লাইটার – ৪

।। চার।।

সহদেব বক্‌সি বয়সে নবীন। স্মার্ট চেহারা। চালচলনে মনে হয় পুলিশ অফিসার না হয়ে যদি সিনেমার নায়ক হতেন, তবে আরও বেশি মানাত। পরের দিন বিকেলবেলায় থানায় তাঁর ঘরে বসে সহদেব কাঁধ নাচিয়ে বললেন, “ইটস্ এ সিম্পল কেস অব সুইসাইড। ভদ্রলোক বাথরুমে গিয়ে জলের কল খুলে নিজের হাতের শিরা কেটেছেন।

অর্জুন চুপচাপ বসে ছিল সামনে। সহদেবকে তার ভাল লাগে। অমল সোমকে সহদেব ঠিক পছন্দ না করলেও অর্জুনের সঙ্গে ভাল ভাব আছে। সে জিজ্ঞেস করল, “এটা তাহলে হত্যা নয়?”

“নট অ্যাট অল। কোনও মানুষের হাতের শিরা জোর করে কাটা যায় না। জোর করে ধরেবেঁধে তা করলেও ধস্তাধস্তির চিহ্ন থাকত। ওর শরীরে কোনও দাগ নেই।”

“তা হলে উনি অমলদার কাছে গিয়েছিলেন কেন? নিশ্চয়ই কোনও বিপদ ঘটতে যাচ্ছিল!”

“এইটেই তো এরা ভুল করে। হয়তো নিজে কোনও অন্যায় করেছিল, ভেবেছিল অমলবাবু বাঁচিয়ে দেবেন, কিন্তু তিনি না থাকায় ভয়ে লজ্জায় আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। ভদ্রলোক আমাদের কাছে এলে এই দুর্ঘটনা ঘটত না। কাঠমাণ্ডু থেকে এসে জলপাইগুড়িতে মরতে হত না।”

অর্জুন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কাঠমাণ্ডু?”

“ও হ্যাঁ। তোমাদের বলা হয়নি! ভদ্রলোক এ-দেশের নাগরিকই নন। ওঁর কাছে আমেরিকান পাশপোর্ট পাওয়া গিয়েছে। এইটে উটকো ঝামেলা। বিদেশি নাগরিক মারা গেলে অনেক নিয়মকানুন মানতে হয়। শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ রায় আমাকে বিপাকে ফেলেছেন।” জলপাইগুড়ি থানার দারোগা সহদেব বকসিকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল।

“সত্যেন্দ্রনাথ রায়! ভদ্রলোকের সম্পর্কে আর কিছু জানা গিয়েছে?”

“এখনও জিনিসপত্র ভাল করে পরীক্ষা করিনি। পাশপোর্ট পেয়ে অথরিটিকে জানিয়ে এখন আদেশের অপেক্ষায় বসে আছি।” এই সময় আর একটা কেস এসে যেতে সহদেব তৎপর হলেন।

অর্জুন একটু দ্বিধা করে জিজ্ঞেস করল, “সহদেবদা, আমি ওঁর জিনিসপত্র দেখতে পারি?”

“কোনও লাভ হবে না। তুমি ভাবছ মার্ডার কেস। মোটেই না। হাত না বেঁধে শিরা কাটা যায় না। দ্যাখো যদিও অফিসিয়ালি আমি তোমাকে দেখাচ্ছি না,” সহদেব একজন সেপাইকে ডেকে হুকুম জানালে সে অর্জুনকে নিয়ে গেল মালখানায়।

স্যুটকেসটা দেখলেই বোঝা যায় বিদেশি। জামা-প্যান্টও তাই। ভদ্রলোকের অবস্থা নিশ্চয়ই খুব ভাল। পাশপোর্টটাকে পেল না সে। কোনও টাকা-পয়সাও নেই। অথচ বিদেশি মানুষ নিশ্চয়ই খালি হাতে এখানে আসবেন না। একটা ডায়েরি দেখল, ভদ্রলোক তাতে বিশদ লেখেননি। ঠিক দশ দিন আগে তিনি প্যান অ্যাম এয়ারকোম্পানির মাধ্যমে দিল্লিতে নেমেছিলেন। দিল্লি থেকে কাঠমাণ্ডুতে এসেছিলেন চার দিন আগে। অমল সোমের ঠিকানা লেখা পাশে ব্র্যাকেটে বিষ্ণুচরণ পত্রনবীশ লেখা। এইটে পড়ে সোজা হয়ে বসল অর্জুন। বিষ্টুসাহেবের কথা জানবেন কী করে সত্যেন্দ্রনাথ? উনি কি এখানে আসার আগে কালিম্পং-এ গিয়েছিলেন? অমলদার ঠিকানায় নিচে লেখা আছে, ভারতীয় গোয়েন্দাদের সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই, এই লোকটির সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। ডায়েরির শেষ পাতায় কয়েকটা নম্বর লেখা। কী মনে হতে অর্জুন একটা কাগজে নম্বরগুলো লিখে নিল। A2501/C/Q/B, A8972/C/Q/B, A11121/C/M.1 এগুলো কিসের নম্বর বুঝতে পারল না সে। ডায়েরিটা রেখে দিয়ে অন্য জিনিসপত্র তন্নতন্ন করে দেখে যখন হতাশ হচ্ছিল, তখন স্যুটের ভেতরের পকেটে একটা কার্ড পেল সে। কার্ডে সত্যেন্দ্রপ্রসাদের নাম-ঠিকানা লেখা। নিউইয়র্কের কুইন্সে থাকতেন ভদ্রলোক। কার্ডের পেছন দিকটায় চোখ বোলাতে গিয়ে সে শক্ত হল। পরিষ্কার ইংরেজিতে লিখে রেখেছেন ভদ্রলোক, ‘ভারতবর্ষে যাচ্ছি। যে কোনওদিন আমি খুন হতে পারি। জোন্স অ্যান্ড জোন্স যে দায়িত্ব দিয়েছে তা পালন করবই। যদি আমার মৃত্যু হয় তা হলে এই কার্ড যিনি পাবেন তিনি অবিলম্বে আমার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে বাধিত হব।’ কার্ডটা রাখতে গিয়েও মন পালটাল সে। এই ঘরে এখন কেউ নেই। হয়তো অন্যায়, কিন্তু সে নিজের পকেটে ওটাকে চালান করে দিল।

তখনই তার বিশ্বাস হল সত্যেন্দ্রনাথ আত্মহত্যা করেননি। জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানির হয়ে কোনও কাজ করতে তিনি এসেছিলেন এখানে। তিনি নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা আছে জানতেন, তিনি আত্মহত্যা করবেন কেন? তা ছাড়া সে যখন ঘরে ঢুকেছিল তখন দরজা ভেজানো ছিল। এমনকী বাথরুমের দরজাটাও ভেতর থেকে বন্ধ ছিল না। এইভাবে সব খুলে রেখেই কেউ আত্মাহত্যা করে নাকি। সত্যেন্দ্রনাথ যখন অমলদার বাড়িতে গিয়েছিলেন তখন তাঁকে মোটেই নাভার্স দেখাচ্ছিল না। বরং লোকটাকে মেজাজি দাম্ভিক বলে মনে হয়েছিল। আত্মহত্যা করতে চাইবার আগে কেউ মুরগির অর্ডার দেয় কি? অর্জুন খুব নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। কিন্তু একথাও ঠিক, দুটো হাত বেঁধে তবেই শিরা কাটা যায়। যার হাত বাঁধা হবে, সে বাধা দেবে না? প্রাণের জন্য লড়াই করবে না? তাহলে তো তার চিহ্ন সত্যেন্দ্রনাথের শরীরে থাকত!

ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝতে পারছিল না অর্জুন। এই সময় তার সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছে হল। যদিও সে বাইরে-বয়স্ক মানুষের সামনে কখনও সিগারেট খায় না। সহদেবদা মনে হয় এঘরে এখনই ঢুকবেন না। সে সিগারেট বের করে দেশলাই বের করতে গিয়ে লাইটারটার স্পর্শ পেল। জোন্স অ্যান্ড জোন্স, এই কোম্পানির দায়িত্ব নিয়ে, এখানে এসে সত্যেন্দ্রনাথ মারা গেলেন। সে প্রথম বোতামটা টিপে অদৃশ্য আগুনে সিগারেট ধরাতে গিয়েই চমকে উঠল। যদি এর দ্বিতীয় বোতামটা সুধাময় সান্যালের জ্ঞান অনুযায়ী সক্রিয় হত তাহলে অদৃশ্য রে দশ ফুট পর্যন্ত ছুটে গিয়ে হাতিকেও অবশ করে দিতে পারত। মানুষ তো অজ্ঞান হতই। আর একটা জ্ঞানহীন মানুষের হাতের শিরা কেটে দেওয়া শিশুর পক্ষেও সহজ।

তার মানে জলপাইগুড়ি শহরে জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর আসল লাইটার এসেছে। খুনি সেটাই ব্যবহার করেছে? সত্যেন্দ্রনাথকে নিশ্চয়ই সে ভদ্রভাবে দেখাতে গিয়েছিল লাইটারটা। সত্যেন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন ওটা জাল। তাই কোনও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবেননি। সুধাময় সান্যালের কথা যদি ঠিক হয় তাহলে আততায়ী সরাসরি দ্বিতীয় বোতাম টিপে সত্যেন্দ্রনাথকে অজ্ঞান করে বাথরুমে টেনে নিয়ে গিয়ে হাতের শিরা কেটেছেন। ওই ব্লেড সত্যেন্দ্রনাথই ব্যবহার করেন। তাঁর দাড়ি কামাবার কিসে ওই ব্লেড আরও আছে।

প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়ল অর্জুন। এই মৃত্যু-রহস্য সে এত দ্রুত সমাধান করবে ভাবতে পারেনি। আনন্দে লাফাতে ইচ্ছে করছিল। অমলদা শহরে থাকলে শাবাশ দিতে বাধ্য হতেন। এখন তো সব ব্যাপার জলের মতো পরিষ্কার। কে সত্যেন্দ্রনাথের কাছে লাইটার দেখাতে যেতে পারে? কাল সুধাময় সান্যালের কাছে গিয়ে সে পরিচয় জেনে এসেছে। সহদেবদাকে এখনও লাইটারের কথা বলা হয়নি। ওকে অ্যারেস্ট করানোর পর সে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলবে। সে আরও চমকিত হল। হরিপ্রসাদ কি সত্যেন্দ্রনাথের আত্মীয়? দু’জনের উপাধি তো এক। হরিপ্রসাদ গতকাল সুধাময় সান্যালের কাছে গিয়েছিল লাইটার পরীক্ষা করাতে। জাল জিনিসটা সরিয়ে রেখে সে আসল জিনিস নিয়ে গিয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথের কাছে। পরিচিত মানুষ দেখে তিনি ঘরে বসাতে আপত্তি করেননি। আর সেই সুযোগে কাজ হাসিল করেছে হরিপ্রসাদ। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। হরিপ্রসাদ কেন সুধাময় সান্যালের কাছে যাবে লাইটার দেখাতে? একজন সাক্ষী কেউ রেখে দেয়? তা ছাড়া লাইটারটার বিশেষত্ব তার অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ যখন খুন হয়েছেন তখন হরিপ্রসাদ তার বাড়িতে ছিল না। এটা তো সে নিজের চোখেই দেখে এসেছে।

গম্ভীর হয়ে বসে ছিলেন সহদেবদা। অর্জুন কারণ জিজ্ঞেস করল। সহদেবদা বললেন, “একটু আগে এস. পি. সাহেব ফোনে জানিয়েছেন যে, সত্যেন্দ্রনাথের বডি যেন ডিফর্মড না হয় তার ব্যবস্থা করতে। কলকাতায় আমেরিকান দূতাবাসে পাঠাতে হবে বরফের বাক্সে ভরে। এ-শহরে ওসব জিনিস যে পাওয়া যায় না তা কি এস. পি. জানেন না?”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি সত্যেন্দ্রনাথের খুনিকে ধরতে চান?”

“খুনি! কী আজেবাজে বকছ? ওই ঘরে সত্যেন্দ্রনাথ যাওয়ার পর তুমি ছাড়া কেউ ঢোকেনি,” সহদেবদা হাসলেন, “কাউকে অ্যারেস্ট করতে হলে তোমাকেই তো করতে হয়। মাথা থেকে ভূত তাড়াও। সত্যেন্দ্রনাথ রায়কে কেউ খুন করেনি। অমলবাবুর সঙ্গে থাকতে থাকতে তুমি সব ব্যাপারেই রহস্যের গন্ধ পাও।” ওঁর কথা শেষ হওয়ামাত্র টেলিফোন বাজল।

রিসিভারটা কানে লাগিয়ে কথা বলতে-বলতে একটু উত্তেজিত হলেন সহদেব বকসি। তারপর “ঠিক আছে, আসছি,” বলে ওটাকে রেখে দিয়ে বললেন, “একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারব না। লোকটা আর অ্যাকসিডেন্ট করার সময় পেল না।”

“অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?” অর্জুন কৌতূহলী হল।

“হ্যাঁ। ঠিক কদমতলার মোড়ে। গাড়ি চালিয়ে আসছিলেন ভদ্রলোক। বোধহয় ব্রেক ফেল করায় রাস্তায় পাশে একটা দেওয়ালে সরাসরি ধাক্কা মারেন। বলছে তো স্পট ডেড। সহদেব বকসি যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। অর্জুনের মন-খারাপ হল। কেন যে ড্রাইভাররা একটু ধীরেসুস্থে গাড়ি চালায় না! কোন গরিব মানুষের সংসার গেল কে জানে! সে জিজ্ঞেস করল, “সত্যেন্দ্রনাথের খবর নিতে আর কেউ আসেনি, না?’

“না”, সহদেব বকসি বেরিয়ে এসে জিপ আনতে হুকুম দিলেন, “মিস্টার রায় হয়তো এতক্ষণে স্পটে আমাকে না দেখে এস. পি.-কে কমপ্লেন করে ফেলেছেন। এই একটা শহর, যা বড়লোকদের শাসনে চলে। তুমি কোন্ দিকে যাবে?”

“মিস্টার রায় মানে?”

“শিল্পসমিতিপাড়ার রায়বাড়ির কর্তা। তাঁরই ছোট ছেলে তো ওই কাণ্ড ঘটিয়েছেন।”

“ছোট ছেলে?” অর্জুন উত্তেজিত হয়ে উঠল, “হরিপ্রসাদ রায় অ্যাকসিডেন্ট করেছে?”

জিপ এসে গিয়েছিল। সহদেব বকসি তাতে উঠে বসতেই অর্জুন ছুটে গেল, “আমি আপনার সঙ্গে যেতে পারি?”

একটু বিস্মিত সহদেব বকসি ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললেন। অর্জুন জিপে উঠে পড়ল। গোটাচারেক সেপাই রয়েছে পেছনে। অর্জুন তখনও বুঝতে পারছিল না, “আপনি ঠিক শুনেছেন? হরিপ্রসাদ রায় অ্যাকসিডেন্ট করেছে?”

“নামটা শুনিনি। রায়বাড়ির ছোট ছেলে বলল। সিরিয়াস হেড-ইনজুরি।”

অর্জুন মাথা নাড়ল। রারবাড়ির অনেক মানুষ। হরিপ্রসাদ জলপাইগুড়ি শহরে কেন দুর্ঘটনা ঘটাতে যাবে। সত্যেন্দ্রনাথের খুনি এত সহজে… বিশ্বাস করতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে করছিল না। যেতে যেতে অনেকবার সহদেব বকসিকে লাইটারটার কথা বলতে গিয়েও সামলে নিল সে। দেখা যাক, আর একটু অপেক্ষা করলে ক্ষতি কী!

থানা থেকে বেরিয়ে রাস্তাটা সোজা। যদিও দু’পাশে প্রচুর দোকানপাট, সিনেমা হলের ভিড়, কিন্তু পুলিশের ড্রাইভার জানে কী করে গাড়ি চালাতে হয়। কদমতলার কাছে পৌঁছে দেখল বেশ ভিড় সেখানে। পুলিশ লেগে গেল কাজে। সহদেব বকসির সঙ্গে অর্জুনও পৌঁছে গেল গাড়িটার কাছে। যে গাড়িকে দেখবে বলে অর্জুন তৈরি ছিল এটা সেটা নয়। গত বিকেলে দেখা সত্যেন্দ্রনাথের ধুলোয় মাখা গাড়ির বদলে একটা সাদা ফিয়াট দুমড়ে পড়ে আছে। ড্রাইভারকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হাসপাতালে। সহদেব বকসি প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ নিচ্ছিলেন। গাড়িটা আসছিল একটু বেশি গতিতেই। পাশের মিষ্টির দোকানের মালিক বললেন, “ভদ্রলোক ঠিকই চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলাম ওঁর হাত স্টিয়ারিং থেকে পড়ে গেল। মাথাটা একদিকে হেলে পড়ল। ব্যস, দড়াম করে গাড়িটা রাস্তা ছেড়ে আছড়ে পড়ল ওখানে।”

এক ডাক্তারবাবু সাইকেলে যাচ্ছিলেন সেই সময়। তিনি বললেন, “স্পষ্ট দেখলাম, হার্টঅ্যাটাক কেস। অ্যাকসিডেন্ট হবার আগেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর মাথাটা স্ম্যাশড হয়েছে। স্পট ডেড।” কথাবার্তা বলে বোঝা গেল ভদ্রলোকের হৃদযন্ত্র বন্ধ হবার কারণেই ওই দুর্ঘটনা ঘটেছে, এবং ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আর কেউ আহত হয়নি।

অর্জুন চুপচাপ শুনছিল। তার মাথাটা এখন খালি। কিছুই চিন্তা করতে পারছিল না সে। রায়বাড়ির ছোট ছেলে হরিপ্রসাদ রায় মারা গিয়েছেন এ-কথা জানার পর সে কোনও নতুন কিছু ভাবতে পারছিল না।

সহদেব বকসি থানায় না ফিরে হাসপাতালে ছুটলেন। অর্জুন তাঁর সঙ্গ নিল। সেখানে তখন হৃদয়বিদারক দৃশ্য। রায়বাড়ির কর্তা অজ্ঞান হয়ে গেছেন। তাঁকে ঘিরে সেবা করছে কয়েকজন আত্মীয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকেই। খবর পেয়ে আসছেন শহরের গণ্যমান্যরা। সহদেব বকসির কাছ থেকে সরে এল সে। হরিপ্রসাদ রায় সত্যিই জীবিত নেই। ঠিক সেই সময় তার পাশে এক ভদ্রলোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল বুকের ওপর দু’হাত ভাঁজ করে। ফর্সা, লম্বা, মধ্যবয়স্ক মানুষটি গম্ভীর, উদ্ভ্রান্ত কিন্তু শোকের উগ্র প্রকাশ নেই। চেহারায় বোঝা যাচ্ছে ইনি রায়বাড়ির একজন। অর্জুনের মনে হল, এঁর সঙ্গে কথা বলা যায়। সে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “এটা কি হার্ট অ্যাটাক থেকে হল?’

ভদ্রলোক মুখ ফেরালেন। ওঁর চোখে যেন পরিচিত ভঙ্গি ফুটল। তারপর ধীরে-ধীরে মাথা নাড়লেন, “ডাক্তাররা বলতে পারবেন কখন কার হার্ট অ্যাটাক হয়, আমি কখনও ওর বুকের দোষ আছে বলে জানতাম না। কী করে যে এমন হল! ওর হার্ট তো ভালই ছিল।”

“উনি কি ড্রিঙ্ক করতেন?”

“না, না। নেভার। আমেরিকায় থেকেও মদ ছোঁয়নি। আমি মাঝে-মাঝে খাই বলে রাগ করত। মদ সিগারেট কিছুই খেত না।” ভদ্রলোক চোখের জল মুছলেন।

“উনি আপনার কে হন?”

“হরি আমার ছোট ভাই।”

“ও। আমার নাম অর্জুন। সত্যসন্ধানী অমল সোমের সহকারী।”

“আপনাকে চিনতে পেরেছি ভাই।”

“কিন্তু আপনি বোধহয় সত্যি খবর জানেন না। হরিপ্রসাদবাবুর সঙ্গে আমার সামান্য আলাপ হয়েছিল। তখন ওর কাছে আমি একটা লাইটার দেখেছিলাম। সিগারেট না খেলে কেউ লাইটার রাখে?”

“ও হো। সেটা একটা মজার ব্যাপার ঘটেছিল। এবার যখন ও কলকাতা থেকে এখানে আসে তখন এক প্যাসেঞ্জারের লাগেজ নির্দিষ্ট ওজনের চেয়ে বেশি হয়ে গিয়েছিল। ভদ্রলোক ওকে অনুরোধ করেন একটা তিন কেজির প্যাকেট যদি হরি ক্যারি করে। ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসের নিয়ম ভাঙতে চায়নি হরি। কিন্তু কখনও কখনও অনুরোধ এড়ানো সম্ভব হয় না। বাগডোগরায় গেলে সেই ভদ্রলোক প্যাকেট ফিরিয়ে নিয়ে খুব ধন্যবাদ দিয়ে ওই লাইটারটা উপহার দিয়েছিলেন ওকে। বলেছিলেন, ‘এ জিনিস ভারতবর্ষে আসেনি।’ একই ট্রান্সপোর্টে ওরা শিলিগুড়িতে আসে। কিন্তু দুঃখের কথা, সেই ভদ্রলোকের কিছু মালপত্র ওর মধ্যেই খোয়া যায়। হরি লাইটারটা আমাকে দেখায়। আমরা কিছুতেই খুলতে বা জ্বালাতে পারছিলাম না। আজ মনে পড়ল সুধাময় স্যানালের কথা। হরি ওঁর কাছে গিয়ে সব জেনে এল। তারপর অবশ্য ওর সঙ্গে আমার আর কথা হয়নি। কিন্তু লাইটার ছিল বলেই প্রমাণ হয় না সে সিগারেট খেত।”

অর্জুন আর কথা বাড়াল না। কিন্তু সে হাসপাতাল ছেড়ে গেল না। এই শহরে দুটো জাল লাইটার এসেছে। প্রথমটি তার পকেটে, দ্বিতীয়টি হরিপ্রসাদ রায়ের কাছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট না জানলে অবশ্য কিছুই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এমনও তো হতে পারে হরিপ্রসাদের হার্ট অ্যাটাকই হয়নি। সে সহদেব বকসির কাছে পৌঁছে দেখল তিনি রায়-পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলছেন। এর মধ্যে ডাক্তার এসে রায়কর্তার চিকিৎসা শুরু করেছেন। একটু সুযোগ পেয়ে সে সহদেব বকসিকে জানাল, “পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা আজ পাওয়া যাবে?”

“কেন?” স্পষ্টত বিরক্ত হলেন তিনি।

“আমি একটু আগ্রহী।

“দ্যাখো অর্জুন, তোমাকে আমি স্নেহ করি। কিন্তু সব কিছুর একটা লিমিট আছে। দেখছ এটা দুর্ঘটনা, দিনের আলোয় সকলের সামনে ঘটেছে, আর তুমি তার মধ্যে রহস্য খুঁজছ।”

“আমি দুঃখিত সহদেবদা, তবু আপনি ওটা পেলে আমাকে বলবেন। ওঁর কাছে কী কী পাওয়া গেছে জানতে পেরেছেন?” অর্জুন শান্ত গলায় প্রশ্ন করল।

একজন সাধারণ মানুষের কাছে যা পাওয়া যায়। আলমারির চাবি, মানিব্যাগ, চিরুনি। কোনও রহস্যজনক কাগজপত্র পাইনি। স্যাটিসফাইড?”

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “লাইটার?”

“লাইটার! এত জিনিস থাকতে লাইটারের কথা বললে কেন?”

“না, মানে উনি সিগারেট খান কি না জানতে চাইছি।”

“ও, সিগারেট খেলে হার্ট অ্যাটাক হবে, তাই! সত্যি, কল্পনার দৌড় বটে! না, কোনও লাইটার সিগারেট পাওয়া যায়নি ওর কাছে।

ধীরে-ধীরে অর্জুন বেরিয়ে আসছিল হাসপাতাল থেকে। হরিপ্রসাদ লাইটারটা কি বাড়িতে রেখে বেরিয়েছিল! সেটাই স্বাভাবিক। যে সিগারেট খায় না, সে ওটা সঙ্গে নিয়ে যাবে কেন? এখনই যদি সে রায়বাড়িতে যায় তা হলে একটা হদিস পাওয়া যেতে পারে।

এই সময় কাটা-গদাইকে দেখতে পেল অর্জুন। হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে আছে। সে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার, এখানে কী উদ্দেশ্যে?”

“তোমাকে ফলো করে এখানে এলাম।”

“সে কী? কী ব্যাপার?” অর্জুনের মনে পড়ল গতকাল সিনেমা দেখে বেরোবার সময় কাটা-গদাই তাকে বলেছিল একটা জরুরি কথা আছে। কাটা-গদাই এপাশ-ওপাশ তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “রায়বাবুর ছেলে ছবি হয়ে গেছে, না?”

হেসে ফেলল অর্জুন। তারপর গম্ভীর হল আবার, “হ্যাঁ, উনি মারা গিয়েছেন।”

“এইটে ওর পকেটে ছিল।” কাটা-গদাই নিজের পকেট থেকে একটা নীল লাইটার বের করে অর্জুনের হাতে দিল। অর্জুন দ্রুত সেটার পেছনে তাকাল, জোন্স অ্যান্ড জোন্স। খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল সে, “তুমি পেলে কোত্থেকে?”

মাথা নাড়ল কাটা-গদাই, “পুলিশকে যদি না বল তা হলে বলতে পারি।”

“ঠিক আছে, বল।”

“আমার এক শিষ্য বডিটা গাড়ি থেকে টেনে বের করার সময় নিয়েছে। আমি জানতে পেরে বললাম, খুব অন্যায় করেছিস। ফেরত দিতে এসেছিলাম। এখন কী হবে?”

অর্জুন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সেটাকে দেখে লুকনো নর্ টিপে আনলক্ করল। তারপর প্রথম বোতামটা টিপতেই অদৃশ্য ফ্লেম বের হল। সিগারেট ছিল না। একটা কাগজ গর্তর মুখটায় ধরতেই সেটা জ্বলে উঠল। এবার দ্বিতীয় বোতামটা? যদিও সে সুধাময় সান্যালের কাছে দেখেছে হরিপ্রসাদের এই লাইটারটা জাল, তবু ঝুঁকি নিল না। হাতের কাছে একটা কুকুর দাঁড়িয়ে ছিল, সেটার দিকে লক্ষ করে দ্বিতীয় বোতামটা টিপতেই সে ছুটে পালাল।

হতাশ হয়ে অর্জুন বলল, “এটা আমি নিচ্ছি। রায়বাবুদের ফিরিয়ে দেব। এসব আমেরিকান জিনিস। এদেশে কারও কাছে দেখতে পাবে না।

হাসল কাটা-গদাই, “না অর্জুনভাই, আজকাল তামাম দুনিয়া নেপাল হয়ে এখানে চলে আসে। সেদিন, হ্যাঁ কালকেই, সন্ধেবেলায় রূপমায়ার সামনে একজন কায়দা করে সিগারেট ধরাল। লাইটার টিপল, আলো জ্বলল না, কিন্তু সিগারেট ধরে গেল।”

সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল অর্জুন, “লোকটি কে? হরিপ্রসাদ রায়?”

“না, না। বাঙালি নয় লোকটা। লাল দাড়ি আছে।’ অর্জুনের সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে গেল যেন। লাল দাড়িওয়ালা লোক—যার কাছে এইরকম একটা লাইটার আছে। কে বলতে পারে সেই লাইটারের দ্বিতীয় বোতাম টিপলে রে বের হয় কি না। তার মানে এই শহরে তিনটে লাইটার এখন। যার দুটো জাল, একটা ঠিক।

সে কাটা-গদাইকে জিজ্ঞেস করল, “লোকটাকে আবার দেখলে চিনতে পারবে?”

একটু ভাবল কাটা-গদাই। তোমাকে অন্য কথা বলছিলাম।

তরপর বলল, “হ্যাঁ। চিনে নেব। কিন্তু কেসটা খারাপ।”

“কী কেস?” অন্য কিছু শুনতে এখন মোটেই ইচ্ছে করছিল না অর্জুনের “পোড়ার পাখা উঠেছে। ও এবার মরবে, তুমি বাঁচাও ওকে।”

কেন? ও কী করছে?”

“পাজিটা এবার স্মাগলিং-এ নেমেছে। আমার সঙ্গে দুশমনি থাকলেও ছেলেবেলার বন্ধু তো! তাই খারাপ লাগে। এতদিন রূপশ্রী হলে ব্ল্যাক করছিল, সে ঠিক আছে। কিন্তু এখন বাগডোগরা এয়ারপোর্টে যায়। টানা মাল নিয়ে বাজারে বিক্রি করে।”

“কিন্তু পোড়া-গদাই আমার কথা শুনবে কেন?”

“শুনবে। তোমার দাদাকে আমরা ভয় পাই। তুমি তো তারই শিষ্য।

হঠাৎ অর্জুনের মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল। সে জিজ্ঞেস করল, “পোড়া-গদাইকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারো?”

“ওর বাড়িতে। সেনপাড়ায়। যাবে তুমি?”

“যাব। আমাকে দূর থেকে বাড়িটা দেখিয়ে দিয়ে তুমি চলে যেও।”

“হ্যাঁ। আমি পোড়ার বাড়িতে যাই না। পাজিটা বহুত বদমাস। নেহাত ছেলেবেলার বন্ধু, তাই!”