রায়বাড়ির ঘড়ি
কলকাতা ভবানীপুরে রায়বাড়ির ব্যাপার-স্যাপার হচ্ছে এলাহি। সাবেক কালের প্রকাণ্ড দোতলা বাড়ি। বাড়িতে থাকেন তিন কর্তা। তাঁদের তিন গিন্নী। তাঁদের গুটি পাঁচ-ছয় ছেলেমেয়ে। গাদাগাদা পুষ্যি আত্মীয়স্বজন এবং এক পাল চাকর-ঝি। লোকজনের আনাগোনায় রায়বাড়ি সর্বদা সরগরম। বাড়ির বাসিন্দারা সবাই সবাইকে ভালো করে চেনেই না। কে আসছে, কে যাচ্ছে, কে তার খোঁজ রাখে।
বড়, মেজ, ছোট—তিন রায়-কর্তাই খুব ব্যস্ত মানুষ। বড় রায় ডাক্তার। তা ছাড়া তিনি পাঁচ-সাতটি স্পোর্টিং ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি প্রভৃতি নানা পদ অলংকৃত করে আছেন। ফলে রোগী দেখার পর বাকি সময়টুকু তিনি ওই ক্লাবগুলিকে নিয়েই বিব্রত থাকেন।
মেজ রায় কোম্পানির ডিরেক্টর। কোম্পানির লাভ-লোকসান ছাড়া তাঁর মগজে অন্য চিন্তা ঢোকার সুযোগ খুব কম।
ছোট রায় কলেজে পড়ান। বাকি সময় করেন সমাজসেবা। দলবল জুটিয়ে হই-হই করে, আজ বন্যাত্রাণ, কাল বস্তি উন্নয়ন, পরশু মেলায় ভলান্টিয়ারি করে বেড়াচ্ছেন। সংসারের ঝক্কি পোয়ানোর সময় কই?
যা হোক, রায়বাড়ির চাকা দিব্যি গড়িয়ে চলেছে। তিন রায়গিন্নি বেজায় চৌখস। কর্তাদের ভরসা তাঁরা করেন না। আর আছেন ভুবনবাবু। বুড়োকর্তা অর্থাৎ বর্তমান রায়দের বাবার আমলে তিনি ছিলেন জমিদারির নায়েব। এখন জমিদারি নেই। ভুবনবাবু কলকাতায় থেকে রায়দের যাবতীয় বৈষয়িক ধকল সামলান।
রায়কর্তারা কিন্তু মাঝে মাঝে হুঙ্কার ছাড়েন। ছোটখাটো বিষয়ে জোরালো মতামত প্রকাশ করে বাড়িতে নিজেদের মান রক্ষার চেষ্টা করেন। প্রত্যেক কর্তারই ধারণা, তাঁর অন্য দুই ভাই ঘোষ অপদার্থ, সংসারের দিকে মোটে হুঁশ নেই। ভাগ্যিস তিনি একটু-আধটু নজর দেন এদিকে, নইলে সব গোল্লায় যেত। অবশ্য গিন্নিরা কর্তাদের সাংসারিক বুদ্ধি নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করেন, আর ভুবনবাবু তো কর্তাদের পাত্তাই দেন না।
শনিবার দুপুর, বেলা প্রায় তিনটে বাজে। রায়বাড়ি নিঝুম। বোঝা যায়, বাড়ির লোকজন ঘুমুচ্ছে বা গড়াচ্ছে। একটা মোটর গাড়ি থামল বাড়ির উঠোনে। বড় রায় ঢুকলেন সদর দরজা দিয়ে। বাইরের ফটকের মতো সদর দরজা সর্বদা হাট করে খোলা থাকে। দারোয়ান একজন আঠে বটে, কিন্তু সে নিজের কুঠুরিতে বসে খানা পাকায় বা ভজন গায়। মাঝে-মাঝে গোরু ছাগল ঢুকে পড়লে তাড়ায়। মানুষের আসা-যাওয়া নিয়ে মাথা ঘামায় না।
বড় রায়ের মিটিং ছিল ক্লাবে। কম মেম্বার উপস্থিত হওয়ায় মিটিং হয়নি, ভেস্তে গেছে। তাই অগত্যা অসময়ে বাড়ি ফিরেছেন।
সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁপাশে বৈঠকখানা ঘর। ঘরে আছে কয়েকটা পুরনো চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চি ইত্যাদি আসবাব। দরজা থেকে সোজা চোখে পড়ে দেওয়ালে ঝোলানো একটা মস্ত ঘড়ি। তার পেন্ডুলামটি দিবারাত্রি টকটক করে দুলছে। একটু কম পরিচিত আগন্তুককে এই ঘরে বসানো হয়।
রায়বাবু বৈঠকখানার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার ভিতরে উঁকি মারলেন।
ফাঁকা ঘর, কেবল একটি লোক পিছন ফিরে মুখ উঁচু করে দেওয়ালঘড়িটা দেখছে। লোকটির গায়ে ময়লা শার্ট ও ধুতি। ছোটখাটো চেহারা।
রায় থামলেন। ‘এই, কে তুমি?’
লোকটি ঘাড় ফেরাল। বোকা-বোকা মুখে কাঁচুমাচু হাসি। ‘এজ্ঞে ঘড়িটা দেখছি।’
‘কেন, ঘড়ির কী হল?’
‘এজ্ঞে, মানে টাইমটা ঠিক—’
‘ও, তুমি কি ঘড়ির দোকান থেকে এসেছ?
‘এজ্ঞে।’ লোকটি হাত কচলাতে কচলাতে মাথা নাড়ল।
‘কে খবর দিল?’
‘এজ্ঞে বাবু।’
‘কোন্ বাবু।’
লোকটি বেশ নার্ভাস হয়ে পড়ে। ‘তা জানি না স্যার, মালিক জানে। আমি কর্মচারী। দূর থেকে দেখেছি বাবুকে। ফর্সা লম্বা। মুখ দেখিনি।’
তিন রায়ই ফর্সা এবং লম্বা। ঠিক কোন্ জন, তা বোঝা গেল না।
বড় রায় বললেন, ‘কী বলেছে? অয়েলিং করতে? টাইম ঠিক দিচ্ছে না?’
‘হ্যাঁ, বাবু।
‘বাস্ আর কিছু নয়?’ রায় রেগে ওঠেন।
‘মানে আমি তো ঠিক জানি না, মালিক জানো।’ লোকটি বেজায় ঘাবড়ে যায়।
বড় রায় জোরে জোরে চিন্তা করেন। ‘নিশ্চয় কানুর কীর্তি। ও সেদিন বলছিল ঘড়িটা দেড় মিনিট স্লো যাচ্ছে, অয়েলিং করা দরকার, দোকানে খবর দিতে হবে, হুম্।’
কানু হচ্ছে মেজ রায়ের ডাক-নাম।
বড় রায় লোকটিকে বললেন, ‘এ-ঘড়ির বয়স কত জান? ফটি ইয়ারস। চল্লিশ বছর। ওয়াচম্যান অ্যান্ড গ্র্যান্ডসন্স-এর তৈরি। খাঁটি বিলিতি জিনিস। আজও এক্কেবারে করেক্ট টাইম দেয়। মাত্র দু-এক মিনিট এদিক ওদিক হয় দৈবাৎ। ওটা সমস্যাই নয়। কিন্তু বাজনাটা খারাপ হয়ে গেছে। সেকথা বলেছে কি? প্রত্যেক ঘণ্টায় বিউটিফুল বাজনা বাজত। যেন জল-তরঙ্গের শব্দ। শুধু টাইম ঠিক করে দিলেই বুঝি হয়ে গেল? কানের মাথা খেয়েছে সব। ওহে, তোমার মালিককে বলবে বাজনাটা ঠিক করে দিতে। মনে থাকবে? :
‘এজ্ঞে স্যার।’
বড় রায় গটগট করে ভিতরে চলে গেলেন।
ঘড়ির দোকানের লোকটি একটা ভারী কাঠের টেবিলে জাপটে ধরে তুলে পা পা করে ঘড়ির নিচে আনছে। তখুনি মমস করে হেঁটে বৈঠকখানার সামনে থমকে দাঁড়ালেন মেজ রায়। পরনে তাঁর সুটবুট, হাতে জ্বলন্ত চুরুট।
চমকে গিয়ে লোকটি ধড়াম করে টেবিলটা মেঝেয় নামাল।
শনিবার হাফ-ডে হলেও মেজ রায় পুরো অফিস করেন। কিন্তু আজ হঠাৎ অফিস পাড়ায় লোডশেডিং হতে গরমে টিকতে না পেরে তিনি পালিয়ে এসেছেন। অফিসের গাড়ি তাঁকে গেটের বাইরে নামিয়ে দিয়ে গেছে। মেজাজ তেতেই ছিল। কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘হ্যাল্লো, কে তুমি? কী করছ এখানে? টেবিলটা এত জোরে ফেললে কেন?’
লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘এজ্ঞে ঘড়িটা পাড়ব, তাই টেবিল আনছিলাম।—’
‘কেন পাড়বে? হোয়াই?’
‘ঘড়িটা ঠিক করতে হবে কিনা, তাই দোকানে নিয়ে যাব। আমি ঘড়ির দোকান থেকে আসছি।’
‘অলরাইট, টাইমটা ভালো করে অ্যাডজাস্ট করবে, বড় স্লো যাচ্ছে।’
লোকটি ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আর বাজনাটাও ঠিক করতে হবে।’
‘বাজনা?’ ভুরু কোঁচকালেন মেজ রায়।
লোকটি তাড়াতাড়ি বলল, ‘বাবু বলে গেলেন।
হুঁ, বড়দা বলে গেছে। বড়দার গাড়ি দেখলাম বাইরে। মনে মনে ভাবলেন মেজো রায়। বড়দার কেবল ওই বাজনা নিয়ে যত মাথাব্যথা। হোপলেস।
মেজ রায় গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বুঝলে হে, ঘড়ির আসল ডিউটি হচ্ছে ঠিক সময় দেওয়া। টাইম ফার্স্ট, মিউজিক নেক্স্ট। মাইন্ড দ্যাট।’
লোকটি হাত কচলাতে কচলাতে জানাল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
দোকানের লোকটির বিবেচনায় সন্তুষ্ট হয়ে চুরুটে লম্বা টান দিয়ে মেজো রায় বাড়ির ভিতর পা বাড়ালেন।
ঘড়িতে সুবিধেমতো হাত পাওয়া যাচ্ছে না। বেশ উঁচুতে ঝোলানো। কীভাবে কায়দা করে নামানো যায় ভাবছে লোকটি। এমন সময় চটির ফটর ফটর আওয়াজ। দরজার গোড়ায় ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত ছোট রায়ের আবির্ভাব হল।
ছোট রায় কলেজ থেকে ফিরছেন। বিকেলে শিক্ষা প্রসার সমিতির মিটিং আছে পাড়ায়, তাই চলে এসেছেন। একজন লোককে টেবিলে চড়ে দু হাতে তুলে ঘড়িটা ধরে বিচিত্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘কী করছ হে? ঘড়িতে দম দিচ্ছ নাকি?’
থতমত খেয়ে লোকটি বলল, ‘এজ্ঞে না।’
‘তবে?’
‘ঘড়িটা দোকানে নিয়ে যাব, তাই নামাচ্ছি।’
‘দোকানে কেন?’
‘মেরামত করতে হবে। আমি ঘড়ির দোকানের লোক।’
‘কে সারাতে বলেছে?’ ছোট রায় জানতে চাইলেন।
‘এজ্ঞে, বাবু।’
ছোট রায় বুঝলেন, তাঁর দুই দাদার কেউ। জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবুর সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে?’
লোকটি ঘাড় কাত করে জানাল, হ্যাঁ।
‘তা ঘড়ি কীভাবে নামাবে তার কিছু উপায় বলেছেন বাবু?’
লোকটি এপাশ-ওপাশ মাথা দোলাল। অর্থাৎ না।
ছোট রায়ের ঠোটে একটু বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। হুঁ, দাদাদের কাণ্ডই এইরকম। স্রেফ অর্ডার দিয়েই খালাস। বেচারা কেমন মুশকিলে পড়েছে।
তিনি লোকটিকে বললেন, ‘ওভাবে হবে না। একটা মই চাই। কিন্তু মইটা যে রেখেছে কোথায় কে জানে। তা যাকগে, এক কাজ করো। ওই টুলটা আনো। রাখো টেবিলের ওপর।’
লোকটি সরু নড়বড়ে টুলখানা এনে টেবিলের ওপর রাখল।
‘ওঠো, ওঠো, ভয় নেই।’ রায় দোকানের লোকটিকে উৎসাহ দিলেন, ‘আমি ধরছি।’
‘এজ্ঞে আপুনি বাবু?’ লোকটি ইতস্তত করে।
‘তাতে লজ্জা কী? চড়ে পড়ো টুলে।’
ছোট রায় হাতেকলমে সমাজসেবী। এই সামান্য কাজের জন্য বাড়ির চাকরবাকরদের ডাকাডাকি করার মানে হয় না। তিনি কোঁচা সামলে শক্ত মুঠোয় টুলের পায়া চেপে ধরলেন। ঘড়ি সমেত লোকটি মাটিতে নামল। রীতিমতো ভারী ঘড়ি। দু হাত আঁকড়ে বগলদাবা করে রাখতে হয়েছে। রায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কদ্দুর যাবে?’
‘এজ্ঞে ধর্মতলা।’
‘যাবে কীসে?’
‘টেরামে।’
‘আরে দূর, ট্রামে এই ঘড়ি নিয়ে উঠতেই পারবে না, যা ভিড়।’
‘তবে হেঁটে যাই।’
‘না না। এতখানি পথ হাঁটবে কী! বরং রিকশায় যাও। এই নাও—’ রায় একখানা নোট লোকটির হাতে গুঁজে দিলেন, ‘ভাড়া।’
কৃতার্থ মুখে পেন্নাম জানিয়ে লোকটি ঘড়ি বগলে গুটগুট করে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। ছোট রায়ও চটি ফটর ফটর করতে-করতে দোতলায় উঠলেন।
বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ। দোতলায় বারান্দায় তিন রায়-কর্তা চেয়ারে পাশাপাশি বসেছেন, হাতে চায়ের কাপ।
বড় রায় প্রথমে কথা পাড়লেন।
‘কানু, তুই ঘড়ির দোকানে খবর দিয়েছিস, ভেরি গুড। কিন্তু শুধু অয়েলিং আর টাইমের কথা বলেছিস কেন? বাজনাটার কথাও তো বলতে হয়। ভাগ্যিস দোকানের লোকটার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল, নইলে ঘণ্টাটা আর মেরামতই না।’
মেজ রায় অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি? আমি আবার ঘড়ির দোকানে গেলাম কখন? আমি তো ভাবলাম তুমি কিংবা বলাই খবর দিয়েছ।’
বলাই অর্থাৎ ছোট রায় সরবে বলে উঠলেন, ‘না না, আমি নই। আমি তো ভাবলাম তোমরা কেউ বুঝি ঘড়িটা সারাতে পাঠাচ্ছ।’
বড় রায় হতভম্বের মতো বললেন, ‘সে কী, লোকটা যে বলল এই বাড়ির বাবু গিয়েছিল খবর দিতে, ফর্সা লম্বা।’
চায়ের কাপ খট্ করে সামনের টেবিলে নামিয়ে রেখে তিনি ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালেন, ‘লোকটা চলে গেছে ঘড়ি নিয়ে?’
‘হ্যাঁ গেছে। আমি দেখেছি।’ জানালেন ছোট রায়।
ধপাস্। বড় রায় ফের চেয়ার নিলেন। ‘দোকানের ঠিকানাটা বলেছে কি?’ করুণ কণ্ঠে তিনি জানতে চাইলেন।
‘উহুঁ।’ হতাশ ছোট রায়ের জবাব। ‘ও শুধু বলল, ধর্মতলা।’
তিন কর্তাই চুপ। গম্ভীর বদন, উদাস নয়ন। তাঁরা তিনজনের কেউই নয়। ভুবনবাবু বেঁটেখাটো শুকনো এবং কৃষ্ণকায় ব্যক্তি। এ-বাড়ির আর কাউকে তো বাবু বলে ভুল করার কারণ নেই। তবে?
একটা বিচ্ছিরি আশঙ্কা তিনজনের মনেই চকিতে উদয় হয়। চোর নয় তো? বেটা তিন কর্তার নাকের ডগা দিয়ে ঘড়ি হাতিয়ে চম্পট দিল নাকি?
বড় রায় দু চুমুকে চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্য দুই ভাই। যে যার ঘরের উদ্দেশে রওনা দিলেন। চটপট পোশাক পরে বেরিয়ে পড়তে হবে। একটু পরেই আবিষ্কার হবে, ঘড়ি নেই। তারপর শুরু হবে হইচই। সুতরাং আগেই সরে পড়া উচিত।
রায়বাড়ির বৈঠকখানার দেওয়াল ঘড়ি আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। ঘড়ির রহস্যময় অন্তর্ধান নিয়ে প্রচুর জল্পনাকল্পনা খোঁজখবর হয়েছিল। কিন্তু কিছু হদিশ মেলেনি। রায়কর্তাদের কানেও অনেক ঘড়ির কথাটা তুলেছিল। কিন্তু, এই তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে তাঁরা মোটে গা-ই করলেন না।
[আনন্দমেলা এপ্রিল, ১৯৭৭ ]
