উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

সাজ ধরার সাজা – ২

দুই

সকাল বেলা মুড়ি আর নারকেল নাড়ু দিয়ে পেটভরে জল খাবার খেয়ে মেলার উদ্দেশে পথে বেরল নারাণ।

দশটার মধ্যে পৌঁছতে হবে। প্রায় চার মাইল পথ। বাসে যাওয়ার উপায় নেই। হেঁটে যেতে হবে, ক্ষেতের আলে আলে আর মেঠো পথ ধরে।

হাতে একটু সময় নিয়েই বেরোল নারাণ। একটা মতলব আছে। নবগ্রাম থেকে ফকিরডাঙার মেলায় ঢোকার ঠিক মুখে সে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকবে। মদন ওই পথেই ঢুকবে মেলায়। যারা আসবে ওই পথে সবাইকে খুঁটিয়ে লক্ষ করবে। মদনকে চিনতে পারলে ক্যাক করে ধরবে চেপে বাছাধনকে, এক্কেবারে গোড়াতেই। একেবারে সিন ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ফাঁস করে দেবে ছদ্মবেশ। তার সঙ্গে কথা কইবার দরকারটুকুও হবে না। মেলার ভিড়ে খোঁজার ঝামেলাটা বাঁচবে। তক্ষুনি আদায় করে নেবে বাজির টাকাটা।

আর যদি চিনতে না পরে? তাতে কী? ও পথে যারা মেলায় ঢুকছে চিনে রাখবে তাদের। তাদের মধ্যে অচেনা কেউ মেলার ভিতরে গায়ে পড়ে কথা বললেই খুঁটিয়ে দেখবে তাকে

মদনের চেহারাটা মনে মনে ভালো মতো ছকে নিতে চেষ্টা করে নারাণ—মুখ, নাক, চোখ—বিশেষ চিহ্ন কী কী আছে।

কিন্তু ক্রমেই যেন চেহারাটা ধোঁয়াটে হয়ে উঠে। বিশেষত্ব কিছুই মনে পড়ছে না কেন। সাধারণ লম্বা, মাঝারি গড়ন, নাক মাঝারি, চোখ না ছোট না বড়, রং ফর্সার দিকে—তবে মেকআপে কালো করা যায় অনায়াসে।

নাঃ মুশকিলে ফেলল। কোনো একটা বাইরের চিহ্ন দেখে চট করে ধরে ফেলার উপায় নেই লোকটাকে। গায়ের খোলা জায়গায় জরুলটরুল বা তিল আছে কি না খেয়াল করেনি আগে। ইস্! সেদিন চায়ের দোকানে বসে দেখে রাখতে হত নজর করে, বোকামি হয়ে গেছে।

মনে হয় গোঁফ, দাড়ি লাগাবে। রং বদলাবে এবং পরচুলা পরবে। চলনবলন তো পালটাবেই সাদা মুখে থাকলে তাকে ফাঁকি দেওয়ার সাধ্যি নেই। সন্দেহজনক কেউ তার সঙ্গে কথা বললেই দেখতে হবে ভালো করে। এবং মদন বলে দেবে ডাক—লাগে তুক, না লাগে তাক।

আরও এক ফ্যাসাদ। মেয়েছেলে সাজতে পারে মদনটা। আগে যাত্রায় ফিমেল পার্ট করত। অচেনা মেয়ে যদি কেউ আগ বাড়িয়ে কথা বলে অমনি দেখতে হবে খুঁটিয়ে।

এমনি ভাবতে ভাবতে চলছিল নারাণ। শুধু আজকের সমস্যা নয়—সমস্যা আছে আসছে কালও। কী ভেক ধরবে সে নিজে?

পথে যেতে যেতে চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে মাঝে মাঝে।

ডেকে বলল ভূষণ,—নারাণ, মেলায় নাকি? আমিও যাচ্ছি। এবার নাকি একটা সার্কাস এসেছে। বেশ ভালো পার্টি।

নারাণ কায়দা করে ভূষণকে এড়িয়ে গেল। সে একা একা হাঁটে। নিজের মনে মাথাটা একটু খেলানো দরকার। তাছাড়া এক্ষুনি সে মেলায় ঢুকছে না। ফকিরডাঙার খুব কাছে ধর্মঠাকুরের স্থান। ওর পাশ দিয়ে নবগ্রামের লোক আসবে মেলায়। অবশ্য অন্য গাঁয়ের লোকও আসে ওই পথে। একটা গাছের আড়ালে বসে সে লক্ষ রাখবে মেলায় আগন্তুকদের ওপর। যদি ওখানে পাকড়াও না করতে পারে মদনকে, ঠিক দশটায় ঢুকবে মেলায়।

নিজের রাস্তা ছেড়ে একটু ঘুরে ধর্মঠাকুরের থানে পৌঁছল নারাণ। ধর্মঠাকুরের নামে কটা পয়সা ফেলে দিয়ে প্রণাম করল। তারপর বসল একটা মোটা তেঁতুল গাছের গুঁড়ির পিছনে গা ঢাকা দিয়ে।

রাস্তা দিয়ে স্রোতের মতো লোক চলেছে মেলায়। বহুকণ্ঠের কলরব মিশে একটা গমগমে আওয়াজ আসছে কানে। গরুর গাড়ির চাকায় ওঠা ধুলোর মেঘ জমেছে আকাশে। এখনও আধ ঘণ্টা বাকি দশটা বাজতে।

গরুর গাড়ি চেপে হাজির হবে নাকি মদন? তবে তো বৃথা প্রতীক্ষা। দেখা যাক।

শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। বৃষ্টি হয়ে গেছে দিন দুই আগে। আজ রোদ পেয়ে ভিজে মাটি থেকে ঠান্ডা উঠছে। মেলার যাত্রীরা বেশিরভাগই চাদর মুড়ি দিয়ে চলেছে। ফাঁকা মাঠে কনকনে হু হু হাওয়ায় মুখের একটু শুধু বের করে রেখেছে। অবশ্য মেলায় লোকের ভিড়ে গায়ের তাতে শীত কম লাগবে। একটা বিড়ি ধরিয়ে পথের ওপর চোখ রেখে বসে রইল নারাণ।

এক বুড়ি আসছে, লাঠিতে ভর দিয়ে ঠুকঠুক করে। থুথুরে বুড়ি। পরনে ময়লা কাপড়। তার ওপর একটা চাদর জড়ানো। মাঝে মাঝে থামছে। চাইছে এদিক সেদিক। ধনুকের মতো বেঁকে হাঁটছে।—হতে পারে মদন। ঠিক দশটায় ঢুকছে। নির্ঘাৎ ও।

বিড়িটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে লাফিয়ে উঠল নারাণ। ছুটে গিয়ে আগলে দাঁড়াল বুড়ির পথ।

বুড়ি থমকে দাঁড়াল। মুখের আধখানা ঢাকা ঘোমটার ফাঁকে পিটপিট করে দেখল নারাণকে খনখনে গলায় শুধাল,–কে বটে?

—কেন, আমি নারাণ। চিনতে পারছ না? আমি তো বাপু ভেক পালটাইনি। উঃ জব্বর মেক-আপ চড়িয়েছিস বটে। নে এবার খাড়া হয়ে দাঁড়া। মাজায় ব্যথা হয়ে গেছে তো।

বুড়ি একটুও দমল না। বলল,– হাঁ বাবা, ফকিরডাঙার মেলা তো ওই সুমুখে?

হুঁ।—হাসি মুখে জানাল নারাণ : আর এখন মেলার গিয়ে কাজ কী? টাকাটা ছাড়। তারপর ড্রেস পালটে সুস্থির হয়ে মেলা দেখতে এস’খন।

বুড়ি নারাণের দিকে বাঁ কান এগিয়ে দিয়ে বলল,—কী বললে, গো, অনেক পথ?

কী ঘোড়েল! কালার ভান করছে। এখনও ভাবছে ফাঁকি দেবে।

নারাণ চেঁচিয়ে বলল,—না, ওই তো মেলা। এবার টাকাটা ছাড় দিকি মদনা। ঢের হয়েছে।

হঠাৎ বুড়ি এক পা এগিয়ে খপ্ করে নারাণের ডান হাতখানা চেপে ধরল। কাঁদ কাঁদ গলায় বলল,–হেইবাবা, আমায় গুরুপদর দোকানে এট্টু পৌঁছে দাও। চোখে দেকি না ভালো, নিজে নিজে খুঁজে পাব না।

বুড়ি গায়ে হাত দিতেই নারাণ চমকে উঠল। এ তো জোয়ান পুরুষের স্পর্শ নয়। দুর্বল অশক্ত হাতের ছোঁয়া। বুড়ির দিকে ভালো করে দেখল সে-তার মুখে, হাতের চামড়ায় অজস্র ভাঁজ। ছানি পড়া ঘোলাটে চোখ।

নাঃ এ মদন নয়। কালের অমোঘ বিধান ছাড়া কারো সাধ্য নেই মানুষের দেহে এমন ছাপ ফেলে।

কে গুরুপদ?-বিব্রতভাবে জিজ্ঞেস করল নারাণ।

—আমার নাত-জামাই গো। নাতনিটারে কতদিন দেখি নাই। জামাইকে বলে আসব নাতনি মেলায় এলে যেন একটিবার নিয়ে যায় আমার কাছে। বুড়ো মানুষ একা থাকি, কেইবা নিয়ে যাবে আমায় নাতনির শ্বশুরবাড়ি।

গুরুপদর কীসের দোকান? চেঁচিয়ে জানতে চাইল নারাণ।

—শুনেছি খেলনার দোকান দেছে। গাঁয়ের লোক বলল।

ভ্যালা বিপদে পড়া গেল। নারাণ ভেবে পায় না কী করবে? বুড়ির মুখে অসহায় মিনতি। না বলতেও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কে গুরুপদ? কোথায় তার দোকান? বুড়ির সঙ্গে খুঁজে মরতে হবে নাকি এই ভিড়ে? শেষ চেষ্টা করল সে—আমি তো চিনি না গুরুপদকে।

আমি ঠিক চিনব বাবা,—বুড়ি বলল।

অনাথা বুড়ির পাশে পাশে খুটখুট করে মেলার দিকে হাঁটতে থাকে নারাণ। যারা পেরিয়ে যাচ্ছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করে তাদের। বুড়ি সমানে তার সুখদুঃখের কথা বলে চলেছে ইনিয়ে-বিনিয়ে।

হট্‌ যাও। অ্যাই হট যাও।—হুড়মুড় করে এসে পড়ল একটা মোষের গাড়ি। নারাণ তড়াক করে পাশে গিয়ে গাড়োয়ানের মুখটা দেখে নেয়। নাঃ নেহাত ছোকরা। চাঁচাছোলা মুখ। মদন নয়।

ভিড়, সাইকেল আর গরু-মোষের গাড়ির ধাক্কা থেকে বুড়িকে বাঁচিয়ে চলতে চলতে সে আনমনা হয়ে পড়ছে। এই ফাঁকে কেউ যদি দুটো কথা কয়ে চলে যায় হয়তো খেয়ালই করতে পারবে না। বুড়ির জন্যেই হারবে বাজিটা। বেজায় রাগ হয় নিজের ওপর। কী দরকার ছিল পরোপকারে? ঝেড়ে ফেললেই হত বুড়িকে। কিন্তু তাও যে পারছে না। বৃদ্ধার করুণ মুখখানা টেনে রেখেছে।

—কী হে নারাণ, পিসিমাকে নিয়ে চললে কোথা? পিছনে ডাক শুনে নারাণ ফিরে দেখল নবগ্রামের ছিরু ঘোষ।

নারাণ বলল,–চেন একে। দেখ না ভাই কী মুশকিলে পড়েছি। নাত-জামাইকে খুঁজতে চলেছেন। আমায় ধরেছে খুঁজে দিতে। কে না কে গুরুপদ-খেলনার দোকান দিয়েছে। বুড়োমানুষ তাই ভিড় থেকে আগলে নিয়ে যাচ্ছি। পথেই আলাপ। আমার আবার কাজ আছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।—ও, বুঝেছি। পশ্চিম দিকে পুকুরপাড়ে গুরুপদর দোকান। আমাদের গাঁয়ের গদাই বলছিল। পিসির তিনকুলে কেউ নেই। ওই নাতনিটিই সম্বল।

—চেন গুরুপদকে?

—হুঁ চিনি বইকি।

একটা উদ্‌গার কর ভাই। তোমাদের পিসিকে গুরুপদর ওখানে পৌঁছে দাও। বড্ড জরুরি কাজ আছে আমার। লোক অপেক্ষা করবে। দেরি হয়ে গেছে। বলতে বলতে নারাণ পিসিমার হাতখানা ছিরুর হাতে গছিয়ে দিল।

পিসিমা ছিরুর মুখের কাছে চোখ এনে তাকে চিনে ফেলে একগাল হেসে বলল,—ও ছিরু, আমায় নিয়ে চল্ বাবা গুরুপদর দোকানে।

আচ্ছা চলি ভাই—পরে দেখা হবে।—হনহনিয়ে হাঁটা দিল নারাণ। ফাঁদে পড়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে ছিরু।

একটু গিয়ে থেমে নারাণ ফিরে ছিরুকে বলল,—মদনকে দেখেছ? তোমাদের গাঁয়ের মদন ঘোষ।

কই না!—জবাব দিল ছিরু।

আবার জোরে পা চালাল নারাণ।