৫.
ইংল্যান্ডের সমুদ্রের ধারে এই ছোট্ট শহরটাকে খুব ভাল লেগে গেল অর্জুনের। সব সময়ই ঝোড়ো বাতাস বইছে এখানে। ঠাণ্ডা আছে, তবে সেটা ডিসেম্বরের জলপাইগুড়ির মতনই। মে-জুন মাসেই যদি এই অবস্থা, তা হলে সত্যিকারের শীত এলে কী হবে! ওদের হোটেলের জানালা দিয়ে সবুজ জলের স্থির সমুদ্র দেখছিল অর্জুন। সমুদ্র বলতে যে উত্তাল জলরাশি মনে আসে, ব্ল্যাকপুলে তা দেখা যাচ্ছে না। আর এই সমুদ্রের তলাতেই মেজরের বন্ধু মার্শালসাহেব মুক্তো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। অবশ্য জায়গাটা এই হোটেল থেকে কয়েক মাইল দূরে এবং সেখানে যাওয়ার জন্যেই ওর আর মেজরের ব্ল্যাকপুলে আসা।
মেজরের বিশেষ পরিচিত মিসেস গ্রান্টের সঙ্গে কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে হিথরোতে আসার সময় দেখা হয়েছিল। ভদ্রমহিলা খুব ভাল। একসময় পেশাদার ম্যাজিশিয়ান ছিলেন। এখন মাঝে-মধ্যে অনুষ্ঠান করেন। এই রসিকা ভদ্রমহিলার বাড়িতে ওরা এক রাত ছিল। সেখানেই পুরোন জুতোর মধ্যে একটা চিরকুটে সাঙ্কেতিক শব্দ পেয়ে গিয়েছিল অর্জুন। অনেক ঝামেলার পর সেই শব্দের সূত্র ধরে একটি স্টিলের কৌটোয় লুকিয়ে-রাখা চাবি আবিষ্কার করে এখন ওরা হোটেলের জানালায় আরাম করে বসেছে। চাবিটার গায়ে ব্ল্যাকপুলের কোনও একটা ব্যাঙ্কের চাকতি এবং তাতে লকার-নম্বর লেখা। হোটেলে ফিরে আসামাত্র মেজরকে রিসেপশনিস্ট বলেছেন, “মার্শালসাহেব খবর পাঠিয়েছেন, তিনি তাঁদের জন্যে আজ দুপুরে অপেক্ষা করবেন।”
মিসেস গ্রান্ট বললেন, “মেজর, আপনারা তা হলে রওনা হন। অবশ্য যদি চান, আমি আপনাদের আমার গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারি।
গতরাত্রে ওই স্টেনলেস কৌটো খোঁজার জন্যে কেউ একফোঁটা ঘুমোতে পারেনি। অর্জুন প্রৌঢ়ার দিকে তাকাল। একটুও ক্লান্ত মনে হচ্ছে না ওঁকে। কিন্তু গাড়িতে আসার সময় মেজর তিনবার ঢুলেছিলেন। সে বলল, “আমার প্রস্তাব হল, স্নানটান করে এখন সবাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। তারপর মার্শালসাহেবের কাছে যাওয়ার সময় ওই ব্যাঙ্ক হয়ে যাব।”
অর্জুনের কথা শেষ হওয়ামাত্র মেজর লুফে নিলেন, “কারেক্ট।” মার্শালের হুকুমমতো আমাদের চলতে হবে নাকি? শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দেওয়া দরকার।” বলতে-বলতে মুখে হাত চাপা দিয়ে হাই তুললেন তিনি।
মিসেস গ্রান্টকে এগিয়ে দিতে নীচে নামল অর্জুন। পার্কিং লটে পৌঁছে প্রৌঢ়া বললেন, “সাবধানে থাকা দরকার। আমার মনে হচ্ছে কোনও একটা বড় ঝামেলার সঙ্গে সবাই জড়িয়ে পড়ছি। যখনই প্রয়োজন হবে তখনই আমাকে যেন খবর দেওয়া হয়।”
অর্জুন মাথা নাড়ল। প্রৌঢ়াকে তার খুব পছন্দ হয়েছে। নিজে ম্যাজিশিয়ান, কিন্তু তাই বলে কোনও অহঙ্কার নেই। পরিষ্কার বলেছেন, “আমি অতীত আবিষ্কার করতে পারি না, ভবিষ্যৎ পড়তে পারি না, শুধু বর্তমানের কিছু ব্যাপারে বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারি মাত্র।”
মিসেস গ্রান্ট চলে গেলে অর্জুন দু-পকেটে হাত ঢুকিয়ে পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে এসে চারপাশে তাকাল। ভাল মেঘলা দিন আজ। সেই সঙ্গে বাতাস দাপটে বইছে। শরীরে একটা কনকনে ভাব তৈরি হচ্ছে এই কারণে। হোটেলের সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে প্রায় জনশূন্য রাস্তা এবং দূরের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে অর্জুন আবিষ্কার করল, শরীরের ক্লান্তিটা এখন আর অত প্রকট নয়। বোধহয় এই কারণেই ঠাণ্ডার দেশের মানুষেরা বেশি কাজ করতে পারে। অর্জুন ধীরে-ধীরে রাস্তা পেরিয়ে সমুদ্রের ধারে চলে এল। স্থির সমুদ্রে বাতাস ভাঙা ঢেউ তুলছে। কিছু রঙিন বোট জেটিতে বাঁধা রয়েছে। সেগুলোতে চড়ার জন্যে কেউ নেই অবশ্য। সমুদ্রের ওপর ভাসমান রেস্তোরাঁগুলো রঙিন সাইনবোর্ড নিয়ে চুপচাপ অপেক্ষায় রয়েছে। বড় চওড়া রাস্তার ওপাশে আধ মাইল জায়গা জুড়ে নানান দোকান এবং বেটিং হাউস। অল্প পয়সায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করার নেশা যাদের, তারাই ওখানে ভিড় জমিয়েছে।
রাস্তাটার নাম গ্লেব রোড। সিঙ্গল লাইন দিয়ে একটা ট্রাম সশব্দে চলে গেল। এবং তখন অর্জুনের নজরে পড়ল মেয়েটাকে। দেখলে ভারতীয় বলে মনে হচ্ছে। কোঁকড়া চুল অযত্নে ছাঁটা, জিনসের প্যান্টের ওপর নীল সোয়েটার এবং সাদা কার্ডিগান। সমুদ্রের ধারের সাদা রেলিং-এ হেলান দিয়ে তাকে লক্ষ করছে। কুড়ি-একুশের ওপরে মোটেই ওর বয়স নয়। অর্জুনের অস্বস্তি হচ্ছিল। মেয়েটা যেখানে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, তার পেছনে একটি সাইনবোর্ডে ‘দি গুড ওল্ডি ডেজ’ নামক একটি নাটকের বিজ্ঞাপন। একটু জেদ করেই অর্জুন মেয়েটির সামনে দিয়ে হেঁটে এল। সে আড়চোখে লক্ষ করল, বাতাসে লুটিয়ে-পড়া একগোছা চুলের ফাঁকে মেয়েটির ঠোঁটে এক চিলতে হাসি চলকে উঠল। আরও খানিকটা এগিয়ে অর্জুন বাঁ দিকে বাঁক নিল। রাস্তা থেকে একটা কাঠের প্ল্যাটফর্ম সোজা সমুদ্রের ভেতর ঢুকে পড়েছে। ওপরের সাইনবোর্ডে লেখা ‘বেল আইল’। এখানে ছোট-ছোট ভিড়, কিন্তু মনুষ্যজন চোখে পড়ছে না। এই সময় এই আবহাওয়ার বিপরীত ঘটনা ঘটিয়ে কমলা রঙের রোদ উঠল। অর্জুন আড়চোখে দেখল, মেয়েটা এবার স্পষ্ট তাকেই অনুসরণ করছে। সে সমুদ্রের দিকে তাকাল প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে এসে। ওদিকে ছোট একটা পাহাড়ের গায়ে সমুদ্র টইটম্বুর, এপাশে অবশ্য দিগন্ত দেখা যায় না।
“এক্সকিউজ মি।” গলাটা যেন একেবারে কানের কাছে।
অর্জুন মুখ ফিরিয়ে দেখল, মেয়েটি পেছনে দাঁড়িয়ে হাসছে। হাওয়ায় তার চুল এবার বড্ড এলোমেলো। দু’পকেটে হাত পুরে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, “তুমি বাংলাদেশি?”
অর্জুন মাথা নাড়ল, “না। আমি ভারতীয়।”
“এই দেশে কতদিন আছ?”
“কয়েকদিন বলাটাও বেশি বলা হবে।”
“বাঃ। তুমি তো দেখছি বুদ্ধিমান। আমিও অবশ্য ভারতীয় ছিলাম কোনও একদিন।”
“মানে? তুমি কি এখন এখানকার নাগরিক?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কি কোনও গোলমাল করেছ?”
“আমি? না তো?”
“সত্যি কথা বলছ না তুমি। নিজের ভাল চাও তো এখনই ব্ল্যাকপুল ছেড়ে যাও। আমি একটা প্লে হাউসে চাকরি করি। দুজন লোককে বলতে শুনলাম কিছু কথা তোমার সম্পর্কে। তুমি ভারতীয় বলেই, মনে হল, সাবধান করে দেওয়া উচিত।” কথা শেষ করেই মেয়েটি যেমন এসেছিল তেমন ফিরে গেল রাস্তার দিকে।
অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল, ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, ঠিক কী শুনেছে। তাকে সাবধান করে দিতে এসে মেয়েটিও কি ঝুঁকি নিল? কিন্তু ততক্ষণ মেয়েটি রাস্তায় উঠে চোখের আড়ালে চলে গেছে। অর্জুন ফিরে এল প্ল্যাটফর্ম ডিঙিয়ে। আর তখনই আর-একটা ট্রাম সামনে এসে দাঁড়াতেই সে কোনও কিছু না ভেবেই উঠে বসল।
এক পাউন্ডের কয়েন দেখতে দারুণ। মোহর দ্যাখেনি সে কখনও। কিন্তু ওই কয়েনটাকে দেখলেই মোহরের কথা মনে আসে। অর্জুন মেয়েটির কথা ভাবছিল। নিশ্চয়ই অনেক কাল এ-দেশে আছে। কথা বলার ভঙ্গিটিও ব্রিটিশদের মতো। শুধু ভারতীয় বলে যেচে সচেতন করতে এল? কী জানি! কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি হলে তাকে নিয়ে এখানে কেউ-কেউ আলোচনা করছে। এরা কারা? এই সময়ে ব্যাঙ্কের সাইনবোর্ডটা নজরে পড়তেই সে ঝটপট উঠে পড়ল। বেশ কিছু যাত্রী ট্রামস্টপে অপেক্ষায় ছিলেন এখানে। অর্জুন নামবার সময় লক্ষ করেনি আর-একটা জিপ ট্রামটার পাশাপাশি এসে আবার ট্রামটারই সঙ্গী হয়ে চলে গেল। অনুসরণকারীরা মানুষের ভিড়ে তাকে লক্ষ করেনি নামতে। রাস্তা পেরিয়ে ব্যাঙ্কের সামনে এসে সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। আজ অবধি সে কোনও ব্যাঙ্কের লকার খোলেনি। কী করে খুলতে হয়, তাও তার জানা নেই। ব্যাঙ্কের অফিসাররা যদি তাকে প্রশ্ন করে তা হলেই হয়ে গেল!
দোনামনা করে সে দরজার দিকে এগোতেই ওটা দু’পাশে সরে গেল তাকে পথ করে দিতে। বিভিন্ন এগারপোর্টে এই ধরনের দরজা দেখে সে এখন অভ্যস্ত। ব্যাঙ্কে তেমন লোকজন নেই। কিন্তু চারপাশে নজর বুলিয়েই তার মনে হল, সে যদি লকারের খোঁজ করে তা হলে ওই যে মহিলা রিসেপশনে বসে আছেন, তার সন্দেহ বাড়বেই। ভদ্রমহিলা যে-দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন, সেটা পছন্দসই নয়।
