটা নজরে এল। গুড়ি মেরে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে বসে পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেবুরা অবাক।

হাত কুড়ি তফাতে, জলের ধারে ফাঁকায় ঘাসের ওপর বসে গম্ভীর মুখে বিড়ি টানছে নিমাই মান্না, আর পাশে ভোলানাথ ছিপ ফেলার আয়োজন করছেন। সত্যি সত্যি ছিপ ফেলবে নাকি! তা ফেলতে পারে। যদি হঠাৎ কেউ আসে ভাববে সত্যি মাছ ধরতে এসেছে। ছিপটা মাটিতে আটকে রেখে এরপর ঠিক দুজনে যাবে আসল কাজে।

ওরা দেবুদের দিকে পিছন ফিরে রয়েছে। ছিপটা দুলিয়ে ভোলানাথ বঁড়শি ফেললেন জলে। বসলেন স্থির হয়ে। নিমাইচরণ এবং ভোলানাথ দুজনেরই দৃষ্টি জলের দিকে। দেবুরাও কাঠ।

এমনিভাবে মিনিট পনেরো কাটল। ভোলানাথদের ওঠার নাম নেই। সেই নটনড়নচড়ন ভঙ্গি। শিবদের অবস্থা কাহিল। সারা গা চুলকোচ্ছে, জ্বলছে। মনে হচ্ছে যেন অন্ততকাল বসে আছে ঠায়। ব্যাপারটা কী! ওরা উঠছে না কেন? আর কতক্ষণ এই ভান করবে।

হঠাৎ ভোলানাথ একবার ওপরে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,—আকাশের গতিক সুবিধের নয় হে। বৃষ্টি আসছে, ঝড়ও আসতে পারে। আজ আমাদের বরাত খারাপ।

নিমাইচরণ আকাশের পানে একবার উদ্বিগ্ন ভাবে চেয়ে আওয়াজ ছাড়ল—হুঁ।

আরও মিনিট কুড়ি কাটল। আকাশ কালো হয়ে উঠেছে। গুড়গুড় করে মেঘ ডাকল বারকয়েক। ভোলানাথ বলে উঠলেন, আজ আর নয় হে, ওঠা যাক। এমন দিনে মাছ গাঁথবে না। বৃষ্টি এলে স্রেফ ভিজতে হবে। এখানে গাছতলা ছাড়া মাথ গোঁজার উপায় নেই ত্রিসীমানায়।

তিনি ছিপের সুতো গুটোতে শুরু করলেন। হুইল ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন—আচ্ছা নিমাই, সেদিন হারু এখানে এসেছিল কী কত্তে?

নিমাইচরণ তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। একটু বিরক্তভাবে বলল,—বললাম তো সেদিন, শাকপাতা তুলতে।

—হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক। সত্যি এ পুকুরে এত বড় মাছ আছে কে জানত! আমি এখানে আসিনি আগে। জায়গাটা ভালো নয় শুনেছি, তাই। তাছাড়া তিন বছর আগে মুখুজ্যেবাবুরা জাল ফেলে সব মাছ ধরে নিয়ে গেছলেন, শুনেছি। যাক্, হারু যখন নিজের চোখে দেখেছে—

পুকুরটার জলে খুব শাপলা হয়েছে। সুতো জড়িয়ে যেতে পারে। তোলা একটু কঠিন। তবে একবার আমার বড়শি গিললে আর নিস্তার নেই—বাছাধনকে ঠিক তুলব। মনে আছে নিমাই, আশি সালে বাঘাটি বিলে সের দশেকের একটা কাতলা তুললাম খেলিয়ে। সে বিলটায় তো এর চেয়েও বেশি ঝাঁঝারি ছিল।

নিমাইচরণ অধৈর্য ভাবে বলে উঠল,–তা আবার আসবে কবে? কাল পরশু তরশু আমার কিন্তু কাজ আছে।

ভোলানাথ বললেন,—বেশ সোমবার ফের ট্রাই করব। ভালোই হল। ক’দিন সময় মিলবে। কয়েকটা জিনিস জোগাড় করতে হবে। একটা স্পেশাল চার বানাব। এ যা পুকুর আর হারু যা সাইজ বলছে—। তাড়াহুড়োয় কাজ কী? হারু ছাড়া আর তো কেউ জানে না।

নিমাই মান্না একটু ইতস্তত করে বলল,–তাই তো মনে হয়—

–মনে হয় কেন? সেদিন যে বললে কেবল হারু দেখেছে।

—মানে তখন আর একটা বাগাল ছেলেও কাঠ কুড়োচ্ছিল এই জঙ্গলে। তবে মনে হয় না সে দেখেছে। মাত্র একবার লাফিয়েছিল যে মাছটা। তাছাড়া দেখলেই বা কী? খবরটা ঠিক জায়গায় পৌঁছলে তবে তো। মানে আমাদের মতো মাছ মারিয়েদের কানে। তা নইলে আর বিপদ কী?

তা বটে, তা বটে।—সায় দিলেন ভোলানাথ।

নিমাই বলল,—হারু শ্বশুর বাড়ি গেছে। ছুটি চাইল কাল। দিয়ে দিলেম। কাকে আবার নেশার ঝোঁকে গল্প-টল্প করে বসবে। ও এখানে না থাকলেই নিশ্চিন্তি।

ঠিক ঠিক।—বললেন ভোলানাথ, এখন যাবে কোথায়, আমার বাড়ি?

আকাশের দিকে চেয়ে নিয়ে নিমাই বলল,—না বরং আমার বাসায় চল, কাছে হবে।

ভোলানাথ ও নিমাইচরণ গোছ-গাছ করে তৈরি হলেন। কাছেই গাছের গায়ে তাদের সাইকেল ঠেসান দেওয়া ছিল। তাতে ছিপ বেঁধে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে জঙ্গলের পথ ধরে তাঁরা অদৃশ্য হলেন।

দেবু শিব হাঁ হয়ে শুনছিল সব কথা। মাঝে মাঝে চোখাচোখি করছিল নীরব বিস্ময়ে।

ভোলানাথদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই দেবু ফোস করে উঠল,—অ্যাঁ! এই ব্যাপার, মাছ! তাই এত লুকোচুরি।

শিব বলল,–ইস্, আমরা ভাবছিলাম কি না কি গুপ্তধন।

দেবু বলল,–গুপ্তধনই বটে, মানে মেছুরেদের কাছে। তবে তোকে যখন অপমান করেছে, ওদের এখানে মাছ ধরা আমি ভন্ডুল করব।

শিব বলল,–কী করে?

দেখি, একটু ভেবে। কিছু একটা বের করব ঠিক। এখন চল, তাড়াতাড়ি, বৃষ্টি এসে গেল।—তাড়া দিল দেবু।

দুজনে নীলকুঠির জঙ্গল থেকে বেরিয়ে মারল ছুট। প্রায় যখন পৌঁছেছে গ্রামে, ঝেঁপে বৃষ্টি নামল, সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস।

বিকেলে দেবু শিবকে দেখেই এক গাল হেসে নিজের মাথায় একটা টোকা দিয়ে বলল—এসে গেছে।

–কী?

–একখানা মোক্ষম আইডিয়া। আচ্ছা তোর কাকার তো খুব মাছ ধরার শখ। বড় মাছ ধরতে গেলে কী কী লাগে জানিস?

—কী আবার। এই ধর হুইল ছিপ, নাইলন সুতো, বঁড়শি, চার—

–একটা ছিপ জোগাড় করতে পারবি? হুইল-টুইল নয়। ছোট কঞ্চির ছিপ।

–খুব পারব। আমাদের বাড়িতে অনেকগুলো আছে।

–বেশ, ওটা নিয়ে হাটে যাব রোববার সকালে। তোর পিসিমার জন্যে জর্দা কিনতে বাজারে যেতে হবে বলছিলি, সেই কাজটারই অজুহাত দিস বাড়িতে। ফেরার সময় এক কৌটো কিনে আনিস মনে করে।

কেন, ছিপ নিয়ে হাটে কি করতে।—শিব উদ্দেশ্যটা ধরতে পারে না।

এখন নয় সেদিন যাওয়ার পথে বলব প্ল্যানটা।—দেবু রহস্যময় হাসে।