দুই
মানিকজোড়ের এই আসন্ন পর্যটনের খবরটা হু হু করে ছড়িয়ে পড়ল।
শুনে কেউ বলল,—শাব্বাশ।
কেউ বলল,—ছেলে দুটোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। স্রেফ পাগলামি। ওদের বারণ কর।
মানিকজোড়ের বাড়ির তরফে ওদের আটকাতে কিন্তু তেমন কোনো চেষ্টা হল না। একেবারে যে হয়নি তা নয়। তবে এ চেষ্টায় কাজ হবে না বুঝি দুই বাড়ির লোকই হাল ছেড়ে দিল। শিব গোঁয়ার বলে বিখ্যাত। আর দেবু পড়াশুনোয় হীরের টুকরো হলে কী হবে বেজায় জেদি এবং কম ডানপিটে নয়। তাছাড়া শিব যখন যাচ্ছে দেবু তার সঙ্গ ছাড়বে না অবশ্যই। তবে কীভাবে পর্যটন করা উচিত এবং পথে কী কী করা উচিত নয় সে সম্বন্ধে দুই বাড়ির অভিভাবকদের অবিরল উপদেশের ঠেলায় দুই বন্ধু অতিষ্ঠ হয়ে উঠল।
দুদিন বাদে শিব হাত মুখ চুলকোতে চুলকোতে দেবুর কাছে হাজির। কাতর কণ্ঠে বলল—লিস্টের সব জিনিস জোগাড় হয়ে যাবে, নো প্রবলেম। কিন্তু ভাই, মশারি ছাড়া শুয়ে যে হাত মুখ ফুলে গেছে মশার কামড়ে। উঃ এই গরমে কি সারা গা মুড়ি দিয়ে ঘুমনো যায়। যেটুকু বেরিয়ে থাকে মশায় দাগড়া দাগড়া করে দিয়েছে। গোটা রাত প্রায় ঘুমুতে পারিনি দু দিন। তোর কী অবস্থা?
দেবু করুণ মুখে বলল,—আমার অবস্থাও কাহিল। এত চট করে কি আর অভ্যেস হয়! কী করবি? এখন বেরুবি, না কয়েক বছরে কষ্টটা একটু একটু করে ধাতস্থ হলে তখন বেরুনো যাবে। বাড়িতে তো বলছিলই আর একটা পাশ দিয়ে তবে যেতে। অভ্যেস হয়ে গেলে আর সমস্যা নেই। দেখিস না কত লোক খোলা রোয়াকে বা ফুটপাথে দিব্যি মশারি ছাড়া নাক ডাকিয়ে ঘুমোয়।
শিব আঁতকে উঠল,—তা হয় না। এখন আর পেছোবার উপায় নেই।—জানিস ময়ূরাক্ষী স্পোর্টিং ক্লাব আমাদের বিদায় সংবর্ধনা দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। খুব নাকি ধুমধাম করবে। এখন না বললে বেইজ্জত হয়ে যাব।
দেবু চমকে বলল,—অ্যা সংবর্ধনা! খেয়েচে। যাক, তবে কদিন অভ্যেস করে নেওয়া যাক।
শিব বলল,—ছোটকাকা বলছিল একটা ছিপ সঙ্গে নিতে।
ছিপ! কেন?
মানে বলছিল যে লোকের বাড়ি বাড়ি চেয়েচিন্তে খাবি। মাছটাছ তো জুটবে না। নিজেই তাই ধরে নিবি ছিপে। আসলে ঠাট্টা করছিল, আমি একটু মাছের ভক্ত কিনা।
প্রস্তাবটা মন্দ নয়।—জানায় দেবু।
না, না। ছিপ হাতে হাঁটব কী? লোকে মেছুরে ভাববে। হাসবে। তাছাড়া ছিপ ফেলে বসলে আমার আর জ্ঞান থাকে না। গোটা দিন বরবাদ হয়ে যাবে।
চারদিন বাদে শিব উত্তেজিত ভাবে এসে দেবুকে বলল,—আর দেরি নয়। আমরা কালই রওনা হব।
কেন? এত তাড়াহুড়ো কীসের?—অবাক হয় দেবু?
কারণ মথুরাপুর গ্রামের কয়েকজন ছেলেও নাকি আমাদের মতন পর্যটনে বেরুবে বলে মতলব করছে। ওদের আগেই আমাদের রওনা হতে হবে।
দেবু চিন্তিতভাবে বলল, – কাল? জোগাড়যন্ত্র আছে। তাছাড়া ময়ূরাক্ষী ক্লাবকে নোটিশ দিতে হবে।—পরশু স্টার্ট করা যেতে পারে।
বেশ তাই। আমি বলে দিচ্ছি ক্লাবে—শিব চলে যায়।
.
বিকেল প্রায় তিনটে বাজে।
মানিকজোড়ের পর্যটনে বেরনো উপলক্ষে চন্দনা গ্রামের ময়ূরাক্ষী স্পোর্টিং মহতী জনসভার আয়োজন করেছে। চন্দনা গ্রামের প্রায় সমস্ত বাসিন্দা হাজির। আশপাশের গ্রামের কিছু লোকও জুটেছে সভায়। স্থানীয় পঞ্চায়েতের প্রধান শ্রীশশাঙ্ক পাল সভাপতি। এবং চন্দনা গ্রামের সুবোধ মণ্ডল ওরফে সিধু খুড়ো প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেছেন।
খেলার মাঠে দুখানা তক্তাপোশ গায়ে গায়ে পেতে তৈরি হয়েছে মঞ্চ। তার ওপর পাশাপাশি চেয়ারে বসে সভাপতি, প্রধান অতিথি এবং দুই ভবিষ্যৎ পর্যটক। শিব আর দেবুবসে আছে একেবারে পর্যটকের বেশে। পরনে সার্ট, ফুলপ্যান্ট, জুতো, মোজা মায় হ্যাভারস্যাক। দুটিও পাশে রাখা। সভার শেষেই অবশ্য তাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে না। আসচে কাল ভোরে রওনা হবে। তবু ক্লাবের অনুরোধে পর্যটকের সাজেই তাদের হাজির হতে হয়েছে। এতগুলি কৌতূহলী দৃষ্টির সমুখে বসে অস্বস্তিতে ঘামছে তারা।
প্রথমে মাল্যদান পর্ব সাঙ্গ হল। তারপর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তারস্বরে গাইল—’দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার…’
ক্লাবের সেক্রেটারি বেচুদা উঠে এরপর শ্রীমান শিব দত্ত ও দেবু মজুমদারের দারুণ প্রশংসা করলেন বাছা বাছা বাক্য প্রয়োগে—ওরা গ্রামের গৌরব। বাংলার গৌরব। ভারতের গৌরব দুঃসাহসী দুর্জয়’ ইত্যাদি। প্রার্থনা জানালেন ‘ওদের যাত্রা শুভ হোক’।
ক্লাবের তরফ থেকে পর্যটকদের একখানা করে চমৎকার ডায়রি উপহার দেওয়া হল, যাত্রা পথের বিবরণ লিখতে।
পটাপট হাততালি পড়ল। সঙ্কোচে মানিকজোড় আর মাথা তুলতে পারে না।
এবার সভাপতির পালা। পঞ্চায়েত প্রধান শশাঙ্ক পাল বক্তৃতায় বেশ পোক্ত। তিনি ভিন গাঁয়ের মানুষ। শিব বা দেবুকে মোটেই চেনেন না। তাদের সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতে পারেননি তাড়াহুড়োয়। তাতে অবশ্য দমলেন না। বহুকাল আগে ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য দেশ ভ্রমণের উপকারিতার বিষয়ে যে রচনাটি মুখস্থ করেছিলেন সেটাই মনে মনে ঝালিয়ে নিয়ে হাতমুখ নেড়ে বলে গেলেন আধঘণ্টার ওপর। প্রধান মহাশয়ের স্টকে এমনই কিছু রচনা কণ্ঠস্থ আছে। নানা উপলক্ষে সভায় ভাষণ দিতে বিলক্ষণ কাজে লাগে।
প্রধান, ভাষণের শেষ পর্বে টেনে আনলেন নিজের কথা—দেশ ভ্রমণ আমিও কম করিনি। একবার লছমনঝোলা থেকে কেদার তীথ গিয়েছিলাম পায়ে হেঁটে। আর পঞ্চায়েতের কাজে এই যে গাঁয়ে গাঁয়ে এত ঘোরাঘুরি করি তাকেও পর্যটন বলা যায় বইকি। ডাক্তার সাইকেল বেশি চড়তে নিষেধ করেছে। তাই পায়ে হেঁটেই ঘুরি। এ খুব ভালো এক্সারসাইজ। স্বাস্থ্যকর। চন্দনার এই দুই বীরকিশোর পায়ে হেঁটে ভ্রমণের যে সংকল্প নিয়েছে পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে তাতে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
ভাষণ সমাপ্ত। হাততালিও পড়ল কিছু। সভাপতি তবু নড়েন না। ইদিকসেদিক নজর করেন। শেষে বলে ফেললেন—ফোটোগ্রাফার কই?
আজ্ঞে, এখনও এসে পৌঁছয়নি। লাভপুরের বিউটি স্টুডিও থেকে লোক আসার কথা। – কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুতভাবে জানালেন বেচুদা। সভাপতি ব্যাজার মুখে আসন নিলেন।
এবার উঠলেন প্রধান অতিথি। খানিক ঠেলেঠুলে দাঁড় করানো হল তাঁকে। বৃদ্ধ সুবোধ মণ্ডলের ধবধবে চুল দাড়ি সৌম্যকান্তি। লাজুক হেসে তিনি বললেন,—আমাকে আবার কেন যে এসব করা? ছেলেরা বলল, আমি অনেক ঘুরেছি, তাই। তা বটে অনেক দেশ আমি ভ্ৰমণ করেছিলাম ভারতের কত জায়গায়। ঘোরা আমার নেশা। এখন আর পারি না। শরীরে কুলোয় না। ট্রেনে বাসে পায়ে হেঁটে অনেক ঘুরেছি। প্রথম যে-বার গাঁ ছেড়ে বাইরে দূরে যাই, তখন এদেরই বয়স।
তিনি আঙুল তুলে রহস্যময় হেসে দেখালেন শিব আর দেবুকে,—কেন জান?
কেন কেন?–শ্রোতাদের তরফ থেকে উদ্গ্রীব প্রশ্ন।
মিটিমিটি হেসে মণ্ডলমশাই জানালেন,—পালিয়েছিলাম বাড়ি থেকে। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ফেল মেরে। খানিকটা লজ্জা আর বেশিটা বাপের পিটুনির ভয়ে। রেজাল্ট জেনেই বাড়ি এসে যা দু-চার টাকা জমানো ছিল তাই নিয়ে সটকালাম এখান থেকে হাওড়া স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেনে চাপলাম যেদিকে দুচোখ যায়। বিনা টিকিটে। ট্রেনের টিকিট কাটলে যে খাওয়ার পয়সা থাকে না। পাটনার কাছাকাছি পৌঁছাতে চেকার ধরল। ঘাড় ধরে নামিয়ে দিল ট্রেন থেকে। দমলাম না। হাতের কাছে যা কাজ পাই করি। দু পয়সা কামিয়ে নিয়ে ফের বেরই পথে। ট্রেনে বাসে বা হেঁটে চলি। ট্রেনে অবশ্য টিকিট কাটতাম না। তবে বাস কনডাক্টাররা বেশ কড়া! বেশি দূর যেতে না যেতে ঠিক ধরে ফেলত। দু ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দিত। তাই পারতপক্ষে বাসে ফাঁকি দিতে সাহস হত না। এইভাবে কানপুর দিল্লি হয়ে পৌঁছালাম আগ্রা। পথে কত কী অদ্ভুত ঘটনা। লক্ষ্ণৌর কাছে এক ভূতুড়ে সরাইখানায় রাত কাটাতে গিয়ে যা মারাত্মক অভিজ্ঞতা-
সিধুখুড়ো সেই ভৌতিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন শ্রোতারা রুদ্ধশ্বাসে শোনে।
আগ্রায় গিয়েই ব্যস্।—সিধুখুড়ো ফের মিটিমিটি হাসেন : সেখানে আমার এক কাকা থাকতেন। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে তাঁর নজরে পড়ে গেলাম। দেখেই সন্দেহ করলেন বাড়ি থেকে ভেগেছি। নিয়ে গিয়ে আটক করলেন তাঁর বাসায়। টেলিগ্রাম পাঠালেন আমার গ্রামের বাড়িতে। বাবা এসে পাকড়ে নিয়ে গেলেন কদিন বাদে। ব্যস, আমার প্রথম বারের দেশ ভ্ৰমণ খতম। লাভের মধ্যে হিন্দিটা রপ্ত হয়ে গেল।
হি হি হো হো—রব উঠল সভায়। অল্পবয়সিরা বেজায় খুশি। তবে কিছু বয়স্ক ভুরু কুঁচকোলেন : সিধুখুড়োর জ্ঞানগম্যি আর হবে না। কী দরকার ছিল এসব বৃত্তান্তে? এই সবে পরীক্ষা হল। অনেক ছেলেই ফেল মারবে। তারপর ছোঁড়াগুলো সিধুখুড়োর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলে ঝামেলার একশেষ!
সিধুখুড়ো দাড়িতে হাত বুলতে বুলতে হেসে বললেন,—সেই যে নেশা ধরে গেল তারপর বারবার গ্রাম ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছি। তবে আর লুকিয়ে পালাইনি। বাড়ির লোকদেরও সঙ্গে নিয়েছি কয়েকবার। এই যে আমাদের দেবু শিব যাচ্ছে সবাইকে বলেকয়ে এ অতি সাধু উদ্যোগ। হেঁটে যাচ্ছে। এও খুব ভালো। বিনাটিকিটে ট্রেনে চাপার রিস্ক নেই। আশীর্বাদ করি ওদের ভ্রমণ নিরাপদ হোক।
সিধুখুড়োর ভাষণের সমাপ্তিতে তুমুল করতালি বাজল। সভা শেষ। লোকজন উঠে পড়ল। যাওয়ার আগে সভাপতি ফের খোঁজ নিলেন,—ফোটোগ্রাফার এসেছে?
কুণ্ঠিত বেচুদা হাত কচলায়,—না। এত করে বলে এলুম। গ্রামে একটা ক্যামেরা আছে কিন্তু ফিল্ম নেই।
গজগজ করতে করতে বিদায় নিলেন পঞ্চায়েত প্রধান।
