ওই চটিজোড়া কার?
কয়েকদিন কেটে গেছে। শিবকে একদিন জিজ্ঞেস করল দেবু, কীরে গোয়েন্দাগিরির ইচ্ছেটা আছে না ছেড়ে দিলি?
আলবাত আছে।—শিবের জবাব : কেস খুঁজছি। চোখকান খোলা রেখেছি। রহস্যের সন্ধান পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ব। তোকেও জানাব।
দেবু বলল,—দু একটা সাজেশান দিতে পারি?
–জরুর।
—এই অঞ্চলেই যখন কাজ করবি আপাতত, এখানকার কিছু খুঁটিনাটি ইনফর্মেশন আগে থাকতে জানা থাকলে সুবিধে হত। তাই নয়কি?
–কী রকম ইনফর্মেশন
এই যেমন ধর, আশেপাশে কাছাকাছি দোকান বাজারে কী কী পাওয়া যায়? কোন্ কোন্ ব্র্যান্ডের জিনিস? এখানে ধোপা নাপিত কামার স্যাকরা কে কে আছে? ওদের স্বভাব চরিত্র কেমন? এমনই কিছু নানা পেশার লোকের খবরাখবর এবং তাদের বিশেষত্ব।
শিব ভেবে বলে,—বুঝেছি। অপরাধের জায়গায় পাওয়া কাপড়ের মালিকের পরিচয় জানতে ধোপার ছাপ। সিঁধকাঠি ইত্যাদি লোহার জিনিস পেলে, কামারটা কে? চোরাই সোনাদানা বিক্রির জায়গা খুঁজতে স্যাকরা। কিন্তু নাপিতের কী দরকার?
–হুঁ হুঁ, নাপিত ঢের কাজে আসে। ওরা ভারি সেয়ানা। লোকে নাপিতের কাছে চুল দাড়ি কামাতে বসে অনেক প্রাণের কথা বলে ফেলে। যে কামাচ্ছে তার মন সেদিন খিঁচড়ে আছে না খোশমেজাজ নাপিত ঠিক খেয়াল করে। গ্রামে নাপিত তার বাক্স নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরে আর সব্বার হাঁড়ির খবর কান পেতে শোনে। এ আমি লক্ষ করেছি। তাই নাপিতদের থেকে অনেক ইনফর্মেশন পাওয়া যেতে পারে।
শিব বলল,—রাইট। মনে মনে ভাবল দেবুটার মাথা কী সাফ! জিজ্ঞেস করল,—আর কোনো সাজেসান?
দেবু বলল, মানুষের হাত পায়ের ছাপ স্টাডি করবি নিশ্চয়ই?
তা তো করতেই হবে।—শিবের জবাব।
—গরু মোষ ছাগলের খুরের ছাপ নিয়েও কিছু স্টাডি করিস।
–গরু ছাগল কেন?
—কারণ গ্রাম দেশে গরু ছাগল চুরির কেস তো কম হয়না। কোন পথে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে পায়ের ছাপ দেখে বুঝলে সুবিধে হবে।
তা বটে।—শিবের সায়।
দেবু বলল,–আর বেশি কী বলার আছে, সবই তো তুই জানিস।
হুঁ।—গম্ভীর চালে মাথা ঝাঁকায় শিব।
শিবের দেখা পাওয়া ভার হয়ে উঠল। এমনকী ছুটির দিনেও তার পাত্তা পাওয়া যায় না। দেবু একদিন শিবের খোঁজ নিতে যেতে সে জানাল, একটু ঘুরে ফিরে স্টাডি করছি। মানে গোয়েন্দাগিরির প্রিপারেশন।
—ভেরি গুড। কোনো কেস পেলি?
—একটা পেয়েছিলাম। নিইনি।
—কী কেস?
আমাদের পাড়ার মোক্ষদা ঠাকরুণের নিরুদ্দেশ নাতি উদ্ধারের কেস।
—মোক্ষদামাসির নাতি? মানে বিল্টু?
হুঁ। চিনিস তো কী বিচ্ছু ছেলে! হরদম ইস্কুল ফাঁকি মরিছিল বলে বাপের কাছে পিটুনি খেয়ে গতকাল সকালে বাড়ি থেকে কেটেছে। দুপুরে খেতে আসেনি। মোক্ষদাঠাকরুণের ভয় তাঁর পেয়ারের নাতি সুইসাইড করবে অথবা মিলিটারিতে ঢুকে যুদ্ধে প্রাণ দেবে। ওই বলে শাসিয়ে বেটা প্রায়ই দিমিাকে ব্ল্যাকমেল করে পয়সা বাগাত
আসলে যা বুঝলুম, বাপের ধোলাইটা ঠিকমতো পড়েনি। দু-চার ঘা খেয়েই বাবার হাত ফসকে পালিয়েছিল। পাওনা বাকি পিটুনির ভয়েই ফিরছে না বিন্টু। বাপের রাগ পড়এল ফিরবে। ও যা ছেলে, হয়তো কুল পেয়ারা দিয়ে লাঞ্চ টিফিন সেরে কোনও জঙ্গলে লুকিয়ে বসে আছে। আর নয়তো মামার বাড়ি পালিয়েছে। ক্রোশ চারেক দূরে ওর মামার বাড়ি। আগেও গয়েকবার বিপদে পড়ে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। মামারা বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরত দিয়ে গেছে। মোক্ষদামাসিকে বলেছি, নাতি দুদিন না ফিরলে তখন খোঁজ করা যাবে।
রাতে বিল্টু ফিরেছে কি?—দেবুর জিজ্ঞাসা।
জানি না,—ব্যাজার মুখে শিবের জবাব।
দেবু বলল,—এখন এখন নন্দ স্যারের বাড়ি যাব ভাবছি। একটা ইংরিজি রচনা কারেক্ট করে নিতে। স্যার ছুটির দিনে সকালে যেতে বলেছিলেন।
শিব বলল,—চল আমিও যাই। একটা ইংরিজি কবিতার মানে বুঝে নেব।
নন্দবাবুর বৈঠকখানায় উঁকি মেরে দেবুরা দেখল ঘর ফাঁকা।
নন্দবাবুর আট বছরের ছেলে বুবুনের আবির্ভাব হল। দেবু বুবুনকে বলল,—স্যার আছেন? আছে।—বুবুন মাথা নাড়ে।
—বল আমরা এসেছি। পড়া বুঝতে।
বুবুন ভিতরে গেল।
একটু বাদে সে এসে বলল,–বাবা কথা বলচে। বসতে বলেচে। আসবে। বলেই বুবুন হাওয়া হল।
দুজনে বসল তত্তোপোষে। তাদের চোখে পড়ল, বৈঠকখানার দোরগাড়ায় একজোড়া চামড়ার চটি। পুরুষের।
শিব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চটিদুটো দেখতে দেখতে বলল, —মনে হচ্ছে এই চটির মালিকের সঙ্গেই স্যার কথা বলছেন।
তাই হবে।—দেবুর সমর্থন : তা চটি দেখে এর মালিকের সম্পর্কে তোর কি অনুমান?
শিব চটি নজর করতে করতে বলে, চটির বড়সড় সাইজ দেখে মনে হয়এর মালিক বেশ লম্বা চওড়া। ভারি চেহারার। কারণ চটির গোড়ালির কাছে একটু ডেবে গেছে। অর্থাৎ ভারি ওজনের লোক এবং থপথপ্ করে পা ফেলে।
—বাঃ! তোর দারুণ অবসার্ভেশন। আর কিছু বুঝছিস?
—লোকটি বোধহয় পয়সাওলা কারণ চটিটা দামী।
—বেশ বেশ। আর কিছু?
আর কি?—শিব দ্বিধাগ্রস্ত। তার পর্যবেক্ষণ আর এগোয় না।
আমি কিছু বলতে পারি?—সহকারী দেবুর অনুমতি প্রার্থনা।
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, বল্!
লোকটি প্রায় ছফুট লম্বা এবং নেটা। বাঁ হাতেছাতা ধরে হেঁটে এসেছে।—দেবুর মন্তব্য।
—এ্যাঁ। কি করে বুঝলি?
তাই মনে হচ্ছে। মানে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।–দেবু এর বেশি কিছু ভাঙে না।
সে এবার চটিজোড়ার কাছে গিয়ে চটি উল্টিয়ে দেখে বলে,—চটির নিচের ধুলো দেখে মালুম হচ্ছে অন্য গাঁয়ের লোক। তার পরনে ধুতি ও শার্ট এবং স্যারের খুব পরিচিত।
শিবও চটির নিচটা দেখে। তার মুখে গভীর সংশয়ের ছাপ। বলে,—স্যারের খুব পরিচিত মানলেম। তাই ভিতরে গেছেন। কিন্তু বাকি সিদ্ধান্তগুলো? যা ইয়ার্কি মারছিস।
ঠিক এই সময় ভিতর থেকে বৈঠকখানায় নন্দস্যার এবং অপর একজনের আবির্ভাব হয়। দ্বিতীয়জন দেবুদের স্কুলেরই শিক্ষক। নন্দবাবুর সহকর্মী। বিজনবাবু।
বিজনবাবুর চেহারাখানা দশাসই। প্রায় ছফুট উচ্চতা। তিনি নেটা। বাঁ হাতে ধরা একটি ছাতা। ধুতি শার্ট পরা। ওঁনার বাড়ি পাশের গ্রাম মথুরাপুরে। শিব থ মেরে যায়। দেবু তো ঠিক বলেছে!
দেবু শিব উঠে দাঁড়ায়। বিজনবাবু ওদের পানে চেয়ে একবার হেসে পায়ে চটিজোড়া গলিয়ে বিদায় নিয়ে রাস্তায় নামলেন। নন্দবাবু এবার দেবুদের দিকে মনোযোগ দিলেন,—কী দেবু, রচনা লিখে এনেছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।—দেবু জবাব দেয়।
তোমার কিছু দরকার?—নন্দবাবু শিবকে প্রশ্ন করেন।
শিবের বিস্ময় তখনও কাটেনি। সে থতমত ভাবে বলে,—আজ্ঞে, একটা ইংরিজি কবিতা বুঝে নিতাম।
বেশ বেশ।—নন্দবাবু দুই ছাত্রকে নিয়ে বসলেন।
ঘণ্টাখানেক বাদে পড়ার পাট চুকলে নন্দবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়েই উদগ্রীব শিব প্রশ্ন করে,—হ্যাঁরেদেবু, ওসব কী করে বুঝলি? এমন কারেক্ট আন্দাজ?
—আন্দাজটা তুইও করতে পারতিস একটু চোখ খোলা রাখলে।
কী করে?—শিব থৈ পায় না।
—কারণ আমরা যখন পঞ্চাননতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম তখন দেখলুম ছাতা হাতে বিজনস্যার গেলেন। তুইও নিশ্চয়ই দেখেছিস। স্কুলেই লক্ষ্য করেছি, বিজনবাবু ওইরকম চটি পরেন। সুতরাং নন্দস্যারের বাড়িতে ওইরকম চটি দেখেই বুঝলাম বিজনবাবুই এসেছেন। ওইটে মাথায় খেলে গেলেই নন্দস্যারের বাড়ির আগন্তুক অর্থাৎ বিজনবাবুর কারেক্ট বর্ণনা তুইও দিতে পারতিস অনায়াসে।
শিব চুপ। মনে আপশোস, ইস্ এমন সোজা ব্যাপারটা খেয়াল হয়নি। ফালতু মাথা ঘামালাম কত।
পথে যেতে যেতে তারা দেখে একটা নিচু গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে পেয়ারা খাচ্ছে বছর বারোর একটি ছেলে। শিব তাকে দেখে থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,—কীরে বিল্টু, কখন ফিরলি? রাতে?
হুঁ।—বিল্টু পেয়ারায় কামড় দিয়ে আড়চোখে চায়।
—মার খেয়েছিলি বাড়ি ফিরে?
—ভ্যাট্।
বাবা মারেনি সত্যি?—শিব খোঁচায়।
এয়েছিল মারতে। পারেনি।—বিল্টুর জবাব।
কে বাঁচাল, ঠাম্মা বুঝি?
বিল্টু মিচকে হাসে।
দেবুরা কথা না বাড়িয়ে এগোয়। দেবু বলল,—ভাগ্যিস এর কেস নিসনি। বেকার খুঁজে মরতিস। এমন মিসিং কেশ ব্যোমকেশ বক্সিও নিত না।
.
