রহস্য উদ্ঘাটন
শিব জানাল, উঃ, গোয়েন্দাগিরি বড্ড রিস্কি কারবার।
কেন?—দেবুর প্ৰশ্ন।
—কাল বুঝলি, খেলার পর সন্ধ্যায় বাড়ি পৌঁছে মনে হল সাধুচরণের ঘরে একবার ঢুঁ মেরে আসি। গেলাম তাই। তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। ঘোষবাগান আর সাধুর ঘরের আশপাশ একদম আবছা। বাগানের ভিতর থেকে লক্ষ করলাম, সাধুর ঘরের পাশে দুটো ছায়ামূর্তি কথা বলছে। একজনকে চিনলাম সাধুচরণ—ওর গলা শুনেই। কিন্তু অন্যজনকে চিনতে পারলাম না। তার গলা শুনতে পাচ্ছিলুম না। আর সে আমার দিকে পেছন ফিরে ছিল। সাধুর ঘরে কুপি বা লণ্ঠনের আলোর যে সামান্য আভাটুকু পড়েছিল দুজনের গায়ে তাতেও বুঝলাম না, লোকটা কে?
আরও ভালো করে দেখতে যেই কাছে গিয়েছি, অমনি সাধুচরণের কুকুরটা কোথায় ছিল ঘাপটি মেরে, একেবারে ঘাউ ঘাউ করে তেড়ে এল আমায়। বেটা দেশি বটে কিন্তু ইয়া তাগড়া আর কী তেজ! মারলাম টেনে ছুট। সাধুও বারকয়েক পেছন থেকে হাঁক পাড়ল কে কে ঘুরে। তবে কুকুরটা ধরতে পারেনি এই রক্ষে। বাগান পেরিয়ে, নদীর চড়া ঘুরে গ্রামে ঢুকেছি।
দেবু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,—ডিটেকটিভগিরি রিস্কি কাজ বইকি। সবে তো শুরু। এরপর কত খুনে গুন্ডার তাড়া খাবি। কানের পাশ দিয়ে গুলি ছুটবে। গল্পের গোয়েন্দাদের গায়ে অবশ্য গুলিটুলি লাগে না। সবসময় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায়। তবে সত্যি গোয়েন্দার অত সৌভাগ্য হবে কিনা বলা শক্ত।
দেবুর রসিকতা মোটেই উপভোগ করে না শিব। নিজের গালে হাত বুলিয়ে বলে,—ওঃ ছড়ে গেছে গায়ে।
অন্য লোকটিকে তাহলে চিনতে পারিসনি? দেবুর কণ্ঠে আর ঠাট্টার ছোঁয়া নেই।
—উঁহু। গায়েকালো রঙের আলোয়ান ছিল। মাঝারি হাইট। ভারী চেহারা।—এইটুকু বুঝতে পেরেছি।
দেবু ভুরু কুঁচকে ভেবে বলে,—ঘোষমশাইয়ের একটা গাঢ় নস্যি রঙের আলোয়ান আছে। অল্প আলোয় সেটা কালো দেখাতে পারে। হাইট গড়ন মোটামুটি মিলে যাচ্ছে। হয়তো ক্ষমাপতিবাবুই ফের এসেছিলেন চক্রান্তটা পাকা করতে। সাধুচরণকে ইদানীং গাঁয়ের ভিতর যখন তখন ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে। আমি লক্ষ করেছি।
আমি আর সাধুচরণের ঘরের বেশি কাছে ঘেঁষছি না। বাপরে, কুকুরটা ডেঞ্জারাস।—বলল শিব।
দেবু বলল,—দরকার নেই বেশি কাছে গিয়ে। সন্দেহ করলে সাবধান হয়ে যাবে। হয়তো পেছিয়ে দেবে প্ল্যানটা। তৈরি থাক। কিছু ঘটলেই সাধুচরণকে ক্যাঁক করে ধরব
গোয়েন্দা মানিকজোড়কে অবশ্য বেশিদিন অপেক্ষায় থাকতে হয়নি।
দুটো দিন বাদে রাত আটটা নাগাদ। মাঘের শীতে গ্রাম তখন জড়সড়, নিঝুম। চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুম জড়ানো চোখে শিব পড়া করছিল। এবার খেতে যাবে। আগুন আগুন’–বহু কণ্ঠের চিৎকার হট্টগোল কানে আসতে শিবের ঝিমুনি কেটে গেল। সে দুই লাফে বেরুল পথে।
পুব পাড়ার আকাশটা লাল হয়ে গেছে। শিব দৌড়ল সেদিকে।
বাড়ি বাড়ি দরজা খুলে যাচ্ছে। নানান বয়সি ছেলে পুরুষ ধেয়ে চলেছে পুব পাড়ার দিকে। বাড়ি বাড়ি দাওয়ায় ছাদে দরজায় কৌতূহলী সন্ত্রস্ত মেয়েদের জটলা। সবার চোখ ওই রাঙা আকাশ পানে।
আগুন লেগেছে বিধু দাসের উঠোনের কোণে খড়ের গাদায়। লোকসান তেমন কিছু হবে না। কারণ খড়টা নতুন নয় পুরনো। কদিন আগে একটা ঘরের চালা নতুন করে ছেয়ে, পুরনো খড় ডাঁই করে রাখা হয়েছিল। তাতেই লেগেছে আগুন। ওই বাজে খড়ের জন্য মাথা ব্যথা নেই বিধু দাস বা পাড়ার কারও। ভয়টা, পাছে আগুন ছড়ায়। কাছাকাছি অনেক খড়ের ঘর।
আগুনকে সহজে বাগ মানানো যাচ্ছে না। কিছু খড় ভিজে ছিল ফলে ধোঁয়া উঠছে প্রচুর। খড়ের গাদায় নিশ্চয় পাটকাঠি ও কাঁচা বাঁশের টুকরো ছিল। ফাটছে সেগুলো ফটাস্ ফটাস্ শব্দে পটকার মতন। লোকে চমকে উঠছে।
জল ঢালা হচ্ছে, বাঁশ দিয়ে পেটানো হচ্ছে জ্বলন্ত খড়ের স্তূপ। তবে যেমন দস্তুর, ভিড়ে আসল কাজের লোকের চেয়ে হাঁক ডাকের লোকই বেশি।
শিব দেখল, দেবু হাজির। দেবু হঠাৎ বলল শিবকে,—সাধুচরণকে তো দেখছি না। চ বোস বাড়ি।
পূবপাড়াতেই ক্ষমাপতি ঘোষ এবং নরহরি বাসের বাড়ি। যাবার সময় দেবুরা দেখল ঘোষবাড়ির সামনে বাড়ির মেয়েরা ভিড় করে রয়েছে। ক্ষমাপতিবাবু ছাড়া অন্য পুরুষদের দেখা নেই। তারা বোধহয় অকুস্থলে। ক্ষমাপতিবাবুকে দেখা গেল মেয়েদের পেছনে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে।
নরহরি বোসের বাড়িতেও ওই একই দৃশ্য। পরিবারের মেয়েরা কিছু সদর দরজায়, কেউ কেউ ছাদে। সবারই উৎসুক চোখ অগ্নিকাণ্ডের দিকে। নরহরিবাবুর দেখা মিলল না। বাড়ির অন্য পুরুষরাও নেই।
মিনিট দুই বোসবাড়ির কাছে অপেক্ষা করে দেবু বলল,—এখানে লাভ নেই। চল সাধুচরণের ঘরে। আগুন লাগার সুযোগে কিছু হাতিয়ে নিয়ে যদি ও ঘরে ফেরে ধরব।
সাধুচরণের কুটিরে আলো নেই। চারপাশ নিস্তব্ধ। দূর হতে ভেসে আসছে অগ্নিকাণ্ড ঘিরে বহুজনের কলরব। দেবু ও শিব ঘোষ বাগানের আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে সাধুচরণের কুটিরের ওপর নজর রাখে। বেশি কাছে ঘেঁষতে ভরসা হয় না। সাধুর কুকুরের ভয়ে। তবেতাদের মনে হল কুকুরটা সেখানে নেই। পাড়ার বেশির ভাগ সারমেয়ই গিয়ে জুটেছে দাস বাড়ির কাছে অমন উত্তেজনার খোরাক পেয়ে। তবে মানুষের চেয়ে তাদের আগুনে ভয় বেশি। তাই মানুষের দঙ্গলের পেছনে থেকে ডাকছে প্রাণপণে। আবার ফাঁকে ফাঁকে পরস্পরকে দাঁত খিঁচোচ্ছে এবং দু-এক রাউন্ড লড়াইও করে নিচ্ছে।
সহসা এক ছায়ামূর্তির আবির্ভাব ঘটে সাধুচরণের কুটিরের কাছে। সাধুর ঘরে মিটমিটে আলো দেখা যায়। নিঃশব্দে পায়ে পায়ে গিয়ে দেবুরা উঁকি মারে ঘরে, ভেজানো দরজায়, সামান্য একটু ফাঁক দিয়ে।
ঘরে একটা কুপি জ্বলছে। সাধুচরণ মেঝেতে উবু হয়ে বসে। তার সামনে দুটো বড় বড় পেটমোটা থলি মাটিতে শোয়ানো। হাঁপাচ্ছে সাধু। হয়তো ওই ভারী থলে দুটো বয়ে আনার পরিশ্রমে।
ক্যাচ্। ভালোমতো দেখার চেষ্টায় শিব দরজার কবাট একটু ঠেলতেই সামান্য শব্দ হয়। চকিতে ঘাড় ফেরায় সাধু দরজার পানে। বলে—‘কে?’
দেবু শিবের কনুইয়ে টান মেরে ইঙ্গিত করে হাট করে খুলে দেয় কবাট দুটো। দাঁড়ায় দরজা আগলে।
সাধুচরণ দুজনকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে বলে,—তোমরা এখানে? কী চাই?
দেবু সোজা থলে দুটোর পানে আঙুল দেখিয়ে প্রশ্ন করে,—ও দুটোয় কী আছে?
সাধুচরণের চোখ ধক্ধক্ করে ওঠে, চাপা গর্জন ছাড়ে,– বেরোও। বেরিয়ে যাও। ডেঁপোমি হচ্ছে। এক ফোঁটা ছোঁড়া।
দেবু বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল,—বেশ যাচ্ছি। তবে কোথায় যাব জান? পুলিশে।
পুলিশে কেন?—সাধুচরণের কণ্ঠে আর্ত উদ্বেগ ফোটে।
পুলিশ এসেই বের করুক কী চোরাই মাল আছে থলে দুটোয়।—দেবু এক পা পেছোয়।
দাঁড়াও।—সাধুচরণের স্বর খাদে নামে। সে খানিক গুম মেরে থেকে বলল,—উত্তম। দেখ, কী আছে এতে? কী ধন দৌলত।
সাধুচরণ একটা থলির মুখ ফাঁক করে টেনে যা বের করল দেখে শিব ও দেবু থ। তারা নিজেদের চোখকেই বুঝি বিশ্বাস করতে পারে না।
একটা প্রকাণ্ড লাউ।
বিনা বাক্যব্যয়ে সাধু দ্বিতীয় থলি থেকেও বের করে আনে অনুরূপ আকারের এক বিশাল লাউ। তার বিদ্রূপমাখা দৃষ্টি ফেরে দেবুদের মুখে। নীরবে তাকিয়ে থাকে।
একী? লাউ! কাদের বাড়ির?—শিবের বিস্মিত প্রশ্ন।
একটা ক্ষমাপতিবাবুর। আর একটা নরহরি বোসমশায়ের বাড়ির। সাধুর জবাব।
—এই জন্যে এত কাণ্ড! ঘোষমশাইয়ের সঙ্গে ষড়যন্ত্র? যাঃ!
শিবকে থামিয়ে দেয় সাধুচরণ,—শুধু ঘোষমশাই নয় নরহরি বোসও আছেন এই ষড়ে। তাঁদের কথাতেই আমি একাজ করেছি। চুরি বিদ্যে ছেড়ে দিয়েছিলেম। নেহাতই ওঁনাদের একান্ত অনুরোধ ফেলতে পারলেম না।
একজন অপরজনের বাড়ির লাউ চুরি করিয়েছেন বুঝি তোমায় দিয়ে?—দেবুর জিজ্ঞাসা।
—মোটেই লয়। যে যা নিজের বাড়ির লাউ সরাবার অর্ডারই দিয়েছিলেন আমায়। দুই কর্তাই জানেন পুরো ব্যাপার। দু দিন বাদে এই লাউ দুটো যেত লাভপুরের কম্পিটিশনে।
সাধুদা, একটু খুলে বল প্লিজ। কিস্সু মাথায় ঢুকছে না।
—শিবের কাতর অনুরোধ।
সাধুচরণ সামলে নিয়েছে তার হতচকিত ভাব। সে বলল,—বসো বলছি সব। তা একখান রহস্যই বটে। সময় নাই। এখুনি মাল পাচার করতে হবে। অল্প কথায় বলি—
সাধুচরণ যা বলল শুনে দেবু ও শিব হতবাক।
গ্রামের সবাই জানে পুবপাড়ার ঘোষ ও বোস পরিবারের মধ্যে আদায় কাঁচকলা সম্পর্ক যা জানে না তা হল, দুই বাড়ির দুই বৃদ্ধ কর্তারা এই ঝগড়াঝাটিতে মোটে সায় নেই। তাঁরা ছেলেদের নিরস্ত রতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। ছেলে বৌ বৌমাদের দাপটে নিরীহ ক্ষমাপতি ও নরহরি পরস্পরকে এড়িয়ে চলেন বাইরে। ভান দেখান যেন তরও বুঝি ক্ষুব্ধ। কিন্তু ফঁক পেলেই দুজনে কথাবার্তা বলেন গোপনে। দুঃখ করেন। নিভৃত দবার আড্ডাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই বৃদ্ধ মর্মাহত। অথচ পুরনো দিনগুলি ফিরে পাবার উপয় খুঁজে পান না। ঝগড়া কমরা লক্ষণ নেই। বরং লাভপুরে কদিন বাদে কৃষি প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে দুই বাড়ির মন কষাকষি আরও বাড়বে হয়তো।য
প্রতি বছর লাভপুরে কৃষি প্রদর্শনীতে নানান ফুল ফল ও তরকারি ফলনের প্রতিযোগিতা হয়। আশপাশের চাষীরা যোগ দেয় তাতে। সেরা ফুল ফল তরকারির জন্য দেওয়া হয় মানপত্ৰ পদক অর্থপুরস্কার। এই প্রতিযোগিতায় ফাস্ট সেকেণ্ড হওয়া রীতিমত গৌরবের ব্যাপার। স্বয়ং কৃষিমন্ত্রী ও জেলা ম্যাজিস্ট্রট আসেন পুরস্কার বিতরণ করতে।
এবার নরহরি বোসের এক ছেলে যোগাড় করে আনে স্পেশাল জাতের লাউয়ের বীচি। তাই থেকে চারা জন্মায়। খবরটা চলে যায় ঘোষবাড়িতে ক্ষমাপতিবাবুর ছেলের কাছে। দুই বাড়িতেই দুপক্ষের চর আছে দুই বাগাল ছেলে। তারা নিয়মিত উৎকোচ পেয়ে থাকে দু বাড়ির গোপন খবর সরবরাহের বিনিময়ে। ব্যাস, স্পেশাল সেই লাউয়ের বীচি, চর মারফও চুরি হয়ে আসে ঘোষ-বাড়িতে। তাই থেকে চারা তৈরি হয় সেখানেও।
এদিকে বোসবাড়িতে খবর যায় ঘোষেরাও এবার কম্পিটিশনের জন্য লাউ ফলাচ্ছে। চারা তুলেছে। তবে সে েচারার বীচি যে কোত্থেকে এসেছে, খবরটা ফাঁস হয়নি।
অমনি বোসবাড়ি খোঁজ রাখে ঘোষেরা লাউগাছে কী কী সার দিচ্ছে। খবর আসে ওরা নাকি স্পেশাল স্যর দেবে লাউয়ের সাইজ বাড়াতে। বোসবাড়ির চর ঘোষেদের লাউ গাছে দেওয়া স্পেশাল সারের ভোজের খবর পৌঁছে দিতে থাকে নরহরিবাবুর ছেলেদের।
স্পেশাল বীচি এবং স্পেশাল সার। ফলে দুই বাড়ির লাউ গাছই হয় দারুণ তেজী। লাউও ধরে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড। কে কাকে দেখে? গোপনে মাপা হয়, কার লাউ বেশি বড়। লাউ গাছ পাহারা দেয় দুপক্ষই, পাছে অন্যে তাদের গাছের ক্ষতি করে বা চুরি করে সবচেয়ে বড় লাউটা।
লাউ নিয়ে এই নতুন বিবাদের সূত্রপাত থামাতে চেয়েছিলেন দুই কর্তা। যথারীতি ব্যর্থ হন। তবে এ ব্যাপারে যে দু পক্ষের ছেলেরাই অসৎ আচরণ করেছে, কর্তারা তা জানতে পারেন মাত্র কদিন আগে। অর্থাৎ ক্ষমাপতি জানলেন যে তাঁর ছেলে চুরি করেছে ওদের স্পেশাল লাউয়ের বীচি এবং নরহদ্দিরর গোচরে এল যে তার ছেলেরা লুকিয়ে জানছে ওদের স্পেশাল সারের ফর্মুলা। দুই কর্তাই পরস্পরের কাছে পুত্রদের জন্য ক্ষমা চাইতে গিয়ে বুঝলেন দুপক্ষের ছেলেরাই সমান দোষী।
দুই কর্তাই বেজায় চটে গেলেন। বুঝিয়ে শুনিয়ে রাগ দেখিয়ে অবাধ্য গোঁয়ার ছেলেদের শায়েস্তা করার সাধ্য নেই তাঁদের। তাই তাঁরা অন্য পন্থা ধরলেন। দুজনে যুক্তি করে সাধুচরণকে ভার দিয়েছেন দুই গাছের সব চাইতে বড় দুটো লাউ হাপিজ করার। যে দুটো রাখা হয়েছে কম্পিটিশনে পাঠাবার উদ্দেশ্যে।
দুই পরিবারের মধ্যে আর ঝগড়া না করাই মঙ্গল। যেই ফার্স্ট হবে, অন্য পার্টি তাকে ফের জব্দ করার ধান্দায় থাকবে। ফলে গণ্ডগোল গড়াবে। তার চেয়ে কারুর বরাতেই ফার্স্ট প্রাইজ না জোটা ভাল।
দেবু শিব মুখ চাওয়া চাওয়ি করে মাথা নাড়ল। দেবু বলল, —নাঃ, থানা পুলিশে দরকার নেই। আমরা বলব না কাউকে এ ব্যাপার।
বেশ বেশ। এই হচ্ছে উচিত বিবেচনা।—সাধুচরণ হাঁপ ছাড়ে খুশিতে : আরে বাপু, আমি হচ্চি সাধুচরণ। এ লাইনে পাঁচজনা মান্যি করে আমায়। রিটায়ার করেচি। তবু যে একাজে হাত দিলেম দশের মঙ্গলের জন্যেই। টাকার লোভে নয়। বোসদের গুন্ডা মেজ ছেলেটা আর ঘোষ বাড়ির খেঁকি কুকুরটার পাহারা এড়িয়ে পনেরো মিনিটের মধ্যে এই দুই পেল্লাই লাউ সরানো যার তার কম্ম নয়। এ শর্মা ভিন্ন এ তল্লাটে আর কে পারবে? কর্তারা অবশ্য পান খেতে দিয়েছেন সামান্য। লাউ পিছু কুড়ি টাকা নগদ। আর লাউ দুটো ফাউ। তা একরকম ফ্রি-তেই করে দিলেম বলতে পার।
তা বটে।—বলল শিব : আগুন কি তুমিই লাগিয়েছিলে?
—হ। একটা গোলমাল পাকালে মাল হাতাতে সুবিধে।
লাউ দুটো নিয়ে করবে কী? খাবে বুঝি?—শিবের জিজ্ঞাসা।
—বাপরে, এ দুটো দিয়ে তো গোটা গাঁয়ে ভোজ লাগানো যায়। এ বস্তু এখুনি পাচার করতে হবে নইলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।—বলেই সাধুচরণ দরজার কাছে গিয়ে একটা তীক্ষ্ণ শিস্ দিল।
একটু বাদেই ঘরে ঢুকল বছর কুড়ির এক ছোকরা। তার পাকানো শরীর। মিশকালো রং এমন নিঃসাড়ে ঢুকল যে প্রথমে টেরই পায়নি দেবুরা।
সাধুচরণ দ্রুত বলে গেল ছেলেটাকে,—গুটে, চটপট লাউ দুটো কেটে ফেল। তারপর থলেতে ভরে নিয়ে যা। এক টুকরো আমার মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দিবি কাল। বলবি আমার গাছের লাউ পাঠিয়েছি। দুটুকরো তোর বরাদ্দ। বাকি অংশগুলো ফেলে দিবি নদীর ধারে।
গুটে নীরবে একটা বড় ছুরি বের করে খচখচ্ করে লাউ দুটো টুকরো টুকরো করে ফেলল। তারপর খণ্ডগুলো একটা থলিতে ভরে কাঁধে ফেলে উঠে মিলিয়ে গেল বাইরে অন্ধকারে।
সাধুচরণ বলল,—এবার যাও তোমরা। আমিও বেরুব। দেখি কী ঘটছে?
—আচ্ছা সাধুদা, সেদিন সন্ধ্যায় কে এসেছিল তোমার কাছে? যেদিন তোমার কুকুরটা আমায় তাড়া করেছিল?—শিব কৌতূহল চাপতে পারে না।
—ও তুমি পিছু লেগেছিলে? আমি ভাবলেম বুঝি পেয়ারা চোর। উনি ছিলেন বোসমশাই। তিনজনে বাইরে এল। তখনো পুবপাড়ায় হইচই চলছে। আগুনের আভাটা যদিও আর নেই। সহসা শিব ও দেবুর খেয়াল হল যে সাধুচরণ উধাও হয়েছে। দুই বন্ধু চলল দাসবাড়ির উদ্দেশে।
দেবুরা ক্ষমাপতিবাবুর বাড়ির সামনে এসে দেখে মস্ত জটলা। ঘোষবাড়ির সবাই ভীষণ উত্তেজিত। রান্নাঘরের চাল থেকে কম্পিটিশনের জন্য রাখা লাউখানা চুরি আবিষ্কার হয়ে গেছে।
এ নির্ঘাৎ বোসেদের কীর্তি। ক্ষমাপতিবাবুর ছেলে দলবল জুটিয়ে তড়পাতে তড়পাতে চলল নরহরি বোসের বাড়ির দিকে। কিন্তু মাঝপথে তাদের সঙ্গে মোলাকাত হল বোসবাড়ির লোকজনের। তারাও আবিষ্কার করেছে যে তাদের কম্পিটিশনের লাউ উধাও এবং ঘোষদের চোর ঠাউরে আসছে হুঙ্কার দিতে দিতে।
পুরো ব্যাপার শুনে দু পার্টিই হতভম্ব। দু দলই অন্যজনের বাড়ি গিয়ে যাচাই করে দেখে এল ঘটনাটা সত্যি কিনা।
এবার দুপক্ষই গিয়ে বসল ঘোষবাড়ির আঙিনায়। দু দলই সন্দেহ প্রকাশ করল যে এ নিশ্চয়ই মথুরাপুরের সাহাদের অপকর্ম। সাহারা লাউ ফলনে এক্সপার্ট। গত বছর সাহাদের লাউ ফার্স্ট হয়েছিল লাভপুরের প্রতিযোগিতায়। পাছে এবার হেরে যায় তাই এই চক্রান্ত। ফুলডাঙা গ্রামের পুবপাড়ার ঘোষ ও বোসদের সঙ্গে মথুরাপুরের সাহাদের অনেক কালের রেষারেষি।
দুঃখের বিষয়, কম্পিটিশনে নামাবার মতো বড় লাউ আর আপাতত: নেই ঘোষ বা বোসবাড়ির গাছে। এই দুটি লাউয়ের আকার যাতে খুব বাড়ে তাই কাছাকাছি আকারের বড় লাউগুলি কেটে ফেলা হয়েছে প্রথামাফিক। এখন উপায়? সাহাদের লাউকে টেক্কা দেওয়ার মতন লাউ যে নেই ফুলডাঙার কারও গাছে। ঘোষ এবং বোসবাড়ির সঙ্গে যোগ দিয়ে গোটা গাঁয়ের লোক শ্রাদ্ধ করতে লাগল মথুরাপুরের সাহাদের।
ক্ষমাপতি ও নরহরিও ছিলেন জমায়েতে। পাশাপাশি তক্তপোশে বসে চুপচাপ শুনছিলেন সব। মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়ছিলেন। অনেক চেঁচামেচির পর উত্তেজিত লোকগুলির কণ্ঠ কিঞ্চিৎ শ্রান্ত হতে ক্ষমাপতি মৃদু গম্ভীর গলায় বললেন,—নরহরি এবার তোমাদের ফুলকপি কেমন হয়েছে? কম্পিটিশনে দেওয়া যাবে?
হুঁ, তা ভালই হয়েছে। প্রাইজ পাবার মতনই।—জানালেন নরহরি।
—আমাদের বাঁধাকপির সাইজও হয়েছে খাসা। তা এবার তোমরা যদি ফুলকপি দাও, আর আমরা বাঁধাকপি পাঠাই কম্পিটিশনে? এ তল্লাটে এমন কপি আর কেউ ফলায় বলে তো জানি না। ফুলডাঙার কিছুটা প্রেস্টিজ বাঁচে। আগের বারও তো আমাদের বাঁধা আর তোমাদের ফুল ফার্স্ট প্রাইজ মেরেছিল। আসচেবার ফের লাউ নিয়ে ট্রাই করব। হয় তোমরা, না হয় আমরা, কেউ না কেউ ফুলডাঙার মুখ রক্ষা করব ঠিক। খুব জোরদার পাহারা বসাতে হবে। কী বল?
উচিত কথাই বলেচ।—নরহরি সায় দিলেন ক্ষমাপতির প্রস্তাবে। সঙ্গে সঙ্গে হইচই করে সমর্থন জানাল গোটা জমায়েত। চা সহযোগে আর এক প্রস্থ মথুরাপুরের মুণ্ডপাত করে সভা ভঙ্গ হল গভীর রাতে।
দেবু শিবও উঠল তখন
এবার আমাদের গোয়েন্দাগিরি সত্যি সাকসেসফুল।—যেতে যেতে শিবের গর্বভরে ঘোষণা।
হুঁ। তবে ভাই ফিজ মিলল না। অবিশ্যি দুই কর্তার থেকে কিছু আদায় করা যেত।—দেবু মিচকে হেসে বলে।
যাকগে।—শিবের আপসোস নেই।
এবার কিন্তু কদিন আমাদের ডিটেকটিভগিরিতে রেস্ট। পরীক্ষা আসছে। বড্ড সময় যায়।—দেবুর মন্তব্য।
তা বটে।—সায় দিল শিব।
[১৯৮৮, কিশোর ভারতী শারদীয়া]
