জুতোয় রক্তের দাগ – ১০

১০.

অনিচ্ছুক ঘোড়া নিয়ে দৌড়নো যায় না। বেরোবার আগে প্রতিপদে এক-একটা ওজর দেখিয়েছিল ব্রাউন, অর্জুন শোনেনি। তাঁবু থেকে বেরিয়ে ছিল ওরা প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে। বালির ওপর চুপচাপ বসে ছিল মিনিটখানেক। দিনের বেলায় দেখেছে পাহারাদারগুলো জায়গা ভাগ করে চক্রাকারে ঘোরে। সমুদ্রের গর্জন এখন তীব্রতর মনে হয়েছে। মনে হচ্ছে বাঁ দিকেও সমুদ্র আছে। অর্জুন পাতলা অন্ধকারে কাউকে দেখছিল না। বাঁ দিকে সেই কুকের তাঁবুটা খুব ঝাপসা নজরে আসছে। এই সময় সে শিস শুনতে পেল। ওপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ শিস ভেসে এল। এদিকের লোকটা এবারে গলা তুলে বলল, “আমি এসে গিয়েছি।”

ওপাশ থেকে গলা ভেসে এল, “ধন্যবাদ।” এবং তখনই দুটো লোককে মিলিত হতে দেখল অর্জুন। পাহারাদার বদল হচ্ছে? ও পাশের লোকটা চলে গেল ডান দিকের তাঁবুর দিকে। অর্জুন চটপট ব্রাউনকে খোঁচা দিয়ে কুকের তাঁবুর দিকে চলে এল। ব্রাউনও এল একটু থপথপ করে। তাঁবুর দরজায় পৌঁছে সে ব্রাউনকে ফিসফিস করে বলল, “কুককে বলুন, আপনার সমুদ্রে স্নান করতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু পাহারাদার রাজি হবে না। তাই সে পাহারাদারকে কথা বলে কিছুক্ষণ যেন আটকে রাখে। রাজি না হলে মার্শালকে বলে দেবার ভয় দেখাবেন।”

“কিন্তু এখন আমি কিছুতেই সমুদ্রের জলে নামব না।” হাঁটুতে ভর করে বসে ব্রাউন মাথা নাড়ল।

“আপনাকে নামতে হবে না।” অর্জুন ওকে ঠেলল, “যান চটপট।

তাঁবুটা ছোট। কুক একা থাকে কি না তাও জানা নেই। অর্জুন দেখল, ব্রাউন বালির ওপর প্রায় গড়িয়ে তাঁবুর তলা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। সে বাইরে তাকাল। অন্ধকার এখন কিছুটা সহনীয়। কুকের চাপা গলা কানে এল, “আপনি? কী আশ্চর্য! এখানে কেন?”

ব্রাউন খুব নিচুস্বরে বোঝাতে লাগল কেন এসেছে। তার শরীর জ্বলছে, একবার সমুদ্রে স্নান না করলে চলছে না। অথচ পাহারাদাররা জানলে অনুমতি পাওয়া যাবে না। কুককে একটু সাহায্য করতেই হবে, নইলে বন্ধু কিসের! কুক বলল, মার্শাল জানতে পারলে তার চাকরি চলে যাবে। তা ছাড়া যে সমুদ্রে হাঙর আছে, সেখানে স্নান করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বিশেষ করে যখন বন্দুক নিয়ে কেউ পাহারা দিচ্ছে না। ব্রাউন জানাল, সেক্ষেত্রে মার্শাল এখনই জেনে যাবে তার কুকের পরিচয়। চাকরি তাতেও থাকবে না।

তাঁবুর ভেতর শব্দ হতে অর্জুন হামাগুড়ি দিয়ে সরে দাঁড়াল। কুককে দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে দেখল সে। পেছন-পেছন ব্রাউন। দরজায় পৌঁছেই নিল ডাউন হয়ে বসে পড়ল ব্রাউন। আর তখনই চিৎকার উঠল, “হু ইজ দেয়ার?”

“দিস ইজ মি, ইওর কুক।”

“কুক? হোয়াট আর ইউ ডুয়িং দেয়ার?”

“নাথিং। শুধু খুব নিঃসঙ্গ লাগছে। কথা বলতে ইচ্ছে করছে।”

“ফানি ম্যান। হোয়াটস্ দি ট্রাবল উইথ ইউ?” ওপাশের অন্ধকার ফুঁড়ে অস্ত্র হাতে একটি মানুষকে বেরিয়ে আসতে দেখল সে। অর্জুন দেখল কুক নিজে একটা সিগারেট মুখে নিয়ে আর-একটা পাহারাদারকে দিল। অর্জুন দেখল কুক নিজে একটা সিগারেট মুখে নিয়ে আর-একটা পাহারাদারকে দিল। অর্জুন আবার হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করল। আরও খানিকটা খোলা জায়গা দিয়ে ওদের যেতে হবে। গাছতলায় সে যখন পৌঁছল, তখন তার সামনে আর-একটি লোক। ঠিক অর্জুনের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে। অর্জুন ডান হাতের ধার দিয়ে ওর ঘাড়ে কোপ মারল। সঙ্গে-সঙ্গে লোকটা কাটা কলাগাছের মতো নেতিয়ে পড়ল। ওকে টেনে একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে অস্ত্রটা নিল সে। এটা রিভলভার, বন্দুক কিংবা রাইফেল নয়। এটার ব্যবহারও সে জানে না। অতএব একটা ভারী জিনিস বহন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ব্রাউন ইতিমধ্যে লোকটার কোমর-পকেট হাতড়ে একটা ছুরি বের করে অর্জুনকে দিল। ধন্যবাদ জানাতে গিয়েও পারল না সে। কারণ ব্রাউন আরও কিছু পকেটে ঢুকিয়েছে এবং সেগুলো পাউন্ড হওয়া অসম্ভব নয়।

মিনিট-তিনেক নির্বিঘ্নে চলে এল ওরা জঙ্গলে-জঙ্গলে। যে এজেন্সির ওপর মার্শাল ভরসা করেছিলেন, তারা নিশ্চয়ই অপদার্থ নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন একই কাজ মানুষকে অনেক সময় শিথিল করে। তা ছাড়া দুর্ভাগ্য নেহাতই প্রবল না হলে ওই লোকটি অর্জুনের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকত না। হয়তো অন্ধকারে নিজেদের তাঁবু থেকে বাইরের দিক দিয়েই আক্রমণ আসতে পারে বলে পাহারাদার আশঙ্কা করেছিল। আক্রমণটা ভেতর থেকেই আসবে তা সে বুঝতে পারেনি। সাধারণত এরকম আঘাতে ঘণ্টা-তিনেকের আগে চেতনা স্বচ্ছ হয় না।

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোন দিকে গিয়েছিলেন?”

ব্রাউন চারপাশে তাকাল। এর মধ্যে একবার আছাড় খেয়ে বেচারার কনুই ছড়েছে। সেখানে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “নাঃ। এদিকে তো আসিনি।”

“কোন দিকে গিয়েছিলেন?”

“সমুদ্রটা কাছে ছিল। মানে যে গাছে আমি উঠেছিলাম, সেখান থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছিল।”

“আপনি বলেছিলেন বাঁ দিকে এসেছিলেন, এখন আমরা বাঁ দিক দিয়েই এলাম।”

“কিন্তু সমুদ্র না থাকলে আমি কী করব?”

অর্জুন আর কিছু বলল না। লোকটাকে সঙ্গে নিয়ে আসায় ভুল হয়েছে বলে মনে হল। মিনিট-দশেক এলোমেলো ঘোরাঘুরি করে সে কোনও জীবিত প্রাণীর অস্তিত্ব টের পেল না। এবং এই সময় ওরা সমুদ্র দেখতে পেল। অন্ধকারে একমাত্র আওয়াজ ছাড়া সমুদ্রের চেহারা বড় শান্ত দেখায়। যেন কালচে-সবুজ জলরাশি দিগন্ত ছুঁয়ে গেছে। অর্জুন ব্রাউনের দিকে তাকাতেই সে মাথা নাড়ল, “না। এই সমুদ্র নয়। অবশ্য সব সমুদ্রই আমার একরকম লাগে।”

“গাছটাকে খুঁজুন, কী গাছ ছিল?”

“দূর! আমি গাছের নাম বলতে পারতাম না বুলে স্কুলে কম নম্বর পেতাম।”

অর্জুন হতাশ নিশ্বাস ফেলল। তারপর বালির আড়াল রেখে হাঁটুতে লাগল সমুদ্রের ধার ঘেঁষে। শীত করছে খুব। হাওয়া বইছে সপাটে। ব্রাউন জিজ্ঞেস করল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

“নরকে।

“ও!”

মাথা পেছনে বালির পাহাড়ের আড়াল, সামনে সমুদ্র। জিরোবার জন্যেই ওরা বসেছিল। অর্জুন দিক বোঝবার চেষ্টা করল। শেষমেষ মনে হল, তারা যেদিকে মুখ করে বসে আছে, সেদিকে সমুদ্রের উত্তর দিক। আর তখনই তার নজর পড়ল একটা নৌকো সমুদ্রের গভীর থেকে এগিয়ে আসছে। ব্রাউনকে সতর্ক করল। পেছন থেকে তাদের দেখা না গেলেও ওই নৌকোয় বসে তাদের লক্ষ করা অসম্ভব নয়। প্রায় বালির ওপর শুয়ে পড়ল ওরা। ব্রাউন ফিসফিস করে বলল, “সাহস খুব। এত রাত্রে দাঁড়টানা নৌকো চালাচ্ছে।”

“অর্জুন কিছু বলল না। নৌকোটা এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দু’জন দাঁড় টানছে, একজন বসে। ঠিক ওদের সামনে দিয়ে আর একটু বাঁ দিকে এগিয়ে যেতেই যেন হুইসল বাজল। এবং তারপরেই নৌকোটা একটা খাড়ির ভেতরে ঢুকে চোখের আড়াল হয়ে গেল। অর্জুন বুঝতে পারছিল না তার কী করা উচিত। এরা অবশ্যই মার্শাল সাহেবের লোক নয়। দ্বীপের এই দিকটা কি অন্য কেউ দখল করেছে? মার্শালের লোকজন তো ইচ্ছে করলেই দিনদুপুরে এদের আবিষ্কার করতে পারে। সে ব্রাউনকে বলল, “আপনি চুপচাপ বসে থাকুন। আমি আসছি।”

“কোথায় যাচ্ছ? আমার মাটিতে একা বসে থাকতে ভয় লাগবে।”

“তা হলে কাছেপিঠের কোনও গাছে উঠে বসুন।”

“সেটা একটা ভাল ব্যাপার। দাঁড়াও, আগে আমি গাছে উঠি, তারপর তুমি যেও।”

বালির পাহাড় ডিঙিয়ে পেছনে এসে খানিকটা হাঁটতেই একটা বড় গাছ পাওয়া গেল। ব্রাউন চটজলদি ওপরে উঠতে লাগল। পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয়েই সে নেমে এল খানিকটা, “এই পেয়েছি। এই গাছটাতেই তখন আমি উঠেছিলাম।”

“বুলেট-ভাঙা ডালটা এখনও আছে।” ফিসফিস শব্দটাও যেন জোরে শোনাল।

অর্জুন নিশ্বাস বন্ধ করে চারপাশে নজর বোলাল। বিরোধীপক্ষের ঘাঁটি কি খুব কাছে! ওপর থেকে নেমে আসছিল ব্রাউন। অর্জুন তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”

“যদি আবার গুলি আসে?”

“একই গাছে দু’বার উঠবেন কেউ ভাববে না। তা ছাড়া রাত্রে ওখানেই আপনি সেফ।”

“বলছ?” প্রশ্নটি করেই উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করে ব্রাউন আবার ওপরে উঠে গেল। অর্জুন আবার বালির পাহাড় ভেঙে নেমে এল সমুদ্রের ধারে। তারপর আড়াল রেখে এগিয়ে গেল সামনে। মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর সে ফাঁড়িটাকে দেখতে পেল। ওর ভেতরেই নৌকো ঢুকেছে। কোথাও কোন শব্দ নেই। এভাবে এগিয়ে যেতেও আর সে সাহস পাচ্ছিল না। মাথার ওপর জঙ্গল শুরু হয়ে গেছে। সেখানে এসে দাঁড়ালে যে কেউ তাকে দেখে ফেলবে। বালির পাহাড়ের আড়ালটা আর এখানে নেই। আর তখনই সে মানুষের কথাবার্তা শুনতে পেল। কেউ কাউকে কিছু নির্দেশ দিচ্ছে। অর্জুন সেসবের কিছুই বুঝতেপারল না। এই সময় নৌকোটা বেরিয়ে এল। এবার দুটো লোক চালাচ্ছে আর দুজন বসে রয়েছে। মনে হল আগের লোকটি যেন কাউকে নিতে এসেছিল।

অর্জুন বালির ওপর শুয়ে পড়ে নৌকোটাকে দেখল। ওরা দ্রুত অন্ধকার সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময় শিস শুনতে পেল। শিসটা এগিয়ে আসছে। তারপরেই মূর্তিটাকে দেখতে পেল সে। কাঁধে লম্বা বন্দুক ঝুলিয়ে লোকটা এসে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রের ধারে। নৌকোটার চলে যাওয়া দেখছে। লোকটা দাঁড়িয়ে আছে হাত-পনেরো দূরে। যদি ওখান থেকে তাকে দেখতে পায় তা হলে আর রক্ষে থাকবে না। অর্জুন চুপচাপ পড়ে রইল।

কোথাও কি কুকুর ডাকছে? একটানা। এই দ্বীপে কুকুর আসবে কোত্থেকে! সামনের লোকটা সমুদ্র দেখতে-দেখতে এগিয়ে আসছে। এখন হাত-আটেক ব্যবধান। হঠাৎ ওপরে আর একটি স্বর বাজল, “মাইক, জ্যাক হঠাৎ খুব খেপে গেছে।”

“মাইট বি হি ইজ হাংরি।”

“নো। আমি একটু আগে ওকে খেতে দিয়েছি। ও কিছু গন্ধ পেয়েছে।”

“গন্ধ? এই রাত্রে ওরা কখনও নিজেদের এলাকা থেকে বের হয় না। ঠিক আছে, মাইককে ছেড়ে দাও। দেখি ও কী খুঁজে পায়।”

“বাঃ চমৎকার। বিকেলে একবার ছেড়ে দিয়েছিলাম। ধরতে প্রাণ বের করে দিয়েছিল। তুমি বরং ওর চেন নিয়ে একটা সার্ভে করে এসো।”

“ডু ইট ইওরসেলফ্। সব-সময় মনে রাখবে, আমি তোমার সিনিয়ার।”

“ওকে। আমি আজ করছি। কিন্তু মনে রেখো এই শেষবার। লোকটা সম্ভবত চলে গেল। কারণ তখনই মাইক নামের লোকটা ওপরের দিকে মুখ তুলে চেঁচিয়েছিল, “হেই, তুমি কি আমাকে শাসাচ্ছ? মনে রেখো, তোমার শাসানিকে আমি তোয়াক্কা করি না।” কিন্তু ওপর থেকে উত্তর এল না। কথা বলতে বলতে মাইক চলে এসেছিল। হাত-চারেকের মধ্যে। তার মুখ এখন ঊর্ধ্বমুখী। কিছুটা উত্তেজনার কারণে সে মুখ নামিয়েও বিড়বিড় করল।

অর্জুন কাঁটা হয়ে শুয়েছিল। এখন তার আর কিছুই করার নেই। এবং তখনই মাইক অস্ফুটে কিছু বলে উঠে এক লাফে তার পাশে এসে দাঁড়াল। অর্জুন চাপা গলায় প্রশ্ন শুনল, “হু আর ইউ?”

অর্জুন উত্তর দিল না। সে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। অমল সোম বলেছিলেন, সাপও ফণা তোলে কিন্তু নড়াচড়া না দেখা পর্যন্ত ছোবল মারে না। গুলি করার আগে মাইকেরও একটা প্রস্তুতি প্রয়োজন। এবং তখনই কোমরের নীচে একটা লাথি এসে পড়তেই গড়িয়ে গিয়ে স্থির হয়ে গেল অর্জুন। প্রাণপণে নিশ্বাস আটকে সে পড়ে রইল।

“ডেড?” মাইক বিড়বিড় করল। তারপর রাইফেল বালির ওপর রেখে অর্জুনের পাশে হাঁটু মুড়ে বসল। ওর একটা হাত নাকের নীচে অনুভব করল অর্জুন। নিশ্বাস পড়ছে কি না পরীক্ষা করছে। এবং সুযোগটা হাতছাড়া করল না অর্জুন। দ্রুত পা গুটিয়ে মাইক সতর্ক হবার আগেই জোড়া লাথি কষাল ওর বুকে। সঙ্গে-সঙ্গে ছিটকে গেল মাইক। স্প্রিং-এর মতো লাফিয়ে উঠে পড়ে থাকা রাইফেল তুলে তার বাঁট দিয়ে লোকটার মাথায় আঘাত করল সে। মাইক চিৎকার করে বাধা দিতে গিয়েও পারল না। দ্বিতীয় আঘাতেই জ্ঞান হারাল।

আর সেই সময় কুকুরের চিৎকার প্রবল হল। কুকুরটা যেন এদিকেই এগিয়ে আসছে। রাইফেল নিয়ে দৌড়তে লাগল অর্জুন। বালির পাহাড়টার কাছে এসে সে নিশ্বাস ফেলল। সাক্ষাৎ-মৃত্যুর হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে আসার পর তার নিশ্বাস কিছুতেই সহজ হচ্ছিল না। কুকুরের আওয়াজটা কমে গিয়েছিল। অর্জুন চারপাশে তাকাল। ওরা নিশ্চয়ই মাইককে এখনই আবিষ্কার করবে। ওদের দলে ক’জন আছে বোঝা যাচ্ছে না। রাইফেলটায় গুলি আছে কি না চট করে যাচাই করে নিঃসন্দেহ হল। অন্তত মরে যাওয়ার আগে পালটা আক্রমণ করার একটা সুযোগ রইল। কুকুরের ডাক আবার কাছাকাছি চলে এসেছে।

হঠাৎ সমুদ্রের জলে আলোড়ন হল। এবং তারপরেই দম বন্ধ হয়ে গেল অর্জুনের। সমুদ্রের জল উত্তাল করে একটা বিশাল জন্তু মুখ তুলেছে। তার লেজের আঘাতে অনেকটা জল ছিটকে আকাশে উঠে গেল। জন্তুটা আবার ডুবে গেল জলের তলায়। এই কি সেই দানব-হাঙরটা, যার কথা মার্শাল বলছিল? সমুদ্রের মধ্যে ওর সামনে পড়লে এক মুহূর্ত লাগবে না নিষ্প্রাণ হতে। অর্জুনের মাথা অকেজো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনই কুকুরের বীভৎস চিৎকার ছুটে এল তার দিকে। কী করবে বুঝতে না পেরে সে বালির আড়ালে হাঁটু মুড়ে বসল। ওপাশে কুকুর আর এপাশে জলদানব, যার দেখা প্রথমে পাবে তাকে লক্ষ্য করেই গুলি চালাবে সে।

কুকুরটাকে সামলাতে পারছিল না পাহারাদার। মাঝে-মাঝেই শিস দিয়ে তাকে শান্ত হতে হুকুম করছে সে। কিন্তু তাকে প্রচণ্ড জোরে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে জন্তুটা। সমুদ্রের কাছাকাছি এসে লোকটা ডাকতে লাগল, “মাইক! মাইক! কাম কুইক!”

অর্জুন এবার ওদের দেখতে পেল। গাছপালার আড়াল থেকে বেরিয়েছে ওরা। ওর হাতে কুকুরের চেইন। জন্তুটা একবার জঙ্গলের দিকে আর একবার অর্জুন যেদিকে দাঁড়িয়ে সেদিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে। লোকটা আবার ডাকল, “মাইক!” সাড়া পেয়ে কুকুরটাকে টানতে-টানতে সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়াল। এবং এইসময় সে মাইকের শরীর দেখতে পেল, “ওঃ গড!”

মাইককে দেখছিল কুকুরটা। তার গতিও একমুখী হওয়ায় প্রহরীর কোনও অসুবিধে হল না। মাইকের শরীরের পাশে পৌঁছে কুকুরটা একবার শুঁকে নিয়ে দ্বিগুণ শব্দ করতে লাগল। জন্তুটার চেহারা বেশ ভীতিকর। যদি ছাড়া পায় তা হলে গুলি চালানো ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু প্রহরী কুকুরকে ছেড়ে দিল না এবং মাইকের শরীরের পাশ থেকে সরেও এল না। অর্জুন দ্রুত জঙ্গলে ঢুকে গেল। নির্দিষ্ট গাছটির নীচে পৌঁছেতই ওপর থেকে ব্রাউনের গলা ভেসে এল, “কুকুর ডাকছে কেন?”

“চটপট নেমে আসুন।

অর্জুন কথা শেষ করা মাত্র সরসর করে নীচে নেমে এল ব্রাউন। অর্জুনের মনে হল এই একটা জায়গায় মেজরের সঙ্গে ব্রাউনের পার্থক্য রয়েছে। মেজর শারীরিক দিক দিয়ে ব্রাউনের মতো এত ফিট নন। নীচে নেমেই ব্রাউন বলল, “তুমি কি সমুদ্রের দিকে তাকিয়েছিলে? শার্কটাকে দেখেছ? ইটস্ এ মনস্টার। ওঃ।”

অর্জুন বলল, “তাড়াতাড়ি ফিরে চলুন। আমাদের নিজস্ব প্রহরীরা কী অবস্থায় আছে কে জানে।” হাঁটতে-হাঁটতে ব্রাউন বলল, “ওরা আর যাই হোক আমাদের তো গুলি করবে না। একটু বকাঝকা করবে, বড়জোর কাল সকালে এই দ্বীপ থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে। তার বেশি কিছু তো করবে না।”

ক্যাম্পে ঢোকার আগে সেই প্রহরীটিকে তখনও অচৈতন্য দেখল ওরা। ব্রাউন চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “মরে যাবে না তো?” অর্জুন ওর নাকের নীচে হাত রেখে নিশ্বাস পরীক্ষা করে বলল, “কোনও চান্স নেই।” কিন্তু দ্বিতীয় প্রহরী ওদের পথ আটকে দাঁড়াল, “কে?”

ব্রাউন জবাব দিল, “আমরা। মিস্টার মার্শালের গেস্ট।”

লোকটা আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে সামনে এল, “তোমরা? তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?”

“বেড়াতে। ঘুম আসছিল না, তাই।” ব্রাউন ভিজে বেড়ালের মতো জানাল।

“কিন্তু এখান থেকে বাইরে গেলে কী করে?”

“পায়ে হেঁটে। দেখছই তো।”

“কী আশ্চর্য! আমি তোমাদের যেতে দেখলাম তো! ওপাশে আর কেউ বাধা দেয়নি?”

“না! আমরা ভাবলাম আজ বোধহয় পাহারা নেই।”

“মাই গড! কোথায় গিয়েছিলে তোমরা? জানো, আজ রাত্রে খুন হয়ে যেতে পারতে।”

“খুন তো হইনি। দেখতেই পাচ্ছ।

প্রহরীটি আরও একটু এগিয়ে এল, “স্যাম তোমাদের বাধা দেয়নি? ওপাশে ওর দেখা পাওনি?”

“না! তা ছাড়া আমরা চোর না ডাকাত যে, বাধা দেবে!”

“ব্যাটা নির্ঘাত ঘুমোচ্ছে। শোনো, একটা অনুরোধ করব। তোমরা যে ঘুরতে বেরিয়েছিলে, তা কারও কাছে গল্প কোরো না। তা হলে এজেন্সি আমাদের ছিঁড়ে খাবে। বুঝলে?”

ওরা মাথা নেড়ে নিজেদের তাঁবুতে চলে এল। ফেরামাত্র ব্রাউন চলে গেল বিছানায়। আর সিগারেট ধরাল অর্জুন। সমস্ত ব্যাপারটা কীরকম রহস্যময় হয়ে উঠেছে। কঠোর নিরাপত্তা নিয়ে মার্শালসাহেব দ্বীপের এ-প্রান্তে মুক্তো পরীক্ষা করছেন। আর রাত নামলেই দ্বীপের ওপাশে আগ্নেয়াস্ত্র আর কুকুর নিয়ে অন্য দল পাহারা দেয়। নৌকোয় চড়ে দাঁড় বেয়ে কারাই-বা মাঝরাত্রে সমুদ্রে যাচ্ছে? এত বড় একটা হাঙর যে সমুদ্রে ঘোরাফেরা করে সেখানে নৌকো বাইতে ওরা কেন ভয় পাচ্ছে না। কিন্তু ওপাশে সমুদ্র নিস্তরঙ্গ প্রায়। হঠাৎ অর্জুনের মস্তিষ্কের কোনও কোষে যেন আলো জ্বলে উঠল। উত্তর দিকে এক ঘণ্টা দাঁড়টানা নৌকোয় গেলে মে মাসে সূর্যদেব যেখানে মাথার ওপরে আসেন ঠিক সাড়ে বারোটায়, মাটি আর আকাশ যেখানে সমান দূরে অবস্থান করে, সেখানে পৌঁছনোর জন্য নৌকোটা চেষ্টা করছে না তো? কিন্তু মধ্যরাতে সূর্য পাবে কোথায় আর সময়টা তো মে মাস নয়। তা হলে?