দেড়দিন – ৬

৬.

ঘুম আসেনি। উত্তেজনা থাকলে রাত জাগার পরেই সকালে ঘুম পালিয়ে যায়। কিন্তু স্নান-খাওয়ার পর কিঞ্চিৎ অবসাদ ছাড়া তেমন কিছু অসুবিধে হচ্ছে না।

জিপে ড্রাইভার ছাড়া কেউ নেই। ওর কাছেই শোনা গেল, রেঞ্জার মিস্টার বিশ্বাস এখন বিশ্রাম করছেন। অথচ এই ড্রাইভারটিকেই গত রাত্রে সে দেখেছিল—এর কি বিশ্রামের কোনও প্রয়োজন নেই? একটু খারাপ লাগল অর্জুনের। সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি জানেন, আমি কোথায় যেতে চাই?”

“জানি স্যার। তবে গ্রাম পর্যন্ত জিপ যাবে না। একটু হাঁটতে হবে আপনাকে।”

অর্জুন মাথা নাড়ল। ক্রমশ জঙ্গলের গভীরতম অংশ পেরিয়ে জিপ চলে এল ফাঁকা জায়গায়। জঙ্গল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই গ্রাম শুরু হয়নি। গাড়ি গেল একটা ঝোরা পর্যন্ত। এখানে কোনও সাঁকো নেই। প্যান্টের নীচটা গুটিয়ে জল পার হল অর্জুন। পায়ে-হাঁটা পথ, এবড়ো-খেবড়ো। জঙ্গুলে। জিপের পক্ষেও আসা সম্ভব ছিল না। মিনিট-পাঁচেক যাওয়ার পর গোরুর গলার ঘণ্টা আর মুরগির ডাক শোনা গেল। শেষ পর্যন্ত গ্রামটাকে দেখতে পেল সে। খড়ের চাল, মাটির দাওয়া, কিছু কৃষিজীবী মানুষের বাস বোঝা গেল। গ্রামের মুখটাতেই একটা লোক সাইকেল নিয়ে খাঁকি হাফ-প্যান্ট আর শার্ট পরে দাঁড়িয়ে। তাকে ঘিরে কিছু খালি গায়ের গ্রামের মানুষ। ওকে দেখতে পেয়ে লোকটা কপালে হাত ঠেকিয়ে সেলাম করল, “নমস্তে সাব। বড়া-সাব আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন আপনাকে সাহায্য করতে। আমি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে কাজ করি। চার নম্বর বিটে আছি।”

অর্জুন তাকে নমস্কার করল, “এখানকার মানুষ জানে মৃত্যু ব্যাপারটা?”

“হ্যাঁ সাব। কালই খবর পেয়েছে। কিন্তু কেউ যায়নি।’

“যায়নি কেন?”

গেলে তো মুশকিল। ডেডবডি আলিপুরদুয়ারের হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে পোস্টমর্টেম করতে। সেখান থেকে আবার গ্রামে ফিরিয়ে আনতে হবে। বেশ মোটা খরচ। এদের সেই সামর্থ্য নেই। না গেলে পুলিশই নিজে থেকে সে সব করিয়ে পুড়িয়ে দেবে।”

খারাপ লাগল, কিন্তু খুব একটা অবাক হল না অর্জুন। ইতিমধ্যেই সে বুঝে গেছে, পেট ভরে খাওয়ার সামর্থ্যই এদের নেই। সে জিজ্ঞেস করল, “লোকটির ছেলে-মেয়ে বা স্ত্রী নেই?”

“আছে। আমি ওদের আপনার কথা বলে আটকে রেখেছি। আসুন সাব।”

“আটকে রেখেছেন মানে? কোথায় যাচ্ছিল ওরা?”

“পেটের ধান্দায়। এক দিন বাড়িতে বসে-থাকা মানে পেটে দানাপানি না-দেওয়া।”

অর্জুন লোকটিকে অনুসরণ করল। তাদের পেছন-পেছন গ্রামের লোকজন চলল। একটা জীর্ণ কুটিরের সামনে গিয়ে সে চার-পাঁচটা শীর্ণ বাচ্চা আর তাদের মাকে দেখতে পেল। মহিলাটির শরীরে শতচ্ছিন্ন শাড়ি এবং তারই আঁচল দিয়ে তিনি চোখ মোছার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বাচ্চাগুলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

পেছনে ভিড়টা আরও বেড়েছে। এই অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদ কতটা ফলপ্রসু হবে, তাতে সন্দেহ আছে। তবু সে জিজ্ঞেস করল, “যিনি মারা গিয়েছেন, তিনি আপনার স্বামী?”

মহিলা উত্তর দিলেন না। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকটি কথাগুলো আদিবাসী ভাষায় উচ্চারণ করল। বাংলা ভাষার সঙ্গে কয়েকটা ক্রিয়াপদের তফাত ছাড়া তেমন পার্থক্য নেই।

এবার মহিলা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।

“ওঁর সঙ্গে কারও ঝগড়াঝাঁটি ছিল?”

মহিলা মাথা নাড়লেন, না।

ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকটি বলল, “সাব, ওর পক্ষে এখন কথা বলা সম্ভব নয়। এত লোক দেখে লজ্জাও পাচ্ছে। ওর ভাসুরের সঙ্গে কথা বলুন। সে খুব ভাল মানুষ। বলে সামনে দাঁড়ানো এক প্রৌঢ়কে দেখিয়ে দিল। লোকটির পরনে খাটো ধুতি, খালি গা, হাঁটু পর্যন্ত জমাট ধুলো। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকটি তাকে কাছে ডেকে বাকিদের চিৎকার-চেঁচামেচি করে দূরে সরিয়ে দিল। প্রৌঢ় নমস্কার করে কাছে এসে দাঁড়াল। অর্জুন তাকে জিজ্ঞেস করল, “এ রকম হবে তুমি জানতে?”

প্রৌঢ় দুই হাত জড়ো করে দাঁড়াল, “আমি ভয় পেতাম।’

“তোমার ভাই কী করত?”

“আগে চাষ করত। কিন্তু তাতে ওর পেট, মন কিছুই ভরত না। শেষে তামাক নিয়ে হাটে-হাটে ঘুরে বিক্রি করত। এতে কাঁচা পয়সা আসত ঘরে। তাই দিয়ে ধার শোধ করত। আমি বলতাম, ভগবান যা দিচ্ছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাক। বেশি লোভ করিস না। কিন্তু আমার কথা কানে তুলল না।”

“ওর অবস্থা কেমন ছিল?”

“আগে খুব খারাপ। এখন একটু ভাল হচ্ছিল।”

“তোমরা ক’ পুরুষ ধরে এখানে আছ?”

“অনেক-অনেক দিন।”

“এত অভাব যখন ঘরে, তখন সোনার গহনাটা কী করে থেকে গেল?” প্রৌঢ় মুখ নামাল, “ঘরে কোনও সোনা দূরে থাক, রুপোও ছিল না। আপনি নিজের চোখেই আমাদের চেহারা তো দেখছেন।”

“তুমি জানো, ও সোনা বিক্রি করতে গিয়েছিল?”

প্রৌঢ় উত্তর দিল না। কিন্তু চোরা-চোখে দূরে দাঁড়ানো গ্রামবাসীদের দিকে তাকাল। অর্জুন বলল, “তুমি এড়িয়ে যেও না। আমি তোমাদের সাহায্য করতে এসেছি।”

প্রৌঢ় এবার গলা নামাল, “আমি তো ওই ব্যাপারেই সাবধান করেছিলাম। বেশি লোভ করিস না। কথাটা কানে নিলে এভাবে মরতে হত না।”

“সোনাটা ও পেয়েছিল কোথায়?”

“তা আমি জানি না। বলেনি আমাকে। কোনও এক হাটে কার সঙ্গে নাকি আলাপ হয়েছিল। সে বলেছিল এক ভরি সোনা যদি বিক্রি করে দেয়, তা হলে একশো টাকা পাবে।”

“কত টাকায় বিক্রি করতে বলেছিল?”

“তা আমাকে বলেনি ও।’

“সোনাটা তুমি দেখেছ?”

মাথা নাড়ল প্রৌঢ়, “একটা গোল আংটির মতো, কিন্তু ঠিক আংটি নয়।

“এই গ্রামের আর কেউ সোনা বিক্রির ব্যবসায় নেমেছে?”

লোকটা চোরা-চোখে তাকাল। তারপর মাথা নাড়ল, “জানি না আমি।”

“তোমার কাউকে সন্দেহ হয়, যে ওকে খুন করতে যাবে?”

“না।”

অর্থাৎ, আর কোনও নতুন তথ্য পাওয়া যাবে না। প্রৌঢ় ভয় পাচ্ছে। অর্জুনের দৃঢ় বিশ্বাস যে, এ-গ্রামে আরও লোক আছে যাদের সোনা বিক্রির ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়েছে। সে মনে মনে হতাশ হল। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকটি অবাক হয়ে শুনছিল এ সব কথা। শেষ হওয়ামাত্র বলল, “হায় বাপ। সোনা বিক্রি করার ক্ষমতা হয় এদের! হাঁ সাব, ধংমালি গ্রামের একটা লোক সোনার আংটি বিক্রি করতে গিয়েছিল মাদারিহাটে। লোকটার তিন কুলে কেউ সোনা দেখেনি। সবাই ভেবেছিল, চোরাই সোনা। আসার পথে কারা যেন মারধোর করে সোনা কেড়ে নিয়েছে।’

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ধংমালি গ্রাম এখান থেকে কত দূরে?”

“সাইকেলে এক ঘণ্টা লাগবে।”

“জিপ যায়?”

“হাঁ সাব।”

“আমাকে নিয়ে যাবেন?”

লোকটা মাথা নেড়ে এগিয়ে চলল। প্রায় বোবা হয়েই গ্রামের লোকগুলো তাদের যেতে দিল। ঝোরা পেরিয়ে জিপে উঠল অর্জুন। আর লোকটা তাদের সামনে সাইকেল চালাতে লাগল। ধংমালি গ্রামে যখন পৌঁছাল তারা, তখন সূর্যদেব মধ্যগগনে। জিপ ছেড়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর গ্রামের মুখটায় পৌঁছে অর্জুন বলল, “আমি ভেতরে যাব না, আপনি ওকে ডেকে আনুন।”

মিনিট-পনেরো বাদে একটি উদ্ভ্রান্ত মানুষকে নিয়ে ফিরে এল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মচারীটি। এনে আলাপ করিয়ে দিল।

অর্জুন তাকে বলল, “শুনলাম, আপনি সোনা বিক্রি করতে চান। আমি কিনব।”

লোকটা মাথা নাড়ল, “সোনা তো আর নাই।”

“বিক্রি করে দিয়েছেন?”

“না, যাদের সোনা তারা নিয়া নিল।”

“কেন?”

“আমারে মাদারিহাটে সবাই চোর ভাবছে, আমি বিক্রি কইরতে পারি নাই, তাই।”

“কার সোনা?”

“সে-কথা বলতে নারব বাবু। বললে আমাকে মেরে ফেলবে। কী পাপে যে রাজি হইছিলাম, এখন রাইতে ঘুম নাই, দিনে কাম কইরতে পারি না।

“কাল যার মৃতদেহ জঙ্গলে পাওয়া গিয়েছে, তাকে চেনো?”

“চিনি বাবু। আমার স্যাঙাত ছিল। ওই তো আমারে নিয়া যায় সেখানে।”

“কোন খানে?”

“জঙ্গলের ভেতর। আর কিছু প্রশ্ন না করেন বাবু।”

“দ্যাখো, লোকগুলো অত্যন্ত অন্যায় কাজ করছে। তুমি যদি সাহায্য করো, তা হলে ওই বদমাশ লোকগুলো শাস্তি পেতে পারে।”

“তার আগে আমারে মাইরা ফেলবে বাবু। হাতে-পায়ে ধইরা একবার বাইচ্যা আইছি। আমি যাই এখন।”

“ওদের মধ্যে কারও মোটরবাইক ছিল?”

“হ।” ঘাড়-নাড়ল লোকটা। তারপরেই খেয়াল হতে দ্রুত গ্রামের দিকে পা চালাল। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকটার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অর্জুন জিপে উঠে বসল। রহস্য এবং তার সন্ধানের পথে অনেকটা এগিয়ে যাচ্ছে সে, এমন মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে নিজেকে সতর্ক করল সে, এ সব নিয়ে তার মাথা ঘামানোর কথা নয়। সে যে দায়িত্ব নিয়ে এসেছে, তাতে তার এখন বাংলোয় থাকা উচিত।

জিপটা যখন গ্রামের রাস্তা ছাড়িয়ে জঙ্গলে ঢুকল, তখন অন্য-একটা চিন্তা তার মাথায় এল। সে যে এই দুটো গ্রামে এসেছে, খবরটা যাদের দরকার তারা পেয়ে যাবেই। সেটা পাওয়ার পর কী ঘটতে পারে। এই সময় দূরে একটা মোটরবাইকের আওয়াজ হল। আর আওয়াজটা এ দিকেই এগিয়ে আসছে। অর্জুন চটপট জিপের ড্রাইভারকে থামতে বলল। লোকটা ব্রেক কষতে সে লাফিয়ে নেমে পড়ল, “আপনি আধ কিলোমিটার এগিয়ে গিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন। কেউ যদি কিছু জিজ্ঞেস করে, তা হলে বলবেন একাই যাচ্ছেন।”

ড্রাইভার বলল, “এগিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। আমি এখানেই বনেটটা খুলে ইঞ্জিন দেখি। কেমন একটা সাউন্ড হচ্ছে।”

অর্জুন দৌড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। বড় ঘাস আর শাল-সেগুনের গাছে জায়গাটা ছায়ায় মাখামাখি। একটা বড় গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে দেখল, ড্রাইভার বনেট খুলে ঝুঁকে ইঞ্জিন দেখছে। মোটরবাইকের আওয়াজ বাড়ছিল। অর্জুন রাস্তার খানিকটা দেখতে পাচ্ছিল। ওখান থেকে বাঁক নিয়েছে ডান দিকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধুলো উড়িয়ে মোটরবাইকটা চলে এল। যে চালাচ্ছে তার মাথায় হেলমেট, পেছনে আর-একজন বসে রয়েছে। জিপের কাছে এসে বাইকের গতি কমে এল। জিপটাকে ছাড়িয়ে আরও কিছুটা গিয়ে সেটা দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বাঁক নিয়ে ঘুরে চলে এল জিপের গায়ে। শব্দ পেয়েই যেন জিপের ড্রাইভার মুখ তুলল। পেছনে যে বসে ছিল সে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ওস্তাদ? কোনও গোলমাল?”

ড্রাইভার বলল, “খুব গরম হয়ে গিয়েছিল।”

“তা তো হবেই।” লোকটা হ্যা-হ্যা করে হাসল, “চার পাশের হাওয়াই গরম।”

হেলমেটধারী হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, “যাকে নিয়ে গিয়েছিলে, সে কোথায়?”

“কাকে?”

“একটা বাঙালি ছোকরাকে। ন্যাকামি কোরো না। ড্রাইভার যেন মুশকিলে পড়ে গেল, “তিনি তো অনেক আগেই নেমে গিয়েছেন।”

“কোথায়?”

“ওই গ্রামের কাছেই।”

“বেইমানি করো না।’

“বেইমানির প্রশ্ন ওঠে না। আমি তোমার নুন খাইনি।”

“তার মানে তুমি মিথ্যে বলছ?”

“সেটা তুমি যা ভাবলে ভাল লাগে তাই ভাবতে পারো।”

“এভাবে কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না। ঠিক আছে।” হেলমেটধারী পেছনের লোকটাকে কিছু বলতেই সে নেমে দাঁড়াল। মোটরবাইক চলে গেল গ্রামের দিকে। এবার লোকটি এগিয়ে এল জিপের কাছে, “আমাকে একটু ফরেস্ট বাংলোয় পৌঁছে দাও।”

“আরে এটা গবমেন্টের গাড়ি, পাবলিকের ওঠা নিষেধ।”

“ছোড়ো ওস্তাদ। যে ছোকরাকে নিয়ে এসেছিলে, সেটাও পাবলিক।”

“কে বলেছে তোমাকে?”

“মালবাজার থেকে পেছন নিয়েছে। বস গোলমাল করতে চায় না বলে এখনও বেঁচে আছে। ইঞ্জিন ঠাণ্ডা হল?”

মোটরবাইকের আওয়াজ মিলিয়ে গিয়েছে। জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় অর্জুন চটপট মতলব ঠিক করে ফেলল। লোকটা দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে পেছন ফিরে। কিন্তু ওর কাছে পৌঁছতে যে সময় লাগবে তাতেই ও দেখে ফেলবে তাকে। নীচ থেকে একটা বড় পাথর কুড়িয়ে ডান দিকের জঙ্গলে ছুঁড়ল সে। হুড়মুড় শব্দ করে গাছপালায় আলোড়ন তুলে সেটা যখন নীচে পড়ল তখন ড্রাইভার আর লোকটা চমকে সে দিকে ফিরে তাকিয়েছে। লোকটা চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”

ড্রাইভার বলল, “হাতি নাকি?”

“না, না। হাতি দূর থেকেই বুঝিয়ে দেয়।”

“গিয়ে দ্যাখো না।”

লোকটা সাহস দেখাল। সাবধানী পা ফেলে এগিয়ে গেল বিপরীত দিকে মুখ করে। আর তৎক্ষণাৎ গাছের আড়াল ছেড়ে অর্জুন চলে এল জিপের গায়ে। এসে নিজেকে লুকিয়ে রাখল। লোকটার গলা শোনা গেল, “দুর, কি নেই। কিন্তু কিছু একটা পড়েছে। তোমার ইঞ্জিন যা ঠাণ্ডা হয়েছে, তাতেই চলতে হবে ওস্তাদ!” লোকটা ফিরে আসছিল।

অর্জুন অপেক্ষা করছিল। লোকটা ড্রাইভারের সামনে এসে দাঁড়াতেই সে পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আচমকা আক্রমণে লোকটা এমন নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল যে, কথা বলার সুযোগ পেল না। তাকে মাটিতে উপুড় করে ফেলে যখন অর্জুন পিঠের ওপর উঠে বসেছে, তখন লোকটার একটা হাত কোমরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেটাকে মুচড়ে ধরতেই আর্তনাদ করে উঠল সে। কোমর থেকে একটা ধারালো ক্ষুর উদ্ধার করল অর্জুন। বাঁ পকেটে একটা লম্বা মুখবন্ধ টিউব। ড্রাইভারকে সে বলল, “একটা দড়ি আছে?”

ড্রাইভার দেরি করল না। ভাল করে হাত-পা বেঁধে ওকে জিপে তোলা হল। জিপ চালু করতে অর্জুন টিউবটা সন্তর্পণে খুলল। কিছু দিন আগে পর্যন্ত যে রকম সিরিঞ্জে টিকা দেওয়া হত, তারই একটা। ভেতরে তরল পদার্থ আছে। হাত-পা বাঁধা লোকটা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সিরিঞ্জটাকে দেখছিল। অর্জুন চোখের সামনে থেকে সেটাকে নামিয়ে লোকটার হাতের দিকে নিয়ে যেতেই পরিত্রাহি চিৎকার করে উঠল সে, “না, না, আমাকে মেরে ফেলবেন না, পায়ে পড়ি আপনার, না!” তার চোখ দুটো ভয়ে ঠিকরে বেরিয়ে পড়ছে যেন।

“এটা দিয়েই খুনটা করেছ?”

“আমি করিনি। বিশ্বাস করুন, সত্যি বলছি।”

“কে করেছে?”

“আমি জানি না।” ঘন-ঘন মাথা নাড়ল লোকটা।”

“তোমাকে বলদেব জিপের কাছে থেকে যেতে বলল কেন?”

লোকটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। অর্জুন সিরিঞ্জটা নাড়ল, “আমি পুলিশ নই। খুন করতে আমার কিন্তু অসুবিধে হয় না।”

“ও সন্দেহ করেছিল এই ড্রাইভার মিথ্যে বলছে।”

“তোমাদের বস কে?”

“আমি জানি না।”

“আমি বেশি কথা বলা পছন্দ করি না।”

লোকটা কুঁকড়ে যাচ্ছিল। অর্জুন হাসল, “সোনাগুলো কোত্থেকে আসছে?”

“ইয়ে, নেপাল থেকে।”

“খাঁটি সোনা?”

“আমি জানি না।

“এই সব গরিব লোকগুলোকে কেন ব্যবহার করছ? চোরাই সোনার তো অনেক চ্যানেল আছে বিক্রি করার। এদের জড়াচ্ছ কেন?”

“বস টাকা চায়। চটপট।”

“বস কে?”

“আমি জানি না।”

গাড়ি তখন কালভার্টের ওপর উঠে এসেছে। অর্জুন ড্রাইভারকে জিপ থামাতে বলল। সেটা থামতেই সে নীচে নেমে দাঁড়াল, “এই জায়গাটা খুব ভাল। তোমাকে মেরে কালভার্টের নীচে শুইয়ে রাখলে কেউ টের পাবে না।”

“আমি ওকে মারিনি স্যার।” কঁকিয়ে উঠল লোকটা।

“কে মেরেছে?”

“বলদেব।” আচমকা বলে ফেলে চুপ করে গেল লোকটা।

“অবশ্য যে মরে গিয়েছে, তার জন্যে ভেবে কী হবে। হনুমানটা কার?”

“আমার।”

“কোথায় পেয়েছ?”

“কাশী থেকে এনেছিলাম। ইঞ্জেকশন দিয়ে বড় করেছি।”

“বাঃ, তুমি দেখছি অনেক কিছু জানো। তোমাদের বস কে?”

“আমি জানি না।”

অর্জুন ড্রাইভারকে বলল হাত লাগাতে। লোকটাকে ধরাধরি করে কালভার্টের নীচে নিয়ে যাওয়া হল। একে এখনই পুলিশের হাতে তুলে দিলে, কিছুতেই মুখ খুলবে না এটা সে বুঝতে পেরেছিল। হয়তো পুলিশের হেফাজতে থাকলেও ওকে খুন করে ফেলা হবে। তা ছাড়া, জিপের ড্রাইভারেরও একাই ফরেস্ট অফিসে ফিরে যাওয়া উচিত। বলদেব ফিরে এসে খবর পেয়ে যাবেই, যা এখনই ওকে জানানো উচিত নয়। সে ড্রাইভারকে বলল, “আপনি জিপ নিয়ে অফিসে ফিরে যান। মিস্টার বিশ্বাসকে সমস্ত ঘটনা বলবেন। তিনি যেন এখনই মিস্টার আহমেদকে নিয়ে বাংলো ঘেরাও করে রাখেন। আমি না ফেরা পর্যন্ত কেউ যেন বাংলোর বাইরে যেতে না পারে।”

“আপনি যাবেন না?”

“আমি হেঁটে যাব। এখানে যেন কেউ না আসে।”

ঘাড় নেড়ে ড্রাইভার জিপ নিয়ে চলে গেলে, অর্জুন কালভার্টের নীচে নেমে এল। সে দেখল, লোকটা গড়াতে গড়াতে জলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তাকে দেখতে পেয়ে থেমে গেল লোকটা। অর্জুন হাসল, “পালাবার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই। স্পষ্ট কথা বলছি। তুমি যদি আমার সঙ্গে সহযোগিতা করো, তা হলে প্রাণে মারব না। নইলে তোমার লাশ এখানে পড়ে থাকবে।”

লোকটা পিটপিট করে তাকাল।

অর্জুন আবার জানতে চাইল, “তোমাদের বস কে?”

“আমি জানি না।”

অর্জুন সিরিঞ্জটা নিয়ে ঝুঁকে পড়ল, “আমি আর একবার প্রশ্ন করব।”

‘মেমসাহেব।” ফ্যাঁস ফ্যাঁস শব্দ করল লোকটা।

“মেমসাহেব? কোন মেমসাহেব?”

“আমি একবার দেখেছি। বলদেব সব জানে।” এই সময় একটা খসখস আওয়াজ পেছনে হতেই অর্জুন তড়াক করে ঘুরে দাঁড়াল। ঠিক হাত-পাঁচেক দূরেই দাঁড়িয়ে আছে হনুমানটা। এত বিশাল হনুমান সে কখনও দেখেনি। না, গোরিলার আকৃতি নিশ্চয়ই নয়, তবে অনায়াসে একটি মানুষকে ঘায়েল করতে পারে। হনুমানটা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে হাত-পা বাঁধা লোকটার দিকে। যদি ও আক্রমণ করে, তা হলে এই সিরিঞ্জটা ছাড়া কোনও অস্ত্র অর্জুনকে সাহায্য করবে না। কিন্তু ওর শরীরে যা লোম, সিরিঞ্জ ঢোকাবার আগেই যা ক্ষতি হবার তা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আক্রান্ত হবার আগেই আক্রমণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। সিরিঞ্জটাকে উঁচিয়ে ধরে অর্জুন আক্রমণ করার ভঙ্গিতে এগোলে হনুমানটা এক লাফে খানিকটা সরে গেল। আর সঙ্গে-সঙ্গে একটা বড় পাথর তুলে নিল অর্জুন। এবং তখনই ক্ষুরটার কথা মনে পড়ল। ওটা তার পকেটেই রয়ে গেছে।

অর্জুন পাথর তুলতেই দড়িতে বাঁধা লোকটা অদ্ভুত সুরে শিস দিল। সঙ্গে-সঙ্গে কালভার্টের থামের আড়ালে চলে গেল হনুমানটা। ওর কাছাকাছি শুধু পাথর হাতে যাওয়া বোকামি হবে। অর্জুন মুখ ফিরিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, “ওটাকে তুমি ট্রেনিং দিয়েছ?”

আর সঙ্গে-সঙ্গে একটা ছোট পাথর শাঁ করে অর্জুনের মাথার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে ঝোরার জলে শব্দ তুলল। হনুমানটা পাথর ছুঁড়ছে। অর্জুন প্রচণ্ড রেগে গিয়ে লোকটাকে বলল, “ওটাকে এখান থেকে চলে যেতে বলো, নইলে তোমাকে আমি খুন করব!”

লোকটা মাথা নাড়ল, “আপনি আমাকে খুন করতে পারেন না। ভদ্রলোকেরা খুন করতে পারে না।”

কথাগুলো কানে যাওয়া মাত্র অর্জুনের মনে হল, সত্যিই সে এখন বেশ অসহায়। যতই মুখে বলুক, ঠাণ্ডা মাথায় কাউকে খুন করা তার পক্ষে অসম্ভব। আর এই সত্যিটা এতক্ষণে লোকটা বুঝে গিয়েছে। এই সময় দূরে মোটরবাইকের আওয়াজ পাওয়া গেল। বেশ দ্রুত এগিয়ে আসছে ওপরের রাস্তা ধরে। অর্জুন ঠিক করল, এই লোকটা যদি চেঁচায়—তা হলে সিরিঞ্জ বসিয়ে দেবে, তারপর যা হয় হোক।

মোটরবাইকটা আরও এগিয়ে আসামাত্র শুয়ে-শুয়েই লোকটা শিস দিল। সঙ্গে-সঙ্গে হনুমানটা থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করল। একটুও ইতস্তত না করে অর্জুন ওকে লক্ষ করে পাথরটা ছুঁড়ল। এই আক্রমণের কথা হনুমানটার মাথায় আসেনি। সে লাফাতে-লাফাতে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিল। পাথরটা আঘাত করল তার ঘাড়ের নীচে। সঙ্গে-সঙ্গে সে ছিটকে গেল খানিকটা। এবং সেই গতিতে গড়িয়ে গেল রাস্তার ওপরে। আর তখনই সশব্দে ব্রেক কষার আওয়াজ, হনুমানটার পরিত্রাহি চিৎকার কানে এল। অর্জুন দেখল, মোটরবাইকটা চালকহীন অবস্থায় কালভার্টের রেলিং-এর গায়ে এসে ধাক্কা খেল। তারপর তার সামনের চাকা শূন্যে বনবন করে ঘুরতে লাগল।

“গুরু, বাঁচাও, গুরু, হাম নীচে হ্যায়, বাঁচাও।” পরিত্রাহি চিৎকার করে উঠল লোকটা। অর্জুন দ্রুত কালভার্টের থামের আড়ালে-আড়ালে খানিকটা ওপরে চলে এল। রাস্তার মাঝখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে হনুমানটা। রক্ত বেরোচ্ছে তার শরীর থেকে। এ-পাশে মোটর বাইক আর উলটো দিকের আগাছার ওপর ধীরে-ধীরে উঠে বসছে হেলমেটধারী। নিশ্চয়ই সে চোট খেয়েছে। কিন্তু উঠে বসার সময় লোকটির চিৎকার তার কানে যাওয়ায় সে পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করে সতর্ক চোখে তাকাচ্ছে। স্পিড বেশি থাকায় হনুমানটা যখন ব্যালান্স হারিয়ে সামনে পড়েছিল, তখন লোকটাই আর ব্রেক কষার সময় পায়নি। এই লোকটিই নিশ্চয়ই বলদেব।

আড়চোখে অর্জুন দেখল, কালভার্টের নীচে শরীরে বাঁধন সত্ত্বেও লোকটা উঠে বসার চেষ্টা করছে। তার গলা থেকে একনাগাড়ে চিৎকার ছিটকে বেরোচ্ছে। ওর পক্ষে হাঁটা কোনও মতেই সম্ভব নয়। এবার নিশ্চয়ই বলদেব ওর উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসবে। এবং সে ক্ষেত্রে রিভলভারের সঙ্গে জেদ দেখানোর মতো বোকামি সে করতে পারে না। অথচ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে সে ধরা পড়ে যেতে বাধ্য।

অর্জুন দেখল বলদেব সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে রিভলভার হাতে। থুক করে থুতু ফেলল। এত দূর থেকেও অর্জুনের মনে হল থুতুর রং লাল। নিশ্চয়ই দাঁত ভেঙে গেছে পড়ার সময়। বাঁ হাতে চোট খেয়েছে, কারণ হাতটাকে বুকের কাছে তুলে ধরেছে। হঠাৎ বলদেব চিৎকার করে উঠল, “কাঁহা হ্যায় তুম, এ মুর্দার্কা বাচ্চা!” গলার স্বরে জঙ্গল গমগম করতে লাগল। কালভার্টের নীচ থেকে লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, “নীচে। ঝোরাকা পাশ।”

বলদেব দু’ পা এগোল। তার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সেই অবস্থায় সে চেঁচাল, “ইয়ার্কি মারছিস, অ্যাঁ। আমার সঙ্গে ইয়ার্কি? হনুমান লেলিয়ে দেওয়া? উঠে আয় বদমাশ।”

লোকটা কাতরে উঠল, “কী করে উঠব। আমার হাত-পা বাঁধা।”

পরস্পরকে না দেখেও এই যে কথাবার্তা—তা হিন্দিতে হচ্ছিল। বলদেব সোজা হল, “কে বাঁধল তোকে? তোর কাছে কেউ আছে নাকি?”

“সেই চিড়িয়া। মেয়েগুলোর সঙ্গে এসেছে। ভড়কি দিয়েছে গুরু। এতক্ষণ আমাকে সিরিঞ্জ ঢোকাবার ভয় দেখাচ্ছিল। এখন দেখতে পাচ্ছি না।”

অর্জুন দেখল, আহত হওয়া সত্ত্বেও একঝটকায় নিজেকে তৈরি করে বলদেব ছুটে এল মোটরবাইকের কাছে। লোকটাকে এখন খুব ভিতু বলে মনে হচ্ছে। অর্জুন যেখানে আড়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে বলদেব মাত্র হাত-দশেক দূরে। সে মোটরবাইকটাকে কোনও মতে সোজা করল। শরীরে প্রচুর শক্তি না থাকলে এই অবস্থায় ওটা করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাইকটার অবস্থা এমন সঙ্গিন হয়ে গিয়েছে যে, হতাশায় ঠেলে দিল বলদেব ওটাকে। আবার কালভার্টের রেলিং-এর ওপর ঝপাং শব্দে পড়ল সেটা। এবার মুখ ঘুরিয়ে কতকটা নেমে এল লোকটা। আর-একটু এগোলেই অর্জুন ধরা পড়ে যাবে ওর চোখে। বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ি-পেটা শুরু হয়ে গিয়েছে। অর্জুন বলদেবের পা এবং হাঁটু দেখতে পাচ্ছে এখন।

“তোকে ধরল কী করে?” চিৎকার ভেসে এল।

“পেছন থেকে। গুরু, দড়ি খুলে দাও। “কী বলেছিস তুই?”

“কিছু না, গুরু, কিছু না।”

“মিথ্যে কথা বলিস না। সিরিঞ্জ পেয়েছে যখন, তখন তুই মুখ বন্ধ রাখিসনি।”

“জিজ্ঞেস করছিল, বস কে?”

“কী বললি?”

“মেমসাব। ব্যস।”

সঙ্গে-সঙ্গে আর্তনাদ করেই নেতিয়ে গেল লোকটা। অদ্ভুতভাবে চিত হয়ে মুখ কাত করে পড়ে গেল। চোখ দুটো পলকেই স্থির, মুখ হাঁ। অৰ্জুন মুখ ফেরাল। হাঁটু এবং পা ধীরে-ধীরে ওপরে উঠে গেল। অর্জুন আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। চোখের সামনেই একটা খুন হয়ে গেল। এই লোকটার কাছ থেকে নিশ্চয়ই কিছু খবর পাওয়া যেত, যেটা বলদেব চাইছিল না। হনুমানটা নিশ্চয়ই এই লোকটারই পোষা। বেচারা বলদেবকে খবর দিতে গিয়ে প্রাণ হারাল। কিন্তু এই কালভার্টের নীচ থেকে বের হওয়া দরকার। অথচ বোঝা যাচ্ছে না বলদেব কাছে-পিঠে আছে কি না। সে যদি অপেক্ষা করে থাকে, তা হলে তার দশা ওই লোকটার মতেই হবে।

হঠাৎ ‘ঝপাং’ শব্দ হতেই চমকে উঠল অর্জুন। মোটরবাইকটা ঠিক ঝোরার মাঝখানে পড়ে আস্তে-আস্তে তলিয়ে গেল। ওখানে জলের গভীরতা বড়জোর চার-পাঁচ ফুট। থামের আড়ালে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে সে দেখল, বলদেব টলতে টলতে বাংলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রাস্তা ধরে।

একটু সময় নিয়ে সে কালভার্টের নীচ থেকে বেরিয়ে এল। হনুমানটা পড়ে আছে রাস্তায়। মাথাটাই ফেটে গিয়েছে। মাথার তুলনায় শরীর বেশ বড়। রাস্তার যতটা সোজা দেখা যায়, বলদেব কোথাও নেই। এবং তখনই গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফরেস্ট অফিসের জিপটাকে দেখতে পেল অর্জুন। বেশ দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে। কালভার্টের সামনে এসে ব্রেক কষতেই মিস্টার বিশ্বাস লাফিয়ে নামলেন, “কী ব্যাপার? আপনি কাকে ধরেছেন? আরে! এটা কী?”

মিস্টার বিশ্বাস ছুটে গেলেন হনুমানটার কাছে। তাঁর সঙ্গী ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরাও বেশ অবাক হয়েছে বোঝা গেল। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “মিস্টার আহমেদ কি এসে গিয়েছেন?”

মিস্টার বিশ্বাস মাথা নাড়লেন, “এখনও নয়। আপনি আসতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু ব্যাপারটা শুনে না এসে পারলাম না।”

তা হলে বাংলো ঘেরাও করা হয়নি? সর্বনাশ। বলদেব ও দিকেই গিয়েছে। অর্জুন খুব ব্যস্ত হয়ে উঠল, “আপনি জিপ ঘোরাতে বলুন।”

“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।” মিস্টার বিশ্বাস কথাগুলো বলতে-বলতে হাত নেড়ে ড্রাইভারকে ইশারা করলেন।

অর্জুন বলল, “আপনার এই জঙ্গলে আর-একজন খুন হয়েছে। একই জায়গায়। তৃতীয় খুন যাতে না হয়, তার জন্য আমাদের এখনই বাংলোয় যাওয়া উচিত। ও হ্যাঁ, আপনি চটপট একবার কালভার্টের নীচ থেকে ঘুরে আসুন।”

মিস্টার বিশ্বাস ছুটে গেলেন। ফিরে এলেন একেবারে ঝড়ের মতো, সৰ্বনাশ!”

অর্জুন জিপে উঠে বসল কিছু না বলে। মিস্টার বিশ্বাস সেখানে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞাসা করলেন, “ওকে খুন করল কে? আপনি?”

“আমার কাছে রিভলভার নেই মিস্টার বিশ্বাস!”

“না, মানে ড্রাইভারের কাছে শুনলাম…।”

সেটি এই জিনিস। এ-দিয়ে রক্ত বের হয় না, সাদা চোখে মৃত্যুর কারণ বোঝা যায় না। চলে আসুন চটপট। আমি মানুষ মারার অধিকারী নই, বাঁচানোর।”

জিপ ছুটে যাচ্ছিল বাংলোর দিকে। যতটা সংক্ষেপে সম্ভব অর্জুন মিস্টার বিশ্বাসকে বুঝিয়ে বলল ব্যাপারটা। শুনে ভদ্রলোক উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। অর্জুন বলল, “আমার দৃঢ় বিশ্বাস মিস্টার ভার্মার স্ত্রী হিসেবে যিনি এই বাংলোয় আছেন, তিনিই ‘মেমসাহেব’ এবং এই চক্রান্তের মূল নেত্রী।

মিস্টার বিশ্বাস কথা বললেন না। বাঁক ঘুরতেই দেখা গেল, ফরেস্ট বাংলোর একজন কর্মচারী ছুটতে ছুটতে আসছে। জিপ থামাতে হল। লোকটা হাঁপাতে-হাঁপাতে যা বলল, তাতে বোঝা গেল একটু আগে একটা লোক বাংলোয় ঢুকে ভার্মা-সাহেবকে কিছু বলতেই তিনি ও মেমসাহেব ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। যাওয়ার আগে চার বাচ্চা-মেমসাহেবের একজনকে বন্দুক দেখিয়ে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছেন।

সঙ্গে-সঙ্গে জিপ ছুটে এল বাংলোর লনে। অর্জুন দেখল, পুনম, চিঙ্কি, এবং টিনা ছুটতে ছুটতে আসছে। কথা বলার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়ল তারা। অর্জুন শুনল, সে বেরিয়ে যাওয়ার কিছু আগে নাকি নন্দিনী একাই গিয়েছিল ভার্মা-সাহেবের ঘরে। সে বন্ধুদের বলেছিল, লোকটার মুখোশ খুলে দেবে। ওরা তাকে অর্জুনের নিষেধের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল কিন্তু কথা শোনেনি নন্দিনী। সে অনেকক্ষণ ফিরছে না দেখে খোঁজ করতে গিয়ে শেষে দেখতে পেয়েছে, নন্দিনীকে রিভলভার দেখিয়ে ট্যাক্সিতে তুলেছে ওরা। কিছু করার আগেই ট্যাক্সি হাওয়া হয়ে গিয়েছে।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “মিস্টার পুরি ঘরে আছেন?”

ফরেস্ট বাংলোর একটি বেয়ারা বলল, “নেহি সাব। আধা-ঘন্টা আগে নিকাল গিয়া।”

মিস্টার বিশ্বাস জিজ্ঞেস করলেন, “মিস্টার পুরি কি এ-ব্যাপারে জড়িত?”

“আমি বুঝতে পারছি না। তবে লোকটার চাল-চলন সন্দেহজনক। আপনি এখনই পুলিশ-স্টেশনে টেলিফোন করুন। ওদের রাস্তায় আটকাতে বলুন। অর্জুন ব্যস্ত হল।

জিপ চলে এল ফরেস্ট অফিসে। দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলেন মিস্টার বিশ্বাস। মিনিটখানেক বাদে ফিরে এসে জিপে উঠলেন, “ড্রাইভার, চালাও। লাইন পাওয়া গেল না। ওরা বেশি দূরে যেতে পারেনি। আহমেদেরও তো এতক্ষণে এই রাস্তায় আসার কথা। ড্রাইভার, জোরে।”

জিপ প্রচণ্ড গতিতে ছোটা শুরু করল।

মিনিট-পাঁচেক যাওয়ার পর বিশ্বাস চমকে উঠলেন, “কিছু দেখতে পাচ্ছেন?”

অর্জুনের নজরে পড়েছে ততক্ষণে। একটা জিপ রাস্তা থেকে অনেকটা সরে এসে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গিয়ে উলটে যাওয়ার ভঙ্গিতে আটকে আছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের জিপ থামানো মাত্র একজন পুলিশ ছুটে এল। ওটা যে মিস্টার আহমেদের জিপ, তা বুঝতে আর অসুবিধা নেই।

পুলিশটি বলল, “ভাগ গিয়া সাব। লেকিন পাকাড় যায়ে গা।”

মিস্টার বিশ্বাস জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে, খুলে বলো।”

লোকটা জানাল থানা থেকে যখন তারা আসছিল, তখন চেকপোস্টে এক ভদ্রলোক মিস্টার আহমেদের সঙ্গে কিছু কথা বলেন। তারপরেই মিস্টার আহমেদ ড্রাইভার ও দু’জন সেপাইকে নির্দেশ দেন জিপ নিয়ে বাংলোয় এসে রেঞ্জার সাহেবকে খবর দিতে যে, তিনি চেকপোস্টেই অপেক্ষা করছেন। সেইমতো বেশ স্পিডে যখন তারা আসছিল, তখন এ দিক থেকে একটা ট্যাক্‌স ঝড়ের মতো উড়ে আসে। ড্রাইভার ভেবেছিল ট্যাক্সি সাইড দেবে, কিন্তু সেটা দিচ্ছে না এবং সংঘর্ষ অনিবার্য দেখে বাধ্য হয়ে ড্রাইভার জিপ নিয়ে জঙ্গলে নেমে যায়। এতে একজন সেপাই আহত হয়েছে। তাকে নিয়ে অন্য সেপাই রওনা হয়ে গিয়েছে চেকপোস্টের দিকে।

শোনামাত্র জিপ রওনা হল। কিছুক্ষণ বাদে মিস্টার বিশ্বাস বললেন, “এই বাঁকটা ঘুরলেই চেকপোস্ট।”. তখনই ওরা সেপাই দুটোকে দেখতে পেল। একজন খোঁড়াচ্ছে।”

অর্জুন বলল, “তা হলে এখানেই গাড়ি থামান। ঠিক রাস্তার মাঝখানে।” গাড়ি থামতেই ওরা নেমে পড়ল। আহত সেপাইটিকে গাড়িতে রেখে দিয়ে অস্ত্রধারীকে অর্জুন বলল অনুসরণ করতে। মিস্টার বিশ্বাস সঙ্গ নিলেন। গাড়ির রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কিছু দূর এগিয়ে যেতে, চেকপোস্টের খানিকটা দূরে ট্যাক্সিটিকে দেখতে পেল ওরা। ট্যাক্‌সির মধ্যে দুজন বসে আছে। ড্রাইভারও। চেকপোস্টের লোহার গেট বন্ধ। গেটের ওপাশে কয়েকজন পুলিশ আর ট্যাক্সির সামনে বলদেব। সামনে নন্দিনীকে রেখে দাঁড়িয়ে। এই সময় বলদেব চিৎকার করল হিন্দিতে, “আমি শেষ বার বলছি, গেট খুলে সরে না দাঁড়ালে এই মেয়েটার জান চলে যাবে।

এবার একজন চৌকিদার গোছের লোক গেট খুলে দিল। বলদেব এক হাতে রিভলভার, অন্য হাতে নন্দিনীকে ধরে ট্যাক্সির দরজায় চলে এল। তার পর চিৎকার করল, “চালাকির চেষ্টা করলে খুব খারাপ হবে।”

এই সময় একটা ফায়ারিং-এর আওয়াজ ভেসে এল। সেটা এত কাছে যে, অর্জুন চমকে পেছন দিকে তাকাল। ততক্ষণে মাটিতে পড়ে গিয়েছে বলদেব। আর তার হাত থেকে রিভলভারটা ছিটকে গিয়েছে খানিক দূরে। অর্জুন দৌড়ে রাস্তায় চলে এসে রিভলভারটা কুড়িয়ে নিতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। তারপরেই শরীরটাকে গুটিয়ে বাঁ পাশে লাফাল। মিস্টার ভার্মার ছোঁড়া গুলিটা তার সামান্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু দ্বিতীয় বার গুলি ছোঁড়ার সুযোগ পেলেন না ভদ্রলোক। মাটিতে পড়ে থাকা অর্জুন যখন দ্বিতীয় গুলির জন্য অপেক্ষা করছে তখন বিপরীত দিকের জানালা থেকে একটি হাত এগিয়ে এসেছিল মিস্টার ভার্মার দিকে, “নো মোর, আদারওয়াইজ্ ইউ উইল বি ডেড।” মিস্টার ভার্মার হাত থেকে রিভলভার পড়ে গেল।

অর্জুন চিৎকার করে উঠল, “অমলদা, আপনি?”

ততক্ষণে পেছন থেকে মিস্টার আহমেদ বেরিয়ে এসেছেন জঙ্গল থেকে। সেপাইরা ছুটে এল চেকপোস্টের আড়াল ছেড়ে। গাড়ি থেকে টেনে বের করা হল মিস্টার ভার্মা আর ‘মিসেস ভার্মা’ নামক মহিলাকে। নন্দিনীর কথা বলার ক্ষমতা ছিল না। আহমেদ পরীক্ষা করে বললেন, “লোকটা আগেই উন্ডেড ছিল। বাট হি ইজ ডেড।”

মিস্টার বিশ্বাস বললেন, “একটু আগে ও আর-এক জনকে খুন করেছে। “সে কী? কোথায়?” মিস্টার আহমেদ বললেন।

আধঘন্টা বাদে ওরা সবাই থানায় বসে ছিল মিস্টার আহমেদের টেবিলের সামনে। ইতিমধ্যে লোক পাঠানো হয়েছে কালভার্টের নীচ থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করতে। অমল সোম বললেন, “আগে অর্জুন, তোমার গল্পটা শোনা যাক।

অর্জুন বিস্তারিত বলল।

আহমেদ বললেন, “আমরা খবর পেয়েছিলাম, সোনা বিক্রির ঢেউ মালবাজারের দিকে লেগেছে। কিন্তু এ দিকটায় শুধু উগ্রপন্থীদের নিয়ে সময় কাটছিল আমার। উফ্!”

মিস্টার বিশ্বাস জিজ্ঞেস করলেন, “এই সোনা ওরা পেত কোথায়?”

অমলদা উত্তর দিলেন, “যে-ভদ্রমহিলা এখানে ‘মিসেস ভার্মা’ পরিচয় দিয়ে ছিলেন, তিনি জন্মসূত্রে পারো-র মানুষ। পারো ভুটানের শহর। এই ভদ্রমহিলার দিল্লিতে যাতায়াত ছিল। কোনওভাবে ওঁর সঙ্গে মিস্টার ভার্মার আলাপ হয়। তখন নন্দিনীর বাবার সঙ্গে ব্যবসা-সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় মিস্টার ভার্মা বিপদে পড়েছিলেন। নন্দিনীর বাবার ওপর ওঁর খুব রাগ ছিল, কিন্তু সেটা বোঝাতেন না। উনি জানতে পেরেছিলেন নন্দিনীরা এ দিকে আসছে। হয়তো ওর বাবার কাছেই জেনেছিলেন তারিখ। পরে নন্দিনীর বাবার কোনও কারণে সন্দেহ হওয়ায় আমার এসকর্টের জন্য অনুরোধ করেন। এ দিকে মহিলা ভুটানের—কিন্তু ভুটানি নন। আমার ধারণা, তিব্বত থেকে পালিয়ে আসা লামাদের সোনা কোনওভাবে ওঁর কাছে চলে আসে। হয়তো ফাঁকি দিয়েই তিনি সেটা দখল করেন। ভুটানে থেকে সেই সোনা বিক্রি করা যেত না। ভারতবর্ষে এসে করতে হলে সরকার অনুমতি দিত না। নিজের অর্জিত সম্পত্তি না হলে মানুষ কম দামেও বিক্রি করে। মিস্টার ভার্মার সঙ্গে ওঁর চুক্তি হয়। এঁদের সঙ্গে বলদেব জোটে। সে এই এলাকায় বেশ কিছু দিন আছে। টাফ ম্যান। খোঁজ নিলে জানা যাবে, মিস্টার ভার্মার স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ওই মহিলা কখনও গরুমারা, কখনও চাপড়ামারি, কখনও কালীঝোরা, কখনও ফুন্টসিলিং-এর বাংলো কিংবা হোটেলে থেকেছেন। মিস্টার ভার্মার বুদ্ধিতে বলদেব গরিব মানুষগুলোকে ব্যবহার করেছে। পুলিশ এদের জেরা করলে এ-ব্যাপারে বিশদ জানতে পারবে।”

“কিন্তু যে লোকটা আজ খুন হয়েছে, সে বলেছিল তাদের বস একজন মেমসাহেব। তার মানে এরা জানত?” অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

“স্বাভাবিক। মিস্টার ভার্মা সমস্ত ডুয়ার্স ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বলদেব মোটরবাইকে ছুটে বেড়াচ্ছে সেই সঙ্গে। মূল ঘাঁটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়িত্বে ছিল এই লোকটি। সে তো মেমসাহেবকে চিনবেই। তাকে তো পাহারাদারের কাজ করতে হত। এর আগে ছিল চাপড়ামারিতে। হনুমানটাকে চমৎকার ট্রেনিং দিয়েছিল। চাপড়ামারির কিছু মানুষ একটা বনমানুষ দেখেছে বলে দাবি করে। সদ্য এ-তল্লাটে আসায় মিস্টার বিশ্বাসরা ওর সন্ধান পাননি।”

অমল সোম উঠে দাঁড়ালেন, “আমি আজই জলপাইগুড়িতে ফিরে যাচ্ছি মিস্টার আহমেদ। যদি কিছু প্রয়োজন হয়, জানাবেন।”

“অবশ্যই। আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না মিস্টার সোম।”

“আপনারা কি আগে পরিচিত ছিলেন?” অর্জুন খুব অবাক হচ্ছিল।

“হ্যাঁ। মানে গতকাল আমি যখন ফরেস্ট থেকে ফিরে আসি, তখন উনি থানায় এসে আলাপ করে গিয়েছিলেন।” মিস্টার আহমেদ বললেন।

থানার বাইরে এসে অর্জুন অভিমানে ফেটে পড়ল, “অমলদা, আপনি ‘মিস্টার পুরি’ নামে আমাদের ফলো করছেন, অথচ একবারও জানতে দেননি কেন?”

অমল সোম অর্জুনের কাঁধে হাত রাখলেন, “তুমি শিলিগুড়িতে রওনা হওয়ার পর নন্দিনীর বাবার আর-একটা টেলিগ্রাম পাই। তিনি বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন। তাই ভাবলাম, তোমাদের সঙ্গে থাকি।”

“চলি। ভাল কাজ করেছ। তবে এখনই তোমার ফরেস্ট বাংলোতে ফিরে যাওয়া উচিত। নন্দিনীকে আমি সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছি। এবার নিশ্চিন্তে ওদের দার্জিলিংটা ঘুরিয়ে দেখাও।” অমলদা গম্ভীর পায়ে গাড়িতে উঠলেন।

অর্জুন ঠোঁট কামড়াল। তার সব আছে, শুধু আর-একটু অভিজ্ঞতা দরকার। অমলদার মতো।