চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোল – ৪

॥ চার ॥

অর্জুনের কলকাতায় ভাল করে ঘুরে দেখা হল না বলে একটুও আফসোস হচ্ছিল না। সে ট্যাক্সিতে বসে জিজ্ঞাসা করল, “এখানকার মানুষদের অসুবিধে হয় না?”

“হয়। কিন্তু মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই।” বিষ্টুসাহেবের মুখ গম্ভীর।

সকালে শিয়ালদায় পৌঁছে ওরা কাছাকাছি একটা হোটেলে উঠেছিল। সারাটা দিন সেখানে কাটিয়ে বিকেলে হাওড়ায় গিয়ে ট্রেন ধরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। হোটেলে উঠে পরিষ্কার হয়ে বিষ্টুসাহেবকে টিকিটের ব্যবস্থা করতে বলে অমলদা বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বলে গিয়েছিলেন, দুপুরে খাবেন না, বিকেলের আগেই ফিরে আসবেন। আর তারপর থেকে বিষ্টুসাহেবের মুখ গম্ভীর। কলকাতায় তাঁর অনেক দিন আসা-যাওয়া নেই। বদলে-যাওয়া শহরটার সঙ্গে ঠিক তাল রাখতে পারছেন না। সকালে হোটেলের ম্যানেজারের কাছে শুনেছেন, মাসখানেক আগে না কাটলে কলকাতায় কোনও ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায় না। দিল্লির ট্রেনে তো আরও ভিড়। বিষ্টুসাহেব আশা করেছিলেন অমলদা এই টিকিট কাটার ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন। তা না করে তিনি ‘কাজ আছে’ বলে বেরিয়ে গেলেন হোটেল ছেড়ে। এইটে অর্জুনেরও ভাল লাগেনি। কলকাতায় তো আসার কথাই ছিল না। তা হলে হঠাৎ অমলদার এত জরুরি কাজ পড়ে গেল কী করে?

এগারোটা নাগাদ বিষ্টুসাহেব ওকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কোথায় বিক্রি হয় জেনে নিয়ে হোটেলের বাইরে আসতেই একটা খালি ট্যাক্সি পেয়ে গিয়েছিলেন। গন্তব্যস্থান বলতে বাঙালি ট্যাক্সি-ড্রাইভার বলল, “দুটো টাকা লাগবে।”

বিষ্টুসাহেব অবাক হলেন, “সে কী। এখানে দু’ টাকায় ট্যাক্সি পাওয়া যায়? দ্যাখো হে অর্জুন, কলকাতা এখনও মধ্যবিত্তের স্বর্গ।”

ট্যাক্সি-ড্রাইভার মুচকি হেসে বলল, “দাদু কি শহরে নতুন? মিটারে যা উঠবে, তার ওপর দু’ টাকা এক্সট্রা দিতে হবে। উঠুন।”

ট্যাক্সিতে ওঠার পর অর্জুনের মনে হল, এই যে দু’ টাকা বাড়তি নিচ্ছে লোকটা, তা বেআইনি, এবং বিষ্টুসাহেব যে রাজি হয়ে গেলেন, সেটাও অন্যায়। সেই হাতকাটা ছেলেটা যে অন্যায় করেছে, এটা তারই রকমফের মাত্র। এই সময় ট্যাক্সিটা একটা চৌমাথায় দাঁড়িয়ে গেল। অর্জুন মুখ বাড়িয়ে দেখল তাদের সামনে একটা ট্রাম দাঁড়িয়ে। ওপাশে সার-সার গাড়ি। মুহূর্তেই পিছনেও গাড়ি জমে গেল। দূর থেকে চিৎকার ভেসে এল। ড্রাইভার দরজা খুলে রাস্তায় নেমে বিড়ি ধরাতে বিষ্টুসাহেব ব্যস্ত গলায় বললেন, “কী হল ভাই, আমাদের হাতে সময় নেই। দিল্লির ট্রেন ধরতে হবে যে।

“উপায় নেই।” ফুক করে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে ড্রাইভার জানাল, “মিছিল যাচ্ছে।”

“মিছিল? কিসের মিছিল? মিছিল বলে গাড়ি যাবে না?”

“দাদু, আপনি তো নতুন, এই শহরটার হালচাল দু’ দিনেই জেনে যাবেন। বিষ্টুসাহেব হতাশ হয়ে এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছেন। অর্জুন দেখল, রাস্তাটায় ক্রমশ গাড়ির জট পাকাচ্ছে। ফুটপাথ দিয়ে অজস্র মানুষ হাঁটছে। কলকাতায় মানুষ খুব কষ্ট করে থাকে, প্রথম দেখায় অর্জুনের এই রকম মনে হল।

এখানে শীত মোটেই নেই। গরম জামাকাপড় কিছু না চাপিয়ে বের হয়েছিল সে। বিষ্টুসাহেব কিন্তু কোট ছাড়েননি। এখন ট্যাক্সির বদ্ধ হাওয়ায় রীতিমত গরম লাগছে। চুপচাপ গাড়ির মধ্যে বসে রাস্তা দেখা ছাড়া কোনও উপায় নেই।

গত রাত থেকে অমল সোমের ওপর একটা চাপা অভিমান জন্মেছে অর্জুনের। মধ্যরাতের ঘুমন্ত ট্রেনে অমলদা হাতকাটা ছেলেটির সঙ্গে কী কথা বললেন তা সে জানে না। প্রায় মিনিট পাঁচেক ওঁদের কথা হয়েছিল। অর্জুন নিজের বার্থে শুয়ে দেখেছিল ছেলেটি শেষপর্যন্ত ঘাড় নেড়ে সম্মতির ভঙ্গিতে কিছু বলতেই অমলদা নিঃশব্দে ফিরে এসেছিলেন নীচের বার্থে। তখন হয়তো তাঁর মনে হয়ে থাকতে পারে যে, অর্জুন ঘুমুচ্ছে, কিন্তু আজ সকালে তো একপাশে ডেকে বলতে পারতেন ঘটনাটা। তা ছাড়া একজন ভাল সত্যসন্ধানী ট্রেনে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে থাকবে এটা অমলদা ভাবলেন কী করে? সকালে এমন ভাব করলেন যেন কিছুই হয়নি। কলকাতায় ঢোকার কিছু আগে একটা বেজায়গায় ট্রেনটা থেমেছিল সিগন্যাল না পাওয়ায়, আর সেই সুযোগে ছেলেগুলো নেমে গিয়েছিল। এমনকী, সেই হাতকাটা ছেলেটাও। অথচ সে বলেছিল দলের সঙ্গে নামবে না। দ্বিতীয় ঘটনাটা হল আজ। অমলদা হোটেল থেকে ‘কাজ আছে’ বলে বেরিয়ে গেলেন। কোথায় গেলেন, কেন গেলেন, তা গোপনেও তাকে বলতে পারতেন। অর্জুনের মনে হচ্ছিল সহকারী হিসেবে অমলদা তাকে মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এই মানুষটা কেন যে হঠাৎ-হঠাৎ অন্যরকম হয়ে যান!

প্রায় দেড়-ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে ওরা ডালহৌসিতে পৌঁছল। প্ৰথম শ্রেণীর টিকিট যেখানে বিক্রি হয় সেখানে ভিড় কম। বেশ ঝকঝকে বাড়ি। কাউন্টারগুলোও সুন্দর। বিষ্টুসাহেব বললেন, “চলো, চটপট টিকিটটা কেটে ফেলি।”

দিল্লি-কালকার টিকিট যে কাউন্টারে দেওয়া হয়, তার সামনে জনাচারেক লোক দাঁড়িয়ে। বিষ্টুসাহেব তাদের পেছনে দাঁড়ালে অর্জুন চারপাশ ঘুরে দেখতে লাগল। ভারতবর্ষের সর্বত্র যাওয়ার জন্যে এক-একটা কাউন্টার খোলা আছে। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলে অন্যরকম অনুভূতি হয়। এই সময় দুজন শিষ্যসমেত একজন সন্ন্যাসী এসে দাঁড়ালেন। সন্ন্যাসীর বয়স হয়েছে। পরনে গেরুয়া পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, কাঁধে গেরুয়া ঝোলা, গলায় মোটা-মোটা রুদ্রাক্ষের মালা। শিষ্য দুটি এবার ছুটোছুটি করতে লাগল টিকিটের জন্যে। অর্জুন লক্ষ করল, সন্ন্যাসীর গায়ের রঙ কাঁচা সোনার মতো। মাথায় যে জটা, তা আদৌ নোংরা নয়। আর মুখখানা বেশ হাসি-হাসি। এরকম সন্ন্যাসীকে দেখলে ভয় লাগে না, বরং কথা বলতে ইচ্ছে করে পাশে গিয়ে।

সন্ন্যাসী চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠোঁটের মৃদু হাসিটা স্থির হয়ে আছে। এই সময় বিষ্টুসাহেব হতাশ ভঙ্গিতে ফিরে এলেন, “হয়ে গেল, এখন কী হবে?”

অর্জুন বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”

“টিকিট নেই। বলল ওয়েটিং লিস্টে থাকতে পারি। আটান্ন নম্বর। তার মানে যারা টিকিট পেয়েছে, তাদের ষাটজন না এলে আমাদের জায়গা হতে পারে। ঠিক আছে?” বিষ্টুসাহেব দু’পকেটে হাত ঢুকিয়ে কোটটাকে ডানার

মতো দোলাতে লাগলেন।

“তাহলে আমরা যাব কী করে?”

“আগামী সাতদিনের মধ্যে কোনও টিকিট নেই।”

সেকেন্ড ক্লাসে পাওয়া যাবে না?” অর্জুন উপায় বাতলাল।

“ফার্স্ট ক্লাসই পাওয়া যাচ্ছে না দেখছ, অথচ রায়সাহেব আমাদের পথ চেয়ে বসে আছেন। না গেলেই নয়। শেষপর্যন্ত বেশি খরচ করে প্লেনেই যেতে হবে দেখছি।”

বিষ্টুসাহেবের সরব চিন্তা শুনে অর্জুনের ভাল লাগল। কখনও প্লেনে চাপেনি সে। এই সুযোগে প্লেনে চড়া যদি হয়ে যায়! কিন্তু আজ সকালে বিষ্টুসাহেব বলেছেন যে, যাতায়াতের টিকিটের টাকা তিনি নিজেই দেবেন। রায়সাহেবকে যখন বন্ধু হিসেবে নিয়েছেন তখন তাঁর কাছ থেকে এই বাবদে টাকা নিতে পারবেন না। তাহলে প্লেনের টিকিট কাটতে বিষ্টুসাহেবের খুবই অসুবিধে হবে।

“কোথায় যাবেন স্যার?”

অর্জুন মুখ ফিরিয়ে দেখল একটা সিড়িঙ্গে-মতো লোক তাদের সামনে দাঁড়িয়ে। বিষ্টুসাহেব বললেন, “আর যাওয়া! টিকিটই নেই তো যাব কী করে!”

“কোই পরোয়া নেই। আমি এসে গেছি। কোন ট্রেন বলুন ।”

“দিল্লি-কালকা মেল।” অর্জুন জানাল।

“আজকে হলে পঞ্চাশ টাকা এক্সট্রা, কাল হলে পঁয়তাল্লিশ, পরশু হলে

চল্লিশ। ফিক্সড রেট।” লোকটা গম্ভীর মুখে জানাল।

“এক্সট্রা? এক্সট্রা কেন?” বিষ্টুসাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন।

“আমাদের মজুরি। দিয়ে-থুয়ে বেশি থাকে না।

“তুমি টিকিট ব্ল্যাক করছ? ব্ল্যাকার? গেট আউট। আমি তোমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেব।” হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন বিষ্টুসাহেব।

লোকটা মোটেই ভয় পেল না, “কী যা-তা বলছেন। আমি আপনাদের উপকার করছি, আপনি আমাদের উপকার করবেন।

বিষ্টুসাহেব উত্তেজনায় কাঁপতে-কাঁপতে সম্ভবত পুলিশের খোঁজে চারপাশে তাকাচ্ছিলেন, এমন সময় শিষ্যদুটি ছুটে এল লোকটির কাছে। “দিল্লি-কালকার টিকিট আছে ভাই?”

“আছে। ক’টা?” লোকটি চট করে ওদের দিকে ফিরে দাঁড়াল।

“একটা কালকার টিকিট। আমাদের গুরুদেব যাবেন আজকে।

“ষাট টাকা এক্সট্রা।”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে।” এক শিষ্য পকেটে হাত দিল।”

বিষ্টুসাহেব দ্রুত পা চালিয়ে লোকগুলোর কাছ থেকে সরে এলেন। অর্জুন তাঁকে অনুসরণ করল। “কী করবেন তাহলে?”

“যাই করি, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করব না। ঠিক আছে!” বিষ্টু সাহেব বিরক্ত মুখে কথাটা বলে এপাশ-ওপাশ তাকাতে লাগলেন, যেন একটা উপায় তিনি এই মুহূর্তে বের করবেন। এবং তখনই সন্ন্যাসীর দিকে তাঁর নজর গেল। অর্জুন দেখল সন্ন্যাসী ইশারায় তাদের কাছে ডাকছেন। কিছু বলার আগেই বিষ্টুসাহেব গুটি-গুটি সন্ন্যাসীর সামনে গিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন। সন্ন্যাসীর ঠোঁটে হাসি, সেই ঠোঁট ঈষৎ ফাঁক হল, “উত্তেজনা অতি বদ জিনিস, ওটি পরিহার করো বৎস।”

বিষ্টুসাহেব কেমন মিইয়ে গেলেন সন্ন্যাসীর সামনে গিয়ে। বিড়বিড় করে বললেন, “আমি অন্যায় সহ্য করতে পারি না বাবা।”

“ঠিক ঠিক, তবে তারও তো একটা পথ আছে। তাঁকে ডাকো, দেখবে তিনিই তোমার সব বোঝা বইবেন। যাচ্ছ কোথায়?”

“চণ্ডীগড়। আমার এক বন্ধু খুব বিপদে পড়েছেন, তাকে বাঁচাতে!”

“বিপদ থেকে বাঁচাবার তুমি কে হে? বড় অহঙ্কারী মানুষ তুমি! যিনি পাঠিয়েছেন, তিনিই বাঁচাবেন। বিপদটা কী?”

“আমার ওই বন্ধুর মেয়েকে অ্যাবডাক্ট মানে চুরি করে নিয়ে গিয়েছে কেউ, তাকে খুঁজে বের করতে যাচ্ছি আমরা। ওই যে, ওর নাম অর্জুন। খুব ভাল গোয়েন্দা, বয়স অল্প হলে কী হবে। আর আছে ওর সিনিয়র। তিনি সব সমাধান করতে পারেন। মানে ঈশ্বরের আশীর্বাদ আছে ওর ওপরে তাই।” গর্বিত ভঙ্গিতে বললেন বিষ্টুসাহেব।

অর্জুন দেখল সন্ন্যাসী তার দিকে তাকাচ্ছেন। সে অন্যদিকে মুখ ফেরাতেই অমলদাকে দেখতে পেল। সেইমুহূর্তে অমল সোম ভেতরে ঢুকলেন। সে বলল, “বিষ্টুসাহেব, অমলদা!”

বিষ্টুসাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “সোমবাবু, ও সোমবাবু।” তারপর সেদিকেই ছুটে গেলেন অপেক্ষা না করে।

সন্ন্যাসীকে অর্জুনের ভাল লাগেনি। উত্তেজিত হতে নিষেধ করছেন, অথচ ব্ল্যাকারদের কাছে টিকিট কাটতে পাঠিয়েছেন শিষ্যদের। সে অমলদার কাছে গিয়ে শুনল বিষ্টুসাহেব ওঁকে সমস্যাটার কথা বলছেন। ব্ল্যাকে তিনি টিকিট কাটবেন না, অথচ আজই যাওয়া দরকার। সেকেন্ড ক্লাসের কাউন্টারে একবার খোঁজ নিলে কেমন হয়। যদিও কোনও চান্স নেউ, তবু—”

অমলদা বললেন, “আপনি কাউন্টার থেকে তিনটে টিকিট কেটে ওয়েটিং লিস্টে নাম লিখিয়ে এখানে এসে দাঁড়ান, আমি ঘুরে আসছি।” কথাটা শেষ করেই অমলদা গম্ভীর মুখে কাউন্টারগুলোর সামনে গিয়ে একটা ঘরে ঢুকে গেলেন।

অর্জুন এই মুহূর্তে অমলদাকে বুঝতে পারছিল না। উনি একবারও বলেননি যে, কাজ সেরে রেলওয়ে টিকিট কাউন্টারে এসে ওদের সঙ্গে দেখা করবেন। তা ছাড়া ট্যাক্সিটা যদি রাস্তায় না আটকে যেত, তা হলে তো টিকিট না পেয়ে এতক্ষণে ওদের হোটেলে ফিরে যাওয়ার কথা। একটা অভিমানবোধ জন্ম নিচ্ছিল অর্জুনের মনে। অমলদা এবার কোনও বিষয়েই ওর সঙ্গে আলোচনা তো দূরের কথা, ওকে কিছু জানানোরও প্রয়োজন মনে করছেন না।

তিনটে প্রথম শ্রেণীর টিকিট দিল্লি-কালকায় হয়ে গেল। ভি. আই. পি-দের জন্যে কিছু টিকিট শেষমুহূর্তের জন্যে রাখা থাকে, অমলদার কোনও পরিচিত অফিসার তাতেই ব্যবস্থা করে দিলেন। বিষ্টুসাহেব বেজায় খুশি। বারবার তিনি অমলদাকেই ‘থ্যাঙ্কু য়ু’

‘থ্যাঙ্কু য়ু’ বললেন। টিকিট কেটে ফেরার সময় অমলদা লালবাজারের সামনে নেমে গেলেন। বললেন, কিছু বন্ধুবান্ধব আছেন পুরনো আমলের, তাঁদের সঙ্গে দেখা করবেন। ট্যাক্সি থেকে নেমে বললেন, “অর্জুন, খুব যদি দেরি হয়ে যায়, তাহলে আমি সোজা স্টেশনে চলে যাব। তুমি আমার স্যুটকেসটা হোটেল থেকে নিয়ে যেও।” বিষ্টুসাহেব জবাবে বললেন, “ঠিক আছে।”

অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল লালবাজারের ভেতরে ঢুকতে। কলকাতা পুলিশের প্রধান কার্যালয় সম্পর্কে সে নানান গল্প শুনেছে। ঠিক তার সামনে থেকে না দেখে চলে যেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু ততক্ষণে ট্যাক্সি চলতে শুরু করেছে এবং বিষ্টুসাহেব জিজ্ঞেস করছেন, “সোমবাবু, আই মিন তোমার দাদাটির কী হয়েছে বলো তো? সবসময় আমাদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকছেন।”

অর্জুন মুখ ফেরাল। বিষ্টুসাহেবের কাছে সে নিজের অভিমানের কথা জানাতে চায় না। হেসে বলল, “কাজটাজ আছে বোধহয়। আজ রাত থেকে তো একসঙ্গেই থাকব।”

“তাই ভেবেছ? মোটেই নয়।’

“তার মানে?”

“তিনটে টিকিট। তোমার আমার একই কুপেতে, ওঁরটা অন্য একটায়।”

“সে কী?” অর্জুন অবাক হল। টিকিট আছে বিষ্টুসাহেবের কাছে। ওয়েটিং লিস্টে নাম লিখিয়ে টিকিট কিনে এনে উনি অমলদার হাতে দিয়েছিলেন। অমলদার পরিচিত অফিসার সেগুলো কনফার্মড করে দিয়েছেন। অতএব অর্জুন জানার সুযোগ পায়নি। কিন্তু বিষ্টুসাহেব টিকিট ফেরত নেবার সময় খুঁটিয়ে দেখেছিলেন।

“হয়তো এক ঘরে তিনটে বার্থ পাওয়া যায়নি। কিন্তু উনি এমন ব্যস্ত হয়ে কাজ করছেন যে, সীতার ব্যাপারটা নিয়ে যে একটু আলোচনা করব তার সময় পাচ্ছি না। ঠিক আছে। তুমি কিছু ভেবেছ?” বিষ্টুসাহেব ট্যাক্সির মধ্যেই সরে এলেন।

অর্জুন মাথা নাড়ল। না। তারপর মুখে বলল, “ওখানে গিয়ে রায়সাহেবের মুখে সমস্ত ঘটনাটা না শুনে কিছু ভাবাটা ঠিক হবে কি?”

“ঠিক হবে না, না? আসলে গোয়েন্দাদের খুব মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। উত্তেজিত হওয়া নিষেধ।”

‘গোয়েন্দা বলবেন না, সত্যসন্ধানী বলুন।”

“ওহো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্যসন্ধানী।”

কলকাতার কিছুই দেখা হল না। এক টিকিটের ব্যবস্থা করতেই দিনের অনেকটা সময় গেল। তা ছাড়া রাস্তায় এত ভিড়, কোথাও গেলে ঠিক সময়ে ফেরা যাবে কি না তাতে সংশয় ছিল। সন্ধে হওয়ামাত্র হোটেলের বিল চুকিয়ে বিটুসাহেবের সঙ্গে অর্জুন হাওড়া স্টেশনে চলে এল। অমলদা টেলিফোনে ম্যানেজারকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি সরাসরি স্টেশনে চলে যাবেন। অর্জুনরা যেন তাঁর জন্যে অপেক্ষা না করে।

হাওড়া স্টেশনের সামনে ট্যাক্সির ভিড়, প্রচুর আলো, প্লাটফর্মের বাইরে বিশাল জায়গা দেখে অর্জুন চমৎকৃত হল। তার দেখা বড় স্টেশনের মধ্যে আজ সকালের শিয়ালদা ছিল, হাওড়া স্টেশন শিয়ালদাকেও হার মানাচ্ছে।

ওরা কুলি নেয়নি। অর্জুন দুহাতে নিজের এবং অমলদার ব্যাগ বইছে। দিল্লি-কালকার পাশ দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে বিষ্টুসাহেব প্রথম শ্রেণীর কামরা খুঁজে চলেছেন। বিশাল ট্রেনের মাঝামাঝি একটা প্রথম শ্রেণীর কামরার দরজায় গায়ে সাঁটা লিস্টে নিজেদের নাম দেখে তিনি উজ্জ্বল চোখে বললেন, “ঠিক আছে।”

আর সেই সময় অর্জুনের নজরে পড়ল একটি জানলার ধারে সন্ন্যাসী বসে আছেন। তাঁর চোখ দুটি বন্ধ। ঠোঁটে হাসি। আলো পড়ায় তাঁর মুখের চামড়া প্রচণ্ড ফরসা লাগছে। জানলার নীচে সেই শিষ্য দুটি। মুখ তুলে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে তারা গুরুদেবের কাছে যেন খুব জরুরি কথা নিবেদন করে যাচ্ছে। এর মধ্যে বিষ্টুসাহেব কামরার মধ্যে ঢুকে গেছেন। জিনিসপত্র রেখে দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকলেন, “এসো হে তৃতীয় পাণ্ডব। ফার্স্ট ক্লাস কুপে। তুমি নীচে নেবে, না ওপরে?’

ঠিক তখনই শিষ্য দুটি তাকে দেখতে পেল। দেখামাত্র ওদের চোখ অন্যরকম হয়ে গেল। একজন তক্ষুনি গুরুদেবকে চাপা গলায় কিছু বলল। অর্জুন লক্ষ করল, ওদের মুখে পরিবর্তন এলেও গুরুদেবের কিছুই হল না। তিনি তেমনি প্রসন্ন মুখে চোখ বন্ধ করে হাসতে লাগলেন। মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি নিয়ে অর্জুন কুপেতে চলে এল। লোক দুটোর মুখের চেহারা পাল্টে গেল। কেন? ওরাও কি এই ট্রেনে গুরুদেবের সঙ্গে কালকায় যাচ্ছে? গেলে নীচে দাঁড়িয়ে কথা বলবে কেন? সে জিনিসপত্র গুছিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চণ্ডীগড়ের কথা ভাবতেই ভীষণ নাড়া খেল। নিজেকে ভীষণ নির্বোধ মনে হচ্ছিল তার। জলপাইগুড়ি থেকে বেরুবার সময় বুড়িদির ঠিকানাটাই নিয়ে আসা হয়নি। কত নম্বর সেক্টর যেন? কেমন ভজকট সব নম্বর! এই সময় কানে এল বিষ্টুসাহেবের গলা, “ঠিক আছে!”