উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

ফ্যাসাদ – ৮

আট

ঠেকাপুর থেকে মাইল দুই যেতে যেতেই শিব খোঁড়াতে শুরু করল। দেবু বোঝে ওর খুবলাগছে পায়ে। কিন্তু যা জেদি, ছেলে, কিছুতেই হার মানবে না।

দেবু বলল,—নাঃ, এভাবে তোর হাঁটা একদম উচিত হচ্ছে না। ওষুধপত্র পড়ছে না,ডাক্তার দেখানো হচ্ছে না। বোলপুর পৌঁছতে আরও তিন চার মাইল বাকি। তাছাড়া আর এক কারণে আমাদের জার্নি হয়তো এবার ক্যানসেল করতে হবে।

কেন?

আমাদের পরিচয়পত্র কই? যে দুটি রয়েছে তাদের যা দশা, অচেনা জায়গায় ঠেকাপুরের মতন মুশকিলে পড়ব বারবার। কেবল মুখের কথায় কি আর লোকে বিশ্বাস করবে?

শিব নীরবে হাঁটে। মনে হল তার দেশভ্রমণের উৎসাহ বিলক্ষণ দমে গেছে।

রাস্তার ধারে গ্রাম। কিছু দোকানপাট। অল্পকিছু লোকের ঘোরাঘুরি। দেবু শিব খানিক বিশ্রাম নিতে বসল একটা ফাঁকা রোয়াকে। একজন কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করল,—কোত্থেকে আসা হচ্ছে?

দেবু জানায় তাদের পরিচয় এবং পর্যটনের উদ্দেশ্য। লিভ তখন ভিজে ন্যাকড়া জড়াচ্ছিল, তার আহত পায়ের গোছে। সেদিকে তাকিয়ে লোকটি বলল,—পায়ে কী হয়েছে?

মচকে গেছে ওর পা। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।—জানাল দেবু।

হ্যাঁ, হন্টন পার্টির ঠ্যাং জখম! ব্যস, তবে তো ভ্রমণ বরবাদ। আর এক পর্যটক পার্টি ও তো ব্রেকডাউন হয়ে পড়ে আছে।

আর এক পার্টি?

হ্যাঁ হ্যাঁ সাইকেল পার্টি। ভূপর্যটক। দুজন ছোকরা। ওদের সাইকেল ভেঙে গেছে। চোটও লেগেছে। আমাদের গাঁয়ের ক্লাব ঘরে রয়েছে গত পরশু থেকে। ওই লাভপুরের কাছ থেকেই এসেছে।

কোথায় তারা?

এসো। কাছেই।—লোকটি দেবুদের সঙ্গে নিয়ে যায়।

ক্লাব ঘরের বারান্দায় শতরঞ্চিতে শুয়েছিল নন্তু। সন্তু কাছে বসে একখানা খবরের কাগজের ওপর ঝুঁকে রয়েছে। দেয়ালে ঠেসান দেওয়া দুখানা সাইকেল। মুখ তুলে দেবু আর শিবকে দেখে সন্তু চমকে উঠল,– আরে তোমরা!

হুঁ যা ভেবেছি। মথুরাপুর। কী হয়েছে? বলল দেবু।

অ্যাকসিডেন্ট। গত পরশু বিকেলে একপাল গরু যাচ্ছিল রাস্তার ধার ঘেঁষে। জোরে জোরে বেল দিচ্ছি। হঠাৎ একটা গরু শিং বাগিয়ে আমাদের এমনি তাড়া করল! প্রাণপণে ছোটালাম বাইক। আকাশে মেঘ। ভালোমতো দেখতে পাচ্ছিলাম না রাস্তার খানাখন্দ। আচমকা এক গর্তে পড়ে ছিটকে পড়লাম। প্রথমে নন্তু। তার ঘাড়ে আমি।

নন্তুর সাইকেলের সামনের চাকার রিম বেঁকে বারোটা বেজে গেছে। শিক-ও ভেঙেছে কয়েকটা। ওর কোমরে আর পায়ে খুব লেগেছে। আমার সাইকেলের তেমন কিছু হয়নি। তবে আমার ডান হাতের কনুইয়ে বেশ চোট লেগেছে।

নন্তু মিনমিন করল,—আসলে ওই লাল ভূপর্যটক মার্কা প্ল্যাকার্ডটাই দায়ী। যা রং, তখনি বলেছিলুম গরু মোষে খেপে যাবে দেখে।

সন্তু মাথা নাড়াল। ভাবখানা যেন সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তারপর সেই গরু?- শিব জের টানে।

সে হঠাৎ আমাদের হুড়মুড়িয়ে পতন দেখে ঘাবড়ে গিয়ে সমান স্পিডে পিটান দিল পিছন ফিরে। তা তোমাদের খবর কী?

ভালো নয়।—দেবু বলে : শিবের পা গর্তে পড়ে মচকেছে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।

হুঁ। দুপার্টিরই দেখছি অযাত্রা। ব্যাজার মুখে মন্তব্য করে সন্তু।

দেবু জিজ্ঞেস করল,—লেগেছে যে ওষুধ দিয়েছ কিছু?

সন্তু বলল,—এখানে পাশ করা ডাক্তার নেই। তবে এই গাঁয়ের এক ভদ্রলোক শখের হোমিওপ্যাথি করেন, তিনি ওষুধ দিয়েছেন। কাজও হয়েছে। আমার কনুইয়ের ব্যথা কমেছে। ফোলাও আজ ঢের কম। হাত প্রায় সোজা করতে পারছি। নন্তুর কেসও বেটার।

দেবু বলল,—সেই হোমিওপ্যাথি ভদ্রলোককে পাওয়া যাবে? মানে শিবের জন্যে।

কেন পাওয়া যাবে না? কাছেই থাকেন। আমি ডেকে আনছি। খুব ভালো লোক।—সন্তু উঠে পড়ল।

শখের হোমিওপ্যাথ ঘোষালমশাই টাক মাথা, পাকা ঝুলো গোঁফসমেত সৌমদর্শন ব্যক্তি। দেবুর পায়ে মচকানো জায়গা পরীক্ষা করে বললেন,—জলপটি দিয়ে ঠিক করেছ। ওষুধ দিচ্ছি, ব্যথা কমে যাবে।

এই গ্রামের মানুষগুলি ভালো। আদরযত্নের ত্রুটি নেই। দুর্ঘটনায় আটকে পড়া ভিনদেশি চারটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তরুণের প্রতি তাদের খুবই সহানুভূতি। দুপুরে ও রাতে দুই বাড়িতে নেমন্তন্ন খেল শিব আর দেবু। মথুরাপুরের আহারের ব্যবস্থা ছিল অন্য বাড়িতে। চা-টার ও জোগান এসেছে বারকয়েক। ক্লাব ঘরে চারজনে শোওয়া গেল অনায়াসে।

রাতে সন্তু বলল, আচ্ছা দেবু, তোমাদের বিদায়সভায় সভাপতি কে ছিল? শশাঙ্ক পাল, তাই না?

হ্যাঁ।—জানায় দেবু।

আমাদের বিদায়সভাতেও ওকে সভাপতি করা হয়েছিল। মনে হচ্ছে ওই লোকটিই অলুক্ষণে। তাই দু কদম যেতে না যেতেই দু পার্টি ফেঁসে গেলাম।

ঠিক ঠিক। কারেক্ট।—অন্য তিন পর্যটক একবাক্যে সায় দেয় সন্তুর এই সুচিন্তিত অভিমতে।

রাতে ঘুম হল খাসা। ভোরে উঠে দেবু জিজ্ঞেস করল শিবকে,—তোর পা কেমন?

ব্যথা বেশ কমে গেছে। খুশি মনে জানায় শিব।

সন্তু নন্তু তাদের জিনিস গোছগাছ করছে দেখে দেবু তাদের জিজ্ঞেস করল,—চললে কোথা? তোমাদের প্ল্যান কী?

সোজা বাড়ি। – জবাব দেয় সন্তু : এবার আমরা জার্নি ক্যানসেল করলাম। অবশ্য ফের ট্রাই করব পরে। তবে বেরুবার আগে ওই অপয়া শশাঙ্ক পালের আর নো দর্শন। নেভার। তোমাদের কী প্ল্যান?

দেবু উৎসাহভরে বলল,—আমরা ভাই ফিরছি না আপাতত। শিবের পা আজ অনেকটা ভালো। হাঁটতে পারবে। তাই এগোব। তবে নেহাতই বেকায়দায় পড়লে তখন ভ্রমণ বাতিল করা ছাড়া উপায় কী। দেখা যাক আর কদ্দূর যেতে পারি।

দেবুর কথায় শিব বেজায় অবাক হয়। এতক্ষণ ওই সমানে আপত্তি তুলছিল তার হাঁটায়। উসকোচ্ছিল এযাত্রা দেশভ্রমণ বন্ধ করতে। এখন যে হঠাৎ উল্টো সুর গাইছে!

তোমরা কবে স্টার্ট করবে এখান থেকে? -জিজ্ঞেস করে সন্তু।

আজই।—জানায় দেবু : তোমাদের সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ব। তবে দু দলের উলটো পথে যাত্রা। মিছিমিছি দেরি করে লাভ কী?

সত্ত্ব নন্তুকে লাভপুরের দিকের বাসে তুলে দিল দেবুরা। দুই সাইকেলসমেত সওয়াররা চড়ল বাসের ছাদে। মথুরাপুর পার্টি শুকনো মুখে হাত নেড়ে বিদায় নিল। তখন ধীরেসুস্থে বোলপুরের দিকে রওনা দিল দেবু আর শিব।

শিব মনে মনে ভাবে, দেবুর মতিগতি বোঝা দায়। আজকের দিনটা এখানে রেস্ট নিলে কী এমন ক্ষতি ছিল। আমার পায়ের পক্ষে উপকার হত। কিন্তু নিজের শারীরিক কষ্ট বা অসুবিধার কথা সে কিছুতেই জানাতে রাজি নয়।

আধমাইলটাক গিয়ে থামল দেবু।

কী হল, দাঁড়ালি যে?—শিব বলে।

দেবু বলল,—এটা বাস স্টপেজ। বোলপুরের বাস থামবে এখানে।

মানে!

অর্থাৎ এখান থেকে আমরা বোলপুরের বাসে উঠব।

সেকী!

হ্যাঁ। নয়তো কি হাঁটবি নাকি ওই পা নিয়ে। শেষে চিরকালের মতো পা-টা তোর জখম হয়ে যাক।

বোলপুরে কেন?–শিব ভ্যাবাচাকা।

কারণ, বোলপুরে গিয়ে আমরা কলকাতার ট্রেন ধরব। অতঃপর তোর মামার বাড়িতে গিয়ে কাটাব যে কদিন খুশি। তোর পা-ও দেখানো হবে ভালো ডাক্তারকে।

তাহলে এই পথটুকু হাঁটলাম কেন? ওই গ্রামের পাশেই তো বাস স্টপেজ ছিল।—শিব থই পায় না।

হেঃ হেঃ।—বিজ্ঞের হাসি দিল দেবু : সাইকেল পার্টিকে ডাউন দিতে হবে না? দু দলেরই এবার দেশ ভ্রমণ ভেস্তে গেল বটে, তবে মথুরাপুর পার্টি থেকে আমরা বেশি এসেছি। এ একেবারে খাঁটি সত। ওরাও স্বচক্ষে দেখেছে। তা দূরত্ব যাই হোক না কেন? অতএব এ যাত্রায় আমাদেরই জিত।

[১৯৯৩, কিশোর ভারতী শারদীয়া]