জুতোয় রক্তের দাগ – ২

২.

ঘণ্টাখানেক পরে পুলিশের বড়কর্তার সামনে ওরা বসে ছিল। সব শুনে ভদ্রলোক বললেন, “মিসেস গ্রান্ট, ব্যাপারটা দুঃখজনক। দ্বিতীয় গার্ডটি আততায়ীদের দেখতে পায়নি, কারণ সে পেছনের দিকে ছিল। কিন্তু ব্যাপারটার সমাধান মনে হচ্ছে আমরাই করতে পারব। কোনও বড় রহস্য নেই এর পেছনে। তা ছাড়া এই ইয়াংম্যান বিদেশি। এদেশে এসব কাজ করতে লাইসেন্সের দরকার হয়।”

এখনও অর্জুনের ঝটপট ইংরেজি বলতে অস্বস্তি হয়। তবু সে জিজ্ঞেস করল, “ওই লোকগুলোর কি চুরির উদ্দেশ্য ছিল বলে আপনার মনে হয়!”

পুলিশকর্তা কাঁধ নাচালেন। “একটা ডিপার্টমেন্টাল শপে প্রচুর দামি জিনিস থাকে।”

হতাশ হয়ে ওরা বেরিয়ে এল। পুলিশ যদি অনুমতি না দেয়, তা হলে এদেশে অপরাধ-সংক্রান্ত ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া মুশকিল। মিসেস গ্রান্ট জিজ্ঞেস করলেন, “এবার কী করতে চাও?”

অর্জুন শেষ চেষ্টা করল, “আমরা একবার ওই দোকানে যেতে পারি?”

দূরত্বটা অনেকখানি। তবু মিসেস গ্রান্ট রাজি হলেন। হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটল। মেজর বললেন, “মিসেস গ্রান্ট, ছেলেবেলায় শার্লক হোমস্ খুব পড়তাম। কিন্তু কিরীটী রায়ের মতো কাউকে লাগত না।”

“হু ইজ হি?” মিসেস গ্রান্ট জানতে চাইলেন।

“এ ফেমাস ডিটেকটিভ অব ক্যালকাটা।”

অর্জুন হেসে ফেলল, “না। এখন সবচেয়ে ফেমাস ফেলুদা।

“হু ইজ হি?” এবারের প্রশ্ন মেজরের।”

অর্জুন বলল, “আপনাকে পড়তে দেব। শুরু করলে ছাড়তে পারবেন না।”

পেট্রল পাম্পটার সামনে গাড়ি রেখে ওরা দোকানে ঢুকল। একজন প্রহরী নিহত হয়েছে, কিন্তু সেই কারণে দোকান বন্ধ হয়নি। দু’জন পুলিশ দোকানের সামনে মোতায়েন হয়েছে, এইমাত্র। ওরা ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করল। বৃদ্ধ ভদ্রলোক মিসেস গ্রান্টকে চিনতে পারলেন। অর্জুন আগেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, মিসেস গ্রান্ট সেইমতো প্রশ্ন করলেন, “গতকাল আমার এই বন্ধু আপনার দোকান থেকে একটি অভিযানে যাওয়ার মতো জুতো কিনেছেন। কিন্তু আমার এই তরুণ বন্ধুটিরও ইচ্ছে হয়েছে ওইরকম জুতো কিনতে। সেকেণ্ড হ্যাণ্ড সেন্টারে গতকাল একটিমাত্র ছিল। আপনি কি এ-ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন?”

ম্যানেজার বললেন, “অভিযানে যাওয়ার মতো চমৎকার নতুন জুতো আমাদের আছে। তার একটা পছন্দ করলেই তো হয়।”

মিসেস গ্রান্ট বললেন, “আমরা ওই একই ধরনের জুতো চাইছি!”

ম্যানেজার হাসলেন, “সাধারণত এই জুতোগুলো কারও অল্প ব্যবহার করা। যাঁর জুতো ছিল, তাঁর কাছে যদি আরও থাকে তবে তা তো এঁর কোনও কাজে লাগছে না। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, দু’জনের পায়ের মাপ এক নয়।

অর্জুন এবার জিজ্ঞেস করল, “ওই সেকেন্ডহ্যান্ড জুতো কোথায় পান আপনি?”

ম্যানেজার বললেন, “আমাদের সাপ্লাই দেয় এ. কে. জন অ্যান্ড কোম্পানি।”

“ওদের অফিসটা কোথায়?” অর্জুন প্রায় হতাশ হয়ে গিয়েছিল।

“ব্ল্যাকপুলে।”

ওরা তিনজনে যখন গাড়িতে উঠল তখন অর্জুন বলল, “মিসেস গ্রান্ট, এখন রওনা হলে কি আমরা আজই ব্ল্যাকপুলে পৌঁছতে পারি?”

“নিশ্চয়ই। হঠাৎ..ও, ওই সাপ্লায়ারদের দোকানে যেতে চাইছ? কিন্তু এই গার্ডটির খুন হওয়ার সঙ্গে মেজরের কেনা সেকেন্ডহ্যান্ড জুতোর কী সম্পর্ক?”

“আমার ক্রমশ মনে হচ্ছে, ওরা ওই সেকেন্ডহ্যান্ড জুতোর খোঁজেই এসেছিল। গার্ডটি দেখে ফেলায় খুন করতে বাধ্য হয়। কারণ আমরা জুতোজোড়া কেনার পর দুটো লোককে ওটার সন্ধানে দোকানে ঢুকতে দেখেছিলাম,” অর্জুন বলল।”

মিসেস গ্রান্ট মাথা নাড়লেন, “কিন্তু চার্লি বলছে, ওটা ভুতুড়ে জুতো। মেজর হোহো করে হাসলেন এবং সঙ্গে-সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেলেন। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আপনার?”

খুব চাপা গলায় মেজর বললেন, “কেউ আমাদের ফলো করছে। পেছনের ওই গাড়িটাকে লক্ষ করো। কিছুতেই ওভারটেক করছে না।”

অর্জুন মুখ ঘুরিয়ে গাড়িটাকে দেখল। চওড়া হাইওয়েতে অজস্র গাড়ি ছুটছে। মিসেস গ্রান্ট যে ট্র্যাকে চালাচ্ছেন, তাতে গতি বেশি নেওয়ার কথা নয়। পেছনের গাড়িতে যিনি চালকের আসনে, তাঁকে অবশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। মেজর উত্তেজিত হয়ে বললেন, “মিসেস গ্রান্ট, আপনি ট্র্যাকটা চেঞ্জ করুন তো। স্পিড বাড়ান।”

মিসেস গ্রান্ট অনুরোধ রাখলে দেখা গেল গাড়িটা ধীরে-ধীরে পিছিয়ে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত আরও অনেক গাড়ির ভিড়ে সেটা হারিয়ে গেলে মেজর রুমালে কপাল মুছতে মুছতে বললেন, “কী করে গোয়েন্দারা বুঝতে পারে কে অনুসরণকারী, কে নয়, তা কে জানে!”

মিসেস গ্রান্টকে খুব ভাল লেগে গেছে অর্জুনের। এককালে পেশাদার জাদুকরী ছিলেন। এখনও দেখান। তবে ইচ্ছে হলে। বারবার অর্জুনের কাছে পি. সি. সরকারের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। অর্জুনের খুব লজ্জা করছিল। পি. সি. সরকারের ম্যাজিক সে দ্যাখেনি। আসলে জলপাইগুড়িতে তো কেউ সচরাচর বড় অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে না।

মিসেস গ্রান্ট ওদের নিয়ে ব্ল্যাকপুলে যাচ্ছিলেন। ওরা ডিপার্টমেন্টাল শপ থেকে ওঁর বাড়িতে ফেরার পর লাঞ্চ শেষ করে যখন যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছে, তখন অর্জুনের মনে হল, চার্লি যে জুতোটা নিয়ে গেছে, সেটা ফেরত পাওয়া দরকার। চার্লিকে কথাটা বলতেই চার্লি চোখ বড় করল, “নো, নো মিস্টার। জুতোতে ভূত আছে। ওটা আর ফেরত চাইবেন না। আমি বাড়ির বাইরে গারবেজ-ব্যাগে ফেলে দিয়েছি।”

অর্জুন আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির বাইরে এল। গেটের পাশেই পলিথিনের ব্যাগ রয়েছে। সেখানে আবর্জনা জমিয়ে রাখলে প্রতিদিন গাড়ি এসে নিয়ে যায়। আমেরিকাতেও সে এই দৃশ্য দেখেছে। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে সে ব্যাগটার মুখ খুলতেই জুতোজোড়া দেখতে পেল। ভাগ্যিস! ছোঁ মেরে ও-দুটোকে তুলে নিতেই সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে একজন পুলিশ মাটিতে নেমে চিৎকার করল, “হোয়াটস দ্যাট?”

অর্জুন এত ঘাবড়ে গিয়েছিল যে, প্রথমে কথা বলতে পারেনি। পুলিশটি কাছে এসে জুতোটা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী আশ্চর্য! এ দুটো তুমি নিচ্ছ কেন?”

অর্জুন কোনওমতে বলল, “ভুল করে চলে এসেছিল এখানে।”

লোকটা হোহো করে হেসে গাড়িতে বসা সঙ্গীকে বলল, “শুনেছ হে, জুতো একা-একা চলে আসে। থাকো কোথায় তুমি?”

অর্জুন মিসেস গ্রান্টের বাড়িটা দেখাল। পুলিশটা জুতো হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল, “অলমোস্ট নিউ, বাট ইউজড্। হে জন, আই লাইক দিস।”

অর্জুন চটপট বলল, “কিন্তু আপনি জুতোটা নিতে পারেন না। যার জুতো, তিনি অসন্তুষ্ট হবেন। মানে, তাকে জিজ্ঞেস না করে…”

পুলিশটি বলল, “লুক! আমার কাছে মিথ্যে কথা বলার একদম চেষ্টা করবে না। এত ভাল পাহাড়ে ওঠার জুতো কেউ ভুল করে গারবেজ-ব্যাগে পাঠায় না।”

অর্জুন বলল, “ওটা শুধু পাহাড়ে ওঠার জুতো নয়। যে-কোনও অভিযানেই পরা চলে।”

“সেটা আমি বুঝব। কিন্তু আমি যদি বলি এটাকে তুমি চুরি করছ?” অতএব অর্জুন ওকে নিয়ে ভেতরে এল। মিসেস গ্রান্ট সব শুনে কেমন নিস্পৃহ গলায় বললেন, “না না, ওঁর যখন এই লেডিস শ্য পছন্দ হয়েছে, তখন ওকে দিয়ে দেওয়াই উচিত।”

পুলিশটি হকচকিয়ে বলল, “লেডিস শ্যু?”

“ওমা, তা হলে আপনি ভাল করে দ্যাখেননি,” মিসেস গ্রান্ট হাসলেন।

অর্জুন দেখল, অফিসারের চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। বিড়বিড় করে লোকটি বলল, “হোয়াট এ ফুল আই অ্যাম! মেয়েদের জুতো নিতে যাচ্ছি! আমি তো বিয়েই করিনি। সরি! কিন্তু তখন যে দেখলাম…। যাক, মিসেস গ্রান্ট, এই ইয়াংম্যানটিকে দেখছি আপনি চেনেন! বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত।”

অফিসার চলে যাওয়ামাত্র মেজর বললেন, “লোকটা পাগল নাকি হে অর্জুন?”

অর্জুন হাসল, “মিসেস গ্রান্ট, আপনার ম্যাজিক শুধু ও দেখল কী করে?” কথাটার জবাব না দিয়ে তিনি বললেন, “এবার বলো তো, জুতোটার বিশেষত্ব কী?”

অর্জুন তখন গোপন কুঠুরিটা খুলে দেখাল। সেটা দেখামাত্র মিসেস গ্রান্ট উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি এখন হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন আর মেজর এবার পেছনের আসনে শরীর এলিয়ে নাক ডাকাচ্ছেন। মিসেস গ্রান্টের পাশের আসনে বসে অর্জুন মুগ্ধ চোখে দু’পাশে ছুটে যাওয়া ইংল্যান্ডের গ্রাম দেখছিল। এত সবুজ যে, চোখ জুড়িয়ে যায়। হঠাৎ মিসেস গ্রান্ট বললেন, “ব্ল্যাকপুলের সাপ্লায়ার কি তোমাকে জুতোর মালিকের সন্ধান দিতে পারবে?”

অর্জুন বলল, “জানি না। চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী!”

“তোমরা ওখানে কোথায় থাকবে?”

“মেজর জানেন।”

‘আমি আমার এক বান্ধবীর কাছে উঠব। ওর খুব ইচ্ছে আমি কিছুদিন ব্ল্যাকপুলে থাকি। ঘুমোলে তো মেজর বেশ নাক ডাকান। নাক কেন ডাকে অর্জুন?”

অর্জুন বলল, “ঠিক জানি না। তবে নিশ্বাসের স্বাভাবিক পথে যদি কিছু বাধা তৈরি হয়, তা হলে ওই রকম শব্দ হয়ে থাকে।”

মিসেস গ্রান্ট বললেন, “কেউ যদি নাক ডাকা সারানোর ওষুধ বের করত তা হলে কোটি-কোটি পাউন্ডের মালিক হয়ে যেত। আমরা এসে গেছি। বাতাসে সমুদ্রের গন্ধ পাচ্ছ?”

অর্জুন অবাক হল। কাছে-দূরে কোথাও বালিয়াড়ি নেই। সমুদ্র অত কাছে হবে কী করে? দু’পাশে ছোট-ছোট সুন্দর কটেজ, ঝকঝকে রাস্তা, যদিও ফুটপাতে মানুষজন নেই বললেই চলে, এরকম এলাকা পার হতেই অৰ্জুন সমুদ্র দেখতে পেল। কী রকম সমুদ্র! ঢেউ নেই, গর্জন নেই। শুধু আদিগন্ত প্রায়-সবুজ জল স্থির হয়ে আছে।

গাড়িটা বাঁক নিতেই সে মুগ্ধ হল। সুন্দর বাঁধানো সমুদ্রসৈকতে বিশাল রাস্তাটা ঘোড়ার নালের মতো ঘুরে গেছে। রাস্তার একধারে সারি-সারি সুন্দর দোকান। দোকানগুলো অভিনব। রাস্তার মাঝখানে ট্রাম-লাইন, একটি ট্রাম চলে যাচ্ছে ওপাশে। রাস্তার এদিকে সমুদ্রের গায়ে নানান রকমের রেস্টুরেন্ট। রংবেরঙের সাইনবোর্ডে লোভনীয় খাবারের বিজ্ঞাপন।

অর্জুন বলল, “দারুণ জায়গা তো!”

মেজর মাথা নাড়লেন, “পকেটে টাকা থাকলে এখানে সময় কাটানো কোনও সমস্যা নয়।”

“টাকা থাকলে কেন?”

“ওই যে দোকানগুলো দেখছ, ওগুলো সব এক-একটা গ্যামব্লিং হাউস। ক্যাসিনো নয়, কিন্তু ঢুকলে লোভ সামলানো যায় না। আমরা আর-একটু এগিয়ে বাঁ দিকে নামব, মিসেস গ্রান্ট। মেজর তাঁর বিশাল দেহটা নিয়ে সোজা হয়ে বসলেন।

অর্জুন দেখছিল পুরো সমুদ্রের ধারে মেলা বসে গেছে। রংবেরঙের পোশাকে প্রচুর মানুষ এসেছে রোদ পোয়াতে ব্ল্যাকপুলে।

বাঁ দিকের হোটেলটার নাম অ্যাবসন। ওরা গাড়ি থেকে নেমে এলে মিসেস গ্রান্ট বললেন, “তোমরা বিশ্রাম নাও। আমি বান্ধবীর ওখানে পৌঁছে ফোন করব।”

জিনিসপত্র নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওঠার মুখেই ঘটে গেল কাণ্ডটা। একটা বেঁটেমতো সাহেব তরতর করে নামছিল আর মেজর মাথা নিচু করে উঠছিলেন। ধাক্কাটা একটু বেশিরকমের হওয়ায় লোকটা ছিটকে পড়ল একপাশে আর মেজরের হাত থেকে সুটকেসটা গেল উড়ে। সঙ্গে-সঙ্গে তিনি চিৎকার করে উঠলেন। একনাগাড়ে গালাগাল দিতে দিতে তেড়ে গেলেন লোকটার দিকে। অর্জুন দেখল, লোকটা কিছু বলল না। চুপচাপ উঠে বসে জামাকাপড়ের ময়লা দু’হাতে ঝেড়ে নীচে নেমে রাস্তায় মিলিয়ে গেল। অর্জুন খুব অবাক হল। অন্যায় যদি কারও হয়ে থাকে তবে তা মেজরের। অথচ লোকটা একটাও কথা বলল না কেন? মেজরকে দু-একটা কথাও শোনাল না। সে চটপট বলল, “মেজর, আপনার পকেট ঠিক আছে কি না দেখুন তো!”

“অ্যাঁ? পকেট? পকেট তো পকেটেই আছে।” মেজর ঘাবড়ে গেলেন।

“পকেটে ব্যাগ আছে তো?”

মেজরের এবার চেতনা ফিরল। কিন্তু না, তাঁর সব কিছু ঠিকই আছে। লোকটা মোটেই পকেটমার নয়। হলে অবশ্য অর্জুনের খারাপ লাগলেও একটা লাভ হত। বিলিতি পকেটমার দেখা যেত।

হোটেলের রিসেপশনে খবর পাওয়া গেল, মিস্টার মার্শাল আজই বিশেষ জরুরি তাগিদে সমুদ্রের নীচে নেমেছেন। মেজরের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন যে, সন্ধের মধ্যেই এখানে ফিরে এসে মুখোমুখি হবেন।

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “মার্শাল কি এখানেই থাকে?”

রিসেপশনিস্ট বলল, “না। ওঁর নিজস্ব একটা ক্যাম্প আছে শহর থেকে মাইল পনেরো দূরে। আপনারা আসবেন বলে তিনি এখানে তিনটে ঘর বুক করেছেন।”

মেজর অর্জুনের দিকে ঘুরে বললেন, “করাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে ভদ্রতা করছেন। আমি হোটেলে বসে পা নাচাব, আর তিনি ক্যাম্পে বসে মজা লুটবেন!”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ক্যাম্পে বুঝি খুব মজা?”

মেজরের দাড়িগোঁফ ছাপিয়ে তৃপ্তির চিহ্ন ফুটে উঠল, “এই হোটেলজীবনের চেয়ে হাজার গুণ। সেবার আল্পসে ক্যাম্প খাটিয়েছি। বাইরের টেম্পারেচার মাইনাসে। হুহু করে হাওয়া বইছে। হাওয়া তো নয়, বরফের করাত। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢুকে পিটপিট করে মাথার ওপরে টেন্টটার দিকে তাকিয়ে সারারাত ভেবেছি, ওটা যেন উড়ে না যায়। সে যে কী আনন্দ, তা যে না থেকেছে, সে বুঝবে না। আফ্রিকায় টেন্ট করে আছি, একটা সিংহের বাচ্চা হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে আমার বিছানায় ঢুকে পড়ল।” বলতে বলতে সেই দৃশ্যটি কল্পনা করে মেজর হাসিতে ভেঙে পড়লেন। দ্বিতীয়টি অবশ্যই রোমাঞ্চকর, কিন্তু প্রথমটিতে মজা বা আনন্দ কোথায় তা অর্জুনের মাথায় ঢুকল না। ওরা দাঁড়িয়ে ছিল লিফটের সামনে। দু’জনের পকেটে দুটো ঘরের চাবি। মেজরের হাসির মধ্যেই লিফটটা থামল। কয়েকজন মানুষ গম্ভীর মুখে মেজরের দিকে তাকিয়ে লিফট থেকে বেরিয়ে গেলেন। হঠাৎই মেজরকে আরও ভাল লেগে গেল অর্জুনের। বিদেশে এসে তাঁর মধ্যে কোনও আড়ষ্টতা নেই। সব পরিবেশে যে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারে, তার তো তুলনা নেই।

ইতিমধ্যে বড় হোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে অর্জুনের। নিজের ঘরে ঢুকে তার মনে হল, এটি সে-তুলনায় কিছুই নয়। মোটামুটি ছিমছাম ঘরটা দেখে তার ভাল লাগল, কারণ এটা ঠিক রাস্তার ধারে। মেজর নিজের ঘরে চলে গিয়েছেন। অর্জুন জানলা খুলে তাকাল। রাস্তার ওপাশেই সমুদ্র। সেখানে যতটুকু কাঁপন, তা শুধু বয়ে যাওয়া বাতাসের জন্যেই। সমুদ্র এত শান্ত হয়? সে রাস্তাটা দেখল। ভিড় বাড়ছে। ইংল্যান্ডে নিগ্রোদের ক্রীতদাস করে নিয়ে আসা হয়েছিল কি না তা সে জানে না, তবে প্রচুর নিগ্রো চোখে পড়ছে। অবশ্য আমেরিকার মতো মোটেই নয়। এদের দেখলে বোঝাই যায়, ইংল্যান্ডে এরা ভিনদেশি। মিসেস গ্রান্টকে জিজ্ঞেস করলে জানা যায়। ওঁর বাড়িতে চার্লিই রয়েছে। হঠাৎ একটি পঞ্জাবি পরিবারকে দেখতে পেয়ে অর্জুনের বেশ মজা লাগল। সত্যি বলতে কী, এখানে যদি কেউ হিসেব করতে বসে তা হলে অন্তত চল্লিশ ভাগ অ-ইংরেজ দেখতে পাবে।

এই ছোট্ট দেশের মানুষরা দুশো বছর ভারতবর্ষকে শাসন করেছিল! এদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়েছে, বাঘা যতীন প্রাণ হারিয়েছেন, সূর্য সেন নিজেকে বলি দিয়েছেন, নেতাজি আত্মোৎসর্গ করেছেন। মাত্ৰ চল্লিশ বছর আগে একজন সৎ ভারতীয় শাসক ব্রিটিশদের বন্ধু বলে মনে করত না। ছেলেবেলায় সে যখন স্বাধীনতার ইতিহাস পড়ত, তখন মনে হত ব্রিটিশরা থাকলে সে-ও আন্দোলনে যোগ দিত। আজ সেই মানুষদের দেশে দাঁড়িয়ে কিন্তু সেরকম অনুভূতিটা আসছেই না। এদের দেখে মোটেই রাগ হচ্ছে না। হঠাৎ তার মনে হল, দোষটা আমাদেরই। আমরাই বিভক্ত হয়ে ওদের সুযোগ দিয়েছিলাম আমাদের শোষণ করতে। তা ছাড়া চল্লিশ বছর আগের মানুষদের মানসিকতার সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের কোনও সাদৃশ্য থাকবে এমন তো নাও হতে পারে। এই যেমন, ওর নিজেরই রাগটা নেই। দরজায় শব্দ হতে সে বাস্তবে ফিরে এল।

মেজর দাঁড়িয়ে আছেন। এখন ওঁর পরনে পুরোদস্তুর অভিযাত্রীর পোশাক। কোমরে হাত রেখে মেজর বললেন, “সে কী! তুমি এখনও এই অবস্থায় আছ? বের হবে না? আরে, নতুন জায়গায় এলে সেই জায়গাটা উলটেপালটে দেখতে হয়।

“আমি তো রেডি।”

“অ। লেটস গো ফর এ রাউন্ড। মিসেস গ্রান্ট ফোন করেছিলেন। উনি আসতে চেয়েছিলেন। আমি নিষেধ করেছি। বলেছি, এবেলা বিশ্রাম নিন।’ কথা বলতে বলতে মেজর নিজের পায়ের দিকে তাকাচ্ছিলেন। “জুতো দারুণ ফিট করেছে হে। সত্যি ভুতুড়ে নয় তো?”

অর্জুন দেখল, মেজর সেই জুতো পরেছেন। ওর খুব মজা লাগছিল। তারপরেই মাথায় একটা বুদ্ধি এল। দরজা বন্ধ করে নীচে নামতে নামতে সে বলল, “মেজর, গল্পের বইতে পড়েছি ইংল্যান্ডের পাব খুব বিখ্যাত। আমাকে নিয়ে যাবেন?”

“মদ খাবে নাকি হে? কত বয়স হল তোমার?”

“একুশ হয়নি। মদ খাব না, শুধু দেখব।”

“তা হলে সেলর্স পাবে চলো। রিয়েল টাফ পিপলের ভিড় ওখানে। হাঁটতে হাঁটতে ডান পা’টা মাঝে-মাঝে হালকা হয়ে যাচ্ছে কেন হে?” মেজর দাঁড়িয়ে পড়লেন।

অর্জুন বলল, “ওটা আপনার মনের ভুল। প্রথমবার পরছেন তো!” ব্ল্যাকপুলে ঠাণ্ডা আছে চমৎকার। হাওয়া বইছে হুহু করে। যদিও এখন মিঠে রোদের মশারি টাঙানো চারদিকে। পাশাপাশি ওরা ফুটপাত ধরে হাঁটছেন। সামনেই যে বিশাল হলঘর, সেখানে মানুষজন ঢুকছে, বের হচ্ছে। মেজরকে বলতেই তিনি সেদিকে পা বাড়ালেন। ওটা যে গ্যামব্লিং হাউস, তা ভেতরে ঢুকে চিনতে পারল সে। ঢুকতেই বাঁ দিকে কয়েকটা কাউন্টার নজরে এল। সেখানে বোর্ডে ঝুলছে, ‘চেঞ্জ’। অর্থাৎ তুমি তোমার পকেটের নোট খুচরো করে নিতে পারো। এরপর দশ ফুট অন্তর অন্তর বিভিন্ন রকমের খেলা রয়েছে। পয়সা গর্তে ফেলে হাতল ধরে টানলে একটা রঙিন বাক্সের চাকা ঘুরবে বনবন করে। সেই চাকার গায়ে নম্বর আঁটা। চাকাটা আবার তিনটে ভাগে ঘুরছে। ওটা যখন থামবে তখন তার তিনটে ভাগে একই নম্বর এসে পাশাপাশি স্থির হলে দ্বিতীয় গর্ত থেকে পাউন্ড পড়বে। অর্জুন দেখল একটি বাচ্চা ছেলে একের পর এক পয়সা ফেলে হাতল ঘুরিয়েই যাচ্ছে, বেচারার ভাগ্যে আর পাউন্ড ঝরছে না। পরের টেবিলটা আরও মজার। একটা কাচের বিরাট বাক্সের ভেতরে দুটো তাক। ওপরের এবং নীচেরটায় ঠাসা হয়ে আছে পাউন্ডের কয়েন। দুটো তাককে কোনও মেশিন ডান দিক বাঁ দিকে ঘোরাচ্ছে সামান্য। একদম নীচে একটা ট্রে রয়েছে বাক্সের বাইরে আটকানো। খেলোয়াড়কে একদম ওপরের একটা গর্তে পাউন্ডের কয়েন ফেলতে হবে। সেটা গড়িয়ে প্রথম তাকে পড়ামাত্র তার চাপে উপচে পড়া জমে থাকা কয়েনগুলোয় যে আন্দোলন হবে, তাতে বেশ কিছু পড়বে নীচের তাকে। সেই চাপে দ্বিতীয় তাকের উপচে পড়া এবং প্রায় ঝুলে থাকা কয়েনগুলো নাড়া খেয়ে নীচে পড়লেই তা ট্রে’তে জমা হবে। যে খেলছে, সে সেগুলো তুলে নিতে পারে। অর্জুন দেখল, একজন একটা কয়েন ওপরের তাকে ফেলল গর্ত দিয়ে। সেটা ওপরের তাকের কয়েনটাকে নিয়ে নীচের তাকে পড়ল। নীচের তাকে তখন কয়েনের পাহাড়। মনে হচ্ছিল ছোঁয়া লাগলেই তার চুড়োটা হুড়মুড়িয়ে ট্রে’তে চলে আসবে। কিন্তু বাঁ দিক ডান দিকে সমানে ঘুরে চলা তাক দুটোয় এমন কিছু কায়দা আছে যে, ওগুলোই মিশে গেল জমে থাকা কয়েনে। লোকটার ভাগ্যে কিছুই এল না।

অর্জুন খেলাটা দেখতে দেখতে বলল, “কেউ যদি না পায় তো খেলে কেন?”

মেজর মাথা নাড়লেন, “কেউ কেউ নিশ্চয়ই পায়, নইলে এটা চলছে কী করে। ওদের একটা হিসেব আছে। হয়তো একশোজন এক পাউন্ড খেলার পর মেশিনটা একজনকে দশ পাউন্ড ফেলে দেবে। খেলবে নাকি?”

অর্জুন মাথা নাড়ল, “না। জুয়ো খেলা ঠিক নয়।”

মেজর হকচকিয়ে গেলেন, “যাচ্চলে! আরে আমরা তো জুয়াড়ি নই, একদিন মজা করার জন্যে খেলছি। কয়েনটা ধরো। ওই গর্তে মন দিয়ে ফ্যালো।

অর্জুন পাউন্ডটাকে দেখল। টাকার চেয়ে অনেক ভারী এবং দেখতে বেশ সুন্দর। এক পাউন্ড মানে উনিশ টাকার মতো। এটাকে নষ্ট করতে ইচ্ছে করছিল না। তবু মেজরের আগ্রহে সে গর্তে ফেলল। ওপরের তাকে পড়ে ওটা গড়িয়ে এল সামনে। এসে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল অন্য কয়েনের ওপরে। সেই ধাক্কায় ওপরের তিনটে কয়েন নীচের তাকে এসে পড়ল। তাকটা তখন বাঁ দিক থেকে ডান দিকে সরে এসেছে।

আর তখনই একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। ঝমঝম শব্দে চারদিক চমকিত হল। আশপাশের সমস্ত লোক নিজেদের খেলা ছেড়ে এদিকে চলে এলেন। অর্জুন দেখল, ভূমিকম্পে ধসে যাওয়া বাড়ির মতো দ্বিতীয় তাকের কয়েনের চুড়োটা তিনটে কয়েনের আঘাতে নেমে আসছে নীচের ট্রেতে। আর তার শব্দে কানে যেন তালা লাগছে। পড়া শেষ হলে দেখা গেল, কিছু কয়েন পড়তে-পড়তেও আটকে রয়েছে ট্রের প্রান্তে। মেজর মাথা নাড়লেন, “একেই বলে ইনটুইশান। তোমাকে দিয়ে খেলালে পাওয়া যাবেই, মন বলছিল। নাও, তুলে নাও।”

অর্জুন দু’হাতের আঁজলায় পাউন্ডগুলো তুলে নিয়ে মেজরের দিকে এগিয়ে ধরল। আশেপাশের দৃশ্যটি দেখতে-আসা মানুষেরা আজ নানান মন্তব্য করছে ওদের ভাগ্য নিয়ে। মেজর আঁজলা থেকে একটি পাউণ্ড তুলে নিয়ে বললেন, “ওগুলো পকেটে ঢোকাও। তোমার সম্পত্তি।”

“সে কী? না না, আপনি তো খেলতে বললেন,” অর্জুন প্রতিবাদ করল।

“তা হোক। খেলেছ তুমি। মেজর হনহন করে এগিয়ে গেলেন। বাধ্য হয়ে ওগুলোকে পকেটে ঢোকাল অর্জুন। হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছে সামান্য। বাইরে বেরিয়ে এসে সে দেখল, মেজর নিচু হয়ে বসে জুতোর ফিরে বাঁধছেন। “এটা বারেবারে আলগা হয়ে যাবে নাকি হে! চলো, তোমার জেতা পয়সায় পাবে গিয়ে বসি।”

অনেকটা হাঁটার পর ওরা একটা বাড়ির সামনে এল, যার ওপরে লেখা—সেলর্স পাব। অর্জুনের খুব মজা লাগছিল। পাব নিয়ে বেশ কয়েকটা গল্প পড়েছে সে। কবি, সাহিত্যিকরা পাবে বসে জমিয়ে আড্ডা মারেন। মেজরের পেছনে-পেছনে সে ভেতরে ঢুকে দেখল একটা বিশাল কাউন্টারের ওপাশে নানান ধরনের বোতলে মদ সাজানো। কাউন্টারে দু’জন মহিলা কাজ করছেন। কাউন্টারের ওপরে তিনটে মেশিন। তাতে চাপ দিতে মাপমতো মদ গেলাসে পড়ছে। কাউন্টারের এপাশে লম্বা-লম্বা টুলে তিনজন লোক বসে মদ খেতে খেতে গল্প করছে। এপাশের হলঘরে টেবিল-চেয়ার রয়েছে। আর দেওয়াল জুড়ে এবং ছাদে টাঙানো রয়েছে প্রাচীন যুগের জলদস্যুদের ব্যবহৃত নানা অস্ত্র, পোশাক।”

অর্জুনের শরীর গুলিয়ে উঠল মদের গন্ধে। মেজর একটা টুলে বসে বিয়ার চাইলেন। চেয়ে অর্জুনের দিকে তাকাতে সে বলল, “কিছু খাব না।

“কমলালেবুর রস খাও। খাঁটি জিনিস।”

জিনিসটা সত্যি খুব ভাল। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে অর্জুন খুব হতাশ হল। যদিও কেউ মাতলামি করছে না, তবু সেই জমাটি আড্ডার কোনও চেহারাই দেখা যাচ্ছে না। মেজর যেভাবে বিয়ার খাচ্ছেন, তাতে মাতাল না হয়ে যান! হঠাৎ মেজর বললেন, “এইসব দেখে আমার একটা পুরনো গানের কথা মনে পড়েছে। জাহাজ লুঠ করে নেওয়ার পর জলদস্যুদের একজন গানটা গেয়েছিল। গাইব?”

মেজর গান জানেন, তা অর্জুন জানত না। আগ্রহী হয়ে সে বলল, “কেউ যদি আপত্তি করে?”

মেজর উঠে দাঁড়ালেন বিয়ারের গ্লাস হাতে নিয়ে, “লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, আমি যদি একটি জলদস্যুর গান গাই, তা হলে আপনারা আপত্তি করতে পারেন বলে আমার এই তরুণ বন্ধুটি জানাচ্ছে। কথাটা কি সত্যি?”

সঙ্গে-সঙ্গে সমবেত চিৎকার উঠল, “না না। জলদস্যুর গান? ফ্যান্টাস্টিক। শুরু করুন।”

এবার মেজর শরীর দুলিয়ে গাইতে লাগলেন। সে-গানের একটি শব্দও বুঝতে পারছিল না অর্জুন। বাংলা বা ইংরেজির ধারে-কাছে নয়। তবে কি মেজর মাতাল হয়ে গেলেন এর মধ্যে? মাতালদের সামলানো নাকি খুব শক্ত ব্যাপার। সে দু-একবার চাপা গলায় মেজরকে সতর্ক করে দিতে গিয়েও ব্যর্থ হল।

গান শেষ করে ঝুঁকে-ঝুঁকে অভিনন্দন গ্রহণ করে মেজর বললেন, “আর একটা গ্লাস।”

অর্জুন বলল, “না, মেজর, আর নয়।”

মেজর হোহো করে হাসলেন, “অ্যাঁ! ভয় পাচ্ছ? বিয়ারে আমার নেশা হয়ে যাবে? আরে আমি হলাম অভিযাত্রী। তা হলে তোমাকে একটা গল্প বলি শোনো। একবার সাহারার মাঝখানে আমাদের কী দুর্দশা! যেদিকে তাকাই, দুটো করে জিনিস দেখি। দলের সবাই মরীচিকা দেখতে লাগল। আমি পেটপুরে বিয়ার খেলাম। ব্যস। নেশার চোটে সব একটা হয়ে গেল। দৃষ্টি পরিষ্কার। কী করে হল বলো তো? মাতাল হলে যা স্বাভাবিক, তা-ই অস্বাভাবিক লাগে। খালি চোখে যখন ক্ষুধা-তৃষ্ণায়, গরমে মরীচিকা দেখছি, যেটা ধরো স্বাভাবিক অবস্থা, লাল চোখে তার উলটোটা দেখলাম।” হেহে করে হেসে উঠলেন মেজর। এই সময় একটি লোক এগিয়ে এল, “চমৎকার গাইলেন দাদা। এটা কোন্ ভাষার গান?”

মেজর বললেন, “আগেকার দিনের জলদস্যুরা আসত পোর্তুগাল থেকে। ওদের গান।”

লোকটার চোখ, অর্জুন লক্ষ করল, মেজরের জুতোর দিকে, “আপনি অভিযাত্রী?”

“ইয়েস”, মাথা নাড়লেন মেজর।

“পাকিস্তানি?”

“নো। ইন্ডিয়ান-আমেরিকান।”

লোকটা হাসল। তারপর পাব থেকে বেরিয়ে গেল।

একঘণ্টা পরে ওরা যখন বাইরে এল তখন সন্ধে হয়ে গিয়েছে। রাস্তায় আর জনতা নেই। বাইরে আসামাত্র অর্জুন লক্ষ করল, উলটো দিকে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে একটা লোক দাঁড়িয়ে। এই লোকটাই গায়ে পড়ে মেজরের সঙ্গে আলাপ করে গিয়েছিল। মেজর মাতাল হননি, কিন্তু মেজাজ ভাল হয়েছে। হোটেলে ফিরছিল ওরা। মেজর গুনগুন করে গাইছিলেন। অর্জুনের খুব ভাল লাগল। মেজরকে, মদ খাওয়া সত্ত্বেও, আরও ভালবেসে ফেলল সে। হোটেল অ্যাবসনে ঢোকার মুখে সে অবাক হল ঘাড় ঘুরিয়ে। লোকটি তাদের পেছন পেছন ওই অবধি এসে চোখাচোখি হতেই উলটো দিকে চলে গেল।

রিসেপশনে একজন রোগা প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে দেখামাত্র মেজর দু’হাত তুলে চিৎকার করে উঠলেন, “মানুষ যে কত বড় বিশ্বাসঘাতক হয়, তোমাকে না দেখলে আমি জানতাম না।” তারপর দু’হাতে জড়িয়ে ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগলেন এমন প্রবলভাবে যে, মানুষটির অবস্থা সঙ্গিন হল। মান-অভিমানের পালা চুকে যাওয়ার পর মেজর পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইনিই হলেন মেজরের বন্ধু মার্শাল। ব্ল্যাকপুলের সমুদ্রে মুক্তো নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন। মার্শাল বললেন, “মেজর, আমি একটু ঝামেলায় রয়েছি। তোমার সঙ্গে আড্ডা মারব তার উপায় নেই। তুমি আজকে বিশ্রাম নাও, কাল সোজা চলে এসো আমার ক্যাম্পে। ওখানে গিয়ে ব্রেকফাস্ট খেয়ো।”

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “সমস্যাটা কী?”

“এদিকের সমুদ্রে বছর পাঁচেকের মধ্যে কোনও হাঙর আসেনি। কিন্তু দু’দিন হল একটা বিশাল হাঙরকে মাঝে-মাঝেই দেখা যাচ্ছে। আমার ডুবুরিরা এখন জলে নামতেই সাহস পাচ্ছে না। এরকম চললে তো কাজ বন্ধ রাখতে হবে,” মার্শাল বললেন।

মেজর বললেন, “ওটাকে আমার ওপরে ছেড়ে দাও। তুমি জানো, আমি ফ্লোরিডাতে তিনটে হাঙর মেরেছি। এটা কোনও সমস্যাই নয়।”

মার্শাল বললেন, “সমস্যা। কারণ আমি কখনও শুনিনি, হাঙর মাটি ঘেঁষে এগিয়ে আসে। মারার চেষ্টা করেও তাই পারছি না। আর হাঙরটা আসার পর থেকেই প্রচুর মুক্তো চুরি যাচ্ছে। ঝিনুকগুলোকে পাওয়া যাচ্ছে না।”

ঠিক হল মার্শাল কাল সকালে গাড়ি পাঠিয়ে ওদের নিয়ে যাবেন।

ডিনার খাওয়া হবে হোটেলের রেস্টুরেন্টে। তার আগে মেজর একটু ঘুমিয়ে নিতে গেলেন। অর্জুন রিসেপশনের এক কোণায় একটি পত্রিকা নিয়ে বসে ছিল। এখন যদিও সন্ধে, তবু আটটা বেজে গেছে ঘড়িতে। কারণ, সূর্য ডোবে দেরিতে। ঘরের ভেতর বেশ আরাম। কিন্তু অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল সুন্দর শহরটায় ঘুরে বেড়াতে। মেজরের জুতো, মধ্যপথে ডিপার্টমেন্টাল শপের খুন, সব ওর মাথা থেকে সরে গিয়েছিল। শুধু সেই অনুসরণকারী লোকটা ছাড়া অস্বস্তির কিছু ঘটেনি। সে হাঙরের কথা ভাবল। হাঙররা কী ধরনের আচরণ করে, তা তার জানা নেই। শুধু জানে, একটা মাঝারি সাইজের নৌকো ডুবিয়ে দেওয়ার শক্তি ওরা রাখে।

এই সময় দরজা খুলে দুটো লোক ঢুকল। একজনকে একটু আগেই অর্জুন অনুসরণ করতে দেখেছে। সঙ্গের লোকটিকে দেখে অর্জুনের বুকটা হঠাৎ ধড়াস করে উঠল। ওই লোকটিকে সে ডিপার্টমেন্টাল শপে সঙ্গীকে হুকুম করতে দেখেছিল না? অর্জুন নিঃসন্দেহ হল। ওরা এখানে কেন? দূরত্ব তো কম নয়। সে আরও ঢুকে গেল সোফার ভেতরে। পত্রিকার আড়ালে নিজেকে রেখে যতটা সম্ভব কান খাড়া রাখল।

লোক দুটো রিসেপশনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, “নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছি বলে মনে করলে উপকৃত হবে। একটা লম্বাচওড়া লোক, দাড়িওয়ালা, যে নিজেকে অভিযাত্রী বলে দাবি করে, ইন্ডিয়ান, সে কোথা থেকে আসছে?”

রিসেপশনিস্ট খাতা দেখে বলল, “বোল্টন।”

লোক দুটো পরস্পরের সঙ্গে একবার দৃষ্টি-বিনিময় করল। তারপর প্রথমজন গলা নামাল, “কত নম্বর?”

রিসেপশনিস্ট বলল, “লুক, আমরা হোটেলের মধ্যে কোনও ঝামেলা চাই না।”

“জ্ঞান দেওয়া আমরা মোটেই পছন্দ করি না”, বলে লোক দুটো লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। লিফট নামছে না দেখে ওরা এবার সিঁড়ি ভাঙতে লাগল।

অর্জুন লাফিয়ে উঠল। রিসেপশনিস্ট ওর দিকে তাকাতেই সে বলল, মেজরকে ফোনে সাবধান করে দাও। তারপর দৌড়ে গেল সিঁড়ির দিকে। এই সময় লিফটটা নেমে আসতেই সে চটপট ঢুকে পড়ল। শোঁশোঁ করে লিফট উঠছে ওপরে। ওরা সিঁড়ি ভেঙে ওঠার আগেই কি ও পৌঁছতে পারবে? লোক দুটোর মতলব কী? মেজরকে খুন করবে নাকি ওরা? কী দোষে? অর্জুনের মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। লিফট থামতেই সে দৌড়ে বেরিয়ে এল। নীচে সিঁড়িতে কেউ নেই। মেজরের ঘরের দরজা বন্ধ। অর্জুন কিছু স্থির করতে পারছিল না। লোক দুটো কি এর মধ্যে ঢুকে পড়েছে? দরজাটা নড়ে উঠতেই সে আবার লিফটে ঢুকে পড়ল। বোতাম টিপতেই সেটা উঠে গেল ওপরে। অর্জুন লিফটটা ছেড়ে দিয়ে সিঁড়ি ধরে ধীরে-ধীরে নামতে লাগল।

নিজেদের ফ্লোরে আসার মুখে সে দাঁড়াতেই দেখল, লোক দুটো বোতাম টিপে লিফটটা নামিয়েছে। এবার ওটার ভেতরে ঢুকে গেল। ওদের একজনের হাতে মেজরের তোয়ালেতে মোড়া জুতোজোড়া। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ওরা নীচে চলে গেলে অর্জুন ছুটে মেজরের ঘরে ঢুকল। দরজা খোলাই ছিল। মেজর বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। অর্জুনের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। উনি কি মরে গেছেন?

সে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার ডাকার পর মেজরের চোখ খুলল, “আঃ। ক’টা বাজে? মা, মাগো।”

অর্জুন যেন প্রাণ ফিরে পেল, “মেজর, আপনি ঠিক আছেন?”

“বেঠিক থাকব কেন? খিদে পেয়েছে তোমার?”

“আপনি তাড়াতাড়ি উঠুন। এই ঘরে দুটো লোক ঢুকেছিল। তারা আপনার ওই জুতোজোড়া নিয়ে গিয়েছে।” অর্জুন চারপাশে তাকিয়ে নিল।

“জুতো? জুতোচোর?” মেজর লাফিয়ে উঠলেন।

অর্জুন তাঁকে ঘটনাটা বলল। মেজর চটপট তৈরি হয়ে নিলেন। তিনি নীচে নামলেন। রিসেপশনিস্ট লোকটি ওঁকে দেখে খুব ঘাবড়ে গেছে বলে মনে হল। মেজর দুম করে ঘুসি মারলেন কাউন্টারে, “আমি জানতে চাই, এই হোটেলটা চোর বদমাশ গুণ্ডাদের দখলে কি না?”

“নো স্যার। এটা খুব রেসপেক্টেবল হোটেল!”

“ছাই হোটেল। ওই লোকদুটোকে আপনি আমার রুমের নাম্বার বলেছেন কেন?”

লোকটা কোনও রকমে মাথা নাড়ল, “আমি ভেবেছিলাম ওরা আপনার বন্ধু।

“বন্ধু? জুতোচোর আমার বন্ধু? আমি আপনার নামে পুলিশকে বলব। কোথায় ওরা? বলুন, কোথায় গিয়েছে ওরা?” মেজর বীভৎস রাগে চেঁচাচ্ছিলেন।

“আমি জানি না স্যার। ওদের আমি কখনও দেখিনি। এমনভাবে কথা বলছিল, যে ভয় পেয়ে…! স্যার, আপনি আমার সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করুন।”

অর্জুন কোনও রকমের বলতে পারল, “পুলিশকে বলার আগে মিসেস গ্রান্টের সঙ্গে পরামর্শ করলে হত না?”

“মিসেস গ্রান্ট?” মেজর আগের গর্জনটা ধরে রেখেছিলেন, “ও, মিসেস গ্রান্ট। …এই যে শুনুন, ডায়াল করুন।” নাম্বারটা বললেন মেজর। যোগাযোগ হতেই রিসিভার হাতে নিয়ে মেজর ইংল্যান্ডের হোটেলগুলো সম্পর্কে নালিশ করতে লাগলেন। তারপর বললেন, “না না, আপনাকে আসতে হবে না। …ডিনার? না না, ডিনার খাইনি। …আসব? কী দরকার?… আচ্ছা! সিটি ব্যাঙ্ক? তারপর? …ও। বাই।”

রিসিভার রেখে মেজর বললেন, “ওই লোক দুটোকে যদি আবার এই হোটেলে দেখি, তা হলে তোমার কপালে অনেক দুঃখ আছে, চাঁদ।”

একজন লালমুখো ইংরেজকে কথাগুলো যেভাবে শোনালেন মেজর, তাতে ওঁর ওপর আরও শ্রদ্ধা বেড়ে গেল অর্জুনের।

হোটেলের বাইরে অর্জুনকে প্রায় হাত ধরে টেনে নিয়ে এলেন মেজর। তখনও তাঁর রাগ কমেনি। একটা ট্যাক্সিওয়ালাকে অকারণে ধমকে থামালেন তারপর সোজা যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললেন, “আমার ঘরে ঢুকে চুরি করে, কী সাহস বলো তো!”

“আপনি ঘুমোচ্ছিলেন, তাই।”

হোটেলের ওই রিসেপশনিস্টটাকে ছাড়া ঠিক হবে না। ওহো, আমরা যাচ্ছি মিসেস গ্রান্টের বাড়িতে। উনি যেতে বললেন।”

“ওটা তো ওঁর বান্ধবীর বাড়ি। কিন্তু কেন যাচ্ছি?”

‘উনি খেতে বললেন।”

“কেন?”

প্রশ্নটা শুনে এবার থতমত খেয়ে গেলেন মেজর, “উনি বলতেই আমি হ্যাঁ বলে ফেললাম।”

অর্জুন হেসে ফেলল। নির্জন রাস্তায় খুব সামান্য গাড়ি চলছে। সমুদ্রকে ডান দিকে রেখে ওরা এগোচ্ছে। খুব ভাল লাগছিল অর্জুনের। এখন আর কল্পনার কিছু নেই। ওই লোক দুটো জুতো পেয়ে গেছে। চোরা কুঠুরিতে যখন কিছুই পাবে না, তখন নিশ্চয়ই খেপে যাবে ওরা। মনে হচ্ছে সেই কারণেই আবার দেখা হবে। দোকানের হত্যাকাণ্ডের জের ব্ল্যাকপুলে এসে পৌঁছবে। হঠাৎ অর্জুন দেখল, একটা বাগানওয়ালা বাড়ির সামনে দুটো লোক দাঁড়িয়ে। ওদের দেখামাত্র অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটতে লাগল। অর্জুন বাড়িটার নাম পড়ল, ‘সি-ফেস’। পুরনো বাড়ি। কেউ থাকে বলে মনে হচ্ছে না। লোক দুটো অমন করল কেন? সে মুখ ফিরিয়ে দেখল, লোক দুটো উলটো দিকে দাঁড় করানো একটা গাড়িতে উঠে শহরের দিকে চলে গেল।

এই অঞ্চলটা শহরের বাইরে। দূরে-দূরে কিছু সেকেলে বাড়ি। বাড়িটার নাম সি-ফেস। সমুদ্রমুখী। একদম ঠিকঠাক নাম। হঠাৎ সোজা হয়ে বসল অর্জুন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিদ্যুৎ খেলে গেল তার। সে মেজরের একটা হাত উত্তেজনায় আঁকড়ে ধরল। মেজর চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন, বিড়বিড় করে বললেন, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

অর্জুন বলল, “মেজর। আমি পেয়ে গেছি।”

“কী?”

“এস. এফ. মানে সি-ফেস। মানে ওই বাড়িটা, আর বি. পি. মানে ব্ল্যাকপুল। ব্ল্যাকপুলের ‘সি-ফেস’ বাড়ি।” অর্জুনের গলায় উত্তেজিত আনন্দ।

“তুমি কী বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,” মেজর বললেন।

অর্জুন গাড়ির আসনে নিজেকে ছেড়ে দিল, “একটু ভাবতে দিন।”