দ্বিতীয় লাইটার

দ্বিতীয় লাইটার

ইদানীং অমল সোম সারাদিন চুপচাপ থাকেন। বাইরের লোকের সঙ্গে দেখাও করেন না, কাজের প্রসঙ্গ এলে এড়িয়ে চলেন। অর্জুন দেখেছে অমলদার সঙ্গী যে বইগুলো তার সবই ঈশ্বর সম্পর্কিত। ওরকম সচল মানুষ এত চুপচাপ হয়ে যাবেন ভাবা যায় না। সেই জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর লাইটার-রহস্যের পর থেকেই এই ব্যাপার। একটি লাইটারের অস্তিত্ব জানা গিয়েছিল কিন্তু দ্বিতীয়টি কোথায়, কার কাছে, তা কেউ জানে না। অবশ্য যার কাছে আছে সে ছাড়া। এমন লাইটার, যার বোতাম টিপলে অদৃশ্য আগুন বেরিয়ে আসে, যাতে সিগারেট ধরানো যায়, দ্বিতীয়টি টিপলে এমন একটা অদৃশ্য রশ্মি বেরিয়ে আসে যা দশফুটের মধ্যে যে-কোনও জীবন্ত প্রাণীকে অসাড় করে দিতে পারে। প্রথম লাইটারটি পাওয়া এবং হারানোর গল্প যারা ‘আনন্দমেলা’য় পড়েছ তারা জানো ওই লাইটার যারা তৈরি করেছিল, সেই আমেরিকার জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানি কতটা উদগ্রীব হারানো লাইটার ফিরে পেতে। তারা ফেডারেল ব্যুরো অভ ইনভেস্টিগেশনের সাহায্য নিয়েছে কিন্তু দুটো হারানো লাইটার, যা নিয়ে একদল কুচক্রী মানুষ পৃথিবীব্যাপী জাল পাততে চলেছিল তার হদিস করা সম্ভব হয়নি। অর্জুনরা একটি লাইটার পেতে গিয়েও পেল না। সেটি ধ্বংস হয়েছে, কারও কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। এই তথ্যটি অমল সোম ঘটনাটির পর জোন্স অ্যান্ড জোন্সকে জানিয়েছিলেন। তারা তার উত্তরে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল। অধিকন্তু দ্বিতীয় লাইটারটি উদ্ধার করতে সাহায্য চেয়েছিল। এ-বাবদ যা খরচ হবে, তা জোন্ড অ্যান্ড জোন্স বহন করবে এবং সেইসঙ্গে ভাল পুরস্কারের ব্যবস্থাও থাকছে। স্বভাবতই অর্জুন উত্তেজিত। কিন্তু তারপর থেকেই অমল যেন হঠাৎ বৈরাগী হয়ে গেলেন। একদিন অর্জুনকে বললেন, “এসব আর আমার ভাল লাগে না। তুমি তো এখন বেশ ম্যাচিওর। যা কেস আসবে এখন থেকে তুমিই ডিল করবে।”

দ্বিতীয় লাইটারটি কোথায় আছে অর্জুন জানে না। কিন্তু জোন্স অ্যান্ড জোন্স নিউইয়র্ক থেকে প্রায়ই তাগাদা দিচ্ছে। অমলদা চিঠিপত্র লিখেছিলেন অর্জুনের নামে। ওরা তো জানে না অর্জুনের বয়স কত! চিঠিপত্র আসছে অর্জুনের নামেই। ওরা প্রয়োজনে আমেরিকায় যাওয়ার কথা লিখেছে। কারণ এফ. বি. আই. যে দুটো লাইটারের একটাকেও খুঁজে বের করতে পারেনি, অর্জুন তার একটাকে বের করে নিশ্চিন্ত করেছে। সেই কৃতিত্ব তারা স্বীকার করেছে অর্জুন পাশপোর্টের দরখাস্তে করেছিল কিছুদিন আগে বাংলাদেশ বেড়াতে যাবে বলে। সেখানে ন’মাসির দেওর থাকেন এখনও। সেটা হাতে এসেছে। জোন্স অ্যান্ড জোন্স নিউইয়র্ক থেকে জানিয়েছে ভিসা কোনও সমস্যা হবে না।

আমেরিকায় যাওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করতে পারছে না অর্জুন। তোমরা যারা অর্জুনকে জানো, তারা আর-একজনকে তো জানোই, তিনি কালিম্পং-এর বিষ্টুসাহেব। খুব ভাল মানুষ। বয়স হয়েছে, বিয়ে-থা করেননি, কালিম্পংয়ে কুকুর নিয়ে থাকতেন, অর্জুনকে খুব স্নেহ করেন। অমল সোম বয়সে ছোট হলেও শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেন। সেই বিষ্টুসাহেব কিছুদিন ধরে কঠিন অসুখে ভুগছেন। তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ডাক্তাররা রোগ ধরতে পারছে না। বিষ্টুসাহেবের এক বোন থাকেন নিউইয়র্কে। তিনি বারংবার লিখছেন, ওঁকে সেখানে যাওয়ার জন্যে। চিকিৎসা ভাল তো হবেই, জায়গারও পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু বিষ্টুসাহেব একা সেখানে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ছোটখাটো বৃদ্ধ মানুষটি জানিয়েছিলেন, যদি অমল সোম তাঁর সঙ্গী হন, তা হলে তিনি বিদেশে যেতে রাজি আছেন। অমল সোম আর তাঁর দোতলার কাঠের ঘর ছেড়ে নড়বেন এ আশা নেই। জোন্স অ্যান্ড জোন্সের আমন্ত্রণ আর বিষ্টুসাহেবের শরীরের কারণে বিদেশে যাওয়া, গন্তব্যটা যখন এক তখন অর্জুন এক দুপুরে গিয়ে হাজির হল কালিম্পংয়ে।

বাজার ছাড়িয়ে বাঁ দিকে তিব্বতি কারুশিল্পের শো-রুম রেখে অর্জুন হাঁটছিল। এখন তার শরীর পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি লম্বা। ছিপছিপে, সামান্য মেদ নেই। ফর্সা গালে তরুণ রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি যা কিনা এখনও কালচে ভাব ধরেনি। অর্জুন হাঁটছিল খুশি মনে। কালিম্পংয়ের পাহাড়টাকে তার ভাল লাগে। কী শান্ত, আর নীল চাদর মুড়ে চুপচাপ বসে থাকে চারপাশে। রাস্তাটা যাচ্ছে সার্কিট হাউসের দিকে। আরও ছাড়ালে দুরবিন-দাঁড়া। এই পথেই ডান দিকে বিষ্টুসাহেবের কটেজ। কিছু নেপালি মেয়ে বোধহয় স্কুল ফেরত ভর দুপুরেই বাড়ি যাচ্ছে। দু-একজন তিব্বতি গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে। রাস্তাটা যেখানে গুলতির মতো দু’টুকরো হয়েছে সেখানে এসে দাঁড়াতেই সে মানুষটিকে দেখতে পেল। পাহাড়ের শরীরে প্রায় নাক লাগিয়ে কিছু দেখছেন। লম্বায় অন্তত ছয়-দুই, বিশাল চেহারা, নীল জিনসের ওপর সামার জ্যাকেট, মুখে একজঙ্গল কাঁচা-পাকা দাড়ি, মাথায় বারান্দা-দেওয়া নেপালি টুপি, হাতে ছড়ি আর চুরুট। এই লোকটিকে কোথায় যেন দেখেছে বলে মনে হচ্ছিল অর্জুনের। খুব চেনা অথচ ঠাহর করতে পারছিল না। এত মগ্ন হয়ে আছেন যে, বিশ্বচরাচর ওঁর কাছে মুছে গেছে যেন। অর্জুন দাঁড়িয়ে পড়ল। কারণ ভদ্রলোকের হাতের চুরুট তাঁর জ্যাকেটের গায়ে, যে-কোনও মুহূর্তে আগুন ধরতে পারে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ পড়ল অর্জুনের ওপর, “অদ্ভুত! ভাবতে পারিনি এখানে এসে একে দেখতে পাব।” ঘন-ঘন দাড়ি-মুখ নাড়ছিলেন ভদ্রলোক। তারপর ‘উঃ’ বলে চুরুটটাকে ছুঁড়ে দিলেন রাস্তায়। তাঁর হাতে অবশ্যই ছ্যাঁকা লেগেছিল। দাড়িওয়ালা মানুষটাকে মুহূর্তেই ভাল লাগল অর্জুনের। শিশুর সারল্য আচরণে। বড্ড চেনা।

সে হেসে জিজ্ঞেস করল, “কিছু যদি মনে না করেন, কী দেখতে পেলেন জানাবেন?”

“অফকোর্স,” ভদ্রলোক নিজের ছ্যাঁকা-লাগা দুটো আঙুল ঠোঁটের ওপর থেকে সরিয়ে বললেন, “রেয়ার টাইপ অব পপি। সুইজারল্যান্ডেও দেখতে পাইনি। আমার বন্ধু হেনরি ডিমককে বললে এক্ষুনি ছুটে আসবে। কিন্তু বলব না, সারপ্রাইজ দেব। সেবার আইসল্যান্ড থেকে ফিরে ওকে একটা ফসিল দিয়েছিলাম, এবার পপি।”

অর্জুন ফুলটাকে দেখল। এই ধরনের জংলি ফুল পাহাড়ের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে। বিশেষ ভাবে কোনওদিন নজর করেনি সে। এখনও মনে হল না অসাধারণ কিছু। ভদ্রলোক আর কথা বললেন না। গম্ভীর হয়ে পাহাড় দেখতে লাগলেন। যেন কোনও এগজিবিশনে গিয়ে ছবি দেখছেন মন দিয়ে।

বিষ্টুসাহেবকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখবে আশা করেনি সে। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠেই সুন্দর বাগানটার পাশে বারান্দায় নজর যেতেই বিষ্টুসাহেব যেন লাফিয়ে উঠলেন, “আরে অর্জুন! কী আশ্চর্য! তুমি? ভাবাই যায় না। এসো, এসো।”

অসুস্থ মানুষটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আন্তরিক হাসিতে। দুটো হাত বাড়িয়ে ওঠার চেষ্টা করার আগেই অর্জুন সেখানে পৌঁছে গেল, “ব্যস্ত হবেন না, আপনি বসুন। কেমন আছেন?”

“আর আছি। হঠাৎ যে কী হল! এখন তো বারান্দায় বসে তোমার সঙ্গে কথা বলছি, মাসখানেক আগেও বিছানা ছাড়তে পারতাম না। কেমন দেখছ, ঠিক আছে?” শেষ শব্দ দুটো শুনে হাসি পেলেও মাথা নাড়ল অর্জুন। ওটা বিষ্টুসাহেবের মুদ্রাদোষ। দোষ কেন বলে কে জানে! বলল, “একটু রোগা হয়ে গেছেন। ডাক্তাররা কী বলছে?”

“ফালতু! মানুষের শরীরের রোগ ধরতে পারে না যে, সে কিসের ডাক্তার! তিনি কোথায়?”

“কে, অমলদা!” অর্জুন বিষ্টুসাহেবকে অমলদার বৈরাগ্যের কথা জানাল।

শুনে আফসোসের শব্দ উচ্চারিত হল বিষ্টুসাহেবের মুখে, “ছি ছি। অমন প্রতিভা, যাকে বলে পর্বতপ্রমাণ, তাকিয়ে দেখছ কী, শুয়ে-শুয়ে অনেক বাংলা পড়ে ফেলেছি হে, হ্যাঁ, পর্বতপ্রমাণ প্রতিভার কী অপচয়! ছি ছি! আমি তো আজই চিঠি লিখব ভেবেছিলাম। অতবড় লাইটার-অভিযান আমাকে বাদ দিয়ে হল? তোমাদের খুঁটিমারি রেঞ্জ ছাড়া সবক’টাতেই তো আমি আছি! শরীরটা—দেহপট সনে নট সকলি হারায়।”

অবাক থেকে কৌতুকে পৌঁছে গেল অর্জুন, “ওই লাইনটা অভিনেতাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। কিন্তু আপনি লাইটারের কথা জানলেন কী করে? অমলদা কী লিখেছিলেন?”

“তিনি লিখলে কোনও আফসোস থাকত না। আমাকে পড়তে হল কিনা বিদেশি কাগজে!”

“বিদেশি কাগজ?” অর্জুন আরও অবাক।”

“ও ঘরে যাও। ওঠো, হ্যাঁ, বাঁ দিকের টেবিলে ভাঁজ করা আছে। কী কাগজ ওটা? নিউইয়র্ক টাইমস! তার দ্বিতীয় পাতা খোলো। ওপরে কী লেখা?” চেয়ারে বসে বলে যাচ্ছেন তিনি। অর্জুন কাগজটার সামনে দাঁড়িয়ে পুলকিত। বড়-বড় হরফে ছাপা, “ওয়ান মিসিং লাইটার ট্রেসড্ বাই অ্যান ইয়াং ইন্ডিয়ান ইনভেস্টিগেটর। তার নীচে বিস্তারিত বিবরণ। এমনকী অর্জুনের কৃতিত্বে যে এটা সম্ভব হয়েছে তাও লেখা। সমস্ত শরীরে যেন কদম ফুটল অর্জুনের। সাগরপারের একটা কাগজে তার কথা এমনভাবে লেখা হবে তা কল্পনাতেও ছিল না। কাগজটাকে রেখে দিয়ে সে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই বিষ্টুসাহেব তৃপ্তির হাসি হাসলেন, “আই অ্যাম হ্যাপি। আমি তোমাকে কতবার বলেছি, জলপাইগুড়িতে বসে থেকো না, তোমার মধ্যে সম্ভাবনা আছে। ঠিক আছে?”

“আপনি নিউইয়র্ক টাইমস রাখেন?”

“কালিম্পংয়ে ওসব পাওয়া যায়? পাগল! আমার বোনের দেওর এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে। এক নম্বরের পাগল। এর মধ্যে কালিম্পংয়ের সবাই চিনে গেছে। এত জোরে হাসে যে, এই বাগানে পাখিগুলো আর বসতে চায় না। মেজর ছিল। মেজাজেও মিলিটারি। আমারই মতো ব্যাচেলর। একটু আগে ফুল দেখতে বেরিয়ে গেল। কেন, রাস্তায় দ্যাখোনি?” বিষ্টু সাহেব বোধহয় অনেকদিন বাদে অনর্গল কথা বলছেন। কারণ তাঁর মুখে এবার একটু ক্লান্তির ছাপ।

অর্জুন মাথা নাড়ল, “মুখে দাড়ি, হাতে চুরুট।

“ঠিক আছে।”

বলতে-না-বলতে পায়ের শব্দ হল। অর্জুন দেখল, মেজর ফিরছেন। তাঁর কোলে একটা নেড়ি কুকুরের বাচ্চা। মুখে স্নেহ যেন ঝরে পড়ছে। বিষ্টু সাহেব সোজা হয়ে বসলেন, “নো, নো, নেভার। এ-বাড়িতে কুকুর ঢুকবে না। লিলি নেই, ওর পর এ-বাড়িতে আর কুকুর দেখতে চাই না। ঠিক আছে?”

বিশাল চেহারার ভদ্রলোক হঠাৎ জবুথবু হয়ে গেলেন, “অসহায় জীব, রাস্তায় কুঁকড়ে পড়ে ছিল। মনে হচ্ছে এর শরীরে মেক্সিকান ব্লাড আছে। মেক্সিকান উলফের ব্লাড!”

বিষ্টুসাহেব হাঁ হয়ে গেলেন। অর্জুন দেখল, নেড়ি কুকুরটাকে বুকের মধ্যে সন্তর্পণে চেপে ভদ্রলোক কাতর চোখে তাকিয়ে আছেন। এই মুহূর্তে ওঁকে কিছুতেই মেজর বলে মনে হচ্ছে না। বিষ্টুসাহেব বিড়বিড় করলেন, “ নেড়ি কুকুরে মেক্সিকান ব্লাড! আমাকে কুকুর চেনাচ্ছে। নামানো হোক ওটাকে! হ্যাঁ, অ্যাই, তুতু, এত্তা আও, তু তু তু।”

নেড়ি-বাচ্চাটা সুড়সুড় করে এসে বিষ্টুসাহেবের পা চাটতে লাগল। ভদ্রলোক হাত ঝাড়লেন। তাঁর সবকটা দাঁত ঝিলিক দিল দাড়ির ফাঁকে, “ঠিক এক রকম, বুঝলেন! সেবার মেক্সিকোতে গিয়েছি মরুভূমিতে এক ধরনের নেকড়ে দেখতে। হেনরি ছিল সঙ্গে। দেখি, নেকড়ের বাচ্চা। ঠিক এইরকম গায়ের লোম, তাকানোর ভঙ্গি, হেনরির পা চাটল ওই এক ভঙ্গিতে। বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারেনি। মেক্সিকান ফক্স কী করে এদেশে এল তা বুঝতে পারছি

না।”

কুকুরেরা বোধহয় ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। না হলে এই নেড়ি কুকুরটি গুটগুট করে কেন ঘরের ভেতর ঢুকে যাবে? সেইদিকে তাকিয়ে বিটুসাহেব একটি প্রবল নিশ্বাস ত্যাগ করলেন, “ওঃ লিলি, লিলি রে—!”

সামনে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক নাক কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, “লিলি কে?”

বিষ্টুসাহেব বুকে হাত দিলেন, “আমার পাঁজর! ওই যে ওইখানে ওকে শুইয়ে রেখেছি।”

সঙ্গে সঙ্গে যেন ভূমিকম্প হল। ভূমিকম্প শব্দটি মনে করা ছাড়া কোনও উপায় রইল না। কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে হাসির আওয়াজে। একটা পাহাড়ি কাক বসে ছিল গ্রান্ডিফ্লোরার ডালে, ভয় পেয়ে ডানায় শব্দ করে উড়ে গেল। পেটে হাত দিয়ে হাসি থামিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “ওঃ, ভাবতেই পারিনি আপনি আর-একটা কুকুরের শোক করছেন। আপনাকে যেন কোথায় দেখেছি? ওহো, একটু আগেই, তাই না?” শেষ দুটি প্রশ্ন অর্জুনকে। সে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল। বিষ্টুসাহেব বেজার মুখে বললেন, “এই রকম বিতিকিচ্ছিরি হাসিটা একটু নীচের স্কেলে ধরা যায় না? তৃতীয় পাণ্ডব, ইনি হলেন মেজর, মেজর আমার বোনের দেওর। আর মেজর, এ হল তৃতীয় পাণ্ডব। বুঝতে পারা গেল না? নিউইয়র্ক টাইমসে যে তরুণ বঙ্গ-সন্তানটির কথা লেখা হয়েছে, এই হল সেই অর্জুন।”

মেজরের মুখের অভিব্যক্তি দাড়ির কারণে দেখা যায় না বটে, কিন্তু চোখ দুটো যে বিস্মিত এবং পুলকিত হয়ে উঠল, তাতে সন্দেহ নেই। অত্যন্ত গাঢ় গলায় তিনি হাত বাড়িয়ে বললেন, “আই অ্যাম গ্লাড টু মিট ইউ। এত অল্প বয়সে এত বড় কাজ করেছেন, আহা, বড় সুন্দর।”

অর্জুন লজ্জা পাচ্ছিল। প্রসঙ্গ এড়াতে সে জিজ্ঞেস করল, “ আপনি বিষ্টুসাহেবকে ওদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছেন? বাঃ, খুব ভাল। ওঁর চিকিৎসার পরিবর্তন হলে উপকার হবে।”

“শুনুন তা হলে। উনি যাবেন কি না মনস্থির করতে পারছিলেন না। অথচ আপনার স্নেহধন্য এই তরুণ গোয়েন্দাটি বলছে, গেলে আপনার উপকার হবে।” মেজর চুরুট ধরালেন।

অর্জুন প্রতিবাদ করল, “আমি গোয়েন্দা নই সত্যসন্ধানী।”

“কী সন্ধানী? সত্য? মানে ফ্যাক্ট? সন্ধানী মানে যে খোঁজে? তা হলে, তা হলে আমার সঙ্গে তো কোনও প্রভেদ নেই। আমিও সত্য খুঁজি। তবে প্রকৃতির মধ্যে, আর আপনি মানুষের লুকিয়ে রাখা সত্যিটাকে খুঁজে বের করতে চান, দ্যাটস দি ডিফারেন্স। ওকে একটু এনকারেজ করুন তো। মেজর বিষ্টুসাহেবকে দেখালেন।

“আপনি প্রকৃতিতে সত্য খোঁজেন?” অর্জুন কৌতূহলী হচ্ছিল।

“হ্যাঁ। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছি, দিন রাত। কত রহস্য চারধারে। জলের নীচে, জলের ওপরে। মিলিটারি থেকে বিশ্রাম নিয়ে এই করে কাটাচ্ছি। কালিম্পংয়ে এসে আমার হিলারির কথা খুব মনে পড়ছে। লোকটা ইয়েতি খুঁজতে অত ওপরে উঠেও জন্তুটাকে না ধরে ফিরে এল।” খুব বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন মেজর।

বিষ্টুসাহেব প্রতিবাদ করলেন, “জন্তুটার পায়ের ছাপ ইয়েতির কি না তা প্রমাণিত হয়নি।”

হাত তুললেন মেজর। এখন তাঁর চুরুট জ্বলছে, “ঠিক কথা। প্ৰমাণিত হয়নি বলেই ওটা যে ইয়েতির নয় তাও বলা যাচ্ছে না। আই মাস্ট কাম হিয়ার। নেক্সট সামারেই আসব।”

“আপনি অনেক অভিযান করেছেন?” অর্জুন মুগ্ধ হচ্ছিল।

“তেমন কিছু না। আমাজনে তিরিশ দিন ডিঙি নৌকোয় ছিলাম, আল্পসের তুষারঝড়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম পুরো সাতদিন, ওজন কমেছিল বারো কেজি। আইসল্যান্ডে এক ধরনের শ্যাওলা খুঁজতে গিয়ে গ্লেসিয়ারের ওপর তাঁবু করে আছি টের পেতে দু’দিন লেগেছিল। তবে সবচেয়ে মারাত্মক হয়েছিল হার্লেমের একটা নিগ্রো ফ্যামিলির কাছে আফ্রিকায় যাওয়ার নেমন্তন্ন জানাতে গিয়ে। দু’জন নিগ্রোর সঙ্গে অলওয়েট বক্সিং-এ তিনটে পাঁজর ভেঙেছিল। আমি কোনও অন্যায় সহ্য করতে পারি না। নো, নেভার। আপনার শরীর কেমন আছে?” ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন মেজর।

“আছি আর কি,” বিষ্টুসাহেব বিরস গলায় বললেন।

“ওয়েল। দেন উই উইল স্টার্ট টুমরো। ঘোষণা করলেন মেজর।

“না। মনে হচ্ছে শরীর এখানেই সেরে উঠছে।” প্রতিবাদ জানালেন বিষ্টু সাহেব।”

‘নো! NAWH, NINE, NOH, NAY, NAI!” চিৎকার করে উঠলেন মেজর।

“মানে?” বিষ্টুসাহেব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।

“এগুলো সবই ‘না’। ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ইটালিয়ান, স্প্যানিশ, ডাচ ইত্যাদি ভাষায়। আন্তর্জাতিক ভাষায় প্রতিবাদ করলাম। অন্যায় করছেন এখানে পড়ে থেকে। অন্যায় আমি সহ্য করতে পারি না। আপনাকে যেতেই হবে। আপনি কী বলেন?” মেজর অর্জুনের দিকে তাকালেন।

অর্জুন মাথা নাড়ল, “বিষ্টুসাহেব, আপনি চলুন। আমাকে জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানি আমন্ত্রণ করেছে আমেরিকায় যাওয়ার জন্য। আপনি গেলে আমি যাব।”

সঙ্গে সঙ্গে উৎফুল্ল হলেন বিষ্টুসাহেব, “তুমি যাবে? বাঃ। তা হলে আমি রাজি। ঠিক আছে?”

অর্জুন দেখল মেজরের মুখ তখনও গম্ভীর। সে বলল, “আপনি আমাকে ‘আপনি বলবেন না। কত ছোট আপনার চেয়ে আমি।”

মেজর ঘরের দিকে পা চালাতে চালাতে বললেন, “ঠিক আছে। TANK BRAH.”

বিষ্টুসাহেব তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করলেন, “এটা আবার কোন্ দেশের ভাষা?” ঘরে ঢোকার আগে মেজর বললেন, “এটা সুইডিশ ভাষা। মানে ভেরি ওয়েল।”

.

দিল্লির হোটেলে ওরা পৌঁছেছিল মধ্যরাত্রে। এগারোটাকে তো মধ্যরাতই বলা যায়। অথচ ভোর চারটের সময় এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে। উত্তেজনায় অর্জুনের ঘুমের প্রশ্নই ছিল না। এই প্রথম সে বিদেশে যাচ্ছে। এর আগে জলপাইগুড়ির বাইরে বলতে গিয়েছিল চণ্ডীগড়ে। সেবার সঙ্গে ছিলেন অমলদা। এবার একদম অজানা বিদেশে পা বাড়ানো। আসবার পথে কলকাতায় কয়েকটা দিন কাটাতে হয়েছিল। বিষ্টুসাহেবের ভিসা টিকিট মেজর ব্যবস্থা করেছিলেন। প্যান-অ্যাম এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানি অর্জুনের যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিল। দিল্লিতে আসার পর তার কেবলই মনে হচ্ছিল একটাও ভাল জামা-কাপড় নেই। স্যুট তো দূরের কথা, বুড়িদির বুনে দেওয়া সোয়েটারটাই সম্বল। তার কাছে টাকাপয়সা নেই যে কিছু কিনবে। তা ছাড়া বিদেশে টাকার মূল্য নেই, সেখানে চাই ডলার। একটা ডলারের বিনিময়-মূল্য ভারতীয় মুদ্রায় বারো টাকা সাতাশ পয়সা। শোনার পর থেকেই অর্জুনের মনে হচ্ছিল ভাতবর্ষের চেয়ে বারো গুণ বেশি ধনী দেশে সে যাচ্ছে পকেট শূন্য রেখে। অবশ্য বিষ্টুসাহেব ভরসা দিয়ে যাচ্ছেন। জোন্স অ্যান্ড জোন্স যদি আমন্ত্রণ না জানাত তাতে কিছু যেত না, তাঁর ইচ্ছে ছিল অমল সোম সঙ্গে যাবে। তা অমল সোমের বদলে না হয় অর্জুন যাচ্ছে। অতএব কেউ কিছু দায়িত্ব না নিলে বিষ্টুসাহেবের বোন তো আছে। ভারী আদরের বোন তাঁর।

মেজর কিন্তু খুব মেজাজে আছেন। তিনি বলেছেন আমেরিকায় পোশাক নিয়ে কেউ মাথাই থামায় না। টাই-পরা লোক রাস্তাঘাটে চোখেই পড়বে না। শীত এড়াবার জন্য জ্যাকেট থাকলেই হল। প্রয়োজনে সেসব ব্যবস্থা হবে। মেজরকে খুব ভাল লাগছে অর্জুনের। যতই হম্বিতম্বি করুন, মনটা খুব সরল। ওঁর দিকে তাকালেই চেনা মনে হয়। কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছে না বলে একটা অস্বস্তি আছে। মেজরের কাছে পৃথিবীটা যেন হাতের চেটো।

ভোরবেলায় দিল্লিতে বেশ ঠাণ্ডা থাকে। পকেটে যা ছিল মেজরের পরামর্শে কিছু খুচরো ডলার কিনল অর্জুন কাস্টমস এনক্লোজারে ঢোকার আগে। ডলার দেখতে টাকার মতনই। তবে বেশ বড়সড়। সে কত ডলার নিয়ে যাচ্ছে তা আবার পাসপোর্টে লিখে দেওয়া হল। খবরের কাগজে পড়েছিল যখন কেউ এয়ারপোর্ট দিয়ে বিদেশে যাওয়া-আসা করে তখন তাকে সার্চ করা হয়। কিন্তু তাদের কিছুই করা হল না। বিপদে পড়লেন মেজর। তাঁর ব্যাগের মধ্যে সেলোফেন প্যাকেটে একগাদা ফুল পেলেন অফিসাররা। এই ফুল থেকে কোনও মাদক তৈরি হয় কি না তাই নিয়ে যখন বিস্তর আলোচনা চলছে এবং মেজর ফুলগুলো বিরল ধরনের পপি বলেও বোঝাতে পারছেন না তাঁদের, তখন তিনি ক্ষিপ্ত হলেন। অনর্গল তাঁর মুখ থেকে অচেনা শব্দ বেরোতে লাগল। কাস্টমসের লোকেরা এত তাজ্জব যে, তাঁরা যেন ছেড়ে দিয়ে স্বস্তি পেলেন। প্লেনে বসেও মেজরের রাগ পড়ছিল না। এয়ারহোস্টেস যখন তাঁকে ‘যাত্রা শুভ হোক’ বলে নমস্কার জানালেন, তখন তিনি গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “ট্যাক।’

অর্জুন বসেছিল জানলার ধারে, মাঝখানে মেজর, প্যাসেজের ধারে বিষ্টুসাহেব। খুব বিনীত ভঙ্গিতে অর্জুন জিজ্ঞেস করেছিল, “কথাটার মানে কী? জ-ফলা না থাকলে বাংলা শোনাত।”

মেজর চুরুট ধরাতে গিয়ে থেমে গেলেন। ওপরে ‘নো স্মোকিং’ লেখা আছে তখনও। বললেন, “শব্দটা ড্যানিশ। মানে হল ধন্যবাদ। চুরুট ধরাবার আগে আমার সঙ্গে কথা বোলো না।’

প্লেনের ভেতরটা বিশাল। সামনের দিকটায় বোধহয় বেশি দামের টিকিট। সুন্দরী এয়ারহোস্টেসরা সবাই বোধহয় আমেরিকান। প্লেনটা তো ওই দেশের। কেনও আসল খালি নেই। এত লোক প্রতিদিন বিদেশে যায়? ভোর হচ্ছিল বাইরে। জানলা দিয়ে অন্ধকার মুছতে দেখল অর্জুন। নীচে, অনেক নীচে ভারতবর্ষ পড়ে রয়েছে। আকাশের কি কোনও নাম আছে? কিন্তু কী আশ্চর্য! প্লেনটা ঘণ্টাখানেক বাদে যখন করাচিতে থামল, তখন অন্ধকার যায়-যায়। এতক্ষণে তো রোদ ওঠার কথা। মাইকে স্থানীয় সময় যা বলল, তা ভারতীয় ঘড়ির সঙ্গে মিলছে না। অর্জুনের খুব মজা লাগছিল। তারা বোধহয় সূর্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। এইভাবে গেলে কখনওই কি ভোর হবে। জানলা দিয়ে এয়ারপোর্টটাকে দেখল অর্জুন। এই হল পাকিস্তান। মানুষজন যারা উঠল, ঘরবাড়ি যা দেখা গেল, ভারতবর্ষের সঙ্গে তো কোনও পার্থক্যই ধরা পড়ছে না।

মেজরের রাগ যে তখনও কমেনি টের পাওয়া গেল, যখন এয়ারহোস্টেস এসে ব্রেকফার্স্ট সার্ভ করে গেলেন। মেজর চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, NOH HUEVOS FRITOS।’ এয়ারহোস্টেস চোখ বড় করে হাসলেন। তারপর ট্রলির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, “MWEE BYEN, TORTA?’’ মেজর ঘাড় নাড়তে তাঁর প্লেটে একটি কেক পড়ল। আরও কিছুক্ষণ সেই অবোধ্য বাক্যবিনিময় করে এয়ারহোস্টেস এগিয়ে গেলেন। অর্জুন লক্ষ করল মেজরের মুখে প্রশান্তি ফিরে এসেছে। বিষ্টুসাহেব খাবার মুখে নিয়ে অর্জুনকে বললেন, “ইতালিয়ান! কেকের ইতালিয়ান কী বলব?”

কে বলেছে ওটা ইটালিয়ান?” শব্দটা এত জোরে মুখ থেকে বের হল যে, বেশ কয়েকটা খাবারের টুকরো তার সঙ্গী হল। কাগজের রুমালে নিজের শরীর যে পরিষ্কার করছেন বিষ্টুসাহেব, তা অর্জুন দেখল, কিন্তু লক্ষই করলেন না মেজর। এক নিশ্বাসে বলে যাচ্ছেন, “না জেনে মন্তব্য করা আমি দু’চক্ষে পছন্দ করি না। এই মেয়েটাকে দেখে মনে হল ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলে বাড়ি। আমি স্প্যানিশে বললাম ডিমভাজা খাব না। ওখানকার মানুষ স্প্যানিশ একটু-আধটু জানে। তা আমায় বলল, কেক খাও। আর আপনি বলছেন ওটা ইতালিয়ান?”

বিষ্টুসাহেব নীরবে প্লেট পরিষ্কার করলেন। দিল্লিতে আসার পর থেকেই ওঁর শরীর যেন চনমনে হয়ে উঠছিল। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কেক শব্দটির স্প্যানিশ কী?”

মেজর বললেন, “TORTA।”

পাশ দিয়ে একজন এয়ারহোস্টেস ফিরছিলেন, বিষ্টুসাহেব তাঁর দিকে একটা আঙুল তুলে বললেন, “TORTA!”

লাইটার-রহস্যের অর্ধেক সমাধানের পর থেকে অস্বস্তিটা রয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর কোনও এক কোনায় এখন একটি লাইটার রয়ে গেছে, যা নিয়ে শুধু জাল অথবা চোরাকারবারিরা তৎপর নয়, ওই মারাত্মক ক্ষমতাবান লাইটারটির গঠন-কৌশল জেনে গেলে সারা পৃথিবীর পক্ষে বিপদ হতে পারে। একটা নিরীহ দেখতে লাইটারের দ্বিতীয় বোতাম টিপলে অদৃশ্য রশ্মি দশ ফুট বেরিয়ে এসে যে-কোনও মানুষকে অবশ করে ফেলতে পারে। আশেপাশে দাঁড়িয়েও কেউ সেটা বুঝতে পারবে না। ওই বস্তুটির নকল করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এখন পর্যন্ত কিন্তু অদৃশ্য রশ্মির ব্যবস্থা না করতে পেরে ওরা মিনি গ্রেনেড ঢোকাতে পেরেছে ওই ছোট লাইটারের খোলে।

প্রস্তুতকারক জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানি খুব বিব্রত। আমেরিকান সরকার তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। কেন দুটো লাইটার সতর্কতা সত্ত্বেও হারিয়ে গেল! একটি বিনষ্ট হয়েছে খবর পেয়েও তাদের স্বস্তি নেই। অর্জুন এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেও কোনও কূল পায়নি। তবে জালিয়াতরা হংকং, থাইল্যান্ড থেকে নেপাল হয়ে তরাই-ভুটান অঞ্চলে যে কাজকর্ম চালাতে চেয়েছিল, তা ওই ঘটনার পর ভেস্তে গিয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর আর কোনও অঞ্চলে যে এই মুহূর্তে কাজ শুরু হয়নি, তা কে বলতে পারে!

প্যান-অ্যাম-এর এই প্লেন এবার থামবে ফ্রাঙ্কফুর্টে। এর মধ্যে দু-দুটো সিনেমা দেখতে পেয়েছে ওরা। দুটোই জেমস বন্ডের ছবি। বিষ্টুসাহেব আর অৰ্জুনই ছবি দেখল। মেজর নাক ডাকিয়ে ঘুমোলেন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। খুব সুখী মানুষই ওভাবে চটপট নাক ডেকে ঘুমোতে পারে। ফ্রাঙ্কফুর্ট যখন এল তখন স্থানীয় সময় আর ওদের ঘড়ির সময়ে অনেক তফাত। মালপত্র সব প্লেনেই থাকবে, ওদের শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য এয়ারপোর্টের ট্রানজিট লাউঞ্জে থাকতে হবে। কারণ এই সময়ে প্লেনের ঝাড়পৌঁছ, তেল ভরার কাজ সেরে নেওয়া হবে।

প্লেনের দরজা দিয়েই এয়ারপোর্ট বিল্ডিং-এর দোতলায় চলে এল ওরা লাইন করে। এরকম ব্যবস্থা দমদম কিংবা দিল্লিতে দ্যাখেনি অর্জুন। মাটিতে পা পর্যন্ত দিতে হল না। ওর মনে হল, বৈধ ভিসা ছাড়া যাতে বিদেশিরা ওদের দেশের মাটিতে পা রাখতে না পারে তাই জার্মানরা এই ব্যবস্থা করেছে। যাই হোক, তবু তো সে জার্মানিতে এল। বিষ্টুসাহেব প্রথমেই উচ্চারণ করলেন, “হিটলারের দেশ হে!”

মেজর সঙ্গে-সঙ্গে চটে গেলেন, “NINE, BIT – TUH জার্মান মানেই হিটলার? আশ্চর্য!”

দাড়িতে হাত বুলিয়ে বোধহয় সংযত করলেন তিনি নিজেকে। তারপর গড়গড় করে অন্তত দশ-বারো জন জার্মানের নাম আওড়ে গেলেন। যাঁরা প্রত্যেকেই স্মরণীয় মানুষ। বিষ্টুসাহেব বললেন, “লোকটার কথাই মনে পড়ল আগে, কেন? আশ্চর্য!”

কিন্তু এই জায়গাটা তো পৃথিবীর যে-কোনও দেশের হতে পারে। অন্তত তিন ফার্লং লম্বা ঝকঝকে প্যাসেজের দু’পাশে আলো-ঝলমল দোকান এবং অফিসঘর। প্রতিটি দোকানের জিনিসপত্র শুল্কবিহীন। অর্জুন বিস্মিত হয়ে শেষ প্রান্তে চলে এল হাঁটতে-হাঁটতে। বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ট্রানজিট প্যাসেঞ্জাররা প্যাসেজের মাঝে-মাঝে-রাখা চেয়ারে বিশ্রাম নিচ্ছেন। মেজর বললেন, “এখানে আমার এক বন্ধু আছে। আপনারা কেউ যাবেন আমার সঙ্গে?”

বিষ্টুসাহেব মাথা নাড়লেন, “উঁহু। আমি এই চেয়ারে বসে মানুষ দেখব। জার্মানিতে এসে একটাও জার্মান দেখতে পাচ্ছি না! তোমরা বরং ঘুরে এসো।”

অর্জুন মেজরের সঙ্গী হল। মেজর বললেন, “ওরা এই এয়ারপোর্টের বাইরে যেতে দেবে না আমাদের। ভিসা থাকলে দিত। ফ্রাঙ্কফুর্টের বিখ্যাত জিনিস হল এর অপেরা। আমি SACHESENHAUSEN – এ অপেরা দেখেছি। দ্বিতীয় বিখ্যাত বস্তু হল আপেলের তৈরি মদ। ওদের জাতীয় মদ। আহা, অমৃত।” একটি দোকানে ঢুকে মেজর একটা হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে বললেন, “GOO-TEN-TAHK!”

টাকমাথা লোকটার মুখ উজ্জ্বল হল। তিনিও হাত তুললেন,

“GOO-TEN-THAK! VEE GAYTESS EE – NEN! বলে করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন। মেজর হাতটা ধরে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন,

“ZAYRGOOT!”

শব্দগুলোর একবর্ণ বুঝতে পারছিল না অর্জুন। মেজর আরও কিছুটা শব্দ খরচ করার পর লোকটি অর্জুনের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বললেন, “ওয়েলকাম, ওয়েলকাম। এত অল্প বয়সে আপনি এত প্রতিভাবান, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গর্বিত হচ্ছি।”

এই সময় আর-একজন খদ্দের দোকানে ঢুকে কাউন্টারে দাঁড়াতে টাকমাথা ভদ্রলোক, “EN-SHOOL-DIGEN-ZEE” বলে ছুটে গেলেন তাঁর কাছে। লোকটার পরনে চমৎকার স্যুট, চোখে চশমা, বয়স তিরিশের সামান্য ওপরে। যা নেবেন সেটা জানিয়ে ভদ্রলোক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে অলস ভঙ্গিতে একটা সিগারেট নিয়ে ওদের দিকে তাকালেন। অর্জুন চোখ ফিরিয়ে নিল। টাকমাথা ফিরে এলে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন সিগারেট না ধরিয়ে। এমন হতে পারে তিনি লাইটার কিনতে এসে না পেয়ে ফিরে গেলেন। কিন্তু পাশের টেবিলের ওপর স্তূপ করা দেশলাই রয়েছে। জলপাইগুড়িতে যেসব দেশলাই দেখেছে সেরকম নয়। বাক্সের বদলে পাতার মধ্যে আটকানো কাঠি। লোকটা তো এই একটাতে সিগারেট ধরাতে পারত। মেজর ততক্ষণে বন্ধুর সঙ্গে গল্প শুরু করেছিলেন। অর্জুন চটপট বাইরে বেরিয়ে এল। অন্তত আট-দশটি প্লেনের যাত্রীরা ট্রানজিট লাউঞ্জে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতিটি মানুষই যথেষ্ট ধনী, অর্জুনের মনে হল, এখানে কোনও গরিব নেই। অন্তত পোশাক এবং আচরণে। লোকটি হাঁটছিল অত্যন্ত অলস ভঙ্গিতে। তার ডান হাতে সিগারেটটি ধরা, তাতে এখনও আগুন পড়েনি। প্যাসেজের পাশে রাখা চেয়ারগুলিতে অনেকে বসে। তাদের একজন লোকটিকে দেখে উঠে দাঁড়াল। ওর বয়স বেশি। দু’জনেই বিদেশি। দেখে কোন্ দেশের তা অর্জুনের পক্ষে ঠাওর করা সম্ভব নয়। কিন্তু দ্বিতীয় লোকটিকে বোঝা যায়। ওর তাকানো, শরীর বলে দেয় সহজ পথের মানুষ নয়। তা ছাড়া লোকটার কাঁধে বেশ ভারী ব্যাগ ঝুলছে। টুকিটাকি ছাড়া সবাই জিনিসপত্র প্লেনেই রেখে এসেছে। অত বড় ভারী ব্যাগ লোকটি বইছে কেন?

ওরা কী কথা বলছে তা বোঝা এতদূর থেকে অসম্ভব। দু-তিনজনের ইংরেজি এর মধ্যে কানে এসেছিল, যার উচ্চারণ এমন যে, চেনা শব্দও অচেনা হয়ে যায়। লোক দুটো এখন পাশাপাশি হাঁটছে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে-বলতে। দু’পাশের দোকান বা জনতার দিকে আর মন দিচ্ছে না। অর্জুনের মনে হল, যদি ও লাইটার কিনতে যেত তা হলে না পেয়ে অন্য দোকানে খোঁজ করত। লাইটার ছাড়া অন্য কিছু হলেও তো এইটে সঙ্গত ছিল। কিন্তু সে কেন ওই লোক দুটোকে অনুসরণ করছে?

অর্জুন দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর মেজরের জন্য পিছন ফিরল। কিন্তু কী আশ্চর্য, সব দোকান যে এক রকম দেখাচ্ছে! দোকানের গায়ে যে নাম লেখা, তা ইংরেজিতে নয়। প্রতিটি দোকান তন্নতন্ন করে খুঁজে সে সেই দোকান বা মেজরকে দেখতে পেল না। এমনকী বিষ্টুসাহেব যে চেয়ারটায় বসেছিলেন সেটাও নজরে আসছে না। মাইকে কিন্তু অনবরত ঘোষণা করছে, কখন কোন্ প্লেন ছাড়বে। যাত্রীদের সেইভাবে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাউন্টারের দিকে এগোতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। আচমকা অর্জুনের শরীরে যেন বরফের স্পর্শ লাগল। তার পাসপোর্ট-টিকিট বিষ্টুসাহেবের কাছে রাখা। যদি ওরা তাকে না পেয়ে প্লেনে উঠে পড়ে তা হলে সে কী করবে? ঠিক তখনই নজরে পড়ল বিষ্টুসাহেব টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসছেন।

প্রাণ ফিরে পাওয়ার মতো আনন্দে ছুটে গেল কাছে, “মেজর কোথায়?”

তোমরা তো একসঙ্গে গেলে। কেন, সে হারিয়ে গেছে নাকি?”

“না, আমরা একটু আলাদা হয়ে পড়েছিলাম, তারপর আর খুঁজে পাচ্ছি না।”

“অ। কোথায় আর যাবে! যে মরুভূমিতে খ্যাঁকশেয়াল খোঁজে, সে ঠিক আমাদের খুঁজে বের করবে। ঠিক আছে? এদের টয়লেটে গেছ? মাথা ঘুরে যায়। কী আধুনিক কায়দা। এসো, এখানে বসি। আমি তখন থেকে বিখ্যাত জার্মানদের নাম ভেবে যাচ্ছি। কিন্তু হিটলার এমন জায়গা দখল করে বসে আছেন যে, হিমলার-টিমলার ছাড়া আর কারও নাম মনে পড়ছে না। তুমি দু-একটা নাম মনে করিয়ে দাও তো!” বিষ্টুসাহেব চোখ বন্ধ করলেন।

অর্জুন হাসল, “বেকেনবাওয়ার, বিখ্যাত ফুটবলার! ম্যাক্সমুলার।”

“হ্যাঁ, হাঁ, হ্যাঁ!” ঘনঘন মাথা নাড়লেন বিষ্টুসাহেব। “ঠিক আছে হিটলার মরে গেছেন, এখন আমার মাথায় সব বিখ্যাত দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীরা এসে গেছেন! সোপেনহাওয়ারের নাম শুনেছ? দার্শনিক!” যেন হৃতরাজ্য ফিরে পেয়েছেন এমন ভঙ্গি করলেন বিষ্টুসাহেব।

ঠিক তখনই মেজরকে দেখা গেল হন্তদন্ত হয়ে, “GEN-RAH-DEH-OUS! প্যান-অ্যাম থেকে প্যাসেঞ্জারদের ডাকছে আর আপনারা এখানে গপ্পো করছেন! প্লেন চলে যাবে আপনাদের ফেলে। চলুন, চলুন। আর তুমি! আমাকে না বলে তুমি চলে এলে?”

প্রায় তাড়িয়ে মেজর নিয়ে এলেন প্যান-অ্যাম এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে। সেখানে তখন লাইন পড়ে গেছে। হঠাৎ বিষ্টুসাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমার ওষুধের কৌটো!”

মেজর হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ওষুধ?”

“হার্টের। ডাক্তার বলেছিল সব সময় সঙ্গে রাখতে। আমি কৌটোয় রেখেছিলাম।”

“আর নেই সঙ্গে? কী ওষুধ নাম বলুন, পাশেই মেডিসিন শপ। চটপট।”

“কিন্তু, কিন্তু…। ওই কৌটোর তলায় হিরের আংটি রেখেছি।”

“হিরের আংটি?” মেজরের দাড়িগুলো যেন ঝুলে পড়ল।

“শুনেছিলাম কাস্টমস খুব চেক করে। যদি আঙুলে থাকলে না নিতে দেয় তাই ওষুধের কৌটোয় রেখে দিয়েছিলাম। প্রথম আমেরিকায় যাচ্ছি। ভাগ্নিকে দেব বলে!” প্রায় কেঁদে ফেললেন ভদ্রলোক, “অনেক দাম, অনেক। কোথায় ফেলেছি!”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি এখানে আসার সময় পকেটে রেখেছিলেন?”

“ইয়েস। আমি চেয়ারে বসে দেখেছি কৌটোটা। রিয়েল ডায়মন্ড। ঠিক আছে!”

সঙ্গে-সঙ্গে মেজর ছুটলেন বিষ্টুসাহেব যেখানে চেয়ারে বসে ছিলেন সেখানে। অর্জুন যে রাস্তায়.ওরা হেঁটে এসেছিল সেটা দেখতে লাগল। আর বিষ্টুসাহেব কাঁদো-কাঁদো ভঙ্গিতে একটি জার্মান পুলিশকে ব্যাপারটা বোঝাতে চাইলেন। অনেক স্মৃতি-বিজড়িত আংটি। খুঁজতে খুঁজতে অর্জুন অনেকটা চলে এল। এত মানুষ হাঁটাচলা করছে, পায়ের তলায় ছোট ওষুধের কৌটো দেখলে নিশ্চয় কেউ পকেটে পুরবে না। কিন্তু যাবে কোথায়? বিষ্টুসাহেব পুলিশকে কী বলছেন তিনি জানেন, কিন্তু পুলিশ যদি জিজ্ঞেস করে হিরের আংটি কেন তিনি ওভাবে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তা হলে উত্তরটা কি বিশ্বাসযোগ্য হবে?

মিনিট দশেক কেটে গেল, তবু কৌটোর হদিস পেল না অর্জুন। শেষে হতাশ হয়ে যখন ফিরছে, তখন টয়লেট-সাইনটা নজরে পড়ল। মুখ ধুতে গিয়ে ওখানে ফেলে আসেননি তো। অর্জুন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দারুণ ঝকঝকে আধুনিক টয়লেট। অর্জুন মেঝেতে নজর বুলিয়ে কিছু পেল না। শেষ লোকটি বেরিয়ে গেলে সে ফিরতেই ব্যাগটাকে দেখতে পেল। একটা ভারী ব্যাগ টুপি রাখার স্ট্যান্ডে ঝুলছে। নিশ্চয়ই কেউ ভুল করে এটাকে ফেলে গিয়েছে। কাছাকাছি হতেই সে চমকে উঠল। এটাকে সে সিগারেট না জ্বালানো লোকটার নিষ্ঠুর দেখতে সঙ্গীটির সঙ্গে দেখেছিল। হ্যাঁ, অবিকল এই ব্যাগ। কিন্তু সেই লোকটা তো ভুলে ফেলে যাওয়ার পাত্র নয়। অর্জুন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা তুলে নিয়ে পাশের খোলা ল্যাট্রিনের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

দ্রুত হাতে ব্যাগটা খুলে তেমন কিছু সন্দেহজনক জিনিস দেখতে পেল না অর্জুন। কয়েকটা ছেঁড়া মোজা, ভারী মোটা-মোটা অঙ্কের বই, তোয়ালে, এইসব। অর্জুন হতাশ হয়ে দরজাটা খুলতেই চমকে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে রোগামতন একটা জার্মান, যার নাকের ওপর সরু ফ্রেমের স্টেনলেশ স্টিলের চশমা। অর্জুন বেরিয়ে আসা মাত্র লোকটি বলল, “GOO-TEN-TAHK.”

অর্জুনের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে কাঁপা গলাতেই ইংরেজিতে বলল, “আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। লোকটি হাসল। তারপর হাত বাড়িয়ে দরজাটা ধরে ভেতরে ঢুকে গিয়ে সেটাকে বন্ধ করল। প্রচণ্ড দুর্বল মনে হচ্ছিল শরীরটা। লোকটার প্রয়োজন বেড়ে গিয়েছিল এবং সবক’টা ল্যাট্রিনে লোক থাকায় সে বিব্রত ছিল এটা বুঝতে সময় লাগল। তারপর ঝটপট ব্যাগটাকে হ্যাট-র‍্যাকে ঝুলিয়ে দিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে এল।

মেজর অর্জুনকে দেখে বললেন, “পাওয়া গিয়েছে। চল, আমাদের ডাক এসে গিয়েছে।”

“পাওয়া গিয়েছে? কী করে পাওয়া গেল?” অর্জুন অনেকক্ষণ পরে খুশি হল।

“ওঁর কোটের ভেতরের পকেটেই ছিল।”

“যা বাব্বা!” অর্জুন বিষ্টুসাহেবের দিকে তাকাল। তিনি তখন অত্যন্ত মন দিয়ে একটি কাগজ পড়ছেন। এইসব কথাবার্তা যেন ওঁর কানেই যাচ্ছে না।

প্লেনে বসে এবার অর্জুন ঘড়ির দিকে তাকাল। যত তারা এগোচ্ছে, তত পাল্লা দিয়ে ঘড়ির কাঁটা পালটাতে হচ্ছে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াবে যে, ভারতবর্ষ ছাড়ার তারিখটা বাইশ ঘণ্টা পরেও আমেরিকায় পৌঁছে একই থেকে যাবে। বিষ্টুসাহেব এখনও কাগজ পড়ছেন। বোধহয় কৌটোটা ভুল পকেটে রেখে হইচই বাধাবার জন্য বেশ লজ্জিত হয়ে পড়েছেন। হঠাৎ কোমরে একটা খোঁচা খেল অর্জুন। পাশে তাকাতেই দেখল বিষ্টুসাহেব খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে খবরের কাগজের একটা অংশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। ইংরেজি কাগজটার শেষ পাতায় বক্স করে ছাপা হয়েছে, ‘জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানি জানাচ্ছে যে, তাদের চুরি যাওয়া একটি লাইটার যে খুঁজে দেবে বা হদিস কিংবা সূত্র জানাবে তাকে দশ হাজার আমেরিকান ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। আমেরিকান এই কোম্পানিটির হারানো লাইটারটি মানবসভ্যতার ক্ষতি করতে পারে। সম্প্রতি হামবুর্গ শহরের গ্রোসে ফ্রেইহিট স্ট্রিটের ‘দি ট্যাবু’ ক্লাবে, জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানির হারানো লাইটারটির একটি নকল পাওয়া গিয়েছে। প্রথম বোতামটি সক্রিয় ছিল কিন্তু দ্বিতীয় বোতাম কার্যকর ছিল না। অনুমান করা হচ্ছে, এই অঞ্চলে ওই জাল কারবারিদের আনাগোনা হচ্ছে। প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, একযন তরুণ ভারতীয় গোয়েন্দা হারানো লাইটারের জুড়িটিকে ধ্বংস করেছেন।’

মেজর বিরক্ত হচ্ছিলেন খবরের কাগজ নিয়ে এই ধরনের উত্তেজনায়। বিষ্টুসাহেব বললেন, “ওদের তোমার নাম দেওয়া উচিত ছিল। আমি প্রতিবাদপত্র লিখব। ঠিক আছে?”

সেই সময় চোখ তুলতেই অর্জুন অবাক হল। সেই লোক দুটো ঢুকছে। বোর্ডিং কার্ড হাতে নিয়ে সিট নাম্বার খুঁজতে খুঁজতে ওদের পেরিয়ে চলে গেল। সেই গুণ্ডামতন লোকটার হাতে এখন ব্যাগ নেই। আর সুবেশ মানুষটির হাতে সিগারেট একইভাবে না ধরিয়ে রাখা আছে।

কোনও প্রত্যক্ষ অবলম্বন নেই, কিন্তু অর্জুনের উত্তেজনা বাড়ছিল। একটা লোক অযথা কেন ঘণ্টাখানেক সিগারেট না ধরিয়ে আঙুলের ফাঁকে রেখে দেবে? সঙ্গী লোকটার ব্যাগে কেন শুধু ছেঁড়া মোজা, অঙ্কের বই থাকবে এবং সেগুলোকে টয়লেটে ফেলে আসবে? নিশ্চয়ই আরও কিছু ছিল ব্যাগটায়। কী ছিল? ব্যাগটাকে ওভাবে ফেলে এল কেন? যে জিনিস সঙ্গে ছিল তা কি ব্যাগে রাখা আর নিরাপদ ছিল না?

এইসময় ঘোষণাটা করে প্লেন ছেড়ে দিল। সিটবেল্ট বেঁধে অর্জুন পেছন ফিরে তাকাল। সুবেশ ভদ্রলোকের শরীর দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তাঁর সঙ্গীর একটা হাত নজরে এল। কোটের বাইরে আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ। ভঙ্গিটাই বলে দেয় প্রচণ্ড শক্তি ধরে লোকটা। এবার ওরা বসেছে সেই এলাকায় যেখানে সিগারেট খাওয়া চলে না। ব্যাপারটা বিষ্টুসাহেব করেছেন, বোর্ডিং কার্ড নেবার সময় বলেছেন, ‘নো স্মোকিং।’ আর সেইটাই খেপিয়ে দিয়েছে মেজরকে। তিনি এখন সারাটা পথ চেয়ারে বসে চুরুট খেতে পারবেন না।

আকাশে প্লেন স্বাভাবিক হয়ে এল। মেজর উঠলেন। তার বিরাট শরীরটা বিষ্টুসাহেব এবং অর্জুনকে অতিক্রম করে পেছনের দিকে চলে গেল। উড়ন্ত প্লেন এবং রানিং ট্রেনে হাঁটার সময় একই অনুভূতি। অর্জুন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর সে-ও চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। এয়ার হোস্টেসরা খাবারদাবারের ব্যবস্থা করছে। সুবেশ ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। ওঁর পাশের লোকটি অর্জুনের দিকে চলে গেল। একবার তাকাল, তারপর দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাল। শেষ প্রান্তে চলে এসে মেজরকে দেখতে পেল অর্জুন। এক হাতে একটা পানীয়ের গ্লাস নিয়ে চুরুট খাচ্ছেন। অর্জুনকে দেখে বললেন, “অদ্ভুত! আগবাড়িয়ে নো স্মোকিং বলার কী দরকার ছিল। এখন খাও এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আমি নিউইয়র্কে পৌঁছেই কেটে পড়ছি।”

“কোথায় যাবেন?”

“আমার ফ্ল্যাটে। ম্যানহাটনে আমার নিজের ফ্ল্যাট আছে। উনি থাকবেন ওঁর বোনের বাড়িতে। এরকম লোক আমি দেখিনি, সবকিছু জেনে বসে আছেন। অসুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে থাকলেই তো চলত। সারা এয়ারপোর্ট চষেছি ওঁর কৌটোর জন্য, জানো?” মেজর এক চুমুকে পানীয়টা শেষ করে চুরুটে টান দিলেন।

অর্জুন বলল, “বিষ্টুসাহেব কিন্তু ভালমানুষ। বয়স হয়েছে বলে ভুল হয়।”

মেজর বললেন, “সেটা আমাকে বলতে হবে না। ভাল মানুষ না হলে আমি সঙ্গী হতাম? তুমি তো সিগারেট খেতে এসেছ, ধরাও, আরে, আমি কিছু মনে করব না।”

অর্জুন দ্রুত মাথা নাড়ল, “না, না। আমি আপনার সঙ্গে গল্প করতে এলাম।”

মেজর খুব খুশি হলেন, “গুড। তুমি ছেলেটা ভাল। আমার কোনও সাহায্য প্রয়োজন হলে বলবে।

অর্জুন বলল, “আপনি তো বলেছেন আমরা দু’জনেই সত্য খুঁজছি। তবে দু’রকমের মাধ্যমে। এই দ্বিতীয় লাইটারটা খোঁজার ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই।

“গ্র্যান্টেড। লাইটারটা এখন কার কাছে আছে?’ মেজর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন।

হেসে ফেলল অর্জুন, “সেটাই তো সবাই জানতে চাইছে। আমিও জানি না।”

.

ওপর থেকে মনে হচ্ছিল একেই বোধহয় বলে হিরের মালা। কেনেডি এয়ারপোর্টের আলো নিউইয়র্ক শহরকে রহস্যময়ী করে তুলেছিল। বিষ্টু সাহেব আপ্লুত হয়ে বললেন, “অনবদ্য। দারুণ দৃশ্য, তাই না?”

প্লেন থেকে নেমে প্রথমেই অর্জুনের মনে হল সে আমেরিকায়। ঠাণ্ডা তো তেমন নেই। তারপরে খেয়াল হল তারা প্লেনের পেট থেকে সোজা চলে এসেছে এয়ারকন্ডিশন্ড বিল্ডিং-এর ভেতরে। বাইরের ঠাণ্ডা এখানে ঢুকবে কেন? কিন্তু এয়ারপোর্ট বিল্ডিংয়ের ভেতরে এসে মনে হচ্ছে যেন খুব বড় কোনও শহরে ঢুকে পড়েছে। এত ব্যস্ততা, কিন্তু তাড়াহুড়ো নেই, চিৎকার নেই। অর্জুন লক্ষ করছিল সেই দুটো লোককে। ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমসের বাধা ডিঙিয়ে ওরা তাদের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল। এখন সুবেশ লোকটির হাতে সিগারেট নেই। প্লেনের ক্যারিয়ারে রাখা মালপত্রের জন্য সবাই যখন অপেক্ষা করছিল, তখনই ওদের দুটো স্যুটকেস এসেছিল। সুবেশ লোকটা যে সুটকেসটি ধরেছিল তার ওপর লেখা আছে, ১৫-৩২, রাস্তা তিরিশ, ম্যানহাটন।

বিষ্টুসাহেবের বোন এবং ভগ্নীপতি এসেছিলেন এয়ারপোর্টে। দাদাকে পেয়ে স্বভাবতই খুব খুশি। তাঁরা এবং বিষ্টুসাহেব চাইছিলেন অর্জুন ওঁদের ওখানে উঠুক। কিন্তু প্রত্যেকের অনুরোধ নস্যাৎ করে দিলেন মেজর, “না, না। এখন থেকে আমাদের একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হবে। তোমাদের ওখানে মাঝে-মাঝে দেখা করতে যাব।

আলাদা গাড়িতে ওঠার আগে বিষ্টুসাহেব বললেন, “শরীরটা একটু সারিয়ে তুলি। তারপর তোমার সঙ্গে যাব। অভিযান-টভিযান হলে আমাকে বাদ দিও না। ঠিক আছে?”

মেজর ট্যাক্সি নিলেন না। বললেন, “ট্যাক্সিতে ওঠা মানে গলা বাড়িয়ে দেওয়া। ডলার যাবে একগাদা। তার চেয়ে বাসে উঠি এসো।”

বাইরে কিন্তু বেশ ঠাণ্ডা। অর্জুনের খুব শীত করছিল। একটা পুরো-হাতা সোয়েটারে শীত আটকাচ্ছে না। সঙ্গের মালপত্র বেশি না থাকায় বাসে আপত্তি করল না কেউ। ঢোকার সময় নব্বুই সেন্ট জমা দিয়ে ঢুকতে হয়। মেজরই দু’জনেরটা দিয়ে দিলেন। সন্ধে হয়েছে, রাত্রের নিউইয়র্ক দেখতে জানলার বাইরে তাকাচ্ছিল সে। মেজর বললেন, “নো, নো, এটা নিউইয়র্ক নয়। কেনেডি শহর থেকে অনেক দূরে।”

বাসে সাদা-কালো দুই ধরনের মানুষ আছে। প্রত্যেকের অঙ্গে ভাল শীতবস্ত্র। হঠাৎ নিজেকে খুব গরিব-গরিব বলে মনে হচ্ছিল। বাইরে তাকিয়ে অর্জুন শুধু বুঝতে পারল তারা দারুণ ঝকমকে একটা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। বাস যেখানে শেষ করল সেই জায়গাটার নাম টাইম স্কোয়ার। অর্জুনের মনে হল যেন দেওয়ালির উৎসব হচ্ছে চারধারে। এত আলো, এত সাজগোজ যে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মেজরের সঙ্গে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে খুব ভাল লাগছিল ঠাণ্ডা সত্ত্বেও। ম্যানহাটনে ওঁর ফ্ল্যাটে পৌঁছতে সময় লাগল বেশ, তবু।

নিয়মটা অদ্ভুত। মোটা কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে যে ফ্ল্যাটে যেতে চাও, সেই ফ্ল্যাটের নম্বরে টেলিফোন করলে তারা যাচাই করবে তুমি কে। পছন্দ হলে সেখান থেকে বোতাম টিপলে ও-পাশের দরজাটা খুলে যাবে। সেইটে দিয়ে ভেতরে ঢোকার পর লিফট পাবে। চাবি ছাড়া এবং অনুমতি না পেলে দ্বিতীয় দরজা খুলবে না। নিজের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে মেজর ঘোষণা করলেন, “এখন থেকে এটাকে নিজের বলেই ভাববে। ও-পাশের দুটো বিছানার যে-কোনও একটায় তুমি শুতে পারো। ওখানে কিচেন আছে। কিছু খাবার আমি যাওয়ার সময় রেখে গিয়েছিলাম, নষ্ট হবার কথা নয়। কাল বাজার করব। আর এই নাও নিউইয়র্কের ম্যাপ। আমি এখানে আছি। এই স্পটটায়। বাড়ির নম্বর, টেলিফোনের নম্বর লিখে নেবে। ও. কে.।”

বলতে বলতেই টেলিফোন বাজল। অর্জুন একটা সোফায় আরাম করে বসল। প্লেনে যা খাইয়েছে, আর খিদের প্রশ্ন নেই। ঘরটায় বেশ গরম আছে। মেজর তখন টেলিফোনে কথা বলছিলেন, ‘GOO DAH, HOOR STORE DET TILL? TAHK BRAH?’ এটা কোন ভাষা বুঝতে পারল না অর্জুন। কিছুক্ষণ পরে মেজর ফিরে এসে বললেন, “আমার এক সুইডিশ বন্ধু ফোন করেছিল। রাশিয়ান রকেটের বিস্ফোরণ সুইডেনে খুব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। জলের তলায় একটা নীল রঙের শ্যাওলা হচ্ছে। ও সেই শ্যাওলা দেখতে যাচ্ছে। আমার চুরুট!” মেজর আচমকা পকেটে হাত দিলেন। এ-পকেট সে-পকেট খোঁজার পর নিজের ব্যাগ হাতড়ালেন, “যাঃ, আমার চুরুটের প্যাকেটটা কোথায় ফেলে এসেছি। তুমি বোসো, আমি চুরুট কিনে আনি।”

এই ভরসন্ধেবেলায় অর্জুনের একা এখানে বসে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। সে সঙ্গ নিতে চাইলে মেজর আপত্তি করলেন না। কিন্তু একটা চোখ ছোট করে অর্জুনকে দেখে সোজা ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। ফিরে এলেন একটা অপেক্ষাকৃত ছোট জ্যাকেট হাতে নিয়ে। কিন্তু সেটা অর্জুনের কাছে আলখাল্লার মতো লাগছিল। ওই বেঢপ জিনিসটা বাধ্য হয়ে পরতে হল মেজরকে খুশি করার জন্য। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে যে আরাম হল, তাতে মনে মনে মেজরকে ধন্যবাদ জানাল অর্জুন।

জায়গাটার নাম ম্যানহাটন। দু’পাশে উঁচু-উঁচু বাড়ি, দোকানপাট কম, সন্ধে পার হওয়ায় লোকজনও দেখা যাচ্ছে না। অর্জুনের চট করে স্যুটকেসের ওপরে দেখা ঠিকানাটার কথা মনে পড়ল। সে মেজরকে জিজ্ঞেস করতে মেজর বললেন, “মিনিট দশেকের হাঁটা। কে থাকে সেখানে?”

“একবার সেই বাড়িটার সামনে যেতে পারি?”

“তুমি হাঁটতে পারলে আমার আপত্তি কী! আহা, এই দোকানটা বন্ধ কেন?”

মেজর চুরুটের দোকান খুঁজতে-খুঁজতে হাঁটছিলেন। এদিকের রাস্তায় মানুষজন কম কেন! ফুটপাথে কি বেশি লোক হাঁটে না! অথচ গাড়ি যাচ্ছে স্রোতের মতো।

অনেকগুলো ব্লক পেরিয়ে মেজর বললেন, “এটাই থার্টিয়েথ স্ট্রিট। কত নম্বর বললে?”

“ফিফটিন—থাটি।

আর একটু হাঁটার পর মেজর একটা পাঁচতলা বাড়ির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী নাম?”

অর্জুন বলল, “নাম জানি না।

“মানে?” অবাক হলেন মেজর।

“নামটাই তো খুঁজে বের করতে হবে।”

সঙ্গে-সঙ্গে চমকে উঠলেন মেজর, “আই সি, আই সি। এক্সপিডিশন!”

ওরা দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটার উলটো ফুটপাথে। বিভিন্ন ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে। লোকটা নিশ্চয়ই এখন ওখানে পৌঁছে গিয়েছে। তার সঙ্গী কোথায় কে জানে! কিন্তু কোন্ ফ্ল্যাটটায় লোকটা থাকে, সেটাই বের করতে হবে। এইসময় মেজর একটা চুরুটের দোকান আবিষ্কার করে ফেললেন। তাঁকে খুব খুশি দেখাচ্ছিল। চুরুট কেনার পর মেজর বললেন, “আমি বড্ড লোভী হয়ে গেছি। নিজেকে শাস্তি দিতে অন্তত আধঘণ্টা চুরুট ধরাব না। চলো না, ওই বাড়ির ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে খোঁজ নিই!”

“কী খোঁজ দেবেন?”

“তাও তো বটে। বাড়ির নাম্বার জানো, কিন্তু লোকের নাম জান না। অথচ দশটা ফ্ল্যাট হবে এখানে। লোকটাকে চেনো তো?”

“চিনি।’

“তা হলে দাঁড়িয়ে থাক। একসময় না একসময় বের হবেই। মেজর ওপাশে তাকালেন, সেখানে একটা দোকানের ওপর দাবার বোর্ডের সাইনবোর্ড, “আঃ, দারুণ। তুমি এখানে দাঁড়িয়ে লক্ষ করে যাও, আমি ততক্ষণ একহাত খেলে আসি।”

“কী খেলবেন?” অৰ্জুন অবাক।”

“দাবা। একটা গেম জিতলে দশ ডলার, হারলেও তাই দিতে হবে। তবে এ-শর্মা কখনও রিস্ক নেয় না, অভিযান ছাড়া। মেজর আর দাঁড়ালেন না। ঠাণ্ডা এড়াতে অর্জুন একটা ছাউনির তলায় এসে দাঁড়াল। এত রাতে অতটা পথ উড়ে এসে লোকটা নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে বের হবে না। এখনও কোনও সন্দেহজনক কাজ লোকটা করেনি, কিন্তু ওর সঙ্গী করেছে। ব্যাগটাকে ফ্রাঙ্কফুর্টের টয়লেটে ফেলে এল কেন? হয়তো পুরোটাই অন্ধকারে হাতড়ানো, তবু অর্জুনের মন মানছিল না। মিনিট পনেরো যাওয়ার পর অর্জুন রাস্তাটা পেরিয়ে বাড়িটার সামনে এল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই প্যাসেজ পেরিয়ে লিফট। তার গায়েই একটা বোর্ডে বিভিন্ন ফ্ল্যাটের অধিবাসীদের নাম লেখা। তা দেখে তো কিছু বোঝা মুশকিল। অর্জুন রাস্তায় বেরিয়ে দাবা খেলার দোকানে চলে এল। মেজর ততক্ষণে বিশ ডলার হেরেছেন।

জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানিতে অর্জুনের যে অভ্যর্থনা হল, তা কল্পনার বাইরে। স্বয়ং কোম্পানির চেয়ারম্যানের পি. এ. এসেছিল মেজরের ফোন পেয়ে গাড়ি নিয়ে। মোটামুটি ভদ্র পোশাকে মেজরকে সঙ্গে নিয়ে সেই গাড়িতে চেপে অর্জুন গিয়েছিল পরের দিন সকালে জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এ। কোম্পানির চেয়ারম্যান বৃদ্ধ মানুষ। তিনি পরের দিন বারংবার ওকে ধন্যবাদ দিলেন প্রথম লাইটারটি খুঁজে বের করার জন্য। তিনি অনুযোগ করলেন কেন অর্জুন তাঁদের জানাল না, কোন ফ্লাইটে সে আসছে। অর্জুনের আমেরিকায় থাকা-খাওয়া এবং সমস্ত রকম খরচ ছাড়া কিছু পুরস্কারের প্রস্তাব দিলেন তিনি।

মেজর জানালেন, অর্জুন তাঁর অতিথি। এখন দ্বিতীয় লাইটারটা খুঁজতে তাঁরা ব্যস্ত। আমেরিকাতে অর্জুন তাই তাঁর কাছেই থাকবে। শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা হল এইরকম, যখনই যা দরকার হবে, তা অর্জুন মিস্টার স্মিথ বলে এক ভদ্রলোককে জানাবে। তিনি সঙ্গে-সঙ্গে তার ব্যবস্থা করবেন। চেয়ারম্যান আরও জানালেন, ফেডারেল ব্যুরো অভ ইনভেস্টিগেশন তাঁকে জানিয়েছেন যে, নকল লাইটারের কারবারিরা আপাতত তাদের কার্যকলাপ বন্ধ রেখেছে। কিন্তু যতক্ষণ না দ্বিতীয় লাইটারটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ কোম্পানি নিশ্চিন্ত হতে পারছে না।

জোন্স অ্যান্ড জোন্স থেকে বের হতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। মেজর ওকে নিয়ে ঢুকলেন ম্যাকডোনাল্ড কোম্পানির রেস্তোরাঁয়। অল্প দামে ভাল খাবার দেওয়ার জন্য এই কোম্পানি প্রতিটি শহরে এইরকম অনেক দোকান করেছে। মেজর কাউন্টার থেকে খাবার আনতে গেলে অর্জুন রাস্তার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসল। কাল থেকে একটা ব্যাপার সে এখানে তেমন দেখতেই পাচ্ছে না। আমেরিকার লোকেরা কি সিগারেট খায় না? একটা মানুষও চোখে পড়ছে না, যার হাতে সিগারেট আছে। একমাত্র মেজর ছাড়া চুরুট খাচ্ছেন এমন কেউ সামনে আসেনি। তা ছাড়া মেজর চুরুট কিনেছিলেন একটা পেট্রল পাম্প থেকে। তারাই সিগারেট চুরুট বিক্রি করে।

অর্জুন রাস্তাটা দেখল। কারও মুখ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে না। অথচ এদেশের কোম্পানি লাইটার তৈরি করেছিল বাজারে চালু করতে। চেয়ারম্যান বললেন, সেটা বিক্রি হয়েছিল যারা আত্মরক্ষা করতে অস্ত্র চায় তাদের উদ্দেশে। রিভলভারের বদলে লাইটার। কিন্তু লাইটারটার প্রথম কাজ তো সিগারেট ধরানো। প্লেনে একটা বুলেটিনে সে পড়েছে, আমেরিকায় অন্যান্য চাষের মাত্র শতকরা ছ’ভাগ তামাক চাষ হয়।

খাবার নিয়ে উলটো দিকের টেবিলে এসে বসলেন মেজর, “এদের মিল্কশেকটা দারুণ। হ্যাঁ, নিউইয়র্ক নিশ্চয়ই ঘুরে দেখতে চাও। স্ট্যাচু অভ্ লিবার্টি? অ্যাঁ! এখনই না? বেশ, বেশ, যখন ইচ্ছে হবে, বলবে। আচ্ছা আমরা এখন কী করব? অ্যাডড্রেস নিয়ে তো কোনও লাভ হবে না। ফ্ল্যাট নাম্বার জানি না, মানুষটার নাম জানি না। মুশকিল। তোমাদের বিষ্টু সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যাবে নাকি?” কথাগুলো বলতে বলতেই মেজর তাঁর নিজের প্লেট শেষ করে ফেলেছেন। অর্জুনের মনে হচ্ছিল, মেজর ওরকম শ’খানেক প্লেট অবলীলায় শেষ করতে পারেন। অথচ খাবারগুলো এত ভারী অথচ সুস্বাদু যে, অর্জুনের মনে হচ্ছিল বিকেল পর্যন্ত খেতে হবে না। সে জবাব দিল, “বিষ্টুসাহেবের বাড়িতে না হয় বিকেলে যাব। কিন্তু আমি আর একবার ওই বাড়িটার সামনে যেতে চাই।”

মেজর কাঁধ নাচালেন। তারপর মুখ ফিরিয়েই চিৎকার করে উঠলেন, “হা-ই! চার্লি!”

ওপাশ থেকে একটি রোগা নিরীহ দেখতে নিগ্রো এগিয়ে এল সাদা দাঁত বের করে, “হা-ই! মেজর!” অর্জুন অবাক হয়ে গেল। কোনও নিগ্রো এত রোগা হতে পারে তা তার ধারণায় ছিল না। লোকটা কথা বলছে খুব শান্ত ভঙ্গিতে। বোধহয় মেজরের অনেকদিনের পুরনো বন্ধু। কিন্তু পোশাক দেখে মোটেই মনে হয় না খুব আরামে আছে লোকটা। মেজর নিগ্রোটির কোমরে হাত রেখে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে অর্জুনের দিকে তাকালেন, “এই হচ্ছে চার্লস। আমার সঙ্গে মেক্সিকো-এক্সপিডিশনে গিয়েছিল। দারুণ চোর।”

শেষ শব্দটাকে হকচকিয়ে গেল অর্জুন। মেজর কিন্তু একই গলায় অর্জুনের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন চার্লিকে। সেটা শেষ হলে চার্লি অর্জুনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একগাল হেসে বলল, “গ্লাদ টু মিট ইউ।” অর্জুন মেজরকে বাংলায় জিজ্ঞেস করল, “উনি কী করেন বলছিলেন?”

“এখন কিছু করে না বলল। তবে ওর চুরির খুব নাম-যশ আছে। এগারোবার জেল খেটেছে। হ্যাঁ, সিরিয়াসলি! তারপরে হেনরি ডিমক ওকে আমাদের অভিযাত্রী সঙ্ঘে ঢোকায়। ওহো, হেনরি এখন শহরে নেই, নইলে তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতাম।”

আমেরিকায় এসে অর্জুন এই প্রথম একজন চোর দেখল, যে দাঁত বের করে সরল হাসে, কিন্তু এই লোকটির সঙ্গে মেজরের যা ভাব দেখা যাচ্ছে সেটা শুধুই চোর হলে হত না। চার্লি অর্জুনকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমেরিকায় বেড়াতে এসেছ, খুব ভাল কথা, এখানকার মানুষের সঙ্গে আলাপ কর। স্ট্যাচুর চেয়ে মানুষ অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং।”

খুব ভাল লাগল কথাটা। অর্জুন সরাসরি এবার জিজ্ঞেস করল, “তুমি চুরি কর?”

“করতাম। হোয়াইট হাউস থেকে বাজি রেখে অ্যাশট্রে চুরি করেছিলাম একসময়। এই নিয়ে জ্ঞান দিতে এসো না। আমার ভাল লাগেনা।” উদাসীন গলায় বলল চার্লি।

থাটিয়েথ স্ট্রিটে পৌঁছে মেজর যথারীতি দাবা খেলতে গেলেন। বিভিন্ন টেবিলে দাবার বোর্ড নিয়ে লোক বসে আছে। এর আগের দিন হেরে যাওয়ার বদলা নিতে বসে গেলেন মেজর। তিনি চলে গেলে একটা চুরুটের প্যাকেট বের করল চার্লি। বলল, “স্মোকিং খুব খারাপ অভ্যেস। মেজরকে পরে ফেরত দিয়ে দিও। ওরকম নাইস জেন্টলম্যান, শুধু-শুধু শরীর খারাপ করবে কেন?”

অর্জুন অবাক হয়ে গেল। মেজরের পকেট থেকে কখন হাতসাফাই করল চার্লি। দাবা খেলতে-খেলতে চুরুট ধরাতে গিয়ে ফাঁপরে পড়বেন মেজর। ব্যাপারটা নিয়ে আর কথা না বলে অর্জুন সেই বাড়িটা দেখাল চার্লিকে। এর মধ্যে সে চার্লিকে প্লেনের ঘটনা বলেছে। সে ইচ্ছে করেই লাইটার-প্রসঙ্গ চেপে গেছে। লোকটি রহস্যজনক, ওর সম্পর্কে সে জানতে চায়। চেহারার বর্ণনা শুনেছে চার্লি। তারপর হেসে বলেছে, “তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে ইতালিয়ান। ইতালিয়ানরা রেস্টুরেন্টে খেতে খুব ভালবাসে। ওই ব্লকে একটা ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে। এখন তো লাঞ্চ খাওয়ার সময়। চল, ওখানে যাওয়া যাক। ওদের POLLO BOLLITO খেতে আমার খুব ভাল লাগে।”

ব্যাপারটায় মন সায় না দিলেও অর্জুন রাজি হল। তার পকেটে কয়েকটা ডলার একই অবস্থায় রয়েছে। চার্লির অভিজ্ঞতা যদি ঠিক হয় তা হলে ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টের মালিক নিশ্চয়ই এই লোকটার বর্ণনা শুনে চিনতে পারবে।

রেস্টুরেন্টটা বড়। শুধু ইতালিয়ান নয়, অন্যান্য জাতের লোকেরা যেভাবে খাচ্ছে টেবিলে-টেবিলে, তাতে এই দোকানের রান্না সম্পর্কে সন্দেহ থাকছে না। চার্লি আর অর্জুন এটা টেবিলে বসতেই বয় এসে মেনু-এগিয়ে দিল। প্রথমে লেখা আছে, PASTINA IN BRODO, TORTELLINI IN BRODO, CON CARNE, COTOLETTE, BISTECCA, MANZO, POLLO, RISOTTO, CASSATA.”

অর্জুন এর মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছে না দেখে চার্লি জিজ্ঞেস করল, “তোমার কি এখনও খিদে আছে?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “না, মেনুটা দেখছিলাম শুধু।”

চার্লি বলল, “তুমি তা হলে একটা GELATO খাও।” নিজের খাবারটাও দিতে বলল সে।

GELATO মানে যে আইসক্রিম, তা দেওয়ার পর বুঝতে পারল অর্জুন। সে তাই খেতে-খেতে চারপাশে মুখ ফিরিয়ে দেখছিল। না, কোথাও সেই সুবেশ ভদ্রলোক নেই। খাওয়া হয়ে গেলে অর্জুন দাম মেটাল। মোট ছ’টা ডলার খরচ হল তার। এবং তখনই নজরে পড়ল সেই গুণ্ডা টাইপের লোকাটাকে। কাউন্টার থেকে খাবার প্যাকেট নিয়ে সে বেরিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে-সঙ্গে অর্জুন ইশারা করল চার্লিকে। চার্লি চোখ ছোট করে দেখল লোকটাকে। ওরা খানিকটা দূরত্ব রেখে অনুসরণ করছিল। হঠাৎ চার্লি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে লোকটার পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। লোকটা আড়চোখে চার্লিকে একবার দেখল। ওরা দু’জনে একসঙ্গে লিফটে উঠে যেতে অর্জুন থমকে দাঁড়াল। লিফটে আরও দু’জন মহিলা উঠলেন।

মিনিট-পাঁচেক বাদে চার্লি নেমে এল শিস দিতে দিতে। অর্জুন খুব উত্তেজিত ছিল। সে জিজ্ঞেস করল, “কী হল, তুমি সোজা ওপরে চলে গেলে?”

“সোজা ওপরে। ও নামল তিনতলায়, বাঁ হাতের প্রথম ফ্ল্যাটে। আমি পাঁচতলায় উঠে একটু সময় নিয়ে ফিরে এলাম। চল, একটু ওপাশে যাই। দ্রুত পা চালিয়ে একটু আড়ালে চলে এসে পকেট থেকে একটা ব্যাগ বের করল চার্লি। মানিব্যাগ।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার?”

“এটা ওই লোকটার পকেটে ছিল। কী আছে দেখি এর মধ্যে। বাঃ, প্রচুর ডলার আছে, দশ বিশ তিরিশ। উঃ একশো ষাট। লোকটার ছবি। আরম্যান্ডো ডি কোরো।” চার্লি হাসল, “লোকটা সত্যিই ইতালিয়ান।

“তুমি, তুমি ওর ব্যাগ চুরি করেছ?” অর্জুন বিশ্বাস করতে পারছিল না। “কিন্তু ও জানবে পকেট থেকে পড়ে গেছে।”

এবার অর্জুন হাসল। চার্লি চমৎকার একটা রাস্তা বের করেছে ওই ফ্ল্যাটে যাওয়ার। চার্লি ওকে ব্যাগটা দিয়ে বলল, “ও আমাকে দেখেছে। আমি গেলে সন্দেহ করতে পারে। যদি দরকার মনে কর, তা হলে তুমি যাও।”

অর্জুন এক মুহূর্ত ভাবল। দোকানে না খেয়ে প্যাকেটে করে যখন খাবার নিয়ে এসেছে বোঝাই যাচ্ছে আর-একজন ঘরে আছে। দুটো লোককে একসঙ্গে কীভাবে ম্যানেজ করা যাবে? ঠিক তখনই দেখা গেল গুণ্ডাগোছের লোকটা উদ্‌ভ্রান্তের মতো বাড়িটা থেকে বেরিয়ে রাস্তার দিকে হেঁট হয়ে খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্জুন চটপট এগিয়ে গেল বাড়িটার দিকে। লোকটিকে এড়িয়ে সোজা তিনতলায় উঠে বাঁ দিকের ফ্ল্যাটের বোতাম টিপতেই সেই সুবেশ ইতালিয়ানটি দরজা খুলে কিঞ্চিৎ অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়েস?”

ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করে অর্জুন হাতে রেখেছিল। সেটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মিস্টার আরমান্ডো এখানে থাকেন কি?”

“হ্যাঁ। কী চাই?”

“আমার কিছু নাই না, উনি কি কিছু হারিয়েছেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু কেন?”

“ব্যাগটা আমি রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি।

সঙ্গে-সঙ্গে ভদ্রলোকের মুখে হাসি ফুটল। বললেন, “ভেতরে আসুন। আরমান্ডো ওই ব্যাগটাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। কী নাম আপনার? আমি পাওলো।”

“আমি অর্জুন। প্রাচ্যদেশ থেকে এসেছি।” ইচ্ছে করেই ভারত শব্দটা উচ্চারণ করল না সে।

“আই সি। কিন্তু আপনাকে খুব চেনা-চেনা মনে হচ্ছে। কোথায় দেখেছি বলুন তো?”

“আমি এদেশে নতুন।” অর্জুন অস্বস্তিতে পড়ল।

এইসময় দরজায় আরমান্ডো এসে দাঁড়াল। তার মুখে-চোখে বিভ্ৰান্তি। পাওলো বললেন, “এই ভদ্রলোকে ধন্যবাদ দাও হে। তোমার ব্যাগ রাস্তায় পেয়ে ফেরত দিতে এসেছেন।”

অর্জুন ব্যাগটা ফেরত দিতেই আরমান্ডো সেটাকে খুলে ডলারগুলো গুনে বলল, “ধন্যবাদ। কিন্তু আমার পকেট থেকে কখনওই ব্যাগ পড়ে না। তবু ধন্যবাদ।”

অর্জুন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে বলল, “আমি একটু আগুন পেতে পারি?”

পাওলো বললেন, “নিশ্চয়ই।” তারপর উঠে একটা দেশলাই-এর পাতা এগিয়ে দিল, “আপনাকে আমি ফ্রাঙ্কফুর্টে দেখেছি। ইয়েস। আপনি কাল এদেশে এসেছেন। তার মানে আমরা একই প্লেনে ছিলাম। তাই না?’

অর্জুন বিপদের গন্ধ পেল। পাওলোর স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে সে ভুল ভেবেছিল। অমল সোম হলে নিশ্চয়ই এই ভুলটা করতেন না। সে নীরবে মাথা নাড়ল।

পাওলো বললেন, “তা হলে কি ধরে নেব আরমান্ডোর পকেট থেকে ওই ব্যাগটা পড়েনি?”

অর্জুন উঠে দাঁড়াল, “কী বলতে চান?”

“কিছুই না। দাঁড়ান। আপনি সিগারেট না-ধরিয়ে চলে যাচ্ছেন। আমি‍ই ওটা ধরিয়ে দিচ্ছি।” পকেট থেকে লাইটার বের করলেন পাওলো। অর্জুন চমকে উঠল। জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানির এই লাইটার, তার কোনও দিন ভুল হবার কথা নয়। আরমান্ডো তখন দরজাটা বন্ধ করছে।

প্রথম বোতাম টিপলেন পাওলো, “নিন, সিগারেটের ডগাটা এখানে আনুন, ধরে যাবে।” হাসলেন তিনি, “বাঃ, আপনি জানেন দেখছি। আমার মনে হচ্ছে আপনি সেই মানুষ যার কথা নিউইয়র্ক টাইমস ছেপেছে। আপনার অভিযানের গল্প আমি পড়েছি। আজ জোন্স অ্যান্ড জোন্সের চেয়ারম্যান তো আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়েছে। তাই না?” পাওলো কথা শেষ করে আরমান্ডোর দিকে ইঙ্গিত করামাত্র অর্জুন ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবং কিছু বোঝার আগেই লাইটারটা মুঠোয় নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে তার মাথায় আঘাত এবং চোখে অন্ধকার নেমে এল।

জ্ঞান ফিরলে অর্জুন প্রথমে ভাল করে তাকাতে পারছিল না। মাথাটা খুব ভারী এবং যন্ত্রণা পাক খাচ্ছে। ক্রমশ সে বুঝতে পারল হাসপাতাল বা ওরকম কোথাও শুয়ে আছে। একটি মহিলা-কণ্ঠ বলল, “ধন্যবাদ, ওর সেন্স ফিরেছে। ক্রাইসিস ইজ ওভার।”

দ্বিতীয়বার জ্ঞান এল যখন, তখন স্পষ্ট তাকাতে পারল। মেজর, বিষ্টুসাহেব সামনে দাঁড়িয়ে। মেজর বললেন, “কেমন আছ এখন?”

“কী হয়েছিল আমার?” দুর্বল গলায় জিজ্ঞেস করল অর্জুন।

“ওরা তোমাকে প্রায় মেরে ফেলেছিল। তারপর ফ্ল্যাট খালি করে চম্পট দেয়। চার্লি আমাকে দাবার দোকান থেকে তুলে নিতে দেরি করলে বাঁচানো যেত না। আমরা গিয়ে দেখলাম তুমি মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছ। ডাক্তার বলছে, দিন-দশেক লাগবে ছুটি পেতে।” মেজর বললেন।

“ওরা ধরা পড়েনি?”

“না,” বিষ্টুসাহেব বললেন, “জোন্স অ্যান্ড জোন্সের চেয়ারম্যান দেখতে এসেছিলেন। ঠিক আছে?”

অর্জুন চোখ বন্ধ করল। তারপরেই তার লাইটারটার কথা মনে পড়ল। জানলা দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া লাইটারটা এখন কোথায়?

ঠিক তখনই চার্লির গলা শুনতে পেল, “হাই ইয়ংম্যান। হিয়ার ইজ ইওর টেন থাউজেন্ড ডলার্স! হঠাৎ দেখি আকাশ থেকে নেমে আসছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে লুফে নিলাম। এটা কী করে খোলে তাই বুঝতে পারছি না।”

চার্লি সরল হেসে বস্তুটি অর্জুনের দিকে এগিয়ে ধরল। এক ঝলক দেখে অর্জুন চিনতে পারল। জোন্স অ্যান্ড জোন্স।

অর্জুন হাসতে চেষ্টা করল, “টাকাটা তোমার আমার আধাআধি চার্লি। তুমি খুব ভাল, খুব।”

***