উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

যাত্রা বিভ্ৰাট – ১

এক

শিবের মুখ দেখেই দেবু বুঝল যে গুরুতর একটা কিছু ঘটেছে। দুপুর বেলা। ছুটির দিন। দোতলার চিলে কোঠায় নির্জনে একা তক্তপোশে শুয়ে গল্পের বই পড়ছিল দেবু। শিব নিঃশব্দে ঢুকল। বসল খাটের কোণায়। চুপচাপ। মুখ থমথমে। দেবু আড় চোখে দেখে নেয়। প্রতীক্ষায় থাকে। কখন শিব নিজেকে খোলসা করবে। ওই হাবভাব তার চেনা।

গল্প শুরুর আগে, দেবু ও শিবদের পরিচয়টা সামান্য দিয়ে রাখি। ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে চন্দনা গ্রাম। এই গ্রামেই বাস করে শিব আর দেবু। দু’জনেই সবে কলেজে উঠেছে। পরম বন্ধু দু’জনে। শিব দত্ত হাতে পায়ে ডানপিটে। নামকরা খেলোয়াড়। পড়াশুনায় মাঝারি। দেবু মজুমদার দারুণ ছাত্র। তবে নিরীহ গোবেচারি নয় মোটেই। যদিও বাইরে তাকে লোকে জানে ভারি ভালো মানুষ টাইপ। ওর দুষ্টুমির খবর রাখে শিবের মতন ঘনিষ্ঠ কয়েকজন মাত্ৰ। বিপাকে পড়লেই শিব আসে দেবুর বুদ্ধি নিতে।

কয়েকদিন শিবের দেখা মেলেনি। ও এখন গ্রামের একমাত্র ক্লাব চন্দনা স্পোর্টিংয়ের যাত্রা নিয়ে ব্যস্ত। এ ব্যাপারে ওর মহা উৎসাহ। নিজে ছোটখাটো পার্ট করে। তবে খাটাখাটনি করে প্রচুর। প্রতি বছর চন্দনায় যাত্রা হয় লক্ষ্মীপূজা আর কালীপূজার মাঝে কোনো এক রাতে। এখনো মাস দুই বাকি। তবে রিহার্সাল শুরু হয়ে গেছে। দেবু অবশ্য যাত্রায় জড়ায় না নিজেকে। তবে দেখতে ভালোবাসে। রিহার্সালও দেখে মাঝে মাঝে। এবার হচ্ছে—‘কুরু পাণ্ডব’।

কী পড়ছিস?—বিরক্ত স্বরে জানতে চায় শিব।

দুর্দান্ত একটা ডিটেকটিভ।—দেবু বই থেকে চোখ সরায় না।

রাখ তো!—ধমকায় শিব : এদিকে কী হচ্ছে খবর রাখিস?

কী ব্যাপার?—এবার দেবু বই মুড়ে উঠে বসে।

ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে শিব—এবার ক্লাবের যাত্রাটা বোধহয় ভন্ডুল হবে।

—কেন?

—কেন আবার। ওই ঢোলকপতির জন্যে।

—ঢোলকপতি! ও মানে গোলকপতি সাহা। দক্ষিণপাড়ার?

—হ্যাঁ। ওই লোকটা ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছে। আমাদের অ্যাদ্দিনের যাত্রা। মিলেমিশে করতাম সবাই। লোকটা আচ্ছা বদ।

—ঝগড়া? ক্লাবে! কীরকম?

শিব বলল,—ঢোলকপতির কী মতলব জানিস। ও এবার আমাদের যাত্রার ডিরেকটর হতে চায়। সেক্রেটারি বেচুটা আর ক্লাবের অন্য বড়রা তাতে রাজি হয়নি। তাই রেগে গিয়ে ও আর একটা যাত্রা করাচ্ছে। গাঁয়ের অনেক লোককে ভাঙিয়ে নিচ্ছে লোভ দেখিয়ে।

গোলকপতি সাহা হবে ডিরেক্টর!—ভুরু কুঁচকে বলে দেবু : উনি কি আগে তেমন অভিনয়-টভিনয় করেছেন? কিংবা পরিচালনা?

আরে ধুস! উনি নির্দেশনা বা অভিনয়ের কচু জানেন। শিব উত্তেজিত।

—তাহলে হঠাৎ এই শখ?

—চালিয়াতি। হঠাৎ পয়সা হয়েছে যে। প্রথমে খুব উৎসাহ দেখিয়েছিলেন যাত্রার ব্যাপারে। যাত্রা কমিটির মেম্বার করা হয়েছিল ওকে। মোটা টাকা চাঁদা দেবেন বলেছিলেন যাত্রার খরচ সামলাতে। কিছু দিন পরেই টের পাওয়া গেল যে শুধু মেম্বার হয়ে থাকাটা উদ্দেশ্য নয়। উনি চান সর্দারি। উড়ে এসে জুড়ে বসার মতলব।

শিবু রাগে গরগর করতে করতে বলে যায়, জানিস আমার ছোটকাকা বলেছে যে, ওই গোলকপতি কাকার সঙ্গে পড়ত ইস্কুলে সব বিষয়ে অঘা ছিল। ক্লাস নাইনে দুবার ফেল্ করার পর ওকে ওর মামারবাড়ি বর্ধমানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মামার কাছে ঠিকেদারি কাজ শিখতে। ইদানীং ঠিকেদারি করে বেশ পয়সা করেছেন। গাঁয়ে তো আসেনি বহুকাল। এলেও দু-এক বছর বাদে বাদে বড়জোর দু-একদিনের জন্যে। এবার এসে বাড়িঘর সারাচ্ছেন। নাকি মাঝে মাঝে এসে থাকবেন। আসলে গাঁয়ে একটু মাতব্বরি করতে চায় পয়সার জোরে।

তা ওঁনাকে একটা পার্ট দিলেই তো হত।—বলল দেবু।

—তাই দিতে চেয়েছিল বেচুদা। নকুল বা সহদেব। অথবা পাণ্ডুরাজার রোল। তা নেবেন না। চাই আরও বড় পার্ট। বেচুদা রাজি হয়নি। ওই তো চেহারা। ঢোলকমার্কা ফিগার। ভুঁড়িওলা। বেঁটে ঢোলক কি সাধে বলে। আবার ফ্যাসফ্যাসে গলা। উনি যে সেটা বোঝেন না তা নয়। তাই এই নিয়ে আর চাপাচাপি করেননি। মাঝে মাঝে শুধু ফুট কাটতেন।

এ জায়গাটা ঠিক হচ্ছে না। এ জায়গাটা অন্য ভাবে করে গন্ধর্ব অপেরা। উঃ কী জমে সিনটা! ক্লাবের বড়রা কেউ পাত্তা দিত না ওর কথায়। তখন রিহার্সালে আসা বন্ধ করলেন। ওর এক চামচাকে দিয়ে বলে পাঠালেন যে এবার ওকে ডিরেকশনের স্কোপ দেওয়া হোক। একটা নতুন দারুণ জিনিস করে দেখাবেন। কীসব একঘেয়ে মান্ধাতা আমলের অ্যাকটিং চালাচ্ছেন এইসব।

বেচুদা সাফ জানিয়ে দিয়েছে মিত্তিরমশাই আমাদের পুরনো ডিরেকটর। পাঁচ গাঁয়ে ওঁর সুনাম আছে। ওঁর ডিরেকশনেই চন্দনা স্পোর্টিং দু’বার লাভপুরে যাত্রা কম্পিটিশনে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে। ওঁকে বাদ দিতে পারব না। গোলকপতি বরং থাকুক প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে।

তাতে রাজি নয় গোলকপতি। জানিয়ে দিয়েছে যে চন্দনা স্পোর্টিংয়ের যাত্রা ফান্ডে চাঁদা দেবেন না। এবং উনি এবার আলাদা যাত্রা করাবেন।

গোলকবাবু কেমন ডিরেকশন দেন?—দেবু জানতে চায়।

হোপলেস্!—শিব গর্জায়; একটু-আধটু যা দেখিয়েছেন তাতেই মাল ক্যাচ। কোনো সেন্স নেই অভিনয়ের। ভীম অর্জুন শ্রীকৃষ্ণ সব করলেন এক ধাঁচে। সবাই যেন সর্বদা দাঁত খিঁচুচ্ছে আর লড়াইয়ের পাঁয়তারা কষছে।

—উনি কি নির্দেশনা দিয়েছেন আগে কোথাও?

—বললেন তো দিয়েছেন। বর্ধমানে একটা থিয়েটার করিয়েছিলেন। নাকি দুর্দান্ত হয়েছিল। মনে হয় ডাহা গুল। অমন ডিরেকশনে নির্ঘাৎ ঢিল খাবে পাবলিকের। তবে যাত্রা হয়তো দেখেছে অনেকে। কলকাতার বড় বড় পার্টির। তাদের নিয়ে খুব লম্বা-চওড়া বুকনি ঝাড়েন। তা দেখা আর নিজে করানো কি এক জিনিস?

দেবু শিশি থেকে হজমিগুলি বের করে একটা নিজের মুখে ফেলে আর একটা শিবুকে দিয়ে বলল,—ক্রেডিট নেওয়ার ইচ্ছে হয়েছে? বরং এক কাজ কর ভুজুং ভাজং দিয়ে কলকাতা থেকে একটা নামকরা যাত্রা পার্টি আনা ওর পয়সায়। আমরা দেখতে পাব। ওরও নাম হবে।

শিব বলল,—আরে আমরাও তো প্রথমে তাই ভেবেছিলুম। বুঝি আমাদের ডাউন করতে কোনো নামকরা প্রফেশনাল দল আনাবেন। কিন্তু সে গুড়ে বালি। একেবারে স্বয়ং নির্দেশক হওয়ার বাসনা। আর শুনছি পার্টও করবেন। বড় পার্ট।

দল ভাঙাবার কথা কি বলছিলি?—দেবু জানতে চায়।

—হ্যাঁ, কিছু গিয়ে জুটেছে ওর সাথে। যারা আমাদের পালায় বড় পার্ট পায় না। মানে শখ আছে কিন্তু সাধ্যি নেই।

—কে কে?

—এই যেমন হরলাল গড়াই। জগাইদা। টেকো দত্ত। লম্বু খোকা এমনি কিছু। আরও খসবে মনে হয়। মিউজিক পার্টির দু একজনও ভাগবে টাকার লোভে।

—গোলকপতি কী পালা করাবে শুনেছিস?

—মহা শয়তান। আমরা তো ধরেছি কুরু-পাণ্ডব? নাকি ঢোলকপতি ওই পালাটাই নিজেই কিছুটা চেঞ্জ করে ‘কুরুক্ষেত্রে’ নাম দিয়ে করাবে বলেছে। অর্থাৎ একই ফিল্ডে চ্যালেঞ্জ। আর ওর দলের নাম দিয়েছে—নিউ চন্দনা ড্রামাটিক ক্লাব।

দেবু চোখ ছোট করে বলে বটে! নিউ চন্দনা! আচ্ছা হরলালদা কেন ও দলে ভিড়ল? বুঝি ভীমের পার্ট পাবে?

—হ্যাঁ ঠিক তাই। ঢোলকপতি ওকে তাই আশ্বাস দিয়েছেন। আমাদের ক্লাবে তো ভীম জুটছিল না। অথচ চেহারাখানা রয়েছে মোষের মতন। বাজখাঁই গলা। বেচুদা আগেরবার নগেনদাকে দিয়ে ভীম করাল। তাই চটে আছে। অনেককে বলেওছিল হরলালদা—নগেনকে কি ভীম মানায়? বেচুর পার্শিয়াল্টি। এক ক্লাসে পড়ত যে।

দেবু হেসে ফেলে—কেন সেবার তো ওকেই প্রথমে ভীম দেওয়া হয়েছিল। রিহার্সেলেই কেঁচিয়ে দিল। অর্ধেক উচ্চারণ আটকে যায়। মনে আছে। কিছুতেই আর “চতুর” বলতে পারল না। মোশান এলেই বেরিয়ে যায়— “সচতুর দুর্যোধন”। তারপরই জিব কাটে। শেষে ওকে ঘটোৎকচ দেওয়া হল। তাও ডায়ালগ কত কমিয়ে।

শিবও হাসে—মনে আছেরে। অনেক বছর আগে। কী জানি পালা হয়েছিল। আমরা তখন ছোট। হরলালদা তখনো এত মোটা হয়নি। কজ্জল সেজেছিল। শ্বেতকেতু যেই বলেছে কী জন্য এসেছে হেথায়? কজ্জল বলল মনে ছিল আশা। রচিব কুটির এক ব্যতসী লতায়। নর্দমার তীরে। “নর্মদা আর বেরুল না। আমরা হেসে কুটিপাটি। সিন মার্ডার। মিত্তির মশাই অমন ঠান্ডা মানুষ। তিনি অবধি খেপে গিয়েছিলেন সেদিন।

দেবু নিশ্চিন্তভাবে বলল—হ্যাঁ : ওই ডিরেকশন। আর ওই সব ছিরির অ্যাকটর। পালা যা হবে বুঝছি। তোরা ঘাবড়াসনি। মাঝে মাঝে আমায় রিপোর্ট করে যাস, ওরা কী কচ্চে।