লাইটার – ৫

।। পাঁচ।।

দূর থেকে পোড়া-গদাইয়ের বাড়িটা দেখিয়ে নেমে পড়ল কাটা-গদাই রিকশা থেকে। যাওয়ার সময় বলল, “পোড়া যদি তোমায় বেইজ্জত করে তা হলে আমায় বলবে। আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি।”

অর্জুন আপত্তি করল, “না, না, তোমাকে দাঁড়াতে হবে না। আমারটা আমি বুঝব।”

টিনের চালা আর কাঠের দেওয়ালে তোলা দু’খানা ঘর হল পোড়া-গদাইয়ের বাড়ি। একটা বাচ্চা ছেলে সামনে বসেছিল। অর্জুন তাকে জিজ্ঞেস করল, “গদাইবাবু বাড়িতে আছে?”

ছেলেটা ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ। এবং, তখনই ভেতর থেকে ফ্যাঁসফেসে গলায় চিৎকার ভেসে এল, “কে, কে ডাকে?”

গলা তুলে অর্জুন নিজের পরিচয় জানাতেই একটা খালি গায়ে লুঙ্গি পরা লোক বেরিয়ে এল। লোকটার মুখের একটা দিক বীভৎসভাবে পুড়ে গেছে। বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। পোড়া-গদাই অর্জুনকে দেখে অবাক হল। বোঝা যাচ্ছে সে ওকে চিনতে পেরেছে। অর্জুন হাসল, “তোমার সঙ্গে আমার একটু জরুরি কথা আছে গদাই।

পোড়া-গদাই চারপাশ তাকিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি একা?”

“হ্যাঁ।” অর্জুন মাথা নাড়ল।

“কী ব্যাপার বলুন তো?”

অর্জুন বলল, “ব্যাপারটা তোমার জন্যই। কিন্তু এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তো কথা বলার সুযোগ হবে না। আমি একটু ব্যক্তিগত কথা বলতে চাই।”

“আপনি কী বলবেন আমি বুঝতে পারছি না। ঠিক আছে, আপনি ভেতরে আসুন। ঘরে বসে কথা বলতে পারি।” পোড়া-গদাই ওকে রাস্তা দেখিয়ে ঘরের মধ্যে নিয়ে এল। ঘরে একটি বউ বসে কাজ করছিল। নতুন লোককে দেখে ঘোমটা টেনে বেরিয়ে গেল বাইরে। অর্জুন দেখল একটা তক্তাপোশের ওপর ময়লা বিছানা। পাশের নড়বড়ে চেয়ারে বসল সে।

পোড়া-গদাই খাটে বসে বলল, “গরিবের বাড়িতে এলেন, কী ব্যাপার?”

অর্জুন বলল, “আমি তোমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। তুমি আমাকে তুমি বলতে পার। যদি অবশ্য তুমি চাও তা হলে আমি আপনি বলতে পারি। আমার আপনিই বলা উচিত!”

‘না, না, যা আছে তাই থাক। ‘তুমি শুনতেই ভাল লাগবে।”

“দ্যাখো গদাই, আমি তোমার সম্পর্কে কিছু-কিছু কথা জানি। তোমাকে যা বলব তা কেউ জানে না, তুমি যা বলবে তাও কেউ জানবে না। পুলিশ তো নয়ই, যদি তুমি আমার সঙ্গে সহযোগিতা কর। এখন বল তো, গত দু’দিনে তোমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেছিল?” অর্জুন সরাসরি চোখের দিকে তাকাল। মুহূর্তে পোড়া-গদাই চোখ নামাল, তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “অনেক লোকই রোজ নানান ধান্দায় দেখা করে। আপনি কার কথা বলছেন যদি জানি না!”

অর্জুন বলল, “তোমার অচেনা লোক। জলপাইগুড়িতে থাকে না। কখনও দ্যাখোনি তাকে তুমি।

পোড়া-গদাইয়ের চোয়াল শক্ত হল, “আপনি কী করে জানলেন?”

অর্জুন বুঝতে পারল সে ঠিক জায়গায় হাত দিয়েছে। কিন্তু খুব সাবধানে জাল গোটাতে হবে। সে বলল, “দ্যাখো গদাই, আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই। তুমি এমনিতেই আইনের চোখে অপরাধ করেছ। এখনও অবশ্য পথ খোলা আছে। ভেবে দ্যাখো।”

“ঠিক আছে। আপনি কতটা জানেন তা আরও বলুন। এসব তো ধোঁয়া-ধোঁয়া কথা।

আচমকা ঢিল ছুঁড়ল অর্জুন, “সেদিন তুমি এয়ার লাইনসের গাড়ি থেকে একটা ব্যাগ সরিয়েছ?”

হকচকিয়ে গেল পোড়া-গদাই, “কী যা-তা বলছ? আমি ওখানে যাব কেন?”

“তুমি শিলিগুড়িতে যাও না?”

এবার মাথা নিচু করল পোড়া-গদাই। কিন্তু কোনও জবাব দিল না। অর্জুন আবার জিজ্ঞেস করল, “কথা বলছ না কেন? সিনক্লেয়ার হোটেলে যখন গাড়িটা পৌঁছল তখন একটা ব্যাগ পাওয়া যায়নি। তাই তো?” পোড়া-গদাই এবারও কথা বলল না। অর্জুন ওঠবার ভঙ্গি করল, “তুমি যখন জবাব দিচ্ছ না, তখন আমার কিছু করার নেই। সহদেব বকসি এবার আসবে তোমার কাছে।

“না”, প্রায় চিৎকার করে উঠল পোড়া-গদাই, “আপনি পুলিশকে কিছু বলবেন না, পায়ে পড়ি।”

“কেন?”

ছেলে-বউ না খেয়ে মরবে।” প্রায় ককিয়ে উঠল পোড়া-গদাই।

“যখন অন্যায় করো তখন মনে থাকে না কথাটা?”

“বিশ্বাস করুন, লোভে পড়ে করেছি। বাজে ছবি এলে কে ব্ল্যাকে টিকিট নেবে বলুন। এখন কাটাটার খুব বাজার যাচ্ছে, ফি সপ্তাহে হিট ছবি আসে রূপমায়াতে। রূপশ্রীতে যত রদ্দি সিনেমা। তাই একজন লোভ দেখিয়েছিল বলে দুদিন গিয়েছিলাম।

“ব্যাগের ভেতর কী ছিল?”

“কোনও লাভ হয়নি ব্যাগ এনে। তিনটে বাক্স ছিল। চল্লিশটা করে লাইটারের মতো দেখতে অথচ লাইটার নয় এমন জিনিস। কোনও মুখ নেই। বাজারে বিক্রি করতে চাইলে কেউ কিনবে না।”

এত দ্রুত সাফল্য আসবে অর্জুন ভাবতে পারেনি। তিন বাক্স লাইটার। জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর হতেই হবে ওগুলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আসল না জাল। যে লোকটা হরিপ্রসাদ রায়কে জাল লাইটার দিয়েছে, সে নিশ্চয়ই অত অসতর্কভাবে আসল লাইটার তিনটে বাক্সে আনবে না। কিন্তু জলপাইগুড়ির রাস্তায় আর একটি লোককে সেই লাইটারে সিগারেট ধরাতে দেখা গিয়েছে। ওই লোকটিই কি হরিপ্রসাদের সঙ্গে এক ফ্লাইটে এসেছে এই বাক্সগুলো নিয়ে! অর্জুন বাক্সগুলো দেখতে চাইল। খানিকটা ইতস্তত করে পোড়া-গদাই একটা ব্যাগ নামিয়ে আনল মাথার ওপরের একটা আধা সিলিং থেকে। তিনটে বাক্স ছিল ব্যাগটায়। তিনটেই খোলা হয়েছে। এবং কয়েক ডজন নীলাভ লাইটার পড়ে আছে তাতে। একটা তুলে নিয়ে সে পকেটে পুরল। পোড়া-গদাইয়ের সামনে খোলার কায়দাটা দেখিয়ে দিলে এগুলোকে আর পাওয়া অসম্ভব হবে। সে বলল, “তুমি এখনই এই বাক্সটা নিয়ে থানায় চলে যাও। সহদেব বকসি যদি ফিরে আসেন, তা হলে তাঁকে বলবে আমি পাঠিয়ে দিলাম, উনি যেন যত্ন করে রেখে দেন।”

পোড়া-গদাই দ্রুত মাথা নাড়ল, “না, না, আমাকে থানায় পাঠাবেন না। দারোগাবাবু বলেছেন যেন কখনও আমার মুখ দর্শন করতে না হয় ওঁকে। লোকটাকে আমার খুব ভয় লাগে।”

অর্জুন বুঝল কথাটা মিথ্যে নয়। সে পোড়া-গদাইকে বলল, “দ্যাখো, আমি এটা ঠিক করছি না। তোমাকে এক্ষুনি পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিত, ব্যাগ চুরি করার অপরাধে। কিন্তু তোমার বন্ধু কাটা-গদাইয়ের অনুরোধে একটা সুযোগ দিতে চাই। তুমি আর জলপাইগুড়ি শহরের বাইরে গিয়ে এইসব কাজ করবে না। হয়তো কত নিরীহ মানুষ তোমাদের হাতে এইভাবে সর্বস্ব হারায়। তুমি শহরের মধ্যে খেটে রোজগার করতে পারো না ভাল পথে? ওই বাচ্চাটা বড় হয়ে তোমাকে চোর বলবে সেটা ভাল লাগবে? তোমরা সিনেমা হলের টিকিটের ব্যবসা ছেড়ে দাও। দেখছ তো, ওতে প্রত্যেক সপ্তাহে আয় হয় না। তার চেয়ে বাজারে আলু-বেগুন নিয়ে বসলে অনেক বেশি লাভ। যাক, এই বাক্সগুলো আমি নিয়ে যাচ্ছি থানায়, তুমি কাটা-গদাইয়ের জন্য এ-যাত্রায় রক্ষে পেলে, মনে থাকে যেন।” কথাগুলো একটানা বলে অর্জুন ব্যাগটা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এল।

পেছন-পেছন পোড়া-গদাই আসছিল। সে এবার কেমন গলায় জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, সত্যি কাটার জন্য আপনি আমাকে ছেড়ে দিলেন? কাটা আমাকে ছাড়তে বলেছে?”

“হ্যাঁ। ও তোমাকে এখনও ভালবাসে। ও চায় তোমার ভাল হোক।”

“কিন্তু ব্ল্যাক নিয়ে ও হুজ্জতি করে কেন?”

“টিকিটের ব্ল্যাক করা বন্ধ হলে আর ওটা করবে না।” অর্জুন কথাগুলো বলে ভাবল ওকে সঙ্গে আসতে নিষেধ করবে। কাটা-গদাই নিশ্চয়ই এখনও অপেক্ষা করছে। কিন্তু তারপরেই ভাবল, দেখা যাক দু’জনে মুখোমুখি হয়ে কী করে!

কাটা-গদাই দাঁড়িয়ে ছিল একটা গাছের নীচে। ওদের আসতে দেখে ওর চোখ যেন কপালে উঠেছিল। তাকে ওখানে দেখতে পাবে ভাবতেও পারেনি পোড়া-গদাই। সে যেন কেমন মিইয়ে গেল।

অর্জুন কাটা-গদাইকে বলল, “তোমাকে একটা কাজ করতে হবে ভাই। এই ব্যাগটাকে থানায় দারোগাবাবুর কাছে আমার নাম করে পৌঁছে দিতে হবে।”

পোড়া-গদাইয়ের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কাটা-গদাই বলল, “যেন এসব এনেছে তাকে বলছেন না কেন? নিজের পাপের নিজেই প্রায়শ্চিত্ত করুক।”

হঠাৎ পোড়া-গদাইয়ের ভাবান্তর দেখা গেল, “ঠিক বলেছে ও। আমাকে দিন, আমিই পৌঁছে দিচ্ছি। দারোগাবাবু যদি মুখ দেখে গরাদে পোরে তো তাই হোক।”

এবার কাটা-গদাই এগিয়ে এসে ব্যাগটা নিজের হাতে নিল, “থাক, যথেষ্ট হয়েছে। আমি চলি। আপনি কোন্ দিকে যাবেন?”

অর্জুন হাসল, “আমি জেলাস্কুলের পাশ দিয়ে অমলদার বাড়িতে যাব। কাটা-গদাই ব্যাগটা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলে দেখা গেল পোড়া-গদাই তার সঙ্গী হল। দু’জনে পাশাপাশি হাঁটছে, কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না। রাস্তাটা অনেক লম্বা, অর্জুন বুঝতে পারল, সে একটা ভাল কাজ করেছে। দূরত্বটা শেষ হবার আগে নিশ্চয়ই ওরা আগের মতো কথা বলবে। দু’মাসের জেল নির্ঘাত পাওনা ছিল পোড়া-গদাইয়ের। কিন্তু সেটা ওকে এভাবে শোধরাতে পারত না।

পোড়া-গদাই যে ব্যাগ চুরি করে এনেছিল, তাতে জাল-লাইটার রাখা আছে। পথে পরীক্ষা করে নিশ্চিন্ত হল অর্জুন। কিন্তু এই জাল লাইটার নিয়ে এত জায়গা থাকতে আমেরিকা থেকে ডুয়ার্স-এ আসছে কেন লোকগুলো? ধরা যাক, জাল-লাইটারকে আসল বলে চালিয়ে ভাল ব্যবসা করতে চায় ওরা। কিন্তু আসল লাইটারের খবর যেখানকার মানুষ জানে না সেখানে জালের আর কী দাম উঠবে? তা ছাড়া নেপালের দৌলতে এসব অঞ্চলে প্রচুর বিদেশি লাইটার সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর নকল জিনিস কী বাজার পেতে পারে!

কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার, একটি আসল লাইটার এই শহরে আছে। নকল তিনটে এখন তার কাছে, বাকিগুলি কাটা-গদাই থানায় পৌঁছে দিতে গিয়েছে। তিন-তিনটে লাইটার পকেটে রাখার কোনও যুক্তি নেই। সেই লোকটি এই শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অর্জুনের বিশেষ ধারণা, হরিপ্রসাদকে দুর্ঘটনা ঘটাতে বাধ্য করা হয়েছিল। ওই কদমতলার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে লাইটারের দ্বিতীয় বোতাম টিপে হরিপ্রসাদকে অবশ করে দেওয়া মোটেই কঠিন কাজ নয়। অবশ হয়ে গেলে হাত সরে আসবে স্টিয়ারিং থেকে, পা অকেজো হবে এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। কিন্তু উলটোটাও হতে পারত। হরিপ্রসাদের গাড়ি কোনও পথচারীকে চাপা দিতে পারত এবং সে নিজে সামান্য আহত হয়ে বেঁচে যেত। কিন্তু এক্ষেত্রে হত্যাকারী নিশ্চয়ই একটা ঝুঁকি নিয়েছে। কাউকে চাপা দেওয়া খুব স্বাভাবিক ছিল এবং তা ঘটলে হয়তো গণ-ধোলাই-এ হরিপ্রসাদের প্রাণ বেরিয়ে যেত। সুধাময় সান্যালের কথা যদি ঠিক হয় তা হলে রে স্পর্শ করার পাঁচ মিনিট পরে তার কোনও প্রতিক্রিয়া হয়তো শরীরে থাকবে না। সত্যেন্দ্রনাথের পোস্টমর্টেমে কিছুই পাওয়া যায়নি। কিন্তু এসবই তার অনুমান। প্রশ্ন হল হরিপ্রসাদকে হত্যা করতে চাইবে কেন আততায়ী। আর সে ওখানে আসছে তাই-বা জানবে কী করে? এই একই হত্যকারী কী করে সত্যেন্দ্রনাথের শহরে আসার সংবাদ পেল? মাথার ভেতরটায় জট পাকাচ্ছিল অর্জুনের।

অমলদার বাড়িতে পৌঁছে অর্জুন হাবুকে চা বানাতে বলল। ডাকে অর্জুনের কোনও চিঠি আসেনি। চিঠিপত্র এলে, সেটা যদি খুব ব্যক্তিগত না হয়, অমলদা নির্দেশ দিয়ে গেছেন, উত্তর দিতে। আজ সে একটা প্যাকেট পেল। হংকং থেকে প্রকাশিত হয় কাগজটা। কাগজটার নাম ‘ক্রাইম অ্যান্ড প্যাশন’। বিখ্যাত রচনার নামে পত্রিকার নাম। অমলদার কাছে দেশ-বিদেশের অনেক অপরাধ-সংক্রান্ত কাগজ আসে। তাদের মধ্যে ক্রাইম অ্যান্ড প্যাশন আর ‘ব্রেনওয়েভ’ কাগজ দুটোয় তুলনা হয় না। প্যাকেট খুলে ক্রাইম অ্যান্ড প্যাশন নিয়ে বসে গেল সে। এবং তখনই মনে পড়ল সত্যেন্দ্রনাথের গাড়ি পাওয়া যায়নি। ভদ্রলোক যদি আমেরিকার নাগরিক হন তা হলে এখানে গাড়ি পেলেন কোত্থেকে। এবং তাঁর মৃত্যুর পর সেই গাড়িটা গেল কোথায়? অর্জুন ঠিক করল সমস্ত ব্যাপারটা সে পর পর কাগজে লিখবে। কোনও পয়েন্ট বাদ দেবে না। তারপর বারংবার সেটা পড়লে হয়তো মাথায় ভিন্ন চিন্তা উঁকি দিতে পারে। অমলদা বলেন, ‘সবসময় কোনও ঘটনাকে যেমন দেখছ, তেমন ভেবো না। সবরকম সম্ভাব্য পথে ব্যাপারটাকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা কোরো। প্রি-অকুপায়েড হওয়া মানে তুমি সত্য থেকে সরে যাচ্ছ।”

কাগজটার কভার স্টোরি, ব্যাঙ্ককে তিনটে খুন হয়েছে। তিনটে মানুষকে পোস্টমর্টেম করে কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুধু কোনও বিশেষ যন্ত্র দ্বারা তাদের হৃদযন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হৃদরোগে আক্রান্ত হলে শরীরে যেসব লক্ষণ ফুটে ওঠে তার কোনও চিহ্ন নেই। এই তিনজন ব্যাঙ্ককের বিখ্যাত স্মাগলার ছিল। তিনজনই বাড়ির বাইরে মারা গিয়েছে। দু’জন দুটো রেস্তোরাঁতে। একজন মারা গিয়েছে গাড়িতে উঠতে গিয়ে।

খবরটা পড়ে অর্জুনের হাতের তালুতে ঘাম জমল। শুধু হৃদযন্ত্র বন্ধ করে দেবার মতো কোনও অস্ত্র বের হয়েছে নাকি? শরীরে কোনও আঁচড় থাকল না, সামান্য কালশিটে পর্যন্ত নেই, পোস্টমর্টেমে কিছুই ধরা পড়বে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ মনে করবে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে। এই জিনিসটা যদি সত্যেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে ঘটত, তা হলে পুরো ব্যাপারটাই অজানা থেকে যেত তার কাছে। এবং তখনই তার মাথায় আর একটা চিন্তা ঝিলিক দিয়ে উঠল। যদি জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর আসল লাইটারের দ্বিতীয় বোতাম সরাসরি কোনও মানুষের হৃদ্যন্ত্রের দিকে তাক করে টেপা যায় তা হলে…অর্জুন ঠিক বুঝতে পারছিল না তাতে শুধুই হৃদযন্ত্র অকেজো হয়ে যাবে কি না। পাঁচ মিনিট বাদে পরীক্ষা করলে সবল হবে কি না! তার সামনে পরীক্ষা করার কোনও রাস্তা খোলা নেই। সুধাময় সান্যালের একটা কথা মনে পড়ে গেল, ‘ওই রে একটা বড় হাতিকেও পাঁচ মিনিট অবশ করে রাখে।’ তা হলে একটা মানুষের হৃদয়যন্ত্র বন্ধ হবে না কেন? কিন্তু একথা কি সত্যেন্দ্রনাথের খুনি জানে না! সে তো স্বচ্ছন্দে দ্বিতীয় বোতামটা ওঁর হৃদ্যন্ত্র লক্ষ করে টিপতে পারত। নাকি সে আরও বুদ্ধিমান। ব্যাপারটাকে আত্মহত্যার চেহারা দিতে চেয়েছে হৃদযন্ত্র বন্ধ করে!

পত্রিকাটির পাতা ওলটাতে-ওলটাতে অর্জুনের চোখ একটা বিজ্ঞাপনে আটকে গেল। জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানি থেকে বিজ্ঞাপনটা দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞাপনটা পড়ল সে।

‘আমরা দুঃখিত। গত তিন বছর ধরে আমরা একটা বিশেষ ধরনের লাইটার তৈরি করছি। এই লাইটার মূলত ফেডারেল বুরো অব ইনভেস্টিগেশন বিভাগের জন্য হলেও সরকারের অনুমতি পাওয়া সার্টিফিকেট দেখালে অল্প কিছু সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। সরকারি আপত্তিতে আর ওই লাইটার বাজারে ছাড়া হচ্ছে না। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি কোনও অসৎ ব্যবসায়ীর দল হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, নেপাল এবং ভারতবর্ষে ওই লাইটারের নকল মডেল চালু করার চেষ্টা করছে। যদিও তারা আমাদের নির্মিত লাইটারের কর্মক্ষমতার অর্ধেকটা আয়ত্ত করেছে, তবু ইতিমধ্যেই নানা বিভ্ৰান্তি দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে যে সব সাধারণ মানুষ বৈধ অনুমতিপত্র দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে ওই লাইটার কিনেছিলেন, সেগুলো ফেরত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাত্র দুটো লাইটারের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। সেই দু’জন মানুষ এখন মৃত। আমরা এই পত্রিকার মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছি, জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর তৈরি কোনও লাইটার এখন বাজারে নেই (শুধু ওই দুটি ছাড়া)। কেউ যদি এই কোম্পানির নামাঙ্কিত লাইটার কেনেন, কিংবা সংগ্রহ করেন, তা আইনত দণ্ডনীয় হবে।