লাইটার – ২

॥ দুই ॥

সাইকেল-রিকশা জলপাইগুড়িতে সন্ধে সাতটার পর পাওয়া যায় না। তাছাড়া তিস্তা নদীর ধারে এই হাকিমপাড়াটা শহরের একধারে বলে এদিকে আসতেই চায় না। পথে বেরিয়ে অর্জুন খুব উত্তেজিত হয়ে হাঁটছিল। ব্যাপারটা স্রেফ কাকতালীয় হতে পারে। আজই অমলদার চিঠিতে সে জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানির কথা জানতে পারল। আবার ওই আগন্তুক যে লাইটার ফেলে গেছেন তাও জোন্স অ্যন্ড জোন্স কোম্পানির। অথচ অমলদা লিখেছেন, এটা এদেশে পাওয়া যায় না! পি. ডব্লু. ডি. অফিসের সামনে দিয়ে বাঁক নিয়ে করলা ব্রিজ পেরিয়ে সে বাবুপাড়ায় চলে এল। রাস্তায় মিউনিসিপ্যালিটির আলো জ্বলছে কি জ্বলছে না বোঝা দায়।

ডান দিকের রাস্তায় ঢুকে তিন নম্বর বাড়ির দরজায় শব্দ করল সে। ভেতর থেকে শুদ্ধ বাংলায় প্রশ্ন ভেসে এল, “পরিচয়?”

“আমি অর্জুন।”

দরজা খুললেন বৃদ্ধ। আশির কাছে বয়স। মাথায় শণের মতো চুল। খুব রোগা। শীত-গ্রীষ্ম একটা গলাবন্ধ গেঞ্জি পরে থাকেন। হাসলেন তিনি, “কী সংবাদ তৃতীয় পাণ্ডব? তিনি কি ফিরেছেন?”

অর্জুন ভেতরে ঢুকল, “না। চিঠি দিয়েছেন, কবে ফিরবেন জানাননি। এই বাড়িতে মোট পাঁচটি ঘর। যার সাড়ে চারটিতে বইপত্র ঠাসা। সিগারেট খেলে ক্যানসার হয়, এই তথ্য অর্ধেক বিশ্বাস করেন সুধাময় সান্যাল। অর্ধেক কেন, প্রশ্ন করলে বলেন, “বইপত্র কাগজ দেখে অর্ধেক মনে হয়। বেশি স্মোক করলে গলায় লাগে, বাঁ দিকটা চিনচিন করে। কিন্তু যতক্ষণ ডাক্তার না বলছে, ততক্ষণ এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যাব। আমার ক্যানসার হলে জলপাইগুড়ির কোনও মানুষ আর সিগারেট খাবে না।”

সুধাময় সান্যালের কাছে পৃথিবীর সব দেশের সিগারেট, পাইপ, তামাক এবং লাইটার আছে। দেশলাইয়ের বাক্স যে কত রকমের হয় না দেখলে ভাবাই যাবে না। ইদানীং উনি হাতে-পাকানো নেপালি সিগারেট খেতে ভালবাসছেন।

বেতের চেয়ারে বসে সুধাময় সান্যাল জিজ্ঞেস করলেন, “চাকরি পেলে না?”

মাথা নেড়ে হাসল অর্জুন, “পাব-পাব করছি। আপনার কাছে একটা দরকারে এসেছি।”

“দরকার হাড়া কেউ আসে না। আমি নাকি ক্যাটকেটে কথা বলি। বলে ফেলো!”

“জোন্স অ্যান্ড জোন্স বলে কোনও লাইটার কোম্পানির নাম আপনি শুনেছেন?”

সুধাময় সান্যাল অবাক হয়ে তাকালেন, “এ নাম তুমি জানলে কী করে হে?”

“অমলদার চিঠিতে প্ৰথম জানি।”

“ও।”

অমলদাকে তো আমিই বলেছিলাম। অদ্ভুত লাইটার বটে। আমেরিকানদের লেটেস্ট আবিষ্কার। ‘টোব্যাকো’ বলে একটা জার্নালে পড়েছিলাম। এমনিতে লাইটারটা লক্ করা থাকে। লক্ খুলে বোতাম টিপলে আগুন দেখতে পাবে না। কাছাকাছি সিগারেট নিয়ে গেলে ওটা ধরে যাবে। রাত্রে লাইটার জ্বাললে আলো দেখে কেউ যাতে বিরক্ত না হয় তাই এই ব্যবস্থা। অদৃশ্য আগুন বলতে পারো। এক নম্বর বোতাম অফ করে দু’ নম্বরটা টিপলে লাইটারটা হয়ে যায় অস্ত্র। দশ ফুট যেতে পারে এমন একটা রে বের হয়, যা একটা হাতিকেও পাঁচ মিনিট অবশ করে রাখতে পারে। এই রে চোখে দেখা যায় না। আমেরিকান গভর্নমেন্ট লাইটারটাকে বাজারে ছাড়তে চায়নি। এখন শুনছি পরিচয়পত্র দেখিয়ে কিনতে হচ্ছে। আমার সংগ্রহে ওই বস্তুটি নেই। তোমার দাদাকে বলেছিলাম, যদি সম্ভব হয় ব্যবস্থা করতে। তিনি অবশ্য বলেছেন যে, তাঁর এক বন্ধু কথা দিয়েছেন আমেরিকা থেকে আনিয়ে দেবেন। দেখা যাক। এদেশের মানুষ ওটা চোখেই দ্যাখেনি।” নেপালি সিগারেট ধরালেন তেকোনা দেশলাই কাঠি জ্বেলে। ধরিয়ে বললেন, “এটা সিঙ্গাপুর থেকে আনানো।”

কথাগুলো শুনতে শুনতে অর্জুন অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল। তার হঠাৎ মনে হল, সুধাময় সান্যালকে বললে তিনি লাইটারটি নিয়ে নেবেন। অবশ্য তার পকেটে যে লাইটার রয়েছে সেটি এইরকম কাজ করবে কি না তা সে জানে না। কিন্তু দুর্লভ জিনিস যাঁরা সংগ্রহ করেন তাঁর একটু পাগলাটে মানুষ হন। এমন গল্পও সে পড়েছে, একটা দুর্লভ বই সংগ্রহের জন্যে মানুষ খুন করতে বাধেনি সংগ্রাহকের। জোন্স অ্যান্ড জোন্সের লাইটারটা তার কাছে, জানলে সুধাময় সান্যাল কিছুতেই ছাড়বেন না। অথচ বিকেলের আগন্তুক নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন খেয়াল হলেই। তখন কী জবাবদিহি দেবে সে? উত্তেজনা চেপে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “জলপাইগুড়িতে ওই লাইটারের কথা আর কেউ জানে বলে মনে হয়?”

চোখে চোখ রাখলেন সুধাময় সান্যাল, “কী ব্যাপার বল তো?”

“কোনও ব্যাপার নয়। যা বর্ণনা শুনলাম তাতে কৌতূহল হচ্ছে।”

“অ,” একটু সহজ হলেন সুধাময় সান্যাল, “তোমাকে স্নেহ করি। তাই বলা যেতে পারে। তুমি রায়দের নাম জানো? ওই যাদের পরিবারের মানুষরা আমেরিকায় থাকত। শিল্পসমিতিপাড়ায় বাড়ি। ওই বাড়ির ছোট ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর নাম আমি জানি কি না। তোমার মুখেও একই কথা শুনে প্রথমে অবাক হয়েছিলাম।”

“ভদ্রলোকের নাম কী?”

“হরিপ্রসাদ রায়। সে আমাকে ওই লাইটার দেখাল। আমি লক্ খুলে বোতাম টিপলাম। কোনও ফ্লেম বের হল না কিন্তু সিগারেট ধরল। দ্বিতীয় বোতাম টিপতে রে বের হল না। বদলে অদৃশ্য আগুন দৃশ্যমান হল। ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। লাইটারটা জাল। দ্বিতীয় বোতাম টেপার পর যের বের হয় বলে ওটা আজ মূল্যবান। টোব্যাকোতে পড়েছি, হংকং থেকে জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর নকল মাল বের হচ্ছে। কথাটা বলায় হরিপ্রসাদ খুব দুঃখিত হল। সে ওটা আমাকে দিতে চেয়েছিল, নিইনি। আসল ছেড়ে কে নকলে হাত দেয়!”

মিনিট-পাঁচেক এটা-সেটা বলে অর্জুন উঠে পড়ল। দ্রুত হেঁটে চলে এল করলা নদীর ধারে। এই জায়গাটা সন্ধের পরই অত্যন্ত নির্জন হয়ে যায়। পকেট থেকে লাইটারটা বের করে সে চোখের সামনে ধরল। ওপরটা সমান, কোনও গর্ত নেই। পাশে দুটো মসৃণ বোতাম আছে। ইংরেজিতে তাদের ওপর এক এবং দুই লেখা। ঠিক উলটো দিকে একটা চৌকো পাতের ওপর লক্ শব্দটা খোদাই করা। সন্তর্পণে সেটায় চাপ দিতে কুট্ করে শব্দ হল।

অর্জুন ইদানীং সিগারেট খাচ্ছে। দিনে চারটে। তার বেশি খাওয়ার ইচ্ছে হয় না, পয়সাও নেই। সে এখনও দাড়ি কামায়নি। গালে রবীন্দ্রনাথের তরুণ বয়সের মতো সুন্দর দাড়ি বেরিয়েছে। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে সে এক নম্বর বোতামটা টিপল। তারপর ধীরে সিগারেটের ডগাটা লক্ টেপার ফলে বের হওয়া একটা পেরেকের মাপে সরু গর্তের কাছে নিয়ে এসে টানতেই ধোঁয়া বের হল। সঙ্গে-সঙ্গে এক নম্বর বোতামটা দ্বিতীয়বার টিপে ওটাকে নিষ্ক্রিয় করল সে। সিগারেটে তার মন ছিল না। হাত কাঁপছিল। বুকের মধ্যে যেন ড্রাম বাজছে। এই আপাত-নিরীহ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্রটি হয়তো ভারতবর্ষে কারও কাছে নেই।

দ্বিতীয় বোতামটি পরীক্ষা করার জন্যে চারপাশে তাকাল। কোনও মানুষের ওপর প্রয়োগ করা যাবে না। সে চুপচাপ হাঁটতে লাগল। থানার একটু আগে সে রাস্তার পাশে ঘাসে বসে জাবর কাটতে দেখল একটা ষাঁড়কে। সেই সময় দু’জন লোক গল্প করতে করতে এদিকে আসছিল। অর্জুন উলটো দিকে মুখ ফিরিয়ে ওদের যেতে দিল। তারপর ষাঁড়টার পাঁচ ফুটের মধ্যে চলে এল। একটু বিরক্ত হয়ে গা-ঝাড়া দিয়ে ষাঁড়টা উঠে দাঁড়াল। সুধাময় সান্যালের কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে ও মারা যাবে না। খানিকক্ষণ শরীরটা অবশ হয়ে যাবে মাত্র। কিন্তু যদি মরে যায়? অন্য কোনও প্রাণী, ইঁদুর, কাকের ওপর পরীক্ষা করলে হত না! কিন্তু আজ রাত্রে তাদের কোথায় পাওয়া যাবে! আর দ্বিধা না করে অর্জুন দ্বিতীয় বোতামটা টিপল সঠিক লক্ষ করে। ষাঁড়টা দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর স্বচ্ছন্দে হাঁটতে লাগল। বিব্রত অর্জুন দ্বিতীয়বার দ্বিতীয়

বোতাম টিপতেই ছোট্ট আগুনটা দৃশ্যমান হল। যে-কোনও সাধারণ লাইটার জ্বালালে যেরকম আগুন বের হয়। লক্ করে লাইটার হাতে নিয়ে ঠোঁট কামড়াল অর্জুন। তার শরীর আচমকা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। বিকেলের অতিথির ফেলে যাওয়া লাইটারটাও জাল? তার কষ্ট হচ্ছিল।