উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

চার্বাক-হিংটিং সংবাদ – অজেয় রায়

চার্বাক-হিংটিং সংবাদ

এক

বিকেল পাঁচটা।

তিনতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় নেমে অভিজিৎ দত্ত দেখলেন, একতলা থেকে এক্সপেরিমেন্টাল লেবরেটরির প্রজেক্ট অফিসার দীপক বোস উঠে আসছেন।

‘কোথায়’? অভিজিৎ দত্ত জিজ্ঞেস করলেন।

‘ডিরেক্টর ডেকেছেন’, বললেন দীপক।

‘আমাকেও। ব্যাপারটা কী? এমন ছুটির পরে?’

‘ঠিক বুঝছি না। অনেকেই ডাক পেয়েছে। কীছু একটা ঘটেছে। সিরিয়াস কীছু।’ ডিরেক্টরের ঘরের সুইং ডোর ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন দু-জন। মস্ত ঘর। অর্ধবৃত্তাকার টেবিলের পিছনে বসে গম্ভীরবদন ডিরেক্টর। সামনে দু-সারি চেয়ারের অধিকাংশই ভর্তি। প্রায় জনা দশ পুরুষ ও মহিলা উদ্বিগ্ন মুখে কর্তার মুখ চেয়ে অপেক্ষা করছেন। অভিজিৎ ও দীপক ঢুকতেই সকলের চোখ তাদের দিকে ফিরল। হাতঘড়ি দেখলেন ডিরেক্টর। ভুরু একটু কুঁচকে গেল। চার মিনিট লেট। উনি সময় মেনে চলতে ভালোবাসেন। যাহোক এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করলেন না। সোজা হয়ে বসলেন। অমনি গোটা ঘর নড়েচড়ে উঠল।

ইনস্টিটিউট অফ সাইবারনেটিকস্-এর প্রধান তাঁর কাঁচা পাকা ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়িতে হাত বুলতে বুলতে একটু অন্যমনস্কভাবে বলতে শুরু করলেন—’আপনাদের ডেকেছি। হ্যাঁ, একটা কারণ আছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত। এটা আমাদের মধ্যেই থাকুক। কথাটা বাইরে চাউর হয় আমি চাই না। কারণ কারণটা আপনারা শুনলেই বুঝতে পারবেন। একটা কেলেংকারি। আমাদের মতো নামী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটাকে আর কীই বা বলা যায়। লোকে জানলে আমাদের স্রেফ বুদ্ধু বলবে—’  

ডিরেক্টরের এই এক স্বভাব। বিষয়টা যত জরুরি হবে, ওনার ভূমিকাও হবে তত-দীর্ঘ। দীপক বোস আর থাকতে পারলেন না। বলে ফেললেন, ‘স্যার কী হয়েছে? একটু সংক্ষেপে যদি—’  

চশমার পিছন থেকে মহামান্য ডিরেক্টরের চোখ দুটি ভর্ৎসনার দৃষ্টি নিক্ষেপ করল দীপক বোসের দিকে। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন ডিরেক্টর, ‘সংক্ষেপেই বলছি। আমার বেশি কথার সময় নেই। তুমি কী জান, গতকাল রাতে চার্বাকের সঙ্গে হিংটিং-এর কথাবার্তা হয়েছে?’

‘আজ্ঞে না।’ হতাশ ভাবে মাথা নাড়লেন দীপক বোস।

এখানকার অনেকেই ডিরেক্টরের ছাত্র। তাই তিনি তাঁদের তুমি করেই বলেন।

‘কে চার্বাক? আর হিংটিং কে?’ কম্পিউটার সেকশনের সুজাতা সোম আমতা আমতা করেন।

‘জান না?’ বেশ অবাক হলেন ডিরেক্টর, ‘ও তুমি তো মাত্র ছমাস হল জয়েন করেছ।’

ডিরেক্টর সবার মুখের ওপর চোখ বোলালেন। তাঁর মনে হল কেউ কিছু মাথা মুন্ডু ধরতে পারছে না। ‘অলরাইট, তাহলে বুঝিয়েই বলি। ব্যাপারটা একটু গোপনেই হয়েছিল। তবু আমি আশা করেছিলাম, এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ এক্সপেরিমেন্টের বিষয় কারো কারো হয়তো জানা থাকবে।

‘হ্যাঁ, তিন বছর আগে আমাদের ইনস্টিটিউটের ডক্টর সিংহা সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটা এক্সপেরিমেন্টে হাত দেন। উদ্দেশ্য ছিল, যন্ত্রের যুক্তিতর্ক করার ক্ষমতা কতটা আছে পরীক্ষা করা।’

‘মনে পড়েছে,’ ইলেকট্রনিক মডেলিং ডিপার্টমেন্টের প্রধান, মোটা ফ্রেমের চশমা পরা ডক্টর ব্যানার্জি উৎসাহিত কণ্ঠে জানালেন, ‘দুটো অটোমেশন তৈরি হয়। স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার যন্ত্র দুটি শব্দের সাহায্যে পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারবে। তারা শব্দ গ্রহণ করতে পারবে। শব্দ দিয়ে তৈরি বাক্যের মানে ধরতে পারবে। এবং শব্দের সাহায্যে উত্তর দেবে। দুটি ফিলসফার মেশিন। বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলবে। তাই না? বানানোর সময় আমি মাঝে মাঝে ওখানে দেখতে গেছি, তবে নাম দুটো শুনে ঠিক মনে করতে পারছিলাম না—’

‘নাম দুটো ডক্টর সিংহার দেওয়া’, জানালেন ডিরেক্টর ‘ডক্টর সিংহা ফিলসফি এবং লজিকের ভক্ত। তাই তিনি চেয়েছিলেন, দুই মেশিনের মধ্যে যুক্তি তর্কটা দর্শন এবং ন্যায়শাস্ত্র নিয়ে হোক। চার্বাকের মধ্যে দেওয়া হয়েছিল প্রাচীন ভারতের যত ফিলসফি এবং লজিকের জ্ঞান। আর হিংটিং-এর মধ্যে দেওয়া হয়েছিল আধুনিক পৃথিবীর ফিলসফি এবং লজিকের ধ্যান ধারণা।’

‘স্যার চার্বাক নামটার মানে বুঝলাম। প্রাচীন ভারতের একজন বিখ্যাত দার্শনিক। কিন্তু হিংটিং কেন?’ সুজাতা সোম অবাক হয়ে বলেন।

‘জানি না’, ডিরেক্টর বিরক্ত, ‘বললাম তো নাম দুটো সিংহার দেওয়া, আমার নয়। যাকগে নামে কি এসে যায়? ফিলসফি এবং লজিকের কয়েকজন নাম করা প্রফেসর সিংহাকে এই প্রোগ্রামিংয়ে সাহায্য করেছিলেন। পাক্কা দু’বছর লেগেছিল মেশিন দুটো বানাতে।’

‘কিন্তু এক্সপেরিমেন্টটা তো ফেল্ করেছিল।’ ডক্টর ব্যানার্জি উৎসাহিত হয়ে জানালেন। তিনি বোঝাতে চান ওই গবেষণা সম্বন্ধে অনেক খবরই তিনি রাখেন।

‘মোটেই না’, ধমকে উঠলেন ডিরেক্টর, ‘বলা উচিত এক্সপেরিমেন্ট কমপ্লিট হয়নি। আর সফল না হলেই বা কী? চেষ্টাটাই বড় কথা। হ্যাঁ, বছর খানেক আগে যন্ত্রদুটো বানানো শেষ হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় মাত্র কয়েকবার কথাবার্তা বলেই দুই যন্ত্রই নীরব হয়ে যায়। এরপরেই ডক্টর সিংহা চলে যান বিদেশে। চার্বাক আর হিংটিংকে ঠিক ওই অবস্থাতেই রেখে দেওয়া হয়।’

‘কোথায়?’ সুজাতা সোম জানতে চাইলেন।

‘একতলায় পুব দিকের কোণে একটা ঘরে। তালা-বন্ধ থাকত। দিন দশ আগে সিংহা আমায় জানান যে তিনি দেশে ফিরেছেন এবং এক্সপেরিমেন্টটা নিয়ে ফের একবার লাগতে চান। সিংহা এখন অন্য ইনস্টিটিউটে জয়েন করেছেন। তাই দিনের বেলা সময় পাবেন না। সন্ধের সময় কাজ করতে আসবেন। যে কোনো দিন কাজ শুরু করবেন।  

‘ডঃ সিংহার টেলিফোন পাওয়া মাত্র আমি ঠিক করি, আমাদের পিওন হারু ওই ঘরে ডিউটিতে থাকবে বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটা অবধি। কারণ বিলডিং-এর ওই অংশ বিকেল পাঁচটার পর একদম ফাঁকা হয়ে যায়। সিংহা এলে হারু দরকার মতো তাঁকে সাহায্য করতে পারবে। তিনি চলে গেলে দরজায় তালা দিয়ে ও নিজের কোয়ার্টার্সে চলে যাবে।’

একটু থেমে ডিরেক্টর ফের শুরু করেন, ‘হুঁ, দু-দিন হল ডক্টর সিংহা কাজ আরম্ভ করেছেন। কাল রাত প্রায় নটার সময় সিংহা আমায় টেলিফোন করেন। এই ইনস্টিটিউট থেকে। ভীষণ উত্তেজিত ভাবে বলেন ‘এক্ষুণি চলে আসুন। একটা ব্যাপার হয়েছে।’

‘কেন কেন?’ সমবেত প্রশ্ন হয়।

‘কারণটা ডক্টর সিংহা খোলসা করে কিছুতেই বললেন না ফোনে। কারণটা আমিও এখন বলব না। আপনারা নিজেরাই দেখেশুনে বুঝতে পারবেন।’

ডিরেকটর চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। গটগট করে হেঁটে এগোলেন। অন্যরা চললেন তাঁর পিছু পিছু।

একতলার কোণে একটা ঘরের সামনে থামলেন ডিরেক্টর। ঘরের দরজা বন্ধ। বোঝা যায় ভিতরে আলো জ্বলছে। দরজায় সজোরে টোকা দিলেন ডিরেকটর।

দরজা খুলল হারু। স্বয়ং ডিরেক্টর এবং এতজনকে এক সঙ্গে দেখে হারু বেশ থতমত খেল। নমস্কার করে তাড়াতাড়ি দরজার কবাট মেলে ধরল। ডিরেক্টর সদলবলে ঘরে ঢুকলেন। হারু বাইরে পালাল। ডিরেক্টর দরজা বন্ধ করে দিলেন।

ঠান্ডা এয়ারকন্ডিশনড ঘর। দুটো মেশিন হাত চারেক তফাতে মুখোমুখি বসানো। তাদের দেখতে খানিকটা রেফ্রিজারেটরের মতো। তবে তাঁদের গায়ে লাগানো অনেকগুলো বৈদ্যুতিক তার এবং কিছু অদ্ভুত দেখতে যন্ত্রপাতি। এছাড়া ঘরে রয়েছে একটা মস্ত স্টিলের আলমারি। গোটা তিন চেয়ার। একধারে একটা টেবিল। তার ওপর তেল কালি মাখা কিছু নাট বল্টু, লোহার পাত ইত্যাদি।

‘কোনটা হিংটিং ছট?’ সুজাতা সোম জানতে চাইলেন।

‘হিংটিং ছট নয়, শুধু হিংটিং, শুধরে দিলেন ডিরেক্টর, ‘ওই যে।’ ডানদিকের মেশিনটাকে আঙুল তুলে দেখালেন তিনি।

‘তাহলে ইনি হচ্ছেন চার্বাক।’ সুজাতা সোম দ্বিতীয় যন্ত্রের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘এদের কিন্তু একটা করে মুন্ডু আর দুটো করে হাত বানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। বেশ দেখতে হত।

আর মিস্টার চার্বাকের মাথায় একখানা জট।’ ডিরেক্টরের কান বাঁচিয়ে মন্তব্য ছাড়েন অভিজিৎ।

ডিরেক্টর দুই যন্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত তুললেন। সবাই চুপ করলেন। ডিরেক্টর বলতে শুরু করেন ‘ডঃ সিংহার ফোন পেয়ে তখুনি আমায় ছুটে আসতে হল এখানে। বোঝো ঠ্যালা। এসে দেখি ঘরের বাইরে বারান্দায় বেগে পায়চারি করছেন সিংহা আর দুরে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হারু।

‘সিংহা বললেন, মেশিন দুটো আজ চালু করে ফেলেছি। ওদের স্বরযন্ত্রে কিছু খুঁত ছিল। তারপরই এই কাণ্ড। চলুন ভিতরে? সত্যি ব্যাপার দেখে আমিও থ।’

ওঃ আবার সেই ধানাই পানাই। দীপক বোস অধৈর্য ভাবে বলে উঠলেন, ‘স্যার ব্যাপারটা কী? একটু পরিষ্কার করে যদি—’  

‘নিজেরাই শুনে বোঝো।’ ডিরেক্টর হাত বাড়িয়ে খট করে একটা সুইচ টিপলেন। সেকেন্ড পাঁচেক মিহি চিঁইই শব্দ। তারপরই শোনা গেল যন্ত্রের কণ্ঠস্বর–ক্যানক্যানে, তীক্ষ্ণ।

সবাই স্তম্ভিত হয়ে শুনতে থাকে

চার্বাক, ‘এবার সুন্দরবাগানের ডিফেন্সকে সেরা বলা যায়। স্টপার সিং, রাও আর মজুমদার তিন জনেই টপ ফর্মে। লিংকম্যান জর্জের বয়স কিছু বেশি হলেও এখনও দারুণ। বিশেষত ভেজা মাঠে।’

হিংটিং, ‘কিন্তু গোলকীপার? খেলার খবর লিখছে—গোলকিপারই সুন্দরবাগান ডিফেন্সের দুর্বলতম স্থান। এক নম্বর গোলকিপার গোস্বামী আহত। দ্বিতীয় গোলরক্ষক শিকদার বড্ড ছটফটে। বাজে ভুল করে। গত বছরের রেকর্ডই তার সাক্ষী। সেদিক থেকে মেডন-স্পোর্টিং-এর গোল প্রায় দুর্ভেদ্য বলা যায়। আর তার ফরোয়ার্ড লাইন সম্বন্ধে খেলাধুলা পত্রিকা বলেছে’ (বাকি কথাগুলো বোঝা গেল না। এত হড়বড়িয়ে বলল।)

চার্বাক, ‘ফরোয়ার্ড সুন্দরবাগানেরও চমৎকার। মাঠ ময়দান পত্রিকার মতে– সুন্দরবাগানের ফরোয়ার্ডরা সবাই তরুণ। প্রচুর দম রাখে। এবং কুশলী। বয়স্ক নামী খেলোয়াড়দের চেয়ে এদের ওপর ঢের বেশি ভরসা।’

হিংটিং, ‘খেলার খবর লিখেছে, ওদের একম্‌পিরিয়েন্স নেই। বড় খেলায় নার্ভ রাখতে পারবে না।’

চার্বাক, ‘ভুল খবর। সুন্দরবাগানের কোচের মতে—’

দুই মেশিন চিৎকার করে চলল। একজন থামলেই অন্য জন শুরু করে। দুজনেরই স্বর প্রায় একরকম। কার গলা দিয়ে যে কখন আওয়াজ বেরুচ্ছে চট করে বোঝা যায় না। আবার এত তাড়াতাড়ি কথা হচ্ছে যে টুকরো টুকরো ভাবে বোঝা গেলেও তাদের অনেক কথাই ধরা যাচ্ছিল না।’

সুজাতা সোম দুহাতে কান চেপে আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘স্যার বন্ধ করুন। বন্ধ করুন। প্লিজ উঃ।’

খটু। ডিরেক্টর সুইচ অফ্ করলেন।

খানিকক্ষণ কেউ কোনও কথা বলতে পারল না কান মাথা ভোঁ ভোঁ করছে।

‘স্যার, এ-ত মনে হচ্ছে ফুটবল, ওরা ফুটবল নিয়ে তর্ক করছে, ‘দীপক বোস বসলেন।

‘হ্যাঁ তাই’, জবাব দিলেন ডিরেকটর।

‘বাপরে কী আওয়াজ। কানে তালা লেগে যায়।’

‘মাত্র দেড় মিনিটেই তোমাদের এই অবস্থা। আর কাল আমায় আধঘণ্টা ধরে এই যন্ত্রণা সইতে হয়েছে। মানে শুনিয়ে ছেড়েছেন ডক্টর সিংহা।’ ক্ষুব্ধ ডিরেক্টর জানালেন।

‘মনে হল চার্বাক সুন্দরবাগানের আর হিংটিং মেডন স্পোর্টিংয়ের সাপোর্টার’, বললেন দীপক।

করেক্ট, ডিরেক্টর মাথা নাড়েন, আরও মন দিয়ে শুনলে বুঝতে ওদের তর্কের বিষয় হচ্ছে—এ বছর কলকাতায় ফার্স্ট-ডিভিশন ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হবে কোন টিম। চার্বাকের মতে সুন্দরবাগান। আর হিংটিং বলছে মেডন স্পোর্টিং। দুই মেশিনই প্রাণপণে যুক্তি দেখাচ্ছে। দু-টিমের প্লেয়ারদের নাম, তাদের সম্বন্ধে নানা পত্রপত্রিকায় মতামত হুড়হুড় করে বলে যাচ্ছে। খানিকটা তো নমুনা শুনলে। আমার যে কাল কী হাল হয়েছিল।’

‘কী করে এমন হল?’ ভারি অবাক হলেন সুজাতা সোম।

‘নিশ্চয়ই কেউ ওদের ফুটবলের বিষয়ে খবর জুগিয়েছে’, অভিজিৎ দত্তর মন্তব্য।

‘ঠিক বলেছ’, বললেন ডিরেক্টর।

‘মেশিন তর্ক করছে, তাহলে তো এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল,’ সুজাতা সোম উৎফুল্ল, ‘ডক্টর সিংহা তবে অত ঘাবড়েছিলেন কেন?’

‘কারণ ডক্টর সিংহা হলফ করে বললেন যে তিনি বা তাঁর পরিচিত কেউ ফুটবল নিয়ে কোনও প্রোগ্রামিং মেশিনকে দেননি। তবে কে? সেই রহস্যটাই উদ্ধার করতে পারছি না—

একটু চুপ করে থেকে ডিরেক্টর বললেন, ‘ডক্টর সিংহা খুব চটেছেন। তাঁর ধারণা আমাদের ইনস্টিটিউটের কেউ এই কর্মটি করেছে, লুকিয়ে ওঁর পিছনে লাগার মতলবে।

খুক খুক করে হেসে ওঠেন সুজাতা হোম। ডিরেক্টর ভুরু কুঁচকে তাকাতেই মুখে আঁচল চাপা দিলেন।

‘আচ্ছা ডক্টর ব্যানার্জি’, বললেন ডিরেক্টর, ‘আপনি তো মাঝে মাঝে এখানে আসতেন?’

‘না, না। আমি ফুটবলের কিছু জানি না।’ ব্যস্ত হয়ে জানালেন ডঃ ব্যানার্জি।

‘জানি। জানি। আমি বলতে চাইছি, আপনি কিছু লক্ষ করেছিলেন কি? কাউকে সন্দেহ? ডক্টর সিংহার সঙ্গে কারোর কোনো গোলমাল?’

‘ডক্টর সিংহার সঙ্গে? নাঃ সেরকম কিছু…কই?’ ডঃ ব্যানার্জি ভেবে পান না, ‘তবে প্রফেসরদের মধ্যে কখনো কখনো বেশ তর্ক হত।’

‘হুঁ, তা আমিও দেখেছি। একদিন প্রফেসর রাও আর চট্টরাজের মধ্যে খুব লেগে গিয়েছিল। লজিকের কী একটা প্রবলেমের উত্তর নিয়ে। হিংটিংকে প্রোগ্রাম দেওয়ার সময়। ডক্টর সিংহা রাওকে সাপোর্ট করলেন। তাতে চট্টরাজ রেগেমেগে চলে গেলেন। কিন্তু নাঃ, চট্টরাজ খেলাটেলার খবর রাখেন না। আমি চিনি ওনাকে। আচ্ছা আমাদের ইনস্টিটিউটের কারো সঙ্গে ডক্টর সিংহার কি কখনো–?’

ডক্টর ব্যানার্জি ঢোক গিলে বললেন, ‘ইলেকট্রনিকস্-এর রামচন্দ্রনের সঙ্গে ডক্টর সিংহার একদিন একটু খিটিমিটি লেগেছিল। মেশিনের একটা ডিজাইন নিয়ে–’

‘রামচন্দন? উঁহু। ও বাংলা পড়তেই পারে না। বাংলা খেলার পত্রিকা থেকে খবর জোগাবে কি করে? মুশকিল হল। ওইটা যে কার কীর্তি!’

ডিরেকটর প্রশ্নটা ছুড়ে দেন শ্রোতাদের। তারা মাথা চুলকোয়। এ ওর মুখের দিকে তাকায়। উত্তর মেলে না।

পিছনে একটা গুঞ্জন ওঠে। ডিরেকটর বললেন, ‘স্পিক আউট। কিছু বলার থাকলে বলে ফেল। লিভ নো স্টোন আনটার্নড। সিংহা তো আমাদের সকলের ওপরে বিশ্রী কটাক্ষপাত করে গেলেন। লোকটির বড় দম্ভ। হতে পারে ব্রিলিয়ান্ট। ওর অনেক শত্তুর। আউট অফ ম্যালিস–’

দীপক ফিসফিস করে অভিজিৎকে বললেন, ‘ওঁকেও বাদ দেওয়া যায় না। প্রফেশনাল জেলাসি—’

সুজাতা মুখ খুললেন, ‘তা এ ঘরে যে কেউ ঢুকতে পারে। ওই তালা অনেক চাবি দিয়েই খোলা যায়। উফ্ মেশিন দুটো কী চেঁচায়! অসহ্য। আবার থেকে থেকে দুটোই বলে–ঘোড়ার ডিম। আহা কী ভাষার ছিরি!’

সদ্য পাশ করা এঞ্জিনিয়ার তপন রায় চমকে উঠলেন ‘অ্যা কী বললেন? স্যার মেশিনের ইলেকট্রনিক ইয়ার তো সব সময়ই কাজ করছিল?’

‘হ্যাঁ নিশ্চয়। কিন্তু তাতে কী?’ বললেন ডিরেক্টর।

তপন রায় বললেন, ‘স্যার হারু খুব জোরে জোরে রিডিং পড়ে, আমি শুনেছি। আর ও কেবল বলে–ঘোড়ার ডিম। মানে একটা মুদ্রাদোষ!’

অমনি অনেকে সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘হারু! হারু’!

ডিরেক্টর খানিকক্ষণ হতভম্ব, তারপর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনিও হাঁক পাড়লেন–‘হারু! হারু!’ হুড়-মুড় করে হারু ঘরে ঢুকল।

‘আচ্ছা হারু তুমি এই ঘরে বসে কিছু পড়তে?’ বললেন ডিরেক্টর।

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। একা একা বসে থাকতাম…’

‘কী পড়তে? খেলার পত্রিকা?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘সব ফুটবলের লেখাগুলো বুঝি?’

ভয়ে ভয়ে ঘাড় নেড়ে হারু সম্মতি জানায়।

‘ঠিক আছে তুমি যাও।’

হারুকে বিদায় দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন ডিরেক্টর–‘যাক বাবা এতক্ষণে বোঝা গেল।’

কম্পিউটারে সেকশনের আলি সাহেব কানে কিঞ্চিৎ খাটো এবং পিছনে ছিলেন। তিনি শেষের ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারেননি। ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হারু কী করেছে?’

‘বুঝলে না’, ডিরেক্টর গলা চড়ান, ‘হারু মহানন্দে একলা ঘরে মেশিনের কাছে বসে আট-দশ দিন ধরে কলকাতার ফুটবল সম্পর্কে জ্ঞানচর্চা করেছে। জোরে জোরে গুচ্ছের খেলার পত্রিকা পড়ে। মেশিনগুলোর স্বরনিক্ষেপ যন্ত্র কাজ করছিল না বটে। কিন্তু তাদের ইলেকট্রনিক-ইয়ারে কোনো গন্ডগোল হয়নি। চার্বাক আর হিংটিং কান খাড়া করে অর্থাৎ তাদের শব্দ গ্রাহক মাইক্রোফোনের সাহায্যে কলকাতার ফুটবল সম্বন্ধে গাদা গাদা তথ্য গ্রহণ করেছে। এবং তার ফলেই এই কাণ্ড। এই অদ্ভুত তর্কযুদ্ধ—’

হাসির অট্টরোলে ডিরেক্টরের গলা ডুবে যায়।

হাসি একটু কমতেই দীপক বোস উত্তেজিত ভাবে বললেন, ‘স্যার আমার একটা কথা মনে হচ্ছে। ফিলসফি নিয়ে না পারুক মেশিনরা নিজে থেকে মানুষের মতো ফুটবল নিয়ে তর্ক করছে–এতে কি প্রমাণ হয় না মেশিন মানুষের মতো ভাবনা চিন্তা করতে পারে? অন্তত প্রায় মানুষের মতো বলা যায়।

‘ও তোমার বুঝি তাই মনে হচ্ছে? কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার তা মনে হয় না’, ডিরেক্টর মুঠো পাকিয়ে দৃঢ়স্বরে বললেন, ‘কারণ এবারের খেলা নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা ভাবনা করার ক্ষমতা থাকলে, যে কেউ বলবে, সুন্দরবাগান বা মেডনস্পোর্টিং নয়, এই বছর ফুটবল লিগ জিতবে ইয়াংবেংগল! খেলা দেখতে মাঠে গেলে তুমিও তাই বলতে।’

[১৯৮১ সন্দেশ শারদীয়া]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *