খুঁটিমারি রেঞ্জ
আজকের খবরের কাগজে কোনো চাকরির বিজ্ঞাপন নেই। অর্জুন কাগজটাকে ভাঁজ করে আকাশের দিকে তাকাতেই যেন বুড়িদিকে দেখতে পেল। দু’বছর আগেও এই জলপাইগুড়ি শহরে বুড়িদির মতো ফরসা সুন্দরী বোধহয় কেউ ছিল না। এমন রঙ ছবিতেও দেখা যায় না। তারপর কী হল কে জানে, বুড়িদির মুখে কালো ছোপ জমতে লাগল। এখন সেগুলোয় ছেয়ে গেছে মুখ, তবু ফাঁকে ফাঁকে ফরসা চামড়াটাকে বোঝা যায়। কিন্তু সেটাই যে অস্বস্তির। এই দুপুরের আকাশটা যেন অবিকল বুড়িদি, সারা মুখে মেঘের মেচেতা নিয়ে বসে আছে।
অন্যসময় হলে এ নিয়ে পদ্য লিখতে বসা যেত, কিন্তু অর্জুন আজ ঘড়ির দিকে তাকাল। এখানে মেঘ দেখে বৃষ্টির আন্দাজ করা যায় না। সঙ্গে একটা ছাতা রাখা ভাল। যেতে হবে ডি সি অফিসে। ওখানে আজ একটা খবর
পাওয়া যেতে পারে। অশোকদা বলেছেন দেখা করতে।
জামা গলিয়ে দরজা খুলে ও চেঁচাল, “মা, আমি বেরুচ্ছি।
আশালতা কিছু বললেন না। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মা এমন চুপচাপ হয়ে গেছেন।
বাইরে এখন ঘন ছায়া। দুপুর বলেই রাস্তায় লোকজন নেই। বাবুপাড়া থেকে ডি সি অফিস এমন কিছু দূরে নয়। তারাপদ উকিলের বাড়ির বারান্দায় চোখ যেতেই বুড়িদিকে দেখতে পেল সে। দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। খোলা চুলে বারান্দার রেলিং-এ কনুই রেখে বুড়িদি দাঁড়িয়ে। কাছাকাছি হতেই বলল, “হাসছিস কেন রে?”
“একটু আগে তোমার কথা মনে পড়েছিল, আর বেরিয়েই দেখি তুমি!”
“আমার কথা? ওমা, কেন?”
উত্তর দিতে গিয়ে হোঁচট খেল অর্জুন। ও জানে বুড়িদি নিজের মুখ নিয়ে খুব বিব্রত, সেই প্রসঙ্গ তোলা খুব অন্যায় হবে। অতএব একটা মিথ্যে কথা বলল সে, “চাঁদের পাহাড়টা তোমার কাছ থেকে আর-একবার নেব, তাই।”
“ওটা তো তোর পড়া।”
“আর একবার পড়ব। এই শংকরটাকে আমার খুব হিংসে হয়। চাকরি-বাকরি না পেয়ে কী সুন্দর চলে গেল আফ্রিকায়। আর আমার অবস্থা দ্যাখো।”
“এখনও রেজাল্ট বের হয়নি আর চাকরি চাকরি করে বেড়াচ্ছিস। তা এই মেঘ মাথায় করে কোথায় যাওয়া হচ্ছে বাবুর?”
“ডি সি অফিসে। একটা চাকরির খবর পাওয়া যাবে বলে আশা আছে।”
একটা লেডিজ ছাতা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল বুড়িদি। ছাতাটা হাতে নিয়ে সে বলল, “এঃ, এটা তো লেডিজ ছাতা, লোকে বলবে কী?”
“তুই কোন্ কালের ছেলে রে? আজকাল আর ওসব নেই। আর মাথায় বৃষ্টি পড়লে ছাতার জাত নিয়ে কেউ ভাবে না। শুধু দয়া করে হারিয়ে আসিস না।”
পোস্ট অফিসের পাশ ঘেঁষে সুন্দর রাস্তাটা ধরে অর্জুন করলা নদীর কাছে আসতেই অদ্ভুত গন্ধ পেল। ঠিক টাটকা মাছের গায়ের গন্ধ অথচ আঁশটে নয়। করলা নদীতে ছিপ দিয়ে মাছ ধরে ওরা এইটে বুঝেছিল। টাটকা মাছের গায়ে কেমন একটা বুনো গন্ধ থাকে, মাছ কাটলেই আঁশটে গন্ধ ছড়ায়।
বাঁ দিকে নেতাজির স্ট্যাচুটাকে রেখে ও ডি সি অফিসের দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশ থমথমে, গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত সিঁটিয়ে আছে, কিন্তু বৃষ্টি যেন পড়তেই চাইছে না। ডি সি অফিসে পৌঁছে অর্জুন অশোকদার খোঁজ করল। অশোকদা টাউন ক্লাবের একজন কর্তা। সবাই চেনে। একটা বড় হলঘরে তিনজন লোককে সামনে নিয়ে বসে ছিলেন। অর্জুনকে দেখে ডাকলেন, “আয়!”
অর্জুন চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল কারণ আর চেয়ার খালি নেই। অশোকদা ওঁদের সঙ্গে কথা বলছেন তো বলছেনই। তারপর হঠাৎ মুখ তুলে বললেন, “কলকাতা থেকে একজন অ্যাথলেট কোচ আসছে, জানিস?”
ঘাড় নাড়ল অর্জুন। একথা তাকে বলার মানে কী? সে তো আর স্পোর্টসে নাম দেবে না। এখন তার একটা চাকরি চাই। প্রায় মিনিট-পনের কেটে যাওয়ার পর সময় হল অশোকদার। তিনজনকে বিদায় করে বললেন, “বোস! অর্জুন, তোর কথা আমি ভেবেছি। ইনফ্যাক্ট, কয়েকজনকে বলেও রেখেছি। কলকাতা হলে স্পোর্টসম্যান বললেই চাকরি পাওয়া যায়। এখানে—। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে কার্ড আছে?”
“আছে।”
“গুড তুই যাতে খুব শিগগির ইন্টারভ্যু পাস তার ব্যবস্থা করব। আর এই শহরে যে ইন্টারভ্যু নেবে তাকে রাজী করাতে অসুবিধে হবে না। কিন্তু আমি চাই তুই অ্যাথলেট ট্রেনিংটা নিবি। সামনের বছরও আমাদের ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন করতে হবে। কী, রাজী?” অশোকদা সিগারেট ধরালেন।
“দেখি।”
“দেখি-ফেকি নয়। আমি যখন বলেছি তখন তোর চাকরি হবেই। রায়সাহেবের চা-বাগানগুলোর হেড অফিসে তোকে এখনই ঢুকিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সেটা ‘ভাল হবে না।” এই সময় টেবিলের কোণে টেলিফোনটা চেঁচিয়ে উঠল আচমকা। অশোকদা কায়দা করে রিসিভার তুলে বললেন, “বলুন! আরে কী খবর! অ্যাঁ, কী বললেন? আচ্ছা, তাই নাকি। এ আর এমন কী! ডি এফ ও আমাকে ভালভাবে চেনেন। বেশ, গাড়িটা পাঠিয়ে দিন, বৃষ্টি আসতে পারে।”
টেলিফোন রেখে অর্জুনের দিকে তাকিয়ে অশোকদা বললেন, “তাহলে তুই আজ আয়। একটা কিছু হয়ে যাবে, ঘাবড়াস না!”
অর্জুনের মন খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। ও খুব নিশ্চিত ছিল চাকরিটা হয়ে যাবে, অন্তত অশোকদা একটা পাকা খবর দেবে।
অর্জুন নিঃশব্দে বাইরের বারান্দায় আসতেই আকাশটা গলে গেল। ঝুপঝুপিয়ে জল ছুঁড়ছে মেঘেরা। জলের এত তোড় যে ছাতায় আটকাবে না। অর্জুনের ইচ্ছে হল এই বৃষ্টি মাথায় করে বেরিয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময় একটা জিপ এসে সামনে দাঁড়াল। বৃষ্টির জল উথালপাথাল হচ্ছে জিপের গায়ে। জিপটা দাঁড়িয়ে দুবার হর্ন দিল।
একটু বাদেই হন্তদন্ত হয়ে অশোকদা বেরিয়ে এলেন, “আরে, তুই এখনও যাসনি। যা বৃষ্টি যাবিই বা কী করে! আচ্ছা, দাঁড়া, মাথায় একটা মতলব এসে গেছে। তুই চলে আয় আমার সঙ্গে।”
দৌড়ে জিপে উঠতে গিয়ে জল এড়াল না। ছাতা খুলল না অর্জুন, খুব কিছু ভেজেনি সে। গাড়ি চলতে শুরু করলে অশোকদা বললেন, “তুই মাসখানেকের জন্য একটা কাজ করবি? মাসখানেক কি তার বেশিও হতে পারে!”
“কী কাজ?”
অশোকদা সিরিয়াস মুখে বললেন, “হাতিদের তাড়াতে হবে। জঙ্গলের হাতিরা দলবেঁধে বেরিয়ে এসে চাষী শ্রমিকদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিচ্ছে, মানুষ মারছে। সরকার থেকে ওদের জঙ্গলে পাঠাবার ব্যবস্থা হচ্ছে। তোকে এই হাতিদের তাড়াতে হবে। রাজী?”
সামনে বৃষ্টির জলে পৃথিবীটা সাদা। মাথার ওপর টিনের ছাদে প্রচণ্ড শব্দ। অর্জুন কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। শুধু কাছের গাছগুলোকে হঠাৎ হাতির মতো মনে হল। সে হেসে বলল, “দারুণ”।
.
প্রীতম সিং থাকেন গয়েরকাটায়। ওখানে ওঁর একটা পেট্রলের দোকান, গোটাচারেক ট্রাক এবং জঙ্গলের ব্যবসা আছে। এই জঙ্গলের ব্যবসাটি হল, বনের কাঠ কেটে মিলে নিয়ে এসে সেগুলোকে চেরাই করে বিভিন্ন আকৃতিতে ভারতবর্ষের চারদিকে পাঠানো। এই কারণে সিংজিকে প্রায়ই জলপাইগুড়ি শহরে আসতে হয়। সেখানে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসারের তত্ত্বাবধানে কুপ ডাকা হয়। প্রতি বছর যেমন নতুন গাছ জঙ্গলে লাগানো হয় তেমনি পুরনো বুড়ো গাছগুলোকে বিক্রি করে দেওয়া হয় কনট্রাক্টরদের কাছে। প্রতিটি গাছের একটা নম্বর বনবিভাগের কাছে রাখা থাকে। যে গাছগুলো বিক্রি হবে তার নম্বর এবং এলাকা ঘোষণা করে নিলাম ডাকা হয়। সিংজি নিজে এই নিলামে অংশ নেন। অত বড়লোক হয়েও কোনো কর্মচারীকে এই দায়িত্ব দেন না। অশোকদার চেষ্টায় এই সিংজির কাছেই চাকরিটা হয়ে গেল অর্জুনের।
ডি এফ ও অফিসের বারান্দায় বসেছিলেন প্রীতম সিং। জিপ থেকে নেমে বৃষ্টি এড়িয়ে অশোকদা তাঁর কাছে পৌঁছলে তিনি দু’হাত বাড়িয়ে অশোকদার হাত চেপে ধরলেন উচ্ছ্বসিত হয়ে, “কেমন আছেন অশোকবাবু!”
“ভাল। আপনি কেমন?”
“চলে যাচ্ছে। মুশকিল করেছে এই হাতিগুলো। আমার লোক জঙ্গলে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না। তার ওপর দলে দলে বেরিয়ে এসে ওরা হামলা করছে। ব্যবসা করাই মুশকিল হয়ে গেল!” সিংজিকে বিমর্ষ দেখাল।
“আপনি টেলিফোনে যে-কথা বললেন সেটার কী হল?”
“আমি গতকাল টেন্ডার দিয়ে দিয়েছি। এটা ইমার্জেন্সি কেস। আজই রেজাল্ট জানার কথা। আপনি একটু দেখুন অশোকবাবু!”
অশোকদা মাথা নেড়ে ভেতরে চলে গেলেন। অর্জুন চুপচাপ কথাবার্তা শুনছিল। সিংজির বয়স পঞ্চাশের ওধারে। চকচকে মোম লাগানো দাড়িতে সাদাটে ভাব। সিংজি যখন নিজে থেকে কথা বলছেন না তখন অর্জুন বারান্দার রেলিং-এর ধারে চলে এল। এখন বৃষ্টির ধার অনেকটা ভোঁতা।
অশোকদার গলা পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল অর্জুন “যাক, আপনিই কনট্রাক্টটা পাচ্ছেন। সেকেন্ড টেন্ডারটা অবাস্তব। আপনি ডি এফ ওর সঙ্গে দেখা করেননি?”
“না, আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। “যান যান, উনি আপনাকে ডাকছেন।”
“কিন্তু উনি নিজে তো লোকাল কাউকে এই কনট্রাক্ট দিতে রাজী ছিলেন না। এখানে আমার একটু, মানে ইয়ে আছে, আমি জানি।
“ছিলেন না কিন্তু হয়ে গেলেন।”
“অনেক ধন্যবাদ। আমি জানি আপনি সব মুশকিল আসান করতে পারেন।”
অশোকদা বললেন, “কিন্তু আমার একটা অনুরোধ রাখতে হবে।”
“বলুন বলুন, নিশ্চয়ই রাখব। চাঁদা?”
“না না। এই ছেলেটির নাম অর্জুন। খুব ভাল স্পোর্টসম্যান। আপনার অরগানাইজেশনে ওকে একটা চাকরি দিতে হবে।”
“আমার ওখানে তো কোনো জায়গা খালি নেই অশোকবাবু!”
“এই কনট্রাক্ট পেলে —।”
“ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। তবে বেশিদিন তো নয়- ।”
“আগে হোক, তারপর দেখা যাবে।”
কদমতলার বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল অর্জুনের। এর আগে মাঝেমধ্যে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে সিগারেট খেয়েছে সে কিন্তু নিজে কখনো কেনেনি। সিগারেটের ধোঁয়াতে সে কোনো মজাই পায়নি।
কিন্তু আজ সাইডব্যাগটা হাতে নিয়ে ওর খুব ইচ্ছে করছিল সিগারেট খেতে। আজ যাকে বলে ঠিক সাবালক তাই হতে যাচ্ছে যে। বুকের মধ্যে বিশ্রী অনুভূতি, বেরুবার সময় মায়ের মুখটা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। এই প্রথম সে বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে।
নিজেকে ঠিকঠাক রাখতে ও সিগারেটের দোকানের দিকে পা বাড়াতেই থমকে গেল। আলিপুরদুয়ারের বাসটা আসছে। এইটে ধরলে দুপুর তিনটে নাগাদ গয়েরকাটায় পৌঁছানো যাবে। অর্জুন শেষবার শহরটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিল। সে যে চলে যাচ্ছে এ খবর মা এবং অশোকদা ছাড়া কেউ জানে না। কোনো বন্ধুকেও জানায়নি সে। বাস এসে দাঁড়াতেই ও চটপট উঠে জানলার ধারে জায়গা পেয়ে গেল। শান্তিপাড়া থেকে আসছে বলেই এখনও খালি। ব্যাগটাকে পায়ের নীচে রেখে বাইরে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল অর্জুন। একটা রিকশা থেকে বুড়িদি নামছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজতে দেখে অর্জুন চিৎকার করল, “বুড়িদি!”
ছোপ-ছোপ মুখ ভুলে বুড়িদি ওকে দেখতে পেয়েই দ্রুত জানালার নীচে চলে এল, “বাঃ, বেশ না বলে চলে যাচ্ছিস। খাওয়াতে হবে এই ভয়ে?”
অর্জুন সত্যি লজ্জা পেল, “তুমি জানলে কী করে?”
বুড়িদি একটা প্যাকেট বাড়িয়ে দিল, “তোর তোয়ালে ফেলে এসেছিলি। মাসিমা আমাকে ডেকে বলতে তবে জানতে পারলাম।”
অর্জুন কৃতজ্ঞতার ভাষা খুঁজে পেল না। বুকের কষ্টটা এতক্ষণে অক্টোপাস হয়ে গেছে। যে-কোনো মুহূর্তেই চোখে জল আসতে পারে। ঠিক সেই সময় বাস গর্জন করে উঠতেই বুড়িদি সরে দাঁড়াল। কদমতলার মোড় ছাড়িয়ে বাসটা চলা শুরু করতেই বুড়িদি চেঁচিয়ে বলল, “চিঠি দিস কিন্তু!”
অর্জুন কোনো কথা বলতে পারছিল না। বুড়িদি মিলিয়ে গেলেও চোখের সামনে সবকিছু আড়াল করে কালো ছোপমাখা বীভৎস কিন্তু সুন্দর মুখটা এসে দাঁড়াচ্ছিল। তারপর নিজেকে শক্ত করতেই যেন সে প্যাকেটটা ব্যাগের ভেতর ঢোকাতে চাইল। সেই সময় ওর হাতে প্যাকেটের ভেতর রাখা শক্ত কিছু ঠেকতেই বুঝতে পারল শুধু তোয়ালে নয়, আরো কিছু সঙ্গে আছে। দ্রুত কাগজের মোড়কটা খুলে তোয়ালের ভাঁজ সরাতে চোখে পড়ল বইটা। পিঠে বন্দুক নিয়ে জঙ্গলমাখা পাহাড়ে শঙ্কর হেঁটে যাচ্ছে। এই বইটাই সে চেয়েছিল সেদিন বুড়িদির কাছে। বুড়িদি তাকে এত ভালবাসে? ঠোঁট দুটো থরথরিয়ে উঠল অর্জুনের। এই সময় কণ্ডাক্টর বলল, “টিকিট?”
চোখের জল মুছবার কথা ভুলে গিয়ে অর্জুন পকেট থেকে টাকা বের করে বলল, “গয়েরকাটায় যাব।”
তিস্তার ব্রিজ পর্যন্ত অর্জুনদের যাতায়াত ছিল। বাঁ দিকে বাতিল রেলপথ, আদিগন্ত খোলা আকাশের বুকে বাসটা গড়িয়ে যাচ্ছিল। এতক্ষণে অর্জুন অনেকটা ধাতস্থ হয়েছে। গাড়ির ভেতরেও বেশ ভিড়। ময়নাগুড়ি ধুপগুড়ি এবং তারপরেই গয়েরকাটা। মাত্র আঠাশ মাইল। গয়েরকাটাই ওর হেডকোয়ার্টার্স হবে। গতকালই অশোকদা বললেন, “প্রীতম সিং আজই তোকে যেতে বলেছেন। এক মাস কাজ করলে পাঁচশো টাকা পাওয়া যাবে। তারপর তোর কাজে যদি ও সন্তুষ্ট হয় তাহলে বলা যায় না, অন্য ব্রাঞ্চে পাকা চাকরি পেতে পারিস।”
অশোকদার কাছে ব্যাপারটা আরো বিশদ জানতে পেরেছিল অর্জুন। বনবিভাগের অফিসাররা লক্ষ রাখেন কোনো চোরাশিকারী জন্তু-জানোয়ারদের হত্যা করছে কিনা। আবার জন্তু-জানোয়াররা যদি লোকালয়ের ওপর হামলা করে তাহলে তাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে জঙ্গলে ফেরত পাঠাবার জন্যে একটা স্কোয়াড আছে। এমনভাবে ফেরত পাঠাতে হবে যা শান্তিপূর্ণ। বানারহাট-নাথুয়া এলাকার দায়িত্ব পেয়েছেন সিংজি।
ঠিক এই মুহূর্তে অর্জুন জানে না হাতিদের কী উপায়ে তাড়াতে হবে। সিংজি নিশ্চয়ই কিছু ভেবেছেন। তবে কথাটা শোনার পর থেকেই ওর মনে হচ্ছিল, সরকার নিজে এ-কাজ না করে বাইরের লোককে দিয়ে কেন করাচ্ছে। অশোকদা বলেছিল তাড়াহুড়ো থাকলে অনেক সময় প্রাইভেট কনসার্নকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বিশেষজ্ঞরা নিশ্চয়এই সিংজিকে পরামর্শ দেবে। জলঢাকা নদীর ওপর যখন বাস উঠে এল তখন নিজের মনেই হেসে ফেলল সে। ঠিক ব্রিজের আগেই একটি মাঠে কাকতাড়ুয়াকে চোখে পড়েছিল। আড়াআড়ি দুটো লাঠির গায়ে জামা পরিয়ে মাথায় কালো হাঁড়ি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার চোখ নাক দাঁত সাদা। নিজেকে ঠিক ওইরকম হাতিতাড়ুয়া বলে মনে হল।
বাস যেখানে থামল সেই জায়গাটা বাজার এলাকা। সাইনবোর্ডে লেখা নাম, ধুপগুড়ি। কণ্ডাক্টর অবিরত হাঁকছে গয়েরকাটা বীরপাড়া-আলিপুরদুয়ার। এই কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসযাত্রীদের চেহারাও পাল্টাতে শুরু করেছে লক্ষ করল অর্জুন। সে জানে এর পরেই গয়েরকাটা। বোধহয় মাইল-আটেক বাকি। এতক্ষণ শুধু খোলা মাঠ সরু আকাশ ছাড়া দুপাশে কিছু ছিল না। জঙ্গলের কোনো চেহারাই চোখে পড়েনি। তরাই-এর বনাঞ্চল শুরু হবে গয়েরকাটা থেকে। কী মনে করে সে ব্যাগ থেকে বুড়িদির বইটা বের করল। আর পাতা খুলতেই যে লাইনে চোখ পড়ল সেটা কি আকস্মিক? অর্জুন সোজা হয়ে বসে লাইনগুলো পড়ল। “সেই ঘন বাঁশবন, সেই পরগাছা ঝোলানো বড়-বড় গাছ, নীচে পচাপাতার রাশ, মাঝে-মাঝে পাহাড়ের খালি গা, আর দূরে গাছপালার ফাঁকে জ্যোৎস্নায় ধোয়া শাদা ধবধবে চিরতুষারে ঢাকা পর্বত-শিখরটি এক-একবার দেখা যাচ্ছে, এক-একবার বনের আড়ালে চাপা পড়ছে। পরিষ্কার আকাশে দু-একটি তারা এখানে-ওখানে। একবার সত্যিই সে যেন বুনো হাতির গর্জন শুনতে পেলে…সমস্ত বনটা কেঁপে উঠল…এত বাস্তব মনে হল, যেন সেই ডাকেই তার ঘুম ভেঙে গেল।”
বই থেকে চোখ তুলে বাইরে তাকাতেই মুগ্ধ হয়ে উঠল অর্জুন। এ কী বিস্ময় তার জন্যে অপেক্ষা করছিল। আকাশে মেঘ জমছে। সরু পিচের পথ দিয়ে হুহু করে ছুটে চলেছে বাস। শীতল বাতাস মেঘেদের শরীর থেকেই যেন নেমে আসছে পৃথিবীতে। আর দুপাশে সেই মেঘের ছায়া মেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সবুজ গালিচার মতো চায়ের বাগান। সেই শূন্য চরাচরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা যা আরো গাঢ় করে তুলেছে চা-বাগানের ওপাশে শুরু হয়ে যাওয়া ঘন জঙ্গল। প্রথমেই যে চিন্তাটা অর্জুনের মাথায় এল তা হল ওই জঙ্গলে হাতিরা বাস করে।
একটু বাদেই বাস একটা ছিমছাম বাজার এলাকায় ঢুকে চৌমাথায় এসে থামল। অর্জুন নেমে এসে চারদিকে তাকাল। সামনেই একটা পেট্রল পাম্প, পান-বিড়ির দোকান। মোটামুটি যা-কিছু প্রয়োজন সাধারণভাবে থাকার জন্যে তার সবই বোধহয় এখানে পাওয়া যায়। জায়গাটা মোটেই পাহাড়ি নয় অথচ পাহাড়ি গন্ধ আছে। বেশিরভাগ বাড়িই কাঠের তৈরি। পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, প্রীতম সিং কোথায় থাকেন?”
“ওই ওপাশে ওর বাড়ি, কিন্তু এখন মিলে পাবেন।”
“মিল?”
“কাঠের মিল। বাঁ দিকের রাস্তাটা ধরে চলে যান, দেখতে পাবেন।”
জায়গাটাকে ভাল লাগছিল হাঁটতে হাঁটতে। দুপাশে বড় বড় দেবদারু গাছ কিন্তু তারই ফাঁকে বকুল চোখে পড়ল। মিনিট-পাঁচেক হাঁটতেই রাস্তাটা ডান দিকে ঘুরল। আর তক্ষুনি অর্জুনের চোখে দুটো জিনিস একসঙ্গে ফুটে উঠল। বিরাট কাঠচেরাইয়ের একটা কারখানা যার গেটের ওপর সাইনবোর্ডে লেখা, “প্রীতম স-মিল”। আর রাস্তাটা যেখানে প্রায় আধ মাইল ছুটে গিয়ে মিলিয়ে গেছে সেখানে চাপ-চাপ অন্ধকার-মাখা জঙ্গল।
কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দাঁড়াল অর্জুন। সামনেই একটা দরজা। ভেতরে কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না। নীচে অনেকটা জায়গা নিয়ে কাঠচেরাইয়ের কারখানা। কাঁচা কাঠের গন্ধ আর উৎকট শব্দে জায়গাটার চেহারাই আলাদা। কারখানার ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছে হচ্ছিল না প্রীতম সিং-এর দেখা করবার আগে, ঠিক সেই সময় জিপটা এসে দাঁড়াল। এই জিপ তার পরিচিত, অশোকদার সঙ্গে বৃষ্টির মধ্যে এটাতেই চেপেছিল। প্রীতম সিং লাফ দিয়ে নেমেই ওকে দেখতে পেয়ে যেন পরিচয়টাকে সঠিক করার জন্যেই জিজ্ঞাসা করলেন, “অৰ্জুন?”
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে অর্জুন সম্মতি জানাল।
“বাঃ, ফার্স্ট ক্লাস। শোনো ভাই অর্জুন, আমি চাই তুমি কাজের সময় কাজ করবে আর বিশ্রামের সময় বিশ্রাম। কাজ করবে চটপট যাতে আমি বিরক্ত না হই। আণ্ডারস্ট্যাণ্ড?” দাড়িতে হাত বোলাতে বেলাতে জিজ্ঞাসা করলেন প্রীতম সিং।
অর্জুন আবার ঘাড় নাড়ল।
“শাবাশ। বলে প্রীতম সিং চিৎকার করে ডাকলেন, “এ বাহাদুর, ইয়ে হ্যায় অর্জুন। উসকো রহনেকো কামরা দেখাও।” প্রীতম সিং আর দাঁড়ালেন না। হনহ্বন করে চলে গেলেন কারখানার ভেতর। বাহাদুরের সঙ্গে কারখানার লন পেরিয়ে আসতে গিয়ে অর্জুন লম্বা লম্বা কাঠের লগ স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে থাকতে দেখল। সে টের পেল কাঠের শরীরের ভেতরের গন্ধ গাছের গন্ধ থেকে আলাদা। এক নাগাড়ে শব্দ হচ্ছে কারখানায়। সেটাকে ডিঙিয়ে আসতেই অর্জুন দুটো কাঠের বাড়ি দেখতে পেল। লম্বা লম্বা গোটা-ছয়েক বিমের ওপর দুটো কাঠের ঘর, বারান্দা আর নীচ থেকে একটা কাঠের সিঁড়ি উঠে সেই বারান্দায় গিয়ে ঠেকেছে। বাহাদুর দরজা খুলে দিতে অর্জুন দেখল ঘরটা মন্দ নয়। একটা তক্তপোশের ওপর তোশক পাতা, টেবিল এবং দুটো চেয়ার হল ঘরটার সম্পত্তি। কিন্তু সবচেয়ে সুখবর হল ঘরের মাঝখানে সিলিং থেকে ঝোলা তারের ডগায় বাল্ব রয়েছে। সুইচে হাত দিতেই আলো জ্বলে উঠল। বাহাদুর বলল, “ডায়নামো চলতা হ্যায়।”
ঘরের পেছন দিকে ছোট্ট একটা ব্যালকনি আছে এবং তার গায়েই স্নানঘর। সেখানে বালতিতে জল তোলা ছিল। পরিষ্কার হয়ে ব্যালকনির রেলিং-এ হাত রেখে অর্জুন জঙ্গলটাকে দেখছিল। বড় জোর একশো গজ গেলেই জঙ্গলটা। অথচ কী শান্ত মনে হচ্ছে এখন।
এই সময় বাহাদুর এসে জানাল সিংজি তলব করেছেন। অর্জুন দ্রুত নেমে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়াল। দরজায় তালা দেওয়া হয়নি। বাহাদুর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্কোচে মন পালটাল অর্জুন। গেলে তো একটা স্যুটকেসই শুধু যাবে।
সিংজি বসে ছিলেন জিপে। ওকে দেখেই ইশারা করলেন উঠে বসতে। অর্জুন বিনাবাক্যব্যয়ে পেছনে লাফিয়ে উঠতেই জিপটা চলতে শুরু করল। সিংজি বললেন, “শোনো ভাই অর্জুন, ছয়জনের একটা টিম দিচ্ছি তোমার চার্জে। কী করে হাতি তাড়াতে হবে তা তোমাকে বলে দেব। কালই ওষুধ এসে যাচ্ছে। তুমি সেগুলো নিয়ে জঙ্গলে চলে যাবে।”
“ওষুধ?”
সিংজি হাসলেন, “হ্যাঁ ভাই, ওষুধ। সব রোগের ওষুধ আছে আর হাতির থাকবে না? আমি তো তারই টেন্ডার দিয়েছি। কেন, অশোকবাবু বলেনি তোমাকে?”
“না।
“হাতিকে মারা চলবে না, আহত করা চলবে না, শুধু পাব্লিকের কাছে ওর আসা বন্ধ করতে হবে। তুমি এর আগে জঙ্গলে এসেছ?”
“না, আসিনি।”
“আরে বাপ! জঙ্গল দ্যাখোনি আর আমি তোমাকে লিডার করে দিলাম? আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”
অর্জুন ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “কিন্তু আমি জঙ্গলের ওপর অনেক বই পড়েছি। হাতির ওপরও।”
“আরে ভাই, রান্নার বই মুখস্থ করা আর রান্না কি এক কথা! অশোকবাবুকে আমি না বলতে পারি না তাই—। ঠিক আছে, রেঞ্জার তোমাকে জিজ্ঞাসা করলে তুমি বলবে এ-ব্যাপারে অনেক এক্সপেরিয়েন্স আছে। কক্ষনো বলবে না যে, জঙ্গলে তুমি কখনো যাওনি। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
“ঠিক আছে।
জিপ একটা বাঁক পেরিয়ে ফরেস্ট অফিসের লনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রীতম সিংকে দেখে যে লোকটি কাঠের বাড়ির দোতলা থেকে নেমে এলেন তিনিই যে রেঞ্জার এটুকু বুঝতে অসুবিধা হল না অর্জুনের
রেঞ্জার হলেন এক-একটা ফরেস্ট রেঞ্জের কর্তা। তাঁর অধীনে বিট অফিসাররা ছড়িয়ে আছেন’ জঙ্গলের বিভিন্ন প্রান্তে। তাঁদের কাজ গাছ এবং বন্যজন্তুদের পাহারা দেওয়া। কন্ট্রাক্টররা যাতে নির্দিষ্ট গাছ কাটে তাই লক্ষ করা। অতএব একজন রেঞ্জার প্রকৃত অর্থে অনেক ক্ষমতার অধিকারী। এইসব খবর গত কদিনে জেনেছে অর্জুন।
গাড়ি থেকে নামতেই অর্জুনকে দেখিয়ে প্রীতম সিং বললেন, “এর সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিতে নিয়ে এলাম। এ হল অর্জুন, আমার স্কোয়াডের লিডার।”
রেঞ্জার অর্জুনকে দেখলেন, “বয়স অল্প, অভিজ্ঞতা আছে?”
প্রীতম সিং বললেন, “আপনি আমাকে জানেন, আমি ব্যবসায় ভুল করি না। তাহলে পাঞ্জাব থেকে এখানে এসে করে খেতে পারতাম না।”
রেঞ্জার হেসে বললেন, “সত্যি, আপনি কী করে এইটে হাতালেন ভেবে পাচ্ছি না। সরকারি কাজ বাইরের লোককে দিয়ে করানো-। যাক, আপনার ওষুধ এসে গেছে?”
“হ্যাঁ। দার্জিলিং-এর চিড়িয়াখানা থেকে পেয়েছি, কলকাতা থেকে আনাবার ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু এতে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না।”
“আমিও মনে করি না। কিন্তু এক্সপার্টরা এক্সপেরিমেন্ট করবেন, আমাদের কী করার আছে। তা বাই দ্য বাই, তিন নম্বরের বিট অফিসারকে সাসপেণ্ড করা হয়েছে, খবরটা আপনি জানেন?”
অর্জুনের চোখ এড়াল না। প্রীতম সিং-এর মুখ এক লহমার জন্য ফ্যাকাশে হয়েও ঠিক হয়ে গেল। অবশ্য দাড়িগোঁফ থাকায় ওদের মুখ দেখে বোঝা যায় না, কিন্তু ব্যাপারটাতে উনি হোঁচট খেয়েছেন টের পাওয়া যাচ্ছে। প্রীতম সিং বললেন, “তাই নাকি! আজকাল কারো ওপর বিশ্বাস করা যায় না।
রেঞ্জার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন এমন সময় একটা লোক ছুটতে ছুটতে এসে জানাল, “সাব, মেছুয়াপুলকা পাস হাতি নিকালা।”
রেঞ্জার প্রীতম সিংকে বললেন, “চলুন, দেখে আসি কী ব্যাপার!”
গাড়ি ছুটে চলল সরু পিচের পথ ধরে। একটু বাদেই বাড়ি ঘরদোর শেষ হয়ে চা-বাগান আরম্ভ হল। রেঞ্জার এবং ড্রাইভার ছাড়া প্রীতম সিং সামনের সিটে বসে, পেছনের খোলা অংশ দিয়ে অর্জুন দেখছিল কালো রাস্তাটা ফিতের মতো খুলে খুলে যাচ্ছে। প্রায় মাইলখানেক গিয়ে জিপ থেমে গেল। তারপর রেঞ্জারের নির্দেশে গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে লাগল। একটু বাদেই ছোট্ট পুল নজরে এল। তার পাশ থেকেই ঘন জঙ্গল শুরু হয়ে গেছে। পুলের গায়ে দুটো সাইনবোর্ড। ছোটটায় লেখা, মেছুয়াপুল। বড়টায় বাঘ, হরিণ, হাতির ছবির পাশে লেখা “অভয় অরণ্য, খুঁটিমারি রেঞ্জ”।
তাহলে এটাই মেছুয়াপুল এবং এখানেই হাতিরা বেরিয়েছে। প্রীতম সিং কিংবা রেঞ্জার এখন চুপচাপ চারপাশে সতর্ক নজর বোলাচ্ছেন। শুধু পুলের নীচে বয়ে যাওয়া জলের ধারার শব্দ ছাড়া এখানে আর প্রাণের অস্তিত্ব নেই। শেষ পর্যন্ত রেঞ্জার বললেন, “এরা এত প্যানিকি হয়ে আছে, সত্যি-মিথ্যে ফারাক করতে পারছে না। কেউ হয়তো বলেছে মেছুয়াপুলের কাছে হাতি বেরোতে পারে, সেটাই আমার ওখানে বেরিয়েছে বলে পৌঁছেছে। চলুন ফেরা যাক।”
অর্জুনের খুব মন খারাপ হয়ে গেল। প্রথম দিনেই বুনো হাতির দেখা পাবে ভেবেছিল এখানে এসে কিন্তু তা বোধহয় ভাগ্যে নেই। এমন কী জঙ্গলের দরজায় এসেও তারা ফিরে যাচ্ছে। সামনের সিটে প্রীতম সিং রেঞ্জারের সঙ্গে আলোচনা করে প্ল্যান ঠিক করে নিচ্ছেন। অর্জুন শুনতে পাচ্ছিল, তরাই-এর এই এলাকায় গত ছয় মাসে মোট একত্রিশজন মানুষ হাতির পায়ে জীবন দিয়েছে।
তখন সন্ধে হয়ে এসেছে। অর্জুনকে নামিয়ে দিয়ে প্রীতম সিং চলে গেলেন রেঞ্জারের সঙ্গে। অর্জুন দেখল শুধু প্রীতম সিং-এর নয়, রাস্তার ওপারে আরো গোটা-তিনেক স-মিল আছে। সন্ধের পাতলা অন্ধকার গায়ে জড়িয়ে পিঠে লম্বা বেতের ঝুড়ি ঝুলিয়ে মদেশিয়া মেয়েরা ফিরে যাচ্ছে কাজ সেরে। এ-রকম অদ্ভুত শান্ত জীবন হঠাৎ অশান্ত করে তুলেছে হাতিরা, যাদের দেখলে এতদিন তার খুব ঠাণ্ডা বলে মনে হত।
অর্জুনের খেয়াল হল বিকেলে কিছুই খাওয়া হয়নি। এক কাপ চা-ও না। তাছাড়া রাত্রে খাওয়ার কী ব্যবস্থা হবে তাও সে জানে না। অশোকদা মাইনের কথা বলেছিলেন, সিংজি কি সেই সঙ্গে খাবার দেবেন? অর্জুন চা খাবে বলে চৌমাথার দিকে এগিয়ে গেল। ওখানে খাবার-দাবারের যে দোকান আছে সেটা সে বাস থেকে নেমেই দেখতে পেয়েছিল।
চৌমাথায় তেমন লোকজন নেই। চায়ের দোকানে ঢুকে একটা বেঞ্চিতে বসে অর্জুন হ্যাজাকের আলোয় চারদিক দেখে নিল। গয়েরকাটায় ইলেকট্রিক বোধহয় ব্যাপকভাবে আসেনি। সিংজির ওখানে তো জেনারেটর চলছে। চা আর নিমকির অর্ডার দিয়ে ও চৌমাথার দিকে তাকিয়ে ছিল এমন সময় কেউ একজন ফিসফিসিয়ে বলল, “চাকরি করতে আসা হল?”
অর্জুন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একজন বয়স্ক মানুষ কখন তার পাশের বেঞ্চিতে এসে বসেছে। লোকটি লম্বা এবং দড়িপাকানো চেহারা, দুটো চোখ এতখানি গর্তের মধ্যে যেন ঝুঁকে দেখতে হয়। মানুষের শব্দহীন হাসি যে কতখানি অস্বস্তিকর হয় একে না দেখলে বোঝা যাবে না। জবাব শোনার জন্যে লোকটা যদি অনন্তকাল অমন করে চেয়ে থাকে? অর্জুন মুখ ঘুরিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি চাকরি করতে এসেছি।”
“হাতি তাড়াবার চাকরি বড় মজাদার চাকরি।” লোকটা এবার হাসল।
খিকখিকে শব্দ করে কেউ হাসতে পারে ধারণা ছিল না অর্জুনের। কিন্তু সে যে ওই চাকরি নিয়ে এসেছে তা এ জানল কী করে? অর্জুন একটু স্মার্ট হবার চেষ্টা করল, আপনি এখানে থাকেন?”
“অবশ্যই। আট বছর ধরে আছি। নাম তিনকড়ি। এখন তো বাসটাস সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বাইরের লোক হলে এখানে রাত্রে থাকতাম কোথায়? এই হতচ্ছাড়া জায়গাটা একটা হোটেল পর্যন্ত নেই। কত মাইনে?”
অর্জুন উত্তর দিল না। কিন্তু বুঝতে পারছিল লোকটি অনেকক্ষণ খায়নি। সে তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে কাউন্টারে গিয়ে দাম মিটিয়ে রাস্তায় নামতেই তিনকড়ি সুড়ুত করে নেমে এল ওর পাশে। এসে জিজ্ঞাসা করল, “রাত্রের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে? এখানকার দোকান আটটার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়।”
অর্জুন বলল, “একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে, আপনি এত চিন্তা করছেন কেন?”
“কী করব ভাই, ওটা যে আমার স্বভাব। কদিন থেকেই শুনছি সিংটি হাতি তাড়াবার কন্ট্রাক্ট বাগিয়েছে আর জলপাইগুড়ি থেকে লোক আসছে। তা আজ দেখলাম তুমি এলে। দেখে ভাল লাগল, আর যাকে ভাল লাগে তার সঙ্গে কথা বলতে দোষ কী!”
“আপনি কী করেন?”
“বড় কষ্টে আছি ভাই। বয়স হয়েছে বলে কেউ কাজকর্ম দেয় না। কীভাবে যে দিন কাটে—! ওই ফটোমাস্টার না থাকলে এতদিনে মরে যেতাম। তোমায় তুমি বলছি বলে কিছু মনে করছ না তো!”
এই মুহূর্তে তিনকড়ির মুখটা অন্ধকারে ভাল করে দেখতে পাচ্ছিল না সে। কিন্তু মন কেমন হয়ে গেল অর্জুনের। লোকটা বোধহয় ভাল। সে বলল, “আপনি সিংজির ওখানে কাজ করেন না কেন?”
“আমাকে নেবে না।
“কেন?”
“ব্যাটা এক নম্বরের চোর। ওই যে পেট্রল পাম্প দেখলে সেটাও ওর। দু”নম্বর তেল বিক্রি করে। ব্যাপারটা তুমি বুঝবে না। ফরেস্টের কুপ অল্প পয়সায় ডেকে বেশি বেশি কাঠ কেটে নিয়ে আসে। লোকটা অসৎ।” তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, “রেঞ্জারের সঙ্গে ষড় আছে।”
“আর কেউ নেই যে চাকরি দিতে পারে?”
“না। একটাও সৎ লোক দেখতে পেলাম না যার কাছে চাকরি করি, ওই এক ফটোমাস্টার ছাড়া। তা ওরই ভাল আয় হয় না যে আমাকে কাজ দেবে। তবু দুবেলা খেতে তো দেয়।”
অর্জুন একটু ভাবল। তারপর বলল, “খুঁটিমারির জঙ্গলটাকে আপনি চেনেন?”
ঘাড় নাড়ল তিনকড়ি, “খু-উ-ব। জঙ্গল জায়গাটা কিন্তু লোকালয়ের চেয়ে ভাল।”
অর্জুন বলল, “আমরা যে টিম যাব হাতি তাড়াতে সেখানে আপনাকে নেওয়ার জন্যে সিংজিকে বলতে পারি।”
তিনকড়ি বলল, “ব্যাপারটা একটু ভাবতে হবে। আচ্ছা, পরে ভেবে বলব।
অর্জুন অবাক হল। যার চাকরি নেই, ঠিকমতো খেতে পায় না, সেই লোক চাকরির প্রস্তাব পেয়ে বলে ভাবব? যেচে মানুষের উপকার করতে নেই।
সিংজির স-মিলের কাছে এসে তিনকড়ি গড়িয়ে গেল, “তাহলে রাত্রে না খেয়ে থাকবে? এক-আধ দিন উপোস শুর। অবশ্য ভাল। অভ্যেস হয়ে গেলে আমার মতো অসুবিধে হবে না। একটা টাকা দাও, আমি মাঝরাত্তিরে খোঁজ নিয়ে যাব খেয়েছ কি না!’
“মাঝরাত্তির? আপনি তখন জেগে থাকেন নাকি?”
খিকখিক করে হাসল তিনকড়ি . তারপব বলল, “থাকি তো! না থাকলে জঙ্গলে কী ঘটছে, রাত্তিরে কারা যায় আসে টের পেতাম কী করে!”
.
এখন কাঠের কারখানা ঘুমিয়ে আছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। এমনকী বাহাদুরের দর্শনও পাওয়া যাচ্ছে না। অর্জুন সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে দেখেছিল ঘরের দরজা ভেজানো। সুইচে হাত দিয়েও বালবটাকে জ্বালাতে পারল না সে। কারখানায় জেনারেটর চলছে না। বোধহয় সরকারি আলো এখন নেই। অর্জুন জামাকাপড় ছেড়ে পাজামা গেঞ্জি পরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। জানলাটা খুলে দেওয়ায় এক ধরনের ফিকে জ্যোৎস্না ঘরে আসছে। সে ভেবেছিল, সিংজির তো উচিত ছিল তার খাওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া। বাহাদুরকে খোঁজ করা দরকার। সে বারান্দায় বেরিয়ে এসে কয়েকবার চিৎকার করে বাহাদুরকে ডাকল। অনেকক্ষণ বাদে কেউ উত্তর দিল, “বাহাদুর নেই হ্যায়।”
এই সময় অর্জুনের মনে হল তিনকড়ির কথা শুনলে হত। জ্ঞান হবার পর সে কখনো রাত্রে না খেয়ে থাকেনি। এক ধরনের অভিমান জন্ম নিচ্ছিল, কিন্তু অর্জুন সেটাকে ঝেড়ে ফেলল।
সামনের ঢালু মাঠ, নদী এবং বিশাল জঙ্গলের গায়ে জ্যোৎস্না যেন কেউ পাউডারের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে। দূরে আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদ দেখে মনে হচ্ছে জঙ্গলটা যেন মাথায় চাঁদের কলসি নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। এই অদ্ভুত মায়ার আলোমাখা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে অর্জুন তার সব সমস্যার কথা ভুলে গেল। এত রূপসী আকাশ সে কখনো দেখেনি। হয়তো ওই চিলতে নদীর চকচকে জল আর কালো জঙ্গল আকাশটাকে আরো সুন্দর করে তুলেছে। অর্জুন একদৃষ্টে যখন তাকিয়েছিল তখন পেছনে শব্দ হল। কেউ যেন পা টিপে আসার চেষ্টা করেও শব্দটাকে ঢাকতে পারেনি। অর্জুন কানখাড়া করল। তাহলে কি বাহাদুর ফিরে এল? কিন্তু এত নিঃশব্দে সে আসতে যাবে কেন? জানলা থেকে ফিরে দাঁড়াতেই অর্জুনের মনে হল ওর হৃৎপিণ্ড এক লাফে বুক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল। সারা শরীর কালো কাপড়ে মোড়া, মুখচোখ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না, মূর্তিটি স্থির, নিস্পন্দ। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল তার দিকে। অর্জুনের গলা শুকিয়ে গেল।
ঠিক সেইসময় খিকখিকে হাসিটা বাজল। “রুটি নিয়ে এলাম, আর কুমড়োর ঘ্যাঁট।
এবার আর একটা ধাক্কা। বুকের ভেতরটা শান্ত হতে সময় লাগল। শরীর হঠাৎ শীতল হয়ে গেল ভয়ানকভাবে। একটা ঠোঙা আর ভাঁড় টেবিলের ওপর রেখে চট করে দরজাটা ভেজিয়ে তিনকড়ি মাথা থেকে কালো চাদরটা খুলল। এবার একই সঙ্গে বিরক্ত এবং কৃতজ্ঞ হল অর্জুন। সে একটু কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করল, “এইরকম ঢেকেঢুকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার মানে কী?”
“তুমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলে ভাই? এইটুকুনিতে ভয় পেলে কী করে চলবে? তোমাকে যে আরো বড় ভয়ের সামনে দাঁড়াতে হবে। হ্যাঁ, আমার তো এখানে ঢোকা নিষেধ, প্রীতম সিং দেখলে বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে। তাই ছায়ায় ছায়ায় নিজেকে ঢেকে-ঢুকে এলাম। আজ আবার জোছনাটা এমন হতচ্ছাড়া হয়েছে! তা খাওয়া হয়নি তো!” তিনকড়ি দাঁত বের করে হাসল।
“প্রীতম সিং আপনাকে নিষেধ করেছে কেন?”
“ওর দু নম্বর ব্যাপারটা আমি জানি বলে। ওসব কথা ছেড়ে দাও। এখানকার ব্যবসায়ীদের মনগুলো এই ডুয়ার্সের জঙ্গলের মতনই। নাও, চটপট খেয়ে শুয়ে পড়ো।”
অর্জুন জানলা ছেড়ে চলে এল টেবিলের কাছে। এবং হঠাৎই সে তিনকড়ির কাছে কৃতজ্ঞ বোধ করতে লাগল।
তিনকড়ি উসখুস করছিল। বলল, “আর একটা টাকা ছাড়ো, দোকান বন্ধ হয়ে গেলে না খেয়ে থাকতে হবে আমাকে।”
অর্জুন তাড়াতাড়ি টাকাটা বের করে দিলে তিনকড়ি নিঃশব্দে চলে গেল। খাবারটা মোটেই সুখাদ্য নয় তবু পেট ভরিয়ে জল খেয়ে অর্জুন শুয়ে পড়ল। জ্যোৎস্না এখন ঘরের মধ্যে।
তখন কত রাত কে জানে, অর্জুনের ঘুম ভেঙে গেল। অবিরত চিৎকার হচ্ছে চারধারে। যেমন চিৎকার মানুষ বোধহয় ডাকাত পড়লেই করে। সে তড়াক করে বিছানা ছেড়ে জানলার ধারে ছুটে গেল। এখন চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। জোছনা নেই বললেই চলে। অথচ চোখের সামনে একটা বিশাল পাহাড় দেখতে পেল সে। ঢালু জমিটার শেষে যে নদী তার জলে পা রেখে হাতিটা শুঁড় নাড়ছে। পেছনে অন্ধকার থাকায় ওকে আরো বিশাল দেখাচ্ছে। সার্কাস কিংবা চিড়িয়াখানার হাতিদের সঙ্গে তুলনাই চলে না। এত চিৎকার এবং ড্রামের আওয়াজ ও ভ্রূক্ষেপই করছে না। এই সময় হাতিটা মাথার ওপর শুঁড় তুলে গর্জন করল। অর্জুন এতক্ষণ নার্ভাস ছিল, এবার ওই শব্দে ওর বুকের ভেতরটাও নড়ে উঠল। ঠিক তখন জানলার নীচে ফোঁস ফোঁস শব্দ হতেই অর্জুন সাবধানে মাথা বের করল। একটা নরম স্পর্শ তার চুল ছুঁয়ে যেতেই চট করে মাথা সরিয়ে নিল সে। কিন্তু তখনও শুঁড়টা জানলায় নেতিয়ে রয়েছে। ভয় কেটে গিয়ে মজা লাগল অর্জুনের। একটা নেহাতই পুঁচকে হাতি। বোধহয় একটু দুষ্টু তাই ওর মা ওখানে দাঁড়িয়ে ধমকাচ্ছে। অর্জুনের মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি এসে গেল। না-খেতে-পারা একটা রুটি টেবিলে ছিল। সেইটে এনে এগিয়ে ধরতেই বাচ্চাটা শুঁড় ঘুরিয়ে টেনে নিয়ে একদম মুখে পুরে দিল। এই সময় বড় হাতিটা আবার ধমকাতেই পুঁচকেটা তুলতুলে পায়ে ছুটে গেল সেদিকে। যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে অর্জুনের দিকে তাকাল এবং তারপরই মায়ের শরীরের সঙ্গে মিশে গেল।
চেষ্টা করেও সে-রাত্রে আর ঘুম এল না। মা-হাতির বিশাল চেহারার ভয়ঙ্কর ভঙ্গিটা সত্ত্বেও তুলতুলে বাচ্চাটার কথা ওর খুব বেশি মনে হচ্ছিল। সমস্ত শিশুরাই একইরকম, দুষ্টু এবং মিষ্টি।
ভোরে বাহাদুর এল, প্রীতম সিং তাকে ডাকছেন। চটপট পোশাক পাল্টে অর্জুন বাইরে বেরিয়ে এল। অফিসবাড়ির বারান্দায় প্রীতম সিং বেতের চেয়ারে বসে আছেন। আজ ওঁর পরনে সাদা স্পোর্টস গেঞ্জি আর খাকি হাফপ্যান্ট। টেবিলে চায়ের পট, কাপ আর কিছু শিঙাড়া। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসতেই প্রীতম সিং বললেন, “কাল রাত্রে হাতি দেখলে?”
“হ্যাঁ।”
“কী মনে হল?”
“ফাইন।” কথাটা ইচ্ছে করে বলল অর্জুন। ও যে ভয় পেয়েছিল সেটা প্রীতম সিংকে না জানানোই ভাল। তাছাড়া তিনকড়ির কথা যদি ঠিক হয় তাহলে এই লোকটি সুবিধের নয়। ও যে মোটেই ভিতু সম্প্রদায়ের নয় সেটা বোঝানো দরকার। প্রীতম সিং একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর হেসে বললেন, “বুনো হাতিকে দেখে কারো সুন্দর মনে হয় জানতাম না। যাক, তোমার এই জায়গা কেমন লাগছে?”
“বেশ ভাল।”
“কিন্তু আজ সকালেই তোমাকে জঙ্গলের ভেতরে যেতে হবে। এ-ব্যাপারে তোমাকে যা-যা করতে হবে আমি ডিটেইলসে বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই ফালতু ঝামেলা হাতে নিয়ে আমার অন্য বিজনেস নষ্ট হতে চলেছে! আমি তোমার ওপর দায়িত্ব দিতে চাই।” সিংজি দুটো কাপে চা ঢেলে একটা ওর দিকে এগিয়ে দিলেন, “কাল রাত্রে এখানে হাতি এসেছিল তা তো দেখেছ। মেছুয়াপুলের ওপাশে কুলি লাইনে ওরা তাণ্ডব করে গিয়েছে। আটটা ঘর ভেঙেছে, যা পেরেছে খেয়েছে।”
অর্জুন ইচ্ছে করেই চায়ের কাপে চুমুক দিল শব্দ করে, “আমায় কী করতে হবে?”
“জঙ্গলের ভেতরে একটা ক্যাম্প করবে প্রথমে। তোমার হাতে একটা জিপ থাকবে। চারজনের একটা টিম নিয়ে চলে যাবে তুমি। হাতি জঙ্গল থেকে বের হয় বিশেষ কয়েকটা পথ দিয়ে। এই পথগুলো ছাড়া ওরা নতুন পথ সচরাচর ব্যবহার করে না। সরকারি প্লান অনুযায়ী ওই পথগুলোতে তুমি কিছু জিনিস ছড়িযে দেবার ব্যবস্থা করবে।” সিংজি এরপব বিস্তারিতভাবে ওকে বুঝিয়ে দিলেন। ওঁর হুকুমে বাহাদুর দশটা কেরোসিনের টিন নীচে নিয়ে এল গুদামঘর থেকে। সেদিকে তাকিয়ে অর্জুনের গা ঘিনঘিন করে উঠছিল।
সিংজি বললেন, “আমি মনে করি না এতে কোনো কাজ হবে, কারণ সামান্য বৃষ্টি হলেই ওসব ধুয়ে মুছে সাফ হবে। কাল রাত্রে হয়নি বলে যে আজ হবে না তা কেউ বলতে পারে না। ওরা চাইছে তাই আমাদের করতে হবে। তবে রেঞ্জারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তোমাকে এক বাক্স অ্যালার্ম বোমা দেওয়া হবে। এগুলো ফাটানো খুব সহজ এবং যা শব্দ হয় তাতে হাতি কাছে ঘেঁষবে না। তুমি কি ফায়ার আর্মস্ ব্যবহার করেছ কখনও?”
অর্জুনের মনে পড়ল এন সি সি-তে থাকতে ওরা রাইফেল ছুঁড়েছিল কয়েকবার। অতএব গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ!”
“তাহলে তোমাকে একটা রিভলভার দেব, খুব বিপদে না পড়লে ব্যবহার করবে না। এবং মনে রেখো হাতির বিরুদ্ধে কখনোই না। কারণ রিভলভারের গুলিতে হাতি সামান্য জখম হতে পারে মাত্র কিন্তু তোমার জীবন নিয়ে নেবে। জঙ্গলে হাতি ছাড়াও এমন অনেক জন্তু আছে তাদের জন্যেই ওটা দিচ্ছি। দুদিন অন্তর রিপোর্ট পাঠাবে আমাকে। তোমাদের রেশন সেইসময় আমি পাঠিয়ে দেব। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
চা শেষ করে প্রীতম সিং উঠে পড়লেন। পিছু পিছু অর্জুনও নেমে এল। প্রীতম সিং বাহাদুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, যে চারজন লোককে আসতে বলা হয়েছিল তারা এসেছে কিনা? বাহাদুর চটপট তাদের হাজির করল। প্রত্যেকেই মজবুত চেহারার নেপালি। হঠাৎ অর্জুনের মনে পড়ে গেল তিনকড়ির কথা। লোকটার জন্যে একটু চেষ্টা করলে হয় না?
সে বলল, “এরা সবাই বিশ্বস্ত?”
সিংজি বললেন, “ও শিওর।”
“রান্না করতে পারে?”
প্রশ্নটা সিংজি নিজে ওদের দিকে ছুঁড়ে দিতে ওরা মুখ চাওয়াচায়ি করতে লাগল। সিংজি সেটাকে আমল না দিয়ে বললেন, “তোমরা তো ওখানে রাজভোগ খেতে যাচ্ছ না। সুতরাং সেদ্ধ করতে পারলেই চলে যাবে।”
“কাল বিকেলে আমার একজন পরিচিত লোককে দেখতে পেলাম। বেচারার কাজকর্ম নেই। ওকে সঙ্গে নিতে পারি?”
“গয়েরকাটায় থাকে? কে?”
“খুব সামান্য লোক, আপনি চিনবেন না।”
প্রীতম সিং সামান্য চিন্তা করলেন, “নিতে পারো। কিন্তু আমি ডেইলি চার টাকার বেশি দিতে পারব না। আর কোনো অ্যাকসিডেন্ট হলে আমি দায়িত্ব নেব না, আন্ডারস্ট্যান্ড”
দুপুর নাগাদ ওরা রওনা হল। রেঞ্জারের অফিস থেকে জঙ্গলের একটা ম্যাপ পেয়েছে অর্জুন। ওরা মেছুয়াপুলের উত্তরে পাঁচ মাইল গভীরে ক্যাম্প করবে। বোমার বাক্সগুলো কেরোসিনের টিনের সঙ্গে গাড়িতে তোলা হল। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে একটি বিশেষ পরিচয়পত্র ওদের সঙ্গে রইল, যদিও সমস্ত বিট অফিসারদের এ-ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এক ফাঁকে চৌমাথার আপ্যায়নে খেতে গিয়েছিল অর্জুন। সেই সময় তিনকড়ি উদয় হল, “কাল হাতি দেখলে?”
অর্জুনের খেয়াল হল লোকটা কখন যেন অবলীলাক্রমে তাকে তুমি বলতে শুরু করেছে। দিনের আলোয় আজ ভাল করে দেখল সে। টিয়াপাখির মতো বাঁকানো নাক এবং অসম্ভব রোগা, ঢ্যাঙা শরীর। অর্জুন গম্ভীর গলায় বলল, “আপনি মাসখানেক কাজ করবেন?”
খুব দ্রুত মাথাটাকে ওপর-নীচ করল তিনকড়ি।
“তাহলে একদম দাঁড়াবেন না। সোজা মেছুয়াপুলের রাস্তায় চলে যান। পথে আপনাকে তুলে নেব।” অর্জুন হুকুম করল।
তিনকড়ির মুখটা উদ্ভাসিত। তারপরই হাত বাড়াল, “আট আনা পয়সা দাও, মুড়ি খেতে খেতে চলে যাই।”
.
ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোক সঙ্গে চলল। সে জায়গা দেখিয়ে দেবে। যদিও তার কোনো দরকার ছিল না। ম্যাপটা জলের মতো পরিষ্কার। খুঁটিমারি ফরেস্ট রেঞ্জ শুরু হয়েছে সেই ডুডুয়া-আংরাভাসা থেকে। তারপর উঠতে উঠতে নানান রেঞ্জের সঙ্গে জড়িয়ে মিশিয়ে হিমালয়ের কোথায়-না-কোথায় মিলিয়ে গেছে। চারজন নেপালি, প্রত্যেকেই সশস্ত্র, জিপের সঙ্গে একটা কেরিয়ারে মালপত্র নিয়ে ওরা রওনা হল তখন বেলা দুটো। একটু আগেই আকাশের রঙ সাবানধোয়া জলের মতো হয়ে পড়ল আচমকা। হিসেবমতো জঙ্গলে ঢুকে এক ঘণ্টায় স্পটে পৌঁছে যাবে এবং তার মধ্যে বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা নেই।
ড্রাইভারের পাশে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোক, যার নাম চতুর এবং একবারে ধারে ছিল অর্জুন। কাঠের গোলাগুলো ছাড়িয়ে দুপাশে সবুজ গালচের মতো চা-গাছগুলোকে রেখে জিপ সাঁইসাঁই করে ছুটে যাচ্ছিল। চোখে মুখে বাতাস লাগায় চমৎকার লাগছিল। চা-বাগান যেখানে শেষ হয়েছে সেখানেই রাস্তাটা ঢালু এবং ফালি কুমড়োর মতো বাঁক নিয়েছে। কাছাকাছি আসতেই অর্জুনের হাসি পেয়ে গেল। ঢলঢলে ফুলপ্যান্ট আর ছেঁড়া-ছেঁড়া কোট পরে তিনকড়ি তীব্রবেগে হাত নাড়ছে। ওর ঢ্যাঙা শরীরটাও নড়ছে সেই সঙ্গে। আর সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, ওর মাথায় একটা কাপড়ের টুপি জাতীয় কিছু যেটা বেশ ছোটমাপের। অর্জুন গাড়িটা থামাতে বলতে চতুর বলল, “তিনুপাগলাকে চেনেন বাবু?”
অর্জুন বলল, “হ্যাঁ। তবে পাগল কিনা জানি না, কিন্তু সিংজির সঙ্গে কথা হয়েছে, ও আমাদের দলে কাজ করবে।”
চতুর বলল, “কিন্তু লোকটা প্রচণ্ড কুঁড়ে, ফটোমাস্টারের কাছে পড়ে থাকে।”
ততক্ষণে গাড়ি থেমেছে। মাটি থেকে একটা ঝোলা কুড়িয়ে দৌড়ে কাছে চলে এল তিনকড়ি। এসে গম্ভীর গলায় বলল, “মশারি আনা হয়েছে?”
অর্জুন থতমত খেল, “ম-শা-রি!”
“আনা হয়নি? বুঝেছিলাম ঠিকই। জঙ্গলের মশারা শকুনের চেয়ে অভদ্র। তারপর সঙ্গের ঝোলাটা দেখিয়ে বলল, “আমি এনেছি। নটা ফুটো ছিল তাও গিঁট দিয়ে রেখেছি। পেছনে বসব, না সামনে?”
অর্জুনের প্রচণ্ড হাসি পেয়ে গিয়েছিল। এখন ওরা জঙ্গল এবং অনেক অজানা বিপদের মুখোমুখি, আর লোকটা কিনা মশারি ঝোলায় নিয়ে দাঁড়িয়ে! তিনকড়ি ততক্ষণে পেছনে উঠে বসেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে অর্জুন দেখল ওর দুটো পা বাইরে ঝোলানো। সে উপদেশের গলায় বলল, “ঠিক হয়ে বসুন।”
“ঠিকই আছি। এনি ডেঞ্জার মোমেন্ট আর ঝাঁপ দেব তৎক্ষণাৎ। কিন্তু মুশকিল হল বিড়ি আনা হয়নি। তুমলোগকো পাস বিড়ি হ্যায় ভাই?” প্রশ্নটা নেপালিদের উদ্দেশে। উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন, “খইনি? বাঃ, ঠিক আছে, বুঝলে ভাই, খইনির মতো নেশা আর নেই।
একটু বিরক্ত হল অর্জুন, “চুপ করুন।”
ওরা তখন মেছুয়াপুল ছাড়িয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকেছে। যদিও এটা পিচের পথ, সিঁথির মতো পরিষ্কার চেহারা নিয়ে নাথুয়ার দিকে গিয়েছে, তবু নাকে জঙ্গুলে গন্ধ এল। লম্বা সেগুন শাল আর লতা জাতীয় কিছু রাস্তার দুপাশকে অন্ধকার করে রেখেছে। একটানা ঝিঁঝি ডাকছে চারধারে। একটাও লোক চোখে পড়ল না এদিকে। আধমাইলটাক এগিয়ে চতুর ডান দিকে ঘোরাতে বলল জিপটাকে।
দুপাশের গাছের ওপর অনবরত চিৎকার এবং হুটোপুটি চলছে। অর্জুন ব্যাপারটা দেখবার জন্যে মাথা বের করতে পেছন থেকে তিনকড়ি বলল, “বাঁদরামি করছে। মাথা ঢুকিয়ে রাখাই ভাল।”
অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “কেন?”
“সাপখোপ থাকা বিচিত্র নয়।”
চতুর বলল, “এখন সাপের সময় না বাবু।”
ধমকাল তিনকড়ি, “খুব জেনে বসে আছে। শীতকালে যেন বৃষ্টি হয় না। আর এটা তো বর্ষাকাল। সাপ গাছের মাথায় উঠে বসে থাকে। বুঝে দ্যাখো ভাই, সরকার কী রকম লোককে মাইনে দেয়।”
চতুর চিৎকার করে উঠল, “অ্যাই, খবরদার।”
এই সময় সামনের জঙ্গলে হুটোপুটি শব্দ উঠতেই ড্রাইভার ব্রেক টানল।
কয়েক মুহূর্ত দমবন্ধ স্তব্ধতা, জিপের প্রত্যেকের চোখ সামনের দিকে। অর্জুন পকেটে হাত দিল। রিভলভারটা বের করবে কিনা চিন্তা করল। তার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করবার কোনো লাইসেন্স নেই, প্রীতম সিং অনেক ঝুঁকি নিয়ে তাকে ওটা দিয়েছেন। বারংবার বলেছেন অত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া ওটা যেন সে বের না করে! ঠিক সেইসময় জঙ্গল সরিয়ে ঘোঁতঘোঁত করতে করতে একটা বিরাট শুয়োর বেরিয়ে এসে ওদের দেখে থমকে দাঁড়াল। খুব অবাক এবং সেই সঙ্গে বিরক্তি ফুটে উঠল তার মুখে। ওর পিছনে তিন-চারটে তুলতুলে বাচ্চা। এক মুহূর্তমাত্র, তারপরই মা বাচ্চাদের নিয়ে উধাও হয়ে গেল। চতুর বলল, “বাবু, শুয়োর দিয়ে বউনি হল আমাদের।”
পেছন থেকে তিনকড়ি ফুট কাটল, “সেই সঙ্গে শুয়োরের বাচ্চা।”
সুন্দর জায়গা পাওয়া গেল। আকাশ থেকে দেখলে মনে হত আচমকা এখানে টাক পড়েছে। ফুট চল্লিশেক জায়গায় শুধু ঘাস, কোনো গাছপালা নেই। ওরা সেখানেই তাঁবু ফেলল। নেপালি ছেলেগুলো খুব করিৎকর্মা। চতুর নির্দেশ দিতেই ওরা পাশাপাশি দুটো তাঁবু টাঙিয়ে ফেলল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই অর্জুনের তাঁবুতে দুটো ফোল্ডিং চেয়ার, টেবিল এবং ক্যাম্পখাট সাজানো হলে বেশ সভ্যভব্য দেখাল। চতুর দুটো তাঁবুর চারপাশে কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে নিশ্চিন্ত হল।
চেয়ারটা বাইরে টেনে নিয়ে এসে অর্জুন আরাম করে গাছগুলোর দিকে তাকাল। কতকাল ওরা এমনি ভাবে আছে। অনেকের শরীরে শ্যাওলা জমে শক্ত হয়ে আছে। এখনই ছায়া নেমেছে জঙ্গলের গোড়ায়। অর্জুনের খেয়াল হল বুড়িদির কথা। ভাগ্যিস চাঁদের পাহাড়টা সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিল। এই পরিবেশে চমৎকার লাগবে বইটা পড়তে। এই সময় তিনকড়ি জঙ্গল ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “ওদিকে কোথায় গিয়েছিলেন?”
লোকটাকে ঢোলা প্যান্ট ছেঁড়া কোট আর বেখাপ্পা টুপিতে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। দুটো হাত-তিনকে লম্বা লাঠি তিনকড়ির হাতে। একটা সামনে রেখে বলল, “সার্ভে করে এলাম। ঠিক পেছনেই একটা ঝরনা আছে। পাথরঠোকরা মাছ চেনো? দারুণ টেস্ট। কিলবিল করছে ওখানে। লাঠিটা রাখো, প্রয়োজনে লাগবে।”
অর্জুন লাঠিটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বেশ শক্ত, হাতে নিলে আত্মবিশ্বাস আসে। সে তিনকড়িকে গম্ভীর গলায় বলল, “আপনি এলোমেলো না ঘুরে বেড়িয়ে ওদের সঙ্গে হাত মেলান। অনেক কাজ বাকি আছে।”
“আমি? লেবারের কাজ করব?” তিনকড়ি যেন আকাশ থেকে পড়ল।
“আপনি তো কাজ করতেই এসেছেন।
“ইয়েস। সেটা তোমাকে হেল্প করতে। আমি কুলি নই।”
অর্জুন লোকটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়েও শেষ পর্যন্ত কঠোর হতে পারল না। নরম গলায় বলল, “ঠিক আছে, এখন তো রান্নাটা দেখুন। চা খেতে ইচ্ছে করছে।
“সে তো আমারও ইচ্ছে। ঠিক হ্যায়, দেখছি।
অর্জুন দেখল ওপাশে উনুন খোঁড়ার তোড়জোড় চলছে। কেরোসিনের টিনগুলো এখনও জিপের কেরিয়ারে। কাল সকাল থেকে কাজ শুরু করতে হবে। কিন্তু অ্যালার্ম বোমের বাক্সগুলোকে চতুর তাঁবুর ভেতরে আনিয়েছে।
লাঠিটা শক্ত হতে নিয়ে জঙ্গলের দিকে এগোল অর্জুন। গাছগুলোর নীচে পচাপাতায় কাদা জমেছে। তাছাড়া আগাছার জন্যে হাঁটাও মুশকিল।
এই জঙ্গলেই হাতিরা আছে। আনুমানিক সংখ্যা রেঞ্জে দুশো। ওরা দিনের বেলা কোথায় থাকে? খুঁটিমারি ফরেস্ট রেঞ্জে দুটো বড় বাঘ আছে। একটি নাকি বেশ অথর্ব। সম্প্রতি চিতার সংখ্যা বেড়েছে। পায়ের ছাপ দেখে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। আজ রেঞ্জারের মুখে কথাগুলো শুনেছে অর্জুন। আর একটু এগোতে সে বুঝতে পারছিল মাটি সমান নয়। খানিকটা উঁচুতে উঠে এসেছে সে। তারপরই কুলকুল শব্দটা কানে এল। জঙ্গল সরিয়ে সরিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই ঝরনাটা চোখে পড়ল। খুব শান্ত ভঙ্গিতে জল গড়িয়ে যাচ্ছে। এক কোমরও হবে না এবং চওড়ায় ফুট-পনেরোর মধ্যে। জলের কাছে সহজে চলে আসা গেল পাথরে পা ফেলে। জিম করবেট থেকে শুরু করে বুদ্ধদেব গুহ, সবার বইতেই অর্জুন পড়েছে জঙ্গলের ঝরনার একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে। জল খেতে প্রাণীরা আসে এখানেই। হাতিও নিশ্চয়ই আসে। অর্জুন চারপাশে তাকাল। ঝরনাটা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আবার জঙ্গলেই ঢুকে গেছে। এবং সত্যি, প্রচুর মাছ আছে এখানে। ফরেস্টে জন্তু মারা যেমন নিষেধ মাছ ধরাও বোধহয় বারণ। কিন্তু পাখি নেই কেন? বুদ্ধদেব গুহ তো জঙ্গলে গেলেই নানারকম পাখির ডাক শুনতে পান। ভদ্রলোক দারুণ বানাতে পারেন। টিটিট্টি, হাট্টিট্টি, পিটিটুং। এর একটাও তো শোনা যাচ্ছে না।
আকাশের রঙ খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে। ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘগুলো এবার ঘোঁট পাকাতে শুরু করেছে। নির্ঘাত বৃষ্টি হবে। এইসময় অর্জুনের চোখ ঝরনার ওপাশে আটকে গেল। লম্বা লম্বা ঘাসগুলো কি সামান্য নড়ছে! স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা হ্যাঁচকা টান আসতেই অনেকটা ভেতরে ছিটকে এল অর্জুন। এমন নাভার্স হয়ে গিয়েছিল যে তিনকড়িকে চিনতে সময় লাগল। কিন্তু তিনকড়ি কথা বলার সুযোগ দিল না। প্ৰবল বিক্রমে ডান হাতের লাঠিতে গাছ ভাঙছে আর মুখে বিকট আওয়াজ করে অর্জুনকে টানতে টানতে জিপের রাস্তায় নিয়ে এসে বলল, “ওটা সেই বুড়ো বাঘ। ব্যাটা ঝাঁপ দিতে সাহস পাচ্ছিল না। নইলে এতক্ষণ হাতি তাড়ানো বেরিয়ে যেত।”
কথাটা শোনামাত্র শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল অর্জুনের। তিনকড়ি কি তাহলে চোখে চোখে রেখেছিল। ভাগ্যিস এসেছিল পেছনে, না হলে—। লোকটার ওপর আরো বেশি নির্ভরতা বাড়ল। কিন্তু কয়েক পা হাঁটতেই ওর চোখ একটা সিগারেটের প্যাকেটে আটকে গেল। ঘাসের ওপর নেতিয়ে পড়ল সিগারেটের প্যাকেটটা সামনে এগিয়ে যাওয়া তিনকড়ির পকেট থেকে।
তিনকড়ি সামনের দিকে তাকিয়ে সমানে বকবক করে যাচ্ছে। কী মনে হতে সামান্য ঝুঁকে প্যাকেটটা দ্রুত পকেটে পুরে ফেলল অর্জুন। তিনকড়ির লক্ষ নেই এদিকে কিন্তু অর্জুন ভাবছিল সিগারেটের প্যাকেটটা লোকটার পকেটে কেন? দুদিন ধরে দেখছে ওকে বিড়ি খেতে এবং এ যাত্রায় বিড়ি আনতে ভুলে যাওয়ায় খইনি চেয়ে খাচ্ছে। তোলবার সময় ওজনে বোঝা গেছে প্যাকেটে সিগারেট নেই। তাহলে গয়েরকাটা থেকে খালি প্যাকেট বয়ে আনবে কেন তিনকড়ি!
চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে চারপাশে তাকাল অর্জুন। ওদিকে রাত্রের রান্নাবান্নার ব্যবস্থা চলছে। তিনকড়ির গলা সবাইকে ছাপিয়ে। বুনো গন্ধমাখা বাতাস বইছে তিনতিরিয়ে। দুটো বাঁদর খুব কাছের একটা নিচু ডালে বসে ওর দিকে এমন ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে যে অর্জুনের হাসি পেয়ে গেল। সঙ্গে কিছু খাবার নেই, নাহলে ওদের দেওয়া যেত। তারপর কথাটা মনে পড়তেই ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখে নিল ধারে-কাছে কেউ নেই। সন্তর্পণে পকেট থেকে প্যাকেটটা বের করল অর্জুন। সাধারণ সিগারেটের প্যাকেটটা খুলতেই ভেতরের কাগজে চোখ আটকে গেল। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে, “রাত একটায় কান খাড়া রেখো।”
সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল অর্জুন। এ যে রীতিমত রহস্য-উপন্যাস! কেউ কি এই নির্দেশ দিয়েছে তিনকড়িকে? হঠাৎ মনে হল, কাল থেকে তিনকড়ি স্রেফ গায়ে পড়েই ওর সঙ্গে ভাব জমিয়েছে, উপকার করেছে যাতে অর্জুনের বিশ্বস্ত হওয়া যায়। কেউ কি ওকে এ-ব্যাপারে কাজে লাগাচ্ছে?
প্যাকেটটা পকেটে রেখে উঠতে যাবে এমন সময় তিনকড়ি হন্তদন্ত হয়ে উদয় হল, “বাঁদরগুলো বাঁদরামির একটা সীমা আছে!”
অর্জুনের চোয়াল শক্ত হল, “মানে?”
“ব্যাটারা রান্নার কিছু বোঝে না তবু আমার অর্ডার শুনবে না। ঝাল আমার একদম সহ্য হয় না তবু গাদা-গুচ্ছের লঙ্কা ঢালছে।” তিনকড়ি যেন প্রতিবাদ করল।
অর্জুন লোকটার মুখের দিকে ভাল করে তাকাল। তারপর বলল, “আমি ড্রাইভারকে বলছি আপনাকে মেছুয়াপুলে ছেড়ে আসতে। ওখান থেকে আপনি হেঁটে ফিরে যেতে পারবেন।
হতভম্ব হয়ে গেল তিনকড়ি, “মা—মানে?”
“ঝাল যখন সহ্য হচ্ছে না তখন আপনার না থাকাই ভাল।”
তিনকড়ি খুব দ্রুত নাভার্স ভাবটা কাটিয়ে উঠল, “বেশ, তুমি যখন বলছ। তবে সন্ধে হয়ে এল, আজকের রাতটা থাকতে দাও কাল সকালেই চলে যাব। মাইরি বলছি।”
হঠাৎ অর্জুনের মন পরিবর্তিত হল। ঠিক আছে, আজকের রাতটা সে লক্ষ রাখবে লোকটার ওপর। দেখা যাক না মতলবখানা কী! সে নীরবে ঘাড় নাড়ল, “বেশ।”
সাতটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া চুকিয়ে দিতে হল। টুপটুপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে সন্ধের মুখ থেকেই। কিন্তু তার চেয়ে মারাত্মক হল মশা। সত্যি, চড়ুইপাখির সাইজের এক-একটা, হুল বসালে প্রাণ বের হয়ে যাচ্ছে। তাঁবুতে ঢুকে দেখল ফোল্ডিং টেবিলটা বিছানার পাশে টেনে আনা হয়েছে। তার ওপর হ্যারিকেন জ্বলছে। এবং চারটে লাঠি মাটিতে গুঁজে তাতে গিঁটবাধা একটি ময়লা মশারি বেঁধে ক্যাম্পখাটকে ঘিরে রাখা হয়েছে। জঙ্গলে বোধহয় একটু ঠাণ্ডা পড়ে। বৃষ্টির জন্যেও হতে পারে। অর্জুন যখন শোওয়ার তোড়জোড় করছে তখন চতুর এল।
“বৃষ্টিতে তো আগুন জ্বালা যাবে না, মুশকিল হল।”
অর্জুনের মনে পড়ল রাত্রে জঙ্গলে আগুন জ্বেলে রাখলে বন্যজন্তুরা দূরে থাকে। সে জিজ্ঞাসা করল, “ভয়ের কিছু আছে?”
“ভয় নেই বলি কী করে? হাতির পাল আসতে পারে। চিতারা আছে, দুটো বাঘও ঘোরে। হায়না আছে। আমি কি এক-একজনকে দু’ ঘণ্টা করে পাহারা দিতে বলব বাবু?” চতুর অনুমতি চাইল।
“হ্যাঁ তাই ভাল। তবে তিনকড়িকে পাহারা দিতে হবে না।”
“আমিও তাই ভেবেছি বাবু।”
“কেন?”
“দিতে বললে ঘুমুবে। ও একা দুজনের ভাত খেয়েছে।”
চতুর চলে গেলে তাঁবুর মুখ বন্ধ করে মশারির ভেতর ঢুকে গেল অর্জুন। ক্যাম্পখাটে শোয়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। খাস জঙ্গলে সেটা মন্দ লাগছে না। তিনকড়ির জন্যে মন খুঁতখুঁত করছে। লোকটা সত্যি রহস্যময়। হাত বাড়িয়ে হ্যারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে বইটা টেনে নিল সে।
বইটা চোখের সামনে রেখে সামান্য কান খাড়া করতেই অজস্র শব্দ শুনতে পেল সে। রাত্তিরের জঙ্গল শুধুই শব্দ করে যায় কেন? তবে এই শব্দগুলোর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। কোথাও হয়তো কোনো পাখি বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠল, ডাব ডাব। সেই শুনে একটা হায়েনা খানিক হেসে নিল। ঘড়ির দিকে তাকাল অর্জুন, একটা বাজতে এখনও অনেক দেরি।
তারপর ও কান পেতে শুনলে—তাঁবুর চারপাশে কে যেন ঘুরে-ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার জোরে নিঃশ্বাসের শব্দ বেশ শোনা যাচ্ছে তাঁবুর মধ্যে থেকে। চাঁদ ঢলে পড়েছে, তাঁবুর বাইরে অন্ধকারেই বেশি, জ্যোৎস্নাটুকু গাছের মগডালে উঠে গিয়েচে, কিছুই দেখা যাচ্চে না। হুড়মুড় করে একটা শব্দ হল—গাছপালা ভেঙে একটা ভারি জানোয়ার হঠাৎ ছুটে পালালো যেন। বইটা চট করে বন্ধ করে কোমরে হাত রাখল অর্জুন। রিভলভারটা বের করে সে উঠে বসল ক্যাম্পখাটটার ওপর। হুড়মুড় করে নয়, খুব সতর্ক-শব্দ একটা হয়েছে যেটা জঙ্গলের নয়। কেউ যেন পা টিপে টিপে তাঁবুর কাছে আসছে।
খানিকটা সময় ব্যয় করে অর্জুন সন্তর্পণে মাটিতে নামল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা টর্চটাকে তুলে নিঃশব্দে তাঁবুর দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। ডান হাতের মুঠোয় রিভলভারের বাঁটটায় কাঁপুনি লেগেছে। তাঁবুর দরজা ফাঁক করে বাইরে তাকাল সে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে মেঘ থাকায় আলোর নামমাত্র নেই। প্রথমে কিছুই নজরে এল না। তারপর একটু একটু করে চোখ সয়ে নিতে লাগল। অন্ধকারেরও একটা নিজস্ব আলো থাকে। সেই আলোটা একবার খুঁজে পেলে আর অসুবিধে হয় না। অর্জুন এবার গাছগুলোকে স্পষ্ট দেখতে পেল। টর্চের বোতাম টিপে সে বনের গায়ে আলো ফেলল। একটা সরু থেকে মোটা হয়ে যাওয়া আলোয় জঙ্গলটাকে খুঁজতে লাগল সে। যার পাহারা দেবার কথা ছিল সে কোথায়? আর এইসময় তার নজরে এল হাতিটা। কুতকুতে চোখে তাকে দেখছে বিশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে। সেই বাচ্চাটা। ওকে দেখে দু”পা এগিয়ে এসে শুঁড় নাড়তে লাগল মজাদার ভঙ্গিতে। ঠিক তখনি পেছনের জঙ্গলে শব্দ হতেই বাচ্চাটা মুখ ঘুরিয়ে চোঁ-চোঁ দৌড় দিল সেদিকে। অর্জুন সতর্ক ভঙ্গিতে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই চাপা গলায় শুনতে পেল, “ওপরে উঠে এসো ভাই।”
হাতি দেখে যতটা না ভয় পেয়েছিল তার চেয়ে বেশি ঘাবড়ে গেল অৰ্জুন। চকিতে আলোটা ওপরের দিকে ফেলতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য নজরে এল। তিনকড়ি হাত নেড়ে তাকে ইশারা করছে গাছে উঠতে। ওর সারা শরীর কাপড়ে মোড়া কিন্তু গাছের ডালের সঙ্গে বাঁধা। অর্জুন কোনোরকমে বলল, “আপনি!”
“আলো নেভাও। চটপট উঠে এসো ওপরে, কথা আছে।”
এত রাত্রে খামোখা গাছে উঠতে যাবে কেন, ভাবার মুহূর্তে জঙ্গল ভাঙার শব্দ হল। অর্জুন আর কিছু না ভেবে টর্চ কোমরে গুঁজে গাছটার ডাল ধরে ঝুলে পড়ল। অনেক কষ্টে টানাহ্যাঁচড়া করে সে ওপরে উঠে এলে তিনকড়ি বলল, “এই গুলতির মতো ডালটায় আরাম করে বোসো। বসে চারপাশে তাকাও।
অন্ধকারে প্রথমে ঠাওর করতে অসুবিধে হল, কিন্তু তারপর আর বুঝতে বাকি রইল না। বিরাট এক হাতির পাল তাদের তাঁবু ঘিরে ফেলেছে। ছোট ছোট পাহাড়ের মতো লাগছে ওদের দেখতে। একটু একটু করে ওরা বৃত্তটাকে ছোট করছে। ওরা যদি ইচ্ছে করে যে-কোনো মুহূর্তে তাঁবু গুঁড়িয়ে দিতে পারে। দ্বিতীয় তাঁবুর মানুষগুলো ঘুমে কাদা হয়ে রয়েছে। আক্রান্ত হলে টেরও পাবে না। অর্জুনের হঠাৎ তিনকড়ির কথা মনে পড়ল, “আপনি এখানে কেন?”
“তাঁবুতে ঘুমুতে পারলাম না। সবকটার নাক ডাকে বাঘের মতো, বাপ্প্স খুব নিচু গলায় বলল তিনকড়ি। অর্জুন এমন অবাক কখনও হয়নি। স্রেফ নাকডাকা সহ্য হয় না বলে কেউ গাছের ওপর উঠে বসতে পারে? কিন্তু এদিকে কিছু একটা করা দরকার। ওই হাতিগুলোকে তাড়াবার মতো অস্ত্র হাতে নেই কিন্তু তাঁবুতে তো বোমা আছে। চিৎকার করে চতুরকে ডাকার জন্যে মুখ খুলতেই তিনকড়ি বলল, ক’টা বাজে?”
“কেন?”
“একটা বেজে গেছে?”
“না।” অর্জুনের হাতের মুঠো সতর্ক হল। সিগারেটের প্যাকেটটা–!
“বাজলেই হাতিরা চলে যাবে জঙ্গল ছেড়ে।”
“আপনি জানলেন কী করে?”
“জানি। একটু বাদেই শব্দটা শুনতে পাবে। যেটার কথা লিখেছিলাম।”
এবার সত্যি চমকে উঠল অর্জুন। তাহলে তিনকড়িই প্যাকেটের গায়ে কথাগুলো লিখে তাকে দিয়েছে। কিন্তু হাতে না দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল কেন?
ঠিক এইসময় হাতিরা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনকড়ি খপ করে অর্জুনের কবজি ধরে বলল, “কান খাড়া রাখো।”
খুব মৃদু একটা শব্দ হচ্ছে। যেন মোটর সাইকেল চেপে অনেক দূরে কেউ ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু তার একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়েছে জঙ্গলে। সঙ্গে সঙ্গে হাতিরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে পড়ল। তারপর লম্বা লাইন করে চলে যেতে লাগল উল্টো দিকে। একটার পেছনে একটা। ওরা চোখের আড়াল হয়ে গেলে তিনকড়ি বলল, “এই শব্দটার কথা বলেছিলাম।”
“কিসের শব্দ?”
“জানি না। শুধু জানি ওটা হলেই হাতিরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর ভোরের আলো ফুটলে আবার ফিরে আসে।
“এসব কথা রেঞ্জারকে বলেননি কেন?”
“বললে কে বিশ্বাস করবে? আমি তো পাগলা, বিশ্বাস না হয় ওই চতুরকে জিজ্ঞাসা করে দ্যাখো।”
“বেশ, একটা কথা বলুন তো, মুখে না বলে আমাকে লিখে জানালেন কেন?”
“তোমায় পরীক্ষা করলাম তুমি সতর্ক কিনা। তাছাড়া মুখে কিছু বলা নিরাপদ নয়। এই যে আমরা কথা বলছি অন্য কেউ শুনছে কিনা কে জানে। আচ্ছা, যাও, এবার শুয়ে পড়ো।”
“সে কী! শব্দটা কোথায় হচ্ছে খোঁজ নেব না?”
“কান পেতে শোনো এখন আর হচ্ছে না। আর আমরা তো কালই চলে যাচ্ছি না, নাকি যাচ্ছি?”
অর্জুন হেসে ফেলল, “না যাচ্ছি না। তারপর লাফ দিয়ে নীচে নামল, কোমর থেকে টর্চ বের করে ও দ্বিতীয় তাঁবুটার দরজায় এসে দাঁড়াল। চারজন আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছে। সত্যি নাক ডাকছে জব্বর। নিজের টেন্টে ফিরে এসে মশারির ভেতর ঢুকে চোখ বন্ধ করতে গিয়েই কথাটা খেয়াল হল! দ্বিতীয় টেন্টে চারজনের ঘুমন্ত শরীরের আদল দেখতে পেল কেন? ওখানে তো পাঁচজনের থাকার কথা। যদি পঞ্চম জন পাহারা দেবার জন্যে না ঘুমোয় তাহলে তাকে তো নজরে পড়তই। তাহলে পঞ্চম জন গেল কোথায়?
.
সকালবেলায় জঙ্গলটাকে চমৎকার লাগল। চাঁপাফুলের মতো রোদ জমেছে গাছের মাথায়। ওদের তাঁবুর কাছে এখনও শিশিরভেজা ছায়া। চায়ের কাপ নিয়ে বসেছিল অর্জুন, এমন সময় চতুর এল, “বাবু, এখনই কাজ শুরু করবেন?”
অর্জুন মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ। একজনকে রান্নাবান্নার জন্যে এখানে রেখে যাও।
চতুর বলল, “না বাবু, কেউ একা থাকতে চাইছে না। কাল এখানে হাতি এসেছিল সবাই বুঝতে পেরেছে আজ। তাই—।”
এমন সময় তিনকড়ির গলা পাওয়া গেল, “ঠিক আছে, আমি থাকছি। ডিমের ঝোল আর ভাত রেঁধে রাখব।
অর্জুন দেখল তিনকড়ি বিরাট মগে করে চা খাচ্ছে। কথাটা বোধহয় চতুরের পছন্দ হল না, “বাবু, পাগলাটাকে একা একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে?”
অর্জুন মাথা নাড়ল, “থাক। ও বরং এইসব কাজই করুক।”
একটু বাদেই ওরা জিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। যেসব পরিচিত পথে হাতিরা জঙ্গল থেকে বের হয়ে লোকালয়ে যায় সেগুলো চতুরের ভালই চেনা। তার দু একটা তো গতকালের যাওয়া-আসায় আরও স্পষ্ট। এই রাস্তাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। না, কোনো দেওয়াল বা বেড় দিয়ে নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন হাতি বাঘকে সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে। বাঘ যে অঞ্চলে থাকে হাতি তার ধারেকাছে ঘেঁষে না। অতএব এই হাতিগুলোকে বাঘের ভয় দেখাতে হবে। প্রীতম সিং যে টেন্ডার দিয়েছেন তা হল হাতির কাছে বাঘের অস্তিত্ব প্রমাণ করার রসদ সংগ্রহ করে এই সব বনপথে ছড়িয়ে দেওয়া।
কেরোসিনের টিনগুলো খোলা হল। ওগুলো এয়ার-টাইট রাখা হলেও শুকিয়ে এসেছে এর মধ্যেই। ব্যাপারটা জানা সত্ত্বেও গা-ঘিনঘিন ভাবটা এড়াতে পারছিল না অর্জুন। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ও নির্দেশ দিতে লাগল। কীভাবে বাঘের মল ছড়িয়ে দিতে হবে প্রীতম সিং ওকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই মলের গন্ধ পেলে হাতি এ রাস্তায় কখনো পা রাখবে না। ওরা যদি উল্টো পথ বেয়ে জঙ্গলের আরো গভীরে ঢুকে যায় তো রক্ষে। সেই সুযোগই নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুধু এই খুঁটিমারি রেঞ্জ কেন, তরাই-এর সর্বত্র হাতি জঙ্গল থেকে নানান কারণে বেরিয়ে আসছে। সব রাস্তা বন্ধ করার মতো ওই দ্রব্য যে পরিমাণে প্রয়োজন তত বাঘই নেই ভারতবর্ষে। তাছাড়া চিড়িয়াখানা থেকেই ওটা আনা সম্ভব। আর কটাই বা চিড়িয়াখানা আছে! তিনটে কেরোসিনের টিন খালি হওয়া দেখতে দেখতে নিজেরই হাসি পেয়ে গেল। সে চাকরিটা পেয়েছে বটে কিন্তু কত আজগুবি পথে সরকারের পয়সা জলে চলে যায়। যদি আজ দুপুরে বৃষ্টি হয় তাহলে এসব পণ্ডশ্রম হবে না? চতুর কোনো কাজ করছিল না। সে বনবিভাগের লোক, প্রীতম সিং-এর কাজ সে কেন করবে। জিপের গায়ে হেলান দিয়ে সে নেপালিদের কাজ লক্ষ করছিল। হঠাৎ অর্জুন লক্ষ করল চতুরের কনুইয়ের ওপরে ব্যাণ্ডেজ। গতকাল তো ওটাকে লক্ষ করেনি সে, সে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার হাতে কী হয়েছে চতুর?”
একটু যেন হকচকিয়ে গেল ও তারপর জোর করে হাসবার চেষ্টা করল, “ও কিছু না। আজ সকালে গাছের ডাল লেগে একটু ছড়ে গেছে।”
অর্জুন কিছু বলল না। কিন্তু ওর বিশ্বাস হল চতুর মিথ্যে কথা বলছে। কারণ এত ভাল ব্যাণ্ডেজ সঙ্গে নিয়ে ওরা জঙ্গলে আসেনি। এবং চতুরের মতো একজন সামান্য কর্মচারীর কাছে ওরকম ব্যাণ্ডেজ থাকাটা একটু অস্বাভাবিক। তাহলে কি গত রাত্রে চতুরই তাঁবুতে ছিল না?
বেলা বারোটা নাগাদ ওরা গয়েরকাটায় যাবার সব ক’টা জঙ্গুলে পথে বাঘের মল ছড়ানো শেষ করল। মাথার ওপর চনমনে রোদ জ্বললেও ঘর গাছের ছায়া ওদের আড়ালে রেখেছিল। আর মাত্র দুটি টিন রয়েছে বাকি। অর্জুন সেগুলোকে আজই খরচ খরতে চাইল না। তাছাড়া খিদেও পেয়ে গিয়েছিল প্রচণ্ড। অর্জুন ওদের টেন্টে ফিরবার নির্দেশ দিল।
গাছে গাছে অজস্র বাঁদর ছাড়া আর কোনো প্রাণী চোখে পড়ছে না। এমন কী আজও পাখিদের ডাক শুনতে পাচ্ছে না অর্জুন। চতুরকে কারণটা জিজ্ঞাসা করবে ভেবেও করল না। লোকটার সঙ্গে বেশি কথা বলতে আর ইচ্ছে করছে না। মাটির রাস্তায় প্রায় লাফাতে লাফাতে জিপটা ওদের নিয়ে চলছিল। পেছনে ক্যারিয়ারটা থাকায় আরো অসুবিধে হচ্ছে। একটা বাঁক ঘুরতেই ড্রাইভার চিৎকার করে ব্রেক কষতে জিপটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠে থেমে গেল।
সামনে তাকিয়ে অর্জুনের হৃপিণ্ড যেন এক লহমার জন্য অকেজো হয়ে গেল। একটি বিশাল মেটেরঙা হাতি ঠিক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে। তার দুটো চোখ জিপের দিকে, কান স্থির। এখন দূরত্ব পঁচিশ গজও হবে না। রাস্তাটা এমন যে কোনোভাবেই জিপটাকে ঘোরানো যাবে না। ক্যারিয়ার পিছনে নিয়ে ব্যাক করাও অসম্ভব। চতুর বলল, “বোম ফাটাব বাবু?”
“বোম? বোমা এনেছ নাকি?”
একগাল হাসল চতুর ওরই মধ্যে, “হ্যাঁ বাবু, তিনুপাগলার কাছে ওগুলো না রেখে সঙ্গে এনেছি। ক্যারিয়ারে আছে। দু-তিনটে ফাটালেই ব্যাটা পালাবে।”
হাতিটা নড়ছে না, সরে যাওয়ারও কোনো গরজ নেই। অর্জুন রিভলভারটাকে একবার ছুঁয়ে নিল। অত বড় জন্তুটার বিরুদ্ধে এটা কোনো কাজেই লাগবে না। সে ঘাড় নাড়তেই চতুর লাফিয়ে নীচে নেমে ক্যারিয়ারের দিকে ছুটে গেল। তারপর বাক্স ভেঙে দুটো বোমা বের করে জিপের সামনে এগিয়ে এল। অর্জুন বলল, “দেখো, গায়ে মেরো না, শুধু ভয় দেখাও।”
চতুর বলল, “এটায় খালি শব্দ হয়, শব্দতেই ব্যাটা ভয় পাবে।” বলামাত্রই একটা বোমা ফাটাল চতুর। প্রচণ্ড শব্দ হতেই হাতিটা নড়ে উঠে এক পা পিছিয়ে গিয়ে মাথার ওপর শুঁড় তুলে চিৎকার করে উঠল। চতুরের বোধহয় সাহস বেড়ে গিয়েছিল, সে আরও একটু এগিয়ে দ্বিতীয় বোমাটা ফাটানোমা দৃশ্যটা চোখে পড়ল। দুপাশ থেকে আরও চারটে দাঁতাল হাতি জঙ্গল ভেঙে ছুটে আসছে জিপের দিকে। ড্রাইভার বলল, “সাব, ভাগিয়ে।”
বলামাত্র ওরা ছয়জন জিপ থেকে লাফিয়ে নেমে পেছন দিকে ছুটতে শুরু করল, কিন্তু ওদিকের জঙ্গলেও শব্দ হচ্ছে। তার মানে হাতিরা এই পথে লুকিয়ে অপেক্ষায় বসে ছিল। হঠাৎ একটা রক্ত হিম করা আর্তনাদ কানে আসতেই অর্জুন পেছন ফিরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চতুর বোধহয় দুপাশের হাতিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিল না। অর্জুন দেখল একটা দাঁতাল চতুরের শরীরটাকে শুঁড়ে জড়িয়ে শূন্যে তুলে জিপের গায়ে আছাড় মারল। চতুর কিন্তু তারপর আর একবারও আর্তনাদ করেনি। সঙ্গে সঙ্গে তিনটে হাতি প্রায় একই সঙ্গে জিপটার ওপর পা তুলে ওটাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলতে লাগল। চোখের সামনে এমন বীভৎস মৃত্যু এর আগে দেখেনি অর্জুন। তার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছিল। চতুর যে বেঁচে নেই এটা নিশ্চিত, কিন্তু ওর শরীরটাকে পাওয়া যাবে কিনা কে জানে।
হঠাৎ কাঁধে নরম ভিজে স্পর্শ এবং নিশ্বাস পেয়ে চমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অর্জুন বরফ হয়ে গেল। প্রায় অর্ধবৃত্তাকারে হাতিরা ওকে ঘিরে রেখেছে। ওর ঠিক সামনে সেই বাচ্চাটা দাঁড়িয়ে শুঁড় নাড়ছে। বাচ্চাটার মুখ বেশ হাসি-হাসি। যেন অর্জুনকে নিয়ে একটু খেলা করার মতলব ওর। শুঁড়টা বারংবার সে অর্জুনের সামনে নাচাচ্ছে। একবার একটা গাছের ডাল ভেঙে এগিয়ে দিল। অর্জুন সেটা নিতেই বেশ চক্কর মেরে নিজের দলকে দেখে নিয়ে শুঁড় দিয়ে অর্জুনকে ঠেলতে লাগল। জীবনের বিন্দুমাত্র ভরসা নেই, অর্জুন পেছনে তাকাল। হাতির পাল অত্যন্ত সতর্ক চোখে তাদের দেখছে। যেন শিশুটিকে খেলা করতে দেওয়া চলে, কিন্তু সে যদি বিপদগ্রস্ত হয় তাহলে ওরা যে-কোনো মুহূর্তেই তেড়ে আসবে। বাচ্চাটা সমানে অর্জুনকে সামনে ঠেলছে। যেন যেতে বলছে এগিয়ে। একটু দ্বিধা করে অথবা মৃতের মতো অৰ্জুন সামনে হাঁটতে লাগল। বাচ্চাটাও পাশাপাশি হাঁটছে। আর সকৌতুকে লেজ নাড়ছে। ভাঙা মোচড়ানো জিপটাকে ডিঙিয়ে অর্জুন প্রায় চোখ বন্ধ করে কয়েক পা এগিয়ে আসতেই শুঁড়ের টান অনুভব করল। বাচ্চাটা যেন তাকে থামতে বলছে। সে দেখল তিনটে বিশাল দাঁতাল ক্ষিপ্ত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে। এই তিনটেই জিপ ভেঙেছে, চতুরকে মেরেছে। বাচ্চাটা হঠাৎ অর্জুনকে ছেড়ে তিরতির পায়ে দাঁতালদের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর শুঁড় দিয়ে ওদের একটু আদর করে আবার ফিরে এল। অর্জুন দেখল দাঁতাল তিনটের যেন মন পাল্টাল, ওরা রাস্তা থেকে সরে জঙ্গলের মধ্যে আলস্যে গা ছেড়ে দিল। বাচ্চাটার সঙ্গে আবার হাঁটতে শুরু করল অর্জুন। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর পেছনে একটা গর্জন উঠতেই বাচ্চাটা দাঁড়িয়ে গেল। অর্জুন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল অন্য হাতিদের আর দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু মা-হাতিটা পেছনে পেছনে অনেকটা এসে তার বাচ্চাকে ডাকছে। আর একবার তার মাথায় শুঁড় বুলিয়ে বাচ্চাটা মায়ের কাছে ফিরে যেতেই অর্জুন দৌড় শুরু করল।
ঘণ্টা দুয়েক বাদে টলতে টলতে অর্জুন যখন তাঁবুর কাছে পৌঁছাল তখন সূর্য ঢলে পড়েছে। ওকে দেখে তিনকড়ি দৌড়ে এল। অর্জুন এক পলক দেখে নিল, চারটে নেপালি তার অনেক আগেই পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ ওরা প্রাণে বেঁচে ফিরতে পেরেছে। ওরা ওকে ধরাধরি করে ক্যাম্পখাটে শুইয়ে দিলে অর্জুনের মনে হল এর চেয়ে আরাম বোধহয় পৃথিবীতে আর নেই।
খানিকবাদে একটু সুস্থ হয়ে উঠে বসতেই তিনকড়ি বলল, “খরগোশের মাংস খেয়েছ কখনো? আজ খাওয়াব। ব্যাটাকে ধরে ফেললাম বলে ডিমে হাত দিতে হল না। আজ আর স্নান-টান করতে হবে না, মুখে জল দিয়ে পেট ভরে খেয়ে নাও।”
অর্জুন অপলকে তাকিয়ে থাকল লোকটার দিকে। এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, কিছু নিশ্চয়ই শুনেছে নেপালিদের মুখে, কিন্তু সেসব কথা একবারও জিজ্ঞাসা করল না লোকটা! অদ্ভুত!
সামান্য কিছু মুখে দিয়ে উঠে পড়ল সে। এখন খিদে নেই, শুধু অবসাদ। চোখের সামনে লোকটা মরে গেল! আর একটু হলে সেও যেত। তার চেয়ে বড় চমক, বাচ্চা হাতিটা ওকে বাঁচাল! কেন? সেদিন রুটি খাইয়েছিল বলে?
কুলিরাও বেশ ভয় পেয়ে গেছে। ওরা খেয়েদেয়ে সামনে এসে বসল। তিনকড়ি এল বেশ খানিক বাদ। এসে বলল, “গয়েরকাটায় একটা খবর পাঠাতে হয়।
অর্জুন মাথা নাড়ল। কথাটা সে ভেবেছে। অন্তত চতুরের মৃতদেহের যা অবশিষ্ট আছে তার একটা গতি করা দরকার। কিন্তু এতখানি জঙ্গল ভেঙে কে যাবে। গেলে সবাই একসঙ্গে যাবে। কথাটা বলতেই তিনকড়ি মাথা নাড়ল, “খেপেছ! একটু বাদেই ঝুপ করে রাত্তির হয়ে যাবে। আজ কিছু হবে না, কাল সকালে দেখা যাবে।”
একজন নেপালি হিন্দিতে বলল, “কিন্তু রাত্রে তো হাতি আসতে পারে। মাথা নাড়ল তিনকড়ি, “না, আজ আসবে না। এলে বাবুকে ছেড়ে দিত না। বাচ্চাদের মন বুঝলে সবসময় ভাল। যত গোলমাল করি আমরা, এই বুড়োরা। কী হয়েছিল বলো দেখি।
অর্জুন সব কথা খুলে বলল। শুনে তিনকড়ি হাসল, “পাপের বেতন দিয়েছে চতুর। বার বার ধান খাবে একবার ফাঁদে পড়বে না, তা কি হয়?”
অর্জুন বলল, “কী বলছেন?”
তিনকড়ি বলল, “ঠিকই বলছি। কাল রাত্রেও ব্যাটা বেরিয়েছিল। কিন্তু আজ রাত্রে একটা হেস্তনেস্ত করব যদি তুমি রাজী থাকো।”
অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “হেস্তনেস্ত! কার সঙ্গে?”
তিনকড়ি অদ্ভুত হাসল, “সেইটেই তো জানি না। আজ রাত্রে তাই খুঁজতে হবে।”
কথা বলতে বলতে তিনকড়ি হঠাৎ এরকম হেঁয়ালি করতে বিরক্ত হল অর্জুন। কিন্তু এই মানুষটি ছাড়া আপাতত তার কোনো গতি নেই, তাও তো ঠিক।
তিনকড়ি উঠল, “একবার স্পটে যেতে হয় আলো থাকতে থাকতে। চমকে উঠল অর্জুন, “স্পটে?”
“নইলে তো রাত্তিরে চতুরের যেটুকু বাকি আছে তাও জানোয়ারের পেটে চলে যাবে। সেটা ঠিক হবে না।
“কিন্তু হাতিরা–।”
“দূর! হাতিরা কি মানুষের মতো এক জায়গায় বসে আড্ডা মারে। এতক্ষণে তারা কোথায় না কোথায় চলে গেছে।”
“আপনি ডেডবডি এখানে নিয়ে আসবেন?”
“একটা কিছু তো করা দরকার। তোমার গিয়ে কাজ নেই। এক দিনেই যা ধকল গেল সারাজীবন মনে রাখবে। এই, তোরা তিনজন আমার সঙ্গে চল, একজন বাবুর সঙ্গে থাক।” নেপালিদের দিকে তাকিয়ে তিনকড়ি হুকুম করল।
অর্জুন দেখল বেচারারা মুখ চাওয়াচায়ি করছে। এই অবেলায় কেউ মার্চ করে আর বিপদের মুখ যেতে চাইছে না। কিন্তু তিনকড়ি ছাড়বার পাত্র নয়। সে বকেঝকে আদর করে তিনজনকে নিয়ে রওনা হয়ে গেল তক্ষুনি।
গাছের মাথায় রোদ উঠে গেছে। একটানা ঝিঁঝির শব্দটা এখন সয়ে গেছে।
অর্জুন মনে মনে সমস্ত ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল। প্রথমত, ডুয়ার্সের সব জঙ্গল থেকেই হাতিরা বেরিয়ে লোকালয়ের ওপর যে হামলা করছে তার দুটো কারণ থাকতে পারে। হয় জঙ্গলে খাদ্যাভাব, নয় তাদের অস্বাভাবিক সংখ্যাবৃদ্ধি। প্রীতম সিং এই অঞ্চলে যে কনট্রাক্ট পেয়েছেন সেটা যদিও হাস্যকর তবু খুঁটিমারি দিয়ে না বেরিয়ে হাসিমারা বা গরুমারা দিয়ে হাতিদের বের হতে কোনো অসুবিধে নেই। অবশ্য যদি না সব অঞ্চলেই একই সঙ্গে হাতি আটকানোর কাজ শুরু হয়। এসব নিয়ে মাথাব্যথা করে অর্জুনের কোনো লাভ নেই, কিন্তু রহস্য হল ওই রাত একটার শব্দটা। ওটা কিসের? ওটা আরম্ভ হলেই হাতিরা দল বেঁধে জঙ্গল ছেড়ে যায় কেন? কাল রাত্রে চতুর এই গভীর জঙ্গলে কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। তাহলে কি এই জঙ্গলে মাঝরাত্তিরে কেউ বা কারা আসা-যাওয়া করে যাদের হাতিরা ভয় পায়? এমনকী পাখিরাও? কারণ এই বিশাল জঙ্গলে কোনো পাখি নেই। অন্য জঙ্গলে কী হচ্ছে কে জানে, কিন্তু এই রেঞ্জে যদি রাত্তিরের রহস্যটি সমাধান করা যায় তাহলে হাতিদের আটকানো যেতে পারে। জঙ্গলে তো বনরক্ষী আছে, বিভিন্ন অঞ্চলে বিট অফিসার আছে, তারা কিছু টের পাচ্ছে না? তারা ওই শব্দটা শুনতে পায় না? অর্জুনের বুদ্ধিতে এর কোনো ব্যাখ্যা মিলল না।
ঠিক সেই সময় একটা হাঁউমাউ চিৎকার শুনে চমকে ঘুরে দাঁড়াতে অর্জুন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। নেপালি ছেলেটি মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে এবং দ্বিতীয় তাঁবুটি ঘিরে আগুনের শিখা উঠছে। অর্জুনের চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলে গেল তাঁবুটা। এক ছুটে নেপালিটির পাশে পৌঁছে তাকে টেনে তুলল অর্জুন। বেচারার জামার কয়েক জায়গায় পোড়া দাগ। চামড়ায় আগুন লাগেনি। বোকার মতো দৌড়াদৌড়ি না করে গড়াগড়ি দিয়েছিল বলে রক্ষে। লোকটাকে ধাতস্থ করতে সময় লাগল। তাঁবুটা ছাই হয়ে গেলেও ভেতরের জিনিসপত্রে তখন সদ্য আগুন লেগেছে। অর্জুন ছেলেটিকে নিয়ে যতটা পারল সেগুলোকে বাঁচাল। আগুন নিভে যাওয়ার পর উৎকট ধোঁয়া বের হচ্ছে। অর্জুন নেপালিটিকে নিয়ে পড়ল। যা জানা গেল তা হল সে নাকি তাঁবুর গায়ে হেলান দিয়ে হাতিদের কথা ভাবছিল এমন সময় পিঠে গরম হলকা লাগে। তারপরেই জ্বলুনি শুরু হতেই সে গড়াগড়ি খায়। তার কাছে বিড়ি নেই অতএব তার আগুন জ্বালানোর প্রশ্নই ওঠে না। দুপুরের রান্নার পর উনুন নিভিয়ে দিয়েছিল তিনকড়ি। সেখানে গিয়ে এক ফোঁটা আগুন দেখতে পেল না অর্জুন। তাহলে তাঁবুতে আগুন লাগল কী করে। ওরা কি দিনদুপুরে লণ্ঠন জ্বালিয়ে গিয়েছিল? উদ্ধার করা লণ্ঠনে হাতে দিয়ে অর্জুন বুঝতে পারল অনেকক্ষণ তাতে আগুন পড়েনি। তাহলে? বাইরের কেউ এসে আগুন দিয়েছে? এই গভীর জঙ্গলে কে আসবে? অর্জুনের শরীর শিরশির করে উঠল। একটু আগে যে কথা ভাবছিল তা কি কেউ টের পেয়ে গেছে? অর্জুন সতর্ক চোখে চারপাশে তাকাল। তারপর পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে পুড়ে যাওয়া তাঁবুর পিছনে পায়ে পায়ে চলে এল। ওকে এই ভঙ্গিতে দেখে নেপালিটিও বোধহয় আন্দাজ করে নিয়ে তার ভোজালির বাঁটে হাত রেখে সতর্ক ভঙ্গিতে অনুসরণ করল। তাঁবুর কিছু পরেই জঙ্গল। কেউ এসেছিল কিনা বোঝার উপায় নেই। ঘাসের ওপর পায়ের ছাপ নেই। এমনকী সামনের জঙ্গলটায়ও মানুষ যাওয়া-আসার কোনো চিহ্ন নেই। অর্জুন আর একটু এগোল। চক্রাকারে অনেকটা ঘুরেও কোনো হদিস পেল না। শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে যখন ফিরে আসছে তখন নেপালিটি একটা বুনো গাছের গোড়াকে ভোজালির এক কোপে কেটে দিল। শেকড় জাতীয় গাছ। অর্জুন বিশেষ লক্ষ করল না।
পোড়া টেন্টের সামনে এসে কিন্তু গা ছমছম করতে লাগল। অর্জুনের মনে হতে লাগল কেউ যেন সারাক্ষণ তাদের লক্ষ করে যাচ্ছে।
সন্ধের আগেই ফিরে এল ওরা। চারজন কয়েকটা বাক্স বয়ে এনেছে। কিন্তু চতুরের শরীর দেখতে পেল না অর্জুন। সে কিছু প্রশ্ন করার আগে তিনকড়ি ছুটে গেল পোড়া তাঁবুর কাছে। তারপর ইশারায় অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করল কী হয়েছে। অর্জুন সংক্ষেপে যতটা পারল ঘটনাটা বলল। তিনকড়ির মুখ এখন শক্ত। তার সঙ্গীরা বিস্মিত। লম্বা লম্বা পা ফেলে তিনকড়ি পোড়া ছাইয়ের মধ্যে চলে গেল। তারপর হঠাৎই হাত বাড়িয়ে একটা গোলাকার দগ্ধ বস্তু তুলে ধরল, “এইটে ছুঁড়ে পুড়িয়েছে।”
অর্জুন দেখল ওটা দড়ির বলের মতো। ততক্ষণে নাকের কাছে তুলে ঘ্রাণ নিয়েছে তিনকড়ি, “পেট্রলে চোবানো ছিল। আশেপাশে কিছু দেখতে পাওনি?”
ঘাড় নাড়ল অর্জুন, “না। আমরা দুজনেই গিয়েছিলাম।” সে নেপালি ছেলেটিকে দেখাল। ছেলেটি তখন ঘাসের ওপর বসে কী একটা জিনিস ঊরুতে ঘষছে। অর্জুন দেখল ঊরুটা অসম্ভব কালো। ওর হলদেটে শরীরের সঙ্গে যা কিনা খুব বেমানান। কথাটা বলেই অর্জুনের খেয়াল হল সে তো এই বলটাকে আগে দেখতে পায়নি, অতএব কিছু তো তার নজরের বাইরেও থাকতে পারে।
অর্জুন বলল, “থাক, এ নিয়ে ভেবে লাভ নেই। চতুরের কী হল!”
তিনকড়ি উত্তর দিল, “আনা যাবে না। একদম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। একটা ঘুঁটের মতো আদল হয়ে গেছে শরীরটা। গাড়ির ভাঙা টিন-ফিন দিয়ে ঢেকেঢুকে এলাম। তারপর একটু থেমে বলল, “তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
“বলুন।”
“এখানে নয়। চলো, ওই গাছটায় উঠে বসি।”
“সে কী! খামোকা গাছে উঠব কেন?” এই রকম হেঁয়ালিতে বিরক্ত হল অর্জুন।
“দেওয়ালের যদি দশটা কান থাকে তো জঙ্গলের একশোটা। ওপরে উঠলে তো শব্দ হাওয়ায় ভেসে যাবে—তাই; ঠিক আছে, তোমার তাঁবুর ভেতরে চলো।”
অর্জুন নেপালিদের বলল, “তোমরা একটু চারদিকে লক্ষ রেখো। খারাপ কিছু মনে হলেই আমাকে ডাকবে।”
তাঁবুতে ঢুকে অর্জুন দেখল তিনকড়ি পকেট থেকে অনেকগুলো লালচে নোট বের করে টেবিলের ওপর রাখছে। ওকে দেখে বলল, “মোট দেড় হাজার টাকা, ব্যাটা তিনশো টাকা মাইনে পেত কিনা সন্দেহ।”
“কোথায় পেলেন এত টাকা?”
“চতুরের পকেটে। বডিটা গেছে কিন্তু জামাকাপড় তো যায়নি? তবে এই টাকাগুলোতে বড্ড রক্ত লেগেছে এই যা।”
“টাকাগুলো ওর কাছে কী করে এল?”
সেইটেই তো ভাবছি। এত টাকা পকেটে নিয়ে কেউ জঙ্গলে বেড়াতে আসে না। তাছাড়া ওর অবস্থা যে ভাল ছিল না সেটা তো আমি জানি। বড় গোলমাল লাগছে হে। লোভ মানুষের বড় শত্রু।”
“তাহলে কেউ নিশ্চয়ই এখানেই টাকা দিয়েছে ওকে।’
“আলবাত।”
“গতরাত্রে ও ছিল না এখানে। আজ আমি ওর হাতে একটা ব্যাণ্ডেজ দেখেছি। আপনি এতগুলো নোট নিয়ে এলেন। আমার মনে হচ্ছে এসব খবর এখনই গয়েরকাটায় জানানো দরকার। চলুন দল বেঁধে রওনা দিই।”
তিনকড়ি ওর মুখের দিকে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। অস্বস্তি হচ্ছিল অর্জুনের। সে জিজ্ঞাসা করল, “কী হল?”
“দূরত্বটা জানো? এই রাত্রে পথ চিনে যেতে পারবে? বারংবার তোমাকে হাতির বাচ্চা বাঁচাতে আসবে না। তাছাড়া, চলে যাওয়া জন্যে তো আমি এখানে আসিনি। ভেবেছিলাম, তোমাকে কিছু জানাব না, কিন্তু এখন আর চেপে রেখে কোনো লাভ নেই।” তারপর আবার মাথা নাড়ল, “না, এখন নয়। সময় এলেই তুমি জানতে পারবে। আজ রাত্রে আমাদের ঘুমুলে চলবে না। এই জঙ্গলের হাতিরা যাতে হুটপাট করে না বের হয় তার ব্যবস্থা আজই করতে হবে।”
কথাগুলো এত রহস্যমাখানো যে অর্জুনের চট করে মুখে কোনো কথা এল না। তারপর সে বলল, “কিন্তু আমরা তো সিংজির চাকরি নিয়ে জঙ্গলে এসেছি। আমাদের যা যা করতে বলা হয়েছে তাই করব। অন্য ব্যাপারে নাক গলিয়ে কী লাভ।”
তিনকড়ি হাসল, “আজ যারা তাঁবু জ্বালিয়েছে তারা যদি রাত্রে তোমাকে পুড়িয়ে মারে? শোনো ভাই, আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে আক্রমণ করা প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। তুমি ভয় পাচ্ছ নাকি?”
রাত্রের খাওয়া খুব নমো নমো করে সারা হল। তিনকড়ি নেপালি চারজনকে কী বুঝিয়েছে সেই জানে। ওরাও দেখা যাচ্ছে বেশ উত্তেজিত। সন্ধের পর থেকেই আজ বেশ ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে আকাশ ছুঁইয়ে। খাওয়া-দাওয়া সেরে ওরা সবাই কিছুক্ষণ অর্জুনের তাঁবুতে বসে ছিল। যদিও সবাই মিলে একসঙ্গে বসে থাকাটা অর্জুনের পছন্দ ছিল না, কিন্তু তিনকড়ি বলেছিল, “না, এখন আর দুশ্চিন্তা নেই। ওটা হবে রাত গভীর হলে।”
বৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে চতুর্দিক থেকে। এতসব পতঙ্গ কিংবা প্রাণী যে ছড়িয়ে ছিল তা গতরাতেও বোঝা যায়নি। তিনকড়ি বলল, “ঈশ্বর খুব সৎ মানুষ।”
অর্জুন চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করল, “হঠাৎ একথা মনে হল কেন?”
“নাহলে বৃষ্টিটা নামত না। বৃষ্টিটা আমাদের অনেক কিছু থেকে আড়াল করবে। তিনি আমাদের পক্ষে আছেন।”
“এই বৃষ্টি মাথায় করে বের হবেন নাকি?”
“আলবাত। এই সুবর্ণসুযোগ ছাড়া যায়?”
রাত বারোটা নাগাদ ওরা তাঁবু ছেড়ে বের হল। তিনকড়ি একটা পলিথিনের প্যাকেটের ভেতর বেশ খানিকটা লবণ নিয়ে নিয়েছে। জল পড়লেই নাকি জোঁক কিলবিল করবে জঙ্গলে। কারো কাছেই বর্ষাতি নেই, অতএব ভিজতে ভিজতে হাঁটা শুরু হল। একটা সিঙ্গল লাইন করে ওরা এগোচ্ছে। অবার আগে তিনকড়ি, তার পরই অর্জুন। তাঁবুটা যেমন ছিল সেই অবস্থায় রেখে আসা হয়েছে। এমনকী হ্যারিকেনটা পর্যন্ত নেভানো হয়নি।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে পা ফেলা খুব মুশকিল। এর মধ্যে তিনবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে যেতে বেঁচে গেছে অর্জুন। অর্জুনের মনে হচ্ছিল আর কোনোদিন সে জলপাইগুড়িতে ফিরে যেতে পারবে না। এই জঙ্গলের আদিম অন্ধকারেই তাকে পড়ে থাকতে হবে আমৃত্যু। হঠাৎ সামনে সড়সড় করে শব্দ হতেই তিনকড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। আর একটু হলেই ওর সঙ্গে ধাক্কা লাগত অর্জুনের। আসবার সময় অর্জুনের টর্চটা হাতিয়েছিল তিনকড়ি। একটু সময় দিয়ে হঠাৎ আলো ফেলল সে। সঙ্গে সঙ্গে শরীরটাকে দুলতে দেখল অর্জুন। একটা বিশাল গোখরো কাঁপতে কাঁপতে ফণা মেলছে। মাটি থেকে অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে ওর শরীর। কুচকুচে কালো মুখটায় আলো পড়ায় বোধহয় বিস্ময়। অর্জুন চকিতে রিভলভার বের করতেই তিনকড়ি ওর হাত চেপে ধরল, “না।”
অর্জুনের খুব রাগ হয়ে গেল। আর দেরি করলেই সাপটা ছোবল বসাবে। ওর পক্ষে তিনকড়িকে আঘাত করাই সবচেয়ে সুবিধের। কিন্তু পলক ফেলার আগেই একটা কাণ্ড হয়ে গেল। অর্জুনের মনে হল কিছু একটা উড়ে গিয়ে সাপটার গলার কাছে আঘাত করতেই সেটা ঝুপ করে মাথা নামাল। আর তারপরেই তড়িৎবেগে ওর পেছনে দাঁড়ানো নেপালি ছেলেটি এগিয়ে গিয়ে সাপের লেজটা ধরে বনবন করে চরকির মতো ঘোরাতে লাগল। তিনকড়ির হাত কাঁপেনি। সে টর্চটা জ্বেলেই রেখেছিল। বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে সাপটাকে একটা গাছের ডালে বেশ কয়েকবার আছাড় মেরে ফেলে দিয়ে নিজের ভোজালিটা কুড়িয়ে নিল ছেলেটি। সাপের প্রায় অনেকটা আগেই উড়ে গিয়েছিল, এখন একটা দড়ির মতো দেখাচ্ছে। অর্জুন দেখল নেপালি ছেলেটি নির্বিকার মুখে ঘাসে ভোজালির রক্ত মুছে নিচ্ছে। এবং তারপরই তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাগল। তিনকড়ি পলিথিনের প্যাকেট থেকে খানিকটা নুন তার পায়ে ঢেলে দিতে একটা টোপা কুলের মতো জোঁক ওর পা থেকে খসে পড়ল। অর্জুনের হাসি পেয়ে গেল। যে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ভয় পায়নি সে একটা জোঁক দেখে কী কাণ্ড করল। যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে চলা শুরু করে চাপা গলায় তিনকড়ি বলল, “গুলি চালালে সমস্ত বন জেনে যেত আমরা এদিকে এসেছি।” এতক্ষণে কারণটা ধরতে পেরে অর্জুন মাথা নাড়ল।
আপাদমস্তক ভিজে শপশপ করছে, মাঝে মাঝে কাঁপুনিও আসছে। তিনকড়ি ফিসফিসিয়ে বলল, “ওঃ, দারুণ রাত।”
দারুণটা কী অর্থে অর্জুন বুঝতে পারল না। বৃষ্টির জন্যে সেটা নিশ্চয়ই আরামদায়ক অর্থে নয়। কিন্তু নেপালি চারজন একটুও প্রতিবাদ করছে না কেন? ওরাও তো সমানে ভিজছে।
ঠিক তখন আওয়াজটা শুরু হল। পায়ের তলার মাটিতে তিরতিরে কাঁপুনি। খুব সজাগ না হলে অবশ্য বোঝা যায় না। তিনকড়ি ইশারায় সবাইকে থামতে বলল। তারপর কান খাড়া করে শব্দটাকে শুনতে লাগল। অর্জুন বুঝতে পারল গতরাতের চেয়ে আজ শব্দটা অনেক স্পষ্ট। অর্থাৎ তারা শব্দ যেখানেই হোক তার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। এই সময় দুদ্দাড় করে জঙ্গল ভাঙার শব্দ ভেসে এল। তিনকড়ি দ্রুত জরিপ করে নিয়ে বলল, “সবাই গাছে উঠে পড়ো জলদি, নইলে প্রাণ যাবে।”
বলা যত সহজ কাজটা করা তত নয়। কারণ গাছগুলো যথেষ্ট মোটা এবং শ্যাওলা বৃষ্টির জলে ভিজে আরো পিছল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তিনকড়ি যখন একটা নিচু ডাল ধরে শরীরটাকে বেঁকিয়ে সামান্য একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওপরে উঠে গেল তখন হতভম্ব হয়ে পড়ল অর্জুন। খুব ভাল জিমন্যাস্টিক না জানলে এ রকম করা যায় না। ডালটায় উঠে হাত বাড়িয়ে অর্জুনকে ওপরে তুলে নিল তিনকড়ি। নেপালিরা অবশ্য এর মধ্যেই হাওয়া হয়ে গেছে। অন্ধকারে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না অর্জুন। তবু তারই মধ্যে সে তিনকড়িকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কে?”
সঙ্গে সঙ্গে তিনকড়ি ওর মুখ চেপে ধরে চাপা গলায় বলল, “চুপ।”
অর্জুন দেখল এক-একটা অন্ধকারের পাহাড় বেশ ব্যস্ত পায়ে ওদের নীচ দিয়ে চলে যাচ্ছে সার দিয়ে। যেন দ্রুত জঙ্গল ছেড়ে চলে যেতে হবে ওদের। এই দলটায় সেই বাচ্চাটাকেও যেন আন্দাজ করতে পারল অর্জুন। চলতে চলতে সে একটু অন্যদিকে মুখ ফেরাতে তার মা শুঁড় দিয়ে লাইনে টেনে আনল। ওরা চলে গেলে তিনকড়ি বলল, “ভাগ্যিস জল পড়ছে আর হাওয়াটা উল্টো দিকে, নইলে—।”
“কিন্তু ওরা তো আজ বের হতে পারবে না।”
“কেন?”
“বাঃ, সারাটা সকাল আমরা ওদের পথে—।”
“তুমি পাগল! সে সব বৃষ্টিতে এতক্ষণে কাদা হয়ে গেছে। সরকারের পয়সা যেভাবে নষ্ট হচ্ছে দেখলে গা জ্বলে যায়।”
কথাটা যে মিথ্যে নয় খানিক বাদেই বুঝতে পারল অর্জুন। কারণ হাতিরা আর ফিরে এল না। তাহলে আজ সকালে যা করা হল তা কোনো কাজেই লাগল না! বিশেষজ্ঞ যিনি, যার মাথায় এটি এসেছিল অথবা প্রীতম সিং কি এই খবরটা জানতেন না?
টুপটাপ করে সবাই গাছ থেকে নেমে পড়ল। নেপালিরাও চলে এল পাশাপাশি। শব্দটা কোনো যন্ত্র থেকে বের হচ্ছে, না এক ধরনের পোকার পাখার ঘষটানি, চট করে ঠাওর করা মুশকিল। তিনকড়ি ওদের নিয়ে এগোল।
.
এইখানে জায়গাটা যেন আরো অন্ধকার। জঙ্গল বেশ গভীর। পায়ে-চলা পথ জঙ্গল একটা রেখেই দেয়, এখানে তাও নেই। তিনকড়ি একটু চিন্তা করল। কিন্তু হঠাৎই আওয়াজটা থেমে গেছে। এবং আশ্চর্য, এখানে ঝিঁঝিরাও ডাকছে না।
আর তখনই তিনকড়ি সজাগ হয়ে গেল। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ ছাপিয়েও যেন কিছু শুনতে পেয়েছে সে। উবু হয়ে বসে কিছু একটা করতেই খুব কাছের ঝোপে কুঁই করে একটা আওয়াজ উঠল আর তারপরেই মাটিতে ছটফট করতে লাগল ভারী কিছু। দু”মুহূর্তের মধ্যে সব শান্ত ওখানে। তিনকড়ি ইশারা করা মাত্র দুটো নেপালি ছেলে সন্তর্পণে ঢুকে গেল ঝোপের মধ্যে। এবং পরক্ষণেই যাকে নিয়ে বেরিয়ে এল তাকে একলা অন্ধকারে দেখলে বাঘ বলেই মনে হত। বিরাট থ্যাবড়া মুখটায় টর্চের আলো ফেলেই নিভিয়ে দিল তিনকড়ি। তারপর কুকুরটার গলা থেকে বকলস খুলে নিয়ে হাসল, “একটা গেল আর ক”টা আছে কে জানে!”
“পোষা কুকুর?”
“হ্যাঁ। বুলডগ। এ অঞ্চলে দেখিনি।”
ঠিক সেই সময় দূরে নাথুয়ার দিকে একটা ভারী শব্দ গড়িয়ে এল। লরি জাতীয় কিছু আসছে। গাড়িটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সিঁথির মতো পিচের রাস্তা দিয়ে ছুটে যেতে যেতে আচমকা থেমে গেল। আর কোনো শব্দ নেই কোনোখানে।
তিনকড়ি আবার সন্তর্পণে ওদের এগোতে বলল। একটু বাদেই একটা শিস বাজল বৃষ্টির শব্দটাকে ছাপিয়ে। প্রথমে খুব স্বাভাবিক স্বর, তারপর একটু বিরক্তি। ওরা ততক্ষণে চারটে গাছের আড়ালে চলে এসেছে। শিসটা এগিয়ে আসছিল। এবং অন্ধকারেও মূর্তিটাকে দেখতে পেল অর্জুন। ওটা যে মানুষের আদল বুঝতে অসুবিধে হয় না।
এবার স্পষ্ট গলা কানে বাজল “টমি! টমি!”
সেই সময় ওপাশের জঙ্গল থেকে তিনটে মানুষ বেরিয়ে এল আচমকা। তাদের একজন এগিয়ে প্রথম লোকটিকে সেলাম করলে সে ইঙ্গিত করল। ওরা তিনজনই লোকটাকে ডিঙিয়ে কয়েক পা যেতেই যেন হঠাৎই চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রথম লোকটি কিন্তু তখনও দাঁড়িয়ে আবার শিস দিচ্ছে। অর্জুন বুঝতে পারল যে কুকুরটাকেই ডাকছে ও।
একটু বাদেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য নজরে এল। লম্বা লম্বা গাছের শরীর মানুষেরা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাইরে। অর্জুন গুনল সংখ্যায় ওরা দশজন হবে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে এই নিয়ে যাওয়া চলল।
এই সময় আর একটি মানুষ যেন দৌড়েই সেখানে উদয় হল, “সাব, উনলোক ভাগ গিয়া।”
“ভাগ গিয়া?” লোকটির গলা থমথমে।
“হাঁ সাব। তাম্বুমে কোই নেহি হ্যায়।”
“চতুর?”
“উও ভি নেহি হ্যায়।”
“মেরা কুত্তা ভি নেহি আতা। জারা ছুঁড়কে দেখো।”
নতুন লোকটা শিস দিতে দিতে জঙ্গলে ঢুকে গেল। তিনকড়ি বলল, “পরের লট বেরিয়ে গেলেই আমরা অ্যাটাক করব।”
সেই মুহূর্তে আবার এক লট কাঠ বেরিয়ে গেল সামনে থেকে। এবার তিনকড়ি ওদের ইশারা করে গুঁড়ি মেরে এগোতে বলল। হাতদশেকের মধ্যে পৌঁছে যেতেই তিনকড়ি চিৎকার করে উঠল “হ্যান্ডস আপ।
চকিতে ঘুরে দাঁড়াল লোকটা। এক লহমায় অর্জুন বুঝতে পারল আপাদমস্তক বর্ষাতি-ঢাকা মানুষটি চমকে উঠেছে। কিন্তু তারপরেই সে পেছনে লাফাল। ততক্ষণে অর্জুনের পাশে দাঁড়ানো নেপালিটি হাতের কাজ সেরে ফেলেছে। লোকটির আর্তনাদ শোনা গেলেও সে যে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে বোঝা গেল। তিনকড়ি লাফিয়ে জায়গাটা ডিঙিয়ে কী একটা জিনিস চেপে ধরে বলল, “অর্জুন, তুমি একজনকে নিয়ে লরিটা আটকাও, আমরা এদিকটা দেখছি।”
অর্জুন দেখল তিনকড়ি প্রাণপণে একটা বন্ধ হয়ে আসা ঢাকনা আটকাবার চেষ্টা করছে। বাকি তিনজন নেপালি ওর সঙ্গে হাত লাগালে অর্জুন চতুর্থ জনকে নিয়ে দৌড়াল যেদিকে কাঠ যাচ্ছিল সেইদিকে।
জঙ্গলটা আমচকা ফুরিয়ে গেল। ওরা দেখতে পেল লরিটাতে কাঠ প্ৰায় বোঝাই। কিন্তু চিৎকারটা শুনেই বোধহয় লোকগুলো হতভম্ব হয়ে গেছে। অর্জুন আর সময় নষ্ট করল না। রিভলভার উঁচিয়ে বলল, “সবাই হাত তুলে দাঁড়াও।
লোকগুলো ভ্যাবাচাকা খেয়ে হাঁউমাউ করে উঠল। কিন্তু ততক্ষণে ড্রাইভার লরিটাকে চালু করে দিয়েছে। গাড়িটা গড়াতেই লোকগুলো তাতে লাফিয়ে উঠতে লাগল।
জীবনে প্রথমবার রিভলবার চালাল অর্জুন। প্রথম গুলিটা কোনদিকে গেল সে নিজেই বুঝতে পারল না। কিন্তু দ্বিতীয়টি ছুঁড়তেই বিকট শব্দ করে গাড়িটা থেমে গেল। তারপর অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল ওরা। লোকগুলো গাড়ি বিকল দেখে লাফিয়ে নেমে চোঁ-চোঁ করে দৌড়াতে লাগল সামনের দিকে। অর্জুনের সঙ্গী বলল, “সাব, উনলোক ভাগতা হ্যায়।”
এরা যে সামান্য কর্মচারী তা বোঝা যায়। অকারণে মানুষ খুন করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না অর্জুনের। ওরা গাড়িটার কাছে গিয়ে বুঝতে পারল টায়ার গেছে। অত ভার না থাকলে হয়তো চলে যেতেও পারত। লোকগুলো ক্রমশ চোখের আড়ালে চলে গেলে পিচের রাস্তা ছেড়ে ওরা আবার জঙ্গলে ফিরে এল। বাইরে থেকে পথ আছে বলে বোঝা যায় না, কিন্তু সামান্য ভেতরে ঢুকলে ঠাওর করতে অসুবিধে হয় না। ওরা যখন নির্দিষ্ট জায়গাটির কাছে চলে এসেছে তখন কুকুর খুঁজতে যাওয়া লোকটিকে দেখতে পেল। বেচারা মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের পায়ের শব্দ পেয়ে ঠাওর করতে চাইল চেনে কিনা। কিন্তু তার আগেই নেপালি ছেলেটি ওকে কব্জা করে ফেলেছে। মাটিতে চিত করে ফেলে তিন-চারবার রদ্দা মারতেই বেচারা অজ্ঞান হয়ে গেল। এবং তারপরই সেই শব্দটা বেজে উঠল।
অর্জুন এবার আর একটু সামনে এগিয়ে যেতেই হতভম্ব হয়ে গেল। মাটির নীচে আলো জ্বলছে। যেন হঠাৎ একটা গহ্বর তৈরি হয়ে গেছে ওখানে। লোকটা এতক্ষণ বোধহয় এইটেই দেখছিল। সঙ্গীকে নিয়ে খুব সতর্কভাবে অর্জুন সেই গর্তে পা রাখল। সিঁড়ির ধাপের মতো জায়গায় পা ফেলে নীচে নেমে আসতেই সে চমকে গেল। যেন বিশাল ঘর সামনে। দুটো বাল্ব জ্বলছে সেখানে। তিরতিরে আওয়াজটা এখন স্পষ্ট। ওটা যে জেনারেটরের বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। ঘরটা কাঠ-বোঝাই। রিভলভার উচিয়ে খানিক এগোতেই স্পষ্ট গলা শুনতে পেল সে, “ওটা নামিয়ে রাখো অর্জুন। আর কোনো ভয় নেই।”
তারপরেই দৃশ্যটা দেখতে পেল। তিনকড়ি একটা চেয়ারে বসে চুরুট খাচ্ছে। তিনজন নেপালি তার সামনে বসা লোকটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে লোকটার হাতে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা হয়ে গেছে। লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল অর্জুন। তার মাথা নীচের দিকে, লোকটা বলল, “আমি এক লক্ষ টাকা দিতে রাজী আছি—প্লিজ —।”
তিনকড়ি উঠে দাঁড়াল। তারপর অর্জুনের কাছে এসে বলল, “তোমার হাতের অস্ত্রটার লাইসেন্স নেই। ওটা সঙ্গে না রাখাই ভাল।” বলে রিভলভারটা নিয়ে বাকি গুলি বের করে পকেটে পুরে রাখল। তারপর হেসে বলল, “যে শব্দটা হত তা ওই জেনারেটরের। মাটির তলায় শব্দ করে হাতিদের ভয় পাইয়ে ইনি জঙ্গলের কাঠ কাটিয়ে এখানে স্টক করতেন। দুটো হাতির দাঁতও দেখতে পেলাম। চমৎকার।”
অর্জুন বিশ্বাস করতে পারছিল না। যার অত টাকা সে এসব করবে কেন? কিন্তু চোখের সামনে যা দেখছে তা তো সত্যি।
তিনকড়ি বলল, “চোরাকাঠের সন্ধানে এসেছিলাম, অ্যাদ্দিনে খোঁজ পেলাম। তুমি অবশ্য মাইনেটা পাবে না অর্জুন, তবে চেষ্টা করব যাতে একটা পুরস্কার সরকার তোমাকে দেয়।”
“হাতি আটকানোর টেন্ডারটা—।”
“সবটাই টোপ। যার লোভ বেশি সেই গেলে। দেখছ তো।”
হঠাৎ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কে!”
তিনকড়ি হাসল। তারপর পকেট থেকে একটা আইডেনন্টিটি কার্ড বের করে সামনে ধরল। অমল সোম, বিশেষ গোয়েন্দা বিভাগ। অমল সোম বললেন, “কাল সকাল অবধি আমাদের অপেক্ষা করতে হবে অর্জুন। হাতিদের ফেরার আগে প্রীতম সিংকে নিয়ে বের হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সকাল ছটায় রেঞ্জারের জিপ আমাদের নিতে আসবে।”
.
গয়েরকাটা থেকে যে গাড়িতে করে অমল সোম প্রীতম সিংকে জলপাইগুড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন অর্জুন সেটাতেই ফিরছিল। আজ সারাটা সকাল খুব ঝামেলা গেছে। গত রাতের পরিশ্রম এবং উত্তেজনার পর এখন খুব শ্রান্ত লাগছে। অমল সোমের কাছে অর্জুন জেনেছে কী দীর্ঘ সময় কত অভিনয় করে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে সুযোগের জন্য। অর্জুন যদি ওঁর সঙ্গে সহযোগিতা না করত তাহলে হয়তো এ-যাত্রায় এই রহস্য ভেদ করা যেত না। তিনি কী করে এতটা জেনেছেন তা বলছিলেন না। শুধু অনবরত অর্জুনের প্রশংসা ওঁর মুখে। রেঞ্জারও নাকি গোড়া থেকে সাহায্য করেছেন।
পুলিশের জিপটা ছুটছিল। তিস্তার ব্রিজ দূরে দেখা যাচ্ছে। যতই হোক মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল অর্জুনের। প্রথম চাকরি করতে এসে কপালে সইল না। টাকাগুলো হাতে পেলে কাজে দিত। যদিও অমল সোম বলেছেন রিওয়ার্ড সে পাবেই, তবু—। হঠাৎ সোজা হয়ে বসল অর্জুন। সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বন্দী প্রীতম সিং এবং অমল সোম। পেছনে চারজন নেপালির সঙ্গে সে। কিন্তু তার নজর সেই নেপালিটির পায়ের দিকে। গত সন্ধ্যায় কত কুচকুচে কালো হয়ে ছিল চামড়াটা, এখন তো তেমন দেখাচ্ছে না। অনেক ফরসা হয়ে এসেছে। সে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল, “ওটা কী হয়েছে?”
ছেলেটি হলুদ দাঁত বের করে হাসল, “কালো হয়ে গিয়েছিল। ওই শেকড় তিনদিন ঘষলেই পরিষ্কার হয়ে যায়।”
অর্জুন উত্তেজিত হল, “তোমার কাছে ওই শেকড় আছে?”
তার ঝোলা থেকে অনেকখানি বের করে সে দেখাল। অর্জুন বলল, “আমাকে কিছু দেবে?”
ছেলেটি ঘাড় কাত করে অনেকটাই অর্জুনকে দিয়ে দিল। এই চারজনই যে অমল সোমের লোক তা পরে জেনেছে অর্জুন।
কিন্তু শেকড়গুলো হাতে নিয়ে থরথর করে উঠল ওর মন। না, আর একটুও দুঃখ নেই চাকরিটার জন্যে। এমনকী প্রতিশ্রুত পুরস্কার না পেলেও তার কিছু যাবে-আসবে না।
এই শেকড় যদি বুড়িদির মুখের দাগগুলো মিলিয়ে দেয় তার চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী সে পেতে পারে? কোথায় যেন সে পড়েছিল, প্রিয়জনকে খুশি দেখার আনন্দ পৃথিবীর কোনো দামে কেনা যায় না।
