চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোল – ৫

।। পাঁচ।।

অমলদা এলেন ট্রেন ছাড়বার দু’মিনিট আগে। বিষ্টুসাহেবকে কুপেতে পাঠিয়ে দিয়ে অর্জুন তখনও কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। শিষ্যদুটিকে দেখা যাচ্ছে না আর। যাত্রীদের ব্যস্ততা হাঁকাহাঁকি বেড়ে গেছে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে যাওয়ায় অর্জুনের অস্বস্তি বাড়ছিল। অমলদা যদি না এসে পৌঁছান! সে দেখল প্রচুর মানুষ তাদের প্রিয়জনদের বিদায় জানাতে এসেছে। ওর খুব মন খারাপ লাগছিল। বুড়িদির ঠিকানা না জানা থাকায় চণ্ডীগড়ে গিয়েও ওঁর সঙ্গে দেখা হবে না। চণ্ডীগড় যখন একটা রাজধানী, তখন নিশ্চয়ই ঠিকানা না জানা থাকলে কাউকে খুঁজে বের করা যাবে না।

অবিরত যাত্রীরা কামরায় ঢুকছিল বলে অর্জুনের সরে সরে দাঁড়াতে হচ্ছিল। অমলদা এসে বললেন, “হাওড়ার ব্রিজে কোনও গাড়ি চলছে না, এত জ্যাম।”

অর্জুনের মনে হল এটা একটা কৈফিয়ত দেবার চেষ্টা, কিন্তু সে কিছু বলল না। অর্জুনদের দু-বার্থের কুপে। তার দরজায় অমলদা দাঁড়ালে বিষ্টু সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, “এই যে এসে গেছেন? ভারী চিন্তা হচ্ছিল। কলকাতায় পা দেবার পর আপনার পাত্তাই পাচ্ছি না। বসুন বসুন।” হাত বাড়িয়ে পাশের জায়গাটা দেখিয়ে দিলেন।

অমলদা আয়েস করে বসতেই ট্রেনটা ছেড়ে দিল। অর্জুন কুপেতে ঢুকে একপাশে চুপচাপ দাঁড়াল। এবং তখনই তার চোখে পড়ল, অমলদার কাঁধে একটা বেশ ভারী ঝোলা ব্যাগ। সেটাকে সন্তর্পণে আসনের ওপর নামিয়ে রেখে তিনি বললেন, “তারপর অর্জুনবাবু, আমরা তা হলে পশ্চিমবাংলা ছাড়াচ্ছি। ওঃ, আজ সারাদিন খুব খাটুনি গেল।”

অর্জুন ঠোঁট কামড়াল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি জানতেন আমরা টিকিট পাব না?”

“অনুমান করেছিলাম। এই ট্রেনটায় খুব ভিড় হয়। আমার ওই পরিচিত বন্ধুকে ফোন করে এই তিনটি টিকিটের জন্যে অনুরোধ করেছিলাম। গিয়ে দেখলাম তোমরা তখনও আছ।” তারপর ঈষৎ থেমে বললেন, “সব ব্যাপারে রহস্য খুঁজতে যাও কেন?”

অর্জুন কোনও উত্তর দিল না। সে রহস্য খুঁজছে না। শুধু অমলদা তার সঙ্গে কেন খোলামেলা হতে চাইছেন না, সেইটেই অনুযোগ। বিষ্টু সাহেব বললেন, “ঠিক আছে। এখন একটু সময় পাওয়া গেল। সীতার ব্যাপারটা নিয়ে কী চিন্তা করলেন?”

“সীতা?” অমলদা খানিকটা অবাক হয়ে তাকালেন।

“ওঃ গড! সীতা, মানে ইউ. এন. রায়ের মেয়ে। যার জন্য আমরা যাচ্ছি।

“ও হো! ওকে নিয়ে কিছু চিন্তা করার দরকার আছে কি? টেলিগ্রামের খবর থেকে চিন্তা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমার টিকিটটা দিন।”

বিষ্টুসাহেব তড়িঘড়ি তিনটে টিকিট বের করে একটিকে বেছে নিয়ে অমলদার হাতে দিতে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর নিজের স্যুটকেসটা তুলে নিয়ে বললেন, “বড্ড ঘুম পাচ্ছে। কাল সকালে দেখা হবে।”

বিষ্টুসাহেব তড়িঘড়ি বললেন, “চললেন? এত তাড়াতাড়ি! রাত্রের খাওয়া দাওয়া…”

“সেরে এসেছি। চলন্ত গাড়িতে ব্যালেন্স রেখে স্যুটকেসটা নিয়ে অমলদা করিডরে বেরিয়ে গেলেন। কুপের দরজায় দাঁড়িয়ে অর্জুন দেখল, ঠিক পরের কুপেটায় অমলদা ঢুকে গেলেন। এবং তারপরই নজরে পড়ল আসনের ওপর ঝোলাটা পড়ে আছে।

বিষ্টুসাহেব বললেন, “তোমার দাদার কী ব্যাপার বলো তো?”

“কেন?”

“এবার যেন বড্ড ছাড়-ছাড় ভাব।”

“গম্ভীর টাইপের লোক তো।” অর্জুন যেন নিজেকেই বোঝাতে চাইল। তারপর কুপের দরজাটা বন্ধ করে আসনে বসে বলল, “এই ট্রেনে একজন সন্ন্যাসী যাচ্ছে। ওই যে যাকে আপনি খুব নমস্কার করলেন তখন।”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ,” বিষ্টুসাহেব উজ্জ্বল হলেন, “উনি কি এই কম্পার্টমেন্টে আছেন?”

‘বোধহয়। লোকটাকে আপনার ভাল লেগেছে?”

“ও ইয়েস। আসলে জানো, আমার সাধু-সন্ন্যাসীর ওপর কোনওকালেই টান ছিল না। কালিম্পংয়ে আমি যে-জীবন যাপন করতাম সেখানে এইসব মানুষের সঙ্গে মিট করার কোনও সুযোগ ছিল না। কিন্তু ওই লোকটার হাসিতে একটা সাবলাইম ব্যাপার আছে। শিশুর মতো সরল। ঠিক আছে?”

“সাবলাইম” শব্দটার অর্থ অর্জুন বুঝতে পারল না। শব্দটা দু’বার উচ্চারণ করে মনে রেখে দিল সে। পরে ডিকশনারিতে দেখে নিতে হবে। বলল, “সত্যিকারের সন্ন্যাসীরা ব্ল্যাকে টিকিট কাটে না।

সঙ্গে-সঙ্গে বিষ্টুসাহেব একটা আঙুল গালে রাখলেন, “সেটা একটা পয়েন্ট।

“তা ছাড়া ওঁর শিষ্যরা সুবিধেজনক নয়। আমার দিকে খুব খারাপ চোখে তাকাচ্ছিল। কোনও ভাল সাধু খারাপ শিষ্য নিয়ে ঘোরে না।

“লোকটা কোথায় যাচ্ছ বলল?”

“কালকায়।”

“কালকা? চণ্ডীগড়ের পরের স্টেশন। ওখান থেকেই সবাই সিমলে যায়। ট্রেনেও যাওয়া যায়, আবার বাসও আছে। কালিম্পংয়ে বাস করি বলে ভেবো না আমি ভারতবর্ষের জিওগ্রাফিটা ভাল জানি না। ঠিক আছে?”

অর্জুন আর কথা বাড়াল না। বিষ্টুসাহেবের সঙ্গে কোনও একটা ব্যাপারে বেশিক্ষণ আলোচনা করা শক্ত। ব্যাপারটা অমলদাকে বলবে নাকি? ওই শিষ্য দুটোকে দেখা অবধি তার কেমন খটকা লেগেছে। ঠিক এইসময় বন্ধ দরজায় আওয়াজ হল। ট্রেনটা এখন ঝড়ের শব্দ তুলে ছুটে চলেছে।

অর্জুন চট করে উঠে দরজা খুলতেই দেখল খাবারের অর্ডার নিতে আসা রেলের লোকটি দাঁড়িয়ে আছে, হাতে নোটবই এবং পেনসিল। মিনিট তিনেক নানান জেরা চালিয়ে বিষ্টুসাহেব চিকেন আর রুটির হুকুম দিলেন দুজনের জন্যে। অর্জুন দরজা বন্ধ করে দিলে বললেন, “ডাক্তার আমাকে মাছ-মাংস একদম নিষেধ করেছিল একসময়। শুধু চিকেন, যত পারো চিকেন খাও। ঠিক আছে?”

তাই যদি হয় তাহলে খামোখা লোকটার সঙ্গে অত কথা বলার কী দরকার ছিল? প্রশ্নটা করতে গিয়ে করল না অর্জুন। বিষ্টুসাহেবকে প্রশ্ন করে কোনও লাভ নেই। এখনই চিকেনের সঙ্গে মাটনের প্রভেদ নিয়ে নানান তত্ত্বমূলক আলোচনা শুনতে হবে।

পোশাক পাল্টাবার জন্যে বিষ্টুসাহেব টয়লেটে গেলে অর্জুন সিগারেট ধরাল। সিগারেটে তার মোটেই নেশা নেই। উনিশ-কুড়ি বছরে কে আর বেশি সিগারেট খায়? কিন্তু সেবার কালিম্পংয়ে যাওয়ার পর থেকে দিনে দু’তিনটে খেয়ে ফেলে। অমলদা কিংবা বিষ্টুসাহেবের সামনে সিগারেট খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। অর্জুন জোরে-জোরে কয়েকটা টান দিয়ে জানলা তুলে প্রায় অর্ধেক সিগারেট বাইরে ফেলে দিল। তারপর অমলদার ফেলে যাওয়া ঝোলাটা খুলল। একটা ছোট্ট কিন্তু ভারী টেপ রেকর্ডার ছাড়া ঝোলায় অন্য কিছু নেই। এই যন্ত্রটি অমলদা জলপাইগুড়ি থেকে নিয়ে আসেননি। অর্জুন দেখল ভেতরে একটা ক্যাসেট রয়েছে। ব্যাপারটা তার মাথায় ঢুকছিল না। হঠাৎ অমলদা এটিকে সঙ্গে নিলেন কেন? আজ কলকাতায় ঘোরাঘুরির নিশ্চয়ই এটাই কারণ। অর্জুন টেপরেকর্ডারটাকে দেওয়া টেবিলের ওপর রাখা মাত্র বিষ্টু সাহেব ফিরে এলেন। পোশাক পাল্টানো হয়েছে। অঙ্গে নৈশবস্ত্র, কাঁধে ছাড়া স্যুট আর হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট, মুখে হাসি, “এটা কী বলো তো?”

অর্জুন না বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল।

“হুঁহুঁ। বিনিপয়সায় পাওয়া গেল। নো দক্ষিণা! ঠিক আছে? কিন্তু এটাকে কোথায় রাখি?”

প্যাকেটটা নিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ইতিউতি তাকাতে লাগলেন তিনি। “কী আছে ওতে?”

“প্ৰসাদ।”

“প্রসাদ?” অর্জুন হাঁ হয়ে গেল, “ট্রেনের কামরায় আপনাকে প্রসাদ দিল কে?”

“সন্ন্যাসী। যে-সে জায়গায় রাখতে পারি না, প্রসাদ বলে কথা।”

“সন্ন্যাসী আপনাকে প্রসাদ দিল?” অর্জুন বিশ্বাস করতে পারছিল না।

“হ্যাঁ। আমি টয়লেট থেকে বেরুচ্ছি আর উনি ঢুকছেন। মুখোমুখি দেখা। কী সুন্দর ধূপের গন্ধ শরীরে। মিষ্টি হেসে কাঁধের ঝোলা থেকে এই প্যাকেটটা বের করে আমায় দিলেন। সন্দেশ আছে, খুলে দেখেছি। খাবে নাকি?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “ওটা আপনিও খাবেন না। উনি কী ভাষায় কথা বললেন?”

“কথা? না না, নো টক। সম্ভবত মৌনী না কী বলে যেন তা-ই?”

“আপনার দেখছি সাধুদের ওপর ভক্তি বেড়ে গেল।”

“মোটেই না। ঠিক আছে? গায়ে পড়ে কেউ সন্দেশ দিলে খাব না কেন? কালিম্পংয়ে এই জিনিসটা মোটেই ভাল পাওয়া যায় না। কিন্তু তুনি নিষেধ করছ কেন?”

“ওই গায়ে পড়ে দেওয়া বলেই। এত লোক থাকতে আপনাকেই বা দিতে যাবে কেন? তা ছাড়া কেউ কি ঝোলা কাঁধে টয়লেটে যায়?”

বিষ্টুসাহেব মাথা নাড়লেন, “ঠিক আছে। থাক।” ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বিষ্টুসাহেব বললেন, “তোমরা গোয়েন্দারা বড্ড সন্দেহবাগীশ।

“গোয়েন্দা বলবেন না, আমরা সত্যসন্ধানী।”

প্রসাদের প্যাকেটের দিকে একটু কাতর চাহনি দিয়ে বিষ্টুসাহেব আরাম করে আসনে বসে টেপরেকর্ডারটাকে দেখতে পেলেন, “আরে, এটি কোত্থেকে এল?”

“অমলদার ঝোলায় ছিল।”

“ব্যাটারি, ক্যাসেট, এসব ওর ভেতরে আছে?”

“মনে হচ্ছে।

“ঠিক আছে, শোনা যাক, কী বলো?”

অর্জুনেরও ইচ্ছে করছিল ক্যাসেসটা শুনতে। দিল্লি-কালকা মেল এখন ঝড়ের বেগে ছুটছে। যদিও ঠাণ্ডা বাতাসের ঢোকার কোনও পথ নেই, তবু একটা কনকনানি পায়ে জমছে। এইসময় রেকর্ডারটা চালিয়ে চাদরের তলায় পা ঢেকে বসতে বেস আরামই লাগবে। অর্জুন স্টার্ট বোতামটায় চাপ দিতেই খুব মৃদু একটা শব্দ বাজল। টুং টাং। তারপর এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার শব্দ হল, টুং টাং। দ্বিতীয়বার সামান্য জোরে। অর্জুন ফিরে এসে আসনে বসে উৎসুক চোখে তাকাল যন্ত্রটির দিকে। তখনই আচমকা কালকা মেলের চাকার শব্দকে ছাপিয়ে একটা আর্তনাদ এমন ভাবে ছড়িয়ে পড়ল যে, বিষ্টুসাহেব চমকে উঠে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন। আর্তনাদটা চড়ায় উঠে অদ্ভুত সুরেলা হয়ে গিয়ে সামান্য খেলা করে আচমকা থেমে গেল। এবং আবার চাকার শব্দটা ছাড়া কোনও আওয়াজই নেই। বিষ্টুসাহেব ফিসফিসিয়ে বললেন, “এ কী হচ্ছে? কোন্ দেশের মিউজিক? পিলে চমকে দিচ্ছে।”

ঠিক তখনই একগাদা যন্ত্র একসঙ্গে বেজে উঠল। কিন্তু কোনওটাই কারও সঙ্গে তাল বা ছন্দ মিলিয়ে বাজছে না। যেন দশটা বুনো মোষকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা যে যার খুশিমতো দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এই সুরের সমষ্টির আওয়াজ এত তীব্র যে কালকা মেলের চাকা হার মেনে গেল। এই পাগলামি চলল কয়েক সেকেন্ড, তার পরেই একটি মেয়েলি গলা ভেসে এল। সুর আছে কি নেই, ঠাওর করার আগেই একটা বেসুরো হাসির দমক ছিটকে আসছে ওই গলা থেকে। বিষ্টুসাহেব চমকে উঠে মুখে হাত দিলেন। তাঁর চোখ গোল হয়ে উঠল। “শুনছ, মেয়েটা কী বলছে? ডেঞ্জারাস!”

সব কথা ঠিক ঠাওর করতে পারছিল না অর্জুন। উচ্চারণ বড্ড জড়ানো। কিন্তু একটু একটু করে সে কথাগুলো ধরতে পারল, “মেকি কথা শুনতে মোটেই চাই না। যেমন, কেমন আছ? যেন আমি খারাপ থাকলে উনি ভাল করে দেবেন। ন্যাকামি দেখলে পিত্তি জ্বলে যায়। আমি চেঁচিয়ে বলতে চাই, কেউ ভাল নেই!” শেষ কথাগুলো বলার সময় আবার আর্ত চিৎকার। চিৎকারের শেষ-উঁচুতে যে সুরের খেলা, তা শুনলে বোঝা যায়, সঙ্গীতে গায়িকার দখল আছে, কিন্তু তৎক্ষণাৎই সেটা ভেঙে চুরমার করে বেসুরোতে শেষ করা হল। আর তারপরেই নানারকম শব্দ এমন জগাখিচুড়ি পাকিয়ে গেল যে, সেটাকে সুর বলা অসম্ভব।

অর্জুন বিষ্টুসাহেবের দিকে তাকাল। এখন তিনি চোখ বন্ধ করে ধ্যানস্থ ভঙ্গিতে বসে আছেন। অর্জুন উঠে রেকর্ডারটা বন্ধ করে দিতেই তিনি প্রসন্ন মুখে বললেন, “সুন্দর। ঠিক আছে!”

“কোনটা সুন্দর?

“ওই যে, ন্যাকামি দেখলে পিত্তি জ্বলে যায়, এই কথাটা। খাঁটি কথা। কিন্তু এ কী ভাষা? এ-ভাষায় গান গাওয়া হয়? কালিম্পংয়ে থেকে এসবের কোনও খবর আমি পেতাম না। ভাই অর্জুন, নিজেকে ভীষণ ব্যাকডেটেড মনে হচ্ছে।”

হঠাৎ অর্জুনের চোখের সামনে অমলদার কাছ থেকে নিয়ে পড়া পা নামক বইটার মলাট ভেসে উঠল। কী মারাত্মক দৃষ্টি ছিল মেয়েটার। যেন পৃথিবীর সব কিছুকে ভেঙে চুরমার করে দিতে চায়। রায়সাহেবের মেয়ে সীতাকে প্রথম যখন সে কালিম্পংয়ে দেখেছিল, তখন ওই ছবির চেহারার সঙ্গে তেমন মিল খুঁজে না পেলেও শেষদিন তো অবিকল এক রকম দেখিয়েছিল। পাঙ্করা আলাদা থাকতে চায়। আমেরিকায় বিভিন্ন ফুটপাথে তারা নিজেদের আলাদা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়। পুরনো সংস্কার বা সংস্কৃতিকে তারা তোয়াক্কা করে না। এই গান সেই পাঙ্কদের নয় তো? অর্জুন মাথা নাড়ল, অবশ্যই। নাহলে অমলদা সারাদিন গা ঢাকা দিয়ে এই ক্যাসেট নিয়ে ফিরবেন কেন? তা হলে কলকাতায় পাঙ্কদের ক্যাসেট এসে গিয়েছে? অর্জুন এবার বুঝতে পারল, তাদের শুনতে দেবার জন্যেই অমলদা এই ঝোলাটা এখানে ফেলে গিয়েছেন।

অর্জুন বিষ্টুসাহেবকে জিজ্ঞাসা করল, “রায়সাহেব যখন মেয়েকে নিয়ে চণ্ডীগড়ে চলে গেলেন, তখন আপনি মেয়েটিকে দেখেছিলেন?”

“হ্যাঁ। আমি তো ওদের সি-অফ করেছিলাম।”

কেমন বিহেভ করেছিল মেয়েটি?”

“খুব ভাল, খুব শান্ত। তোমাদের সেই কাণ্ড হয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছিল। সাহেবটাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ক’দিন অবশ্য খুব পাগলামি করেছিল, কিন্তু তারপর বেশ চুপচাপ হয়ে যায়। পাঙ্কদের মতো বিকট পোশাক পরত না, চুলও রঙ করত না। চুপচাপ লনে বসে থাকত। শেষদিকে আমার সঙ্গে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। ঠিক আছে?”

“কথা বলত আপনার সঙ্গে?”

“হ্যাঁ। আমাকে ইন্ডিয়ান গান শোনাতে বলল। “আপনি গান গাইতেন?”

অবাক হয়ে তাকাল অর্জুন।

এই মুহূর্তে খুব লাজুক দেখাল বিষ্টুসাহেবকে, “ছেলেবেলায় শিখেছিলাম কিছু কিছু। তাই মনে করে-করে। সবই দেশাত্মবোধক গান আর কি।”

“এমন কী পরিস্থিতি হল যাতে রায়সাহেব বাধ্য হলেন কালিম্পং ছাড়তে?” বিষ্টুসাহেব অর্জুনের প্রশ্ন শুনে মাথা নাড়লেন, “কী জানি! সম্ভবত মানুষটা ভয় পাচ্ছিলেন। পাহাড়ি জায়গায় নিরাপত্তা বজায় রাখা শক্ত। তা ছাড়া ওঁরা ছিলেন সানফ্রানসিস্কোতে। সেখানে গরমকালে প্রচুর গরম পড়ে। মিসেস রায় কালিম্পংকে ঠিক নিতে পারছিলেন না। ঠিক আছে?”

“মিসেস রায় কবে এসেছিলেন?”

“এই তো, ওদের চণ্ডীগড়ে যাওয়ার কিছুদিন আগে। যাওয়ার ব্যবস্থা পাকা করে রায়সাহেব আমাকে জানালেন। আমার একটু অভিমান হয়েছিল তখন। গিয়ে অবধি তেমন যোগাযোগ ছিল না। আর তারপর এই টেলিগ্রাম।”

রাত্রে খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে বিষ্টুসাহেব শুয়ে পড়লেন অর্জুনের ঘুম আসছিল না। ওর কেবলই সাধুর মুখ মনে পড়ছিল। অমলদাকে সচেতন করা দরকার। সাধুটা কী উদ্দেশ্যে প্রসাদ পাঠাল? সে বাঙ্ক থেকে নেমে দরজাটা ভেজিয়ে করিডরে দাঁড়াল। বেশ জোরে ছুটছে গাড়ি। ব্যালেন্স রেখে হেঁটে সে পরের কিউবিকলের দরজায় টোকা দিল। তারপর চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল।

অর্জুন ডাকল, ‘অমলদা!”

বড় আলোটা নেভানো। নীল আলোয় দেখা যাচ্ছে যাত্রীরা ঘুমোচ্ছেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সে আবার ফিরে এল নিজেদের কুপেতে। তারপর নিজের বাঙ্কে শুতে গিয়ে টেপরেকর্ডারটাকে দেখতে পেল। গাড়ির মেঝেতে পড়ে আছে। চট করে সেটাকে তুলতেই দেখতে পেলে ক্যাসেটটা নেই।

হতবাক অর্জুন তাকাল বিষ্টুসাহেবের দিকে। মাথা মুড়ে তিনি ঘুমোচ্ছেন, আর তাঁর নাক থেকে বিকট শব্দ বের হচ্ছে।