।।আট।।
তিস্তা ব্রিজে টোল না দিয়ে যখন অর্জুনরা ছুটে যাচ্ছিল সামচির দিকে, পেছনের সিটে তার পাশে তখন অমলদা বসে। অমলদা চলে যাওয়ার পরে কাটা-গদাই ফিরে এসে জানিয়েছিল, এক দুই তিন চার নম্বর গাড়িটা তিস্তা বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে-সঙ্গে অর্জুন উঠে দাঁড়িয়েছিল। জেমসের জীবনের জন্য সে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। দুই গদাইকে সঙ্গে নিয়ে সে ছুটে গিয়েছিল তিস্তা বাংলোতে। গিয়ে দ্যাখে, গাড়িটা নেই। কিন্তু কাটা-গদাই শপথ করে বলে সে গাড়িটাকে বাংলোর পাশে দাঁড়াতে দেখেছে। সেই লোকটা গাড়ি থেকে নামে, যে থানায় গিয়েছিল। গাড়িতে আরও একটা লোক বসেছিল স্টিয়ারিং-এর পেছনে। কাটা-গদাইয়ের ধারণা ওই দ্বিতীয়টা লোকটাই মান সিং। অর্জুন নিষেধ করেছিল বলে সে কিছু করেনি, না হলে তার ইচ্ছে হচ্ছিল লোকটাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে।
অর্জুন সঙ্গীদের নিয়ে ওপরে ছুটে গিয়েছিল। তখন মধ্যরাত। তিস্তা বাংলোর প্রতিটি ঘরের দরজা বন্ধ। জেমসের ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। সেখানে ঢুকে হতভম্ব হয়ে পড়েছিল অর্জুন। কোনও চিহ্ন নেই জেমসের। বাথরুমের দরজা খোলা। তার লাগেজও নেই। অর্জুনের মনে হয়েছিল, আততায়ীরা আরও সাবধানী হয়েছে। তারা জেমসের মৃতদেহ এখানে রেখে যেতে চায়নি। একমাত্র অর্জুন ছাড়া কেউ জানে না জেমস এই বাংলোতে আশ্রয় নিয়েছে। অর্জুন যদি লাইটার-বিস্ফোরণে নিহত হয় তা হলে জেমসের হদিস কেউ পাবে না।
ওরা যখন নীচে নেমে ভাবছে কী করা যায়, তখন আর-একটা জিপ এসে দাঁড়াল সামনে। জিপের পেছন থেকে অমলদা মুখ বাড়ালেন, “উঠে এসো অর্জুন।”
“আপনি?” অর্জুন কাছে এগিয়ে গেল।
“সহদেব বকসির সঙ্গে কথা বলে মনে হল আমার এখনই রওনা হওয়া উচিত। তোমার বাড়িতে পৌঁছে দেখলাম তুমি নেই। এত রাত্রে এখানে ছাড়া আর কোথাও যেতে পারো না তুমি। তাই চলে এলাম। উঠে এসো।” অমল সোম সোজা হয়ে বসলেন।
কোনও প্রতিবাদ না করে জিপে উঠল অর্জুন। উঠে বলল, “ওরা জেমসকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। আমরা যদি আর-একটু আগে পৌঁছতাম তা হলে….।” খুব আফসোস হচ্ছিল ওর। অমলদা কোনও জবাব দিলেন না। সামনের সিটে যে ভদ্রলোক বসে আছেন, তাকে দেখে খুব অবাক হল ও। জলপাইগুড়ির এস. পি.-কে সে এই গাড়িতে আশা করেনি। ভদ্রলোক কোনও কথা বলছেন না। সরকারি জিপ বলে তিস্তা ব্রিজে টোল দেবার জন্য দাঁড়াতে হল না।
ময়নাগুড়ি শহরকে বাঁ দিকে রেখে ঝড়ের মতো জিপটা ছুটে গেল ধুপগুড়ি, গয়েরকাটা পেরিয়ে। ‘খুঁটিমারি রেঞ্জ’ রহস্যটা সে ওই গয়েরকাটায় উদ্ঘাটন করেছিল। বানারহাটের চৌমাথায় দেখল একটা পুলিশের জিপ দাঁড়িয়ে আছে। এস. পি. গাড়িটাকে থামাতে বললেন। বানারহাটের ও.সি. এসে ওঁকে স্যালুট করলেন। বোঝাই যাচ্ছে এখানে অপেক্ষা করতে ওঁদের খবর পাঠানো হয়েছিল। ও.সি.-কে এস. পি. জিজ্ঞেস করলেন, “ওয়ান টু থ্রি ফোরকে দেখেছেন?”
ও.সি. দ্রুত ঘাড় নাড়লেন, “হ্যাঁ স্যার। আপনার খবর পাওয়ামাত্র বাইরে বেরিয়ে দেখি, গাড়িটা চলে গেল। ধরতে পারিনি। ধরার অবশ্য অর্ডার ছিল না।”
পেছন থেকে অমলদা মন্তব্য করলেন, “ভালই করেছেন। লেটস্ মুভ। ওঁদের আধঘণ্টা বাদে স্টার্ট করতে বলুন মিস্টার কাপুর।”
হুকুম দেওয়া হলে জিপ আবার দৌড়তে শুরু করল। পলাশবাড়ি চা-বাগান পেরিয়ে রিয়াবাড়ির পাশ দিয়ে ওরা ছুটে যাচ্ছিল। ভুটানের বর্ডারটা দেখতে পাওয়ামাত্র অমলদা গাড়ি থামাতে বললেন। এস. পি. মাথা ঘুরিয়ে বললেন, “মিস্টার সোম, ওই বর্ডার পেরিয়ে গেলে আমার কিছুই করার থাকবে না।”
অমলদা বললেন, “আমি জানি। আপনি জিপটাকে নিয়ে সামচির ভুটান পুলিশের কাছে চলে যান। ওদের সাহায্য চান। আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব। অর্জুনকে ইশারা করে নেমে পড়লেন অমল সোম। অর্জুন নামতেই জিপটা সীমান্ত পেরিয়ে বর্ডার পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সামনে পড়ল। অর্জুন দেখল ওদের ছাড়া পেতে সময় লাগল না। তারপরেই জিপটা ওপরে উঠে যেতে চারপাশে অন্ধকার নামল। শুধু ভুটান পুলিশের চেকপোস্টে হ্যাজাক জ্বলছে। দুজন সান্ত্রী বন্দুক হাতে তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
অমলদা চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ওরা কোথায় যেতে পারে বলে তোমার ধারণা অর্জুন? সোজা সামচি বাজারে পৌঁছাবে চেকপোস্ট ডিঙিয়ে?”
অর্জুন বলল, “আমি বুঝতে পারছি না। যদি না যায় তা হলে ওদের গাড়িটাকে দেখতে পেতাম।”
“গুড। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, আমাদের মতন ওদের দু’জন নেমে গেছে মাঝরাস্তায়। মান সিং নামের এদেশি লোকটা গাড়ি নিয়ে পুলিশের কাছে কিছু জবাবদিহি দিয়ে চলে গেছে বাজারে। সেখানে কারও গ্যারাজে গাড়ি রেখে আবার ফিরে অসবে। এই চেকপোস্টগুলোতে কোনওরকম কড়াকড়ি হয় না। কোথা থেকে আসছ, কোথায় যাবে এইটুকু জানালেই চলে। তাই না?”
অর্জুনেরও তাই মনে হল। এদিকটা এখন গভীর অন্ধকারে ঢাকা। ওপাশে পাহাড়ের শরীর সোজা ওপরে উঠে গেছে। সামচি পাহাড় হিসেবে কোনও কৌলীন্য দাবি করতে পারে না। কিন্তু রাত্রে তাই কত রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই।
অমলদা বললেন, “অদ্ভুত ব্যাপার তো? এই পাহাড়ে কি ঝিঁঝিও শব্দ করে না? অর্জুন, তুমি এখানেই অপেক্ষা কর। আমি একটু ঘুরে আসছি।”
অমলদা অন্ধকারে মিলিয়ে গেলে অর্জুন চারপাশে একবার তাকাল। এইভাবে কোনও সূত্র ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকার কী অর্থ, তা তার মাথায় আসছিল না। সামচিতে যদি ওরা যায়, তা হলে জেমসকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। আর তারই বা কী দরকার। জলপাইগুড়ি থেকে আসবার পথে অন্ধকারে যে-কোনও জঙ্গলের ধারেই ওকে মৃত অবস্থায় ফেলে দিলে কে দেখবে। একজন এফ. বি. আই. অফিসার এত সহজে মারা গেল, ভাবলেই অবাক হতে হয়। অবশ্য মারা যে গিয়েছে, তারও তো কোনও প্রমাণ নেই।
ঠিক সেই সময় দূরে পাহাড়ের গায়ে একটা বাড়ির সামনে আলো জ্বলে উঠল। আলোটা জ্বলছে নিভছে। অর্জুন সতর্ক হল। এত রাত্রে কেউ আলোর খেলা খেলবে কেন? শেষবার নিভে যাওয়ার পর আর জ্বলল না আলোটা। অর্জুনের মনে হল, কেউ নিশ্চয়ই জেগে আছে ওদিকে। তাকে আলোটা টানছিল। রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে গেলে সামনেই পড়বে চেকপোস্টটা। অর্জুন ডান দিকে এগোল। অন্ধকারে বেশিক্ষণ থাকলে আকাশ এক ধরনের আলো দেয়। যাদের চোখ থাকে, তারা ঠিক পৃথিবীটাকে চিনে নিতে পারে। অর্জুন চেষ্টা করল।
পাহাড় কখনওই পায়ে চলার জন্য সুন্দর রাস্তা তৈরি করে রাখে না। আগাছা, এবড়ো-খেবড়ো পাথর ডিঙিয়ে অর্জুন সন্তর্পণে উঠছিল। তার একবার মনে হয়েছিল অমল সোমকে খবরটা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করবে কি না! কিন্তু পরক্ষণেই স্থির করলে আলোর উৎসটা দেখেই ফিরে আসবে। কিছুদূর যাওয়ার পর অর্জুন বুঝল আর এগোন সম্ভব নয়। এখান থেকে পাহাড় খাড়াই উঠে গেছে। ওপাশে অনেক নীচে একটা চওড়া নদীর খাত। আলোটা
যেখানে জ্বলেছিল সেখানে এদিক দিয়ে পৌঁছানো যাবে না। সে সমান্তরালভাবে হাঁটতে লাগল। এবং এক সময় আগাছা ভাঙতে-ভাঙতে বড় রাস্তায় চলে এল। এই রাস্তাটাই চেকপোস্টের সামনে দিয়ে চলে এসেছে। অর্জুন আবার ওপরের দিকে তাকাল। সেখানে পৌঁছতে গেলে রাস্তাটা ধরে চলাই সুবিধে।
ক্রমশ সে সামচির বাজারে এসে পড়ল। বাড়িঘরগুলো ঘুমিয়ে আছে। কোথাও কোনও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। বাজারটা চৌকো, মাঝখানে চত্বর খোলা পড়ে আছে। আরও একটু এগোতেই সে মানুষের গলা শুনতে পেল। একাধিক মানুষ জড়ানো গলায় কথা বলছে। সন্তর্পণে এগিয়ে সে বুঝতে পারল ওটা দিশি মদের দোকান। দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। কথাবার্তা আসছে ওখান থেকেই। একটু অপেক্ষা করল সে। ঝাঁপের ফাঁক দিয়ে আলো বাইরে আসছে। হঠাৎ তিনটে লোক বেরিয়ে এল বাইরে। তিনজনেই স্থানীয় মানুষ। পা টলছে। তারা বের হওয়ামাত্র আলো নিভে গেল। শেষবার জড়ানো কথা বলে তিনটে লোক তিনদিক চলে গেল। অর্জুন মুশকিলে পড়ল। প্রথমত এদের সন্দেহ করার কিছু নেই। দ্বিতীয়ত, যদি অনুসরণ করতে হয়, কাকে করবে। যারা জলপাইগুড়ি থেকে এসেছে তাদের একজন আমেরিকান, একজন চাইনিজ আর একজন নেপালি। এই তিনটে মানুষের মধ্যে নেপালিটাই থাকতে পারে। তিনজনের চেহারাই এক। আর এইসব ভাবতে-ভাবতে ওরা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। অর্জুন ঠিক করল যেখানে অমলদা তাকে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন সেখানেই ফিরে যাবে। ঠিক তখনই বন্ধ পানশালার ঝাঁপ সরিয়ে চতুর্থ লোকটি বেরিয়ে এল। বেরিয়ে একটু অপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নেপালি ভাষায় কিছু বলল কাউকে। ভেতর থেকে তার জবাব এল। লোকটা একটু অপেক্ষা করে পা ফেলতে লাগল। মধ্যবয়সী লোকটা বেশ স্মার্ট, প্যান্ট আর জ্যাকেট পরা, মাথায় একটা চাপা টুপি। সে হঠাৎ পকেট থেকে টর্চ বের করে কয়েকবার জ্বালল আর নেভাল। অর্জুন ঘাড় ফিরিয়ে ওপারের পাহাড়ের দিকে তাকাল। সঙ্গে-সঙ্গে সেখানেও একই আলোর সঙ্কেত শুরু হল। এবার লোকটা সন্তুষ্ট হয়ে সেদিকে হাঁটতে লাগল। রাস্তাটা দুটো ভাগ হয়ে গেছে। একটা সোজা ওপরের দিকে চলে গেছে, আর একটা বেঁকে ওই পাহাড়ে। মুখ-চোখ এখন ভাল করে দেখা অসম্ভব ব্যাপার, তবু অর্জুনের মনে হল, এই হল মান সিং। লোকটা, এতক্ষণ পানশালায় ছিল কিন্তু একফোঁটাও মদ খেয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। ও গাড়িটাকে কোথায় পার্ক করল?
কিন্তু পাহাড়ের রাস্তায় যেখানে পায়ের তলায় অসমান নুড়ি সেখানে কাউকে শব্দহীন হয়ে অনুসরণ করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু এই লোকটা বোধহয় ফূর্তিতে আছে। অর্জুন চেষ্টা করছিল যতটা নিঃশব্দে যাওয়া যায়। লোকটা যেভাবে পা ফেলছে সে তাই করছে। কিন্তু লোকটা একটিবারও পেছন ফিরে তাকিয়েছে বলে মনে হল না। মিনিট দশেক হাঁটল লোকটা। এখনও ওরা পাহাড়ের অনেকটা উঁচুতে উঠে এসেছে। পরপর অনেকটা জায়গা নিয়ে এক-একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি বাড়ি কাঠের এবং দেখলেই বোঝা যায় মানুষগুলো অর্থবান। লোকটি যে বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়াল সেখানেই রাস্তার শেষ। তারপরেই পাহাড় নেমে গেছে সোজা নীচে নদীর বুকে।
বারান্দায় যে দাঁড়িয়ে ছিল সে শিস দিতেই আগন্তুক একই সঙ্গে শিস দিল, একই রকম ছন্দে। তারপর সে ভেতরে ঢুকে গেল। অর্জুনের নিশ্চিত ধারণা হল, মান সিং গাড়ি পার্ক করে তার কর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। এই মাটি ভুটানের। যদিও পাশপোর্ট-ভিসার দরকার হয় না কিন্তু এখানকার পুলিশ তাকে যে-কোনও মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কী করবে বুঝতে পারছিল না সে। ওই মানুষগুলো যদি এখানে থাকে তা হলে বিপদ যে-কোনও মুহূর্তেই আসতে পারে। ওই গ্রেনেড-লাইটার ছুঁড়ে দিলেই হল। আর যদি জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর আসল লাইটারের মালিক এখানে থাকে তা হলে তো আর দেখতে হবে না। অর্জুনের সঙ্গে কোনও অস্ত্র নেই। যদি এস. পি. এখানকার পুলিশদের সঙ্গে এনে বাড়ি ঘেরাও করেন, তা হলে সদলবলে ধরা যায়। কিন্তু ওদের তো জানাতে হবে। অমলদা যেখানে থাকতে বলেছিলেন, সেখানে ফিরে যেতেও তো সময় লাগবে!
এই সময় বাংলোর একটা দরজা খুলে গেল। অর্জুন দ্রুত একটা গাছের আড়ালে সরে গেল। যে লোকটা বেরিয়েছিল, সে বারান্দার রেলিং ধরে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, এত দেরি হল কেন? কোনও গোলমাল হয়েছে নাকি?”
“সামচি আমার হাতের মুঠোয়। গোলমাল এখানে হবে কেন?”
“কোনও গাড়ি এসেছে?”
“হ্যাঁ। জলপাইগুড়ির এস. পি. একা গাড়ি নিয়ে ঢুকেছে।”
“এস. পি.! ওই ছোকরা সঙ্গে নেই তো?”
“না।”
“কেন্টকে বললাম শেষ করে দিতে ছোকরাটাকে কিন্তু ও খেলতে চাইল। কাম অন, আমরা এখনই রওনা হব।” লোকটা এবার বাংলোর ভিতরে ঢুকে গেল। মান সিং সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে তাকে অনুসরণ করল। যে লোকটা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, সে দেশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরাল। তারপর সিঁড়ির মধ্যে বসে পড়ল। ওই লোকটা হয়তো নিরীহ। জাল লাইটার হাতে পায়নি।
কিন্তু ওরা এখন কোথাও যাচ্ছে! কোথায়? অর্জুন আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। এবার ওই লোকটি হেঁটে আসছে দেখতে পেল গেটের কাছে। গেটে হাত রেখে চারপাশে তাকাল। তারপর মুখের শেষ হয়ে আসা সিগারেটের প্রান্তটুকু ছুঁড়ে দিল রাস্তায়। একবার পেছন ফিরে তাকাল। বাংলোয় কোনও আলো জ্বলছে না। লোকটা গেট খুলে চলে এল এপাশে। তারপর কী জন্য যেন পথের পাশে বসে পড়ল। মুহূর্তেই অর্জুনের শরীর টান-টান হল। বাংলোর কাছে পৌঁছনোর এই একটাই সুযোগ। লোকটা বসেছে তার দিকে পেছনে ফিরে। সে নিঃশব্দে চিতাবাঘের মতো দূরত্বটা অতিক্রম করল। শেষ মুহূর্তে বোধহয় লোকটা অনুমান করল কেউ আসছে। কিন্তু ততক্ষণে অর্জুনের হাত নেমে এসেছে ওর ঘাড়ে। সঙ্গে-সঙ্গে একটা ককানির মতো শব্দ হল। আর লোকটা এলিয়ে পড়ল মাটিতে। অর্জুন ওকে টেনে নিয়ে এল গাছটার পেছনে। লোকটা নেপালি। কোমরে একটা ভোজালি গোঁজা। সেটা খুলে নিয়ে বাংলোর দিকে তাকাল সে। দরজাটা এখন বন্ধ। কেউ নেই সামনে। দ্রুত ঢুকে পড়ল অর্জুন ভেতরে। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর ওপরে না উঠে বাংলোর পাশ দিয়ে নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল। বাংলোর ঠিক পেছনেই পাহাড়টা নেমে গেছে নদীর বুকে। সেখানে পৌঁছে সে মানুষের গলা পেল। দুটো ভারী স্যুটকেস নিয়ে কারা কথা বলতে বলতে বাংলো থেকে নামছে। মান সিংয়ের গলা পেল সে, “ওকে কিছু বলে যাওয়া হল না। ও জানবে আমরা বাংলোতেই আছি।”
“তাই জানা উচিত। বেশি লোককে জানাবার দরকার নেই।”
“এর মধ্যে সব একই ধরনের মাল আছে?”
“কেন?”
“হাত থেকে পড়ে গেলে তো শেষ হয়ে যাব।”
“শেষ যাতে না হও তার ব্যবস্থা করা আছে।”
অর্জুন এবার লোকটিকে চিনতে পারল। পাতলা, কিন্তু মজবুত শরীর। একটা হিলহিলে ভাব আছে। চেহারা দেখলে চাইনিজ বলে মনে হয়। থাই কিংবা সিঙ্গাপুরিও হতে পারে। ওরা নদীর ধার দিয়ে নেমে যাচ্ছিল। অর্জুনকে অনেকখানি ব্যবধান রাখতে হচ্ছিল। জেমস নিশ্চয়ই একটি মৃতদেহ হয়ে পড়ে আছে কোথাও। লোকটার জন্য কষ্ট হচ্ছিল তার। মিনিট পনেরো হাঁটার পর ওরা একটা প্যাগোডা টাইপের বাড়ির সামনে এসে পড়ল। এদিকে মানুষের বসতি কম। এত রাতেও পাশের মনাস্ট্রিতে অদ্ভুত বাজনা বাজছে। প্যাগোডা টাইপের বাড়িটার ভেতরে ঢুকে গেল ওরা। অর্জুন দেখল দু’জন লামা কথা বলতে বলতে মনাস্ট্রি থেকে বেরিয়ে উলটো দিকে চলে গেলেন। এবং তখনই বাজনা থেমে গেল।
“ডোন্ট মুভ,” চাপা গলায় ধমকানিটা শুনে চমকে পেছনে ফিরে তাকাতেই অর্জুন অমল সোমকে দেখতে পেল। অমলদা বললেন, “তোমাকে অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। খুব রেগে যেতাম যদি না ঠিক জায়গায় পৌঁছে যেতে। এস. পি. মিনিট পাঁচেকের মধ্যে এসে পড়বেন। কিন্তু তার আগে আমি ভেতরে যাচ্ছি। তুমি এবার এখান থেকে নোড়ো না।” কথা শেষ করে অমলদা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন। সঙ্গে-সঙ্গে ভেতর থেকে শব্দ ভেসে এল। কেউ চ্যালেঞ্জ করছে। অমলদা কিছু জবাব দিতেই আলো দেখা দিল। একটা লোক বেরিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল ওঁকে। নিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে যেন খাতির ছিল।”
ঠিক তখনই মনাস্ট্রি থেকে আর-একটি লোক বেরিয়ে চাতালের ওপর দাঁড়াল। লোকটা কোমরে হাত রেখে আকাশ দেখল। তারপর লম্বা-লম্বা পা ফেলে প্যাগোডা-বাড়ির দিকে আসছিল। এই আকাশ-চুঁয়ানো তারার আলোয় কাছাকাছি লোকটাকে দেখে অর্জুনের হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। জেমস ব্রাউন বাড়িটায় ঢুকছে।
এই সময় চাইনিজ লোকটি ওপর থেকে ডাকল, “কেন্ট, সামওয়ান ওয়ান্টস টু মিট ইউ।
“হু ইজ হি?”
“এ বায়ার। গট ইনফরমেশন ফ্রম কাঠমাণ্ডু। হিজ আইডি ইজ জনিস ফ্রেন্ড।”
“ডিড ইউ টেল জনি দ্যাট উই উড বি হেয়ার?”
“ইয়া।
“ও. কে. আই অ্যাম কামিং।” তরতর করে উঠে গেল জেমস ওপরে।
মাথায় কিছু ঢুকছিল না। জেমস আর কেন্ট এক লোক? জেমস তো এফ বি. আই-এর অফিসার। কেন্ট স্পষ্টতই স্মাগলার। অর্জুন এও বুঝতে পারছিল না অমল সোম কী করে জনি নামক লোকটির বন্ধু হন!
তখনই পায়ের শব্দ পেল অর্জুন। দশ-বারোজন পুলিশ আড়ালে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এস. পি. ওর পাশে এসে নিচু গলায় প্রশ্ন করলেন, “অমলবাবু ভেতরে?”
খুব রাগ হয়ে গেল অর্জুনের। অমলদা এঁকে সব প্ল্যান বলে এসেছেন, কিন্তু তাকে কিছু জানাননি। সে গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল। এস. পি. বললেন, “উনি আমাদের অপেক্ষা করতে বলেছেন যতক্ষণ না বাইরে বেরিয়ে আসেন।”
মিনিট-দশেক কেটে গেল। তারপর আলো জ্বলল। অমল সোম ইংরেজিতে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসছেন, “তোমরা কী করে আশা কর জিনিসগুলো ঠিক কাজ করবে কি-না না জেনে আমি টাকা দেব। অন্তত একটা আমাদের সামনে পরীক্ষা কর। তা ছাড়া আমি শুনেছিলাম লাইটার থেকে রে বের হয়। সেটাই তো দিচ্ছ না।
জেমস বলল, “লুক ম্যান, এই রাত্রে গ্রেনেড চার্জ করলে সবাই শুনতে পাবে। তা ছাড়া রে-লাইটার যে বিক্রির জন্য নয়, তা জনি জানে। তুমি সত্যি একজন খদ্দের কি না আমার সন্দেহ আছে।”
“সন্দেহ? জনি কখনও তোমাদের বলেনি সে ইন্ডিয়ান খদ্দেরদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে?”
“বলেছিল। কিন্তু তোমার সঙ্গে টাকা কোথায়?”
“আগে মাল দেখব, পরে টাকা। তুমি তো মালই দেখাতে পারলে না।”
“তুমি এখানে এসেছ কী করে?”
“বাই রোড। আমার গাড়ি বাজারে রেখে এসেছি।”
হঠাৎ জেমস ঘুরে ডাকল, “লি, এই লোকটাকে পরীক্ষা করতে বল মান সিংকে।”
চাইনিজ লোকটার নাম লি। সে মান সিংকে হিন্দিতে কিছু বলল। মান সিং মাথা নেড়ে নীচে নেমে এল। অমল সোম পা বাড়াচ্ছিলেন, জেমস বাধা দিল, “নো ম্যান, তোমার গাড়ির নাম্বারটা বল। মান সিং বাজারে গিয়ে দেখে আসবে তুমি ঠিক বলছ কি না। মাল কিনতে তুমি একা এসেছ আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।”
“গাড়ি দেখে কী করে বিশ্বাস করবে?”
“সেটা আমি বুঝব। আগে দেখি গাড়িটা আছে কি না।
এই সময় একজন তিব্বতি ঘর থেকে বেরিয়ে লি’র পাশে দাঁড়াল। তারপর পরিষ্কার হিন্দিতে বলল; “লোকটাকে ছেড়ো না। অনেকক্ষণ থেকে আমি মনে করতে চেষ্টা করছি একে কোথায় দেখেছি। কিছুতেই মনে পড়ছে না। কিন্তু লোকটাকে দেখে আমার ভাল লাগছে না। ওর কথা শেষ হওয়ামাত্র লি সিগারেট বের করল এবং পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে ধরাল। তার লাইটার থেকে কোনও আগুন বের হল না। এইবার সে সোজা অমল সোমের দিকে সেটা তাক করতেই তিনি লাফিয়ে নীচে পড়লেন। সঙ্গে-সঙ্গে মান সিং ছুটে ধরতে গেল তাঁকে। অমল সোম মাটিতে পড়েই এঁকেবেঁকে দৌড়চ্ছিলেন। এবং তখনই দৃশ্যটা দেখা গেল। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল মান সিং। তারপর কাটা গাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। জেমস পকেট থেকে আর একটা লাইটার বের করে মাথার ওপর তুলতেই অর্জুন চিৎকার করে উঠল, “জেমস!” সঙ্গে-সঙ্গে দারুণ চমকে গেল জেমস। অর্জুন ছুটে গেটের সামনে দাঁড়িয়েছে। অন্য লাইটারটি হাতে লি নামতে যাচ্ছিল। তার রে অবশ্যই দশ ফুটের বেশি যায় না। সে বোধহয় অমল সোমের কাছাকাছি যেতে চাইছিল। অর্জুনকে দেখে দ্রুত ফিরে গেল। তৎক্ষণাৎ একটা গালাগাল দিল জেমস তারপর হাতের লাইটারটা ছুঁড়ে মারল গেটের ওপর। বিস্ফোরণের আগে অর্জুন যতটা সম্ভব দূরে সরে যেতে পেরেছিল। এবং তখনই পেছনে থেকে গুলি ছুটে গেল ওপরে। প্রথমে আহত হল লি। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে চিৎকার করতে লাগল। ততক্ষণে এস. পি. ঢুকে গেছেন ভেতরে। সামচির পুলিশবাহিনী তাঁর সঙ্গে। অমল সোম চিৎকার করুলেন, “কেন্ট, আত্মসমর্পণ কর, নইলে তুমি মরবে।”
জেমস ছুটে গেল লি’র কাছে। ওর পাশে পড়ে থাকা লাইটারটার ওপরে দ্বিতীয় গ্রেনেড লাইটার ছুঁড়ে মারতেই বারান্দার কিছু অংশ এবং লি’র শরীরটা নীচে গড়িয়ে পড়ল। তারপর তিন নম্বর বিস্ফোরণ ঘটল। তৃতীয় গ্রেনেড-লাইটারটা ফাটল জেমসের শরীরেই।
.
খুব ভোরে ফিরে আসছিল ওরা। তিনটে মৃতদেহ এখন ভুটান সরকারের হাতে। মান সিংকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার জ্ঞান ফিরেছিল দেরিতে। সে স্বীকার করেছে কাঠমাণ্ডুতে জনির ক্যাসিনোতে চাকরি করতে করতে সে এদের দলে ভিড়ে যায়। সে স্বীকার করেছিল, রায়বাবুর ছোট ছেলেকে সে মারেনি, কিন্তু অমল সোমের বাড়িতে লাইটার-গ্রেনেড চার্জ করেছিল। সত্যেন্দ্রনাথ এবং রায়বাবুর ছেলে মারা গিয়েছে লি’র হাতে।
অমল সোম মুখ খুললেন, “সত্যেন্দ্রনাথের চিঠি পেয়ে কাঠমাণ্ডুতে গিয়েছিলাম। জনি’র ক্যাসিনোতে সত্যেন্দ্রনাথ খবর পান সামচির মনাস্ট্রিতেই ওরা ঘাঁটি করছে। সেই উদ্দেশ্যেই ওরা এসেছিলেন ডুয়ার্সে। জেমস নামের এফ. বি. আই. অফিসারটির সর্বস্ব চুরি যায় শিলিগুড়ির হোটেলে। আমি তাকে সেখানেই রেখে এসেছি। জলপাইগুড়িতে কেন্ট এসে জেমসের নাম ব্যবহার করে তার পাশপোর্ট এবং আইডেনটিটি কার্ড দেখিয়ে। দুটো ভালমানুষ আর তিনটে বদলোক খুন হল, এটা খুবই দুঃখের ব্যাপার। কিন্তু সুখের ঘটনা সত্যসন্ধানী হিসেবে অর্জুন এখন দক্ষ হয়েছে। জোন্স অ্যান্ড জোন্স নিশ্চয়ই ওকে পুরস্কৃত করবে।’
অর্জুন ঠোঁট কামড়াল। তার খুব আফসোস হচ্ছিল। আসল লাইটারটা যদি পাওয়া যেত! একটাকে চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখল। দ্বিতীয় হারানো আসল লাইটার এখন কোথায়?…
***
