১.
হিথরো এয়ারপোর্টে প্লেনটা থামতেই মেজর সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তখন প্লেন থেকে নামার সিঁড়ি দরজায় লাগেনি। ওপরে লাগেজ-বক্স থেকে নিজের অল-পারপাস ব্যাগটা টেনে নামিয়ে দু’পা এগোতেই তাঁর সঙ্গে বেজায় ধাক্কা লাগল সামনের প্যাসেজের পাশের সিটে বসা একজন মহিলার। তিনি জড়ানো ইংরেজিতে চিৎকার করে উঠলেন, “চোখের মাথা খেয়েছেন! একজন ভদ্রমহিলাকে ব্যাগ দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছেন? এত তাড়া কিসের, অ্যাঁ?”
“চোখের মাথা আপনি খেয়েছেন না আমি খেয়েছি? চোখ দেখাচ্ছেন আমাকে, চোখ?” মেজর চোখ বন্ধ করে সমানে গলা চড়ালেন।
ওপাশ থেকে একজন সৌম্য চেহারার আমেরিকান বলে উঠল, “লুক জেন্টলম্যান, ইউ মাস্ট নট বিহেভ লাইক দিস উইথ আ লেডি!”
মেজর তাঁর দিকে এমন চোখে তাকালেন যেন ভস্ম করে দেবেন। অর্জুন কী করবে বুঝতে পারছিল না। এইসময় মহিলা বলে উঠলেন, “এইসব উজবুকদের জন্যে কোথাও যাওয়াই মুশকিল।”
“কী, আমি উজবুক? তা হলে…।” এইবার প্রথম মেজর ভদ্রমহিলার দিকে ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে ফিরে তাকালেন। আর সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর গলা থেকে একটা সরু স্বর ছিটকে উঠল, “আরে, ডোরা, ডোরা গ্রান্ট! আমাদের সেই মিষ্টি মেয়েটার এই চেহারা হয়েছে?”
আচমকা ভদ্রমহিলার গলায় বিস্ময় মেশানো উচ্ছ্বাস ছিটকে উঠল, “ওঃ মেজর! ইট’স ইউ!”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি। আমি ছাড়া কোন্ উজবুক কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে হিথরো পর্যন্ত এক প্লেনে এসেও তোমাকে না-দেখে থাকবে। এত মুটিয়েছ না, ইশ্ ইশ্। কী ছিলে, কী হলে!” মেজর দু’হাতে ভদ্রমহিলার হাত ধরে নাচাতে লাগলেন।
যাত্রীরা প্যাসেজে সারবন্দী দাঁড়িয়ে। এখন অনেকেই দৃশ্যটা দেখে হাসছেন, শুধু সেই সৌম্য ভদ্রলোক ছাড়া। অর্জুনের খুব মজা লাগছিল। ডোরা গ্রান্টের বয়স অন্তত পঞ্চাশ। বিশাল বপু। কিন্তু সাজগোজের বাহার আছে খুব। সিট ছেড়ে উঠে মেজরের পেটে এক আঙুলের খোঁচা মারলেন তিনি, “চোখের মাথা তা হলে খেয়েছে কে! বলো, বলো এবার?”
মেজর হোহো করে হাসলেন। তাঁর ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল এই প্লেনে যেন আর-কোনও যাত্রী নেই। এইসব এয়ারপোর্টের বিল্ডিং-এ সরাসরি ঢোকার জন্যে টানেল থাকে, যার একটা মুখ প্লেনের দরজায় লাগালে আর মাটিতে পা ফেলতে হয় না। কোনও কারণে সেটা না পাওয়া যাওয়ায় এই পুরনো ব্যবস্থা। নীচে নামতেই বেশ ঠাণ্ডা লাগল অর্জুনের। আমেরিকায় এই ক’দিন সে বেশ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। লন্ডনে নেমে মনে হল বেশ স্যাঁতসেঁতে ভাব। মেজর মহিলাকে হাত ধরে থামালেন। “লেট মি ইন্ট্রোডিউস ইউ টু দিস ইয়াংম্যান।”
অর্জুন মুখ তুলে তাকাতেই তিনি হেসে ইংরেজিতে পরিচয় করিয়ে দিলেন, “এ হচ্ছে অর্জুন। ট্যালেন্টেড প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। আমেরিকায় জোন্স অ্যান্ড জোন্স-এর লাইটার এ-ই খুঁজে বের করেছে।”
ভদ্রমহিলা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওর হাত ধরলেন, “ইজ ইট? তুমি? এত অল্প বয়সে?”
মেজর বললেন, “আর ইনি হচ্ছেন মিসেস ডোরা গ্রান্ট। ফেমাস ম্যাজিশিয়ান। আমার অনেক দিনের বন্ধু।”
ম্যাজিশিয়ান। অর্জুন অবাক হয়ে গেল। এই ভদ্রমহিলাকে দেখলে তো ম্যাজিশিয়ান বলে মনেই হয় না। ভদ্রমহিলা হেসে বললেন, “অবাক হয়ে দেখছ কী! একদম বাজে কথা। কান দিও না। আমি তোমার কথা কাগজে পড়েছি। ওয়েল ডান।”
ওরা কথা বলতে বলতে টার্মিনাল বিল্ডিং-এ ঢুকে পড়ল। কয়েক ধাপ ওপরে ওঠার পর টানা সুড়ঙ্গের মতো চলার রাস্তা। যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। এয়ারপোর্ট যে এত বড় হয়, তা অর্জুনের জানা ছিল না। কেনেডি এয়ারপোর্ট অনেক বড়, কিন্তু এতটা হাঁটতে হয়নি। বিভিন্ন এয়ারলাইনস যাত্রী নিয়ে হরদম নামছে হিথরোতে। যাত্রীদের ব্যস্ততার শেষ নেই। ব্যস্ত মেজরও, দু’বার ধাক্কা মেরে বসলেন এর মধ্যে। প্রথমজন কিছু বলেননি। দ্বিতীয়বার মিসেস ডোরা গ্রান্টের সঙ্গে কথা বলে পিছিয়ে চলা অর্জুনের দিকে বাংলায় কথা ছুঁড়ে দিলেন, “এই ব্যাটাদের আমরা দুশো বছর আমাদের দেশে রাজত্ব করতে দিয়েছিলাম, বুঝলে?”
অর্জুন হেসে জবাব দিল, “এরা নয়, এদের পূর্বপুরুষরা।
“দ্যাটস রাইট। বলে পেছন ফিরতেই দড়াম করে শব্দ। মেজরের ব্যাগ ঘুরে গিয়ে পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি ছুটে যাওয়া আধবয়সী একটি লোকের হাঁটুতে ধাক্কা মারল। সঙ্গে-সঙ্গে লোকটি যেন হাওয়ায় সাঁতার কাটার ভঙ্গিতে কয়েক সেকেন্ড ব্যালেন্স রাখার চেষ্টা করে নড়বড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়ে একটা থাম ধরে নিজেকে সামলালেন। পরমুহূর্তেই তীরের মতো ছুটে এলেন তিনি। যেভাবে হাত উঁচিয়ে এলেন, তাতে অর্জুনের আশঙ্কা হচ্ছিল, হয়ে গেল একটা কিছু। ভদ্রলোক যে অনর্গল গালাগাল দিচ্ছেন, তা মুখের অভিব্যক্তিতে বুঝতে পারছে সে। মেজর কান পেতে যেন বুঝতে চাইছেন, ভদ্রলোক কী বলছেন। কারণ, যে-ভাষায় শব্দগুলো ছোঁড়া হচ্ছে তা অর্জুনের জ্ঞানের বাইরে। তবে মেজর তো দুনিয়াসুদ্ধু ভাষা জানেন। হঠাৎ মেজরের গলায় বাজ ডাকল, “অ্যাই ছুঁচো, বদমাশ, তোর ভাষা আমি বুঝতে পারছি না। তুই কোন্ দেশের ভূত? কিন্তু আমি একা খাব কেন? তুইও খা। পাজি, ছুঁচো, খবরদার হাত চালাবি না।”
লোকটা এবার থমকে গেল। অর্জুন লক্ষ করল, অন্যান্য যাত্রীরা পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে একবার আড়চোখে তাকিয়ে, কিন্তু কেউ ভিড় বাড়াচ্ছে না। মিসেস গ্রান্ট এবার দু’জনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর মেজরকে বললেন, “মেজর এটা তোমার দোষ। তুমি সতর্ক হয়ে চললে উনি ধাক্কা খেতেন না। তারপর ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, “সরি।”
ভদ্রলোক আবার উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতেই মিসেস গ্র্যান্ট তড়িঘড়ি মাথার ওপরে তাকিয়ে সরে এলেন মুখে হাত চাপা দিয়ে। ওরা মুখ তুলে তাকাতেই দেখল, মাথার ওপরে দেওয়ালের গায়ে একটা কুচকুচে কালো সাপ ফণা তুলছে। সঙ্গে-সঙ্গে ভদ্রলোক, সাপটা যাঁর ঠিক মাথার ওপরে, একটা আর্ত চিৎকার করে ছুটলেন সামনে। মেজর মুগ্ধ হয়ে সাপটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “রেয়ার টাইপ অব কোব্রা। আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলে ওদের বাড়ি। কামড়ালে এক সেকেন্ড। কিন্তু এ-ব্যাটা দলছুট হয়ে হিথরো এয়ারপোর্টে এল কী করে?” এই সময় সেই ভদ্রলোক দু’জন পুলিশ নিয়ে ছুটে এলেন। ওঁদের দৃষ্টি পুলিশের ওপর পড়েছিল। ভদ্রলোক আঙুল তুলে পুলিশদের ওপরের দিকে তাকাতে বলতেই ওরা হোহো করে হেসে উঠল। অর্জুন মাথা তুলে দেখল, একটা কালো তার সেখানে ঝুলছে সামান্য মুখ উঁচিয়ে। অর্জুন খুব অবাক হয়ে মিসেস গ্রান্টের দিকে তাকাল। তিনি হেসে বললেন, “এভরিথিং অলরাইট? চলো, আমরা বের হই।”
পুলিশ দু’জন তখন ভদ্রলোককে ঠাট্টা করছে। মেজর তাঁকে বললেন, “সরি। আপনাকে ধাক্কা দিইনি, লেগে গিয়েছিল।” তারপর হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনে বিড়বিড় করলেন, “আমি একটা গাধা। নইলে ম্যাজিক দেখে বুঝতে পারি না।”
লন্ডনে ঢুকতে গেলে তখন হিথরো এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট ভিসা কিংবা এনট্রি-পারমিট দেখতে চাইত না। তারা শুধু প্রশ্ন করত, যে ঢুকছে তার থাকা-খাওয়ার মতো পয়সা বা আশ্রয় আছে কি না। সেটা পরিষ্কার হতে ওরা পাশপোর্টের গায়ে ছাপ মেরে লিখে দিত, আগন্তুক ক’দিন ইংল্যান্ডে থাকতে পারে। জোন্স অ্যান্ড জোন্স কোম্পানির দৌলতে অর্জুনের পকেটে পয়সার অভাব ছিল না। আসলে সেই কারণেই মেজর তাকে বলেছিলেন, “সোজা দেশে ফিরে যাবে কেন হে? বিমান কোম্পানির কাছে চাইলে তো তুমি লন্ডনে স্টপ ওভার পেতে পারো। একই ভাড়ায় ক’দিন ও-দেশটাও দেখে যাও। আমাকেও তো ব্ল্যাকপুলে যেতে হচ্ছে।”
বেড়ানোর নামে কার না জিভে জল আসে! লাইটার-রহস্য ভেদ করতে আমেরিকায় এসে অবশ্য অর্জুন হাঁপিয়ে পড়েছিল এর মধ্যে। দেশের জন্যে মন খারাপ করছিল খুব। তবু ব্রিটিশদের দেশ দেখার লোভটার জন্যে সে জিজ্ঞেস করেছিল, “ব্ল্যাকপুলটা কোথায়?”
“ইংল্যান্ডের একটা সমুদ্রের ধারে। লেক ডিস্ট্রিক্ট জানো?”
“আমি ইংল্যান্ডের কিছুই জানি না।”
“জানা উচিত। গোয়েন্দাদের সব ইনফরমেশন রাখা দরকার।”
“আমি গোয়েন্দা নই। সত্যসন্ধানী।” অর্জুন প্রতিবাদ করেছিল।
“অ। ব্ল্যাকপুলে আমার পুরনো বন্ধু জেমস মার্শাল একটা দারুণ এক্সপেরিমেন্ট করছে সমুদ্রের জলে। ঘুরেই যাও না হে।” মেজর বলেছিলেন।
হিথরো এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দেখল, বেজায় ভিড়। সবাই যে-যার আত্মীয়দের নিতে এসেছে। এয়ারপোর্টের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় অর্জুন লক্ষ করেছে, সর্দারনিরা লম্বা ঝাঁটা নিয়ে ঝাঁট দিচ্ছেন এয়ারপোর্ট। সালোয়ার-পাঞ্জাবি পরা মহিলা কাজ করছেন! আর বাইরে এসে যাদের দেখল, তাদের অর্ধেকই ভারতীয়। শুধু ভারতীয়দেরই আত্মীয়-বন্ধু এ-দেশে বেশি আসে নাকি!
লন্ডনের আকাশে এখন মেঘ। অবশ্য হিথরো এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়ালে লন্ডন সম্পর্কে কোনও আঁচ করা যায় না। এখন ভর-সকাল। কিন্তু চারধারে এমন আলো, যেন দিনটা রাতের তারে ঝুলছে। অর্জুন দেখল, মিসেস গ্রান্ট এবং মেজর খুব তর্ক করছেন। বিষয়টা সে বোঝার চেষ্টা করল না। তার চোখ যাত্রী, গাড়ি এবং রাস্তার ওপর ঘুরছিল। হঠাৎ মেজর তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। “যাওয়ার সময় আমাদের লন্ডনে থাকা হচ্ছে না হে। এই ভদ্রমহিলা বায়না করছেন আমাদের ওঁর ওখানে দু’দিন থাকতেই হবে। ব্রিটিশ হলে হুট করে বলত না। তা তুমি কী বলো, থাকবে? আমার মনে হয়, থাকাই উচিত। কারণ ওঁর বাড়ি থেকে ব্ল্যাকপুল মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ।” বলতে বলতে মেজর অর্জুনের মতামত না জেনেই হাত তুলে মিসেস গ্রান্টকে সম্মতি জানালেন।
কেউ যদি এয়ারপোর্ট দিয়ে বিদেশে, কিংবা স্বদেশেরই অন্য কোথাও যায় তো তার গাড়ি স্বচ্ছন্দে এয়ারপোর্টের পার্কিং লটে পার্ক করে যেতে পারে। মাসখানেক পরে এলেও দেখা যাবে, গাড়িটিতে কেউ হাত দেয়নি। তার জন্যে পয়সা দিতে হয় বটে, কিন্তু ভয় থাকে না এক ফোঁটা! মিসেস গ্রান্টের গাড়িতে বসে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওরা এয়ারপোর্ট-এলাকার বাইরে চলে এল। লন্ডন শহরের ধারকাছ দিয়ে ওরা যাচ্ছে না। কিন্তু নিপাট রাস্তা, ঢেউ-খেলানো পরিষ্কার সবুজ মাঠ, আর রাস্তার ওপর জায়গার নাম লিখে দিক-নির্দেশ করা, সব মিলিয়ে চমৎকার লাগছিল। ঘেরা মাঠের মধ্যে যে গোরুগুলো চরছে, তাদের চেহারা দেখে আমাদের দেশের গোরুর জন্যে কষ্ট হল। অর্জুন দিগন্তের দিকে তাকাচ্ছিল পাহাড়ের জন্যে। কিন্তু কোথাও পাহাড়ের চিহ্ন নেই। অথচ ঠাণ্ডা তো বেশ। কথাটা বলতেই হেহে করে হাসলেন মেজর, “মনে করো তুমি পাহাড়ের চুড়োয় বসে আছ, তা হলে সামনে পাহাড় দেখবে কী করে?” এইবার অমল সোমের জন্যে অর্জুনের মন-খারাপ হয়ে গেল। উনি থাকলে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন নিশ্চয়ই, পাহাড় না-থাকা সত্ত্বেও কেন এত ঠাণ্ডা লাগে সারা বছর। অমলদা কি সত্যি সন্ন্যাসী হয়ে গেলেন? আমেরিকায় পৌঁছবার পরও তিনটে চিঠি লিখেছে অমলদাকে জলপাইগুড়ির ঠিকানায়। একটি চিঠিরও জবাব আসেনি।
মিসেস গ্রান্ট গাড়ি চালাচ্ছেন খুব সহজ ভঙ্গিতে। ভদ্রমহিলা যে চমৎকার ম্যাজিক জানেন, তা বোঝা গেল। কিন্তু উনি যদি ব্রিটিশ না হন, তা হলে ব্রিটেনে ওঁর বাড়ি-গাড়ি কেমন করে থাকবে? তারপরেই ওর মনে পড়ল, ভারতীয়রা যদি এদেশে থাকতে পারে, তা হলে উনি কেন পারবেন না। এবার মিসেস গ্রান্ট বললেন, “তোমরা কী নিয়ে কথা বলছিলে?”
মেজর হাসলেন, “অর্জুন বলছে, এদেশে পাহাড় আছে কি না?”
“আছে। দেখবে? আচ্ছা, এই বাঁকটা পেরিয়ে আমরা পাহাড়ের পাশে থামব।” ভদ্রমহিলা হাসলেন ওর দিকে একবার তাকিয়ে। এঁর কথাবার্তা স্পষ্ট বুঝতে পারে অর্জুন। আমেরিকানদের মতো অত জড়ানো নয়। কিন্তু বাঁকটা তো দেখা যাচ্ছে; অথচ পাহাড়ের চিহ্ন দিগন্তে নেই। সে দেখল, বোর্ডে ল্যাঙ্কাশায়ার লেখা। এই নামগুলো সে জানে। ইয়র্কশায়ার, ল্যাঙ্কাশায়ার, ডার্বিশায়ার। যেন ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, গয়েরকাটা। ব্রিটিশরা ওদের সমস্ত সাহিত্য দিয়ে দুশো বছরে ভারতীয়দের এ-সব চিনে নিতে বাধ্য করেছে।”
বাঁক ঘুরতেই অর্জুনকে মিসেস গ্রান্ট বললেন, “ওই দ্যাখো পাহাড়।” অর্জুন হতভম্ব হয়ে গেল। সত্যি একটা বিশাল পাহাড় সামনে এগিয়ে আসছে। এত উঁচু এবং তুষারে ভরা যে, অর্জুন নড়তে পারছিল না বিস্ময়ে। কিন্তু গাড়িটা থামামাত্র পাহাড়টা মিলিয়ে গিয়ে একটা বড়সড় ঢিপি হয়ে গেল। ঢিপিটা পুরনো ভাঙা কিংবা বাতিল গাড়ির। অন্তত শ’তিনেক গাড়ি রাস্তার পাশে এক জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ম্যাজিকের কল্যাণে এটাকেই সে পাহাড় বলে ভুল করেছিল। অর্জুন সভয়ে মিসেস গ্রান্টের দিকে তাকাল। জাদুকরী গ্রান্ট যদি ম্যানড্রেকের মতো ভালমানুষ হন, তা হলে খুব ভাল হয়।
গাড়িটা থেমেছিল। মিসেস গ্রান্ট পেট্রল নেবেন। পেট্রল পাম্পটা খুব সুন্দর। হলদে রংটা চোখে বেশ লাগে। তার পাশেই একটা ডিপার্টমেন্টাল শপ। আর কিছু নেই আশেপাশে। দিগন্তবিস্তৃত শুধু মাঠ আর মাঠ। একটা গাড়ি পার্ক করা আছে ডিপার্টমেন্টাল শপের সামনে। অর্জুন গাড়িগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল বারংবার। মেজর নেমে দাঁড়িয়ে বললেন, “বাতিল গাড়ি, বুঝলে? এগুলো এখান থেকে নিয়ে গিয়ে ভেঙে ফেলবে। আমি একটু দোকানটা ঘুরে আসি। বসে বসে হাতে-পায়ে জং ধরে গেল হে।”
অর্জুন নেমে দাঁড়াল। শিরশিরে ঠাণ্ডা আছে। মিসেস গ্রান্ট এগিয়ে এলেন। “তুমি কি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছ? আসলে মজা করার লোভটা প্রায়ই পেয়ে বসে আমাকে।”
অর্জুন দ্রুত মাথা নাড়ল। “না, না, কিছু মনে করিনি।
“গুড। তুমি কি প্রথম আসছ ইংল্যান্ডে?”
“হ্যাঁ।”
“সো নাইস। লেট’স্ গো ফর কফি!”
অর্জুন মাথা নাড়তেই ভদ্রমহিলা এগোলেন পেট্রল পাম্পের পাশের দোকানের দিকে। ভিতরে ঢুকে বেশ অবাক হয়ে গেল সে। আমেরিকাতে সে এরকম দোকান দেখেছে, যেখানে যাবতীয় জিনিসপত্র সুন্দর থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয় ক্রেতাদের জন্যে। তাঁরা পছন্দমতো জিনিস নিয়ে বেরোবার সময় কাউন্টারে দাম মিটিয়ে দিয়ে যায়। আলু থেকে পারফিউম, সবই পাওয়া যায় ওখানে। কিন্তু এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় এত বড় দোকান, খদ্দের কোথায়? চট করে মেজরকে খুঁজে পাওয়া গেল না। বিভিন্ন ধরনের জিনিস বিভিন্ন গলিতে রাখা। তারই একটায় মেজর খুঁটিয়ে একজোড়া জুতো দেখছিলেন। মিসেস গ্রান্ট জিজ্ঞেস করলেন, “এই সেকেন্ড হ্যান্ড সেন্টারে তুমি কী করছ মেজর?”
“লুক,” মেজর জুতোটা দেখালেন, “এটা সেকেন্ড হ্যান্ড বটে, কিন্তু মোটেই বেশি ব্যবহৃত হয়নি। এই জুতো দু’বছর হল তৈরি হয় না। কিন্তু অভিযানের পক্ষে এর চেয়ে ভাল কিছু নেই। অনেকদিন থেকে খুঁজছিলাম আমি। যেবার তুন্দ্রা অঞ্চলে গিয়েছিলাম, তখন একজনকে পরতে দেখেছিলাম। আমি এই জুতোজোড়া নেব।” মেজর জুতোজোড়া হাতে ঝুলোলেন।
অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “অন্যের পরা জুতো আপনি পরবেন?”
মেজর বললেন, “জুতোটা খুব দরকারি। জীবাণুমুক্ত করে নিলেই হবে।”
“এখানে সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস বিক্রি হয়?”
‘হ্যাঁ। এই দিকটায়। যাদের কম পয়সা, তারা কেনে। এই আমার মতো।” বলে নিজে থেকেই হোহো করে হেসে উঠলেন মেজর। হঠাৎ মিসেস গ্রান্টের মুখ ভারী হয়ে গেল, “শোনো মেজর, আমি যতক্ষণ তোমাদের সঙ্গে থাকব, ততক্ষণ ইংরেজিতে কথা বলবে। তুমি যে জোক করলে, আমি তা বুঝতেই পারলাম না।”
মেজর হাত তুলে বললেন, “তথাস্তু।”
কফি খেয়ে গাড়িতে ফিরতেই আর-একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। মেজর আসনে বসলেন। মিসেস গ্রান্ট পেট্রলের দাম দিতে ভেতরে গেলেন। অর্জুনের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, শো-কেসে একটা গগল্স্ দেখে এসেছে, সেটা এই ফাঁকে চটপট কিনে আনার। সে মেজরকে এক মিনিট দাঁড়াতে বলে ডিপার্টমেন্টাল শপে আবার ঢুকে পড়ল। নতুন-আসা গাড়ির লোক দুটোও তখন তার পাশ দিয়ে ঢুকছে। অর্জুন ঝুঁকে পড়ে গগলসের লকেটে লেখা দাম পড়তে গিয়ে শুনল একটা লোক বলছে, “ইট মাস্ট বি ইন দি সেকেন্ড হ্যান্ড সেন্টার। ফাইন্ড ইট, আই অ্যাম হিয়ার। জুতোটা চিনতে ভুল কোরো না।”
অর্জুন মুখ তুলে তাকাল। সেই লোক দুটো, যারা এইমাত্র ঢুকল। দ্বিতীয় লোকটা এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “এক লক্ষ জুতোর মধ্যে থাকলেও জ্যাকের জুতো খুঁজে বের করতে পারব।”
দুটো লোকের চোখেই গগল্স্। দ্বিতীয়জন উধাও হয়েছে। প্রথমজন তার চামড়ার জ্যাকেটে হাত গলিয়ে শিস দিচ্ছে। এদের ভঙ্গি মোটেই ভাল লাগল না অর্জুনের। সে একটু সময় নিতেই দ্বিতীয় লোকটা প্রায় দৌড়তে-দৌড়তে ফিরে এল, “ইট্স নট দেয়ার।
“নিশ্চয়ই ওখানে আছে। মারা যাবার আগে লোকটা মিথ্যে বলবে না।” প্রথম লোকটা ছুটল।
অর্জুন আর দাঁড়াল না। ওর খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। এরা কোন্ জুতোর খোঁজ করছে? খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে গাড়িতে উঠে বসল। মেজর জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু কিনলে?”
সে ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলল। কিন্তু সেইসঙ্গে চোখের কোণে দেখতে পেল দোকানের দরজায় ওরা এখনও এসে পৌঁছয়নি। কাউন্টারে যদি খোঁজ নিত এবং এই জুতোই যদি সেই জুতো হত, তা হলে যে-লোকটা জিনিস দেখে দাম নিচ্ছে, সে বলে দিত কতক্ষণ আগে বিক্রি হয়েছে। মিসেস গ্রান্টের গাড়ি তখন আবার হাইওয়েতে পড়েছে। সামনের সারিতে পা-রাখার জায়গায় জুতোজোড়া রাখলে অসুবিধে হবে বলে মেজর জুতোজোড়া পেছনের পা রাখার জায়গায় রেখেছেন। জুতোজোড়া অর্জুন দেখতে পাচ্ছিল। মোটা, ভারী, এবং গোড়ালি থেকে অনেকটা উঁচুতে উঠে আসা জুতো। বানিয়েছে কায়দা করে, আর সেই কায়দাটা চোখে পড়ে। কালিম্পং-এ এরকম জুতো পরতে অনেককে দেখেছে সে। কিন্তু সেকেন্ড হ্যান্ড জুতো কেউ পরছে ভাবা যায়? মেজর মানুষটি অদ্ভুত। অবশ্য এই জুতোজোড়ার তেমন কোনও ইতিহাস না-ও থাকতে পারে।
এখন গাড়ি চলছে হাইওয়ে দিয়ে। রাস্তা মোটেই নির্জন নয়। পাশাপাশি তিনটে ট্র্যাকে তিনরকম গতিতে একমুখী গাড়িগুলো ছুটছে। ও-পাশের তিনটে ট্র্যাকে বিপরীতমুখী গাড়িগুলো যাচ্ছে। রাস্তার খানিকটা দূরে দূরে বিভিন্ন রকমের নির্দেশিকা টাঙানো। এমনকী, কোথায় পেট্রল পাম্প, স্ন্যাকস, কিংবা মোটেল পাওয়া যাবে, তাও। কিন্তু একটা জিনিস দেখে সে খুব অবাক হয়ে যাচ্ছিল। হাইওয়ের দু’পাশে কোনও বসতবাড়ি বা জনবসতি নেই। শুধু মাঠ কিংবা খামার। যেদিকে তাকাও, শুধু চোখের আরাম।
বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পর মিসেস গ্রান্ট হাইওয়ে ছেড়ে ডান দিকের রাস্তা ধরলেন। অর্জুন দেখল বোর্ডে তীর এঁকে লেখা আছে ‘বোল্টন’। অর্থাৎ এই বোল্টনে মিসেস গ্রান্ট যদি থাকেন, তা হলে যাত্রার সমাপ্তি হয়ে এল। ক্রমশ বাড়িঘর চোখে পড়তে লাগল। ছিমছাম, সুন্দর। বেশির ভাগ একতলা বাগানওয়ালা বাড়ি। দোতলাগুলো বাংলো প্যাটার্নের। ফুটপাথে লোকজন বেশি নেই। মনে হচ্ছে শহরটা ছিমছাম, অল্প মানুষের। দোকান, বার, ক্লাব চোখে পড়ছিল। হঠাৎ অর্জুন মুখ ফিরিয়ে উদ্ভাসিত হল। একটা দোকানের সামনে লেখা আছে, ‘মা, অ্যান ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ। এত দূরে এসে কোনও ভারতীয় দোকান করে বসে আছে!
মিসেস গ্রান্টের বাড়িটা চমৎকার। শহরের ও-প্রান্তে নির্জন রাস্তার গায়ে ওঁর গেট। তারপর তিনটে টেনিসকোর্টের মতো লন পেরিয়ে বাড়ির গাড়িবারান্দা। নীচে নেমে দাঁড়িয়ে মিসেস গ্রান্ট সামান্য ঝুঁকে হাসলেন, “ওয়েলকাম টু মাই লিটল নেস্ট।”
ততক্ষণে ভেতরের দরজা খুলে একটি নিগ্রো প্রৌঢ় বেরিয়ে এল। “গুড আফটারনুন, মিসেস গ্রান্ট।”
“গুড আফটারনুন, চার্লি। এঁরা আমার বন্ধু। মেজরকে তো তুমি এর আগে দেখেছ। আমি এঁদের অনুরোধ করেছি কয়েকটি দিন এখানে কাটিয়ে যেতে।” মিসেস গ্রান্ট হাসলেন।
“খুব ভাল করেছেন। আপনারা ভেতরে গিয়ে বসুন, আমি জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যাচ্ছি।”
অগত্যা খালি হাতে ওরা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠেছিল। এইসময় চার্লি চিৎকার করে উঠল, “ইটস্ নট ডান, সেকেন্ড হ্যান্ড দোকান থেকে জুতো কেনা মোটেই উচিত নয়।”
মিসেস গ্রান্ট মাথা নাড়লেন, “চার্লিটা সবসময় আমাদের ওপর শাসন চালিয়ে যাচ্ছে। আসুন।”
পাশাপাশি দুটো ঘর দেওয়া হয়েছে ওদের দু’জনকে। এত আরামের ঘরে অর্জুন কখনও থাকেনি। এমনকী, আমেরিকাতেও নয়। দুধের সরের মতো বিছানা। গালচে থেকে আসবাবপত্রে পুরনো ঐতিহ্য চমৎকার মেজাজি করে তোলে। কাচের জানলার এপাশে কাজ-করা পর্দা। আজ অনেক গল্প হয়েছে। সন্ধের পর ডিনার খেয়ে যে-যার ঘরে শুতে চলে গেছেন ওঁরা। কিন্তু এখন রাত ন’টাই বাজেনি। অর্জুনের ঘুম পাচ্ছিল না। সে তার ঘরের গোল-সোফায় আরাম করে বসেছিল। জলপাইগুড়ির একটা বেকার ছেলে ইংল্যান্ডের এরকম বনেদি বাড়িতে একা ঘরে একা বসে পা নাচাবে, তা কি কেউ ভেবেছিল? সে ঝুঁকে সামনের বাক্সটার গায়ে উঁচিয়ে-থাকা বোতাম টিপতেই ঝপ করে সেটা খুলে এক ডজন বড় চুরুট বেরিয়ে এল, পাশে দেশলাইয়ের পাতা। অর্জুন মাঝে-মাঝে সিগারেট খায়, কিন্তু চুরুটের অভিজ্ঞতা ছিল না। এ-ঘরে যখন রাখা হয়েছে, তখন নিশ্চয়ই সে ব্যবহার করতে পারে। আরাম করে ধরিয়ে সে মৃদু ধোঁয়া ছাড়তেই বুঝতে পারল, পুরোটা খাওয়া অসম্ভব। চুরুট হাতে সে উঠে জানলার পাশে দাঁড়াল। এই ঘরে হাওয়া ঢুকছে না, তবু ঠাণ্ডা বেশ। বাইরের জ্যোৎস্নালোকিত বাগানটায় নিশ্চয়ই হাড়-কাঁপানো ব্যাপার চলছে। ফুলের গাছের পাশাপাশি কয়েকটা এ-দেশি লম্বাটে গাছ ছায়া ফেলছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। অর্জুন বাগানের সেই মায়াময় দৃশ্য দেখছিল চুরুট খেতে-খেতে। আচমকা বাড়িটা কেঁপে উঠল একটা চিৎকারে। ডাকাত পড়লে কিংবা ভূত দেখলে এরকম চিৎকার বেরোয় গলা থেকে।
চিৎকারটা আসছে মেজরের ঘর থেকে। নিচের দরজা খুলে অর্জুন মেজরের দরজার দিকে যাওয়ার সময় দেখল, চার্লি এবং একজন মহিলা-কাজের-লোক ছুটে আসছে বিপরীত দিক থেকে। মিসেস গ্রান্টের গলা পাওয়া গেল, “কী হয়েছে চার্লি?”
চিৎকারটা তখন থেমেছে, কিন্তু গোঙানি বন্ধ হয়নি। অর্জুন বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল, “ মেজর, মেজর! আপনার কী হয়েছে? মেজর! দরজা খুলুন।”
চার্লি বলল, “ইট মাস্ট বি আ গোস্ট।”
“গোস্ট?” মিসেস গ্রান্ট এসে দাঁড়িয়েছেন পেছনে।
“ইয়েস মিসেস গ্রান্ট। গোস্ট অব দোজ শ্যজ।” ভয়ার্ত স্বরে বলল চার্লি।
এখন গোঙানিটা থেমেছে। এবং তার কিছুক্ষণ পরে দরজা খুললেন মেজর। খুলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার! সবাই এখানে কেন? কিছু হয়েছে নাকি বাড়িতে?”
মিসেস গ্রান্ট উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এলেন। “কী হয়েছে আপনার মেজর। “আমার? নাথিং! কিস্যু হয়নি। আমি আরাম করে ঘুমোচ্ছিলাম।” মেজর হাসলেন।
উত্তর শুনে মিসেস গ্রান্ট অর্জুনের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি কোনও কিছুর স্বপ্ন দেখছিলেন মেজর?”
“স্বপ্ন? ওঃ, হ্যাঁ। মনে পড়েছে।” তারপরেই লাফিয়ে উঠলেন বিশাল শরীর নিয়ে, “ইউরেকা!” কিন্তু শরীরটা এসে পড়ল জুতোজোড়ার ওপরে। দরজার পাশে ও-দুটোকে রেখে গিয়েছিল চার্লি। আর ব্যালান্স হারিয়ে কার্পেটের ওপর চিত হয়ে পড়লেন মেজর। মিসেস গ্রান্ট জিজ্ঞেস করলেন, “আর ইউ অলরাইট মেজর?”
“অ্যাবসিলিউটলি।” মেজর শুয়ে শুয়েই একবার কাতর-চোখে জুতোজোড়ার দিকে তাকিয়ে উঠে বসলেন। গায়ে লাগা কল্পিত ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, “পেয়ে গেছি। ক্যান্সারের ওষুধ পেয়ে গেছি।
অর্জুন চমকে উঠল, “ক্যান্সারের ওষুধ?”
বিজ্ঞের মতো ঘাড় নাড়লেন মেজর, “আমি স্বপ্ন দেখলাম ব্ল্যাকপুলে সমুদ্রের মধ্যে মার্শালের সঙ্গে ঝিনুক নিয়ে অভিযান করতে গিয়ে উড়ুক্কু মাছের ঝাঁকে পড়লাম। মার্শালের একজন কর্মচারীর গলায় ক্যান্সার ছিল। সে ওই উড়ুক্কু মাছ সেদ্ধ করে খেতেই গলার ব্যথা কমে গেল। আর তখনই হাঙরটা আমাদের আক্রমণ করল। তার মানে উড়ুক্কু মাছের তেলই ক্যান্সারের ওষুধ।
মিসেস গ্রান্ট বললেন, “আপনি স্বপ্নে হাঙর দেখে চিৎকার করেছিলেন। মেজর বললেন, “আমি? নেভার! আমি কালই ব্ল্যাকপুলে যাচ্ছি। হঠাৎ চার্লি মেঝেতে বসে পড়ে বুকে মাথায় ক্রস আঁকতে লাগল। “ও মিসেস গ্রান্ট। ইট্স দ্যাট গোস্ট অব দোজ শ্যুজ। ওই জুতোয় নিশ্চয়ই ভূত আছে। সেই ভূত মিস্টার মেজরকে ভয় দেখিয়েছে। সে-ই একটু আগে মিস্টার মেজরকে মাটিতে ফেলে দিল। যার জুতো, সে নিশ্চয়ই মারা গিয়েছে। তার ভূত জুতোর মধ্যে বসে আছে।”
মেজর থতমত হয়ে গেলেন। তাঁর চোখজোড়া জুতোর ওপরে। তিনি চার্লির দিকে তাকিয়ে খিঁচিয়ে উঠলেন, “কী, আমাকে ভয় দেখাচ্ছে? নো, নেভার। তুমি জানো, আমি হরেক মুল্লুকে এক্সপিডিশানে গিয়েছি! একটা ভূত ভয় দেখাবে, আর আমি ভয় পেয়ে যাব? তবে তোমরা যখন বলছ, তখন জুতোটা ঘরের বাইরে রাখা যেতে পারে।
কেউ কিছু বলার আগেই অর্জুন এগিয়ে গিয়ে জুতোটা দরজার বাইরে একপাশে রেখে দিল। এবার মিসেস গ্রান্ট বললেন, “ওয়েল! লেস গো ব্যাক টু আওয়ার রেসপেক্টিভ বেডস্।’
সবাই চলে গেলে অর্জুনের মেজরের ঘরে ঢুকল। এসব ব্যাপার মেজরের মাথায় মোটেই নেই। তিনি তখন টেলিফোন নিয়ে বসে। “ইয়েস! মেজর, টেল হিম আই ওয়ান্ট হিম রাইট নাউ।” মেজর অর্জুনের দিকে তাকালেন,
“ব্যাটা মুক্তো খুঁজছে! তার চেয়ে যে কয়েক লক্ষ গুণ দামি কাজ…” বলেই চিৎকার করে উঠলেন, “ও, মার্শাল : ইউ লিট্ল ডেভিল, আমি এখন বোল্টনে! কী বলছ, দারুণ কাজ হচ্ছে? ছাই হচ্ছে। উড়ুক্কু মাছ কেন? হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার ওই উড়ুক্কু মাছ চাই। আমি কালই রওনা হচ্ছি।
অর্জুন বলল, “জিজ্ঞেস করুন তো ওঁর কোনও কর্মচারীর গলায় ক্যান্সার আছে কি না?”
রিসিভারের হাত চাপা দিয়ে বিরক্ত হয়ে অর্জুনের দিকে একবার তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন মেজর, “কী? কারও ক্যান্সার নেই? সে কী? আহা, এমনও তো হতে পারে, তোমার কাছে চেপে গিয়েছে চাকরি হারাবার ভয়ে। আমি কালই তোমার কর্মচারীদের ডাক্তার নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করাব। তুমি কিছু বুঝতে পারছ না? হেহে। সবই যদি বুঝবে, তা হলে তুমি মার্শাল আর আমি মেজর হব কেন? ঠিক হ্যায়, কাল দেখা হবে।”
রিসিভার রেখেও মেজরের উত্তেজনা কমল না। চোখ বন্ধ করে হাসলেন, “মার্শালটা সত্যি পণ্ডিত। আচ্ছা, পণ্ডিতরা মাঝে-মাঝেই এরকম হাঁদা হয় কেন, বলো তো? কিস্যু বুঝতে পারে না।”
মেজরকে শুভরাত্রি জানিয়ে অর্জুন বাইরে বেরিয়ে এল। আবার বাড়িটা শব্দহীন হয়ে গেছে। প্যাসেজের আলোগুলোকে এখন বিবর্ণ বলে মনে হচ্ছে। চার্লি যেভাবে ভূতের কথা বলল, তারপর আজ রাত্রে কেউ সম্ভবত নিজের ঘরের বাইরে পা দেবে না। অর্জুন খানিকটা দূর চলে এসে আবার থমকে দাঁড়াল। ওই জুতোয় যদি ভূত থাকে চার্লির কথামতো, তা হলে এই তো সুযোগ। আজ অবধি সে কখনও ভূত দ্যাখেনি। চটপট ফিরে গিয়ে বাঁ হাতে ফিতে ধরে জুতোজুড়ো ঝুলিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করল। ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় চুরুট রেখে গিয়েছিল ছাইদানিতে, ফিরে এসে আবার ধরাল ওটাকে। মেজর যে স্বপ্ন দেখে অমন কাণ্ড করবেন কে জানত! মুশকিল হল স্বপ্নটাকে সত্যি ভাবতে ওঁর ভাল লাগছে।
অর্জুনের মনে হল পৃথিবীটা আরও নিশ্চুপ হয়ে গেছে। এইবার শুয়ে পড়া উচিত। মিসেস গ্রান্ট সত্যি ভাল মহিলা। ম্যাজিক দেখাতেন আগে পেশাদারি ভাবে। এখন আর বাইরের লোকের সামনে দেখাতে চান না। এরকম মানুষের সঙ্গে কার না থাকতে ভাল লাগে। কিন্তু তিনিও কি জুতোর ভূতটাকে বিশ্বাস করলেন! অর্জুন জুতোর দিকে তাকাল। আচ্ছা, সে ঘরে ঢুকে ও-দুটো রাখার সময় গায়ে-গায়ে রেখেছিল, না অতটা ছেড়ে রেখেছিল? অর্জুনের অস্বস্তি হচ্ছিল। সে চুরুটটাকে রেখে উঠে জুতোজোড়ার কাছে এসে একটাকে তুলে ধরল। দেখতে যেমন মনে হয়, ততটা ভারী নয় মোটেই। কোথাও সামান্য নোংরা লেগে নেই। কিন্তু তারপরেই একটা জায়গা দেখে তার চোখ ছোট হয়ে এল। সে পলকে দ্বিতীয় জুতোটা তুলে নিল। ডানদিকেরটায় বাঁ দিকে আর বাঁ দিকেরটায় ডান দিকে কালচে দাগ যেন সেঁটে আছে। জুতোটা পালিশ হয়নি অনেক দিন। ফলে জুতোর ব্রাউন রঙের সঙ্গে এই কালচে রংটা মিশে গিয়েও থেকে গেছে। ও-দুটোকে টেবিলের ওপর রেখে সে নিজের স্যুটকেস খুলল। তারপর যে ম্যাগনিফায়িং কাচ সে টাইম স্কোয়ারের ফুটপাথ থেকে কিনেছিল, সেটা বের করে কালচে রংটার ওপর ধরল। হ্যাঁ, কোনও তরল পদার্থ জুতোয় পড়ে শুকিয়ে সেঁটে গেছে। অর্জুন সোজা হয়ে বসল। একমাত্র রক্তই শুকিয়ে গেলে কালচে হয়ে যায়। কিন্তু এটা রক্তের দাগ কি না, তা পরীক্ষা না করালে বোঝা যাবে না।”
কিন্তু অর্জুনের মন খুঁতখুঁত করতে লাগল। আচ্ছা, ঠিক এই জুতোজোড়ার জন্য ডিপার্টমেন্টাল শপে কি লোক দুটো ঢুকেছিল? দাগটা, অর্থাৎ তরল পদার্থ পড়েছে ঠিক ওপর থেকে সরাসরি একই জায়গায়। ফলে জুতোর দু’পাটির মাঝখানে রং লেগেছে। এই তরল পদার্থ যদি রক্ত হয়, তা হলে নিশ্চয়ই জুতোর মালিককে খুন করা হয়েছে, কিংবা তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন। কিন্তু লোকটা যদি খুন হয়েই থাকেন, তবে তাঁর জুতো সেকেন্ড হ্যান্ড সেন্টারে যাবে কী করে, অথবা সেই জুতোর খোঁজে লোক দুটো সেখানে পৌঁছবে কেন? হঠাৎ অমল সোমের একটা উপদেশ মনে পড়ল অর্জুনের। কোনও প্রমাণ ছাড়া শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যাওয়া মূর্খতার সামিল। এটা যদি রক্ত না হয়, তা হলে কোনও মানুষ খুন হননি। রক্ত হলেও মানুষটি খুন হয়েছেন তা বলা যাবে না। অনেক কারণেই রক্তপাত হতে পারে। যার জুতো, তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করায় সেকেন্ড হ্যান্ড সেন্টারে দিয়ে যেতে পারেন। এবং ওই লোক দুটোর আসার সঙ্গে এই জুতোর কোনও সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। এই পর্যন্ত ভাবার পর অর্জুনের মাথাটা হাল্কা হয়ে গেল।
সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আঃ, কী আরাম। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই আবার জুতোর কথা মনে হল। অনেক চেষ্টা করেও সে জুতোটাকে ভুলতে পারছে না। অর্জুন উঠে বসল। চার্লির কথা সত্যি নাকি? সে যে এত ভাবছে, তা কি ওই জুতোর ভূতের জন্যে? আচ্ছা, একটা কাজ করলে কেমন হয়! ডিপার্টমেন্টাল শপে টেলিফোন করে জিজ্ঞেস করা যায়, এই জুতোজোড়া তাঁরা কোত্থেকে কিনেছেন। মালিকের নাম পেলে ব্যাপারটার সুরাহা হয়ে যাবে। কিন্তু বিছানা ছেড়ে টেলিফোনের দিকে এগোতে গিয়ে তার খেয়াল হল, ডাইরেক্টরি দেখে নাম্বার বের করেও কোনও লাভ হবে না। এত রাত্রে নিশ্চয়ই কোনও দোকান খোলা থাকবে না।
অথচ ঘুম আসছে না। অর্জুন আবার টেবিলে গিয়ে বসল। অভিযানের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই জুতো। সাধারণ মানুষ কখনও পথে পরে বের হবে না। সে কাচটা আবার তুলে নিল। তরল পদার্থটা পড়ে গড়িয়ে গেছে। ফলে জুতোয় দাগ বেশি লাগেনি। চট করে নজর করাও মুশকিল। কিন্তু শুকনো দাগ বলছে, ওটা ওপর থেকে পড়েছে। অর্জুন ম্যাগনিফাইং কাচটা এবার জুতোর অন্য অংশে নিয়ে গেল। খুব বেশি দিন ব্যবহৃত হয়নি এগুলো। ডান পায়ের গোড়ালির তলা সামান্যও খয়ে যায়নি। বাঁ-পাটিটা সে তুলে ধরল। কাচের ভেতর দিয়ে জুতোটার শরীর অনেকগুণ বড় দেখাচ্ছিল। গোড়ালির হিলের কাছে কাচটা পৌঁছবার পর সে সামান্য চমকে গেল। খালি চোখে যেটাকে চামড়ার জোড়ের দাগ বলে মনে হচ্ছিল, সেটাকে যেন অন্যরকম লাগছে কাচের মধ্যে দিয়ে। সে ডান-পার্টির গোড়ালির জোড়টা দেখল। একদম অটুট। কিন্তু বাঁ-পাটির জোড়টা যেন বেশিদিন লাগেনি। কারণ জোড়ের গায়ে দুটো ছোট্ট দাগ আছে। সম্ভবত কিছু দিয়ে ওখানে চাপ দেওয়া হয়েছিল। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনেকক্ষণ সে জোড়টা দেখল। ঠিক সমানভাবে বসেনি, যেমনটি ডান পায়ে বসে গেছে। সে একটা আলপিন তুলে নিয়ে জোড়টায় চাপ দিল। কিন্তু তাতে আলপিনটাই বেঁকে গেল। একটা শক্ত কিছু চাই। অর্জুন উঠে ঘরের চারপাশে দেখতে দেখতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে চলে এল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা চুলের কাঁটা খুঁজে পেল। কালো কাঁটাটা পড়ে ছিল ড্রয়ারের এক কোণে।
কাঁটাটা নিয়ে অর্জুন ফিরে এল টেবিলে। তারপর ওর দুটো মুখ সামান্য চেপে জোড়ের ভেতর ঢোকাতে চেষ্টা করে বিফল হল। হঠাৎ খেয়াল হতে পাশাপাশি ছোট্ট দাগ দুটোয় চুলের কাঁটার প্রান্ত রেখে সে চাপ দিতে লাগল। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ধীরে-ধীরে কাঁটাটা ভেতরে ঢুকতে লাগল। ইঞ্চিখানেক ঢোকার পর আর-একটু চাপ দিতেই স্প্রিং-এর মতো তলাটা নেমে গেল খানিকটা। হতভম্ব অর্জুন দেখল, জুতোর গোড়ালির ভেতরে একটা বোতামে চাপ পড়তেই এই কাণ্ড ঘটেছে। এবং তখনই সে কাগজটাকে দেখতে পেল।
কাঁপা-কাঁপা হাতে সুন্দর ভাঁজ করা কাগজটাকে বাইরে বের করল সে। একটা সেলোফেন পেপারে ওটাকে এমন করে রাখা আছে, যাতে জলেও নষ্ট না হয়। বের করে ভাঁজ খুলে কাগজটা সামনে ধরল অর্জুন। কালো কালিতে পর পর কয়েকটা শব্দ লেখা রয়েছে। ‘বি. পি.। এস. এফ.। শ্যাডো কিসড্ দ্য পপলার। ফোর এল. টু ইউ।’
বারংবার শব্দগুলো, অক্ষরগুলো পড়ল অর্জুন। পারছে না। কিন্তু এখন এটা দিনের মতো সত্যি যে, মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে এই জুতোর মালিক খুব গোপন কিছু এই কাগজে লিখে রেখেছেন। তিনি চাননি, কাগজটা অন্য কারও হাতে পড়ুক। এবং এখন এটাও স্পষ্ট যে, ওই লোক দুটো জানতে পেরেছিল, জুতোর মধ্যে কোনও খবর পাওয়া যাবে। ওরা নিশ্চয়ই দেরিতে জেনেছে। হতে পারে লোকটা খুন হয়ে যাওয়ার পরে।
অর্জুন রোমাঞ্চিত হল। বি. পি. মানে ব্ল্যাকপুল নয় তো? মেজর তো আগামীকালই তাকে ব্ল্যাকপুলে নিয়ে যাচ্ছেন।
ইংল্যান্ডের একটি সমুদ্রতীরের শহরের নাম ব্ল্যাকপুল। সেখানে মেজরের পুরনো বন্ধু মার্শাল গবেষণা করছেন। সমুদ্রের জলে ঝিনুক এবং মুক্তো নিয়ে নানান পরীক্ষা। মেজর এসেছেন এবার বন্ধুর সঙ্গে যোগ দিতে। দেশে ফেরার পথে আমেরিকা থেকে উড়ে অর্জুন নেমেছে লন্ডনে ক’দিনের স্টপওভার নিয়ে। আবার কখনও ইংল্যান্ডে আসা হবে কি না সন্দেহ; বাড়তি ভাড়া যখন লাগছে না, তখন এত-নাম-জানা দেশটাকে কে দেখতে না চায়!
জুতোর মধ্যে থেকে কাগজটাকে আবিষ্কার করার পর অর্জুন বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। লোক দুটো ডিপার্টমেন্টাল শপে যে এইজন্যেই এসেছিল, তাতে আর সন্দেহ নেই। অনেক রাত ধরে চেষ্টা করেও সে কাগজের লেখাটার গোপন অর্থ উদ্ধার করতে পারেনি। কিন্তু বুঝতে পারছে, কোনও গুরুত্বপূর্ণ বস্তু এই লেখাতে ধরা আছে। তা না হলে কেউ জুতোর মধ্যে অমন কায়দা করে লুকিয়ে রাখে! শেষ পর্যন্ত সে জুতোটাকে আবার ঠিকঠাক করে শুয়ে পড়েছিল।
সকালে ঘুম ভাঙল মেজরের ডাকে। দরজা খুলে সে দেখল, মেজর সেজেগুজে তৈরি। ঘরে ঢুকে মেজর বললেন, “ইয়াং ম্যান, এখনও পড়ে-পড়ে ঘুমোচ্ছ! আমার মর্নিং ওয়াক শেষ হয়ে গেছে কখন। তৈরি হয়ে নাও, আমরা ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়ব।”
চেয়ারে বসে পা ছড়িয়ে মেজর সঙ্গে-আনা সকালের কাগজ খুলে বসলেন। অর্জুন অপ্রস্তুত অবস্থায় তাড়াতাড়ি বাথরুমে চলে এল। সে বুঝতে পারছিল না, মেজরকে কাগজটার কথা বলবে কি না! কারণ, কয়েকদিন বাদেই সে চলে যাবে জলপাইগুড়িতে। এই রহস্যটায় সে কোনও ভূমিকা নিতে পারছে না যখন, তখন বলতে কোনও অসুবিধা নেই। অমল সোম বলেন, ‘গোপন তথ্য কাউকে জানালে সে আগবাড়িয়ে নিজের মতামত চাপিয়ে তোমাকে বিভ্রান্ত করতে পারে।’ তবে সে যখন তদন্ত করতে যাচ্ছেই না, তখন বলাই উচিত। হাজার হোক, জুতোটা মেজর কিনেছেন। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসামাত্র মেজর বললেন, “ওহে নবীন গোয়েন্দা, তোমার জন্যে একটা জব্বর খবর আছে।”
“আমি গোয়েন্দা নই, সত্যসন্ধানী! খবরটা কী?” অর্জুন হাসল।
“কাল যে ডিপার্টমেন্টাল শপে আমরা জুতো কিনেছিলাম, তার গার্ড খুন হয়েছে। দোকান বন্ধ হয়েছে সাতটায়। খুন হয়ে যায় ন’টায়। ডাকাতরা দোকানে ঢুকেছিল। গার্ড বাধা দিতে গিয়ে মারা পড়ে। বেচারা!” খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে মেজর জানালেন।
অর্জুন হতভম্ব হয়ে গেল। সে কাগজটা নিজের হাতে নিয়ে আবার খবরটা পড়ল। বিস্তৃত বিবরণ কিছু নেই। সে দোনোমনা করে জিজ্ঞেস করল, “আমাদের কি আজই ব্ল্যাকপুলে যেতে হবে?”
“অফ কোর্স! আমি মার্শালকে টেলিফোনে তাই বলেছি।”
‘বেশ। যাওয়ার আগে একবার ওই ডিপার্টমেন্টাল শপে যাবেন?”
“মাথা খারাপ? সেটা কত পেছনে তা জানো? কী দরকার সেখানে?”
অর্জুন এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে জুতোটা তুলে নিল, “কাল রাত্রে গার্ডটি খুন হয়েছে আপনার এই জুতোর জন্যে। আপনি যদি আগে না কিনতেন, তা হলে এই খুনটা হত না। আপনার পরে কারও প্রয়োজন হয়েছিল এই জুতো।”
“কী বলছ যা-তা?” মেজরের চোয়াল ঝুলে পড়ল যেন।
“ঠিক বলছি। আপনার কেনার পর দু’জন লোক এসেছিল এটার খোঁজে। তারা জুতোজোড়া না পেয়ে ফিরে গিয়েছিল। পরে নিশ্চয়ই কেউ তাদের বলেছিল, আবার ভাল করে খুঁজে দেখতে। সেটা করতে গিয়েই মনে হচ্ছে এই কাণ্ড।”
অর্জুনের কথাটা শেষ হওয়ামাত্র মেজর দু’পা এগিয়ে এলেন, “কী আছে জুতোটায়? চার্লি বলছিল, ওটা ভুতুড়ে জুতো। কিন্তু তুমি এসব জানলে কী করে?”
অর্জুন আবার চুলের ক্লিপ দিয়ে জুতোর নীচটা খুলল। মেজর অবাক হয়ে গোপন চেম্বারটা দেখলেন, “মাই গড! কী ছিল ওখানে?”
অর্জুন এবার কাগজটা বের করল। সেটা পড়ে মেজর চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “এইসব কথার মানে কী?”
“মানেটা বুঝলেই সব সরল হয়ে যাবে। আপাতত বুঝতে পারছি, এই কাগজটার জন্যে একদল মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করছে না। আপনি যে এসব জানেন, তা কাউকে বলবেন না।” অর্জুন জুতোটা আবার ঠিকঠাক করে রাখল।
মেজর বললেন, “মাথা খারাপ! মনে হচ্ছে ওই জুতোটাই ফেলে দেওয়া উচিত।”
“জুতোটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আপাতত এটা কারও সামনে বের না করাই ভাল।”
অর্জুনের কথা শেষ হওয়ামাত্র চার্লি দরজায় দাঁড়াল। তাকে এক রাত্রেই খুব অসুস্থ দেখাচ্ছে। চার্লি বলল, “গুডমর্নিং! ব্রেকফাস্ট ইজ রেডি!”
অর্জুন বলল, “আমরাও। চলো, যাচ্ছি। মিসেস গ্রান্ট উঠেছেন?”
“মিসেস গ্রান্ট আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন।” কথাটা বলেও সে গেল না। সামান্য দ্বিধা কাটিয়ে সে বলল, “মেজর, আপনাকে একটা অনুরোধ করব?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। মেজর মাথা নাড়লেন।
“ওই জুতোটা আপনি পরবেন না। কাল সারারাত আমি আমার মৃত আত্মীয়দের স্বপ্নে দেখেছি। ভোর রাতে ওই জুতোর ভূতটা আমার দিকে তেড়ে এসেছিল। ওটাকে আপনি ফেলে দিন,” বৃদ্ধ নিগ্রোটি খুব করুণ গলায় বলল।
“তুমি ফেলে দাও চার্লি। আই ডোন্ড মাইন্ড। লেট্স গেট রিড অব ইট!”
মেজর কিছু বলার আগেই জুতোজোড়া চার্লিকে দিয়ে দিলেন। যেভাবে লোকে মরা নেংটি ইঁদুরের লেজ ঝুলিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি করে চার্লি ও’দুটো নিয়ে দ্রুত চলে গেল। অর্জুন বলল, “কাজটা ঠিক হল না। পুলিশকে আপনি প্রমাণ দিতে পারবেন না।
“পুলিশ? পুলিশের কাছে কে যাচ্ছে? ওসবে আমি নেই। আমি অভিযাত্রী, আসামি নই। চলো, মন খুলে ব্রেকফাস্ট খাই।” মেজর হাঁটতে লাগলেন। যেন জুতোর ভার কমিয়ে তিনি এখন খুব হাল্কা হয়ে গেছেন।
ব্রেকফাস্ট টেবিলে মিসেস গ্রান্টের সঙ্গে দেখা হল। এবং যথারীতি কালকের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ উঠল। তিনি বললেন, “অর্জুন, তুমি কি ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং বলে মনে করছ? আমি ভাবছিলাম, আমেরিকায় অত বড় কাণ্ড করে এলে, ইংল্যান্ডেও যদি কিছু করো, তা হলে মন্দ হয় না।”
অর্জুন বলল, “আমি তো ব্যাপারটার কিছুই জানি না। যেহেতু দোকানটা গতকাল দেখেছি, তাই আগ্রহ হচ্ছে।”
মেজর মাথা নাড়লেন, “না, না। আজ আমাদের ব্ল্যাকপুলে যেতে হবে। মিসেস গ্রান্ট বললেন, “তোমাকে না হয় আজই যেতে হবে, কিন্তু অর্জুন যদি দু’দিন বাদে যায়, তা হলে ক্ষতি কী?”
অর্জুন বলল, “কোনও ক্ষতি নেই। মেজরের চলে যাওয়াই ভাল।
“ভাল কেন?” মেজর চোখ তুললেন।
“বলা যায় না, কী হতে কী হয়ে যায়!”
“কী? আমি কাওয়ার্ড? ডরপুক? কী ভাবো তুমি আমায়? জানো, আমি পিগমিদের তীর উপেক্ষা করে হেঁটে গেছি! আগামী বছর আমি ইয়েতি খুঁজতে হিমালয়ে যাব। বেশ, আমি থেকেই গেলাম। মার্শালকে ফোন করে দিচ্ছি।” মেজর কারও কোনও কথা না শুনে হনহন করে উঠে গেলেন টেলিফোনের দিকে।
মিসেস গ্রান্ট হাসলেন, “মেজর সত্যি মাঝে-মাঝে বাচ্চা ছেলে হয়ে যান। সত্যি বলো তো, অর্জুন, তুমি কি ইন্টারেস্টেড? এই গার্ডটিকে আমি চিনতাম।”
“ইন্টারেস্টেড। কিন্তু আপনি যদি সাহায্য করেন।
“আমি? কীভাবে?”
“আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন। আপনার ম্যাজিকের সাহায্য যদি পাই, তা হলে এগিয়ে যেতে পারি,” অর্জুন খুব আন্তরিকভাবে বলল।
“আমি জানি না ম্যাজিক তোমার কী কাজে লাগবে। ম্যাজিক মানে তো ভাঁওতা। এই এলাকার পুলিশের বড়কর্তা আমার খুব ফ্যান। এটুকু বলতে পারি, আমি গেলে তিনি তোমাকে সাহায্য করবেন,” মিসেস গ্রান্ট বললেন।
