।।এক।।
‘রূপমায়া’তে চমৎকার একটা ছবি দেখাচ্ছে। ক্রাইম অ্যাট মিডনাইট।
দুপুরবেলায় আজ অর্জুনের কিছু করার ছিল না। গতকাল সে শেষ ইন্টারভিউ দিয়েছে। প্রতিবার মনে হয়েছে চাকরিটা হয়ে যাবে কিন্তু কখনওই হয়নি। বি.এ. পাশ করে সে এখন সত্যিকারের বেকার। অমল সোম জলপাইগুড়ি শহরে না থাকায় নতুন কোনও কেসও আসছে না। তা ছাড়া অমলদা বেশি কেস নেওয়া পছন্দ করেন না। দিন কুড়ি আগে কালিম্পং থেকে বিষ্টুসাহেব লিখেছিলেন তাঁর শরীর খুব অসুস্থ। রাত্রে ঘুম হয় না, হাঁটলে মাথা ঘোরে। ডাক্তাররা পূর্ণ বিশ্রাম নিতে বলেছেন। চিঠির শেষে বিষ্টু সাহেব লিখেছিলেন, ‘ঈশ্বরের তৈরি এই পৃথিবীতে আমি শুধু শুয়ে থাকব অর্জুন? বাইরে কত কী ঘটছে, কিছুই দেখতে পাব না? আমার যা কিছু সম্পত্তি আছে, তা মাদার টেরেসাকে উইল করে দিয়ে যাব স্থির করেছি। ঈশ্বরের কাজে লাগুক।’ এই চিঠি পেয়ে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ইচ্ছে করেছিল বিষ্টুসাহেবকে কালিম্পংয়ে গিয়ে দেখে আসে। কিন্তু কালিম্পংয়ে যাওয়া-আসায় তো অন্তত তিরিশটা টাকা খরচ। মায়ের কাছে আজকাল টাকা চাইতে লজ্জা করে।
‘রূপমায়া’র সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে হাউসফুল বোর্ডটাকে ঝুলতে দেখল। কিন্তু তখনই কাটা-গদাইয়ের চোখে পড়ে গেল সে। অর্জুনকে দেখে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল সে। জোর করে তাকে সিনেমা দেখাবেই কাটা-গদাই। এই শহরে তার একটা বিশেষ খাতির আছে। শহরের যাঁরা মাথা, তাঁরা স্বীকার করুন বা না করুন, সাধারণ মানুষ তাকে খুব সমীহ করে। কাটা-গদাই এই সিনেমা হলের চত্বরেই থাকে। বোধহয় টিকিট ব্ল্যাকের ব্যাপারেও তার হাত আছে। কিন্তু সে বলল, “তুমি সিনেমা দেখতে এসে ফিরে যাবে এটা জলপাইগুড়ির লজ্জা।”
পয়সা দিয়ে টিকিট নিল অর্জুন। কাটা-গদাই রাজি হচ্ছিল না। সিনেমা হলে বসে অর্জুনের মনে হল, এই একটি কারণেই তার চাকরি হচ্ছে না। সবাই ভাবে ছেলেটা গোয়েন্দাগিরি করে, একে কাজ দিলে কোথা থেকে কী হয়ে যায়! ছবিটা সত্যি ভাল। মুগ্ধ হয়ে দেখল অর্জুন। অপরাধীকে বুঝতে পারা যাচ্ছিল না শেষ দৃশ্য পর্যন্ত। ছবি দেখে বেরিয়ে আসছে ভিড়ের সঙ্গে,
হঠাৎ কানের পাশে ফিসফিসানি শুনল, “তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে।”
মুখ ফিরিয়ে সে কাটা-গদাইকে দেখল। কাটা-গদাই বলল, “এখন নয়, পরে বলব।”
এই শহরে দু’জন গদাই খুব পরিচিত। পোড়া-গদাই আর কাটা-গদাই। সে ছেলেবেলা থেকে ওই নাম দুটো শুনে আসছে। কেন তাদের ওই নামে ডাকা হয়, তা কখনও জানতে চায়নি। কাটা-গদাই তার কাজে চলে গেলে অর্জুন অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিল। ঠিক কী বলতে চায় কাটা-গদাই। ওর সঙ্গে কী কথা থাকতে পারে? একটু আগে দেখা ছবির ডিটেকটিভকে একটা লোক ওইভাবে এসে বলেছিল, কথা আছে। অর্জুন হেসে ফেলল। নিশ্চয়ই কাটা-গদাই ছবিটা দেখেছে।
“এই অর্জুন। একবার এসো।”
ডাকটা শুনে সে বাঁ দিকে তাকাল। চৌধুরী মেডিক্যাল স্টোর্সের রামদা তাকে ডাকছেন। অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ মানুষ। চেহারা দেখলে কিছুদিন আগে সিনেমার নায়ক বলে মনে হত। কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানোমাত্র রামদা বললেন, “একটু আগে এক ভদ্রলোক অমল সোমের খোঁজ করছিলেন। আমি বললাম, উনি শহরে নেই। তবু হদিসটা জেনে নিয়ে চলে গেলেন। খুব জরুরি ব্যাপার বলে মনে হল।”
অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনি ভদ্রলোককে চেনেন?”
“না, না। উনি এই শহরের মানুষ নন। সঙ্গে গাড়ি ছিল। অর্জুন আর দাঁড়াল না। একটা রিকশা। নিয়ে সে হাকিমপাড়ায় যেতে বলল। এখন ভরা বিকেল।
জলপাইগুড়ি শহরে বৃষ্টিটা সবে শেষ হয়েছে। শীত আসতে কয়েক সপ্তাহ দেরি। এই সময় হাঁটতে ভাল লাগে। কিন্তু শহরে অমল সোম নেই জেনেও ভদ্রলোক বাড়িতে গেলেন কেন? অবশ্যই কিছু লিখে যেতে চাইছেন। অথবা এমনও হতে পারে, অমলদার কোনও বন্ধুবান্ধব। অবশ্য এতকাল সেরকম কেউ আসেননি।
দূর থেকেই গাড়িটাকে দেখতে পেল সে। ওর গায়ে যে পরিমাণ ধুলো তাতে বোঝা যাচ্ছে সফরটা কম হয়নি। গেট খুলতেই হাবুকে দেখতে পেল। বাগান পরিষ্কার করছে সে। মুখ ফিরিয়ে অর্জুনকে দেখে মুখে হাসি ফুটল তার। ইঙ্গিতে বাইরের ঘরটা দেখিয়ে দিল। অর্জুন কাঠের সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠতেই চুরুটের গন্ধ পেল। গন্ধটা মোটেই ভাল নয়। আর তারপরেই ভদ্রলোকের মুখোমুখি হল।
বেতের চেয়ারে বসে চুপচাপ চুরুট খাচ্ছেন পঞ্চাশ পার হওয়া মানুষটি। বেশ মোটাসোটা, মাথায় টাক, চোখের তলায় কমলালেবুর কোয়া, পরনে ছাইরঙা স্যুট। অর্জুন ঘরে ঢুকে বলল, “নমস্কার। আপনি অমল সোমকে চাইছেন?”
ভদ্রলোক কোনও উত্তর দিলেন না। তাঁর চোখের দৃষ্টি যেন অর্জুনকে পড়ে নিচ্ছিল।
“অমলদা বাইরে গেছেন।”
“খবরটা আমি শহরেই শুনেছি। এখানে এসে ওই নোটিসটা পড়েছি। আমাকে অশিক্ষিত ভাবার কি খুব কারণ আছে?” মুখের অভিব্যক্তি না পালটে চুরুট খেতে খেতে কথাগুলো বললেন ভদ্রলোক। এবং অর্জুন বুঝতে পারল ইনি সাধারণ নন।
সে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। তারপর শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, “বলুন, আপনাকে কী সাহায্য করতে পারি। আমি অর্জুন। অমল সোমের সহকারী।”
“প্রথমে আমি দুটো প্রশ্ন করব। কোনও গোয়েন্দা তার খবরাখবর দেবার জন্য একটা বোবা লোককে বাড়িতে রাখে কেন?” ভদ্রলোককে খুব উত্তেজিত দেখাল।
অর্জুন হেসে ফেলল, “আমি কিন্তু আপনার নাম জানি না।”
“কোনও দরকার নেই। আমি শুধু একজন কথা বলতে পারে এমন লোকের জন্যে বসেছিলাম। বোবা চাকর রেখে আর যাই হোক গোয়েন্দাগিরি চলে না।”
“প্রথমেই বলে রাখি গোয়েন্দাগিরি আমরা করি না। আমরা সত্যসন্ধানী। হাবু কথা না বলতে পারলেও অমলদা ওকে অতিপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন?”
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ অর্জুনের দিকে তাকালেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “মিস্টার সোম কবে ফিরছেন?”
“জানি না। ওঁর ইচ্ছে হয়েছে সারা দেশটা ঘুরে আসবেন। “মোস্ট আনপ্রফেশনাল! এই জন্যই দেশটার কিছু হল না। তাহলে আমি চলি!”
“আমি বুঝতে পারছি না এত দূর থেকে এসে আপনি চলে যাবেন কেন?”
“কারণ, যাঁর কাছে এসেছিলাম তিনি নেই বলে।” উঠতে চাইলেন ভদ্রলোক।
“কিন্তু রায়গঞ্জ অথবা মালদা থেকে আসতে অনেক সময় লেগেছে আপনার।”
“কী করে বোঝা গেল আমি কোত্থেকে আসছি?” ভদ্রলোক উঠলেন না।
“আপনি ডুয়ার্স থেকে আসছেন না। কারণ ডুয়ার্সের রাস্তাগুলো সুন্দর পিচের, তাতে ধুলো ওড়ে না। দাজিংলিং বা কালিম্পং থেকে নামছেন না। পাহাড়ে ধুলো নেই। কিন্তু আপনার গাড়ির যা অবস্থা তাতে ওই দিক থেকে আসছেন বলে মনে হয়।
“অনুমান মিলল না। অমল সোমও এইরকম অনুমান করেন নাকি। তাহলে আসাটা বৃথাই হল।” ভদ্রলোক আর বসলেন না। দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন, “এই শহরে কোনও ভাল হোটেল আছে? আমি টায়ার্ড।”
“ভাল হোটেল নেই। তিস্তা বাংলোতে ট্রাই করতে পারেন।
অর্জুন ওঁকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। কোনও কথা না বলে গাড়ি ঘুরিয়ে তিনি চলে গেলেন। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছিল। উত্তেজনা নিশ্চয়ই আছে, বোধহয় প্রেশারও ওপরের দিকে। কিন্তু পরিচয়টা দেবার প্রয়োজন মনে করলেন না ভদ্রলোক। হঠাৎ নিজের ওপর তার রাগ হল। আগ বাড়িয়ে বলার কী দরকার ছিল কোত্থেকে আসছেন ভদ্রলোক। অমলদা যেমন ঠিকঠাক বলে দেন তেমন যদি সে বলতে পারত! তা ছাড়া সে নিজে কেস করতে চাইছে অথচ মুখ ফুটে ভদ্রলোককে সে-কথা বলতেও পারল না।
ঝুপঝাপ অন্ধকার নেমে গেল। দূরে শঙ্খ বাজছে। এ-বাড়িতে অবশ্য সে-বালাই নেই। অর্জুন বারান্দায় উঠে এসে দেখল হাবু আলো জ্বেলে দিল। তাকে দেখতে পেয়ে হাবু ওপাশের টেবিল থেকে দুটো খাম এনে সামনে ধরল। ওপরে অমল সোমের নাম লেখা, কোনায় ফ্রম বিষ্টুসাহেব। দ্বিতীয়টার ওপরে তার নাম লেখা। এই বাড়ির ঠিকানায় তার কোনও চিঠি আসে না। খানিকটা অবাক হয়ে সে খামটা খুলতেই অমলদার নামটা দেখতে পেল।
‘স্নেহের অর্জুন, তোমার বাড়ির ঠিকানায় চিঠি না দিয়ে নিজেরটা ব্যবহার করলাম। কারণ, যখনই কাউকে চিঠি লিখি, তখন তার ঠিকানা লিখতে হয়, নিজের ঠিকানায় চিঠি পাঠানোর সুযোগ আজ অবধি পাইনি। অবাক হোয়ো না।
গতকাল বোম্বাইতে এসেছি। একা-একা এই ঘুরে বেড়াতে খুব ভাল লাগছে। চেনা মানুষ যে একেবারেই সামনে আসেনি তা নয়, কিন্তু যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলছি। কবে ফিরব জানি না। হাবুকে টাকা-পয়সা দিয়ে এসেছি। মাঝে-মাঝে নিশ্চয়ই খোঁজ নিচ্ছ। নতুন কোনও কেস পেলে পারো তো কোরো। শুধু দুটো জিনিস মনে রাখবে। কখনও বেশি উৎসাহ দেখাবে না। আর সত্যের সন্ধানে যদি হনলুলুতেও যেতে হয় যাবে।
বিষ্টুসাহেবের জন্য মনটা কিছুদিন থেকেই খারাপ। ভদ্রলোক শেষ পর্যন্ত অথর্ব হয়ে গেলেন। উনি কি কোনও চিঠিপত্র দিয়েছেন তোমাকে? আমার নামে দিলেও তুমি পড়তে পারো। বিষ্টুবাবু আমাকে একটা আমেরিকান লাইটার উপহার দেবেন বলেছিলেন। জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানির। এ-দেশে পাওয়া যায় না। ওঁর এক বোন থাকেন নিউইয়র্কে। তাঁকে লিখেছিলেন পাঠাতে। মানুষটি সত্যি ভাল। ওঁকে হারালে পরমাত্মীয়কে হারাব। শুভেচ্ছা জেনো। অমলদা।’
চিঠির তারিখ পাঁচ দিন আগের। অমলদা কোথায় যাবেন এরপরে, তার কোনও ইঙ্গিত দেননি। মানুষটি হঠাৎ কেন এমন ভবঘুরে হয়ে গেলেন, ভেবে পায় না অর্জুন।
এবার বিষ্টুসাহেবের চিঠিটার দিকে তাকালো। অমলদা যখন অনুমতি দিয়েছেন তখন স্বচ্ছন্দে খোলা যেতে পারে।
“মাননীয়েষু, আশা করি ঈশ্বর আপনাকে সুস্থ রেখেছেন। আমি ভাল নেই। হাঁটতে বড় কষ্ট হয়। কালিম্পংয়ে একা খুব খারাপ লাগছে। তা ছাড়া আপনাদের সঙ্গ দীর্ঘকাল পাইনি। মনে পড়ে, সেই খুনখারাপি থেকে শুরু করে চণ্ডীগড় পর্যন্ত আমরা কত না রোমাঞ্চিত হয়েছি। ভাল বাংলা লিখতে পারি না বলে মার্জনা করবেন। একটি জরুরি ব্যাপার ঘটেছে। আমার যে বোন নিউইয়র্কে থাকে, সে বায়না ধরেছে যে, আমি যেন তার কাছে চলে যাই। সেখানে সে আমার চিকিৎসা করাবে। আমি জানি এই রোগ বার্ধক্যের। কোথাও গেলে সারবে না! কিন্তু বাঁচতে বড় লোভ হয়। এখানকার বাড়িঘর বিক্রি করে দিচ্ছি। মনে হচ্ছে সেখানেই চলে যাই। একা যেতে সাহস হচ্ছে না। আপনি যাবেন? জানি খুব ব্যস্ত মানুষ, কিন্তু এই বৃদ্ধ বন্ধুকে সাহায্য করা কি অসম্ভব? আমাদের পাশপোর্ট-ভিসা-টিকিটের ব্যবস্থা হয়ে যাবে আপনার সম্মতি পেলেই। ইতি, গুণমুগ্ধ বিষ্টুসাহেব।’
মনটা কেমন হয়ে গেল অর্জুনের। ওইরকম হাসিখুশি মানুষটির এই পরিণতি তার একটুও ভাল লাগছিল না। কিন্তু এখন কী হবে? অমলদা কবে ফিরবেন জানা নেই। এই চিঠির খবরটাও তাঁর কাছে পৌঁছে দেবার উপায় নেই। সে ঠিক করল বিষ্টুসাহেবকে বিস্তারিত জানাবে।
রাত হচ্ছিল। হাবুকে ডেকে দরজা বন্ধ করতে বলবে বলে অর্জুন এগোতেই চোখে পড়ল, চেয়ারের নীচে কী একটা পড়েছে। নীল চকচকে জিনিসটা আলো পড়ায় আকর্ষক মনে হচ্ছে। ঝুঁকে সে হাতে নিতে শীতল স্পর্শ এবং গঠনে বুঝল ওটা একটা লাইটার। এই বাড়িতে লাইটার তো এভাবে পড়ে থাকার কথা নয়। মনে পড়ল, এই চেয়ারে বিকেলের আগন্তুক বসে চুরুট খাচ্ছিলেন। সম্ভবত কেন, নিশ্চয়ই, লাইটারটা তাঁর। মানুষটাকে দেখলে মনে হয় না তিনি এত অসতর্ক। সে টেবিলের ওপর লাইটারটা রাখতে গিয়ে পেছনে কয়েকটা অক্ষর দেখতে পেল। একটু কৌতূহলী হয়ে লাইটারটাকে চোখের সামনে ধরতেই স্পষ্ট পড়তে পারল, ‘জোন্স অ্যান্ড জোন্স।’
