দেড়দিন – ১

১.

জিনসের প্যান্ট আর ব্যাগি শার্ট পরে সাইকেল চালাচ্ছিল অর্জুন। এখনও জলপাইগুড়িতে তেমন শীত পড়েনি। গরমটা নেই এই যা। এই সময় একটু বৃষ্টি হবার অপেক্ষা। তারপর কয়েক মাস ধরে হাড় কাঁপাবে। এখন হাওয়ায় একটা মিষ্টি আরাম। কদমতলার মোড়ে এই সকালে তেমন ভিড় নেই। বেলা বাড়লেই রিকশার দাপটে পথ চলাই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায় এই তল্লাটে।

মোড়টা পার হতেই অর্জুন দেখল, জগুদা মর্নিং ওয়াক শেষ করে ফিরছেন। ছোটখাটো এই মানুষটি এই সেদিনও অর্জুনের জন্য চাকরির খুব চেষ্টা করেছিলেন। দেখতে পাওয়া মাত্রই জগুদা হাত তুললেন, “কোথায় চললে?”

“এমনি ঘুরে বেড়াচ্ছি।” অর্জুন সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়াল।

“আমি অনেক ভেবে দেখলাম, তখন তোমার চাকরি না হয়ে খুব ভাল হয়েছে। একবার একটা চাকরিতে ঢুকলে ভবিষ্যৎ বারোটা। চাকরিতে ঢুকলে তোমার ইউরোপ-আমেরিকায় যাওয়া হত না। ভাবতে পারা যায়, আমাদের মতো আর্থিক অবস্থার পরিবার থেকে তোমার মতো বয়সের কেউ ও দেশে বেড়াতে যাচ্ছে? একবার মালবাজারে চলে এসো।

“আপনি কি ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করছেন?”

“না। শনি-রবিবার এখানে থাকি। একটা ইন্টারেস্টিং কেস হচ্ছে ওখানে।”

“কী রকম?” অর্জুন কৌতূহলী হল।

জগুদা আশেপাশে একবার নজর বুলিয়ে বললেন, “এসো, চা খাওয়া যাক।”

কদমতলার মোড়েই যে ভাঙাচোরা চায়ের দোকানে জগুদাকে অনেক দিন আড্ডা মারতে দেখেছে, অর্জুন সেখানেই গেল। সবে চায়ের জল গরম হচ্ছে। বেঞ্চিতে আরাম করে বসে জগুদা বললেন, “আমাদের ব্যাঙ্ক-লোনের জন্যে রোজ একগাদা দরখাস্ত পড়ে। বাছাই করে জামিনদার রেখে উপযুক্ত লোককে আমরা ধার দিই। ব্যবসা করে তাদের সেই টাকা শোধ করে দেওয়ার কথা। কিন্তু সত্তর ভাগ মানুষ পুরো টাকা শোধ দেয় না।”

ঘটনাটা সবাই জানে। এর মধ্যে ইন্টারেস্টিং কেস কী আছে বুঝতে পারছিল না অর্জুন। সে নড়ে-চড়ে বসল। অমল সোমের কাছে যাওয়ার কথা আছে। কাল রাত্রে হাবুকে দিয়ে তিনি চিঠি পাঠিয়ে দেখা করতে বলেছেন।

জগুদা বললেন, “এদের ব্যাপারটা আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু সম্প্রতি আর-এক ধরনের লোনের জন্যে মানুষ আসছে। তুমি হয়তো জানো, ব্যাঙ্কে সোনার গয়না রেখে লোন পাওয়া যায়। সুদ সমেত সেই টাকা শোধ করে দেওয়ামাত্র গয়না ফেরত দেওয়া হয়। তুমি দেখলে অবাক হয়ে যাবে, এমন সব মানুষ গয়না রেখে লোনের জন্যে আসছে, তাদের দু’ বেলা পেট ভরে খাওয়ার অবস্থা নেই। লোকগুলো হঠাৎ গয়না পেল কী করে কে জানে?” চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “এই লোকগুলো কারা?”

“কাছেপিঠের আদিবাসী মানুষ।

“চা-বাগানে কাজ করে?”

“না, না। সেটাই বিস্ময়ের। চা-বাগানে যারা কাজ পায় না, ঝুপড়ি বেঁধে জঙ্গলে বা রাস্তার ধারে থাকে, ঠিকাদারদের কাছে কাজ করে, তারাই আসছে সোনার গয়না নিয়ে। আর ওই গয়নাগুলো সব এক ধরনের, আঙুলের রিং। খাঁটি সোনার।”

“পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস অথবা জামিনদার আছে?”

“দরকার নেই। তিন-চার ভরি সোনার গয়না থাকলে ব্যাঙ্ক কোনও প্রশ্ন করবে না। মজার কথা হল, যদি বেশি গয়না থাকত, তা হলে তার সোর্স নিয়ে পুলিশকে তদন্ত করতে বলা যেত। প্রশ্ন করলে বলে কয়েক পুরুষ ধরে নাকি ওরা ওই গয়না রেখেছিল। কিন্তু গত তিন মাসে দু’শো পঁচিশজন লোক তিন ভরি থেকে সাড়ে তিন ভরি করে গয়না বন্ধক রেখে পঁচাত্তর ভাগ টাকা ধার নিতে এল, এটা নিশ্চয়ই অভিনব ব্যাপার। তুমি কী বলো?”

সমস্ত ব্যাপারটা শুনে অদ্ভুত ধোঁয়াটে লাগল অর্জুনের। সে জিজ্ঞেস করল, “ঠিক কত ভরি সোনার গয়না আপনারা পেয়েছেন?”

টোটাল ছ’শো দশ ভরি। পাকা সোনা। আংটি কিংবা বালা। প্রায় দু’ কোটি টাকা। আমাদের ব্রাঞ্চের ক্ষমতা মাঝারি। অত ধার দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আর ব্যক্তিগতভাবে সোনার পরিমাণ এত কম, কিছু করতেও পারা যাচ্ছে না।”

“এত সোনা কী করে ওদের হাতে আসছে, অনুমান করছেন?”

জগুদা মাথা নাড়লেন, “না। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। লোকাল থানার ও. সি-কে বলেছিলাম। দু-তিন ভরি সোনার জন্যে তিনি কিছু করতে পারেন না, যদি কেউ অভিযোগ না করে যে, সে ওই গয়না হারিয়েছে। ব্যাঙ্ক তো গয়না খাঁটি জেনেই খালাস। তাই তোমাকে বলেছিলাম, কেস খুব ইন্টারেস্টিং। পারলে চলে এসো মালবাজারে।”

চা খাওয়া হয়ে যেতে জগুদার কাছ থেকে বিদায় নিল অর্জুন। সত্যি‍ই ব্যাপারটা খুব রহস্যজনক। কোনও মানুষ বোধহয় এইভাবে নিজের গোপন সোনার গয়না ব্যাঙ্কে রেখে কিছু টাকা হাতিয়ে নিতে চান, যা প্রকাশ করলে আয়কর দপ্তরের জেরার সামনে পড়তে হবে। এ অনেকটা কালো টাকাকে সাদা করে নেওয়া। কিন্তু তা-ই বা হবে কী করে? যার সঞ্চয়ে অত সোনা রয়েছে; যে বুদ্ধি খরচ করে নিঃস্ব লোকগুলোকে পাঠিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার করে নিচ্ছে—সে ইচ্ছে করলে দেশের যে-কোনও কালোবাজারে বিক্রি করে পুরো টাকা পেত। লোকগুলোকে নিশ্চয়ই কিছু দিতে হচ্ছে কাজ করার জন্যে। তা ছাড়া ধার তো নিজের নামে পাচ্ছে না, তাই আয়কর দপ্তর থেকে নিস্তারও পাবে না। কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল সমস্ত ব্যাপারটা। সাইকেল চালিয়ে হাকিমপাড়ায় চলে এল অর্জুন।

এই সকালে বাগানে কাজ করছিলেন অমল সোম। গেট খোলার শব্দ পেয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অর্জুন লক্ষ করল, অমলদার পরনে ইস্ত্ৰি-ভাঙা পাজামা-পাঞ্জাবি। বেশ সৌখিন মানুষ বলে মনে হচ্ছে। অমলদা জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার হাসছ যে?”

অমলদার সঙ্গে তরল কথা কখনও বলেনি অর্জুন। আজও বলতে বাধল। গম্ভীর হয়ে বলল, “কিছু নয়। কাল রাত্রে হাবুর হাতে আপনার চিঠি পেলাম।”

“হ্যাঁ। তোমার হাতে এখন কোনও কেস আছে?”

“বাঃ, কেস থাকলে আপনি জানতে পারতেন না?” অর্জুনের গলায় একটু অভিমান।

“কী জানি। এখন তো তোমার নামডাক হয়েছে। আমার খুব ভালই লাগে। চা খাবে?”

“না। একটু আগে জগুদা খাওয়ালেন।”

“জগুদা?”

“কদমতলায় থাকেন। মালবাজারের ব্যাঙ্কে কাজ করেন।

“তোমার হাতে যখন কোনও কেস নেই, তখন তুমি আমার একটা উপকার করতে পারো। দিল্লিতে আমার এক পুরনো ক্লায়েন্ট থাকেন। ভদ্রলোককে কোটিপতি বললে কম বলা হবে। লোকটি ভাল। কোনও সাতে-পাঁচে থাকেন না। তাঁর মেয়ে স্কুলের ওপরের দিকে পড়ে। সে তার তিন বন্ধুর সঙ্গে দার্জিলিং-এ বেড়াতে আসছে। সেই সঙ্গে ডুয়ার্সের ফরেস্টে দু-তিন দিন থাকতে চায়। ভদ্রলোক আমাকে অনুরোধ করেছেন, ওরা যে ক’ দিন উত্তর বাংলায় থাকবে, তত দিন যদি ওদের জন্যে একটি ভাল গাইডের ব্যবস্থা করি, যে ওদের নিরাপত্তার ভার নিতেও পারবে, তা হলে ভাল হয়। ওঁর বাসনা ছিল আমি যদি কয়েকটা দিন ওদের সঙ্গে থাকি। তা আমি ভাবলাম, অল্পবয়সী মেয়েদের মানসিকতা বা স্বভাবের সঙ্গে আমার ধরনটা ঠিক মিলবে না। ওরাও একজন বয়স্ক মানুষকে সব সময় কাছে থাকতে দেখে অস্বস্তি বোধ করবে। তার চেয়ে তুমি যদি যাও, তা হলে খুব ভাল হয়। খরচের জন্যে ভেবো না। ওঁর মেয়ের নাম নন্দিনী। তার হাতে একটা আলাদা প্যাকেটে তোমার খরচের টাকা থাকবে।”

অমলদা কথা শেষ করা মাত্র হাবু চায়ের কাপ নিয়ে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। তার হাতে এক কাপ চা। অর্জুনকে দেখে জিভ বের করল সে। অর্জুন হাত নেড়ে নিষেধ করল। সে চা খাবে না। হাবু কথা বলতে পারে না। কানেও কম শোনে, কিন্তু ওর বোধশক্তি, বুদ্ধি, গায়ের জোর খুব। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ওরা কবে আসছে?”

“আজই। বাগডোগরায় দিল্লি ফ্লাইটে। তুমি বেশি সময় পাবে না তৈরি হতে।”

অর্জুনের প্রস্তাবটা মোটেই ভাল লাগল না। কোনও থ্রিল বা রহস্য নেই। চারটে বড়লোকের মেয়েকে পাহারা দিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। মেয়ের বন্ধু যখন, তখন নিশ্চয়ই মেয়ে। মেয়েদের সঙ্গে থাকার কোনও মানেই হয় না। আর ওদের বাবা-মা কী করে কোনও গার্জেন ছাড়াই এত দূরে আসতে দিচ্ছে! অর্জুনকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অমল সোম বললেন, “না, তোমার ওপর আমি কাজটা জোর করে চাপিয়ে দিতে চাই না। ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি।”

অর্জুন নাড়া খেল। আজ পর্যন্ত সে কখনও কোনও অবস্থায় অমল সোমকে অস্বীকার করেনি। তাঁর যে-কোনও অনুরোধই অর্জুনের কাছে আদেশ। আজ পিছিয়ে যাওয়ার কোনও কথাই ওঠে না। যত খারাপ লাগুক, কাজটা তবু সে করবে। অর্জুন বলল, “না, অমলদা, আপনি আমাকে ভুল বুঝেছেন। আমার যেতে কোনও আপত্তি নেই।”

শিলিগুড়িতে বাস থেকে নেমে বাগডোগরা এয়ারপোর্টে যাওয়া খুব ঝামেলার। কোনও বাস নেই সরাসরি। বাগডোগরা শহর থেকে, অবশ্য যদি শহর বলা যায়, রিকশা নিয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ ডিঙিয়ে তবে এয়ারপোর্ট চত্বরে পৌঁছনো যায়। যাত্রীদের নিজের গাড়ি না থাকলে ট্যাকসি কিংবা অটো ভাড়া করেন। অর্জুনের মনে পড়ল, বিদেশের সব শহরেই এয়ারপোর্ট থেকে শহরে যাতায়াত করে এয়ারলাইনসের বাস। সেটা নিশ্চয়ই এখানে পাওয়া যাবে। বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা নিয়ে অর্জুন চলে এল সিনক্লেয়ার হোটেলে। ওর সামনেই এয়ারলাইনসের অফিস। কিন্তু সেখানে গিয়ে হতাশ হল সে। শিলিগুড়ি শহর থেকে সে রকম কোনও ব্যবস্থা নেই এয়ারপোর্টে যাওয়ার।

অর্জুন ঘড়ি দেখল। সময় বেশি নেই। সিনক্লেয়ার হোটেলটা শিলিগুড়ি শহরের বাইরে। ভুল হয়ে গেল। বাসস্ট্যান্ড থেকে চেষ্টা করলে হয়তো শেয়ারে ট্যাকসি পাওয়া যেত। অর্জুন ঠোঁট কামড়াল। এই সময় হোটেল থেকে বেরিয়ে এলেন স্যুট-পরা এক ভদ্রলোক। ঘড়ি দেখলেন। সঙ্গে-সঙ্গে একটা প্রাইভেট ট্যাকসি পার্কিং লট থেকে গড়িয়ে এল। ড্রাইভার মুখ বের করে বলল, “বলিয়ে সাব, কাঁহা যানা হ্যায়।”

“এয়ারপোর্ট। জলদি।”

“ষাট রুপিয়া ওয়ান ওয়ে।”

“ঠিক হ্যায়।” ভদ্রলোক পেছনের দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসলেন। অর্জুন আর ইতস্তত করল না। দৌড়ে গাড়ির কাছে গিয়ে বলল, “আমাকে দয়া করে এয়ারপোর্ট নিয়ে যাবেন? আমি কোনও ট্রান্সপোর্ট পাচ্ছি না।”

ভদ্রলোক অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। কিন্তু সেই সময় ড্রাইভার বলল, “নিয়ে নেব স্যার?”

ভদ্রলোক যেন অনিচ্ছায় মাথা নাড়লেন। গাড়ি হোটেল থেকে বেরিয়ে ডান দিকে বাঁক নিল। অর্জুন চুপচাপ বসে ছিল। লরি, টেম্পো, মিনিবাস ছুটে যাচ্ছে হাইওয়ে দিয়ে। বাঁ দিকে চা-বাগান। শেষ পর্যন্ত বাগডোগরা বাজার হয়ে বাঁ দিকে সংরক্ষিত এলাকায় তারা ঢুকে পড়ল। একজন সান্ত্রী দাঁড়িয়ে থাকে লক্ষ করার জন্য। ইচ্ছে হলে গাড়ি থামিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, কিন্তু করল না। অর্জুন দেখল, এয়ারফোর্সের লোকজন সাইকেলে চেপে ফিরছে।

বাগডোগরা এয়ারপোর্টটাকে দেখে চট করে এয়ারপোর্ট বলেই মনে হয় না। যদিও প্রচুর গাড়ি রয়েছে, হলঘর, কাউন্টার, সিকিউরিটি এনক্লোজার এবং রেস্টুরেন্ট আছে, কিন্তু তবু এয়ারপোর্ট বলে মনে হয় না। সব কিছুই শিথিল, ঘরোয়া। ট্যাকসি থেকে নেমে সে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, “কত দিতে হবে?”

“দশ টাকা।”

অর্জুন টাকাটা দিয়ে আর দাঁড়াল না। ছুটে হলঘরে ঢুকে কাউন্টারের কাছে পৌঁছে দেখল, দিল্লি ফ্লাইট ঠিক সময়ে আসছে। অর্থাৎ আর মিনিট-দশেক বাকি। সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ফ্লাইট পৌঁছে গেলে মেয়েগুলো নিশ্চয়ই ওর জন্যে দাঁড়াত না। তখন অমলদাকে কী কৈফিয়ত দিত সে?

সিগারেট ধরাল অর্জুন। বাড়ি ফিরে খুব অল্প সময় পেয়েছে তৈরি হবার নিউ ইয়র্ক থেকে কেনা ব্যাগটায় জামাকাপড় পুরে চলে এসেছে কোনও মতে। আবার দাড়ি রেখেছে সে। কত সুন্দর দাড়ি। অনেকটা তরুণ রবীন্দ্রনাথের মতো। ফলে দাড়ি-কাটার ঝামেলায় পড়তে হয় না আজকাল। অর্জুনের খেয়াল হল, তাড়াহুড়োতে নীল বাহারি জ্যাকেটটা ফেলে এসেছে বাড়িতে। ওটা পরলে তাকে খুব সুন্দর দেখায়।

সিগারেটে টান দিতে-দিতে হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল অর্জুন। সর্বনাশ হয়ে গেছে। অমলদাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, নন্দিনীকে দেখতে কী রকম! কীভাবে সে চিনবে তাকে! যদি চারজন মেয়েকে একসঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়, তা হলে নাহয়….! যদি চারজন মেয়ের বদলে দু’জন ছেলে, দু’জন মেয়ে হয়? অর্জুন সিগারেট নিভিয়ে অ্যাশট্রেতে ফেলে দিল। বেশ নার্ভাস হয়ে পড়ছিল সে। এই সময় বাইরের আকাশে প্লেনের গর্জন শোনা গেল। যে সব মানুষ এয়ারপোর্টে এসেছেন, তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। অর্জুন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। প্লেন নীচে নেমে এল। রানওয়ে দিয়ে দৌড়ে দম নিয়ে বাঁক খেয়ে শেষ পর্যন্ত কাছাকাছি এসে থেমে যেতেই সিঁড়ির গাড়ি দৌড়ে গেল। যাত্রীরা নামতে আরম্ভ করলেই অর্জুন প্রত্যেককে লক্ষ করতে লাগল। এবং এই সময় পনেরো-ষোলো বছরের প্যান্ট শার্ট পরা চারটে মেয়েকে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নেমে আসতে দেখল। মেয়েগুলো সুন্দরী কিন্তু পুতুল-পুতুল নয়। হাঁটার ভঙ্গিতে সপ্রতিভতা পরিষ্কার। অর্জুন দেখল, আত্মীয়স্বজন-বন্ধুরা আগত যাত্রীদের আপ্যায়ন করে নিয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা গেট পেরিয়ে এসে চার পাশে তাকাতে লাগল। অর্জুন আরও একটু অপেক্ষা করল। ওরা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলছে। দিল্লির মেয়ে বাঙালি হবে না এমন ভাবার কোনও কারণ ছিল না। অথচ অর্জুন তাই ভেবেছিল। একটি মেয়ে বলল, “স্ট্রেঞ্জ। সামওয়ান শ্যড কাম। ড্যাড টোল্ড মি লাইক দ্যাট।”

দ্বিতীয়জন ইংরেজিতে জবাব দিল, “না এলে আমরা অনন্তকাল বসে থাকতে পারি না। লেটস গো।” ওরা কোনও বড় লাগেজ আনেনি। যে-যার হাতের ব্যাগ তুলে নিল বিরক্ত মুখে। এবার অর্জুন এগিয়ে গেল, “নমস্কার।”

ওরা চারজন থতমত হল এক মুহূর্তের মতো। সামনের মেয়েটি মুখে বিরক্তি নিয়ে বলল, “ইয়েস?”

অর্জুন গম্ভীর হয়ে ইংরেজিতে বলল, “আমার নাম অর্জুন। দিল্লি থেকে মিস্টার রায় আমার সিনিয়র অমল সোমকে চিঠি দিয়েছেন।” অমলদার দেওয়া চিঠিটা এগিয়ে ধরল অর্জুন। ওই চিঠি মিস্টার রায় অমলদাকে পাঠিয়েছিলেন।

মেয়েটি চিঠি নিয়ে খুলে ফেলল খামটা। একবার আগাগোড়া তাকিয়ে নিয়ে আবার ফেরত দিয়ে বলল, “আমি নন্দিনী। আমরা ভেবেছিলাম কেউ হয়তো আসেনি। হোটেল কত দূরে?” অর্জুন মাথা নাড়ল, “দুঃখিত, এখানে হোটেল নেই। আধঘণ্টার গাড়ির দূরত্বে শিলিগুড়ি শহর। সেখানে যেতে হবে।

অন্য একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমরা আজই দার্জিলিং যেতে পারি না?”

“পারেন।” অর্জুন ওদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতেই ট্যাকসিওয়ালারা ছুটে এল। সবাই ওদের নিয়ে যেতে চায়। সে একটু দরাদরি করতে চাইল। এই সময় এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন মেয়েদের কাছে। কথা বলার জন্য অর্জুন খানিকটা দূরে ট্যাকসিগুলোর সামনে দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে ভদ্রলোককে দেখতে গেল। পেয়ে চমকে উঠল। এই লোকটির সঙ্গেই সে সিনক্লেয়ার হোটেল থেকে এয়ারপোর্টে এসেছিল। ইনিই ট্যাকসিটাকে ভাড়া নিয়েছিলেন। সে বুঝতে পারছিল না তার সঙ্গী মেয়েদের সঙ্গে ওঁর কী দরকার। মনে পড়ল, এয়ারপোর্টে আসার সময় ইনি সঙ্গে কোনও লাগেজ আনেননি। অর্থাৎ ইনি যাত্রী নন, কাউকে নিতে এসেছেন। তিনশো টাকায় দার্জিলিং-এ যাওয়া রফা করে অর্জুন ফিরে আসতেই নন্দিনী বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কল, উই ক্যান টেক কেয়ার অব আওয়ারসেলফ। আপনি যে খবর পেয়ে আমাদের জন্যে এসেছেন, তার জন্যে অনেক ধন্যবাদ।”

ভদ্রলোক সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর চোয়াল শক্ত। তিনি বললেন, “তোমাদের একটা কথা মনে রাখা উচিত। এই সব এরিয়া শান্তিপূর্ণ নয়। এখানে তোমরা খুব সেফ নও।”

নন্দিনী হাসল, “সে সব খবরের কাগজেই পড়েছি। তা ছাড়া এসকর্ট হিসেবে এই ভদ্রলোক আছেন। বাবা এঁদের ওপর খুব নির্ভর করেন।”

ভদ্রলোক অর্জুনের দিকে তাকালেন, “আপনি…আপনাকে একটু আগে লিফট দিয়েছি না?”

“ঠিকই।” অর্জুন মাথা নাড়ল। তারপর নন্দিনীকে বলল, “দার্জিলিং-এ যেতে হলে এখনই রওনা হওয়া উচিত। ট্যাকসি ঠিক হয়ে গিয়েছে।”

সঙ্গে-সঙ্গে মেয়েরা হই-চই করে ট্যাকসিটার দিকে এগিয়ে গেল। সবাই জানালার পাশে জায়গা চায়। ডিকিতে ড্রাইভার হাতব্যাগগুলো রেখে দিতেই অর্জুন পা বাড়াতে যাচ্ছিল। এই সময় ভদ্রলোক ওকে থামালেন, “ইয়েস ইয়ংম্যান, আমি কি তোমার পরিচয় জানতে পারি? এই মেয়েরা আমার পরিচিত। তুমি কোথায় থাকো?”

“জলপাইগুড়ি শহরে। আমার নাম অর্জুন। “কী করো তুমি?”

“কিছু না।” কথাটা বলে অর্জুন ট্যাকসির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পেছনে তিনজন বসেছে, ড্রাইভারের পাশে যে মেয়েটি বসেছে তার নাম জানা নেই। বসতে হলে তাকে সামনে বসতে হবে। মেয়েটি দরজা খুলে নেমে দাঁড়াল, “আপনি নিশ্চয়ই দার্জিলিং-এ অনেক বার গিয়েছেন। তাই ভেতরে বসতে নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না!”

অর্জুন কথা না বাড়িয়ে মাঝখানে বসতেই ট্যাকসি ছাড়ল। মেয়েরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। এই চিৎকারের অর্থ অর্জুন বুঝল না। প্রায় চার-পাঁচবার চিৎকারটা করে নন্দিনী বলল, “আপনার নামটা কী যেন?”

“অৰ্জুন।”

“ও, মহাভারাতা? ও. কে! শুনুন, আমরা এ রকম আওয়াজ মাঝে-মাঝেই করি। আপনি কিছু মনে করবেন না। শুধু রিলে করে যান রাস্তাটা। আমরা শুনে চিনব।

এয়ারপোর্টের চৌহদ্দি থেকে ন্যাশনাল হাইওয়েতে পড়ামাত্র নন্দিনী জিজ্ঞেস করল, “আরে, এখানে কি পাহাড় নেই?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “না। পাহাড় পাবেন শিলিগুড়ি ছাড়ালে। এই জায়গাটার নাম বাগডোগরা। এর কাছাকাছি আছে ফাঁসিদেওয়া, যেখানে সত্তর দশকের আন্দোলন শুরু হয়েছিল।”

নন্দিনীর বান্ধবীদের নাম ইতিমধ্যে শুনে-শুনেই জেনে গিয়েছিল অৰ্জুন। রোগা মেয়েটি, যার চোখে চশমা, চুল ছেলেদের মতো ছাঁটা, জিজ্ঞেস করল, “আন্দোলন? কিসের আন্দোলন?”

এই মেয়েটির নাম টিনা। অর্জুন বুঝল, এরা প্রায় কুড়ি বছর আগের ঘটনাবলী সম্পর্কে নেহাৎই অজ্ঞ। আর অত কথা বোঝাবার সময় এবং ইচ্ছে দুটোই এখন নেই। সে বলল, “একটা রাজনৈতিক আন্দোলন।

টিনা বলল, “ওঃ, আমরা রাজনীতিতে ইন্টারেস্টেড নই।

অর্জুন হাসল, “আপনারা কিসে-কিসে ইন্টারেস্টেড?”

স্পোর্টস, ক্রাইম ফিকশন, মিউজিক আর অ্যাডভেঞ্চার।” নন্দিনী জবাব দিয়েই জানতে চাইল, “আপনি? আচ্ছা আপনার বয়স কত?”

“তেইশ।”

“তা হলে কুড়ি বছর আগের ঘটনা আপনি জানলেন কী করে?”

“যে ভাবে আমরা মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পার কথা জেনে থাকি।”

“আ-চ-ছা! হ্যাঁ, আপনার কিসে ইন্টারেস্ট?”

“সত্যসন্ধান।”

“হোয়াটস দ্যাট?”

“যে ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর মনে হয় রহস্য লুকিয়ে আছে অথবা আপাতভাবে কোনও রহস্য নেই বলে মনে হলেও কয়েকটা ব্যাপারে খটকা থাকে, সেই ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত করতে আমার ভাল লাগে, তা ছাড়া ওটা এখন আমার পেশা।

“মাই গড! আপনি ডিটেকটিভ?”

“ঠিক তা নয়। আমি সত্যসন্ধান করি মাত্র।”

সঙ্গে-সঙ্গে কান ফাটানো সেই চিৎকারটা ছিটকে বেরোল মেয়েদের মুখ থেকে। অর্জুনের কান লাল হয়ে গেল। এরা কি তাকে অবিশ্বাস করছে? ট্যাকসির ড্রাইভার পর্যন্ত হাঁ হয়ে গেল। নন্দিনী বলল, “ওঃ দারুণ! আমরা তা হলে একজন ডিটেকটিভের সঙ্গে থাকব। কিন্তু আপনার কি মনে হয় না, ডিটেকটিভ হবার পক্ষে যে বয়সটা দরকার, সেটা হতে অনেক দেরি আছে। বিদেশি উপন্যাসে এত ইয়ং ডিটেকটিভ—‘হার্ডি বয়েস’ বা ‘ফেমাস ফাইভ’-দের তো ম্যাচিওরড্ বলা যায় না।

অর্জুন বলল, “আমি জানি না। তবে একটা তদন্তের ব্যাপারে আমি ইংল্যান্ড আর আমেরিকায় গিয়েছিলাম, সেখানে কিন্তু বয়স নিয়ে ঝামেলা হয়নি।”

সঙ্গে-সঙ্গে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হল। চারটে মেয়েই পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল। যেন তারা নিজেদের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। টিনা অবিশ্বাসী-গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি স্টেটসে তদন্ত করতে গিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। একটা লাইটার নিয়ে সমস্যা হয়েছিল।”

নন্দিনী চোখ কপালে তুলল, “ও মাই গড! মনে পড়েছে। কাগজে পড়েছিলাম, একজন তরুণ ভারতীয় গোয়েন্দা স্টেটসে গিয়ে ক্যান্টার করেছে। সেই লোক আপনি?”

এই সময় ড্রাইভার হাইওয়ে থেকে গাড়ি বাঁ দিকের কয়েকটি ঝুপড়ি দোকানের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার?”

“তেল নেব স্যার।”

“তেল? এখানে পেট্রল পাম্প কোথায়?”

“দু নম্বর তেল। এক নম্বর কিনলে পোষাতে পারব না। এরা পাঁচ টাকা লিটার নেয়, তিন টাকা সত্তর কম। একশো টাকা দিন। অ্যাডভান্স।”

অর্জুন হতভম্ব। সে কোনও দিন এই ঘটনা চোখে দেখেনি। এই বেআইনি তেল কিনতে দেওয়াটা এক ধরনের অন্যায়কে সমর্থন করা। সে মাথা নাড়ল, “আপনি যদি আমাকে না জানিয়ে তেল নিতেন, তা হলে আমার কিছু বলার ছিল না। কিন্তু জানতে পারার পরে এখান থেকে আপনাকে তেল নিতে দিতে পারি না।”

“আমি জানাতে গেছি নাকি? আপনিই তো জানতে চাইলেন।

“আপনার একবারও মনে হচ্ছে না, এই গরিব লোকগুলো সস্তায় তেল দিচ্ছে কী করে?”

“চোরাই তেল। প্রাইভেট কিংবা কম্পানির গাড়ির ড্রাইভারেরা লুকিয়ে তেল বিক্রি করে দেয় এদের কাছে হাফ দামে। ওরা আবার আমাদের কাছে বিক্রি করে।

“এই সব গরিব মানুষগুলোর ক্ষমতা আছে তেল কিনে ব্যবসা করার?”

“তা জানি না। হয়তো পেছনে কেউ আছে, সেই টাকা ঢালছে। আমার কী দরকার ও সবে, আমি তেল পাচ্ছি, তাই ঢের!”

ওরা যখন কথা বলছে, সেই সময় দু’জন আদিবাসী মহিলা এগিয়ে এসেছে গাড়ির কাছে। তাদের একজন জিজ্ঞেস করল, “ক” লিটার লাগবে?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “তেল লাগবে না। চলুন, সামনের পাম্প থেকে নেবেন।”

ড্রাইভার একটু ভাবল। তারপর বলল, “তা হলে আমাকে মাপ করবেন। আমি দার্জিলিং যেতে পারব না। কথাটা সরাসরি বলে দেওয়াই ভাল।”

“তা, এই কথা এয়ারপোর্টেই বলেননি কেন?”

“আমি তো যেতেই চেয়েছিলাম। কে জানত, আপনি এমন ঝামেলা করবেন?”

অর্জুন পেছনে তাকাল, “আপনারা কী চাইছেন?”

টিনা বলল, “আপনাকে আমি সাপোর্ট করছি।”

নন্দিনী বলল, “কাছাকাছি কোনও পুলিশ স্টেশন নেই?

এবার ড্রাইভার হাত জোড় করল, “মাপ করবেন দাদা, আপনারা পুলিশে খবর দিলে কী হবে জানি না, তবে এই লাইনে ট্যাকসি চালানো আমার বন্ধ হয়ে যাবে। দয়া করে গরিবের ভাত মারবেন না।

ড্রাইভার আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি চালু করল। নন্দিনী মন্তব্য করল, “এখানে পা দিয়েই করাপশন দেখলাম। আপনি তো সত্যসন্ধানী, এর একটা বিহিত করুন, তেল কম্পানি থেকে নিশ্চয়ই ফি পাবেন।”

অর্জুন জবাব দিল না। হঠাৎ বাঁ দিকে চোখ পড়ায় সে বলল, “ওইটে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি।”

মেয়েরা দেখল। কিন্তু কোনও মন্তব্য করল না। শিলিগুড়িতে পৌঁছে বাঁ দিকে না ঘুরে ট্যাকসি শহরের দিকে যেতে লাগল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনি সত্যিই দার্জিলিং-এ যাবেন না?”

ড্রাইভার কথা না বলে মাথা নেড়ে “না” বলল।

অর্জুন ঘড়ি দেখল। লোকটাকে আর অনুরোধ করবে না বলে ঠিক করল। সে পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করল, “আপনাদের প্রোগ্রামটা যদি আমাকে খুলে বলেন।

নন্দিনী বলল, “কোনও স্টিরিও-টাইপ প্রোগ্রাম নেই। ঘুরব, হই-হই করব।”

“আপনারা কি আজ রাত্রে শিলিগুড়িতে থাকতে চান?”

নন্দিনী ঘাড় ঘুরিয়ে দু’ পাশের রাস্তাঘাট দেখল। তারপর বলল, “এইটেই শিলিগুড়ি? না-না, এটা তো ঘিঞ্জি শহর। দার্জিলিং যদি না যাওয়া যায়, তা হলে কোনও নির্জন জায়গায় যাওয়া যায় কি না ভেবে দেখুন।”

ততক্ষণে গাড়ি ‘এয়ার ভিউ’ হোটেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্জুন ড্রাইভারকে বলল, “আপনি কি দয়া করে আর-একটু এগিয়ে যাবেন?”

লোকটি কথা শুনল যেন অনিচ্ছায়। বিশেষ একটি বাড়ির সামনে গিয়ে অর্জুন ভাড়া মিটিয়ে দিল। সিনক্লেয়ার হোটেল থেকে সেই ভদ্রলোক এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় যে ভাড়া দিয়েছিলেন, তার থেকে দশটা টাকা বেশি দিল শহরে ঢোকার বাড়তি পথটুকু আসার জন্যে। অর্জুন মেয়েদের বলল, “আপনারা আমার সঙ্গে আসতে পারেন!”

পুনম নামের মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছেন?”

“ওপরে টুরিস্ট-ব্যুরোর অফিস। আমার পরিচিত একজন ভদ্রলোক আছেন চার্জে, ওঁর সঙ্গে কথা বললে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

মেয়েদের নিয়ে অর্জুন ওপরে উঠে এল সরু সিঁড়ি বেয়ে। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে সে একজনকে জিজ্ঞেস করল, “মিস্টার ভট্টাচার্য আছেন?”

“ও পাশের ঘরে।” ভদ্রলোক দেখিয়ে দিলেন। ট্যুরিস্ট-ব্যুরোর এই অফিসারের সঙ্গে অর্জুনের আলাপ হয়েছিল অমল সোমের মাধ্যমে। খুব ভদ্র মানুষ, নিয়মিত সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। দরজায় দাঁড়ানো মাত্র তিনি চিৎকার করলেন নিজের চেয়ারে বসে, “আরে অর্জুনবাবু যে, এসো এসো। হঠাৎ শিলিগুড়িতে, কী ব্যাপার?”

অর্জুন ভদ্রলোকের সঙ্গে মেয়েদের আলাপ করিয়ে দিল। ওরা কেন এসেছে, তাও জানাল।

সব শুনে মিস্টার ভট্টাচার্য বললেন, “দেখুন, আপনারা এসেছেন উত্তর বাংলা দেখতে। আমি সাজেস্ট করব, প্রথমেই দার্জিলিং-এ না গিয়ে আপনার ডুয়ার্সটা দেখুন।”

“ডুয়ার্স?” টিনা জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ। উত্তর বাংলার আসল সৌন্দর্য যেখানে, জঙ্গল।”

“ওহ্ ফ্যান্টাস্টিক!” নন্দিনী বলে উঠল, “কিন্তু জঙ্গলে আমরা থাকব কোথায়?”

“প্রত্যেকটা ফরেস্ট বাংলোয় আমাদের একটা করে ঘর আছে।” মিস্টার ভট্টাচার্য বললেন, “কিন্তু সেগুলোতে ব্যবস্থা আমি আগামী কাল থেকে করে দিতে পারব। আজকের রাতটা আপনারা মালবাজার ট্যুরিস্ট লজে থাকুন। আমি টেলিফোন করে দিচ্ছি, যাতে দুটো ডাব্‌ল আর একটা সিঙ্গল রুম আপনারা পান।”

মেয়েরা রাজি হয়ে গেল। মিস্টার ভট্টাচার্য ওদের ট্যুর-প্রোগ্রাম করলেন। সেই রাত ওরা থাকবে মালবাজার ট্যুরিস্ট লজে। পরের দিন যাবে চাপড়ামারি ফরেস্টে।

সেখানে একটা রাত থেকে তার পরের দিন যাবে গরুমারা ফরেস্টে। গরুমারা থেকে ওরা যাবে হলং ডাকবাংলোতে। সেখান থেকে সোজা শিলিগুড়িতে ফিরে এসে দাজিলিং-এর বাস ধরবে। প্রোগ্রাম তৈরি করে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের সঙ্গে কী রকম লাগেজ আছে?”

টিনা বলল, “জাস্ট এই ব্যাগগুলো।”

“ও, তা হলে ভালই হল। এখনই বাসে রওনা হয়ে যান। ট্যাকসি ভাড়া করে খরচ বাড়ানোর দরকার নেই। আমি সমস্ত ফরেস্ট বাংলোয় খবর পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

বাইরে বেরিয়ে এসে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনারা নিশ্চয়ই বাসে যেতে পারবেন না। চলুন, ট্যাকসি দেখি।”

টিনা বলল, বাসে বসার জায়গা পেলে ট্যাকসি নেওয়ার কী দরকার? আমরা বাসে গেলে লোক্যাল মানুষের সঙ্গে মিশতে পারি।”

অর্জুন হাসতে গিয়ে সামলে নিল। দিল্লির এই মেয়েরা জিনসের প্যান্ট আর শার্ট পরে এসেছে। স্থানীয় মানুষেরা ওদের কিছুতেই সহজ মনে নিতে পারবে না। মেলামেশা তো দূরের কথা!

সেবক রোড হয়ে যে সব বাস মালবাজার দিয়ে ডুয়ার্সে যায়, তার একটাতে উঠে বসল ওরা। বসার জায়গা পাওয়া গেল। মেয়েরা অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিল লেডিস সিটে বসে। অর্জুন পেছনে জায়গা পেয়েছিল। সে ভাবছিল, অমলদা তাকে অদ্ভুত এক ঝামেলায় ফেলে দিয়েছেন। এই মেয়েগুলোকে ডুয়ার্স ঘুরিয়ে দেখানো মানে কিছুটা সময় নষ্ট করা। তার মনে পড়ল অমলদা বলেছিলেন, নন্দিনীর বাবা খরচ চালানোর জন্যে একটা খাম মেয়ের হাতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু এতক্ষণে একবারও নন্দিনী সেই প্রসঙ্গ ওঠায়নি। আর লজ্জায় অর্জুন নিজেও বলতে পারেনি।

বাসে তেমন ভিড় নেই। বাস ছাড়ার মুহূর্তে অর্জুনের নজর পড়ল একটা ট্যাকসির দিকে। এইমাত্র এসে দাঁড়াল সেটা। ড্রাইভারটা যেন পরিচিত। তারপরেই খেয়াল হল, ওই ট্যাকসিতে চড়ে সে আজ এয়ারপোর্টে গিয়েছিল। এবং তখনই দেখতে পেল ভদ্রলোককে। নন্দিনীর সঙ্গে এঁর একটা আলাপ হয়েছিল। কিন্তু ভদ্রলোক এখানে কী করছেন। পেছনের দরজা খুলে এপাশ-ওপাশ তাকাতে লাগলেন তিনি, আর অর্জুনদের বাসটা চলা শুরু করল।

লোকটার সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। ওর হাবভাব মোটেই ভাল লাগছে না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এই চিন্তাটা মাথা থেকে সরে গেল। মেয়েরা চিৎকার করে জানতে চাইছে ওটা কী নদী, এটা কোন পাহাড়, আর সে পেছনে বসে জানিয়ে যাচ্ছে। বাসের অন্য যাত্রীরা কৌতুক বোধ করছিল। অর্জুন দেখল, তাদের অনেকেই মেয়েদের কৌতূহল মেটাচ্ছে আগ বাড়িয়ে। সে খুশি হল, আর চেঁচাতে হচ্ছে না। সেবক ব্রিজ পেরিয়ে বাসটা যখন পাহাড় থেকে নেমে ওদলাবাড়ি-বাগরাকোট দিয়ে ছুটছে, তখন সূর্যদেব পাটে বসেছেন। অর্জুন টাকার কথা চিন্তা করছিল। এর মধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। প্রচুর টাকা নিয়ে সে বের হয়নি। এবার মুখ ফুটে চাইতে হবে। এই সময় নন্দিনী গলা তুলে জানতে চাইল, “কোথাকার টিকিট কাটতে হবে?”

অর্জুন গম্ভীর গলায় জানিয়ে দিল, “আমিই কাটছি।”

মালবাজারের বাসস্ট্যান্ডে বাস দাঁড়াতেই অর্জুন ট্যুরিস্ট লজটা দেখতে পেল। দেখেই বেশ পছন্দ হয়ে গেল। এমন সুন্দর ডিজাইনের বাংলোবাড়ি দেখলেই থাকতে ইচ্ছে হয়। মেয়েরাও দেখে বেশ উত্তেজিত। একটা মাঠ পেরিয়ে স্টেট ব্যাঙ্কের অফিসকে ডান হাতে রেখে ওরা ট্যুরিস্ট লজে পৌঁছে গেল। পুনম বলল, “ফ্যান্টাস্টিক। এ রকম জায়গায় এমন বাংলো, ভাবা যায়? আমাদের থাকতে দেবে তো?”

অর্জুন হাসল, কিন্তু কোনও জবাব দিল না। ভট্টাচার্যদা যখন আশ্বাস দিয়েছেন, তখন এরা বিমুখ করবে না। দোতলার বারান্দায় চেয়ার সাজানো। সেখান থেকেই মেয়েরা দূরের পাহাড়, মাঠ, চা-বাগান আর ডুবন্ত সূর্য দেখতে পেল। ওরা তিনখানা ঘর পেল। জানা গেল, শিলিগুড়ি থেকে টেলিফোনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নন্দিনী আর টিনা এক ঘরে, পুনম আর চিঙ্কি দ্বিতীয়টায়, আর কয়েকটা স্টেপ ওপরে একটা ঘরে অর্জুন ঢুকে পড়ল। ব্যাগটাকে রেখে সে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল জানালা খুলে দিয়ে। আকাশে এখন লাল রং ছড়ানো। সেদিকে তাকিয়ে অর্জুনের মনে হল, তার পাহারা দিতে আসাই সার হবে, এই সব মেয়ে এমন-কিছু লবঙ্গলতিকা নয়, নিজেদের ঝুঁকি নিজেই নিতে পারে। এই ঘরে দ্বিতীয় বিছানাটি খালি। এমন পাণ্ডববর্জিত জায়গায় নিশ্চয়ই এই সন্ধের সময়ে কেউ এসে উঠবে না মালবাজারে…। হঠাৎ মাথার ভেতর জগুদার মুখ ভেসে উঠল। একেই কি কাকতালীয় ব্যাপার বলে? আজ সকালে যখন কদমতলার মোড়ে জগুদার কাছে সোনা বিক্রির গল্প শুনছিল, তখন বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না, তাকে এই মালবাজারে সন্ধেবেলায় আসতে হবে। জগুদা তাকে একবার এখান থেকে ঘুরে যেতে বলেছিলেন। মনে হয়, আজ রাত্রে জগুদা জলপাইগুড়ি থেকে এখানে আসবেন না। ব্যাঙ্ক খোলার আগেই কাল সকালের ফার্স্ট বাস ধরে পৌঁছে যাবেন। কাল তাদের যাওয়ার কথা চাপড়ামারি আর গরুমারা ফরেস্টে। এ-যাত্রায় জগুদার সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তা ছাড়া সে এসেছে পাহারাদার হিসেবে, সোনার উৎস সন্ধান করতে নয়।

এই সময় দরজায় শব্দ হল। অর্জুন মার্কিনি কায়দায় উচ্চারণ করল, “ইয়া।”

সঙ্গে-সঙ্গে চারটে মেয়ে একসঙ্গে ঢুকে পড়ল ঘরে। পুনম ছুটে গেল জানালায়, “কাম হিয়ার, এখান থেকে সূর্য-ডোবা দেখা যাচ্ছে।”

“আমি সান-সেট দেখতে ভালবাসি না। আমি প্রেফার করি সান-রাইজ। চিঙ্কি বলল।

ওরা ঘরে ঢুকতেই অর্জুন উঠে বসেছিল। মেয়েরা দুটো খাটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসল। শুধু নন্দিনী টেবিলের উপর উঠে বসে চেয়ারে পা তুলে দিল। অর্জুন লক্ষ করল, এর মধ্যেই ওরা পোশাক পালটে ফেলেছে। প্যান্ট ছেড়ে ম্যাকসি পরেছে চারজনেই। তাদের রং খুব জোরদার।

নন্দিনীর কাঁধে একটা সরু স্ট্র্যাপের চামড়ার ব্যাগ। অর্জুনকে জিজ্ঞেস করল, “এখন আমাদের প্রোগ্রাম কী? নিশ্চয়ই বাংলোয় বসে থাকার জন্যে আমরা এত দূর আসিনি?”

অর্জুন ফাঁপরে পড়ল। সে বলল, “মুশকিলে ফেললেন, এ সব জায়গায় সন্ধে নামতেই ভূতেদের রাজত্ব হয়ে যায়। তখন কেউ বাড়ির বাইরে বের হয় না।”

“ভূত? দারুণ ব্যাপার। আই রেড লট অব ঘোস্ট স্টোরিস।” টিনা বলল।

অর্জুন তাড়াতাড়ি কথা ঘোরাল, “না, না, মানে, ভূত বলতে আমি অন্ধকার মিন করেছি। সন্ধের পর কেউ এখানে পথে বের হয় না।”

“কেন?” নন্দিনী জিজ্ঞেস করল।

“রাস্তায় তেমন আলো নেই, কিছু দেখা যায় না। দেখার জিনিসও বিশেষ কিছু নেই মালবাজারে। আজকের রাতটা রেস্ট নিয়ে কাল যেখানে যাব…।”

“শুনুন মিস্টার মহাভারতা! আমরা এখানে ঘরে বসে থাকার জন্যে আসিনি। আামদের সঙ্গে টর্চ আছে। অন্তত ঘন্টা-খানেক হাঁটব আমরা। রাত্রের গাছপালা, তার সৌন্দর্য দেখব। শুনেছি সাইলেন্সেরও একটা সাউন্ড আছে। সেটা জানতে চাই। কিন্তু তার আগে আমাদের কিছু খাওয়া দরকার।”

অর্জুন খাট থেকে নেমে দাঁড়াল, “আপনারা লাউঞ্জে অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।”

“কেন?” চিঙ্কি বলল, “আপনি আবার সাজগোজ করবেন নাকি? এই পোশাকেই চলুন। বললেন তো রাস্তায় লোক থাকে না রাত্রে, দেখবে কে আপনাকে?”

এমন কথা কোনও মেয়ের মুখে কখনও শোনেনি অর্জুন। তার চেনাজানা চৌহদ্দিতে অল্পবয়সী মেয়ের সংখ্যা খুব কম। যারা আছে তারা কথা গিলতে পছন্দ করে, কথা বলতে নয়। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করে নিয়ে বলল, “চলুন, আপনারাও কি এই পোশাকেই যেতে পারবেন?”

নন্দিনী লাফ দিয়ে টেবিল থেকে নামল, “ইয়েস জনাব। রাত্রে তো কেউ আমাদের সাজ দেখবে না।”

শুধু চা-টোস্ট আর ওমলেট পাওয়া গেল লজের ক্যান্টিনে। তাই খেয়ে ওরা যখন নামতে লাগল সিঁড়ি বেয়ে, তখন ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা হল। ভদ্রলোক ফিরছিলেন, জিজ্ঞেস করলেন, “এই সময়ে চললেন কোথায়?”

নন্দিনী জবাব দিল, “ঘুরতে।”

“ও। যেতে হলে বাঁ দিকে যান, দোকানপাট কিছু পাবেন, ডান দিকে না যাওয়াই ভাল।”

ওরা নেমে এল মাঠে। নন্দিনী বলল, “আমরা ডান দিকেই যাব।”

অর্জুন বলল, “শুনলেন তো ম্যানেজারের কথা।”

“দুর। দোকানপাট দেখতে কি আমরা দিল্লি থেকে আসছি!”

অগত্যা বড় রাস্তায় উঠে ওরা ডান দিকে এগোল। এদিকে আলো নেই। নন্দিনীর হাতে টর্চ ছিল। পুনম বলল, “দারুণ লাগছে। কী রোমান্টিক ব্যাপার।”

চিল্কি বলল, “এক-আধটা ভূত থাকলে ভাল হত।”

টিনা নির্জন অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে গান ধরল, “ইয়ে রাত ভিগি ভিগি।”

অর্জুনের ভাল লাগছিল। এই রকম বাঁধন-হারা উচ্ছলতায় ডুবে যাওয়া তার ওই বয়সে হয়নি। অথচ এরা তার থেকে এমন কিছু ছোট নয়। টিনা গান গাইছে আর বাকি তিনজন তালি অথবা টর্চ বাজিয়ে তাকে উৎসাহ দিচ্ছে। মেয়েটার গলা ভাল। ডান দিকে পার্কটাকে রেখে ওরা মিনিট দশেক হাঁটল। এখন অন্ধকারে জোনাকি ছবি আঁকছে। মাঝে-মাঝে একটা-দুটো গাড়ি তীব্র আলো জ্বেলে ছুটে যাচ্ছে। সেই সময় অন্ধকার এবং নির্জনতা ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে। নন্দিনীর গলায় বিরক্তি ফুটে উঠল, “হরিবল্। এভাবে হাঁটা যায়? কোনও নির্জন রাস্তা নেই? ওই তো ও দিক দিয়ে একটা রাস্তা গিয়েছে।”

অনুমতির অপেক্ষা না করে মেয়েরা নেমে পড়ল হাইওয়ে ছেড়ে। বাঁ দিকে জঙ্গলের জন্যে আরও অন্ধকার। অর্জুনের পছন্দ হচ্ছিল না ওরা ওই দিকে যাক। সে বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করছি, আপনাদের সাপের ভয় নেই তো?”

“সাপ? ওরে বাবা! এখানে সাপ আছে নাকি?”

“প্রচুর। নর্থ বেঙ্গলের সাপ বিখ্যাত।

সঙ্গে-সঙ্গে চারটে গলা থেকে একসঙ্গে চিৎকার ছিটকে বেরোল। সবাই দ্রুত পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করল। তড়িঘড়ি বড় রাস্তায় পৌঁছে নন্দিনী বলল, “আগে বলবেন তো?”

“বলার সুযোগ পেলাম কোথায়?”

হঠাৎ টিনা প্রশ্ন করল, “আপনি গুল মারছেন না তো?”

অর্জুন কিছু বলার আগেই দু’জন মানুষ তাদের সামনে এসে নমস্কার করল। জায়গাটা অন্ধকার। তবু যেটুকু বোঝা যায় তাতে অর্জুনের মনে হল, এরা চা-বাগানের শ্রমিক অথবা কোনও কন্ট্রাক্টরের কাছে কাজ করে। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কী চাই?”

একজন হিন্দিতে বলল, “সাব—আপনারা বস্তিতে যেতে গিয়েও ফিরে এলেন, তাই এলাম।”

“হ্যাঁ। ওদিকটায় বড় অন্ধকার।”

“জি সাব। গরিব লোকের বস্তি, তাই আলো জ্বলেনি। আপনারা মালবাজারে নতুন?”

“হ্যাঁ, আজ বিকেলে এসেছি, কাল সকালে চলে যাব।”

“তা হলে সাব, মেমসাহেবদের বলবেন—আমাদের যেন একটু কৃপা করেন।”

“কী কৃপা?” নন্দিনী জিজ্ঞেস করল।

‘মেমসাব, আমরা খুব গরিব। কাজকর্ম নেই। ঘরে যা ছিল, তা বিক্রি করে এত দিন চালিয়েছি। কিন্তু আর পারছি না।”

নন্দিনী বলল, “উফ্। যেখানে যাব, সেখানেই এই প্রবলেম। আমি ভিক্ষে দিই না।”

“না মেমসাব। আমরা ভিক্ষে চাই না। আমার ঘরে তিন পুরুষের জমানো একটু সোনা আছে, এত-দিন অনেক অভাবেও বিক্রি করিনি, তাই কিনে যদি আমাদের বাঁচান।”

“সোনা?” চিঙ্কি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ, মেমসাব।”

“খাঁটি না নকল? আমরা সোনা চিনি না।”

“কসম খেয়ে বলছি মেমসাব। আমরা গরিব মানুষ, ব্যবসাদার নই।” পুনম জিজ্ঞেস করল, “সোনা থাকলে গয়নার দোকানে গিয়ে বিক্রি করছ না কেন?”

“ঠিক দাম দেয় না মেমসাব। তা ছাড়া বলে, আমরা চুরি করেছি, পুলিশে ধরিয়ে দেবে।”

ততক্ষণে অর্জুনের মাথার ভেতরে জগুদার কথাগুলো কাজ করতে আরম্ভ করেছে। এই মালবাজারের ব্যাঙ্কে হাজার-হাজার টাকার সোনা জমা দিয়ে গরিব মানুষগুলো টাকা ধার নিয়ে যাচ্ছে। এটা জগুদার কাছে রহস্য বলেই মনে হয়েছে। এই লোক দুটো কি সেই দলের? অর্জুন এখনই কথা বাড়াতে চাইল না। সে বলল, “শোনো, এই অন্ধকারে কথা বলে লাভ নেই। তা ছাড়া আমাদের কাছে কত টাকা আছে তাও দেখতে হবে। তুমি বরং ঘন্টাখানেক বাদে সোনা নিয়ে ট্যুরিস্ট লজে এসো। আমি সামনেই থাকব। তখন কথা বলা যাবে।’

নন্দিনী ইংরেজিতে বলল, “আপনি কেন মিছিমিছি ডাকছেন? আমি সোনা কিনতে একদম ইন্টারেস্টেড নই। ও সব বিশ বছর আগে মেয়েদের শখ ছিল।”

অর্জুন হেসে বলল, “আমি ইন্টারেস্টেড।

নন্দিনী শুধু মন্তব্য করল, “স্ট্রেঞ্জ!”

এর পরে সোনাটা খাঁটি কি না এ নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা চলল। ট্যুরিস্ট লজের কাছে এসে নন্দিনী ঘুরে দাঁড়াল, “আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম। ড্যাডি একটা খাম দিয়েছিলেন, বলেছিলেন মিস্টার সোম অথবা তাঁর লোক এয়ারপোর্টে এসে যদি আমাদের রিসিভ করেন, তা হলে তাঁর হাতে যেন খামটা দিয়ে দিই। আমাকে ওটা খুলতে বিশেষ করেছিলেন। আপনি জানেন ওতে কী আছে? মিস্টার সোম কি আপনাকে বলেছেন?”

অর্জুন স্বস্তি পেল, “ব্যাপারটা যখন আপনাকে উনি জানাননি, তা হলে আমি জানব কী করে। ওটা সম্ভবত মিস্টার রায় আর মিস্টার সোমের ব্যক্তিগত ব্যাপার।”

মেয়েরা যে-যার ঘরে চলে গেলে অর্জুন লাউঞ্জে চেয়ার টেনে বসল। ও-পাশের একটা চেয়ারে এক প্রৌঢ় বসে ছিলেন। দূরে মালবাজার বাজারের আলো দেখা যাচ্ছে। এই সময় নন্দিনী আবার ফিরে এল। খামটা দিয়ে বলল, “আপনার ঘরে গিয়ে দেখলাম দরজা বন্ধ। এখানে একা বসে বোর হচ্ছেন কেন? ওহো, সেই লোক দুটোর জন্যে অপেক্ষা করছেন?”

অর্জুন হাসল, জবাব দিল না।

এই সময় ওপাশের টেবিলের লোকটি বলে উঠলেন, “কী ব্যাপার? এক্সকারশন? এক কলেজ থেকে আসা হচ্ছে? গুড গুড।” প্রশ্ন আর উত্তর তিনি একই সঙ্গে দিলেন।

নন্দিনী লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এখানে থাকেন?”

“নো নো। আমি শহরে থাকি না। শহরে এক দিনের বেশি থাকলেই আমার মনে অ্যালার্জি বের হয়। কোত্থেকে আসা হচ্ছে?”

“ডেল্লি।”

“গুড। অ্যাডভেঞ্চার করতে চাও তো আমার ওখানে চলে এসো। এখান থেকে কিছু দূর গেলেই ফুন্টসিলিং বলে একটা জায়গা পড়বে। সেখানকার ‘কাফে দ্য মাউন্টেন’-এ আমার খোঁজ করলেই তোমরা হদিস পেয়ে যাবে। আমার নাম রতনলাল গুপ্ত। ও হ্যাঁ, জায়গাটা ভুটানে। অর্থাৎ, তোমাদের এক রকম বিদেশ ঘোরাও হয়ে যাবে সেই সঙ্গে। নো ভিসা।” উঠে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক ফিরে গেলেন তাঁর ঘরের দিকে।

“দারুণ ব্যাপার!” নন্দিনীর মুখে-চোখে উৎসাহ, “আমার মনে হচ্ছে ওঁর ওখানে গেলে খুব মজা হবে। ফুন্টসিলিং-এর কাছাকাছি কি আমরা যাচ্ছি?”

“হ্যাঁ। কিন্তু উনি বললেন শহরে এক দিনের বেশি থাকলে ওঁর অ্যালার্জি হয়, অথচ ফুন্টসিলিং পুরোদস্তুর শহর।” অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ডিনার করবেন কখন?” নন্দিনী ঘড়ি দেখল, “এই সন্ধে বেলায়?”

অর্জুন বলল, “বেশি রাত করবেন না।” নন্দিনী চলে গেল। অর্জুন সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা নিতেই নীচের সিঁড়িতে সেই দুটো লোক হাতজোড় করে এসে দাঁড়াল। অর্জুন সোজা হয়ে বসল, “ও, এসো তোমরা।

যে লোকটা তখন বেশি কথা বলছিল, সে দু’ হাত জড়ো করেই জিজ্ঞেস করল, “ওপরে যাব স্যার? কেউ কিছু বলবে না তো?”

“না না, কেউ কিছু বলবে না, উঠে এসো।”

লোক দুটো সামনে এসে দাঁড়াল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের কাছে সোনা আছে, নাকি সোনার গহনা? নিয়ে এসেছ?”

“হ্যাঁ সাব। সোনার গহনায় খাদ থাকে বলে আমাদের পূর্বপুরুষ সোনার কাঠি করেছিল। আপনি যদি বলেন, তা হলে এখানে বের করতে পারি।”

অর্জুন ইশারা করতেই লোকটা ধুতির খুঁট খুলে একটা ছোট্ট কাপড়ের ব্যাগ বের করল। জলঢাকা হাইড্রোইলেকট্রিক্যাল প্রজেক্টের আলো এত টিমটিমে যে, অর্জুনকে চোখ বড় করতে হল। কাপড়ের ব্যাগটা সন্তর্পণে খুলে একটা সোনালি কাঠি বের করল লোকটা। করে অর্জুনের হাতে দিল। প্রথম দর্শনেই অর্জুনের মন বলল, জিনিসটা খাঁটি সোনা। কিন্তু সত্যিই কি সোনা? সে হাতের তালুতে কাঠিটাকে রেখে এবার নাচাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কতখানি সোনা আছে এতে?”

“সাব, এক ভরি।”

“কী করে বুঝব?”

“আপনি যে-কোনও সোনার দোকানে গিয়ে যাচাই করতে পারেন। “এখন কি সোনার দোকান খোলা পাব?”

“তা হয়তো পাবেন না।’

সঙ্গের লোকটা বলল, “লালচাঁদের দোকান খোলা আছে।”

“মালবাজারে ক’টা সোনার দোকান আছে?”

“বেশি না সাব।”

“তুমি কী করে জানলে এতে এক ভরি আছে?”

“সাব, আমার বাবার কাছে শুনেছি।”

অর্জুন লোকটার মুখের দিকে তাকাল। কী সাবলীল ভঙ্গিতে মিথ্যে কথা বলছে। যদি থিয়েটারে নামত, তা হলে নিশ্চয়ই নাম করত। সে বলল, “পয়সা দিয়ে জিনিস কিনছি, সোনার মতো জিনিস, যাচাই না করে তো কিনতে পারি না।

“আপনি এটা নিয়ে লালচাঁদের দোকানে চলে যান সাব।”

“তুমি সঙ্গে যাবে?”

“না সাব। আমি গেলে সন্দেহ করবে। আজেবাজে কথা বলবে। “তা হলে তুমি আমার হাতে বিশ্বাস করে সোনা ছেড়ে দেবে?”

“আমরা গরিব মানুষ, কিন্তু মানুষ চিনি সাব।”

অর্জুন এক সেকেন্ড সিগারেট টানল। সোনার কাঠি তার হাতের মুঠোয়। এটা তার কেস নয়। সে এসেছে মেয়েদের পাহারাদার হিসেবে, স্বর্ণ-রহস্য সন্ধানে নয়। অতএব এ-নিয়ে কথা বলে কোনও লাভ নেই। সে বলল, “ঠিক আছে, কাল সকালে তোমরা এসো। আমি দেখতে চাই সোনাটা খাঁটি কি না।”

“আপনি তখন বললেন, কাল সকালেই এখান থেকে চলে যাবেন?”

অর্জুন লোকটার দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”

লোকটা হকচকিয়ে গেল। সঙ্গীর দিকে তাকাল। তারপর যেন বাধ্য হয়েই বলল, “মাংরা।

অর্জুন হাসল, “আচ্ছা। মাংরা ভাই, এই সোনা যদি খাঁটিও হয়, তবু তো সাধারণ মানুষের সন্দেহ যাবে না। তার চেয়ে তোমরা যদি এই সোনা নিয়ে ব্যাঙ্কে যাও, তা হলে ব্যাঙ্ক এটা জমা রেখে তোমাদের ধার দেবে। এতে সুবিধে হল যখন তোমরা টাকার ব্যবস্থা করতে পারবে, তখন ব্যাঙ্ককে ধার শোধ করে দিলে পরিবারের গয়না ফেরত পেয়ে যাবে।”

মাংরা মাথা নাড়ল, “না সাব, আমরা পড়তে-লিখতে জানি না। ব্যাঙ্কে যেতে ভয় লাগে। আপনাদের ভদ্রলোক বলে মনে হওয়ায় সাহস করে এসেছি।”

“এটা কত দাম পেলে বিক্রি করবে?” অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

“এক ভরি আছে। সোনার যা দাম, তাই দিন।

‘সোনার দাম কত?”

মাংরা তার সঙ্গীর দিকে তাকাল। স্পষ্ট হল সে বুঝতে পারছে না অর্জুনকে। তারপর বলল, “আপনি যদি মেমসাহেবদের জিজ্ঞেস করেন, তা হলেই জানতে পারবেন।”

“আজকালকার মেমসাহেবরা সোনার খবর রাখে না।” সে কাঠিটাকে আবার দেখল। তারপর মনে-মনে ভাবছে এমন ভঙ্গি নিয়ে বলল, “জিনিসটা সত্যি সুন্দর। এ রকম গোটা চারেক পেলে ঠাকুরের জন্যে মুকুট তৈরি করতে পারতাম।” কথাগুলো বলতে-বলতেই সে চোখের কোণে তাকিয়ে ছিল। মাংরা আর তার সঙ্গী দৃষ্টি বিনিময় করল। লোক দুটো সত্যিই বুদ্ধিমান। কোনও মন্তব্য করল না। অর্জুন সোনার কাঠি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “মাংরা ভাই, আজকের রাত্রের জন্যে তুমি দশটা টাকা নিয়ে যাও। ককাল সকাল সাতটায় নিয়ে এসো, দিনের আলোয় দেখে তারপর দাম করব।”

মাংরা মাথা নাড়ল, “না সাব, দশ টাকা এখন দিতে হবে না। আমি কাল সকালেই আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসব।” সোনার কাঠিটা ফেরত নিয়ে দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার করে সঙ্গীকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। এই সময় একটা গাড়ির হেডলাইট মাঠ দিয়ে ছুটে আসতে লাগল ট্যুরিস্ট লজের দিকে। লজের সামনে পৌঁছেই পেছনের দরজা খুলে কেউ নামল। নেমেই মাংরাকে জিজ্ঞেস করল, “ইয়ে ট্যুরিস্ট লজ হ্যায়?”

“জি মালিক।”

“তুমলোগ কৌন হো?”

“মুঝে সবকোই মাংরা পুকারতা। বলদেবজী মুঝে আচ্ছাসে জানতা”

“কৌন বলদেব?” লোকটি বিরক্তি হল, “ক্যা ফালতু বকোয়াস করতা হ্যায় তুম। যাও, ভাগো ইঁহাসে।” কথা শেষ করে লোকটি বেশ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগলেন। ঠিক তখনই লজের ম্যানেজার এসে দাঁড়ালেন সিঁড়ির মুখে। ভদ্রলোক তাঁর দিকে তাকিয়ে নীচ থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “ট্যুরিস্ট লজের ম্যানেজার কোথায়?”

“আমিই ম্যানেজার।”

“আপনার এখানে ঘর খালি আছে? আই নিড এ রুম, সিঙ্গল রুম।”

ঠিক তখনই অর্জুন সোজা হয়ে বসল। লোকটিকে দেখেই চমকে উঠেছে সে। চটপট চেয়ার ছেড়ে ভেতরে চলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়াল। লোকটি তখন ম্যানেজারকে কিছু বলতে-বলতে ওপরে উঠে আসছে। মনে হল, তাকে লক্ষ করার অবকাশ পায়নি।

নিজের ঘরে ঢুকে বিছানায় চুপচাপ বসে রইল অর্জুন কিছুক্ষণ। অন্যমনস্ক হয়ে সিগারেট ধরাল। এটাও কি কাকতালীয় যোগ? লোকটা নিশ্চয়ই মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে এয়ারপোর্টে গিয়েছিল। ধরা যাক, নিজের কোনও কাজে সেখানে গিয়ে হয়তো মেয়েদের দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু শিলিগুড়ির বাসস্ট্যান্ডে কার খোঁজে যাবে এমন লোক? আর উত্তর বাংলার এত জায়গা থাকতে এই মালবাজারে রাত্তির বেলায় এসে ট্যুরিস্ট লজে উঠবে কেন? এমন হতে পারে, বাস ছেড়ে যাওয়ার অনেক বাদে লোকটি খবর পেয়েছিল, চারটে মেয়ে (এই মেয়েদের বর্ণনা মনে রাখতে কারও অসুবিধে নেই), আর একটা ছেলে মালবাজারের বাসে উঠে চলে গিয়েছে। খবর পেয়ে, এখানে চলে আসা অসম্ভব নয়। হয়তো এখনও জানে না কোথায় উঠেছে ওরা! এমন হতে পারে পথে যে কয়েকটা জায়গা পড়েছে তার সবক’টাতেই খোঁজ নিতে-নিতে এসেছে যে, তারা সেখানে নেমেছে কি না। ফলে মালবাজারে পৌঁছতে দেরি হয়েছে। এই সব ভাবনা যদি সত্যি হয় তা হলে লোকটা এখনও জানে না এই ট্যুরিস্ট লজেই মেয়েরা রয়েছে। অবশ্য ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললেই জেনে যাবে এক মুহূর্তে। এত ঘন ঘন সিগারেট খায় না অর্জুন, তবু সিগারেট শেষ করে উঠে দাঁড়াল। মানুষটার পরিচয় জানা দরকার।

ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে অর্জুন মাথা নাড়ল। এই লজে যদি ঘর থাকে, তা হলে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করারও দরকার হবে না। রেজিস্টারে নাম-ঠিকানা লেখার সময় ভদ্রলোক দেখতে পাবেন চারটি মেয়ে দিল্লি থেকে এখানে এসে উঠেছে। সে ঘর থেকে বেরিয়ে সরু প্যাসেজে দাঁড়িয়ে দু’ পাশে তাকাল। ভদ্রলোক ঘর পেলেন কি না বোঝা যাচ্ছে না। সে ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেল মেয়েদের ঘরের দিকে। পাশাপাশি দুটো ঘর। একটা ঘর থেকে হঠাৎই সেই বিশ্রী চিৎকার ভেসে এল। অর্থাৎ চারজন একই ঘরে রয়েছে। অর্জুন দরজায় নক্‌ করল।

হাসি থামছিল না, কিন্তু একটি গলায় প্রশ্ন হল, “হু ইজ দেয়ার?”

“অর্জুন।”

দরজা খুলল পুনম। খুলে ওকে দেখে খুশি হল, “ও, আপনি! ওয়েলকাম।”

ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিল অর্জুন। চারটে মেয়ে সম্ভবত দুটো বিছানায় ভাগাভাগি করে শুয়েছিল। নন্দিনী ছাড়া বাকি দু’জন উঠে বসেছে, পুনম নন্দিনীর পাশে গিয়ে বসল। অর্জুন দুটো চেয়ারের একটাকে টেনে নিয়ে বলল, “নন্দিনী, আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”

নন্দিনীর মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল, “কী ব্যাপার?”

সঙ্গে-সঙ্গে বাকি তিনজন পরস্পরকে ইশারা করল। অর্জুন বলল, “না, না, আপনারা থাকতে পারেন। সত্যি বলতে কী, কারও বাইরে যাওয়ার দরকার নেই।”

টিনা বলল, “ও জরুরি, কিন্তু প্রাইভেট নয়।”

অর্জুন বলল, “নন্দিনী, আজ এয়ারপোর্টে যে ভদ্রলোকের সঙ্গে আপনি কথা বলেছেন, তিনি কে? কীভাবে ওঁর সঙ্গে আপনার আলাপ হয়?”

নন্দিনী উঠে বসল, “কেন বলুন তো?”

“দুটো ঘটনা ঘটেছে। ভদ্রলোক উঠেছেন শিলিগুড়ির একটা নামী হোটেলে। জলপাইগুড়ি থেকে আসতে আমার দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে আমি ওঁর গাড়িতে লিফ্ট নিই। আমরা যখন শিলিগুড়ি থেকে বাসে উঠি, তখন ওই ভদ্রলোক ট্যাকসি নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে আসেন। সেখানে কী করেছেন আমি জানি না, কারণ বাস তখনই ছেড়ে দিয়েছিল। আর-একটু আগে সেই একই ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে এই ট্যুরিস্ট লজে জায়গা খুঁজতে এসেছেন। তাই আমি ভদ্রলোক সম্পর্কে কৌতূহলী।” অর্জুন একটানা কথাগুলো নন্দিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে গেল।

“ভার্মা-আঙ্কল এই লজে এসেছেন?” নন্দিনী বিস্মিত।

“হ্যাঁ। এই ভার্মা-আঙ্কল কে?”

“আমার বাবা এককালে নেপাল এবং বার্মায় এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট বিজনেস করতেন। তখন ভার্মা-আঙ্কল বাবার পার্টনার ছিলেন। আমার মা ওঁকে ঠিক পছন্দ করতেন না বলে আমি এড়িয়ে যেতাম। বাবার সঙ্গে বিজনেস নিয়ে কিছু মত-বিরোধ হতে বাবা বিজনেস বন্ধ করে দিলেন। তারপরও অবশ্য দিল্লিতে গেলে ভার্মা-আঙ্কল আমাদের সঙ্গে দেখা করতেন। ব্যস, এইটুকু।

“মিস্টার ভার্মা শেষ কবে দিল্লি গিয়েছিলেন?”

“সপ্তাহখানেক আগে উনি আমাদের দিল্লির বাড়িতে এসেছিলেন।”

“তখন কি আপনার বাবা ওঁকে বলেছিলেন যে, আপনি এ দিকে আসছেন?”

“আমি জানি না।”

অর্জুন এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কিছু মনে করবেন না, আমি যদি জানতে চাই, আপনার বাবা কী করেন, তা হলে আপনি কি অসন্তুষ্ট হবেন?”

“না, না। বাবা এখন আর ব্যবসা করেন না। উনি কোনও কোনও কম্পানিতে টাকা ইনভেস্ট করেন আজকাল।”

“উনি কি মিস্টার ভার্মার কোনও বিজনেসে টাকা দিয়েছেন?”

“আপনাকে একটু আগে বললাম, বাবার সঙ্গে মিস্টার ভার্মার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়াতে তিনি বিজনেস বন্ধ করে দিয়েছেন। আসলে বাবা ওঁর কাছে অনেক টাকা পান।” নন্দিনী বলল, “সেটা সম্প্রতি আমরা জানতে পেরেছি।”

“কীভাবে?”

“গত সপ্তাহে যখন ভার্মা-আঙ্কল আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, তখন বাবার সঙ্গে কিছু কথা কাটাকাটি হয়। আমি পাশের ঘরে ছিলাম বলে শুনতে পেয়েছিলাম।”

“কী বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল?”

“বাবা টাকা ফেরত দিতে বলেছিলেন। ভার্মা-আঙ্কল সেটা দিতে চাননি। এই নিয়ে ঝগড়া। টাকার অ্যামাউন্ট আমি জানি না।”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আপনি বলদেব নামে কাউকে চেনেন?”

“বলদেব! না তো।”

অর্জুন হাসল, “নন্দিনী, আপনার ভার্মা-আঙ্কলের ব্যাপারস্যাপার আমার ঠিক ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে উনি আপনার সম্পর্কে ইন্টারেস্টেড।”

“হোয়াট ডু ইউ মিন?”

“ঠিক বোঝাতে পারব না। হয়তো উনি আপনাকে বিপদে ফেলতে পারেন।”

“হোয়াই?”

“আমি বিশ্বাস করি, উনি আপনাকে অনুসরণ করছেন। ওঁর সম্পর্কে সাবধান হতে হবে।”

“কীভাবে?”

“আমার কথা আপনারা শুনবেন?”

“কী বলছেন, তার ওপর নির্ভর করছে।”

“আজ রাত্রের ডিনার আপনারা যে-যার ঘরেই করুন। আমি বা লজের বেয়ারা ছাড়া আর অন্য কেউ ডাকলে আপনারা দরজা খুলবেন না।”

“বেশ। কিন্তু কাল সকালে কী হবে?”

“সকাল হতে এখনও অনেক দেরি আছে।

“বেশ, তাই হবে।” নন্দিনী মুখ ফেরাল, “গার্লস, শুনলে তো?”

পুনম একটু রাগত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, “হু ইজ দিস ম্যান, যার ভয়ে আমাদের এইভাবে লুকিয়ে থাকতে হবে। এটা খুব সরল প্রশ্ন, তাই না?”

অর্জুন উঠে দাঁড়াল, “উত্তরটা নন্দিনী দিতে পারেন। আমরা যদি একটা রাত অপেক্ষা করি, তা হলে ক্ষতি কী।” অর্জুন ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে দেখল বেয়ারা প্যাসেজ দিয়ে এগিয়ে আসছে। সে লোকটাকে ডাকল, “শোনো, আজ রাত্রে এই দুটো ঘরে ডিনার এনে দেবে। দিদিমণিরা ডাইনিং রুমে ডিনার খেতে যাবেন না।’

“ঠিক আছে সাব।”

“আর-একটা কথা, মিস্টার রতনলাল গুপ্ত কোন্ ঘরে আছেন?”

“চার। বেয়ারা চলে যেতে-যেতে ঘুরে দাঁড়াল, “এখানে সাড়ে ন’টার মধ্যে ডিনার খাওয়া হয়ে যায়। আপনি কি ঘরে খাবেন?”

“তুমি আমার ঘরে খাবার ঢাকা দিয়ে যেও।”

“আপনারা কি এখানে কালকে থাকবেন?”

“তাই তো ইচ্ছে আছে।”

বেয়ারা চলে গেলে অর্জুন সতর্ক পায়ে হাঁটতে লাগল। ভার্মা যদি সামনে পড়েন, তা হলে তৎক্ষণাৎ চিনে ফেলবেন। ফেললে কী করতে পারেন? না, এই রকম জেদের কোনও অর্থ হয় না। ভদ্রলোককে এড়িয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

চার নম্বর ঘরের সামনে দাঁড়াল অর্জুন। দরজা বন্ধ। সে মৃদু টোকা দিল। ভেতর থেকে কোনও সাড়া এল না। অর্জুন হতাশ হল। তবু দ্বিতীয়বার শব্দ করল অর্জুন। এবং তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে গেল। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে মিস্টার গুপ্ত বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে একটা খোলা কলম।

“হু আর ইউ? কী দরকার?”

লোকটার গলার স্বর শুনে অর্জুন থমকে গেল। সে বলল, “আপনাকে বিরক্ত করেছি বলে দুঃখিত। ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি।

“দাঁড়াও। তুমি একটু আগে লাউঞ্জে বসে ছিলে, তাই তো? দিল্লি থেকে এসেছ?”

“প্রথমটা ঠিক। কিন্তু মেয়েরা দিল্লি থেকে এসেছেন, আমি জলপাইগুড়ির ছেলে।”

“ও। কী দরকার?”

“এখন থাক। আপনি সম্ভবত লিখছিলেন, আমি জানতাম না।

“ভেতরে এসো।” রতনলাল গুপ্ত সরে দাঁড়ালেন দরজা থেকে। ফিরে গিয়ে বসলেন নিজের চেয়ারে। সেখানে টেবিলের ওপর লাইন-টানা ফুলস্কেপ কাগজ, যার অর্ধেকটা লেখা হয়ে আছে। দরজা ভেজিয়ে বিছানায় একধারে বসল অর্জুন।

রতনলাল বললেন, “তোমাকে ‘তুমি’ বলছি বলে কিছু মনে করছ?”

“না, না।’

“গুড। কী নাম তোমার?”

“অর্জুন। আপনি কি কিছু লিখছেন?”

“হ্যাঁ। আমার আত্মজীবনী। তোমরা হয়তো হাসবে, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের একটা নিজস্ব জীবন আছে। সেই জীবনে নানান গল্প আছে। আমিও ব্যতিক্রম নই। সারা জীবন জঙ্গল আর পাহাড়ে কাটিয়েছি। আমার এক পরিচিত বন্ধুর বন্ধু বাংলা ভাষায় গল্প লেখেন। জঙ্গলের গল্প। তাঁর সঙ্গে একবার লালজির ওখানে আলাপ হয়েছিল। লালজিকে চেনো? অত বড় জঙ্গল-প্রেমিক খুব কম দেখেছি আমি। তা, তখন সেই সাহিত্যিক আমাকে বলেছিলেন, আমরা তো বাইরে থেকে বেড়াতে এসে যা দেখি, তাই লিখি। আপনারা তো ভেতরে রয়েছেন, একটু-আধটু লিখে ফেললে অনেক নতুন তথ্য জানতে পারবে সবাই। কথাটা মনে ধরেছিল হে। তাই এখন কলম ধরেছি।” রতনলাল গুপ্ত একনাগাড়ে বলে গেলেন।

অর্জুনের ভাল লাগল মানুষটাকে।

হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেল, এই রকম ভঙ্গিতে রতনলাল জিজ্ঞেস করলেন, “তা কী কারণে আমার ঘরে আসতে হল, সেটা এখনও বলোনি তুমি?”

“আমরা যদি আগামীকাল সকালে আপনার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি?”

“পারবে না।” খুব দ্রুত মাথা নাড়লেন রতনলাল গুপ্ত।

“কেন?”

“আমি বের হব ভোর পাঁচটায়, যখন পাখি ডাকবে। তোমাদের নিশ্চয়ই তখন মধ্যরাত।”

“না, কাল ভোর পাঁচটায় বেরোতে আমার কোনও অসুবিধা হবে না।” চোখে চোখ রাখলেন রতনলাল, তারপর সপ্রশংস ভঙ্গি নিয়ে মাথা নাড়লেন।

অর্জুন উঠে দাঁড়াল, “আপনার গাড়িতে আমাদের পাঁচজনের জায়গা হবে কি?”

“আমার গাড়ি একটা স্টেশন ওয়াগন। এখান থেকে বেরিয়ে একটা গ্যারাজ পাবে বাঁ দিকে। সেখানে সেটা দাঁড়িয়ে আছে। দু’-একটা কাজ ড্রাইভার করিয়ে নিচ্ছে ওখানে। বুঝতেই পারছ, স্টেশন ওয়াগনের পেটে পাঁচজন কিছুই নয়।”

“নমস্কার। তা হলে কালই দেখা হবে।” অর্জুন হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে দরজা ভেজিয়ে দিল। চারপাশ নিস্তব্ধ। কাঠের এই ট্যুরিস্ট লজে নিশ্চয়ই কেউ চলাফেরা করছে না, হলে শব্দ বাজত। কাল ভোরে যদি চলে যেতে হয়, তা হলে ম্যানেজারকে হিসেব মিটিয়ে দেওয়া দরকার। অর্জুন পা বাড়াতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। সে ফিরে এল মেয়েদের দরজায়। নন্দিনীর ঘরে মৃদু শব্দ করল। কেউ সাড়া দিল না। দ্বিতীয় বারেও না। অর্জুন আস্তে দরজা ঠেলল। দরজা খুলে গেল। জিনিসপত্র চারপাশে ছড়ানো, কিন্তু ঘরে কেউ নেই। সে বিস্মিত হল। এরা গেল কোথায়? দ্বিতীয় ঘরটিতেও কেউ নেই। ফাঁপরে পড়ল অর্জুন। এমন কথা ছিল না। সে মেয়েদের বারংবার বলে দিয়েছিল ঘর ছেড়ে না বেরোতে। কোথায় খুঁজবে এদের সে? এমন সময় পায়ের আওয়াজ উঠল। অর্জুন দেখল দু’ হাতে দুটো ট্রেতে খাবারের প্লেট নিয়ে বেয়ারা আসছে। সে জিজ্ঞেস করল, “এই দুই ঘরের মেমসাহেবদের তুমি দেখেছ? মানে, কোথায় গিয়েছে, জানো?”

“না সাব। খাবার কি ঘরে দিয়ে যাব?”

“হ্যাঁ, দিয়ে ঢেকে রাখো।” অর্জুন দাঁড়াল, যতক্ষণ লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে না যায়। সে বাইরের দিকে যাওয়ার সময় ভাবল একটা টর্চ নিয়ে এলে হয়। প্রথমবার ওটার কথা খেয়াল ছিল না। তার সুটকেসের কোণে একটা টর্চ তো থাকার কথা। অর্জুন উলটো দিকে ফিরল। নিজের ঘরের দরজা টানা ছিল। বাইরে থেকে। কিন্তু সেটা এখন ভেতর থেকে বন্ধ। অর্জুন নক্‌ করতেই নন্দিনীর গলা পাওয়া গেল। সে জানতে চাইছে কে এসেছে। অর্জুন গম্ভীর গলায় বলল, “খুলুন, আমি।”

টিনা দরজা খুলতেই নন্দিনী বলল, “স্যরি। আপনাকে না জানিয়ে এই ঘর দখল করেছি।”

অর্জুন দেখল, দুটো খাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে মেয়েরা তাস খেলছে। সে খুব বিরক্ত হল, “আপনারা কাজটা ঠিক করেননি। আপনাদের অনুরোধ করেছিলাম ঘর থেকে না বেরোতে।”

“ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরে ঢুকেছি।”

“নিজেদের ঘরে ফিরে যান, আপনাদের খাবার দেওয়া হয়েছে।”

নন্দিনী উঠে বসল, “লুক মিস্টার মহাভারতা! আপনি তখন থেকে এমন ব্যবহার করছেন যেন আমরা বেড়াতে আসিনি, কোনও ক্রিমিনালের ডেরায় ঢুকে পড়েছি। আমি এখনই ভার্মা-আঙ্কলের কাছে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করছি, কেন তিনি আমাদের অনুসরণ করছেন বা আদৌ করছেন কি না?”

“উনি স্বীকার করবেন বলে মনে করছেন?”

“অস্বীকার করলে সব সমস্যা মিটে গেল।”

অর্জুন হাসল, “আপনি আমাকে বোঝার চেষ্টা করুন। আমি কোনও ঝুঁকি নিতে চাই না। তাই একটা বিকল্প ব্যবস্থা করেছি। আপনারা তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়ুন। কাল ভোর সাড়ে চারটের মধ্যে সবাই উঠে পড়ব। ঠিক পাঁচটা বাজতে পাঁচ মিনিট আগে এই লজ ছেড়ে সামনের একটা গ্যারাজে যাব। পাঁচটায় গাড়ি ছাড়বে। পরিষ্কার?”

টিনা প্রায় চিৎকার করে উঠল, “ইম্‌পসিবল! আমি অত সকালে উঠতেই পারব না।”

“এটা আপনাদের ওপরে নির্ভর করছে। চেষ্টা করলে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়।”

নন্দিনী জিজ্ঞেস করল, “আমরা কেন চোরের মতো পালিয়ে যাচ্ছি?”

“আমরা যে চলে যাচ্ছি, তা মিস্টার ভার্মাকে জানতে দিতে চাই না।”

“উনি জানেন যে, আমরা এখানে রয়েছি?”

“জানাটা অস্বাভাবিক নয়।”

নন্দিনী তার পকেট থেকে একটা পার্স বের করে চারটে একশো টাকার নোট এগিয়ে ধরল, “তা হলে পেমেন্ট করে দিন।”

“এত লাগবে না।

“ব্যালান্সটা রেখে দেবেন। খরচ তো আপনিই করবেন। আমার কাছে টাকা আছে, যখন প্রয়োজন হবে চেয়ে নেবেন।”

“টাকাটা আপাতত আপনাকে দিতে হবে না। মিস্টার রায় যে খামটা আপনার হাতে পাঠিয়েছেন, তাতে কিছু টাকা আছে। অবশ্য সেটা মিস্টার অমল সোমের পারিশ্রমিক। আপাতত আমি সেখান থেকেই খরচ করছি। যান, নিজেদের ঘরে চলে যান।”

অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে মেয়েরা একে একে উঠে যেতেই, বেয়ারা খাবার নিয়ে এল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ম্যানেজার সাহেব কোথায়?”

“দু নম্বর ঘরে।”

“দু’ নম্বরে কে আছেন?”

“ওই যে, এক সাহেব একটু আগে এলেন।

“ঠিক আছে, কিন্তু ম্যানেজার সাহেবকে এখনই আমার একটু দরকার।”

“ডেকে দেব?”

“দাও।”

খাবার ঢাকা দিয়ে বেয়ারা চলে গেলে অর্জুন খাম থেকে টাকা বের করে ঘরের বাইরে পা দিল। বেয়ারার পায়ের শব্দ অনুসরণ করে সে দোতলায় চলে এল। দু’ নম্বর ঘরের দরজায় বেয়ারা মৃদু শব্দ করল। সঙ্গে-সঙ্গে একটা গর্জন ভেসে এল। অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে কেউ চিৎকার করেই দরজা খুলে চোস্ত হিন্দিতে ধমক দিল, “কী চাই এখানে? এত বার বলে দিলাম ম্যানেজারকে, কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে। কেন এসেছ, কী চাই?”

এই সময় ম্যানেজার ছুটে এলেন, “আরে কী হয়েছে? কেন দরজায় নক্ করছ?” তারপর ঘরের দিকে ফিরে বললেন, “আই অ্যাম সরি মিস্টার পুরি। আর এমন হবে না।”

দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। আর কিছুটা দূরে দাঁড়ানো অর্জুন হতভম্ব। মিস্টার পুরি? সে কি ঠিক শুনল? অসম্ভব। সে স্পষ্ট দেখেছে মিস্টার ভার্মাকে সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসতে। কিন্তু ততক্ষণে বেয়ারা ম্যানেজারকে বোঝাচ্ছে, কেন সে দু’ নম্বরের দরজা নক্ করেছিল। ম্যানেজার অর্জুনকে দেখে নিয়ে বেয়ারাকে বললেন, “দু’ নম্বর ঘরে কেউ যেন আজ রাত্রে না যায়।” তারপর অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এনি প্রবলেম?”

অর্জুন এগিয়ে এল, “আমি বিল ক্লিয়ার করতে চাই।”

“কেন? আপনারা কাল ব্রেকফাস্ট নেবেন না?”

“না।”

ম্যানেজার আর কথা বাড়ালেন না, “আসুন।”

ভদ্রলোককে অনুসররণ করল অর্জুন। খাতা বের করে ম্যানেজার বিল কাটলেন। টাকা মিটিয়ে দিয়ে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ওই ভদ্রলোক অত বিরক্ত হলেন কেন?”

কাঁধ ঝাঁকালেন ম্যানেজার, “মানুষের ধরন এক-এক জনের এক-এক রকম।”

“কী নাম ভদ্রলোকের?” অর্জুন খাতা দেখল প্রশ্ন করেই। ম্যানেজার জবাব দেবার আগেই সে নাম পড়ে নিয়েছে, এস এম পুরি, পাটনা।

“উনি কি এখনই এলেন?”

“হ্যাঁ, এই একটু আগে।

অর্জুন তার আগের নামটি পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগে ম্যানেজার খাতাটা বন্ধ করে দিয়েছেন। বেশি কৌতূহল দেখানো এক্ষেত্রে সমীচীন হবে না ভেবে অর্জুন সরে এসে লাউঞ্জে দাঁড়াল। তার দৃঢ় বিশ্বাস হল, ভামাই এখানে নাম পালটেছেন। এবং যদি কোনও লোকের বদ মতলব না থাকে, তা হলে সে নাম পালটায় না।

অন্ধকার মাঠ, দূরের হাইওয়ের আলো, মাঝে-মধ্যে ছুটে যাওয়া লরির হেডলাইট দেখতে দেখতে অর্জুনের এক ধরনের অস্বস্তি শুরু হল। মাংরা লোকটা সোনা বিক্রি করতে এসেছিল। এবং এখন চোখ বন্ধ করেই বলা যায়, সোনাটা মাংরার পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। অর্থাৎ, এই রকম ‘মাংরা’-দের পেছনে কেউ আছেন, যাঁর সোনা পালটে টাকা পাওয়া দরকার। অবশ্যই এই সোনা কালো পথে পাওয়া, তাই ন্যায্য দামে বিক্রি করার সাহস তাঁর নেই। কিন্তু মাংরাদের তিনি সংগঠিত করলেন কী করে, এটাই ভাবার কথা। কাল সকালে এখানকার পাট চুকিয়ে চলে গেলে এই ব্যাপারটার সঙ্গেও তার সম্পর্ক চুকে যাবে। অর্জুন ঠিক করল, জলপাইগুড়িতে ফিরে গিয়ে অমল সোমকে সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বলবে। যদি তখনও খুব দেরি না হয়ে যায়, তখন নিশ্চয়ই অমলদা অনুসন্ধান করতে পারেন।

অর্জুন সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে এল। বাঁ দিকে ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে আছে। লজের আলো ওর গায়ে পড়েছে। ট্যাক্সির ভেতরে কেউ নেই। কিন্তু নম্বরের প্লেটটা ভাল করে দেখে অর্জুন লজের দিকে তাকাল। না, আর কোনও সন্দেহ নেই, ভার্মাই লজে এসেছেন। এই ট্যাক্সি তাদের নিয়ে এয়ারপোর্ট ছুটেছিল, এটাই শিলিগুড়ির বাসস্ট্যান্ডে গিয়েছিল।

অর্জুন অন্ধকার মাঠের ভেতর দিয়ে হাইওয়ের দিকে হাঁটতে লাগল। বাসস্ট্যান্ডে এখন কোনও মানুষ নেই। এমন কি, চায়ের দোকানের ঝুপড়িগুলো পর্যন্ত ঝাঁপ-ফেলা। অর্জুন হাইওয়ে ধরে শহরের দিকে হাঁটতে লাগল। গ্যারেজের মুখে হ্যাজাক ঝুলছে। স্টেশন ওয়াগনটাকে নজরে পড়ল, এটি রতনলাল গুপ্তর বাহন নিশ্চয়ই। গ্যারাজের পাশেই একটা লাইন হোটেল। এ রকম জায়গায় বলদেব নামের লোকটার খবর পাওয়া যেতে পারে, যে মাংরা আর ভামাসাহেবের মধ্যে সংযোগ রেখে চলে।

গোটা পাঁচেক লোক বেঞ্চিতে বসে খাচ্ছিল। এ সব জায়গায় দিশি-বিদেশি পানীয় রাতের অন্ধকারে প্রকাশ্যেই বিক্রি হয়। বেশির ভাগ খদ্দেরই ড্রাইভার। দূর-পাল্লার লরি থামিয়ে তারা খাওয়া-দাওয়া করতে আসে। অর্জুন ঢুকতেই একটা বাচ্চা ছেলে ছুটে এল, “বলিয়ে সাব।” এবং তখনই সে সেই ড্রাইভারকে দেখতে পেল। মন দিয়ে রুটি-মাংস খাচ্ছে। অর্জুন ছেলেটাকে হাত নেড়ে ‘না’ বলে ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসল। লোকটা আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে খাবারে মন দিতে গিয়ে আবার মুখ ফেরাল, “খুব চেনা লাগছে।”

অর্জুন হেসে সিগারেট ধরাল, “আজ আপনার গাড়িতে আমি এয়ারপোর্ট-এ গিয়েছিলাম।”

লোকটার মনে পড়ল, ‘ওহো! হ্যাঁ। আসলে এত প্যাসেঞ্জার রোজ তুলি, কিন্তু আপনি এখানে? কখন এলেন?”

“এই তো একটু আগে। আপনি ভাড়া নিয়ে এসেছেন বুঝি?”

“হ্যাঁ। একটা বড় পার্টি পেয়েছি। সেই ভদ্রলোক—যিনি এয়ারপোর্ট গিয়েছিলেন। এখন ডেইলি বেসিসে গাড়ি নিয়েছেন, পেট্রল-মবিল ওঁর।”

“শিলিগুড়ি থেকেই চলে এলেন?”

“না। এখানে-ওখানে উনি কাজ মেটাতে মেটাতে আসছেন।

“ব্যবসায়ী?”

“তাই মনে হয়।” ড্রাইভার খেতে খেতে বলল, “আমি তো বুঝতেই পারছি না, কী কাজ। প্রায়ই গাড়ি দাঁড় করিয়ে, দশ মিনিট থেকে আধ ঘণ্টার জন্যে উধাও হয়ে যান। আমাকে অবশ্য অ্যাডভান্স দিয়েছেন, টাকা মার যাওয়ার কোনও ভয় নেই।”

“এখান থেকেই ফিরে যাবেন?”

“জানি না ভাই। বলেছেন গাড়িতেই শুতে। হুট করে নাকি প্রয়োজন হতে পারে।”

অর্জুন বুঝল, লোকটাকে ভার্মার্সাহেব অন্ধকারে রেখেছে। এর কাছে নতুন কোনও খবর পাওয়া যাবে না। হঠাৎ লোকটা জিজ্ঞেস করল, “আপনি কিছু খাবেন না?”

“নাঃ, আমি একজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। লোকটাকে আমি চিনি না, নামটা জানি, বলদেব—এ রকম নামের কোনও লোককে এখানে দেখেছেন? মানে, কেউ যদি ডেকে থাকে নাম ধরে।” অর্জুন আন্দাজে একটা ঢিল ছোঁড়ার চেষ্টা করল।

ড্রাইভার মাথা নাড়ল, “না, আমি শুনতে পাইনি। বলদেব কি পাঞ্জাবি?”

“হ্যাঁ।”

“না, কোনও পাঞ্জাবিকে তো এখানে আমি আসার পর দেখিনি। অর্জুন মাথা নাড়ল। তারপর, “আচ্ছা, চলি,” বলে উঠে এল বাইরে।