॥ দুই ॥
টেলিগ্রামটা পড়তে-পড়তে অমল সোমের ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি ফুটল। বিষ্টুসাহেব উদ্গ্রীব চোখে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কাগজটা ফিরিয়ে দিয়ে অমলদা বললেন, “মানালিতে এইসময় বেশ বরফ পড়ে।”
“মানালি?” বিষ্টুসাহেব হতচকিত হয়ে টেলিগ্রামে চোখ বোলান, “মানালির কথা তো এখানে লেখা নেই। টেলিগ্রামটা এসেছে চণ্ডীগড় থেকে। ঠিক আছে?”
অমলদা বললেন, “চণ্ডীগড় থেকে মানালিতে যাওয়া যায়। কেউ-কেউ সিমলা হয়েও যান। আপনার কালিম্পংয়ের শীতও হার মানবে ও জায়গায় পৌঁছলে।”
বিষ্টুসাহেব এবার অবাক হয়ে অর্জুনের দিকে তাকালেন। যেন অমলদার কথার কোনও সূত্রই তাঁর মাথায় ঢুকছে না। শেষ পর্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, “শীতে আমার ভয় নেই। যা হোক, আমাকে চণ্ডীগড়ে যেতেই হচ্ছে। মানালির শীত মানালিতেই পড়ুক, ও নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আর কালিম্পং নিয়ে ঠাট্টা করবেন না, মাঝে-মাঝে ওটা সাইবেরিয়া হয়ে যায়। ঠিক আছে?”
“আপনি কিসে যাচ্ছেন? বাগডোগরা থেকে কি প্লেন ধরতে পারবেন?”
“প্লেন? রিটায়ার্ড মানুষ, প্লেনের পয়সা পাব কোত্থেকে! ট্রেনেই যাব, আজকে এখানে আসার সময় নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে তিনটে টিকিট কিনে এনেছি।” বিষ্টুসাহেব তাঁর ছোট্ট মাথাটি দুলিয়ে সরল ভঙ্গিতে হাসলেন। “জিজ্ঞেস না করেই তিনটে টিকিট কাটলেন?” অমলদার কপালে ভাঁজ পড়ল।
“বাঃ, শি ইজ ইন ডেঞ্জার। আমরা থাকতে রায়সাহেবের…না, না, আমি ভাবতে পারি না। লোকটার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া সব কিছুই জিজ্ঞেস করে করতে হবে? আপনাদের ওপর আমার কোনও রাইট নেই?” বিষ্টুসাহেব একটু উত্তেজিত।
“নিশ্চয়ই আছে।” অমলদা হাসলেন, “তবে কি জানেন, আমরা ভারতীয়রা কখনওই চিন্তা করি না অন্যের সুবিধে বা অসুবিধে আছে কি না। আমরা বড্ড বেশি আবেগে পরিচালিত হই। তা ছাড়া এক্ষেত্রে আমরা গিয়ে কী করব। মনে হচ্ছে এটা বাপ আর মেয়ের ব্যাপার। তাই না?” অমলদা উঠলেন।
অর্জুন এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। সে দেখল, বিষ্টুসাহেব হতাশ মুখে বসে আছেন। তারপর রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন। অর্জুন বুঝল, মানুষটি সত্যিই নাভার্স হয়ে গিয়েছেন। সাইবেরিয়া কিংবা মানালি না হলেও জলপাইগুড়িতে যে শীত পড়েছে, তাতে কপালে ঘাম জমে না পরিশ্রম না করলে।
অমলদা ততক্ষণে কাঠের বারান্দা থেকে বাগানে নেমে গিয়েছেন। অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল টেলিগ্রামের খবরটা পড়তে। ব্যাপারটা সে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে। চট করে সে কালিম্পংয়ে সীতাহরণের ঘটনাটা ভেবে নিল। সেই ঘটনার মাস তিনেকের মধ্যে রায়সাহেব খামারবাড়ি বিক্রি করে পাঞ্জাবে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে আবার নতুন কী বিপদ হল, অর্জুন তা বুঝতে পারছে না। কিন্তু বিষ্টুসাহেব নিজে থেকে টেলিগ্রামটা দেখতে না-বললে কী করে দ্যাখে!
ঘাড় ঘুরিয়ে অর্জুন দেখল বাগানে ফিনফিনে রোদ ছড়িয়েছে। অমলদা ফলের গাছগুলোর মধ্যে পায়চারি করতে করতে একটা বিশেষ গাছের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর উবু হয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সেটাকে লক্ষ করতে লাগলেন। গাছটাকে কালিম্পং থেকে আনা হয়েছিল। পাহাড়ি ফুলের গাছ। বছরখানেক বয়স হয়ে গেল, কিন্তু বাড়ছে না, মরছেও না। মাঝে-মাঝে পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে, আবার নতুন পাতা গজায়। কিন্তু বড় হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই, ফুল ফোটা তো দূরের কথা। পাহাড়ের গাছ সমতলের মাটির সঙ্গে যেন কিছুতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না। আর তাই ওটাকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই অমলদার। নানা রকম পরীক্ষা চালাচ্ছেন যাতে ওটা বড় হয়।
“অর্জুন।”
বিষ্টুসাহেবের গলা শুনে মুখ ফেরাল সে।
“কী করা যায় বলো তো!” ওর কাছেই পরামর্শ চাইলেন বিষ্টুসাহেব।
“আমি তো ব্যাপারটার কিছুই জানি না।”
“জানো না? কেন, এতক্ষণ তো শুনলে!” বিষ্টুসাহেবের হাঁ বড় হয়ে গেল।
ঠিক সেই সময় অমলদা ওই গাছের সামনে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বললেন, “বিষ্টুসাহেব, দয়া করে একবার এখানে আসবেন? এই গাছটা আমাকে বড্ড জ্বালাচ্ছে।
খানিকটা ইতস্তত করে এবং অনেকটাই অনিচ্ছায় বিষ্টুসাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। তারপর বারান্দার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, “টেলিগ্রামটা পড়ো। আমার এখন নৌকোডুবির অবস্থা আর উনি গাছ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন! ঠিক আছে।”
“ওটা আপনার দেওয়া গাছ। বাড়ছে না।” অর্জুন বিষ্টুসাহেবের মুখ দেখে হেসে ফেলল।
টেলিগ্রামটা এগিয়ে দিয়ে বিষ্টুসাহেব গুটিগুটি চলে গেলেন। অর্জুন তাকাল অক্ষরগুলোর দিকে। অনেকটা লিখেছেন ভদ্রলোক। আর একটু বড় হলে পোস্টকার্ড হয়ে যেত। কোনও ভূমিকা নেই। টেলিগ্রামে অবশ্য ভূমিকা করার সুযোগও থাকে না। “আমি আবার বিপদগ্রস্ত। পাঁচদিন হল সীতাকে পাচ্ছি না। এখানে এসে বেশ ভালই ছিলাম। সীতাও পাল্টে গিয়েছিল। মনে হচ্ছে এবার অ্যাবডাক্ট করা হয়েছে। পুলিশ কোনও হদিস পাচ্ছে না। আপনি মিস্টার সোমকে নিয়ে অবিলম্বে চলে আসুন। সমস্ত খরচ আমার। আপনাদের অনুগ্রহ চাইছি। ইউ এন রায়।”
দু’বার বার্তাটা পড়ল অর্জুন। একটি লাইনের ওপর তার দৃষ্টি আটকাল। ‘মনে হচ্ছে এবার অ্যাবডাক্ট করা হয়েছে।’ তার মানে জোর করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেয়েটিকে ধরে নিয়ে গেছে। কারা, কী জন্যে এই অপকর্মটি করবে, তা টেলিগ্রামে লেখা নেই। আর তাই পুরো ব্যাপারটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল অর্জুনের কাছে। কালিম্পংয়ের ঘটনাটা তো অন্য কথা বলে।
ইউ এন রায় পুরোদস্তুর সাহেব। দীর্ঘকাল আগে জলপাইগুড়ি ছেড়ে তিনি আমেরিকার সানফ্রান্সিসকো শহরে চলে যান পড়াশুনো করতে। তারপর সেখানেই চাকরি, চাকরি থেকে ব্যবসা। মোটামুটি সাধারণ আমেরিকানদের তুলনায় বেশ সচ্ছল অবস্থা তাঁর, এমন কথা বলেছিলেন বিষ্টুসাহেব। পুরো নাম উপেন্দ্রনারায়ণ রায়। মজবুত, সুদর্শন মানুষ গায়ের রঙ ধবধবে। বয়স পঞ্চাশের ওপাশেই, কিন্তু বোঝা যায় না। সানফ্রানসিসকোতে মানুষ হলেও ওঁর স্ত্রী বাঙালি। তাঁকে দেখেনি অর্জুন। যে-সময় কালিম্পংয়ে ঘটনাটা ঘটেছিল, সেই সময় তিনি আমেরিকাতেই ছিলেন। ‘উপেন্দ্রনারায়ণ’ বলতে যে জমিদারি চেহারাটা মনে আসে, তার সঙ্গে মানুষটার কোনও মিল না থাকলেও মেজাজে একটা মিল আছে। সেটা হল কঠোর ব্যক্তিত্ব। ভদ্রলোক যেন হালকা কথা বলতে শেখেননি।
দীর্ঘকাল আমেরিকায় থাকার ফলে ভারতবর্ষের সঙ্গে উপেন্দ্রনারায়ণের যোগসূত্র ক্ষীণ হয়ে গেলেও বাড়িতে বাংলা কথা বলার চলটা বজায় রেখেছিলেন। তাঁর বিবাহ হয়েছিল আমেরিকায় বড় হওয়া একজন বাঙালিনির সঙ্গে। ফলে একমাত্র কন্যাসন্তানটি বাবার চাপে বাধ্য হয়ে বাংলা বলতে পারে, কিন্তু তার আচরণ এবং চেহারায় মার্কিন ছাপ স্পষ্ট। এই মেয়ের বয়স যখন ষোলো বছর হয়নি, তখন উপেন্দ্রনারায়ণ বাধ্য হয়েছিলেন মেয়েকে নিয়ে ভারতবর্ষে পালিয়ে আসতে। তিনি কালিম্পংয়ের অনেকখানি এলাকা নিয়ে একটি বাংলোবাড়ি আর খামার করেছিলেন। সেই সুবাদেই বিষ্টুসাহেবের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। মিসেস রায় ওই সময় এদেশে আসেননি।
বিপদ এড়াতে উপেন্দ্রনারায়ণ এদেশে চলে আসেন; কিন্তু বিপদ এড়ানো গেল না। বিষ্টুসাহেবের কাছে খবর পেয়ে উপেন্দ্রনারায়ণ তখন সাহায্যের জন্য এসেছিলেন অমল সোমের কাছে। কালিম্পংয়ে সীতাহরণ নিয়ে তারপর নানান কাণ্ড। অমলদা শেষ পর্যন্ত উপেন্দ্রনারায়ণকে বিপন্মুক্ত করেছিলেন। তারপর আর কোনও খবর পায়নি অর্জুন। কিন্তু মাঝে-মাঝেই মেয়েটি, যার নাম সীতা, তার চেহারাটা মনে পড়ত। অত সুন্দর গায়ের রঙ, নাক-চোখের সুন্দর গড়ন, মুখে বাঙালি মেয়ের লাবণ্য সত্ত্বেও মেয়েটি মাথার দু’পাশের চুল কানের ওপর থেকে এমনভাবে কামিয়েছে, যাতে ঠিক সিঁথির জায়গায় ইঞ্চি দুয়েক খাটো চুল ছাঁটা টুপির মতো পড়ে থাকে। ওইটুকুতেই মেয়েটিকে কি বীভৎস দেখাচ্ছিল! এই মেয়ে নাকি পাঙ্ক!
পাঙ্ক শব্দটার সঙ্গে অর্জুন কখনও পরিচিত ছিল না। উপেন্দ্রনারায়ণ সেবার যখন সাহায্যের জন্য এসেছিলেন তখনই শব্দটা শোনে। আমেরিকার কিছু কিশোর এবং তরুণ সম্প্রদায় নাকি নিজেদের অখুশি ভাবতে পারলে খুশি হয়। পুরনো সংস্কার, ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি এবং চলতি প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারলে একশ্রেণীর অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়ে বেশ গর্ব বোধ করে। এদের জন্য তাদের বাপ-মায়ের চিন্তার শেষ নেই। এই কিছু দিন আগে ছেলেমেয়েদের মধ্যে হিপি হবার প্রবণতা দেখা যেত। হিপিরা ছিল বাউণ্ডুলে। ঘরের বাঁধন ছেড়ে এরা পৃথিবীর চারপাশে বেরিয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন মাদক দ্রব্যে এদের আসক্তি পুলিশের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিল। কিন্তু হিপিরা উগ্র প্রকৃতির ছিল না। প্রাচুর্যের মধ্য থেকে ওরা হাঁপিয়ে উঠেছিল বলে বাউণ্ডুলে জীবনের সুখ খুঁজতে চেয়েছিল, এমন কেউ কেউ অনুমান করেন। ক্রমশ হিপিকালচারের দিকে ঝুঁকবার আকাঙ্ক্ষা কমে যেতে লাগল। এখন তো হিপি শব্দটা প্রায় ইতিহাস হতে চলেছে।
হিপিদের পরে এখন আমেরিকার কিশোরদের মধ্যে পাক্ হবার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। পাঙ্কদের প্রধান বক্তব্য হিপিদের চেয়ে উগ্র। ওরা পুরনো সংস্কার এবং রীতিনীতিকে ব্যঙ্গ করে প্রকাশ্যে। কোনও আইন বা নিয়মের ধার ধারে না। পাঙ্করা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে বটে, কিন্তু হিপিদের মতো পৃথিবী ঘুরে বেড়ায় না। এক-একটা শহরের সবচেয়ে কুখ্যাত রাস্তায় ওরা দল বেঁধে পড়ে থাকে। সাধারণত সানফ্রানসিসকো এবং ন্যুইয়র্ক শহরের মতো ঘনবসতি এলাকায় এদের সংখ্যা বাড়ছে। এদের দলে পনেরো থেকে পঁচিশ বছরের ছেলেমেয়ে রয়েছে। যে এলাকায় ওরা থাকে, সেই এলাকাটাকে বীভৎস করে তুলতে এদের জুড়ি নেই। তবে সব সময় ওরা সতর্ক থাকে, যাতে পুলিশের মুখোমুখি না পড়তে হয়। খুবই নির্দয় এবং পাষণ্ড টাইপের এইসব ছেলেমেয়ে পুলিশকে এড়িয়ে চলে। ফুটপাথে পা ছড়িয়ে বসে এরা পথচারীকে ব্যঙ্গ করে। বিশেষ করে সে যদি বিদেশি কিংবা অন্য শহরের মানুষ হয়। এরা চামড়ার জ্যাকেট পরতে ভালবাসে, মেয়েরা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত চামড়ার জুতো। মাথার চুল দু’ পাশ থেকে কামিয়ে শুধু মাঝখানে ইঞ্চি দুয়েক রেখে তাতে নানান উজ্জ্বল রঙ মাখিয়ে রাখে। খিদে পেলে ছিনতাই করতে এদের বাধে না। সামাজিক ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেবার জন্য এরা ওইরকম বীভৎস সাজে নিজেদের সাজায়। এটা এদের প্রতিবাদ।
এই দলে যে-সব ছেলেমেয়ে যোগ দিয়েছে তাদের অনেকের পরিবার বেশ ধনী। কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে স্বেচ্ছায় এই জীবনে এরা পা বাড়িয়েছে। তবে সংখ্যায় খুবই কম। কিন্তু এখনই এরা সরকারের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবরকম শুকনো মাদক এরা নেশা হিসেবে ব্যবহার করে। পাঙ্করা ইচ্ছে করেই ভাল কথা বলে না, কারণ তাতে পুরনো সংস্কারকে মর্যাদা জানানো হয়।
উপেন্দ্রনারায়ণের মেয়ে সীতা এই পাঙ্কদের দলে ভিড়ে গিয়েছিল। অনেক কষ্টে প্রায় জোর করে এবং গোপনে তাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন উপেন্দ্রনারায়ণ এই দেশে। মেয়েটির ভবিষ্যৎ যাতে নষ্ট না হয়, ভারতবর্ষের সামাজিক সম্পর্ক দেখে যদি ওর চৈতন্য জাগে, এই আশায় তিনি এদেশেই থেকে যাবেন ঠিক করেছিলেন। তাঁর আসাটা খুব আকস্মিক ছিল। তাই সম্পত্তির একটা ব্যবস্থা করার জন্য তাঁর স্ত্রী সে-দেশে থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু কালিম্পংয়ে আসার পর উপেন্দ্রনারায়ণ বুঝতে পেরেছিলেন পাঙ্কদের সম্পর্কে তিনি নির্ভুল ধারণা করতে পারেননি। সম্প্রদায়ভুক্ত কোনও পাকে ওরা সহজে ছেড়ে দেবে না। ফলে কালিম্পংয়ের পাহাড়ে তিনি বিশাল বাড়ি নিয়ে বাস করেও যখন বুঝলেন, পাঙ্কদের এড়িয়ে যেতে পারেননি, তখন বিষ্টবাবুর পরামর্শে অমলদার সাহায্য নিয়েছিলেন। সেই যাত্রা খুব জোর বেঁচে গিয়েছিল মেয়েটি। অবশ্য বেঁচে গিয়েছিল বলাটা ঠিক হবে না, কারণ মেয়েটি স্বেচ্ছায় পাঙ্কদের সঙ্গে চলে যেতে চেয়েছিল। অনেক কাণ্ড করে সেবার এই যাওয়া বন্ধ করেন অমলদা। সে ব্যাপারে অর্জুনেরও বড় ভূমিকা ছিল। পাক্ ছেলেটিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আদালতে পেশ করা যায় না। কারণ মেয়েটি বেঁকে দাঁড়াত। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলে যেতে গেলে বিদেশিদের বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। ছেলেটির সেটা না নেওয়া থাকায় তিন মাস জেলে থাকতে হয়েছিল। এবং শেষ পর্যন্ত সে ভারতবর্ষের বাইরে চলে যায়।
এরপরে বিষ্টু সাহেবের চিঠিতে অর্জুন জেনেছিল, উপেন্দ্রনারায়ণ কালিম্পংয়ের বাস তুলে পাঞ্জাবে চলে গিয়েছেন। কালিম্পংকে তাঁর নিরাপদ এলাকা বলে মনে হয়নি। পাঞ্জাবে তিনি বিশাল ডেয়ারি খুলেছেন। যতটা ব্যবসার জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটানোর জন্য। বিষ্টু সাহেব আরও জানিয়েছিলেন, মেয়েটির মধ্যে নাকি দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। খুব শান্ত হয়ে গিয়েছে সে।
অর্জুন তাকিয়ে দেখল বাগানে দাঁড়িয়ে বিষ্টুসাহেব উত্তেজিত গলায় কিছু বলছেন আর অমলদা নিঃশব্দে মাথা নাড়ছেন। শেষ পর্যন্ত বিষ্টুসাহেব রাগত ভঙ্গিতে বারান্দায় উঠে এলেন। “নাঃ, কেউ যখন বুঝবে না, তখন আমাকে একাই যেতে হবে। ঠিক আছে।”
কথাগুলো বলতে-বলতে ধপ করে চেয়ারে বসে রোগা খাটো মানুষটি অর্জুনের দিকে তাকালেন। তারপর ছোঁ মেরে টেলিগ্রামটা নিয়ে বললেন, “গাছ বড় করবেন! ও গাছ বড় হবে না। ওই মাটির জিনিস কি এই মাটিতে প্রাণ পায়? নো!”
আচমকা কথা শেষ করে বিষ্টুসাহেব অর্জুনের দিকে সরু চোখে তাকালেন, “ভাই অর্জুন! তুমি কি তোমার নামকরণ সার্থক করবে?”
“মানে?” অর্জুন হতভম্ব হয়ে তাকাল।
“সহজ ব্যাপার। তুমি কি আমার সঙ্গে চণ্ডীগড়ে যাবে?”
অর্জুনের খুব ইচ্ছে করছিল। কখনও সে উত্তরবাংলার বাইরে যায়নি। ছাড়া সেখানে যে রহস্য রয়েছে, সে তো রায়সাহেবের চিঠিতেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু অমলদা না বললে সে যায় কী করে। সত্যানুসন্ধানীর সহকারীর কি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত? সে বিষ্টুসাহেবকে সরাসরি না-ও বলতে পারল না। বলল, “অমলদা কী বলেন দেখি!”
“না না, তোমার অমলদাকে আমি বুঝতে পারি না। এত দক্ষ মানুষ শুধু আলসেমি করে জলপাইগুড়িতে রয়ে গেল। তোমাদের ব্যাপার জানার পর আমি প্রতিদিন একটা করে থ্রিলার উপন্যাস পড়ে যাচ্ছি। ওফ্! সেখানে গোয়েন্দারা কতরকম কাণ্ড করে জেমস বন্ড তো সমস্ত পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। আজ হংকং তো কাল বার্লিন। তোমার অমলদার তো জলপাইগুড়ি থেকে নড়তেই ইচ্ছে করে না। বড়জোর ওই কালিম্পং। না না, অর্জুন, আমি হতাশ, কমপ্লিটলি হতাশ। ঠিক আছে।”
এই সময় অমল সোম আবার ঘরে ফিরে এলেন। এসে বললেন, “যাই বলুন, এবার ঠাণ্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে।”
কথাটা বিষ্টুসাহেবের মোটেই পছন্দ হল না। তিনি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। ওঁর ভাবসাব দেখে অর্জুনের মজাও লাগছিল, আবার কষ্টও হচ্ছিল। এই রোগা বেটেখাঁটো বৃদ্ধের মধ্যে অদ্ভুত সারল্য আছে।
অমলদা বললেন, “বিষ্টুসাহেব, হয়তো আপনার কথাই ঠিক। প্রত্যেক গাছের নিজস্ব মাটি থাকে, পরিচিত আবহাওয়া থাকে। সেখানেই সে স্বাভাবিকভাবে বড় হয়। অপরিচিত মাটি এবং পরিবেশ তাকে পঙ্গু করে দেয়। তাই আমার গাছটা বড় হচ্ছে না। কিন্তু ওটা তো মরেও যাচ্ছে না। কেন? সেটাই আমার প্রশ্ন।”
বিষ্টুসাহেব মুখ অন্য দিকে ফিরিয়েই বললেন, “এ বিষয়ে আমি আপনাকে এক ঘণ্টা ধরে বোঝাতে পারি। কিন্তু এখন সেই মেজাজ নেই। ঠিক আছে?”
কথাটা যেন কানেই তুললেন না অমলদা। বললেন, “একটা কথা বোঝা যাচ্ছে, গাছটা মরতে চাইছে না। প্রতিকূল পরিবেশেও সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আপনার টিকিট কোন ট্রেনের?”
“টিকিট?” হতভম্ব হয়ে মুখ ফেরালেন বিষ্টুসাহেব, “টিকিট মানে?”
“একটু আগে যে বললেন তিনটে টিকিট কিনে এনেছেন?”
“ও, হ্যাঁ। তা তাতে আর কী প্রয়োজন আপনার?”
“প্রয়োজন কিছু ছিল না। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে যে লড়াই করে, তাকে অবশ্যই সাহায্য করা উচিত। এই যেমন আমি আমার গাছটাকে সার দিয়ে যাচ্ছি।”
বিষ্টুসাহেবের দুটো চোখ পিটপিটিয়ে উঠল, “ঠিক বোধগম্য হল না।”
হাত বাড়িয়ে টেলিগ্রামটা তুলে নিলেন অমল সোম, “এই লাইনটার কথা ভাবছিলাম। ‘মনে হচ্ছে এবার অ্যাবডাক্ট করা হয়েছে।’ যে মেয়ে আমেরিকায় জন্মাল, বড় হল, তার তো ভারতবর্ষে মন টিকবে না। সে পাঙ্ক কিংবা যাই হোক না কেন, তাতে আমার কিছুই এসে যায় না। কিন্তু এখানে আসার পর দেশের হাওয়ায় যদি না ওর মন পাল্টায়, তা হলে অ্যাবডাক্ট করা হবে কেন? অ্যাবডাক্ট মানে তো জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া। তার মানে মেয়েটির মন এই ধরে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে। আমার গাছটা ধরুন এই মাটি আর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বড় হতে চায়, কিন্তু কিছু পোকা যদি তার সেই ইচ্ছেটাকে মেরে ফেলতে আসে, তা হলে আমি অবশ্যই প্রতিরোধ করব। এই অ্যাবডাক্ট শব্দটা আমাকে…” এই অবধি একটানা বলে হঠাৎ চোখ বন্ধ করলেন অমল সোম। কথাগুলো যতটা না বিষ্টুসাহেবকে বলা, তার অনেক বেশি নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করা।
বিষ্টুসাহেব উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে গিয়ে সামলে নিলেন। তারপর নিজেকে প্রাণপণে নিরাসক্ত রাখার চেষ্টা করতে-করতে বললেন, “অর্জুন, প্রচুর পরিমাণে গরম জামাকাপড় নিও। শুনলে তো খুব শীত পড়ে ওখানে। ঠিক আছে?”
অমল সোম বললেন, “চলো অর্জুন, ভারতবর্ষের ও পাশটা ঘুরে আসা যাক। পাঞ্জাবে এখনও টাটকা দুধ আর মিল্ক-কেক পাওয়া যায়।”
