খুনখারাপি
দ্রুত পা চালিয়ে গলিটা পেরিয়ে আসছিল অর্জুন। ঠিক সাড়ে-ছটায় কদমতলার মোড় থেকে মিনিবাসটা ছাড়বে। এই সময় বুড়িদি ওকে ডাকল। অর্জুন দেখল বুড়িদি ওর ভাইঝিকে নিয়ে মর্নিং-ওয়াক সেরে ফিরছে। ভোরে হাঁটলে মানুষের চেহারাটা বেশ পবিত্র দেখায়। সেই খুঁটিমারি থেকে আনা শেকড় রস করে লাগিয়ে এখন বুড়িদির মুখ টলটলে দিঘির মতো ছিমছাম, এক ফোঁটা পানা নেই।
“এই সাত-সকালে ব্যাগ ঝুলিয়ে চললি কোথায়?”
“কালিম্পংয়ে।” অর্জুন হাসল।
“ওমা, তাই নাকি! কেন রে? চাকরি পেয়েছিস?” বুড়িদি উদ্গ্রীব হল।
“না। অমলদা যাচ্ছেন তাই। যদি ভাগ্যে থাকে জুটেও যেতে পারে।”
“ও, অমলবাবুর সঙ্গে তোর এখন খুব ভাব হয়েছে, তুই গোয়েন্দা হয়ে যা। এই ধর শার্লক হোমস্ কিংবা ফেলুদা। খবরদার বঙ্ হবি না!” চোখ পাকাল বুড়িদি।
মিনিবাসে বসে এই কথাগুলো ভাবছিল অর্জুন। জলপাইগুড়ি ছাড়িয়ে শিলিগুড়ির পথে ছুটছে গাড়ি। এই সকালে মোটেই ভিড় নেই। ওদের সামনে দুজন মোটাসোটা মানুষ নাক ডাকছেন। ঘুম থেকে উঠে এটুকু পথ এসেই আবার কী করে যে ঘুমিয়ে পড়লেন কে জানে। ঘুম ছোঁয়াচে নয়, অসময়ে কাউকে ঘুমোতে দেখলে বিরক্তি আসে। ওপাশে আর একটি লোক ওর দৃষ্টি টানছিল। চকচকে জুতো, চাপা কালো প্যান্টের ওপর দাবার বোর্ডের মতন কোট আর মাথায় কাউবয় টুপি পরে লোকটা জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। মুখের একফালি দেখতে পাচ্ছে সে। খুব রহস্যজনক ভঙ্গি। এই ধরনের মানুষই অপরাধী হয়। অবশ্য অপরাধ না ঘটলে অপরাধীকে খোঁজার কোনো মানে হয় না। অর্জুন দেখল বাইরের আকাশ চমৎকার সূর্যের প্রথম আলো এত নরম যে সবকিছু সুন্দর দেখাচ্ছে। তার চাকরি দরকার। কিন্তু চাকরি না করে সে যদি গোয়েন্দা হয়ে যেত তাহলে—! অমলদা নিজে খুব ভাল গোয়েন্দা! কিন্তু এখনও সরকারি চাকরি করেন। এদেশে শুধু গোয়েন্দাগিরি করে বেঁচে থাকা নাকি মুশকিল। রোজ-রোজ মক্কেল পাওয়া যায় না। কিন্তু খুঁটিমারি রেঞ্জের ঘটনার পর থেকে অর্জুন এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে।
গাড়িটা চলতে শুরু করা মাত্রই অমল সোম ব্যাগ থেকে বই বের করে মুখের সামনে ধরেছিলেন। এবার চাপা গলায় বললেন, “ওপাশের লোকটার দিকে অত তাকাতে হবে না। সিকিমিজরা একটু ইয়াঙ্কি প্যাটার্নের সাজ পছন্দ করে।” অর্জুন একটু হোঁচট খেল। সে এতক্ষণ লোকটাকে নেপালি ভাবছিল, সিকিম নেপাল এবং ভুটানের মানুষদের চেনা খুব মুশকিল। অথচ অমলদা একবারেই বলে দিলেন।
অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “ও যে সিকিমিজ কী করে বুঝলেন?”
“চেহারাই বলে দেয়। নেপালিরা সাধারণত খাটো হয়, চোখ ও নাক ফোলা। ভুটানিদের শরীর মোটার দিকে, লম্বা কিন্তু চোখ প্রায় ঢাকা। ওদের নাকও বেশ ছড়ানো। সিকিমিজদের নাক সাধারণত তীক্ষ্ণ, ছিমছাম লম্বা শরীর, চোখ ছোট কিন্তু ফোলা নয়। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে কিন্তু এই লোকটির ক্ষেত্রে ভুল হয়নি। অমল সোম কথাগুলো বলে আবার বইয়ে ডুবে গেলেন। অর্জুন আড়চোখে দেখল বইটি রামকৃষ্ণ কথামৃত। আজ অবধি কোনো গল্পের গোয়েন্দাকে ওই বই পড়তে দেখেনি সে।”
জলপাইগুড়ি থেকে কালিম্পংয়ে আসতে সাড়ে-চার ঘণ্টা সময় লাগে। সেবক ব্রিজ অবধি চেনা পথ অর্জুনের, তারপর যত মিনিবাসটা ওপরে উঠতে লাগল তত ওর রোমাঞ্চ বাড়ছিল। কালিঝোরা ডাকবাংলোকে ডান দিকে রেখে পাহাড়টাকে লাট্টুর লেত্তির মতো পাক খেয়ে উঠে গেছে রাস্তাটা। নীচে অতলান্ত খাদ। শুধু একটানা ঝিঁঝির শব্দ বাসের ইঞ্জিনের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। তিস্তাবাজারে এসে ওটা দশ মিনিটের জন্যে থামতেই সবাই নেমে পড়ল চা খেতে। অর্জুন দেখল সেই সিকিমিজ ছেলেটি কিন্তু নামল না। টুপিতে চোখ ঢেকে জানলায় মাথা এলিয়ে রয়ে গেল আসনেই।
বাইরে পা দিতেই বেশ গর্জন কানে এল। ওপাশে একটা সাঁকোর তলা দিয়ে তিস্তা ছুটে নামছে। অমল সোম বললেন, “আটষট্টির বন্যার সময় এই এলাকাটা তলিয়ে গিয়েছিল জলের তলায়। ভাবতে পারো?”
চায়ের গরম গ্লাস হাতে নিয়ে অর্জুন ঝুঁকে নদীটাকে আবার দেখল। অন্তত তিরিট ফুট নীচে জল। ওই নদী এত উঁচুতে উঠবে বিশ্বাস করা মুশকিল। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে কিন্তু মোটেই কনকনে নয়। বেশ কিছু ঘরবাড়ি দোকানপাট রয়েছে এখানে, পাহাড়ের গায়ে গায়ে। অমল সোমের জন্যেই ওর এই বেড়ানোটা হচ্ছে। সাতদিনের ছুটি কাটাতে অমল সোম কালিম্পংয়ে যাচ্ছেন। জলপাইগুড়িতে থাকলে রোজ সন্ধেবেলায় ওঁর বাড়িতে আড্ডা বসে ওদের। ব্যাচেলার মানুষ অমল খুব খাওয়াতে ভালবাসেন। এই লোকের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে কিনারা করতে পারে না অর্জুন, কাঠচোর ধরতে গয়েরকাটায় উনি তিনকড়ির ছদ্মবেশে কী করে ছিলেন। অমল সোমই বলেছিলেন, “চল আমার সঙ্গে, দিন-সাতেক বই তো নয়।” তারপর জুড়েছিলেন, “আমার এক বন্ধু আছে কালিম্পংয়ে। খুব ইনফ্লুয়েন্সিয়াল। ও চেষ্টা করলে তোমার একটা চাকরি হয়েও যেতে পারে।” চাকরি না গোয়েন্দাগিরি, এই দ্বন্দ্বের মধ্যে অর্জুনের এবারের কালিম্পং যাত্রা।
চায়ের গ্লাস দোকানি ছোঁড়ার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বাসের দিকে তাকাতেই অর্জুন দেখতে পেল একটা লোক হনহন করে এসে বাসে উঠে পড়ল। লোকটার হাতে ছোট্ট একটা চামড়ার ব্যাগ। কিন্তু সে এক মিনিটও ভেতরে রইল না। যেমন এসেছিল তেমন ভঙ্গিতে বাস থেকে নেমে চলে গেল ওপাশে। একটা দোকানের আড়ালে তার শরীর মিলিয়ে গেল। না, এবার ভুল হয়নি অর্জুনের। এই লোকটাও নির্ঘাত সিকিমিজ। অমলদার বর্ণনামতো মিলিয়ে নিয়েছিল সে। কিন্তু লোকটা ঢুকলই বা কেন আর বেরিয়েই বা এল কেন? চলে যাওয়ার সময় ওর হাতে কোনো ব্যাগ ছিল না। তার মানে ওটা হাতবদল হয়েছে। চকিতে ওর মনে সেই সিকিমিজ ছেলেটি ভেসে উঠল। এই লোকটির হাঁটাচলা খুবই সন্দেহজনক। যেন কিছু তাড়া করেছিল ওকে। কথাটা অমলদাকে জানাতে যেতেই খুব জোরে হর্ন বাজতে লাগল। বাস ছাড়বে, কণ্ডাক্টর চেঁচাচ্ছে। ওরা তড়িঘড়ি ফিরে এল যে যার আসনে। অর্জুন দেখল সেই সিকিমিজ ছেলেটির ভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি। এবং তার কোলের ওপর ছোট্ট চামড়ার ব্যাগটা পড়ে আছে অবহেলায়। অর্জুন লজ্জা পেল। ওই ব্যাগটায় দামী বা গোপনীয় কিছু থাকলে লোকটা ওইভাবে ফেলে রাখত না। বাস চলতে শুরু করলে সে একসময় প্রকৃতির মধ্যে ডুবে গেল।
কালিম্পং শহরের বাসস্ট্যান্ডে ওরা যখন পৌঁছল তখনও রোদ ওঠেনি, কুয়াশা ছড়িয়ে আছে চারধারে। অথচ স্ট্যান্ডের ঠিক পাশেই পাহাড় কেটে গড়া ফুটবল মাঠটায় ছেলেরা বেশ প্র্যাকটিস করছে। ঠাণ্ডা তেমন কিছু নয়, হাফ-হাতা সোয়েটারেই বেশ কাজ চলে যাচ্ছে। সবাই যখন বাস থেকে নামছে তখন অর্জুনের দৃষ্টি সেই সিকিমিজ লোকটিকে খুঁজছিল। কী আশ্চর্য! লোকটা উধাও হয়ে গেল নাকি। কালিম্পংয়ের বাসস্ট্যান্ডে আসবার আগেই কোথাও নেমে গেছে সে খেয়াল করেনি। অমল সোমের এদিকে নজর নেই। তিনি বললেন, “কালিম্পং রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় জায়গা ছিল। ওঁর বন্ধু গ্রাহামসাহেবের নামে একটা স্কুল আছে এখানে। বিষ্টুর সঙ্গে দেখা হলে এসব জানতে পারবে। আরে, ওই যে বিষ্টুসাহেব এসে গেছেন।” কথাটা শেষ করেই হাত নাড়লেন অমল সোম।
অর্জুন দেখল বেশ রোগা, খাটো এক ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন হাসিমুখে। স্যুট-টাই এবং কনুইয়ে ঝোলানো লাঠিতে কেমন যেন বেমানান দেখাচ্ছে ওঁকে। সামনে আসতেই অমল সোম এক পা এগিয়ে বললেন, “আমি জানতাম আপনি আসবেন এবং এইমাত্র আপনার কথা বলছিলাম, তাই অনেকদিন বেঁচে থাকবেন। কেমন আছেন?”
“আমি তো কখনও খারাপ থাকি না। ওয়েলকাম টু কালিম্পং। মনে হচ্ছে আপনার সঙ্গী ইনি? আমার নাম বিষ্ণুচরণ পত্রনবীশ। কালিম্পংয়ে সবাই অবশ্য বিষ্টুসাহেব বলে ডাকে।” হাত বাড়িয়ে দিলেন বিষ্টুসাহেব এমন ভঙ্গিতে যে অর্জুন তাড়াতাড়ি সেই হাত স্পর্শ করেই ছেড়ে দিল।
অমল সোম বললেন, “ওর নাম অর্জুন। খুব ভাল ছেলে। খুঁটিমারি রেঞ্জে আমায় খুব সাহায্য করেছিল। একটা চাকরির দরকার ওর।
“হয়ে যাবে ভাই।” সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় কাত করলেন বিষ্টুসাহেব। আর অর্জুন অবাক হয়ে গেল। লোকটা ফোরটোয়েন্টি নাকি! কত ক্ষমতাবান লোকের কাছে সে চাকরি চেয়েছে কিন্তু অতি পরিচিত সেই ব্যক্তিরা কখনোই এমন কথা বলতে পারেনি, আর ইনি তো তাকে চেনেন না। অমল সোম হাসলেন, “অর্জুন, অবাক হয়ো না। বিষ্টুসায়েব হলেন কালিম্পংয়ের মুকুটহীন রাজকুমার। বাঙালি দেখলেই উনি কিছু না কিছু উপকার করবেনই। ক’দিন থাকলেই সেটা টের পাবে।”
বিষ্টুসাহেব বিন্দুমাত্র বিনয় দেখালেন না, গম্ভীর মুখে বললেন, “আমি খুব লজ্জিত সোমবাবু, আজকের দিনটা আপনাদের কষ্ট করতে হবে।
“কী ব্যাপার?”
“সার্কিট হাইস বুক করে রেখেছিলাম কিন্তু বিহারের একজন মিনিস্টার এসেছেন বলে এস ডি ও রিকোয়েস্ট করেছেন আজকের দিনটা ওঁকে ছেড়ে দিতে। কাল সকালেই আপনারা ওখানে শিট করবেন। আজকে একটু কষ্ট করে প্রধানের ওখানে থাকতে হবে।” বিষ্টুসাহেবকে বিমর্ষ দেখাল।
অমল সোম হাসলেন, “ঠিক আছে, আপনি অত বিব্রত হবেন না।” প্রধানের হোটেল বাসস্ট্যান্ডের লাগোয়া। প্রধান হলেন একজন নেপালি ব্যবসায়ী, হোটেল ছাড়া ট্রান্সপোর বিজনেস আছে। বিষ্টুসাহেবকে দেখে এগিয়ে এলেন তাঁর অফিস ছেড়ে, “আপনার গেস্ট এসে গেছেন! ঠিক আছে, আর এ কাঞ্ছা, এত্তা আইজা, ছিটো।”
ঘুরপাক খাওয়া সিঁড়ি বেয়ে ওরা যে ঘরটায় পৌঁছল সেটি খুব ভাল নয় তবে পরিষ্কার। জানলা দিয়ে খেলার মাঠটা দেখা যায়। দুটো খাট পাশাপাশি, অ্যাটাচ্ড বাথে জল আছে। বিষ্টুসাহেবকে অমল সোম বিদায় করে স্নান করতে ঢুকেছিলেন। অর্জুনের ইচ্ছে করছিল না মোটেই। সে জানলার ধারে চেয়ার নিয়ে রাস্তা দেখছিল। সরু একটা রাস্তা বাসস্ট্যান্ড থেকে বেরিয়ে এই হোটেলের গা ঘেঁষে নীচে নেমে গেছে। রাস্তাটার দুধারে নানা রকম অদ্ভুত জিনিসের দোকান। এইগুলো জলপাইগুড়িতে দেখা যায় না। মানুষের হাঁটা, চলা, পোশাক, এমনকী তাকানোর ভঙ্গিতেও কত পার্থক্য। মাথার ওপর সূর্য জ্বলছে না এবং ক্রমশ শীত বাড়ছে। খিদে পেয়েছে বেশ। হঠাৎ ওর চোখ বেশ নাড়া খেল। সেই সিকিমিজ ভদ্রলোক চটপটে পায়ে এগিয়ে আসছে এদিকে। ওর দৃষ্টি দুপাশের বাড়িগুলোর গায়ে ঝোলানো সাইনবোর্ডের ওপর। অর্থাৎ নতুন লোক, ঠিকানা খুঁজছে। তারপর প্রধানসাহেবের ট্রান্সপোর্ট অফিসের হদিস পেয়ে নিশ্চিন্ত মুখে ঢুকে গেল ভেতরে। বছর-তিরিশ বয়স হবে এবং মুখের ভঙ্গিতে বেশ শীতল কাঠিন্য আছে। প্রধানের সঙ্গে ওর কী সম্পর্ক? লোকটাকে কিছুতেই সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না।
মিনিট-পাঁচেক বাদে প্রধানের অফিস থেকে বেরিয়ে এল লোকটা, সঙ্গে আর একজন নেপালি। অফিসের সামনে দাঁড় করানো অনেকগুলো জিপের একটায় উঠে বসার পর অর্জুন বুঝতে পারল নেপালি ছেলেটি ড্রাইভার। সিকিমিজ ওর পাশে বসার পর জিপটা বেরিয়ে গেল সামনে থেকে।
অমল সোম বাথরুম থেকে বেরিয়ে বললেন, “যত ঠাণ্ডাই হোক, স্নান করার একটা আলাদা চার্ম আছে। তুমি করবে না অর্জুন?”
“আমি একটু হাতমুখ ধুয়ে নেব। অমলদা, সেই সিকিমিজটা প্রধানসাহেবের কাছ থেকে একটা জিপ ভাড়া করে নিয়ে গেল।”
“কোন্ সিকিমিজ?”
“সেই যে বাসে টুপিতে মুখ ঢেকে বসেছিল।”
অমল সোম হাসলেন, “তুমি দেখছি লোকটাকে ভুলতে পারছ না!” এমনভাবে কথা শেষ করে চুল আঁচড়াতে লাগলেন যেন আর এ-বিষয়ে কিছু বলার নেই। অবশ্য সত্যি তো কিছু নেই কিন্তু তবু স্বস্তি পাচ্ছিল না অর্জুন। লোকটা সন্দেহজনক।
দুপুরের খাওয়া ওরা একটা রেস্তোরাঁতে সারল। বিল মোটামুটি খারাপ নয়। অর্জুনের খারাপ লাগছিল। অমলদার ওপর নির্ভর করতে খারাপ লাগছে। অথচ তার পকেটে বেশি টাকাও নেই। সে ঠিক করল চাকরি পেলে সে এসব খরচ মিটিয়ে দেবে।
রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে অমল সোম বললেন, “চলো, একটু হাঁটাহাঁটি করা দরকার। এক ফোঁটা রোদ নেই অথচ এখন দুপুর। বেশ ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। দুপাশের দোকানপাট বেশ সাজানো। একপাশে পাহাড়ের গায়ে এই শহরের মানচিত্র আঁকা আছে। অর্জুন দেখল, ম্যাপটার বিশেষত্ব হল সমস্ত শহরটার দ্রষ্টব্য স্থানগুলো সুন্দরভাবে চিহ্নিত করা আছে। ঢালু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা তেমাথায় চলে এল। অমল সোম বললেন, “চলো, এখানে একটা হস্তশিল্পের গ্যালারি আছে, খুব সুন্দর। দেখে আসি।”
অর্জুনের জায়গাটা খুব ভাল লাগছিল। একটা ভাঙা গেট দিয়ে ওরা ওপরে উঠে এল। দুপাশের খোলা জায়গায় কিছু মুরগি আর ছাগল চরছিল। খানিকটা এগোতেই মনে হল মাঠটা আমচকা শেষ হয়ে গিয়েছে। কাছাকাছি হতেই চোখ জড়িয়ে গেল অর্জুনের। পায়ের নীচে পাহাড় আর পাহাড়। অদ্ভুত নীল ছায়া মেখে সেই পাহাড়গুলো ঝিমোচ্ছে। আর তাদের ফাঁকে-ফাঁকে চিকচিক করছে দুটি ধারা। দুটো নদী দুপাশ থেকে এসে মিলে গেছে ওইখানে। অমল সোম মুগ্ধ চোখে সেইদিকে তাকিয়ে বললেন, “অপূর্ব না? জলপাইগুড়িতে দাঁড়িয়ে কখনও ভাবতে পেরেছ আমাদের সেই চেনা তিস্তা এখানে কী রকম?”
“তিস্তা?” অর্জুন অবাক হয়ে গেল।
“হ্যাঁ। ও-দুটো হল তিস্তা আর রঙ্গিত। মিলেছে এইখানে আর মিলবার পর তিস্তার মধ্যে রঙ্গিতের নামটা হারিয়ে গিয়েছে।”
এইসময় দুজন টিবেটিয়ান একটা বিরাট ঘর থেকে বেরিয়ে এল। আর তাঁদের পেছন পেছন বিষ্টুসাহেব। ওদের দেখে হাত নাড়লেন তিনি 1 তারপর দ্রুত কিছু বলে প্রায় দৌড়ে এলেন কাছে, “আপনাদের আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি কখন থেকে। জলদি হোটেলে চলে গিয়ে জিনিসপত্র প্যাক করে নিন। আমি আধ ঘণ্টার মধ্যেই আসছি। ঠিক আছে?”
অমল সোম জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার? তাড়াচ্ছেন কেন?”
“সার্কিট হাউস পাওয়া গেছে। এখন দখল না করলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। আমি এই তিব্বতিদের ঘাড় থেকে নামিয়েই হোটেলে আসছি। ঠিক আছে? বলে আর উত্তরের জন্যে না দাঁড়িয়ে লোক দুটোর পেছনে ছুটলেন।
অমল সোম বললেন, “কী অদ্ভুত মানুষ! যাক, প্রধানের হোটেলে থাকবে না সার্কিট হাউসে যাবে?”
অর্জুন বলল, “সার্কিট হাউসে তো শুনেছি ভি আই পি-রা ওঠেন। তাঁরা কেউ এলে আমাদের চলে আসতে হবে না তো?”
“সে দায় বিষ্টুসাহেবের। তবে সেখানে গেলে এই বাজার, দোকানপাট, মানুষজন চাইলেই দেখতে পাবে না। খুব নির্জনে, এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বাংলো। আমার পক্ষে ভাল, চুপচাপ রেস্ট নেওয়া যাবে, তোমার কেমন লাগবে তাই বলো?” অমল সোম প্রশ্ন করলেন।
সার্কিট হাউস বোঝা যাচ্ছে পাণ্ডববর্জিত জায়গায়। কিন্তু সেখানে গেলে অমলদা খুশি হবেন এবং বিষ্টুসাহেবের সান্নিধ্যে থাকা যাবে। বিষ্টুসাহেব যখন চাকরি দিতে পারেন তখন তার কথা শোনাই তো ভাল
প্রধানের জিপে চড়ে ওরা সার্কিট হাউসে চলে এল। বিষ্টুসাহেব আর অমল সোম পেছনের সিটে বসেছিলেন, অর্জুন ড্রাইভারের পাশে। পাহাড়টাকে পাক খেতে খেতে ওরা উঠে আসছিল ওপরে। বিষ্টুসাহেব রিলে করার ভঙ্গিতে রাস্তার পাশে যেসব উল্লেখযোগ্য বাড়ি পড়ছে তার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। একটা বাড়ি দেখিয়ে চাপা গলায় বললেন, “এটা হল গোয়েন্দাদের বাড়ি। চিনাদের আক্রমণের সময় আমাদের হেডকোয়াটার্স ছিল। ঠিক আছে?”
অর্জুন চমকে উঠল, বিষ্টুসাহেবও গোয়েন্দা ছিলেন নাকি! সেটা লক্ষ করে বিষ্টুসাহেব হাসলেন, “সে বিরাট গল্প। পরে বলব, ঠিক আছে? হ্যাঁ, ওই, যে রাস্তাটা ডানদিকে বেঁকে গেছে, ওদিকে পড়বে গৌরীপুর হাউস। ওই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসে থাকতেন। বিউটিফুল। ঠিক আছে?”
অর্জুনের বেশ মজা লাগছিল। ‘ঠিক আছে’ শব্দ দুটো ওঁর মুদ্রাদোষ কিন্তু এমন স্বরে উচ্চারণ করেন যে মনে হয় খুব সিরিয়াস।
সার্কিট হাউসে ঢুকে চোখ জুড়িয়ে গেল অর্জুনের। এদিকটায় মানুষের বাড়িঘর বেশি নেই। সার্কিট হাউসের গেটের পাশেই আর্মির বড় অফিসারের গেট, সেখানে প্রহরী বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে। ভেতরের প্যাসেজ দিয়ে অনেকটা এসে গাড়িটা থামতেই অর্জুন চোখের সামনে বিশাল ভ্যালি দেখতে পেল। সবুজ কার্পেট যেন ঢালু হয়ে সুদূরে হারিয়ে গিয়েছে। সার্কিট হাউস জুড়ে নানান ধরনের ফুলের গাছ। একটা গ্র্যান্ডিফ্লোরার গাছ তো ফুলের ভারে নুইয়ে পড়েছে। বিষ্টুসাহেবকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই চৌকিদার ছুটে এল, “হুজুর!”
বিষ্টুসাহেব বললেন, “সাবলোককো তিন নম্বর কামরামে লে যাও। এস ডি ও সাহেব ফোন কিয়া থা?”
“জি হুজুর!”
জিনিসপত্র ঘরে রেখে এসে ওরা বারান্দার বেতের চেয়ারে বসল। সামনের ভ্যালিতে মিলিটারিরা গল্ফ খেলছে। সাদা বলটাকে হিট করা মাত্র উড়ে যাচ্ছে অনেক দূরে। একটু বাদেই কুয়াশা উঠে আসতে শুরু করল নীচের খাদ থেকে। বাংলোর বারান্দা থেকে পিচের রাস্তাটার একটা অংশ আবছা দেখা যায়। পাখির ডাক ছাড়া কোনো শব্দ নেই। অর্জুন প্রথম আবিষ্কার করল গন্ধ কখনও-কখনও জীবন্ত সঙ্গীর মতো নির্জনে কাজ করে। অদ্ভুত মিষ্টি ফুলের গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ফুলগুলোর শরীর থেকে বেরিয়ে।
বিষ্টুসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “চা চলবে?”
অমল সোম বললেন, “একটু পরে। কিন্তু বিষ্টুসাহেব, আপনি যে আমাদের এই স্বর্গরাজ্যে নিয়ে এলেন কেউ আবার উৎখাত করবে না তো?”
বিষ্টুসাহেব চোখ ঘুরিয়ে হাসলেন। ওঁর হাতের লাঠিটা বারান্দার মেঝেতে দুবার শব্দ করল, “আমার ওপর দেখছি আপনার আস্থা নেই। একবার যখন এখানে এসেছেন তখন যাওয়ার ইচ্ছে না হলে কেউ আপনাদের যেতে বলবে না। ঠিক আছে? আমাকে ছটার মধ্যে ক্লাবে যেতে হবে। তার আগে চলুন আপনাদের দূরবিনটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। ঠিক আছে?”
চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে অমল সোম বললেন, “আমি আর কোথাও নড়ছি না আজ। এরকম জায়গা ছেড়ে স্বর্গেও যেতে রাজী নই। অর্জুন, তুমি বরং বিষ্টুসাহেবের সঙ্গে ঘুরে এসো। ইন্টারেস্ট পাবে।”
বিষ্টুসাহেব জিপে উঠতে উঠতে বললেন, “তোমার চাকরি চাই?”
দ্রুত মাথা নেড়ে ওঁর পাশে বসল অর্জুন। ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে বিটুসাহেব বললেন, “গোয়েন্দাগিরিতে ইন্টারেস্ট আছে মনে হচ্ছে?”
অর্জুন নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ল সম্মতির। বিষ্টুসাহেব বললেন, “গুড়। আমি অনকেদিন থেকে এইরকম ভাবছিলাম। এই কালিম্পং শহরটা ক্রিমিনালে ভরে গিয়েছে। প্রত্যেকদিন দুটো করে ক্রাইম হচ্ছে। পুলিশের সাধ্য কি তার সমাধান করে। তুমি যদি লাইসেন্স নিয়ে এখানে অফিস করে বসো তাহলে দেখবে চাকরির একশো গুণ বেশি রোজগার করবে। ঠিক আছে?”
অর্জুন প্রস্তাব শুনে অবাক হয়ে গেল। সে একা কী করে এখানে ওসব করবে? বিষ্টুসাহেব ওর মুখ দেখে হাসলেন, “যতক্ষণ এই শর্মা আছে ততক্ষণ তোমার কোনো চিন্তা নেই। অফিসের ব্যবস্থা আমিই করে দেব। তাছাড়া তোমার অ্যাডভাইসার হিসেবে তো আমি রইলামই। প্রচুর পড়াশুনা করেছি বুঝলে ক্রাইম নিয়ে। ক্রিমিনাল হলে কেউ আমাকে ধরতে পারত না। তার ওপর অমলবাবু আছেন। প্রয়োজনে ওরও সাহায্য পাব আমরা। ঠিক আছে?”
বেশ মজা লাগছিল অর্জুনের। সে ঘাড় নেড়ে বলল, “একটা চাকরির সঙ্গে ওসব করলে ভাল হত না?”
বিটুসাহেব বললেন, “ক্রিমিনালদের যেমন দ্বিধায় পড়লে বিপদ তেমনি গোয়েন্দাদের দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। ঠিক আছে? আচ্ছা, এইটে হল মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট। চিনারা টুস দেওয়ার পর তৈরি হয়েছে।”
অর্জুন দেখল ওরা মিলিটারি এলাকার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দুপাশে নানান বোর্ডে মিলিটারিদের পথনির্দেশ রয়েছে। অস্ত্রধারী জোয়ানরা সতর্ক চোখে ওদের দেখছে। পুরো এলাকাটাই ক্যান্টনমেন্ট। চকচকে পরিষ্কার পথঘাট। অনেকটা উঠে গাড়ি একটা বৌদ্ধমন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াতেই বিষ্টুসাহেব বললেন, “এইটেই হল কালিম্পংয়ের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়।”
কিন্তু অর্জুন তখন মুগ্ধ হয়ে মনাস্টারির দিকে তাকিয়েছিল। এই নির্জনে মনাস্টারির ভেতর থেকে ভেসে আসা বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ অদ্ভুত আবহাওয়া সৃষ্টি করছে। বিষ্টুসাহেব ওকে নিয়ে প্রথম চারদিক প্রদক্ষিণ করলেন। পাশের খোলা জমিতে অনেক রকম কাপড় টাঙানো আছে। অর্জুন কোথায় যেন পড়েছিল ওগুলো হয় মৃত আত্মাদের উদ্দেশে অথবা কোনো মানত করার সময় টাঙানো হয়। ভেতরে ঢোকা মাত্র একটা বড় হলঘর দেখতে পেল অর্জুন। জুতো বাইরে রেখে সেই ঘরে ঢুকে প্রথমেই নজরে এল বিশাল বুদ্ধমূর্তি। তাঁর সামনে একটা পদ্ম। দুজন লামা সেই মূর্তির সামনে ধুনো জ্বালছেন। একজন লামা সেই বাদ্যযন্ত্রটি বাজাচ্ছেন এক কোণে বসে। অনেক পুঁথি সাজানো আছে দেওয়ালের ধার ঘেঁষে। বেদির এপাশে অনেকগুলো আসন। বড় থেকে ছোট ওই আসনগুলো পদমর্যাদানুযায়ী। বিষ্টু সাহেব চাপা গলায় কথাগুলো বললেন। দালাই লামার আসন সবচেয়ে উঁচুতে।
বুদ্ধদেবের মূর্তিটি বইতে দেখা চেনা বুদ্ধ নয়। একটু যেন রাগী-রাগী, বিষ্টুসাহেব চাপা গলায় বললেন, “ইনি মহাকাল। চিনারা যখন তিব্বতে ঢুকে পড়েছিল তখন লামারা এই মূর্তিটিকে বিভিন্ন খণ্ডে অত্যন্ত পবিত্রভাবে এদেশে নিয়ে আসে। এখানে তাঁকে আবার জোড়া দেওয়া হয়।”
বিষ্টুসাহেব কথা শেষ করে মাটিতে প্রায় শুয়ে পড়ে প্রণাম করলেন। অর্জুন দেখাদেখি হাত জোড় করে নমস্কার জানাতে গিয়ে মন পালটাল। একটা লোক শুয়ে প্রণতি জানাচ্ছে আর সে দাঁড়িয়ে? কেমন ধৃষ্টতা হয়ে যাচ্ছে। প্ৰায় বাধ্য ছেলের মতো সে বিষ্টুসাহেবের পাশে শুয়ে পড়তেই চাপা গলা কানে এল, “তুমি আমি যেখানে শুয়ে আছি তার তলায় পঞ্চাশ কোটি টাকার হিরে রাখা আছে।
হাতের তালুর নীচে ঠাণ্ডা মোজায়েক করা মেঝে কিন্তু আচম্বিতে মনে হল সেটা ছ্যাঁক করে উঠল। বিষ্টুসাহেব বললেন, “কথা নয় আর, বাইরে চলো।”
ওরা চুপচাপ মনাস্টারি ছেড়ে বেরিয়ে এল। বেশ হিম বাতাস বইছে এখন। অর্জুন বিষ্টুসাহেবের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, “কেমন দারুণ ব্যাপার, না? কোটি কোটি টাকার হিরের ওপর শুয়ে এলাম। আমি এখানে এলেই তাই একবার শুয়ে নিই। ঠিক আছে?”
অর্জুন এবার না বলে পারল না, “না, ঠিক নেই।”
বিষ্টুসাহেব চোখ ছোট করলেন, “নেই মানে? বিশ্বাস হচ্ছে না কথাটা?”
“খামোকা অত টাকার হিরে ওখানে থাকবেই বা কেন?”
যেন অবোধ শিশুর সঙ্গে কথা বলছেন এমন ভঙ্গিতে হাসলেন বিষ্টুসাহেব, “দালাই লামা যখন এদেশে চলে আসেন তখন কত ধনরত্ন সঙ্গে এনেছিলেন তা জানো? জানো না! এদিক দিয়ে যে সব লামারা এসেছিলেন তারা ওই হিরে সঙ্গে এনেছিলেন। সব বৌদ্ধমঠের সম্পত্তি। ভারত সরকার সেগুলো সীমান্তেই আটকে দেয়। কিন্তু বৌদ্ধরা প্রাণ থাকতে ওই দেবতার সম্পত্তি হাতছাড়া করতে রাজী হল না। রক্তারক্তি ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে দেখে সরকার একটা চুক্তি করলেন। ওই হিরে কোনোভাবেই দেশের বাজারে যাতে না যায় তার ব্যবস্থা হল। এই দূরবিন পাহাড়ের ওপর এমন চমৎকার মনাস্টারি তৈরি করে দিলেন সরকার। ঠিক হল মনাস্টারির মেঝের নীচে একটা ইস্পাতের ভল্টে ওই হিরেগুলো রাখা থাকবে। দেবতার জিনিস তাঁর সামনেই রইল। কিন্তু ওই ইস্পাতের ভল্ট কখনও খোলা যাবে না। ঠিক আছে?”
খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল অর্জুন। একবার মনাস্টারির দিকে ভাল করে তাকাল সে। কেউ বুঝতে পারবে না ওখানে অতখানি সম্পদ লুকনো রয়েছে। কিন্তু খবরটা যখন বিষ্টুসাহেব জানেন তখন আরও অনেকেই জানেন। অথচ কোনো গার্ড বা সতর্কতা চোখে পড়ছে না কেন?
বিষ্টুসাহেব বললেন, “চলো, আমরা সানসেট দেখি। ঠিক আছে?”
সূর্য তো ওঠেইনি আজ চোখের সামনে তো অস্ত যাবে কী! তবু ওঁর পেছনে যেতে যেতে অর্জুন প্রশ্ন করল, “এইভাবে এত হিরে রয়েছে, বিপদটিপদ হতে পারে না?”
“না।” খুব দ্রুত পুতুলের মতো মাথা নাড়লেন বিষ্টুসাহেব। দশ ইঞ্চি পুরু ইস্পাতের দেওয়াল মাটির নীচে বসে কাটা যায় না। যদি কেউ সে চেষ্টা করে তাহলে ওই ইস্পাতে কোনো মেটাল ছোঁয়ানো মাত্র অ্যালার্ম বেল বেজে উঠবে। লামারা এমনিতে খুব শান্ত কিন্তু বুদ্ধের কোনো ক্ষতি ওঁরা প্রাণ থাকতে সহ্য করবেন না। যে আসবে তাকে জীবন্ত ফিরতে হবে না। তার ওপর এই পাহাড়ের চুড়োকে ঘিরে রয়েছে বিরাট মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট। এখানে আসতে হলে ওদের চোখের সামনে দিয়ে দীর্ঘপথ উঠে আসতে হবে। কারও বুকের পাটা নেই এখানে এসে ডাকাতি করে। ঠিক আছে?”
হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে। অর্জুন নিশ্চিন্ত হল, এখানে কখনও কোনো বিপদ ঘটবে না। বেশ ছায়া নেমে গেছে চারধারে। যেহেতু ওরা পাহাড়ের চুড়োয় তাই নীচের অন্ধকার ওপরে উঠে আসেনি। মনাস্টারির পিছনে বিশাল মাঠ। বোধহয় মিলিটারিরা এখানে খেলাধূলা করে কিন্তু একটা হেলিপ্যাড আছে বলে মনে হচ্ছে। সত্যি জায়গাটা বেশ সুন্দর।
ওরা যখন গাড়ির কাছে পৌঁছল তখন মনাস্টারি থেকে মন্ত্রসঙ্গীত ভেসে আসছে। যতদূর শব্দ যাচ্ছে ততদূর যেন পবিত্র হয়ে উঠছে। অর্জুন ঠিক করল এখানে রোজ একবার করে আসবে। সার্কিট হাউস থেকে হেঁটে আসতে মিনিট কুড়ির বেশি লাগবে না।
গাড়িতে বসে বিষ্টুসাহেব বললেন, “তাহলে আমার প্রস্তাবটা ভেবে দ্যাখো। অমলবাবুর সঙ্গে আলোচনা করো। বুঝলে হে, কালিম্পংয়ে ক্রিমিনালরা থিকথিক করছে। তুমি আমি মিলে সবকটাকে পুঁটিমাছের মতো টপাটপ ধরতে পারি। ঠিক আছে?” সার্কিট হাউসের গেটে অর্জুনকে নামিয়ে বিষ্টুসাহেব ক্লাবে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন পারলে রাত্রে একবার খোঁজ নিতে আসবেন। ভদ্রলোককে বেশ লেগেছে অর্জুনের। একটু মেয়েলি গলায় কথা বলেন আর ওই ‘ঠিক আছে’ জিজ্ঞাসাটা অস্বস্তিকর ঠেকলেও মানুষটা ভাল।
সার্কিট হাউসে আলো জ্বলছে। প্যাসেজ দিয়ে ফুলের গন্ধ মেখে হেঁটে এল অর্জুন। ভীষণ চুপচাপ চারধার। সন্ধে হতেই ঠাণ্ডাটা দাঁত বসাতে শুরু করেছে। এমনকী চৌকিদারটাও বাইরে নেই। অর্জুন বাংলোর বারান্দায় উঠে দেখল চেয়ার খালি, অমল সোম নেই।
ঘরের দরজা বন্ধ, সেখানে একটা তালা ঝুলছে। তালার গায়ে ছোট্ট একটা চিরকুট। অবাক হয়ে কাগজটা খুলে নিয়ে বারান্দায় জ্বালানো আলোর তলায় এসে ভাঁজ খুলল অর্জুন, “ঘুরে আসছি। চৌকিদারের কাছে গিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি নিও।”
অমল সোম এরকম চিরকুট রেখে কোথায় গেলেন বুঝতে পারল না অর্জুন। বিকেলেও বলেননি যে উনি বের হবেন। তাছাড়া এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় যাওয়ার মতো—, অবশ্য বেড়াতে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে সন্ধে হলেই ফিরে আসার কথা। অর্জুন একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বারান্দায় বসল। অন্ধকারেও বোঝা যায় সামনের ভ্যালিটা কুয়াশায় সাদা হয়ে গেছে। গাছের শরীরে হাওয়ারা ফিসফিসানি শব্দ তুলছে। গ্রাণ্ডিফ্লোরার গন্ধে যখন নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল তখনও অমল সোম ফিরলেন না।
শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্জন বলেই অর্জুনের অস্বস্তি শুরু হল। চেয়ার ছেড়ে উঠে সে বাগানের প্যাসেজ দিয়ে চৌকিদারের ঘরের কাছে চলে এল। দরজা বন্ধ। ডাকতে গিয়ে পায়ের আওয়াজ পেল সে। ঘাড় ঘুরিয়ে একটি ছায়ামুর্তি দেখতে পেল। গেট পেরিয়ে খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে মূর্তিটা। আলোর তলায় এলেই অর্জুন স্পষ্ট দেখতে পেল। বেশ লম্বা মহিলা, টিবেটিয়ান কিংবা সিকিমিজ। পরনে পা ঢাকা ছুম্বা। দুটো হাত ভাঁজ করে বুকের নীচে রেখে এগিয়ে আসছেন। অর্জুন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল বলেই ভদ্রমহিলা দেখতে পাননি। পাশ দিয়ে যখন উনি ডানদিকের বাংলোর বারান্দায় উঠে গেলেন তখন চমকে উঠল অর্জুন। এ মুখ সে দেখেছে। ভদ্রমহিলাকে খুব চেনা লাগছে তার অথচ এঁকে আগে কখনও দেখেনি। এটা কী করে সম্ভব হয়! তারপরেই কারণটা ধরা পড়ে গেল তার কাছে। আজ জলপাইগুড়ি থেকে আসার সময় মিনিবাসে কিংবা প্রধানের অফিসের সামনে যাকে সে দেখেছিল এই মহিলার মুখের সঙ্গে তার মুখের কোনো ফারাক নেই। সাদৃশ্য এতখানি যে, অবাক হতে হয়। কিন্তু বাসের সন্দেহজনক লোকটি পুরুষ আর ইনি হলেন পুরোপুরি মহিলা। নকল সাজ যে নয় তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। তাহলে? সাদৃশ্য বলে যেটাকে মনে হচ্ছে তা দুজনেই সিকিমিজ বলে নয় তো? মঙ্গোলিয়ান মুখ তো একইরকম হয়।
বেশ উত্তেজিত হয়ে চৌকিদারকে ডাকতে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়াল অর্জুন। আর একজন আসছে। একটু লেংচে লেংচে, আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে। আলোর নীচে এলেও ঠিক বুঝতে পারল না অর্জুন। লোকটা আর একটু এগিয়ে এসে বাঁ দিকের বাংলোর দিকে ঘুরে যেতেই সজাগ হল সে। ওটা তো তাদের আস্তানা। লোকটা ওখানে যাচ্ছে কেন? সে নিঃশব্দে পিছু নিল। লোকটা লেংচে লেংচে ততক্ষণে বারান্দায় উঠে একটা চেয়ার টেনে সশব্দে বসে পড়ে মাথা থেকে শালটা খুলে ফেলল। আর অর্জুন এমন ঠকে যাওয়াটা নিঃশব্দে হজম করল কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে বারান্দায় উঠে জিজ্ঞাসা করল, “অমলদা, আপনার পায়ে কী হয়েছে?” অমল সোম বললেন, “পড়ে গিয়েছিলাম। অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারিনি। তুমি কতক্ষণ এসেছ?”
“বেশ কিছুক্ষণ! আপনি বের হবেন বলেননি তো।
“হঠাৎ মনে হল ঘুরে আসি তাই ঘুরে এলাম। তা কী কী দেখলে?”
অর্জুন বলল, “দূরবিন পাহাড়ের ওপর একটা বৌদ্ধদের মন্দির আছে। সেই মন্দিরের তলায় কোটি কোটি টাকার হিরে রাখা হয়েছে।”
“হিরে?” অমল সোম সোজা হয়ে বসলেন, “বিষ্টুসাহেবের কাছে শুনেছ?”
“হ্যাঁ। কেন, উনি কি মিথ্যে বলবেন?”
“জানি না, তবে বলার তো কোনো কারণ নেই। অমল সোমকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল। অর্জুন সেটা লক্ষ করে বলল, “অবশ্য হিরে যেভাবে রয়েছে তাতে কারও সাধ্য হবে না ওগুলোকে স্পর্শ করা। ইস্পাতের ভল্ট, অ্যালার্ম বেল, লামা এবং মিলিটারি—এতগুলো বাধা কে টপকাবে।”
অমল সোম বললেন, “বিরাট বাহিনী ঘিরে রেখেছিল, পাশে স্ত্রী পাহারা দিয়েছিল তবু লোহার বাসরে ছিদ্র খুঁজে পেয়েছিল সাপ। তাই না?”
অর্জুনের মনে চট করে লখিন্দর-বেহুলার ঘটনাটা ভেসে এল। সত্যি কথা। আর তখনই সে কথাটা বলে ফেলল, “জানেন অমলদা, একটু আগে এখানে একজন মহিলাকে দেখলাম, ভুটানিদের মতো ছুম্বা পরা, কিন্তু মুখখানা অবিকল সেই লোকটার মতো। যাকে বাসে দেখেছিলাম, সিকিমিজ!”
অমল সোম হাসলেন। তারপর উঠে পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলে ভেতরে চলে গেলেন। এইভাবে তার কথার গুরুত্ব না দেওয়াতে বেশ উষ্ণ হয়ে উঠেছিল অর্জুন। তার মনে পড়ল এই অমলদা যখন তিনকড়ি ছিল তখন সে কেমন ধমকাতে পারত। যেই লোকটা খোলস ছাড়ল সঙ্গে সঙ্গে অন্য মানুষ হয়ে গেল।
মিনিট-খানেক ঠাণ্ডায় থেকে ওর মাথায় আর একটা মতলব খেলে গেল। সার্কিট হাউসের অফিসঘরে যে খাতাটা আছে সেখানে নিশ্চয়ই ভদ্রমহিলার নাম লেখা হয়েছে। কারণ, বিষ্টুসাহেব ওকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার সময় ওদের হয়ে কাজটা করে গিয়েছিলেন। অর্জুন উঠল। বাগানের প্যাসেজ দিয়ে নিঃশব্দে সে সার্কিট হাউসের অফিসঘরের বারান্দায় উঠে এল। দরজা বন্ধ, ঘর অন্ধকার। চৌকিদার নিশ্চয়ই চাবি দিয়ে কোথাও গেছে। অর্থাৎ এইটে আজ জানা যাবে না।
.
রাত্রের খাওয়া খানসামা পৌঁছে দিয়েছিল ঘরে। মুরগির মাংস আর রুটি। খাওয়াদাওয়া শেষ করে কম্বলের তলায় ঢুকে পড়েছিল ওরা। পাশের খাটে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে অমল সোম কথামৃত পড়ছেন। আজকে হাঁটাহাঁটি ঘোরাঘুরি কম হয়নি। তবু ঘুম আসছিল না অর্জুনের। বিষ্টুসাহেবের কথা মনে পড়ছিল। উনি চাকরির বদলে এখানে গোয়েন্দা হয়ে থাকতে বলছেন। খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। কিন্তু গোয়েন্দা হতে হলে তো নিশ্চয়ই কিছু ট্রেনিং দরকার হয়। না হলে তো সবাই গোয়েন্দা হয়ে যেত। দূর, তার চেয়ে ছোটখাটো একটা চাকরি করে সে মাকে টাকা পাঠাতে পারত আর অবসর সময়ে এইসব করত—সেটাই ভাল ছিল। বিষ্টুসাহেবটা গুলবাজ নিশ্চয়ই। যে এক কথায় সার্কিট হাউস ব্যবস্থা করে দিতে পারে সে তাকে যে কোনো চাকরি দিতে পারে না! আসলে কাটিয়ে দেবার মতলব আর কি! কিন্তু কালিম্পংয়ে নাকি ক্রিমিনাল থিকথিক করছে। কিন্তু তাদের একজনেরও তো সাক্ষাৎ পাওয়া গেল না এখনও।
বাইরে শব্দ হচ্ছে টুপটাপ। কাচের জানালায় ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ। অর্জুনের মনে হল আকাশের অনেকটা কাছাকাছি আসায় বিদ্যুতের জেল্লা আরও বেড়ে গেছে। আর তারপরেই হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। অর্জুন নাক অবধি কম্বলে ঢেকে পর্দার ফাঁক দিয়ে আকাশটা দেখছিল। হঠাৎ মনে হল বিদ্যুতের ঝলকানি বুঝি বাগানে নেমে এসেছে। অস্পষ্ট জলের ধারার ওপর পড়ে একটু একটু করে বাড়ছে। তারপরেই ইঞ্জিনের শব্দ কানে এল। একটা গাড়ি এসে থামল বারান্দার নীচে এবং তার হেডলাইট এখনও জ্বলছে।
দরজায় নক্ হল। অমল সোম বই বন্ধ করে অর্জুনের দিকে তাকালেন। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠলেন। এই ঠাণ্ডায় কম্বলের আরাম থেকে বের হতে অর্জুনের একটুও ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু এত রাত্রের আগন্তুকটিকে দেখার আগ্রহে সে অমল সোমের পিছু-পিছু হলঘরে এল। আলো জ্বালিয়ে দরজা খুলতেই মনে হল বাইরে মহাপ্রলয় শুরু হয়েছে। প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ছে। আর বর্ষাতি গায়ে চাপিয়ে বিষ্টুসাহেব একগাল হাসলেন, “আমার আনন্দে আজ একাকার ধ্বনি আর রঙ, জানে তা কি এ কালিম্পং?”
অমল সোম খুশি হয়ে বললেন, “আপনি?”
“উত্তরটা দিয়ে দিলাম। আমাদের বৃদ্ধ এসব উত্তর অনেক আগেই রেখে গেছেন। এই যে মেঘের আওয়াজ আর আলোয়-আঁধারে যে রঙের খেলা, এইসব নিয়েই তো বেঁচে থাকা। কেমন আছেন দেখতে এলাম। ঠিক আছে?” বিষ্টুসাহেব ঘরে ঢুকলেন।
অর্জুনের মনে পড়ল সন্ধেবেলায় উনি বলে গিয়েছিলেন রাত্রে একবার দেখা করে যাবেন। তাই বলে এত রাত্রে! ভেতরে এসে বসলেন বিষ্টুসাহেব, “আপনাদের খাওয়াদাওয়া চুকে গেছে তো?”
কথাটা শেষ করলেন অর্জুনের দিকে তাকিয়ে। তাই সে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল।
“তাহলে তিনটে কাপ নিয়ে এসো। কফি খাই।” অর্জুনের নজরে পড়ল বিষ্টুসাহেবের কাঁধে একটা ফ্লাস্ক ঝুলছে।
কফি খেতে খেতে অমল সোম জিজ্ঞাসা করলেন, “বাড়িতে ভাবছে না?”
“না। ভাববার তো কেউ নেই, তাই না। অনেক আগেই আসতাম এখানে। ক্লাব থেকে বেরিয়ে বাজারের সামনে দিয়ে আসতে গিয়ে দেখলাম এক বাঙালি ভদ্রলোক ফ্যামিলি নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন। কোনো হোটেলে জায়গা পাচ্ছে না। ওদের তুলে নিলাম গাড়িতে, তারপর নানান জায়গায় চেষ্টা করে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল!” মাথা নাড়লেন বিষ্টু সাহেব, “আমার এক পরিচিত ভদ্রলোকের বাড়ির একটা ঘর তিনি মাঝে মাঝে ভাড়া দেন। সেখানে ওঁদের তুলতেই বাঙালি ভদ্রলোক আমার হাত জড়িয়ে ধরলেন, তিনি সেখানে থাকতে পারবেন না। ঠিক আছে?”
অর্জুন জিজ্ঞাসা করল, “কেন?”
“পায়ের তলায় ছ-ইঞ্চি কার্পেট, দেওয়ালে ফ্রেসকো দেখে ঘাবড়ে গিয়েছেন ভদ্রলোক। তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে বৃষ্টির মধ্যে আসছি এখানে, দেখতে পেলাম একটা জিপ পাহাড়ের গায়ে কাত হয়ে রয়েছে। অ্যাকসিডেন্ট, তবে কেউ আহত হয়নি। একটি সিকিমিজ ছেলে আমার কাছে লিফট চাইল। বলল, আমেরিকায় থাকে, এখানে বেড়াতে এসেছে। কিন্তু মশাই, সার্কিট হাউসের সামনে জিপ স্লো হয়েছিল সেই ফাঁকে কখন পেছন থেকে টুক করে নেমে গেছে। এমন অকৃতজ্ঞ যে ধন্যবাদটুকু দিল না। ভিজুক ব্যাটা বৃষ্টিতে, আমেরিকায় আর যেতে হবে না। ঠিক আছে?”
কফির কাপ রেখে অমল সোম সোজা হয়ে বসলেন, “আপনি ঠিক দেখেছেন ছেলেটি সিকিমিজ?”
“হ্যাঁ মশাই। ওতে আমার ভুল হয় না। আমি টিবেটিয়ানে ডক্টরেট করেছি তা নিশ্চয়ই জানেন।” বেশ চটে গেলেন বিষ্টু সাহেব।
“কিন্তু মানুষ মাত্রেই ভুল হয়!” অর্জুন উত্তেজিত গলায় বলল।
“ধ্যাত্, লোকটার সঙ্গে আমি কথা বললাম, ভুল হবে কী করে!”
অমল সোম জিজ্ঞাসা করলেন, “এখানে কোথায় উঠেছে কিছু বলল?”
“না তো। কেন বলুন তো?”
“কী-রকম পোশাক পরেছিল?”
“কালো টাইট জিনস্, শর্টস্, তার ওপর দাবার বোর্ডের মতো কোট আর মাথায় একটা কাউবয় টুপি। লাইফ ম্যাগাজিনে যেমন দেখি আর কি। ঠিক আছে? বিষ্টুসাহেব সন্দেহের গলায় এবার প্রশ্ন করলেন।”
“না, এবার বোধহয় ঠিক নেই বিষ্টুসাহেব। অমল সোম বললেন, “আপনার মনে হচ্ছে সার্কিট হাউসের সামনে এসে সে গাড়ি থেকে নেমেছে, তাই তো? কিন্তু আগে যে নামেনি তা বুঝলেন কী করে?”
“কারণ তার একটু আগেও আমি সিগারেটের গন্ধ পাচ্ছিলাম। টিপিক্যাল। কিন্তু ব্যাপারটা কী মশাই! রহস্য আছে মনে হচ্ছে? লোকটা কি ক্রিমিনাল?” বিষ্টুসাহেব চেয়ারটাকে আর একটু সামনে টেনে আনলেন।
অমল সোম উঠে দাঁড়ালেন, “অর্জুন, তুমি ওঁকে ব্যাপারটা বলো। আমি ঘুরে এসে বাকিটা বলব।” ওদের বিস্মিত করে অমল সোম ভেতরে চলে গেলেন। এবং পরমুহূর্তেই একটা বর্ষাতিতে সর্বাঙ্গ ঢেকে নিঃশব্দে বৃষ্টির মধ্যে নেমে গেলেন।
অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল অমল সোমের সঙ্গে যায়। ও নিশ্চিত জানে সেই লোকটা এই সার্কিট হাউসেই এসেছে এবং ওই মহিলার কাছেই। বিটুসাহেব না থাকলে সে অমল সোমের সঙ্গী হত। বিষ্টুসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “কেসটা কী একটু খুলে বলো তো?”
অর্জুন তখন সকাল থেকে দেখা ঘটনাগুলো পরপর বলল। সব শুনে হো-হো করে হেসে উঠলেন বিষ্টুসাহেব, “মাই গড। তোমাদের মাথাফাথা খারাপ হয়ে গেছে বোধহয়। একটা লোককে বাসে দেখেছ, তিস্তাবাজারে আর একজন তাকে কিছু দিতে পারে, প্রধানের কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া করতে সে এসেছিল, ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে তাকে ক্রিমিনাল ভাবলে? আরে পোশাক দেখে কি মানবচরিত্র ঠাওর করা যায় আজকাল? আর এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে ওর চেহারার মিল? এক হাজার প্রায় একই রকম দেখতে ভুটানি, নেপালি, সিকিমিজ কিংবা টিবেটিয়ান আছে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের আত্মীয়? তোমরা ভাই সর্ষের মধ্যে ভূত দেখছ। ঠিক আছে?”
অর্জুন একটু চুপসে গেল। সত্যি তো, একটা লোককে দেখে তার সন্দেহ হয়েছিল। শুধু এইটুকু সম্বল করে কাউকে ক্রিমিনাল ভাবা অন্যায়। কিন্তু লোকটা বিষ্টুসাহেবকে না বলে জিপ থেকে নেমে গেল কেন? এইসময় সর্বাঙ্গে বৃষ্টি মেখে অমল সোম ফিরে এলেন। বর্ষাতিটা খুলে বারান্দায় রেখে ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বসেই জিজ্ঞাসা করলেন, “এখানকার থানায় আপনার কেমন প্রভাব আছে বিষ্টুসাহেব?”
“থানা? দার্জিলিঙের এস পি, ডি এস পি আমাকে দাদা বলে ডাকে। থানার দারোগা আমায় দেখলেই নমস্কার করে। কেন?”
“বেশ। আপনার ইনফ্লুয়েন্স আমাদের দরকার হতে পারে। আপনি কি এখনই বাড়িতে ফিরছেন।” অমল সোম গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।
“এত রাত্রে আবার কোন্ চুলোয় যাব! কিন্তু কী ব্যাপার বলুন তো! এই রহস্যটুকু না শুনলে আমার ঘুম হবে না।
“আপনি যাকে লিফ্ট দিয়েছেন সে আমাদের পাশের বাংলোয় এসেছে। এসেই ব্যাটা ড্রিংক করতে বসেছে এবং তাই ভদ্রমহিলা খুব রাগারাগি করছেন। মনে হচ্ছে আজকের রাত্রে কালিম্পংয়ে বেশ বড়সড় গোলমাল হবে।”
“ভদ্রমহিলা? এর মধ্যে ভদ্রমহিলা আসলেন কোত্থেকে?”
“কেন? আপনাকে অর্জুন বলেনি?”
“হ্যাঁ। কিন্তু এরা ক্রিমিনাল তার প্রমাণ কী?”
অমল সোম বললেন, “বিকেলে আপনারা চলে গেলেন এখানে বসে থাকতে ভাল লাগছিল না। ভাবলাম বাগানে একটু পায়চারি করি। গ্রাণ্ডিফ্লোরার গাছগুলোর তলা দিয়ে খানিকটা এগোতেই মানুষের গলা শুনতে পেলাম। ইংরেজিতে কথা বলছিল ওরা। খুব চাপা গলায়। বলার ধরন দেখে সন্দেহ হল। আমি ওদের টের পেতে দিলাম না। মহিলা বলছিলেন, ‘আর একটা দিন অপেক্ষা করা দরকার।’ সঙ্গীটি তাতে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “সেটা খুব ঝুঁকি হয়ে যাবে। যে কোনো মুহূর্তে সুড়ঙ্গটা লোকের চোখে পড়ে যেতে পারে।”
“মহিলা হতাশ গলায় বলেছিলেন, ঠিক আছে। তাহলে আজ রাত একটায় তাঁরা তৈরি থাকবেন। ওঁর ভাই মাল নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। এই কথাগুলো শুনে আমি সোজাপথ দিয়ে না ফিরে ওই গল্ফ মাঠে নেমে গেলাম।”
অর্জুন উত্তেজিত গলায় প্রশ্ন করল, “তখনই কি আপনার পায়ে লেগেছিল?”
“না, লাগেনি। মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় ফিরতেই ওই মহিলাকে দেখে ইচ্ছে করে লেংচে হাঁটছিলাম। এবার সব পরিষ্কার হয়েছে?” অমল সোম ঘড়ি দেখলেন।
বিষ্টুসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “সঙ্গের লোকটা কি ওই ছোঁড়া?”
“না। এ মধ্যবয়সী।”
“কিন্তু মতলবটা কী ওদের? সুড়ঙ্গ করেছে কেন?”
“জানি না। তবে যদি সম্ভব হয় আপনার দারোগাকে এখান থেকে ফোন করুন না। আপনি কিছু বলবেন না, যা বলবার আমি বলব।” অমল সোমের কথা শেষ হতে বিষ্টুসাহেব উঠলেন। হলঘরের একপাশে স্ট্যান্ডের ওপর টেলিফোন রাখা ছিল। ওঁকে খুব নার্ভাস দেখাচ্ছিল। রিসিভার তুলে নাম্বার ঘুরিয়ে বললেন, “কী, বলেছিলাম না, কালিম্পংয়ে ক্রিমিনাল থিক-থিক করছে।”
তারপর কানেকশান পেয়ে বললেন, “কে, রাইসায়েব? আমি বিষ্টু। হ্যাঁ-হ্যাঁ ভাল আছি। কী করছেন? বাড়ি ফিরছেন! হ্যাঁ, জোর বৃষ্টি পড়ছে। আমি সার্কিট হাউস থেকে বলছি। আমার এক বন্ধু আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস। নিন ধরুন।”
অমল সোম এগিয়ে গিয়ে সিরিভারটা নিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে চাপা গলায় খানিকক্ষণ কথা বলে হাসিমুখে ফিরে এলেন, “এই দারোগাটিকে বেশ স্মার্ট মনে হচ্ছে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই এসে যাবেন। তা বিষ্টুসাহেব, বেশ রাত হয়েছে, আপনি আর দেরি করবেন না। বৃষ্টি আজ রাত্রে থামবে বলে মনে হচ্ছে না।”
বিষ্টুসাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন, “মানে? আমি বাড়ি যাব মানে? এত বড় একটা নাটক অভিনীত হবে সামনে আর আমি বাড়ি গিয়ে ঘুমোব? অ্যাম আই কাওয়ার্ড? আমি আজ ফিরছি না, ঠিক আছে?”
অর্জুনের মনে হল অনেকক্ষণ বাদে উনি ঠিক আছে শব্দ দুটো বললেন। বোধ হয় নাভার্স হয়ে গেলে মুদ্রাদোষটি বন্ধ হয়ে যায়।
অমল সোম বিব্রত গলায় বললেন, “বেশ। কিন্তু আপনার খাওয়া-দাওয়া!”
“দরকার নেই। কফিই যথেষ্ট।”
অমল সোম বললেন, “তা কি হয়? অর্জুন, দ্যাখো তো খানসামার কাছে কিছু পাওয়া যায় কি না। ওয়াটারপ্রুফটা নিয়ে যাও।
অর্জুন চট করে উঠে পড়ল। এতক্ষণের কথাবার্তায় ওর শীতের আলসেমিটা চলে গিয়েছিল। এই বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারে হাঁটার একটা আলাদা মজা আছে। পাজামা গুটিয়ে নিয়ে বর্ষাতিটায় শরীর এবং মাথা ঢেকে সে বিষ্টুসাহেবের আপত্তি সত্ত্বেও বেরিয়ে পড়ল। বাতাস নেই কিন্তু বৃষ্টির তেজ মারাত্মক। শরীরে জলের ধারা যেন আছড়ে পড়ছে। মাঝে-মাঝে বিদ্যুতের ঝলসানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। কোনোরকমে খানসামার ঘরের কাছে এসে দেখল দরজা বন্ধ এবং ভেতরে কোনো আলো জ্বলছে না। সবাইকে খাইয়ে লোকটা নিশ্চয়ই শুয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় ওকে ডেকে তুলে খাবার চাওয়াটা অমানবিক হবে। অর্জুন চারপাশে তাকাল। অদ্ভুত গা-ছমছমে অন্ধকার বৃষ্টিমাখা গাছগুলোর শরীরে। এমনকী প্যাসেজের আলোগুলোকে পর্যন্ত ভুতুড়ে মনে হচ্ছে বৃষ্টির ধারায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসতে গিয়ে ওর চোখ ডানদিকের বাংলোর ওপর পড়ল। একটা ঘরের জানলা আলোমাখা, বাকিটা অন্ধকার। খুব কৌতূহল হল অর্জুনের। নিঃশব্দে ও গাছের ফাঁক গলে বারান্দায় উঠে এল। সবকটা দরজা-জানলা বন্ধ। দেওয়াল ঘেঁষে পা টিপে টিপে সে জানলাটার কাছে পৌঁছে গেল। ভেতরের পর্দা বোধহয় ছোট, নইলে এক পাশে সামান্য ফাঁক থাকত না। অর্জুন সতর্ক চোখে ভেতরটা দেখল। মহিলা একটা সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। এখন তাঁর পরনে ছুম্বার বদলে কালো প্যান্ট আর সোয়েটার। সেই বাসের লোকটা তাঁর পাশে বসে একটা টুলের ওপর পা ছড়িয়ে দিয়ে রিভলভার নিয়ে খেলা করছে। উলটো দিকে আরও দু’জন মোটা মধ্যবয়সী বসে। এদের মুখ দেখতে পাচ্ছিল না অর্জুন। ওদের মাঝখানে টেবিলের ওপর একটা বড় বাক্স খোলা। হঠাৎ দাবার ছক-মার্কা কোট পরা লোকটি চেঁচিয়ে কিছু বলে উঠল। বৃষ্টি এবং জানলা বন্ধ থাকায় অর্জুন কিছুই শুনতে পেল না। উলটো দিকের লোকটা কপালে হাত দিয়ে কিছু বলতেই মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। ওঁকে খুব অস্থির দেখাচ্ছিল। অর্জুনের মনে হল দাবার ছক এমন কিছু করেছে যার জন্যে এরা খুব বিব্রত হয়ে পড়েছে। হঠাৎ তার নজরে পড়ল মহিলা দরজার দিকে আসছেন। আর দেরি না করে সে নিঃশব্দে বারান্দা থেকে নেমে দ্রুত একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। একটু বাদেই দরজা খুলে গেল। মহিলা অলস হাতে চুল ছুঁয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে বাঁ দিকে চোখ ফিরিয়ে যেন সজাগ হলেন। তারপর কয়েক পা এগিয়ে এসে বৃষ্টির আড়াল সরিয়ে কিছু দেখবার চেষ্টা করে চাপা গলায় একটা নাম ধরে ডাকতেই মোটা লোকদের একজন বেরিয়ে এল। হাত দিয়ে অর্জুনদের বাংলোটাকে দেখিয়ে দিলেন মহিলা। ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে অর্জুনের মনে হল যে তার দম বন্ধ হয়ে যাবে। ওরা ওই বাংলোটা লক্ষ করছে কেন? ঘর থেকে কি মহিলা তাকে জানলায় দেখেছেন? মহিলার কথা শুনে মোটা লোকটা ঘরে ফিরে গিয়ে একটা ওয়াটারপ্রুফ পরে প্যাসেজে নেমে পড়ল। মহিলা তখনও দাঁড়িয়ে আছেন, অতএব ঝোপের আড়াল ছেড়ে অর্জুন বাইরে আসতে পারছিল না। লোকটা সোজা চলে গেল বাংলোর সামনে। হয়তো বৃষ্টির জন্যেই অর্জুন বের হবার পরে সোম দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ভেতর থেকে, তাই বাইরে আলো আসছিল না। অর্জুন দেখল মোটা লোকটা বারান্দায় না উঠে সামনে দাঁড় করানো গাড়িটায় উঠে বসল। বিষ্টু সাহেবের গাড়িতে ও কী করছে? বিকেলে যখন বিষ্টুসাহেব গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন তখন ড্রাইভার ছিল। এখন কি ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিয়েছেন? একটু বাদে মোটা লোকটা গাড়ি থেকে নেমে ফিরে এল। বারান্দায় উঠতেই মহিলার উদ্গ্রীব মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওকে!”
মহিলার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি মোটা লোকটির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভেতরে চলে যেতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। অর্জুন আর দাঁড়াল না। ঝোপ থেকে বেরিয়ে এক দৌড়ে গাড়িটার পাশে পৌঁছে ভেতরে মুখ ঢোকাল। চাবিটা লাগানো আছে। কিন্তু পেছনের সিটে একটা লোক শুয়ে আছে। লোকটা বিষ্টুসাহেবের ড্রাইভার। কিন্তু এমনভাবে ঘুমিয়ে আছে যে অর্জুন চাপা গলায় ডাকতেও তার ঘুম ভাঙল না। অর্জুন লোকটার শরীরে হাত দিয়ে ঠেলতে একটা পা সিট থেকে পড়ে গেল। আঁতকে উঠল অর্জুন। লোকটা মরে যায়নি তো! ওই মোটা লোকটা যখন গাড়িতে উঠেছিল তখন নিশ্চয়ই ড্রাইভার ঘুমোচ্ছিল। ঘুমের মধ্যে খুন করে গিয়ে ‘ওকে’ বলল না তো! অর্জুন ধীরে ধীরে ড্রাইভারের নাকের কাছে আঙুল নিয়ে গিয়ে দেখল নিশ্বাস পড়ছে। সে আর দাঁড়াল না। এক লাফে বারান্দায় উঠে দরজা ঠেলতেই অমল সোম বললেন, “কী, খাবার পাওয়া গেল না?”
অর্জুন দ্রুত মাথা নেড়ে দরজা ভেজিয়ে বর্ষাতি খুলতে খুলতে এক নিশ্বাসে সব কথা খুলে বলতে বিষ্টুসাহেব তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন, “কী! আমার ড্রাইভারকে খুন করেছে?”
অর্জুন বলল, “না, খুন করেনি, অজ্ঞান করে রেখেছে।”
বিষ্টুসাহেব তখনি দেখবার জন্যে ছুটছিলেন, কিন্তু অমল সোম তাকে বাধা দিলেন, “উত্তেজিত হবেন না বিষ্টুসাহেব, বসুন।
“বসব? আমার ড্রাইভার সেন্সলেস আর আমি বসব?”
“হ্যাঁ। আমার কথা
শুনুন। ওদের মনে হচ্ছে জিপটা দরকার। ওই ছোকরার বোধহয় জিপ নিয়ে আসার কথা ছিল। অ্যাকসিডেন্ট করে এদের প্ল্যান ভেস্তে দিয়েছিল বলে মহিলা উত্তেজিত হয়েছিলেন। কিন্তু এরা এফিসিয়েন্ট, পেশাদার, নইলে জিপে উঠে ঘুমন্ত ড্রাইভারকে নিঃশব্দে অজ্ঞান করতে পারত না। অজ্ঞান করে জিপেই রেখে দিয়েছে যাতে যদি আমরা এখন বের হই তাতে কিছু টের না পাই। আমরা যে টের পেয়েছি তা ওদের বুঝতে দেওয়া ঠিক হবে না। ওরা আপনার জিপটা নিয়ে কাজে বের হবে। অমল সোম বললেন।
“আমার জিপ নিয়ে ক্রাইম করবে?” বিষ্টুসাহেব আঁতকে উঠলেন।
“ওদের তাই ইচ্ছে। এটা করতে দিতে হবে।”
“কিন্তু আমার ড্রাইভার যদি মরে যায়?”
অমল সোম অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ড্রাইভারকে উন্ডেড বলে মনে হল তোমার? রক্ত পড়ছে?”
“না রক্ত দেখিনি। চুপচাপ পড়েছিল পেছনের সিটে।”
“তাহলে ওকে না দেখার রিস্ক নিতেই হবে। ক’টা বাজল?”
“বারোটা বেজে গেছে।”
“ঘরের আলো নিবিয়ে দাও অর্জুন।”
অর্জুন সুইচগুলো টিপতেই বাড়িটা অন্ধকার হয়ে গেল। মিনিট পনেরো ওরা চুপচাপ বসে থাকল। অর্জুনের মনে পড়ল দারোগাবাবু আধঘণ্টার মধ্যেই আসবেন বলেছিলেন কিন্তু এখনও আসছেন না কেন? প্রশ্নটা চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করতে অমল সোম বললেন, “ওঁর এখানে আসার কথা নয়। আমাদের জন্যে রাস্তায় অপেক্ষা করবেন।
আরও কিছুক্ষণ পরে অমল সোম জানলায় দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বললেন, “আসছে!”
বিষ্টুসাহেব উঠলেন না। অর্জুন লক্ষ করছিল উনি কেমন যেন চুপসে গিয়েছেন কিছুক্ষণ থেকে। অর্জুন অমল সোমের পাশে দাঁড়িয়ে দেখল সেই মোটা লোকটা সটান গাড়ির মধ্যে উঠে গিয়ে ড্রাইভারকে টানতে টানতে বের করে পাঁজাকোলা করে ফুলগাছের মধ্যে শুইয়ে দিল। তার পর গাড়িতে উঠে হেডলাইট না জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে ব্যাক করে নিয়ে গেল জিপটা। ডানদিকের বাংলোর সামনে সেটা দাঁড়াতেই বাকি তিনজন চটপট জিপে উঠে পড়ল। ওদের প্রত্যেকের হাতেই কিছু না কিছু জিনিস রয়েছে। হেডলাইট না জ্বেলেই জিপটা বাগানের ভেতর দিয়ে উঠে গেল ওপরের রাস্তায়।
ওরা চোখের আড়াল হতেই অমল সোম দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলেন। তারপর সেই বৃষ্টির মধ্যেই নেমে গেলেন বাগানে। অর্জুনও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নীচে নামল। শীতল জলের ধারায় শরীর চমকে উঠেছিল ওর। অমল সোমের সঙ্গে ধরাধরি করে ড্রাইভারকে বারান্দায় তুলে আনতেই সে উঃ আঃ করতে লাগল। বিষ্টুসাহেব ঝুঁকে পড়ে ঘন ঘন ডাকতে লাগলেন, “এ পদম, পদম বাহাদুর!”
ডাকের জোরেই বোধহয় ড্রাইভার সাড়া দিল, “জি!”
“রামরো ছ?”
মাথা নাড়ল ড্রাইভার। হ্যাঁ সে ভাল আছে। অমল সোম উঠে দাঁড়ালেন, “চলুন, ওকে ভেতরে নিয়ে যাই, সময় নষ্ট করা চলবে না।
বৃষ্টিতে ভিজে বোধহয় ড্রাইভারের চৈতন্য দ্রুত ফিরে এসেছিল। তাকে আর বেশি সাহায্য করতে হল না। বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে সে ঠিক হয়ে যাবে। ভেতরের ঘর থেকে একটা কম্বল এনে অমল সোম লোকটিকে বললেন ভেজা জামা-কাপড় ছেড়ে ফেলতে। তারপর অর্জুনকে বললেন, “চলো। ওয়াটারপ্রুফটা পরে নাও।”
বিষ্টুসাহেব বলে উঠলেন, “সে কী! আমি বাড়ি না গিয়ে এখানে রইলাম কেন? নো নো, আমাকে সঙ্গে নিতে হবে। তা ছাড়া আমি আর অর্জুন মিলে ভবিষ্যতে ইনভেস্টিগেশন সেন্টার খোলার প্ল্যান করেছি যখন তখন আমার যাওয়া দরকার।”
অর্জুন কী মনে করে বিষ্টুসাহেবকেই ওয়াটারপ্রুফটা পরতে দিল। একটার বেশি নেই যখন তখন সেটা পরা অস্বস্তিকর। তা ছাড়া বৃষ্টিতে এর মধ্যেই ভেজা হয়ে গেছে। বিষ্টুসাহেব লজ্জিত ভঙ্গিতে সেটা পরতে পরতে বললেন, “খুব লজ্জা লাগছে, তোমরা পরছ না আর আমি—, খুব লজ্জা লাগছে। ঠিক আছে?”
ড্রাইভারকে দরজা বন্ধ করতে বলে ওরা বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে এল। চিনচিনে ঠাণ্ডায় বিষ্টুসাহেব বললেন, “ফ্যান্টাস্টিক!”
উত্তেজনা স্থান-কাল-পাত্রকে ভুলিয়ে রাখে। অর্জুন এই শীতের রাত্রে জল বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে অমল সোমের পাশাপাশি হাঁটছিল। বিষ্টুসাহেব পেছনে থেকে বলে উঠলেন, “ওদের ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হয়নি। আর এই হতভাগা দারোগাটা আসবে বলেও এল না, কী দায়িত্বজ্ঞানহীন।” বড় রাস্তায় উঠে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়াতেই একটা জিপের শব্দ কানে এল। খুব কাছেই পাহাড়ের আড়ালে সেটা যেন ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়েছিল, ওদের দেখেই হেডলাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে এল। সামনে এলে ভেতর থেকে একজন বলে উঠলেন, “নমস্কার বিসাহেব, উঠে পড়ন।
বিষ্টুসাহেব গলাটা চিনতে পেরে বেশ উষ্ণ গলায় বললেন, “ইশ, এতক্ষণে আসার সময় হল? আর কিছু আগে এলেই—।”
দারোগাবাবু বললেন, “বাঃ, আমাকে তো এখানেই অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক চুপচাপ বসে আছি।”
গাড়িতে উঠে অমল সোম নিজের পরিচয় দিতে দারোগাবাবু হাত মেলালেন, “আরে আপনার নাম জানি মশাই। রিসেন্টলি সেই কাঠচুরির কেসটা আপনি ধরেছিলেন তো?”
অমল সোম বললেন, “একা আমি নই, এও ছিল।” বলে অর্জুনকে দেখিয়ে দিলেন। অর্জুন দেখল দারোগাবাবু ছাড়াও গাড়িতে আরও চারজন পুলিশ রয়েছে। তারা প্রত্যেকেই সশস্ত্র।
দারোগাবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার বলুন তো?”
অমল সোম বললেন, “একটু আগে সার্কিট হাউস থেকে বেরিয়ে একটা জিপ কোন্দিকে গিয়েছে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ। বাঁ দিকে।”
অর্জুনের হৃপিণ্ড সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠল। ওইদিকেই তো দূরবিন পাহাড়, বৌদ্ধমন্দির, কোটি-কোটি টাকার হিরে।
অমল সোম বললেন, “খুব সাবধানে ওইদিকে গাড়িটা নিয়ে চলুন। পথে যদি জিপটাকে দেখতে পান তাহলে উপেক্ষা করবেন?”
দারোগাবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “ওই জিপে কারা আছে?”
এবার অমল সোম যতটা পারেন খুলে বললেন ঘটনাগুলি। এমনকী অর্জুন অবাক হল শুনে, তিস্তাবাজারে ব্যাগ বদল হওয়ার ঘটনাটাও বাদ দিলেন না অমল সোম। শুনতে শুনতে দারোগাবাবু খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, “আপনি আগেই ওদের ধরতে চাইলেন না কেন?”
“তাহলে কিছুই প্রমাণ করা যেত না। আমার স্থির বিশ্বাস ওরা বৌদ্ধমন্দিরের তলায় আজ রাত্রে ঢুকবে।” অমল সোম বললেন।
এবার বিষ্টুসাহেব কথা বললেন, “ইম্পসিব্ল। দশ ইঞ্চি পুরু ইস্পাতের দেওয়ালে মেটাল ছোঁয়ালেই সমস্ত কালিম্পং জেগে উঠবে।
অমল সোম বললেন, “হয়তো। কিন্তু অসম্ভব শব্দটা বুদ্ধিমানদের অভিধানে নেই। দেখাই যাক না।”
অর্জুনের হাসি পাচ্ছিল এর মধ্যেই। অমল সোম কথাটা বেশ ঘুরিয়ে বললেন, অসম্ভব শব্দ শুধু মূর্খের অভিধানেই পাওয়া যায়। এতে অবশ্য বিষ্টুসাহেবকে মূর্খ বলা হল না। জিপটা খুব সুন্দর, শব্দ হচ্ছে না। হেডলাইটের আলোয় বৃষ্টিধারা দেখা যাচ্ছে। এবং এই পথে ওই আলো না জ্বেলে এক পা এইসময়ে এগিয়ে যাওয়া যায় না। অর্জুন দেখল মিলিটারিদের এলাকা শুরু হয়ে গিয়েছে। এই বৃষ্টিতেও এত জওয়ান পাহারায় আছে। ওদের জিপের আলো দেখে হাত তুলল একজন। দারোগাবাবু গাড়িটা থামাতেই বর্ষাতি পরে একজন ছুটে এল, “কাঁহা জায়েগা?”
“মনাস্টারি! পুলিশ।”
লোকটা এবার জিপটাকে এবং বোধহয় দারোগাকেও চিনতে পেরে মাথা নাড়ল, “উও জিপ থোড়া পহেলে গিয়া!”
“কৌন জিপ?”
“জিসমে বড়া লামা আয়া রুমটেকসে!”
দারোগা তাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু অমল সোম চাপা গলায় বললেন, “না। এখন থাক।”
গাড়িটা পাহাড়ি পথ বেয়ে আর একটু ওপরে উঠতেই মন্দির দেখা গেল। কারণ এখন আচমকাই, সুইচ টিপে আলো নেবানোর মতোই বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। রাত্রের আকাশটাকে মেঘেরা ধুয়েমুছে সাফ করে রেখেছিল। তার গায়ে বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল মন্দিরটাকে।
অমল সোম বললেন, “গাড়িটাকে এখানেই রাখুন। ওপরে নিয়ে গেলে ওরা টের পেয়ে যাবে।”
ওরা গাড়ি থেকে টপাটপ নেমে পড়ল। বিষ্টুসাহেব অর্জুনের কানের কাছে বললেন, “সঙ্গে অস্ত্র আছে তোমার?”
অর্জুন ঘাড় নাড়ল, “না।”
“আমারও নেই। এ যেন অহিংস আক্রমণ হচ্ছে! ঠিক আছে।”
অর্জুন ঘাড় নাড়ল। হ্যাঁ, সত্যি কথা। সঙ্গে একটা অস্ত্র থাকলে ভাল হত। মনে বেশ জোর আসত।
দারোগাবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে অমল সোম সোজা পথ ছেড়ে পাকদণ্ডী ধরলেন। বেশ খাড়া পথ, তার ওপর বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় পেছল হয়ে গেছে। অর্জুনের তেমন অসুবিধে হচ্ছিল না কিন্তু বিষ্টুসাহেব পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি যদি সোজা পথে উঠি তাহলে কি খুব অসুবিধে হবে?”
অর্জুন বলল, “বোধহয় ওরা দেখতে পেয়ে যাবে।”
বিষ্টুসাহেব হতাশ গলায় বললেন, “আমার ফিগার তো দেখবার মতো নয়!” অর্জুনের কথাটা শুনে এমন বিষম লাগল যে শব্দটা চাপতে পারল না। দারোগা ধমকে উঠলেন, “সাইলেন্স!”
আরো খানিকটা ওঠার পর জিপটাকে দেখতে পেল ওরা। রাস্তার পাশে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। ওরা যদি পাকদণ্ডী বেয়ে না উঠত তাহলে চোখে পড়ার কথা নয়। চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বোঝা গেল জিপে কেউ নেই। অমল সোম বিষ্টুসাহেবকে চাপা গলায় বললেন, “কিছু মনে করবেন না, আপনার জিপটাকে একটু অকেজো করে দিতে হবে।
মাথা নিচু করে এক ছুটে রাস্তা পেরিয়ে অমল সোম জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলেন। তারপর জিপের বনেট খুলে কীসব করে ওদের ইশারা করলেন চলে আসতে। একে একে সেই ভঙ্গিতে ওরা রাস্তাটা পেরিয়ে এল। বোঝা যাচ্ছে এখানে জিপ রেখে দলটা হেঁটে গেল।
অমল সোম বললেন, “সবার একসঙ্গে যাওয়ার দরকার নেই। দারোগাবাবু, আপনি আমার সঙ্গে চলুন, বাকিরা এখানেই লুকিয়ে থাক। প্রয়োজন পড়লে আপনি হুইস্ল বাজালে যেন হেল্প পাই।”
বিষ্টুসাহেব বললেন, “সেই ভাল। অস্ত্রহীন হয়ে এগোনো বোকামি। পুলিশরা যে যার জায়গা নিয়ে নিল। অমল সোমরা গুঁড়ি মেরে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছেন এমন সময় অর্জুন বলল, “অমলদা, আমি যাব।”
অমল সোম কী বললেন বোঝা গেল না কিন্তু অর্জুন সঙ্গ নিল। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর আচমকা খোলা পাহাড়। ওরা দেখল প্রায় মন্দিরের নীচে এসে গেছে ওরা। কিন্তু কোনো জনমানবের চিহ্ন নেই। ওপাশে ভুতুড়ে আলো জ্বেলে কালিম্পং ঘুমুচ্ছে। ওরা সেই খেলার মাঠটার গায়ে এসে পড়েছিল। দারোগাবাবু বললেন, “এগোবেন?”
অমল সোম ইশারা করলেন, না। কোনো অস্বাভাবিক জিনিস চোখে পড়ছিল না ওদের। চার-চারটে লোক একসঙ্গে উধাও হয়ে যেতে পারে না। এদিকটা এত খোলা যে কেউ নড়লেই চোখে পড়বে। ওরা কি এতখানি ঝুঁকি নেবে। অথচ জিপ রেখে ওরা তো এই পথেই এসেছে। মিনিট-পাঁচেক জঙ্গলের গায়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর অর্জুন সতর্ক হয়ে অমল সোমকে স্পর্শ করল। একটা লোক কোথায় ছিল কে জানে, হঠাৎ খোলা আকাশের তলায় বেরিয়ে এসে চারপাশে নজর বুলিয়ে নিয়ে আবার উধাও হয়ে গেল।
দারেগাবাবু বললেন, “চলুন।”
অমল সোম বললেন, “না। আর একটু দেখি। ওখানে কি কোনো প্যাসেজ আছে? ন্যাড়া পাহাড় ছাড়া কিছু নজরে পড়ছে না তো!”
দারোগাবাবু বললেন, “আমিও বুঝতে পারছি না।”
আরও মিনিট-পাঁচেক যেতেই সেই লোকটাকে দেখা গেল। তেমনি সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে বাইরে এসে দেখে নিচ্ছে ধারে-কাছে কেউ আছে কি না। একবার পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাতে গিয়েও ধরাল না। তারপর আবার ভেতরে ঢুকে গেল। তৎক্ষণাৎ অমল সোম
তৎক্ষণাৎ অমল সোম দৌড়তে শুরু করলেন। দারোগাবাবু এবং অর্জুন পিছু নিল। ঢালু পথ বেয়ে দৌড়ে যেতে যেতে অর্জুন দেখল দারোগাবাবুর হাতের মুঠোয় রিভলভার।
লোকটা যেখানে দেখা দিয়েছিল সেখানে পৌঁছে ওরা দেখল মোটা সিমেন্টের পাইপ এঁকেবেঁকে নীচে চলে গেছে। সেই পাইপের একটা জোড় থেকে খানিকটা খুলে বাইরে রাখা আছে। বোঝা গেল লোকটি ওই বিশাল পাইপ থেকেই বেরিয়ে আসছে পাঁচ মিনিট অন্তর।
কাছাকাছি আড়াল বলতে একটা বিরাট পাথরের চাঁই, ওরা দ্রুত পায়ে সেখানে পৌঁছে গেল। অমল সোম জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কিসের পাইপ?”
“ওয়াটার সাপ্লাই দেওয়ার জন্যে পাতা হয়েছিল কিন্তু একজন মামলা করায় এখনও কানেকশন দেওয়া হয়নি।”
“খাওয়ার জলের পাইপ এত বড়?”
“খাওয়ার এবং চাষের। আশপাশের সমস্ত গ্রামে জল সাপ্লাই করার পরিকল্পনা হয়েছিল। এরা দেখছি তার মধ্যেই ঢুকেছে। কী করবেন?”
অমল সোম বললেন, “আর একটু অপেক্ষা করুন। এদের আইডিয়া কিন্তু চমৎকার। পাইপের মধ্যে বসে স্বচ্ছন্দে সুড়ঙ্গ খোঁড়া যায়।”
এবার অর্জুন না বলে পারল না, “কিন্তু ইস্পাতের ভল্টে হাত দিলেই তো চারধারে অ্যালার্ম বাজতে থাকবে।”
“হাত না দিয়েও ইস্পাত কাটা যায়। বিজ্ঞান সেটুকু পারে। চুপ!”
অমল সোমের কথা শেষ হওয়া মাত্রই সেই লোকটি বেরিয়ে এল। মাত্র দশ-পনেরো গজ দূরে দাঁড়িয়ে লোকটা চারপাশে তাকাল। মোটাসোটা লোক যে গাড়ি চুরি করেছিল। এ বোধহয় ওদের পাহারাদার। নিশ্চিন্ত হয়ে লোকটা ঘড়ি দেখল। তারপর পেছন ফিরে যেই ঢুকতে যাবে অমনি অমল সোম উবু হয়ে ছোট নুড়ি কুড়িয়ে একটু ওপাশে ছুঁড়ে দিল। শব্দটা কানে যেতেই লোকটা তড়াক করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওর হাতে এর মধ্যেই একটা চকচকে অস্ত্র উঠে এসেছে। গড়িয়ে পড়া নুড়িটাকে সতর্ক চোখে দেখল সে। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল, তারপর পায়ে পায়ে খোলা আকাশের নীচে যেন জরিপ করতেই বেরিয়ে এল অস্ত্রটা সামনে ধরে। ওকে দেখেই যেন একটা রাতের পাখি ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল আর লোকটি বুঝতে পারার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। তারপর সামান্য এগিয়ে এসে পাথরের চাঁইটার গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করল। এখন ওর ভঙ্গি বেশ নিশ্চিন্ত। অর্জুনরা যেখানে দাঁড়িয়ে তার তিন-চার গজ দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল সে। এমন সময় আর একটি কণ্ঠ পাওয়া গেল। সেই ডাকে সাড়া দিল লোকটা, ভঙ্গিটা এমন যে, দাঁড়াও এক্ষুনি যাচ্ছি। অর্জুন দেখল বেড়ালের মতো পা ফেলে অমল সোম পাথরের গা ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছেন। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল অর্জুনের, কোনো কারণে লোকটা যদি সামান্য মুখ ফেরায় তাহলে অমল সোমকে ঝাঁঝরা করে দেবে। নিজের হৃদপিণ্ডের আওয়াজ কানে আসছিল যেন। অমল সোম যখন প্রায় লোকটার পেছনে পৌঁছে গেছেন তখন সেই রাতের পাখিটা চিৎকার করে ফিরে এল। লোকটা মাথা তুলতেই ঘাড়ে প্রচণ্ড আঘাত পেল। অত বড় মোটা মানুষটাকে কাটা গাছের মতো পড়ে যেতে দেখল অর্জুন। দারোগাবাবু বললেন, “শাবাশ।” তারপর দৌড়ে গিয়ে অমল সোমের সঙ্গে হাত লাগালেন। ওই ভারী শরীরটাকে টেনে পাথরের এপাশে আনা হল। অর্জুন দেখল লোকটার পিস্তল মাটিতে পড়ে আছে। সেই খুঁটিমারি রেঞ্জে সিংজির রিভলভার হাতে পেয়েছিল সে, গুলি ছোঁড়ার সুযোগ হয়নি। তারপরে এই। অমল সোমের গলা পাওয়া গেল, “ওটা আপাতত রেখে দাও হাতে, ভুল করে আবার ট্রিগারে চাপ দিও না।”
অর্জুন দেখল লোকটির ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। অমল্ সোমের পকেটে যে অতটা নাইলনের দড়ি ছিল তা টের পায়নি সে। এইসময় ভেতর থেকে আবার ডাকটা ভেসে আসতেই অমল সোমের ইঙ্গিতে দারোগাবাবু চাপা গলায় সাড়া দিলেন। তারপর ওরা তিনজনেই অস্ত্র উঁচিয়ে পাইপের ভাঙা জোড়টার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেইসময় আর একবার ডাক ভেসে এল। এবার বেশ বিরক্ত গলা। তারপরই পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। কেউ এগিয়ে আসছে।
উবু হয়ে একটা মাথা বাইরে বেরিয়ে আসতেই প্রচণ্ড আঘাত, লোকটা কথা বলার সময় পেল না। দারোগাবাবু ওকে টেনে আনলেন বাইরে। অর্জুন দেখল সেই দু’নম্বর মোটা লোকটা। রিভলভারের আঘাতে মাথা থেকে দরদর করে রক্ত পড়ছে ঘাড় গড়িয়ে। আর ঠিক সেই সময়েই সাঁ করে একটা শব্দ হল এবং দারোগাবাবু চিৎকার করে আছড়ে পড়লেন। তারপরেই দ্বিতীয় শব্দ এবং অমল সোমের হাতের অস্ত্র খসে পড়ল। অর্জুন দেখল অমল সোমের হাত থেকে রক্ত পড়ছে। সেই অবস্থায় তিনি দৌড়ে গিয়ে ফিরে গেলেন পাথরের চাঁইয়ের দিকে, চিৎকার করে উঠলেন, “অর্জুন সরে এসো।”
কিন্তু তখন আরও কয়েকবার শব্দ হয়েছে। ভেতর থেকে কেউ অবিরত গুলি ছুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাইলেন্সার লাগানো থাকায় শব্দ হচ্ছে না। অর্জুন পাইপের ওপরের দিকে ছিল, সেইখানেই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। অমল সোমকে সে দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু দারোগাবাবু মোটা লোকটার পাশে শুয়ে এক হাতে কাঁধ চেপে রক্ত সামলাবার চেষ্টা করতে করতে হঠাৎ ডান হাতটা দিয়ে পকেট থেকে হুইস্ল বের করে সজোরে বাজাতে লাগলেন। ঠিক সেই সময় একজন ছিটকে বেরিয়ে এল বাইরে। এক ঝলকেই অর্জুন দেখে নিল তার সামনে দাবার ছক টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে লম্বা মতন অস্ত্র এবং নিঃসন্দেহে তাতে সাইলেন্সার লাগানো। লোকটা ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে তাকাল। তারপর চিৎকার করে কাউকে ডাকল। অর্জুন মড়ার মতো পড়ে থেকে দেখল দারোগাবাবু আর নড়ছেন না।
এই সময় দূরের জঙ্গল থেকে পুলিশরা দৌড়ে বেরিয়ে আসতেই দাবার ছক তাদের দিকে অস্ত্রটা উঁচিয়ে ধরল। দুটো পুলিশ চিৎকার করে পড়ে গেল মাটিতে, বাকিরা ভয়ে দৌড়ে গেল অন্যদিকে। দাবার ছক এবার দৌড়ে নীচের দিকে যেতেই থমকে দাঁড়াল। তারপর সতর্ক ভঙ্গিতে বাঁ দিকে অস্ত্র ঘোরাতে ঘোরাতে পশুর মতো চিৎকার করে উঠল। অর্জুন বুঝতে পারল লোকটা অমল সোমকে দেখতে পেয়েছে। ইঁদুরকে থাবায় পেয়ে ধূর্ত বেড়ালের উল্লাস দেখা দিল ওর মুখে। উপুড় হয়ে শুয়ে অর্জুন হাত সামনে প্রসারিত করল। ওর আঙুলগুলো খুব কাঁপছিল। কিন্তু ট্রিগারে চাপ দিতেই ও নিজেই বিস্মিত হয়ে গেল। গুলিটা দাবার ছকের অস্ত্রে লেগেছে, ছিটকে পড়েছে সেটা। ঠিক অরণ্যদেব যেভাবে গুলি ছোঁড়েন। প্রচণ্ড বিস্ময়ে দাবার ছক ওর দিকে ফিরে তাকাল। তারপর নিচু হয়ে অস্ত্রটাকে তুলতে গিয়ে সামলে নিল নিজেকে। আর অর্জুন সামনে দাঁড়ানো অপ্রস্তুত লোকটাকে গুলি করতে পারল না। প্রথমবার সে সত্যি মরতে চেয়েছিল কারণ অমল সোম তখন মৃত্যুর দরজায়। কিন্তু লক্ষ্য স্থির না হওয়ায় লোকটার গায়ে গুলি লাগেনি। এখন সরাসরি একটা মানুষকে সে খুন করে কী করে! তা ছাড়া গুলির শব্দ তার কানে অন্য রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। দাবার ছকের দুটো হাত মাথার ওপরে তোলা। কয়েক মুহূর্ত স্থিরচিত্রের মতো দাঁড়িয়ে আচমকা লোকটা ছুটতে শুরু করল। আর তখনি গুলির শব্দ হল। ন, অর্জুন ট্রিগারে চাপ দেয়নি। গুলি এসেছে জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যাওয়া পুলিশদের বন্দুক থেকে। অর্জুন দেখল দাবার ছক আচমকা যেন কিছুটা শূন্যে উঠে গড়িয়ে পড়ে যেতে যেতে আটকে গেল একটা গাছের গুঁড়িতে।
ঠিক তখনি আহত বাঘিনীর মতো বেরিয়ে এলেন মহিলা। তাঁর পোশাক লামাদের মতন, কাঁধে একটা ব্যাগ। বাইরে বেরিয়েই তিনি কিছু একটা ছুঁড়তেই চারধার কেঁপে উঠল। জঙ্গলের দিকটায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হল। তারপরেই মহিলা দৌড়ে নীচে নেমে গেলেন। এই সময় চারদিকে মানুষের সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল। গুলি এবং বিস্ফোরণের শব্দে মন্দিরের লামারা এবং নীচের ক্যানটনমেন্ট জেগে উঠেছে। অমল সোমের চিৎকার শোনা গেল, “কেউ গুলি ছুঁড়বেন না।
অর্জুন এগিয়ে এল সামনে। বোঝা যাচ্ছে মহিলা জিপের দিকে যাচ্ছেন। অমল সোম বললেন, “খামোকা একটা মেয়েকে গুলি করে কী হবে। মন্ত্রী গেছে, গজ ঘোড়া গেছে, বেচারা রাজা একা আর কী করবে।”
দারোগাবাবু এক হাতে কাঁধ চেপে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। এই সময় বেশ কয়েকবার জিপটার ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল কিন্তু গাড়ি স্টার্ট নিল না। হঠাৎ অর্জুনের খেয়াল হল ওখানে বিষ্টুসাহেব রয়েছেন। মহিলার সঙ্গে বিস্ফোরক তো আছেই, রিভলভারও থাকতে পারে! বিষ্টুসাহেবের অবস্থা কী কে জানে!
এই সময় নীচের ক্যান্টনমেন্ট থেকে মিলিটারির গাড়িগুলো সোঁ-সোঁ করে ওপরে উঠে আসছিল। ভোরের আকাশের তলায় লামারা মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে। ওরা দেখল মহিলা পড়ি-কি-মরি করে জিপ ছেড়ে বড় রাস্তা ধরে ছুটছেন যে দিক দিয়ে মিলিটারি-পুলিশ আসছে। অমল সোম বললেন, “বেচারা!” তারপর দারোগাবাবুকে বললেন, “পরে সুযোগ পাব কি না জানি না, চট করে ভেতরটা ঘুরে আসি। আপনি ঠিক আছেন তো?”
দারোগাবাবু বললেন, “মনে হচ্ছে। আপনি?”
“সামান্য উন্ডেড। তারপর অর্জুনকে ইশারা করে পাইপের ভেতর নেমে গেলেন অমল সোম। অন্ধকারে কয়েক পা হাঁটার পর আলো দেখতে পেল ওরা। পাইপের অর্ধেকটা মাটিতে ভরে আছে। আলোটা কাচের বাক্সে, সম্ভবত ব্যাটারিতে জ্বলছে। সেখানে পৌঁছে ওরা দেখল পাইপটা ফাটানো এবং সেখান থেকেই সুড়ঙ্গ শুরু হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে মাটি কেটে এই পাইপে রাখা হয়েছে যাতে বাইরে থেকে কেউ টের না পায়। প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ল ওরা। অর্জুন অবাক হচ্ছিল হাতে আঘাত লাগা সত্ত্বেও অমল সোম এতখানি তৎপর কী করে হলেন। ইঁটের গাঁথুনির মধ্যে দিয়ে গর্ত এবং তারপরেই ইস্পাতের দেওয়াল। সেখানেও ওই রকম একটা আলো জ্বলছিল। ওরা অবাক হয়ে দেখল ইস্পাতের দেওয়ালে দু’ফুট গোলাকার গর্ত হয়ে গিয়েছে এর মধ্যে, আর সামান্য কাজ বাকি ছিল। ভেতরের বড় বড় বাক্সের গায়ে আলো পড়েছে।
বাইরে বেরিয়ে এসে ওরা অবাক হয়ে গেল। মিলিটারি পুলিশে ছেয়ে গেছে জায়গাটা। লামারা নেমে এসেছে। দারোগাবাবু একজন মিলিটারি অফিসারের সঙ্গে কথা বলছিলেন। অমল সোম বেরিয়ে আসতেই দারোগাবাবু ওঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ভদ্রলোকের। তিনি হাত বাড়িয়ে অভিনন্দন জানাতে যেতেই অমল সোম বললেন, “ধন্যবাদ, কিন্তু কৃতিত্ব যদি কারো হয় তাহলে তা এই ছেলেটির। ও না থাকলে আমরা এই দলটাকে ধরতে পারতাম না, আমিও বাঁচতাম না।”
অফিসার সবিস্ময়ে বললেন, “ইজ ইট?”
অর্জুন মুখ নামাল। মিলিটারি পুলিশরা আহতদের তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে। ওরা জোর করে অমল সোমকেও নিয়ে গেল। অন্তত ফার্স্ট এইড দিয়ে তবে ছাড়বে। দারোগাবাবুকে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হবে।
লামারা নেমে গেছে পাইপের ভেতরে নিজের চোখে ব্যাপারটা দেখতে। পুরো এলাকাটা মিলিটারিরা ঘিরে ফেলল দেখতে দেখতে। অফিসার বললেন, “আপনি আমার সঙ্গে চলুন। সমস্ত কথাটা রেকর্ড করতে হবে। শুধু আমি বুঝতে পারছি না, যদি আপনারা আগে থেকেই টের পেয়ে থাকেন এসব হবে, তাহলে আমাদের জানালেন না কেন?”
অর্জুন বলল, “আমরা আগে থেকে জানতাম না।
ওরা কথা বলতে বলতে নেমে আসছিল। রাতের অন্ধকারকে চটপট মুছে ফেলছিল ভোরের আলো। হালকা বাতাস বইছে। শীত গায়ে মেখে। এইসময় উচ্চকণ্ঠে শুনতে পেল ওরা, “অর্জুন, অর্জুন।
অর্জুন অবাক চোখে দেখল একটা বড় গাছের ডালে কোনোরকমে বসে আছেন বিষ্টুসাহেব। অফিসার চটপট তাঁর রিভলভার বের করতে যাচ্ছিলেন। অর্জুন তাঁকে বাধা দিল। “উনি আমাদের লোক। গাইড।
অফিসার অবাক হলেন, “গাইড তো গাছে কেন?”
বিষ্টুসাহেব বললেন, “মেয়েছেলেটা যেভাবে বোমা নিয়ে তেড়ে এল, আমি এছাড়া কোনো পথ দেখলাম না। দয়া করে আমাকে নামিয়ে নিন।”
অর্জুন বলল, “নিজে উঠলেন, নামতে পারছেন না কেন?”
বিষ্টুসাহেব জবাব দিলেন, “ভাই, বুড়ো বয়সে পা ভাঙলে আর জোড়া লাগবে না। তবে কিনা এখানে বসে কত কী দেখলাম!”
“কী দেখলেন?”
অর্জুনের মজা লাগছিল। “এই মেয়েছেলেটাকে কী কায়দায় ধরে ফেললো মিলিটারিরা। আর এত উপরে বাতাসটা কি চমৎকার। চোখের সামনে, বুঝলে, রাতটাকে সরিয়ে দিচ্ছিল দিন। এত নীল আকাশ মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখা যায় না। বৃদ্ধ ঠিকই লিখেছেন। প্রভাতে সোনার ঘণ্টা বাজে ঢং ঢং—শুনিছে কি এ কালিম্পং!”
