।। ছয়।।
ট্যাক্সিটা কখন এসে দাঁড়িয়েছিল টের পায়নি অর্জুন। বিজ্ঞাপন তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। মাত্র দুটো ভাল লাইটার বাজারে ছাড়া আছে। এফ. বি. আই. নিশ্চয়ই চাইছে না সেগুলো সাধারণ মানুষের হাতে থাক। কিন্তু যারা ওই দুটো রেখেছে তারা কি সাধারণ মানুষের পর্যায়ে পড়ে? এফ. বি. আই. খুঁজে পায়নি বলেই জোন্স অ্যান্ড জোন্স এই বিজ্ঞাপন ছেপেছে। কিন্তু হঠাৎ ডুয়ার্সের এই অঞ্চলে লাইটারগুলো আসতে যাবে কেন? অর্জুনের মনে হল, অমলদা থাকলে ব্যাপারটার একটা সুরাহা হয়ে যেত সহজে। দুটো খুন হল, অথচ কে খুনি, তার উদ্দেশ্য কী, তা-ই ধরতে পারল না সে এখন পর্যন্ত।
এই সময় হাবু এসে সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ইশারায় উঠতে বলল। হাবু যা বলে অমলদা তা স্পষ্ট বুঝতে পারেন। অমলদা বলেন, হাবুর ইশারায় রহস্য নেই। যে মন দিয়ে বুঝতে চায় তার কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়। অনেক চেষ্টা করেছে অর্জুন। হাবু বোধগ্রস্ত হলেও মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়। এই মুহূর্তে কিন্তু অর্জুন বুঝতে পারল।
ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই লোকটাকে দেখতে পেল। জিনসের প্যান্ট, চেক জ্যাকেট পরে যে লোকটা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার শুধু গায়ের চামড়াই নয়, ভাবভঙ্গিও বলে দিচ্ছে, বিদেশি। চোখাচোখি হতে লোকটা হাসল। বছর তিরিশের মধ্যে বয়স। বেশ নাদুসনুদুস চেহারা। মাথায় চুল অল্প।
বারান্দা থেকে নেমে অর্জুন বাগানের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেল কাছে। সঙ্গে-সঙ্গে লোকটা বলল, “হাই! আমল সোম ইজ দেয়ার?”
অমলদার নামটার এমন হাল দেখে অর্জুন অনেক কষ্টে হাসি চাপল। তারপর গম্ভীর মুখে বলল, “নো। হি ইজ আউট অব দ্য টাউন।”
এখনও ইংরেজি বলতে গেলে তাকে ভাবতে হয়। আগে তো মনে-মনে বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বলতে চেষ্টা করত। এখন ঠিকঠাক শব্দ সময়মতো মাথায় আসতে চায় না কিছুতেই। লোকটার হতাশ প্রতিক্রিয়া সহজেই ধরা পড়ল। নিজের মনেই বলল, “মাই গড! হোয়াট শ্যাল আই ডু নাউ। মে আই আস্ক ইওর গুড নেম প্লিজ?”
“আমি অর্জুন। অমল সোমের সহকারী হিসেবে কাজ করছি। আপনার নাম জানতে পারি?”
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমি জেমস, জেমস ব্রাউন। রয় আমাকে বলেছিল, যদি তার কিছু হয় আমি যেন মিস্টার সোমের সঙ্গে দেখা করি।”
“কে রয়?” অর্জুন যাচাই করতে চাইল।
“এস. এন. রায়। উনি কি গতকাল এখানে আসেননি?”
অর্জুন বলল, “আপনি ভেতরে আসুন।” এই সময় ট্যাক্সিওয়ালা বলল, “আমাকে এবার ছেড়ে দিন সাহেব। অনেকক্ষণ থেকে টাউনে এই ঠিকানা খুঁজতে ঘুরছি। পুরো নাম বলতে পারেন না ইনি। শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে সব জেনে এলেন। আমাকে এখনই শিলিগুড়িতে ফিরে যেতে হবে।”
অর্জুন ইংরেজিতে জেমস ব্রাউনকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আবার শিলিগুড়িতে ফিরে যেতে চাইছেন? এই ট্যাক্সিওয়ালা দাঁড়াতে চাইছে না।”
জেমস বলল, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমার আজকে এখানেই থাকা দরকার।” কথাটা শেষ করে জেমস পেছনের দরজা খুলে তার লাগেজ নামিয়ে নিয়ে ট্যাক্সিওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে দিল। লোকটার মানিব্যাগে প্রচুর টাকা দেখতে পেল অর্জুন। ট্যাক্সিওয়ালা গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেলে সে জেমসকে নিয়ে ঘরে ফিরে এল। হাবুকে ডেকে দু’কাপ চা করতে বলে আরাম করে বসল সে, জেমসের মুখোমুখি। রহস্যটা বেশ জম্পেশ হচ্ছে। এই প্রথম নিজেকে বেশ স্বনির্ভর সত্যসন্ধানী বলে মনে হচ্ছে তার। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “এস. এন. রায়ের সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক? আর আপনি এখানে আসছেনই বা কোত্থেকে?”
জেমস এতক্ষণ অর্জুনকে দেখছিল। এবার ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, “আমি কী করে বুঝব তুমি মিস্টার সোমের সহকারী?”
অর্জুন হেসে ফেলল। তারপরেই মনে হল, সত্যি তো, সমস্ত চেনা মানুষের কাছে তার যে পরিচয়টা জানা, তা অচেনা লোকের কাছে অস্পষ্টই তো হবে। কিন্তু কী দিয়ে প্রমাণ করা যায়? ওপাশের ঘরে একটা অ্যালবামে অমল সোম আর তার ছবি আছে। কিন্তু তা থেকে কী প্রমাণ হয়? তা ছাড়া এই লোকটা তো অমল সোমকেই চেনে না। সে বলল, “আমি আপনাকে এই মুহূর্তে কোনও প্রমাণ দিতে পারব না’। কিন্তু এই শহরের যে-কোনও মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।”
অর্জুনের উত্তর শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল জেমস। তার চোখ মাটির দিকে। মনে হল সে কিছু ভাবছে। তারপরে সে মুখ তুলে ফের অর্জুনের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, “অমল সোম কবে ফিরবেন?”
“জানি না। উনি শেষ যে চিঠিটা দিয়েছেন তাতে কিছু জানাননি। বলতে-বলতে অর্জুনের চিঠিটার কথা খেয়াল হল। সে উঠে টেবিল থেকে চিঠিটা নিয়ে জেমসের হাতে দিল। যদিও বাংলায় লেখা কিন্তু ইংরেজিতে অর্জুনের নাম আর এই বাড়ির ঠিকানা এবং পেছনে শুধু অমল সোম লেখা রয়েছে। সেটা পড়ে যেন জেমসের একটু স্বস্তি হল। অর্জুন এবার জিজ্ঞেস করল, “অমল সোমের খবর আপনি পেলেন কোত্থেকে?”
“বললাম তো, রয় আমাকে বলেছিল। রয়ের এক আত্মীয় নিউইয়র্কে থাকেন। তাঁর কাছে সে শুনেছিল মিঃ সোম নাকি খুব বুদ্ধিমান ডিটেকটিভ। নর্থবেঙ্গলে কোনও ব্যাপার ঘটলে তিনি সাহায্য করতে পারেন। আমাদের যখন কাঠমাণ্ডু থেকে দিল্লি হয়ে বাগডোগরায় আসা প্রয়োজন হল তখন রয় ঠিক করল ওঁর কাছে আসবে। আমি শিলিগুড়িতে থেকে গিয়েছিলাম। কথা ছিল, আজ সকাল সে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। কোনও খবর না পেয়ে এখানে এসে জানলাম হি ইজ ডেড।”
“আপনি কি জোন্স অ্যন্ড জোন্স কোম্পানি থেকে আসছেন?”
প্রশ্নটা শোনামাত্র সোজা হয়ে বসল জেমস, ওর মুখে অদ্ভুত অভিব্যক্তি ফুটল, “হাউ ডু য়ু নো?”
অর্জুন বলল, “শোনো জেমস। আমি গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত অনেক কিছু জেনে গেছি। কিন্তু আমিও তো জানি না তুমি কে? সুতরাং তোমাকে কিছু বলার নেই।”
এই সময় একটা জিপ এসে দাঁড়াল বাইরে। গেট খুলে সহদেব বকসি ভেতরে ঢুকলেন।
অর্জুন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আসুন সহদেবদা!”
সহদেব বকসি জেমসের দিকে তাকালেন। জেমস তাঁকে বলল, “হা-ই।” সহদেব বললেন, “যাক, তা হলে সাহেব এখানে পৌঁছে গেছে। ব্যাপারটা একটু গোলমেলে মনে হচ্ছে এখন। সত্যেন্দ্রনাথ আত্মহত্যা করা মাত্র ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের লোক পৌঁছে গেল জলপাইগুড়িতে। ওকে বললাম, অমলবাবু শহরে নেই, তবু বিশ্বাস করল না। কী বলে এ?”
অর্জুন বলল, “এখনও কিছু বলেনি। আসলে আমি যে অমলদার সহকারী তা বিশ্বাস করতে পারছে না এখনও।”
সহদেব বকসি এবার ইংরেজিতে জেমসকে বললেন, “অর্জুন খুব ব্রাইট ছেলে। অমল সোমকে ও সাহায্য করে। কিন্তু তোমাদের ব্যাপারে ওর কী করণীয় আছে বুঝতে পারছি না।”
তারপর অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ, যে জন্য তোমার কাছে এলাম। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়া গেছে। রায়বাবুর ছেলের হার্ট অ্যাটাক হয়নি। কারণ তার কোনও নিদর্শন ডাক্তার পায়নি। তা হলে ভদ্রলোক অমন করলেন কেন, বোঝা যাচ্ছে না। আর তুমি কী পোড়া-গদাইকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলে?”
সে সময় আমি যা তুমি আমাকে যখন হুঁশ আসে, অর্জুন অবাক হয়ে বলল, “হাঁ। কেন, কী হয়েছে?”
“পোড়া-গদাই থানায় এসে বসে ছিল আমার জন্য। হাসপাতালে ছিলাম। সে বলছে, তার সঙ্গে একটা ব্যাগ ছিল, পৌঁছে দিতে বলেছিলে। হঠাৎ তার শরীর অবশ হয়ে যায়। তখন ব্যাগটাকে খুঁজে পায় না। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিল বলে পড়ে যায়নি। পুরো ব্যাপারটাই বানানো মনে হচ্ছে। ওর শরীর অবশ হয়ে গেল আর ব্যাগটা কেউ নিয়ে গেল! ইয়ার্কি আর কি! আমি ওকে থানায় আটকে রেখেছি। ওর বন্ধু কাটা-গদাইকেও ছাড়িনি। কী ব্যাপার বল তো?”
অর্জুনের নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হল। পোড়া-গদাইকে থানার মধ্যে কে অবশ করে রাখবে? একটা লোক কখনও নিঃসাড়ে বসে থাকতে পারে? তা হলে কি জলপাইগুড়ির থানার মধ্যে সে স্বচ্ছন্দে ঢুকতে পারে, যার কাছে আসল লাইটার আছে! লোকটা কে? পোড়া-গদাইয়ের দিকে তাক করে দ্বিতীয় বোতাম টিপলে সে মরে গেল না, শুধু অবশ হয়ে বসে রইল! লোকটা জানলই বা কী করে পোড়া-গদাই জাল লাইটার-বোঝাই স্যুটকেসটা নিয়ে থানায় এসেছে! লোকটা যদি নাই চায় জাল লাইটারের কথা পাবলিক জানুক, তা হলে রায়বাবুর ছেলেকে কেন উপহার দিতে গেল। অবশ্য রায়বাবুর ছেলের সহযাত্রী আর এই লোকটি যদি আলাদা না হয়।
সহদেব বকসি জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল? কী ভাবছ?”
অর্জুন চট করে সিদ্ধান্ত নিল না, এখনই সহদেব বকসিকে লাইটারের কথা বলা উচিত হবে না। ব্যাপারটা উনি বিশ্বাসই করবেন না। সে বলল, “ওই স্যুটকেসটা কার বোঝা যাচ্ছিল না বলে পোড়া-গদাইয়ের হাত দিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলাম।”
“কার বোঝা যাচ্ছিল না মানে? পেলে কোথায়?”
“পোড়া-গদাই এনেছিল। ওর কোনও বন্ধু বোধহয় চুরিচামারি করে।”
‘চোরাই মাল। কিন্তু থানায় এসে কে নিয়ে যাবে সেটা?”
“যার মাল সে।”
“বুঝলাম। এটা আবার কাউকে বলে বোসো না, থানা থেকেও চুরি যায়। কিন্তু ওই অবশ হওয়ার গল্প। নিজেই সরিয়ে গল্প ফাঁদেনি তো?”
“না, না। তা হলে থানাতেই নিয়ে যেত না। হয়তো মাথা ঘুরে গেছে কোনও কারণে আর সেই ফাঁকে কেউ নিয়ে গেছে ওটা। আপনি বরং ওদের ছেড়েই দিন।
‘ছেড়ে দেব বলছ? ওরা সিনেমায় টিকিট ব্ল্যাক করে। “সেটা তো শহরের সবাই জানে।”
“আচ্ছা চলি। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা জানার পর মেজাজ খিঁচড়ে আছে। ওটা যদি অন্য কিছু হয় তো আমার দফা রফা হয়ে যাবে।” সহদেব বকসি জেমস ব্রাউনকে জানান, যদি তাঁর দ্বারা কোনও উপকার হয় তা হলে তিনি সবসময় করতে রাজি আছেন। আপাতত তাঁর থানায় জরুরি কাজ আছে বলে চলে যেতে হচ্ছে।
সহদেব বকসি চলে গেলে জেমস এবার নীরবতা ভাঙল, “জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর নাম তুমি জানলে কী করে? ইন্ডিয়াতে তো কারোর জানার কথা নয়!”
এই সময় হাবু এসে দুই পেয়ালা চা দিয়ে গেল। জেমসের যেন তার খুব প্রয়োজন ছিল। অর্জুন পকেট থেকে জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর লাইটারটা বের করে জেমসের হাতে দিল। তার পকেটে তখনও দ্বিতীয় লাইটারটা রয়েছে। সেটার কথা সে ইচ্ছে করেই জানাল না।
খুব অবাক হয়ে গেল জেমস, “মাই গড! তুমি এটাকে কোত্থেকে পেলে?”
সে দ্রুত লক্ খুলে প্রথম ও দ্বিতীয় বোতাম টিপে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অর্জুন সেটা লক্ষ করে বলল, “তোমার পকেটেও নিশ্চয়ই একটা রয়েছে?”
জেমস নীরবে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। অর্জুন তখন উঠে সদ্য-আসা পত্রিকার পাতা খুলে বিজ্ঞাপনটা জেমসের সামনে ধরল। তৎপর চোখে বিজ্ঞাপনটা পড়ল জেমস। অর্জুন বলল, “এটা এস. এন. রায়ের লাইটার। উনি গতকাল এখানে এসেছিলেন। যাওয়ার সময় ভুল করে ফেলে গিয়েছিলেন।”
“আই. সি,” বলে জেমস ব্রাউন চোখ বন্ধ করল। তারপর বলল, “তুমি যদি কিছু মনে না করো, তা হলে আমাকে বলবে, ঠিক কী কী জানো এবং কেমন করে জানো?”
অর্জুন বলল, “আমি তোমাকে কী করে বিশ্বাস করব?”
জেমস চটপট ওর পরিচয়পত্র বের করে দেখাল। সেখানে তার ছবিও আছে। অর্জুন তবু বলল, “এটাও যে জাল নয় তা বুঝব কী করে?”
জেমস চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “কী প্রমাণ চাও?”
অর্জুন এবার হাসল, “জেমস, আমি কিছুটা আন্দাজ করেছি, কিন্তু মিলিয়ে নিতে চাই। তুমি আর এস. এন. রায় কী উদ্দেশ্য নিয়ে আমেরিকা থেকে কাঠমণ্ডুতে এসেছিলে?
জেমস ব্রাউন অবাক হয়ে গেল। সে বলল, “তোমার বয়স দেখে আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। আমি বুঝতে পারছি তুমি কিছু তথ্য জেনে গেছ। গতকাল রয় এখানে না আসার ব্যাপারে তো তোমার কোনও জ্ঞান হওয়া সম্ভব ছিল না। রয় বলেছিল, অমল সোমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তিনি নেই। তুমি তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট। ঠিক আছে, আমি তোমাকে বিশ্বাস করছি। কিন্তু এই ‘ঘরে কথা বলা কি নিরাপদ?”
অর্জুন মাথা নাড়ল, “এই ঘরের ধারেকাছে কেউ এলে সে হাবুর চোখে পড়বেই। ও কথা বলতে পারে না বলেই বোধহয় অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলো খুব সজাগ। তুমি শুরু কর।”
জেমস ব্রাউন শুরু করল, “এস. এন. রায় জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী। জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর তৈরি লাইটার সম্পর্কে তুমি কি….”
“আমি সব জানি। যারা জাল লাইটার তৈরি করেছে তারা সব পেরেছে শুধু রে তৈরি করতে পারেনি।
“মাই গড। ভারতীয় তরুণরা এত বুদ্ধিমান হয় আমার জানা ছিল না। হ্যাঁ, যারা ওই লাইটার জাল করছে তারা সেকেন্ড বোতামটা টিপে রে বের করার কৌশলটা আয়ত্ত করতে পারেনি। কিন্তু তাতেই কোম্পানির যা ক্ষতি হবার হয়ে যাচ্ছে। জোন্স অ্যান্ড জোন্স ফেডারেল ব্যুরোকে সাপ্লাই দিত। বাজারে যা ছেড়েছিল লাইসেন্সের বদলে তা তুলে নিয়েছিল সরকারের আপত্তিতে। শুধু দু’জন জানিয়েছিল তারা লাইটার হারিয়ে ফেলেছে। আমরা দেখেছি লোক দুটোর মিথ্যে বলার কোনও কারণ নেই। কিন্তু ওই দুটো লাইটার বাজারে এমন লোকের হাতে গিয়েছে যা শুধু অপরাধীদের হাত শক্ত করবে না, এফ. বি. আই.-কে পর্যন্ত বিভ্রান্ত করছে। প্রতিটি লাইটার পরীক্ষা না করে আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না, ওটা ঠিক না জাল।
জোন্স অ্যান্ড জোন্স এবং এফ. বি. আই. যুক্তভাবে ওই লাইটার দুটো উদ্ধার করতে চায়। এই মুহূর্তে কয়েকটা দল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দুটো আসল লাইটার খুঁজে যাচ্ছে। মোটামুটি স্থির সিদ্ধান্তে এসেছিলাম। হংকং, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, থাইল্যান্ড অঞ্চলে জাল লাইটার তৈরি হচ্ছে। এবং আমাদের বিশ্বাস করার পেছনে যুক্তি আছে যে জাল লাইটার যারা তৈরি করছে তাদের কাছেই আসলটি রয়েছে।
দিন বারো আগে আমাদের কাছে খবর এল, সন্দেহভাজনদের একজনকে কাঠমাণ্ডুতে দেখা গেছে। তারা চাইছে ভারতবর্ষের এই অঞ্চলে লাইটারগুলোর ব্যবসায়িক এলাকা বিস্তৃত করতে। আমরা ভারত সরকারকে ব্যাপারটা জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের হাতে হঠাৎ একটি লাইটার এল। ওগুলো দেখতে অবিকল জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর তৈরি পাইটারের মতো। প্রথম বোতাম টিপলে ফ্লেম দেখা যায় না কিন্তু সিগারেট ধরানো যায়। কিন্তু সেই সঙ্গে শুরু হয়ে যায় চার্জ। দশ সেকেন্ডের মধ্যে দ্বিতীয় বোতাম টিপে ছুঁড়ে দিলে একটা শক্তিশালী গ্রেনেডের চেয়ে বেশি কাজ করে। ওরা রে আবিষ্কার করেনি, কিন্তু লুকানো গ্রেনেড আবিষ্কার করে ফেলেছে। বুঝতেই পারছ, এই লাইটারগুলি তাদের কাছে কতখানি মূল্যবান, যারা ওটা ব্যবহার করতে চায়। হোয়াইট হাউসে বেড়াতে গিয়ে সিগারেট ধরাবার নাম করে কেউ যদি ওটা ব্যবহার করে, তা হলে যা হবে কল্পনা করতে চাই না আমরা। সিঙ্গাপুরে যে-লোকটি ধরা পড়েছে সে আমাদের জানিয়েছিল, ওরা তরাই অঞ্চলটাকে ঘাঁটি করতে চায়। এখান থেকে ইন্ডিয়ার বিভিন্ন প্রভিন্স, বাংলাদেশ এবং নেপাল, ভুটানকে বাজার তৈরি করবে। লোকটার কথা বিশ্বাস করার কারণ আছে, পরদিনই পুলিশের হেফাজতে লোকটি মারা যায়। তার হৃৎপিণ্ড শুধু অচল হয়ে গিয়েছিল। আমরা বিশ্বাস করি, ওটা জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর আসল লাইটার ব্যবহার করে করা হয়েছিল। এনি ওয়ে, উই ওয়ান্ট টু স্টপ দিস! আমরা যখন এই অঞ্চলের ম্যাপটা স্টাডি করছিলাম, তখন লক্ষ করলাম, ইন্ডিয়ান পুলিশ দীর্ঘ এলাকাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। এই সময় রয় অমল সোমের কথা বলল। পাঙ্কদের সঙ্গে ওঁর নাকি একটা এনকাউন্টার হয়ছিল, এবং তাদের কাছ থেকে একটি মেয়েকে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই রিপোর্ট নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হয়েছিল এবং রয় ওর এক আত্মীয়ার মাধ্যমে জেনেছিল। সেই আত্মীয়ার দাদা বোধহয় অমল সোমের পরিচিত। সুতরাং এই ঠিকানা পেতে আমাদের কোনও অসুবিধে হয়নি। আমরা ঠিক করেছিলাম পাঙ্কদের ব্যাপারটা যিনি ট্যাকল করতে পেরেছেন, প্রয়োজনে তাঁর সাহায্য নেব। লোকটির সন্ধানে কাঠমাণ্ডুতে আসবার পর আমরা হতাশ হলাম। ওখানে সঠিক সোর্স না থাকলে কাউকে খুঁজে বের করা মুশকিল। রয় জানতে পারল কাঠমাণ্ডু থেকে বাই রোড শিলিগুড়িতে যাওয়া যায়। বাগডোগরা এয়ারপোর্টে যাচ্ছে এমন লোক কম নয়। সেই সময় আমরা জানতে পারলাম দ্যাট ম্যান ইজ নাউ ইন ডুয়ার্স। রয় এল প্লেনে। আমি বাসে। কথা ছিল শিলিগুড়িতে আজ আমরা মিট করব। দ্যাটস অল।
কথা শেষ করে জেমস তার চুলে হাত বোলাল। ব্যাপারটা বোধহয় ওর মুদ্রাদোষ।”
অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “তুমি থানায় গেলে কেন? এস. এন. রায় ঠিকমতো না পৌঁছনোতেই তোমার কেন মনে হল থানায় যাওয়া উচিত?”
জেমস বলল, “আমাদের মধ্যে তাই কথা ছিল। নাউ টেল মি, তুমি কী করে এত জানলে?” অর্জুনের মনে হচ্ছিল জেমস ঠিকঠাক বলেছে। সে যখন বলতে আরম্ভ করল তখন আর কোনও আড়াল রাখল না। পোড়া-গদাইকে দিয়ে সে লাইটারগুলো থানায় পাঠিয়েছিল এটাও জানাল। এইমাত্র সহদেব বকসি জানিয়ে গেলেন যা উধাও হয়ে গেছে থানার চত্বর থেকেই।
জেমস সব শুনে চুপচাপ বসে রইল খানিক, “তুমি কি মনে করো রায়বাড়ির ছোট ছেলে ওই দলটার সঙ্গে যুক্ত। কেন সে গাড়ি নিয়ে ওইসময় বেরিয়েছিল?”
“আমি বুঝতে পারছি না। তবে সে এখন থাকে তোমাদের দেশে। সেই সূত্রের যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে। কোথায় গিয়েছিল সেটা জানতে পারলে ব্যাপারটা সহজ হত অবশ্য।”
জেমস বলল, “ওর ভাইয়ের কথামতো যে লাইটারটা ওর কাছে ছিল, সেটা এখন কোথায়?”
এবার অর্জন পকেট থেকে দ্বিতীয় লাইটারটা বের করে দিল, “অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার পর উদ্ধার করার সময় কাটা-গদাইয়ের এক শাগরেদ এটাকে পকেট থেকে সরিয়েছিল।”
সন্তর্পণে লাইটারটাকে ধরে জেমস জিজ্ঞেস করল, “এটাকে পরীক্ষা করেছ?”
“হ্যাঁ, জাল।” অর্জুন নিশ্চিন্ত গলায় বলল।
জেমস মাথা নাড়ল, “আমার মনে হচ্ছে এই ভদ্রলোক লোভের শিকার হয়েছে। শুধু একটা জাল লাইটার থাকার কারণে কেউ ওকে হত্যা করবে না। রয়কে হত্যা করার অবশ্যই একটা কারণ আছে। দে ডোন্ট ওয়ান্ট টু বি ডিস্টার্বড। বাট হোয়াট অ্যাবাউট দিস চ্যাপ?” এবং তখনই অর্জুনের মাথায় একটা চিন্তা চলকে উঠল। সত্যেন্দ্রনাথ এবং রায়বাবুর ছোট ছেলের পদবি এক। এবং এঁরা দু’জনেই এসেছেন আমেরিকা থেকে। দু’জন আগে থেকেই দু’জনকে চিনতেন কি?
জেমস বলল, “তুমি একটা কাজ করতে পারো। আমার অনুমান, খুব অল্পের জন্যে তুমি বেঁচে গেছ। ওই ব্যাগে যে ক’টা লাইটার দেখেছ তার সবগুলোই যে নিরীহ হবে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। আর নেই বলেই ওরা ব্যাগটাকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। ওই জাল লাইটার এখানে একশো-দুটো টাকার বেশি দামে বিক্রি হবে না। ওরা অত অল্পের জন্য অত কষ্ট করবে না। লাইটারগুলো মেশানো ছিল। তুমি সৌভাগ্যক্রমে নিরীহ লাইটারটায় হাত দিয়েছিলে। কিন্তু এ সবই আমার অনুমান। তুমি নিহত ছেলেটির বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতে পারো, গতকাল কেউ তার সঙ্গে দেখা করেছিল কি না। কিংবা কোথায় যাচ্ছিল সে? অ্যান্ড হোয়াট অ্যাবাউট দ্যাট কার যা এস. এন. রয় ভাড়া করে এনেছিল!”
অর্জুন মাথা নাড়ল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তুমি আজ রাত্রে কি এই শহরে থাকবে?”
“অফ কোর্স। জেমস বলল, “আমাদের প্রতিপক্ষ এখানে আছে। কিন্তু তোমার সাহায্য চাই। একজন বিদেশি হিসেবে আমি একা কিছু করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। রয় যেখানে ছিল সেখানে জায়গা পেতে অসুবিধে হবে?”
অর্জুন চিন্তিত গলায় বলল, “সেখানে থাকাটা ঝুঁকি হয়ে যাবে না?”
জেমস উঠে দাঁড়াল, “প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু নিয়ে আমরা হাঁটাচলা করি। আমার যদি কিছু হয় তা হলে কলকাতার আমেরিকান কনস্যুলেটে জানিয়ে দিও। লেটস্ গো টু দ্যাট জেন্টলম্যান যিনি টোব্যাকো পত্রিকা পড়েন।”
“সুধাময় সান্যাল? কেন?”
“আমার ভয় হচ্ছে তিনি খুব বেশি জেনে গেছেন, এটাই তাঁর অপরাধ হতে পারে।”
বিশাল ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে স্বচ্ছন্দে হাঁটছিল জেমস। কয়েক পা এগিয়েই ওরা রিকশা পেয়ে গেল। অর্জুন দেখল শহরের রাস্তায় তাকে একজন বিদেশির সঙ্গে রিকশায় বসে থাকতে দেখে অনেকেই ঘুরে-ঘুরে তাকাচ্ছে। এখন ঘন বিকেল। অর্জুনের খিদে পাচ্ছিল। সুধাময় সান্যালের বাড়িতে গেলে খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। অমলদা থাকলে এক কাপ কফি আসে দুধ-চিনি ছাড়া। সে জেমসকে বলল, “আমরা যদি পাঁচ মিনিট রিকশাটা দাঁড় করাই তা হলে তোমার কি খুব আপত্তি হবে? আমার বেশ খিদে পেয়ে গেছে।”
জেমস হেসে বলল, “তুমি আমার মনের কথা বলেছ। কিন্তু এখানে কী খাবার পাওয়া যায়! ইন্ডিয়াতে ম্যাকডোনাল্ড কোম্পানির অবিলম্বে ব্যবসা শুরু করা উচিত।”
অর্জুন ওই কোম্পানির নাম শুনেছে। কম পয়সায় সুন্দর খাবারের দোকান করেছে তারা আমেরিকা এবং ইউরোপে। সে বলল, “ওই দোকানে দারুণ রাধাবল্লভি ভাজে। সঙ্গে জিলিপি।”
“রাধাবল্লভি। হোয়াটস দ্যাট?” জেমসের চোখমুখে বিস্ময় ফুটল।
ইংরেজিতে রাধাবল্লভি শব্দটাকে কিছুতেই অনুবাদ করতে পারল না অর্জুন। সে জেমসকে বলল, “তুমি রিকশা থেকে নেমে দোকানে এসে খাবারটা দ্যাখো।”
জলপাইগুড়ি শহরের এই অঞ্চলের দোকানগুলো যেমন হয় এটি তেমন। শোকেসে মিস্টি, সামনের বেঞ্চিতে বসে খদ্দেররা খাচ্ছে। পাশের নর্দমার গন্ধটাকে কেউ আমল দিচ্ছে না। সেদিকে তাকিয়ে জেমস মাথা নাড়ল, “তুমি খাও। আমি পারব না।”
অর্জুন জোর করল না। বিদেশিদের এই ব্যাপারে অনেক মানসিক বিধিনিষেধ আছে বলে সে শুনেছিল। সেটা হাতেনাতে প্রমাণিত হল। দ্বিতীয় রাধাবল্লভি মুখে দেওয়া মাত্র কাণ্ডটা হল। জেমস বসে ছিল রাস্তার পাশে দাঁড় করানো রিকশায়। রিকশাওয়ালা বিশ্রাম পেয়ে নেমে দাঁড়িয়ে খৈনি খাচ্ছিল। বেশ শান্ত চারদিক। ঠিক তখনই গাড়িটাকে যেতে দেখল সে। সেই একই রকম ধুলো-ভর্তি গাড়ি। নাম্বারপ্লেটটা পড়ল সে। পশ্চিমবঙ্গের নাম্বার। বাঁক নিয়ে কিছুদূর গিয়ে গাড়িটা যেন গতি কমাল। ড্রাইভারকে দেখতে পেল না অর্জুন, কিন্তু সে নিশ্চিত যে লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে জেমসকে দেখেছে। অর্জুন তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে এল। এবং সঙ্গে-সঙ্গে গাড়িটা বেরিয়ে গেল। তাকে ওই অবস্থায় দেখে জেমস জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার?”
গাড়িটাকে আর দেখতে না পেয়ে অর্জুন ফিরে গেল দোকানে। দাম মিটিয়ে সে ধীরেসুস্থে রাস্তায় উঠে জেমসকে বলল, “আমাদের উচিত রিকশাটাকে ছেড়ে দেওয়া।”
“কেন?” জেমস অবাক হল।
‘এস. এন. রয় যে গাড়িতে আমাদের ওখানে এসেছিলেন, সেই গাড়িটাকে আমি এখনই দেখতে পেলাম। নাম্বারপ্লেটটা আমি লক্ষ করিনি কিন্তু মনে হচ্ছে সেইটেই।”
জেমস পেছন দিকে একবার তাকাল, তারপর জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি নিশ্চিত?”
“মনে হচ্ছে, বললাম।”
“তা হলে ভালই হল। ওরা আমাদের খুঁজে বের করবে। নিশ্চয়ই ওরা জানে রয় তোমার সঙ্গে গতকাল কথা বলেছিল। ওরা এ-কথাও জানে, আমি রয়ের সঙ্গে দেশে এসেছি। অতএব আশা করছি আমরা মুখোমুখি হতে পারব। কিন্তু রিকশা ছাড়তে বলছ কেন?”
“ওরা আক্রমণ করতে পারে।”
“সাক্ষী রেখে কেউ আক্রমণ করে না। উঠে পড়ো।”
অর্জুন যদিও জেমসের পাশে বসল, তবু তার অস্বস্তি হচ্ছিল। কাঁচা রাস্তা দিয়ে এখন যাচ্ছে রিকশাটা। জেমসের কথা যদি ঠিক হয়, তা হলে একটা লাইটার চার্জ করে ছুঁড়ে দিলেই কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। করলা সেতু পেরিয়ে আর একটু এগোতেই সে দেখতে পেল, পোড়া-গদাই আর কাটা-গদাই আসছে। পোড়া-গদাইয়ের কাঁধে হাত রেখেছে কাটা-গদাই। ওরা দূর থেকে তাকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করতে লাগল। জেমস জিজ্ঞেস করল, “এরা কারা?”
অর্জুন দ্রুত পরিচয় দিয়ে রিকশাটা দাঁড় করাতে বলল। সামনাসামনি পৌঁছে সে রিকশা থেকে নেমে পোড়া-গদাইয়ের সামনে গিয়ে বলল, “কিছু মনে কোরো না, আমি ভাবতে পারিনি সহদেবদা তোমাদের ধরে রাখবেন। ছেড়ে দিয়েছেন দেখে খুশি হলাম।”
সঙ্গে-সঙ্গে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল পোড়া-গদাই, “আমি কথা রাখতে পারিনি। আপনি আমাকে যে কাজ দিয়েছিলেন তা করতে পারিনি। ক্ষমা চাওয়ার মুখ নেই আমার।”
কাটা-গদাই মুখ নিচু করল। তাকেও খুব দুঃখিত দেখাচ্ছিল। অর্জুন বলল, “কী করে ব্যাপারটা হল, তা সহদেবদার মুখে আমি শুনেছি। কিন্তু তোমাদের কি নতুন কিছু বলার আছে?”
পোড়া-গদাই প্রথমে মাথা নাড়ল, “আগে বলুন কী করলে ক্ষমা পাব?”
অর্জুন বলল, “তোমাদের যখন কোনও দোষ নেই, তখন কেন ক্ষমা চাইছ। ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করিনি। তোমরা দু’জনে কি সোজা থানায় চলে গিয়েছিলে?”
এবার কাটা-গদাই মাথা নাড়ল, “না। হাঁটতে-হাঁটতে হাসপাতালের সামনে গিয়ে পোড়াকে আমি বলেছিলাম, জিনিসগুলো দেখাতে। ও বলল, খুব দামি-দামি লাইটার আছে ব্যাগে। আমি বললাম যে, আমিও আজ একটা লাইটার পেয়েছিলাম। তখন পোড়া ব্যাগটা খুলে আমাকে লাইটারগুলো দেখাল। আমরা হাসপাতালের সামনের রকে বসে লাইটারগুলো দেখছিলাম। এইসময় একটা লোক আমাদের জিজ্ঞেস করল, ওগুলো কোত্থেকে পেয়েছি? আমি তাকে ভাগিয়ে দিলাম। কিন্তু মনে কুমতলবএল। পোড়াকে ধাপ্পা দিয়ে একটা লাইটার সরিয়ে নিলাম। থানায় গিয়ে দেখলাম বড়বাবু নেই। পোড়া একটা বেঞ্চিতে হেলান দিয়ে বসে ব্যাগটাকে পাশে রেখেছিল। আমি সিগারেট খাব বলে বারান্দায় বেরিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই একটা নেপালি গাড়ি নিয়ে থানায় এল। সে খুব বড়বাবুর খোঁজ করল। তার কোনও চেনা মানুষ কাল মারা গেছে। মর্গে নাকি ডেডবডি আছে। সেই ব্যাপারে খোঁজ নিতে চায়। একটু পরে লোকটা বেরিয়ে গেল ব্যাগ হাতে নিয়ে। আমার মনে হল ওটা পোড়ার ব্যাগ। সত্যি কি না দেখবার জন্য ভেতরে ছুটে এসে পোড়াকে হেলান দিয়ে একইভাবে বসে থাকতে দেখলাম, কিন্তু ব্যাগটা নেই। পোড়াকে হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিতেই ও বেঞ্চিতে টলে পড়ল। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন বড়বাবু কিছুতেই বিশ্বাস করলেন না আমাদের কথা।”
কাটা-গদাই থামতে পোড়া-গদাই বলল, “আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। হঠাৎ দেখি একটা লোক আমার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাচ্ছে। সে সিগারেট ধরাল, কিন্তু আগুন না জ্বেলেই। আমি তাকে বললাম, ওই লাইটার আমি চিনি। তারপরেই আর কোনও খেয়াল নেই। বড়বাবু আমাকে সেপাই দিয়ে পিটিয়েছেন।
অর্জুন কাটা-গদাইকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি যখন দেখলে একটা লোক পোড়া-গদাইয়ের ব্যাগ নিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন তাকে ধরলে না কেন?”
কাটা-গদাই বলল, “আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পোড়ার কাছ থেকে কেউ কিছু ছিনতাই করবে ভাবতে পারা যায় না।
অর্জুন হাত বাড়াল, “লাইটারটা দাও।”
কাটা-গদাই পকেট থেকে সেটা বের করে জিজ্ঞেস করল, “পোড়াকে কী ভাবে অজ্ঞান করেছিল? কোনও গন্ধটন্ধ শুঁকিয়ে, তাই না? ও সেটা বলছে না?”
পোড়া-গদাই সঙ্গে-সঙ্গে প্রতিবাদ করল, “না, না, সত্যি বলছি, কেউ কিছু শোঁকায়নি আমাকে।”
অর্জুন ওদের কিছু বলল না। এরকম একটা অস্ত্রের অস্তিত্ব জানলে ওদের লোভ বেড়ে যাবে।
সে লাইটারটাকে ভাল করে দেখল। আগেরগুলোর সঙ্গে কোনও তফাত নেই। কাটা-গদাইকে সে বলল, “একটা খুব বড় ঝামেলা শুরু হয়েছে। তোমরা বাড়ি চলে যাও।”
কাটা-গদাই বলল, “ঝামেলা? জান লড়িয়ে দেব। কী করতে হবে?”
“এখন কিছু করতে হবে না। লোকটাকে দেখলে চিনতে পারবে?”
“হ্যাঁ। নিশ্চয়ই। তবে হাসপাতালে যে আমাদের প্রশ্ন করেছিল, তাকে মনে হয় চিনি।”
“আগে নাথুয়া-জলপাইগুড়ি রুটে বাস চালাত,” পোড়া-গদাই জানাল। “এখন কী করে?”
“জানি না। অনেক বছর দেখিনি। খোঁজ নিতে পারি। তবে সেই লোক আর থানার লোক এক নয়।” কাটা-গদাই নিশ্চিন্ত হয়ে বলল।
অর্জুন বলল, “তা হোক, তবু তোমরা ওর খবর নিয়ে যদি পারো একবার রাত্রে আমার বাড়িতে এসো।”
আবার রিকশায় উঠে বসে জেমসকে সমস্ত ঘটনাটা খুলে বলল অর্জুন। এতক্ষণ জেমস চুপচাপ ওদের দেখেছে। এবার জিজ্ঞেস করল, “এরা কি লোকাল ক্রিমিন্যাল?”
অর্জুন একটু সময় দিল, “না, ঠিক ক্রিমিন্যাল বলা যায় না, আবার বলতেও পারো। এরা দুটো সিনেমা হলের টিকিট ব্ল্যাক করে। এতদিন শত্রু ছিল, আজ বন্ধু হয়েছে।
জেমস হেসে জিজ্ঞেস করল, “কী রকম?”
অর্জুন তখন ব্যাপারটা বলল। তারপর হাতের লাইটারটার লক্ খুলল। সঙ্গে-সঙ্গে জেমস চাপা গলায় বলল, “সাবধানে বোতাম পুশ করবে।
“এটা তো জাল।”
“জাল তো নিশ্চয়ই। কিন্তু কী ধরনের জাল তা তো জানি না।”
সুধাময় সান্যালের বাড়ির সামনে পৌঁছে গিয়েছিল রিকশাটা। অর্জুন ওকে দাঁড়াতে বলল।
সন্ধে হয়ে আসছে। তিস্তা বাংলোতে যাওয়ার রিকশা এটাকে ছেড়ে দিলে পাওয়া যাবে না।
হাতের লাইটারটার লক্ তখনও খোলা। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “এটাকে কী ভাবে পরীক্ষা করব?”
জেমস একটা সত্যিকারের জাল লাইটার আর এইটের ওজন এক কি না অর্জুনকে হাতের তালুতে রেখে যাচাই করতে বলল। সেটা করামাত্র অর্জুন কাটা-গদাইয়ের সরানো লাইটারটার ওজন বেশি টের পেল। সে জেমসকে বলল, “এটা এত ভারী ভাবিনি।”
জেমস ওর হাত থেকে লাইটারটা তুলে নিল। তারপর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত মুখে হাসি ফুটে উঠল, “দ্যাখো, নতুন লাইটারটার পেছনে লেখা রয়েছে জোন্স অ্যান্ড জোন্স। এ. এন. রয়েছে, ডি. নেই। অবশ্যই এটা সংকেত, যারা ব্যবহার করে তারা জানে! তোমার লোক যদি লোভ সামলে হাতসাফাই না করত তা হলে এইটের অস্তিত্ব আমরা টের পেতাম না। মনে হচ্ছে দ্বিতীয় বোতাম টিপলেই বিস্ফোরণ হবে। অবশ্য তার আগে আমাদের এই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করা উচিত।” খুব সাবধানে ওটা নিজের পকেটে রেখে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল জেমস।
অর্জুন বলল, “এখানেই সুধাময় সান্যাল থাকেন। বৃদ্ধ মানুষ। বিয়ে-থা করেননি। এককালে কলেজে পড়াতেন। কিন্তু লাইটারটার সম্পর্কে জানা গেল না।”
জেমস বল, “কী জানতে চাও? এটা ছুঁড়লে বিস্ফোরণ হয় কি না? যদি হয় তা হলে এটা আর কাজে লাগবে না। তাই না?”
“বিস্ফোরণ হলে কী রকম হবে?”
“একটা হাতি মরে যাবে, এইমাত্র।”
অর্জুন কথা না বলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিল। কিন্তু মনের মধ্যে অস্বস্তিটা থেকেই গেল। ওই লাইটার সত্যি বিস্ফোরক কি না তা না ছুঁড়লে জানা যাবে না। কিন্তু সেটা না হলে জেমসের ধারণা সঠিক বলে প্রমাণ হবে না। সেক্ষেত্রে নানারকম সন্দেহ উঠতে পারে।
সুধাময় সান্যালের ভৃত্য দরজা খুলল। অর্জুনকে দেখে বলল, “বাবুর শরীর খারাপ, আজ কারও সঙ্গে দেখা করবেন না।”
অর্জুন অবাক হল। এরকম তো কখনও হয়নি। একবার সুধাময় সান্যালের ম্যালেরিয়া হয়েছে শুনে সে অমলদার সঙ্গে দেখতে এসেছিল। তখন তো কোনও বাধা পায়নি। সে ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করল, “বাবুর কী হয়েছে?”
“আমি ঠিক জানি না, তবে দেখা হবে না।
“ডাক্তার এসেছিল?”
“সেটাও জানি না।”
অর্জুন জেমসকে সংবাদটা অনুবাদ করে জানাল। জেমস জিজ্ঞেস করল, “এই লোকটা যে বিশ্বাসযোগ্য তাতে তুমি নিশ্চিত?”
অনেকদিন ধরে ভৃত্যটাকে দেখছে অর্জুন। অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। কথাটা জানালে জেমস বলল, “জিজ্ঞেস কর তো, একটু আগে কেউ এসেছিল কি না।”
ভৃত্যটা বলল, “দু’জন লোক এসেছিল। তাদের মধ্যে একজনের চেহারা এই সাহেবের মতন। তারা কথা বলে চলে যাওয়ার পর থেকেই বাবুর শরীর খারাপ করেছে।” অর্জুনকে সে চেনে বলেই এত কথা বলল, নইলে বলত, “বাবু বলেছেন কারও সঙ্গে কোনও কথা না বলতে।” চাকরটা দরজা বন্ধ করে দিল।
“দু’জন লোক এসেছিল। তার মধ্যে একজনকে তোমার মতো দেখতে।”
“প্রত্যেকটা রাউন্ডে হারছি আমরা।” বিড়বিড় করল জেমস, “প্রার্থনা করছি, এই ভদ্রলোক বেঁচে থাকুন। চল, আমরা আস্তানার খোঁজে যাই।”
অর্জুন রিকশার কাছে চলে এল। সুধাময় সান্যালের ব্যবহারে সে খুব দুঃখিত হয়েছিল। লোক দুটো কী কথা বলল যার জন্য ভদ্রলোক জনসংযোগ ত্যাগ করতে চাইছেন! জেমসের মতো দেখতে, বলল ভৃত্যটা। তা হলে কি আর একজন আমেরিকান এই শহরে এসেছে? তা হলে গদাইরা তো সে কথা বলত! জেমস যাই বলুক, সুধাময় সান্যাল মারা যাননি। ভৃত্যটি এতবড় কথা চেপে যেত না। সুধাময় সান্যাল থাকেন দোতলায়। অর্জুনের মনে হল, কেউ যেন ব্যালকনি থেকে চট করে সরে গেল। সে জেমসকে রিকশায় অপেক্ষা করতে বলে বাড়িটার একপাশে চলে এল। বৃষ্টির জলের পাইপ ছাদ থেকে ব্যালকনির পাশ দিয়ে নীচে নেমে এসেছে। অর্জুন পাইপটা ধরল। উঠতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যালকনিতে পৌঁছে গেল সে। এখন সন্ধে হয়ে গেছে। মশার কারণে আশেপাশের বাড়িগুলোর জানালা বন্ধ। ফলে অর্জুনের মনে হল, সে কারও চোখে পড়েনি। রেলিঙ টপকে ব্যালকনিতে ঢুকতেই সে সুধাময় সান্যালকে দেখতে পেল। পেছনে হাত রেখে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু দেখছেন।
“আপনার শরীর খারাপ?” অর্জুন স্পষ্ট জিজ্ঞেস করল। সঙ্গে-সঙ্গে মুখ ফেরালেন সুধাময় সান্যাল আর সেখানে আতঙ্ক ফুটে উঠল। এক পা পিছিয়ে গেলেন তিনি, “তুমি? তুমি কী করে উপরে উঠে এলে? নো, নো, ইটস নট গুড। এইভাবে বাড়িতে ঢুকতে পারো না তুমি!”
অর্জুন ঘরে ঢুকল, “আপনার কী হয়েছে? এরকম ব্যবহার করছেন কেন আপনি?”
দ্রুত ভেতরের দরজার দিকে ছুটে গেলেন সুধাময়। তারপর চলে এলেন ব্যালকনিতে। মুখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালেন। তারপর ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “সাহেবটা কে?”
“আমেরিকান। অমলদার কাছে এসেছে।”
“অমল! অমল ফিরেছে?” সুধাময় ব্যগ্র হয়ে প্রশ্ন করলেন।
“না।
উত্তরটা শোনামাত্র সুধাময়ের মুখে কালো ছায়া নামল। তিনি বললেন, “অর্জুন, তুমি এখনই চলে যাও। কিছুদিন আমি কারও সঙ্গে দেখা করতে চাই না।”
অর্জুন শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, “কেন?”
“জোন্স অ্যান্ড জোন্স, অর্জুন জোন্স অ্যান জোন্স আমার সর্বনাশ করেছে। এখন আমি আমার কাজের লোককেও বিশ্বাস করতে পারছি না। ওই লোকগুলো সত্যিকারের খুনি।” কথাগুলো বলার সময় ওঁর মুখের ভঙ্গি বোঝাল তিনি যথার্থই ভীত।
“ওরা কী বলেছে আপনাকে?”
“ওরা! কাদের কথা বলছি তুমি জানো?”
“না। তবে অনুমান করতে পারি। জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর লাইটার জাল করে এদেশে যারা ব্যবসা করতে চায়, তারাই এসেছিল আপনার কাছে। আপনি কি জানেন গত চব্বিশ ঘণ্টায় ওরা দু’জন মানুষকে খুন করেছে, যাদের কাছে জাল লাইটার ছিল? ওরা কী করে জানল যে, আপনি লাইটারটার ব্যাপারে সব খবর রাখেন?”
“রায়বাবুর ছোট ছেলে ওদের বলেছে, আমি এই লাইটারটার সম্পর্কে সমস্ত লিটারেচার পড়ে জেনেছি। আমিই বলেছি তার সঙ্গে আনা লাইটার জাল। ওরা আমাকে শাসিয়ে গিয়েছে আমি যেন কারও সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা না বলি। বললে কী হবে, তা আমার বেড়ালটার ওপর পরীক্ষা করে দেখিয়ে দিয়েছে।” সুধাময় সান্যাল হাত বাড়ালেন টেবিলটা দেখাতে। সেখানে বেড়ালটা পাশ ফিরে শুয়ে ছিল। কিন্তু সচেতন চোখে অর্জুন বুঝল ও বেঁচে নেই। জীবিত বেড়াল অতক্ষণ পাশ ফিরে শুয়ে থাকতে পারে না!
হঠাৎ অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “ওরা আপনাকে দয়া দেখাবে কেন? শুধু ভয় দেখিয়ে চলে যাওয়ার পাত্র তো ওরা নয়।”
“আমি জানি না, বিশ্বাস কর, আমি জানি না। হরিপ্রসাদের কাছে টেলিফোনে ওরা আমার কথা জেনেছিল। ওদের খুব তাড়া ছিল। একজন চেয়েছিল আমায়…।” ঢোক গিললেন সুধাময়, “কিন্তু দ্বিতীয়জন বলল, চাকরটা ওদের ঢুকতে দেখেছে। আজ রাত্রে ওরা যখন সামচিতে পৌঁছচ্ছে না, তখন আর ঝুঁকি বাড়িয়ে কোনও লাভ নেই। সেটা শুনে প্রথমজন সাবধান করে চলে গেল। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। ওরা কী চাইছে তাও বলল না। শুধু টোব্যাকো পত্রিকাটি নিয়ে চলে গেল।”
“সামচি? আপনি কি ভূটানের সামচির কথা বলছেন?”
“আমি বলিনি। ওরাই বলল। ভুটান ছাড়া আর কোথাও সামচি নামে কোনও জায়গা আছে বলে জানি না। ওরা কারা অর্জুন?”
অর্জুন বলল, “অমলদা ফিরে এলে আপনার সঙ্গে দেখা করব। তার আগে আপনি কারও সঙ্গে এই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলবেন না।”
যে-পথে ওপরে উঠে এসেছিল সেই পথেই সন্তর্পণে নেমে এল সে। যদিও এর ফলে জামা-প্যান্টে নোংরা লেগে গেছে। রিকশায় উঠে সে তাড়াতাড়ি তিস্তা বাংলোর দিকে যেতে বলল।
জেমস জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? কী হল?”
অর্জুন জেমসের দিকে তাকাল। তারপর বলল, “ওরা এসে ওঁকে এমন শাসিয়ে গিয়েছে যে, উনি খুব ভেঙে পড়েছেন। এখন কথা বলার অবস্থায় নেই।”
“দে আর রিয়েলি ডেঞ্জারাস,” জেমস মন্তব্য করল।
তিস্তা বাংলোয় পৌঁছানো পর্যন্ত কোনও বিপদ হল না। ঘর পেতে ওদের কোনও অসুবিধে হল না। এবং সেই ঘরটিই পাওয়া গেল, যেখানে গতকাল সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন। বাবুর্চিকে খাবার অর্ডার দেওয়ার পর জেমস বলল, “খুব টায়ার্ড লাগছে আজ। কাল সকালে একবার ট্রাঙ্ককল করার চেষ্টা করতে হবে। তার মধ্যে তোমার ওই লোক দুটো যদি কোনও খবর আনে তো সৌভাগ্য বলতে হবে।”
অর্জুন দেখল জেমস তার লাগেজ না খুলেই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। সে যাওয়ার জন্য উঠল, “সাবধানে থেকো। যদি কেউ দরজা নক করে তা হলে তৈরি হয়ে খুলবে।”
সেই অবস্থায় জেমস বলল, “থ্যাঙ্কস্। আমি আত্মরক্ষায় অভ্যস্ত।
