উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

সাজ ধরার সাজা – ৪

চার

মেলার রাস্তায় দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল নারাণ। গরম চায়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ভাঁড়ের তলায় একটা এবং ওপরে একটা আঙুল দিয়ে সাবধানে ধরেছে। ভাঁড়ে কানায় কানায় ভর্তি চা। একটু হাত কাঁপলেই চলকে গায়ে পড়বে, আঙুলে ছেঁকা লাগবে।

মানুষের জমাট স্রোত গা ঘেঁষে বয়ে চলেছে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে নারাণ। তবু কেউ কেউ তার গায়ের ওপর এসে পড়েছে। দোকানগুলোর দিকে সে মুখ করে রয়েছে। ধাক্কাটা পিঠেই লাগুক।

দাদা এট্টু সরে। একটি অদৃশ্য হাত নারাণের কোমরের কাছে আলতো ভাবে ঠেলা দিল এবং পরক্ষণেই একজন পাশ দিয়ে হুড়মুড় করে পেরিয়ে গেল।

ভাঁড়ের কিনারে ঠিক তখন ঠোঁট ঠেকিয়েছে নারাণ। কোনো রকমে বাঁচাল চা-টা। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল।

নীল রঙের শার্টের পিঠ। মাথা ঘন কালো চুল। লোকটির সঙ্গে। সঙ্গে সঙ্গে ধাঁ করে মনে জাগল—মদন

এইটুকু সে দেখতে পেল চলে যাওয়া

চমকে উঠে নারাণ তাড়াতাড়ি দু-পা এগিয়ে গেল ওর পিছনে পিছনে।

উঃ! চা চলকে পড়েছে হাতে। জামাতেও পড়েছে চা। ভাঁড়টা সে দিল ছেড়ে। চা ভর্তি মাটির পাত্র ফটাস করে আছড়ে পড়ল পায়ের কাছে।

আই ব্বাস্! —পাশেই একজন ছিটকে উঠল গরম চায়ের ছিটে পায়ে লাগাতে : এটা কী হল দাদা? দৃকপাত নেই নারাণের। সে প্রায় ছুটে এগোল। দূরে ভিড়ের ভিতর চলমান নীল শার্টকে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে। চলতে চলতে নারাণ চিৎকার ছাড়ল—মদন।

আট-দশ পা গিয়ে সে গেল আটকে।

চার-পাঁচটি যুবক হেলে-দুলে হাঁটছিল। তাদের একজনের জামার বোতামে নারাণের চাদরের সুতো গেল জড়িয়ে।

—দাদা আপনার চাদর।

হেঁচকা টানে সুতোটা ছিঁড়ে ফেলে চাদর মুক্ত করে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল নারাণ—নীল শার্ট হাওয়া। নাঃ ঠিক উধাও বলা উচিত নয়। ভিড়ের মাঝে চোখ বুলিয়ে সে বরং একের বদলে তিনটে নীল জামা আবিষ্কার করল। কিন্তু ওদের মধ্যে কে যে তার সঙ্গে কথা বলেছে ধরতে পারল না।

মরিয়া হয়ে আন্দাজে এক হাঁক পাড়ল নারাণ—মদন।

—কে মদন? কোথায়?

নারাণের চোখ-মুখের উদভ্রান্ত ভাব দেখে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল ছেলেগুলো।

কথা কয়ে সময় নষ্টের ইচ্ছে ছিল নারাণের। কিন্তু পাছে পিছনে ছুটলে লোকে নীল শার্টকে পকেটমার ভাবে এই ভয়ে সে জবাব দিল

—কই?

আমার বন্ধু। ওই যাচ্ছে।

আঃ, ছেলেগুলো আচ্ছা নাছোড়বান্দা তো।

ওই যে নীল—বলতে বলতে আর কিন্তু তখন একটাও নীল-শার্ট নজরে এল না নারাণের। তার মুখ দিয়ে একটা আক্ষেপ বেরোল—যাঃ…!

কিছু হারিয়ে গেছে বুঝি? ঘাবড়াবেন না ডেকে দিচ্ছি—বলেই প্রশ্নকর্তাটি তারস্বরে চিৎকার ছাড়ল : মদন। ও মদনবাবু।

বাকি তিনজনও তার সঙ্গে গলা মেলাল। তাদের কানে তালা ধরানো চিৎকারে মেলার লোক আঁৎকে উঠে হাঁ করে দেখতে লাগল তাদের।

একজন রোগা ঢ্যাঙা লোক এগিয়ে এসে বিরক্তস্বরে বলল—কী হল ডাকছেন কেন?

এই যে উনি ডাকছেন। একটা আঙুল নারাণকে দেখিয়ে দিল।

নারাণ থতমত খেয়ে বলল,

ওঃ।—আগন্তুক ফিরে গেল।

আজ্ঞে, আপনাকে নয়।

একটা মোটা-সোটা মাঝবয়সি ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন—কী ব্যাপার, কে

ডাকছে আমায়?

ইনি।—নারাণকে দেখিয়ে দেওয়া হল।

আজ্ঞে, আপনাকে নয়।—নারাণ অপ্রস্তুতভাবে জানাল।

ভদ্রলোক চটে গেলেন।

তবে ডাকছিলেন কেন?

আজ্ঞে আমি মদন ঘোষকে খুঁজছি। নবগ্রামের মদন ঘোষ।

ও সেটা বলবেন তো। আমি কি হাত গুনব? ঘোষ না মিত্তির।—মোটা ভদ্রলোক ফিরে চললেন।

নারাণকে সাহায্য করতে উৎসুক ছেলেগুলির মধ্যে একজন বলল,—হুঁ ঠিক! গুচ্ছের মদন তো ঘুরছে মেলায়। শুধু মদন বলে ডাকলে সব কটা সাড়া দেবে। কী নাম বললেন দাদা? মদন ঘোষ। নবগ্রাম। বেশ ডাকছি তাই—

মদন ঘোষ কে আছেন—নবগ্রামের মদন ঘোষ। আপনাকে খুঁজছে—ছোকরা বিকট হাঁক পাড়ল।

তার সঙ্গীরাও চেঁচাতে লাগল—মদন ঘোষ কে আছেন?—নবগ্রামের মদন ঘোষ—

ছোটখাটো ভিড় জমে গেল সেখানে। অনেকেই জিজ্ঞেস করতে লাগল : কী ব্যাপার মশাই? হারিয়ে গেছে?—বাড়িতে অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে বুঝি? খবর পাঠিয়েছে? ইত্যাদি—

একজন নবগ্রামের লোক দৌড়ে এল-কি হল? মদনের কী হয়েছে?

নারাণ দেখল কেলেঙ্কারী। এভাবে ডাকাডাকি করলে মদন তো দেখা দেবেই না উলটে আরও ডুব মারবে। সে তাড়াতাড়ি থামাতে গেল,—থাক থাক, এত কষ্ট করে—

আহা কষ্ট কী দাদা। আমাদের জন্যে বন্ধুকে মিস্ করলেন। জরুরি দরকার বুঝি? নারাণের হিতৈষী সেই চারজনের একজন জানতে চাইল।

তা জরুরি বটে। স্বীকার করল নারাণ দেখা পেলে উপকার হত খুব।

তবে তো এটুক করতেই হয়। পরোপকারী ছেলেগুলি একবাক্যে মত দিল।

চ, বরং ওই মোড়ের মাথায় গিয়ে ডাকি।—বলল এক জন : বংকা একটা চোঙা জোগাড় করতে পারিস।

—চোঙা কেন?

—ডাকটা জোরালো হবে।

ঠিক বলেছিস। একটা ছোঁড়া অবাক জলপান বিক্রি করছিল চোঙা ফুঁকে, আমি দেখেছি। দাঁড়া নিয়ে আসচি চেয়ে—বংকা দৌড়োল।

হুঁ, নেহাত কালা না হলে নবগ্রামের মদন ঘোষকে আমি শুনিয়েই ছাড়ব।—নারাণকে নিশ্চিন্ত করা হল।

নারাণ আরও ব্যস্ত হয়ে বলল, যাবে ঠিক। অনেক ধন্যবাদ।

থাক থাক, আমি খুঁজে নেব। ঘুরতে ঘুরতে দেখা হয়ে

ধুত্তেরি, এই করতে গিয়ে একটুও মেলা দেখা হচ্ছে না। নারাণ দেখল তার গাঁয়ের ফণী আর দুলাল আসছে। ফণী ডাকল, কীরে নারাণ একা একা? আসবি আমাদের সাথে?

নারাণ খুশি হয়ে ওদের সঙ্গে জুটে গেল। ভাবল—মদনকে ধরতে গিয়ে যা সব ঝামেলায় পড়ছি সঙ্গে দুটো বন্ধু থাকলে বুকে একটু বল পাওয়া যায়। এই রকম ঘুরতে ঘুরতেই চোখ-কান খোলা রাখলেই চলবে। মদনকে ধরে ফেললে পর তখন নাহয় বাজির কথাটা ফাঁস করা যাবে ফণীদের কাছে।