২.
ভোর সাড়ে চারটের সময় দরজায় শব্দ হতে ঘুম ভেঙে গেল অর্জুনের। বিছানায় শুয়েই সে সময়টা দেখল, তারপর তড়াক করে উঠে পড়ল। এই সময় দ্বিতীয়বার শব্দ হল। অর্জুন এগিয়ে গিয়ে নিঃশব্দে দরজা খুলে অবাক হল। নন্দিনী দাঁড়িয়ে আছে বাইরে বেরোবার পোশাকে তৈরি হয়ে। হেসে বলল, “মিস্টার মহাভারাতা, আর মাত্র আধঘণ্টা দেরি আছে।
“অনেক ধন্যবাদ। আমি এখনই তৈরি হয়ে নিচ্ছি।” অর্জুন ব্যস্ত হল।
“আমরা চারজনই তৈরি। যদি অনুমতি দেন, তা হলে এখনই বেরিয়ে পড়তে পারি। গাড়িটা গ্যারাজে থাকবে বলেছিলেন, গ্যারাজটা কোন দিকে?”
অর্জুন জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। এখনও পৃথিবী জুড়ে ঘন অন্ধকার। সে মাথা নাড়ল, “একটু অপেক্ষা করুন। বাইরে এখনও আলো ফোটেনি, আমরা একসঙ্গে যাব।”
“আপনি মিছিমিছি ভয় পাচ্ছেন। আমরা যথেষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক। বয়সটা কোনও ফ্যাক্টর নয়। তা ছাড়া আমি ক্যারাটে জানি।
“খুবই ভাল কথা। তবু জায়গাটা আপনাদের অচেনা। আলোও নেই। পথ গুলিয়ে ফেললে মিস্টার রতনলাল গুপ্ত আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করবেন না।”
“রতনলাল গুপ্ত?”
“কাল রাত্রে লাউঞ্জে বসে ছিলেন যে ভদ্রলোক।
“আচ্ছা। আমরা তাঁর গাড়িতে যাচ্ছি? উনি কোথায়?”
“আমাদের সঙ্গে গাড়িতেই ওঁর দেখা হবে।”
নন্দিনী হাসল, “আপনি সত্যিই বুদ্ধিমান। তৈরি হয়ে নিন।”
পাঁচটা বাজতে দশে অর্জুন মেয়েদের নিয়ে বের হল। সে প্রত্যেককে সাবধান করে দিয়েছিল, যাতে কাঠের মেঝেতে পায়ের শব্দ না হয়। কোনও অতিথির ঘুম ভাঙাতে চায় না সে। ধীরে ধীরে ওরা লাউঞ্জের মুখে চলে এল। একটা হলদেটে বাল্ব জ্বলছে লাউঞ্জের মুখে। লজের কেউ জেগে আছে বলে মনে হচ্ছে না। অর্জুন চাপা গলায় বলল, “আমি আগে লাউঞ্জ পার হয়ে যাচ্ছি। আপনারা পর-পর নিঃশব্দে চলে আসুন।”
অর্জুন গিয়ে ট্যাক্সির পিছনে দাঁড়াল। ভেতরের সিটে ড্রাইভার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ট্যুরিস্ট লজটাকে এখন ভৌতিক বাড়ি বলে মনে হচ্ছে। হঠাৎ একটি ঘরে আলো জ্বলে উঠল। ওটা কত নম্বর ঘর, বুঝতে পারছে না অর্জুন নীচ থেকে। যদি মিস্টার ভার্মা জেগে ওঠেন, তা হলে এই চুপিসাড়ে চলে যাওয়ার কোনও মানে থাকবে না। অর্জুন প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করেই লক্ষ করল, মেয়েরা একে একে নিঃশব্দে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এল। সে আর দাঁড়াল না। ঠোঁটে একটা শব্দ করে এগিয়ে গেল অন্ধকার মাঠের দিকে। মেয়েরা আসছে পেছনে। কেউ কোনও কথা বলছে না। সম্ভবত অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেয়েছে ওরা। বাসস্ট্যান্ডের কাছে পৌঁছানো মাত্র অর্জুনের কানে মোটরবাইকের আওয়াজ ভেসে এল। মোটরবাইক আসছে শিলিগুড়ির দিক থেকে। সাধারণত এত রাত্রে—যেহেতু এখনও অন্ধকারই, তাই রাতই বলা উচিত—কেউ ডুয়ার্সের রাস্তায় মোটরবাইক চালায় না। অবশ্য কাছেপিঠের চা-বাগান থেকে অত্যন্ত প্রয়োজনে কেউ ওই সময় বেরোতে পারে। ওরা হেডলাইটের আলো দেখতে পেল। পিচের রাস্তা আলোকিত করে ছুটে আসছে। অর্জুন মেয়েদের ইশারা করল চায়ের দোকানের ঝুপড়ির পেছনে দাঁড়াতে। মোটরবাইকটা হাইওয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলে আবার হাঁটা শুরু করবে ওরা। অন্তত ওর হেডলাইটের আলোয় নিজেদের আলোকিত করার কোনও মানে হয় না। দূর থেকেও জেগে-থাকা কেউ সেটা দেখে বুঝতে পারবে।
মোটরবাইকটার স্পিড কমতে লাগল। শেষ পথটুকু বরাবর আলোকিত করে সেটা নেমে এল হাইওয়ে থেকে, মাঠের ভেতরে ঢুকে সোজা ট্যুরিস্ট লজের সামনে গিয়ে থামল।
অর্জুন অবাক হল। এই ভোরের আগে কে এল লজে মোটরবাইক চালিয়ে? পাশ দিয়ে লোকটা যখন মাঠে নামল, তখন স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে ওর সঙ্গে কোনও জিনিসপত্র নেই। তা হলে এখনই কী প্রয়োজন পড়তে পারে? এই সময় পুনম বলল, “আমাদের কি দেরি হয়ে যাচ্ছে? পাঁচটা বাজতে আর মাত্র দু’ মিনিট বাকি আছে।”
ওরা দৌড়তে লাগল। হাইওয়েতে পায়ের শব্দ বাজল। পুবের আকাশ একটা নীল ছোপ মাখতে আরম্ভ করেছে। গ্যারাজের বাইরে দাঁড়িয়েছিল গাড়িটা। তার গায়ে হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছিল এক নেপালি ড্রাইভার। অর্জুন তার সামনে পৌঁছে বলল, “মিস্টার গুপ্ত এখনও আসেননি?”
ড্রাইভার জবাব দেবার আগেই পেছন থেকে গলা শোনা গেল, “গুড মর্নিং।”
ওরা পাঁচজন পেছন ফিরে দেখল একটা বড় ব্রিফকেস হাতে নিয়ে মিস্টার গুপ্ত আসছেন। তিনি যখন গাড়ির সামনে এলেন, তখন কাঁটায়-কাঁটায় পাঁচটা। রতনলাল গুপ্ত আবার বললেন, “গুড মর্নিং এভরিবডি।”
মেয়েরা প্রায় একই সঙ্গে জানান দিল, “গুড মর্নিং।”
রতনলাল বললেন, “কাঞ্ছা, পেছনের দরজা খুলে দাও, এঁরা আমাদের সঙ্গে যাবেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে হাসলেন, “খুব অবাক হয়ে গেলাম। ইয়ং লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান যে এত সময়-মাফিক বিছানা ছেড়ে উঠে আসবে, তা আমি ভাবিনি।”
মেয়েরা হাসল। অর্জুন কিছু বলল না।
স্টেশন-ওয়াগনটা একটু নিজস্ব ধরনের। ড্রাইভারের সিটের পাশে দু’জন বসতে পারে। পেছনে ড্রাইভারের দিকে মুখ ফেরানো সিটে বারোজনের অবলীলায় বসে যেতে কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়। রতনলাল মেয়েদের দু’জনকে সামনে বসতে, বললে নন্দিনী আর চিঙ্কি সেখানে উঠে পড়ল। পেছনের সিটের মাঝখানে বসল অর্জুন। দুটো মেয়ে দু’ দিকের জানালায়। স্টেশন-ওয়াগনের আরও পেছনে জিনিসপত্র স্তূপ হয়ে রয়েছে। গাড়ি ছাড়ল।
সবে ভোর হচ্ছে। সূর্যদেব এখনও দেখা দেননি। কিন্তু অন্ধকার ফরসা হতে আরম্ভ করেছে। হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে স্টেশন-ওয়ান। দু’ পাশের গাছগুলো থেকে অন্ধকার মিলিয়ে যাচ্ছে। অর্জুন পেছনে তাকাল। সূর্য ওঠার আগের আলোয় মায়াবী হয়ে শূন্য রাজপথ পড়ে আছে। কাউকে সে অনুসরণ করতে দেখল না। রতনলাল গুপ্ত হাসি-হাসি মুখে বসে আছেন। নন্দিনী ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই সব নদী কি বর্ষার সময় ফেরোসাস হয়ে যায়?”
স্টেশন-ওয়াগন তখন একটা শুকনো নদীর ওপর পাতা ব্রিজ পেরিয়ে ছুটছিল। রতনলাল বললেন, “মাই ডিয়ার ইয়ং লেডিস, যদি অনুমতি দাও তা হলে বলি, বর্ষাকালে এই সব নদীর চেহারা সুন্দর হয়ে যায়। এখন তো হাড়-জিরজিরে, নুড়ি আর পাথরের ফাঁকে তিরতিরে জল। দেখলেই মন খারাপ হয়ে যায়।”
চালসা পেরিয়ে খুনিয়ার মোড়ে পৌঁছনো মাত্র সূর্যদেব দেখা দিলেন। গাড়ি থামাতে বললেন রতনলাল, “বাঁ দিকের রাস্তাটা দ্যাখো কী সুন্দর। দু’ পাশে ঘন জঙ্গল আর মাঝখানে সরু পিচের রাস্তাটা চলে গেছে ঝালং বিন্দু পর্যন্ত। জলঢাকা হাইড্রো-ইলেকট্রিক্যাল প্রজেক্ট সেখানে। এই জঙ্গলটার নাম চাপড়ামারি।”
অর্জুন নামটা কানে যাওয়ামাত্র সোজা হয়ে বসল, “আরে, আমাদের তো এখানেও থাকার কথা ছিল। চাপড়ামারি ফরেস্ট বাংলো।”
রতনলাল গুপ্ত জিজ্ঞেস করলেন, “তা হলে এখন তোমরা কোথায় যাচ্ছিলে?”
মেয়েরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। অর্জুন বলল, “হলং-এ।”
“হলং তো ফুন্টসিলিং-এর মুখে। যাওয়ার পথে নামিয়ে দিতে পারি।” অর্জুন চিন্তায় পড়ল। শিলিগুড়ির ট্যুরিস্ট ব্যুরোর ভট্টাচার্যদা বলেছিলেন চাপড়ামারি, গরুমারা এবং হলং-এ তাদের জন্য ব্যবস্থা থাকবে। যত দূর মনে হচ্ছে, কথা ছিল মালবাজারেই খবরটা পাওয়ার। কিন্তু ম্যানেজার তো কিছুই জানাননি এ-ব্যাপারে। যদি এমন হয় উনি ভেবেছেন….যা ভাবুন তিনি, লিফ্ট যখন পাওয়া, গিয়েছে একেবারে হলং চলে যাওয়া যাক।
পথে বিনাগুড়ি নামের একটা জায়গায় গাড়ি থেমেছিল। চা খাওয়া হল। অর্জুন আশ্বস্ত হল এই কারণে যে, জায়গাটা চোখে পড়ার মতো নয়। চার-পাঁচটা দোকান দৃষ্টি আকর্ষণ করবে না কারও।
নন্দিনী জিজ্ঞেস করল, “ডুয়ার্স কি এটাকেই বলে?”
রতনলাল বললেন, “হ্যাঁ। জঙ্গল, নদী, চাষের জমি নিয়েই ডুয়ার্স।”
বীরপাড়ার পাশ দিয়ে মাদারিহাট হলে এল গাড়িটা। রতনলাল জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কোথায় ব্যবস্থা হয়েছে? বাইরের বাংলোটাকে বলে ‘মাদারিহাট ফরেস্ট বাংলো’ আর জঙ্গলের ভেতরে ছয় কিলোমিটার গেলে ‘হলং রেস্টহাউস’। বলতে বলতে গাড়িটা একটা গেটের সামনে দাঁড়াল। এখানে রাস্তা বাঁক নিয়েছে। ডান দিকে ঝিঁঝি ডেকে চলেছে ছায়া-ছায়া জঙ্গলে একটানা। কেমন রহস্যময় চার ধার। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা নুড়ির রাস্তা চলে গেছে। তারই মুখটি পোল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে, যাতে বিনা অনুমতিতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। এক পাশে পাহারাদারদের ঘর। একজন লোক গাড়ি থামতেই বাইরে এসেছিল। রতনলাল অর্জুনকে বললেন, “ওখানে গিয়ে অনুমতি নাও ভেতরে যাওয়ার জন্যে।”
অর্জুনের হাঁটতে ভাল লাগল। সে এগিয়ে গিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, “হলং কি এই রাস্তায় যাব?”
লোকটা মাথা নাড়ল, “রেস্ট হাউসে থাকবেন?”
“হ্যাঁ।”
“পাশ দিন। খাতায় এনট্রি করতে হবে।”
“পাশ? আমাদের সঙ্গে তো পাশ নেই। ট্যুরিস্ট অফিসার বলেছেন এখানে আমাদের ব্যবস্থা থাকবে।”
এই সময় রতনলাল গুপ্ত নেমে এলেন। তাঁকে দেখামাত্র লোকটি কপালে হাত ঠেকাল। রতনলাল বললেন, “এদের জন্য ব্যবস্থা আছে। পরে খাতায় নোট করো। এখন গেট খুলে দাও, আমার তাড়া আছে।
লোকটা চটজলদি গেট খুলে দিল। নন্দিনী বলল, “আপনাকে তো ও বেশ খাতির করে। একটুও প্রতিবাদ করল না।”
রতনলাল বললেন, “দীর্ঘকাল এক সঙ্গে থাকলে গাছেরাও বন্ধু হয়ে যায়।”
দু’ পাশে জঙ্গল, নুড়ি বিছানো পথ, পাখির ডাক আর মাঝে-মাঝে বাঁদরের দর্শন, বেশ ভাল লাগল হলং-এ পৌঁছতে। এবার ডান দিকে পর-পর কয়েকটা কাঠের বাড়ি, কোয়াটার্স এবং বনবিভাগের সাইনবোর্ড। দু’জন ভদ্রলোক কথা বলতে বলতে আসছিলেন। রতনলাল তাঁদের দেখে গাড়ি থামাতে বললেন। ওঁরা থেমে গিয়ে কৌতূহলী চোখে তাকাতে রতনলাল গাড়ি থেকে নামলেন, “নমস্কার, মিস্টার বিশ্বাস। ভাল তো? জঙ্গলের খবর কী?”
“ভাল।” মিস্টার বিশ্বাস এগিয়ে এলেন। অল্প বয়স, সুন্দর চেহারা।
“আমার কিছু তরুণ বন্ধু এসেছেন। শিলিগুড়ির ট্যুরিস্ট অফিসার কথা দিয়েছেন জায়গা করে দেবেন।”
মিস্টার বিশ্বাস বললেন, “তিনটে ঘর তো? টেলিফোন পেয়েছি। রুম নম্বর পাঁচ ছয় সাত আপনাদের জন্যে অ্যালট করা আছে।” শেষ কথাগুলো অর্জুনের দিকে তাকিয়ে, “আপনারা চেক ইন করে যান, পরে খাতায় সই করবেন।
রতনলাল বললেন, “ইনি রেঞ্জার, এখানকার কর্তা।”
মিস্টার বিশ্বাস বললেন, “কী যে বলেন। আপনার মতো জঙ্গলকে যদি ভালবাসতে পারতাম, তা হলে গর্বিত হতাম।
“ভাই, জঙ্গলে চাকরি করতে গেলে জঙ্গলকে ভালবাসতেই হবে। কিছু দিন থাকলে অবশ্য জঙ্গল আপনাকে জোর করে ভালবাসবে। ইনি কে?”
“ওহো, আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। ইনি মিস্টার আহমেদ। থানার চার্জ নিয়ে জয়েন করেছেন। আর ইনি রতনলাল গুপ্ত। এঁর পরিচয় কি আপনি শুনেছেন মিস্টার আহমেদ?”
পুলিশ অফিসার যে এমন রূপবান হয়, তা অর্জুনের জানা ছিল না। মিস্টার আহমেদ দু’ হাত যুক্ত করে নমস্কার করলেন, “অবশ্যই। আমি এর আগে লাটাগুড়িতে ছিলাম। তখন উনি লালজির সঙ্গে গরুমারা ফরেস্টে গিয়েছিলেন।”
রতনলাল বললেন, “হ্যাঁ। আমারও মনে পড়েছে। আপনার চেহারা একবার দেখলে ভোলা সম্ভব নয়। তা এখানকার খবর কী?”
মিস্টার বিশ্বাস বললেন, “এখন আমাদের নিরাপদে রাখার দায়িত্ব মিস্টার আহমেদের ওপর। জানেন তো, আমরা এখন কী রকম আতঙ্কে আছি!”
রতনলাল কিছু বললেন না। গাড়ি একটা সাঁকো পেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। দু’ পাশে ঘন জঙ্গল। ডান দিকে আর-একটা রাস্তা বেঁকে গিয়েছে। সোজা পৌঁছে গেল গাড়িটা লন পেরিয়ে বাংলোর নীচে। গাড়ি থেকে নেমে পুনম চেঁচিয়ে উঠল, “বিউটিফুল।”
সত্যিই সুন্দর। অর্জুনও মুগ্ধ হয়ে গেল। ছবির মতো তিন তলা কাঠের বাংলো। বাংলো থেকে কিচেনে যাওয়ার জন্যে একটা ঘেরা প্যাসেজ। ও পাশে লনের শেষে একটা ছোট্ট ঝরনা। ঝরনার গায়েই সুন্দর একটা ঘাসের মাঠ, যার মাঝখানে নুনের মাটি রাখা হয়েছে জন্তু-জানোয়ারের স্বাদ পালটানোর জন্যে। আর চার পাশের ঘন জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে পাখির চিৎকার, ঝিঁঝির টানা শব্দ। দু’জন বেয়ারা ছুটে এসেছিল গাড়ির শব্দ শুনে। নন্দিনী তাদের বলল “রুম নম্বর পাঁচ, ছয় আর সাত।
লোক দুটো ইতস্তত করছিল, কাগজ ছাড়া সম্ভবত এখানে ঘর দেওয়া হয় না। অর্জুন বলল, “রেঞ্জার সাহেব আমাদের নম্বরটা বলে দিয়েছেন।”
এবার কাজ হল। মেয়েরা রতনলালের কাছে বিদায় নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে তিনি বললেন, “চলি ভাই, আমার একটু দেরিই হয়ে গিয়েছে।”
অর্জুন বলল, “আপনি আমাদের খুব উপকার করলেন। আপনার সাহায্য না পেলে এত তাড়াতাড়ি আরামে এখানে পৌঁছতে পারতাম না।”
রতনলাল হাত তুলে ওকে থামতে বলে গাড়িতে উঠে বসলেন। তারপর মুখ বের করে বললেন, “আমার সন্দেহ, কোনও ঝামেলা এড়াতেই তোমরা এত ভোরে মালবাজার ছেড়ে এসেছ। আমি জানতে চাই না সেটা কী! কিন্তু ইফ এনি প্রবলেম সোজা ফুন্টশিলিং-এর কাফে দ্য মাউন্টেন-এ আমার খোঁজ ক’রো।”
অর্জুন দেখল, গাড়িটা বেশ দ্রুতই বাংলোর লন থেকে বেরিয়ে গেল। তার স্যুটকেস বেয়ারা তুলে নিয়ে গিয়েছে। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগল সে। দোতলায় বাঁক নেবার মুখে অর্জুন এক ভদ্রমহিলাকে দেখতে পেল। খোলা দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রমহিলার পরনে পা-ঢাকা ম্যাসি। কিন্তু দৃষ্টি অদ্ভুত। এমন দৃষ্টি বড় একটা চোখে পড়ে না। যেন এক্স-রে আই দিয়ে বুকের হাড় পর্যন্ত দেখে নিচ্ছেন। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অর্জুন তিন তলায় উঠে এল। পাঁচ-ছয় নম্বর ঘর দুটি মেয়েরা দখল করে নিয়েছে। সাত নম্বরের সামনে বেয়ারাটি দাঁড়িয়েছিল। অর্জুনকে দেখামাত্র কপালে হাত ঠেকাল, “ব্রেকফাস্ট লাগবে স্যার?”
“কী পাওয়া যাবে?”
টোস্ট, ওমলেট, ফিশ ফ্রাই, চা।”
“সাবাস। জলদি করো। পাঁচ, ছয়, সাত নম্বরের জন্যে।”
অর্জুন ঘরে ঢুকল। এটিও ডাবল-বেড রুম। বাথরুম চমৎকার। পাখা, আলো আছে। বিছানা ধবধবে। আর কী চাই? জুতো পরেই শুয়ে পড়ল অর্জুন। এখন অন্তত এই সকালটায় মেয়েদের বিশ্রাম করা উচিত। কাল অত রাত অবধি জাগার পর আজ রাত থাকতেই তৈরি হয়েছে সবাই। ক্লান্ত না হয়ে কেউ পারে?
এখন তার বন্ধ চোখের পাতায় পর-পর অনেকগুলো মুখ। ভার্মা কি তাদের খোঁজ পাবেন? না, কোনও চান্স নেই। তারা মালবাজার থেকে ট্রান্সপোর্ট ভাড়া করলে তবু একটা সুযোগ থাকত। লোকটাকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। যদি দিল্লির ব্যবসায়ী হয়, তা হলে নর্থ বেঙ্গলের গরিবদের মধ্যে সোনা ছড়াতে আসবে কেন? আর ট্যুরিস্ট-লজের পুরি নামের লোকটাই বা কে? অমন মেজাজ দেখাতে গেলেন কেন বেয়ারার ওপর। ঘরের দরজা বন্ধ করে ভদ্রলোক কী করতে পারেন? ভোরের মোটরবাইক-আরোহী কার কাছে এসেছে? যদি ওদের দু’জনের একজন হয়, তা হলে কি তিনি মিস্টার পুরি? এ ক্ষেত্রে ভার্মার ওপর থেকে সন্দেহ তুলে নিতে হয়।
অর্জুন ঘুমিয়ে পড়েছিল। বেয়ারার ডাকে ঘুম ভাঙল। লোকটা ব্রেকফাস্টের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে মুখ ধুয়ে এসে ব্রেকফাস্ট খেল। পরিমাণ কম নয়। মুখ তুলে জানালা দিয়ে তাকাল। এক-পাল হনুমান ঝরনার ও পারের ঘাসের জঙ্গলে বসে আছে। একজন বসেছে নুনের ঢিবির ওপর। যেন সে সভাপতি, আর তার বক্তৃতার শ্রোতা সবাই। দৃশ্যটি বড় ভাল লাগল। অর্জুনের ঘুমের রেশটা তখনও কাটেনি। সে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল জুতো খুলে। সেটা খোলামাত্র বেশ আরাম হল।
