৮.
ব্রাউন উসখুস করছিল। দ্বীপটা খুব বড় নয়। জন্তু-জানোয়ার আছে বলে মনে হচ্ছে না। মেজর এবং অর্জুনকে যেতে দেওয়ার পর তার খুব একা-একা বোধ হল। জঙ্গলের মধ্যে না দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে চলে এল সে। এখান থেকে কোনও স্থলরেখা দেখা যায় না। সূর্য ওঠার পর হাওয়ার তেজ বেড়েছে। ফলে ঢেউগুলো বেশ ফুলে উঠছে। কাল রাত থেকে তেমন খাওয়াদাওয়া হয়নি। ভেবেছিল ওই লোক দুটোকে জপিয়ে খাবার কেনাবে। কিন্তু মেজর এমন ঝামেলা শুরু করল যে, মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল তার। ওরা কিছু না বললেও ব্রাউন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে শুধু বেড়াবার জন্য এখানে কেউ আসে না। যাদের পেছনে লোক লেগে গেছে তাদের নিশ্চয়ই কোনও গোপন ব্যাপার আছে। ছোটখাটো কিছু অপরাধ মার্শাল করেছে। কিন্তু বড় অপরাধ করতে সাহস হয় না এবং ইচ্ছাও করে না। কিন্তু ওর কেবলই মনে হচ্ছিল এই লোক দুটোর সঙ্গে লেগে থাকলে তার আখেরে লাভ হবে। যদি ফালতু কিছু টাকা ম্যানেজ করা যায়, তা হলে কিছুদিন নিশ্চিন্ত। অতএব এখন তার উচিত এদের সাহায্য করা। হাঁটতে-হাঁটতে একটা গাড়ির সামনে চলে এল ব্রাউন।
তার চোখ ছোট হয়ে এল। দু’ধারে জঙ্গল নিয়ে জল ঢুকে এসেছে অনেকটা ভেতরে। সেখানে অবশ্য ঢেউ ওঠার কথাও নয় কিন্তু একটা চওড়া কাঠের পাটাতন ভাসছে। পাটাতনটা লোহার শেকলে বাঁধা। মাটি থেকে পা ফেললেই ওই পাটাতনে ওঠা যায়। জিনিসটাকে খাড়ির মধ্যে জঙ্গলের আড়ালে প্রায় লুকিয়েই রাখা হয়েছে। ব্রাউন বুঝতে পারল এই পাটাতন নিয়ে যেহেতু সমুদ্রে ভেসে যাওয়া সম্ভব নয় তাই যারা এটাকে ব্যবহার করে তারা অন্য কাজে লাগায়। কাজটা কী ওর মাথায় ঢুকছিল না।
এইসময় একটা মোটরবোটের আওয়াজ কানে এল ব্রাউনের। সে চটজলদি নিজেকে একটু আড়ালে নিয়ে গেল। শব্দটা বাড়তে বাড়তে কাছে এসে গেল। এবার মোটরবোটটাকে দেখতে পেল সে। সমুদ্র থেকে খাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। ব্রাউনের খুব কৌতূহল হচ্ছিল এগিয়ে গিয়ে খাড়ির সামনে দাঁড়াতে। সে উসখুস করছিল। এমন সময় পিঠে একটা ভারী থাপ্পড় পড়তেই ঘুরে দেখল স্বাস্থ্যবান একটা লোক তার কাঁধটাকে যেন মুঠোর মধ্যে পুরে নিয়েছে। ব্রাউন আর্তনাদ করে উঠল, “এ কী হচ্ছে? আমাকে তো এখানেই অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।”
“কে বলেছে?” লোকটা নিষ্ঠুর গলায় জানতে চাইল।
“নাম জানি না। আমার সঙ্গীদের নিয়ে ভেতরে গিয়েছে।”
“চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকো। আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখা হচ্ছিল। কথাগুলো যদি মিথ্যা হয় তা হলে খাড়িতে ডুবিয়ে রাখব।” লোকটার কথা শেষ না হওয়ামাত্র দু’জন লোক খুব দ্রুতপদে খাড়ি থেকে উঠে এল। তাদের একজনের বয়স নির্ঘাত ষাটের কাছাকাছি। অন্যজন যুবক এবং স্বাস্থ্যবান। ওরা বড়-বড় পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল। ব্রাউনের কাঁধ ধরে থাকা লোকটি চেঁচিয়ে উঠল, “এখানে তিন নম্বরটাকে পেয়েছি বস।
শক্ত চেহারার প্রৌঢ় চকিতে ঘুরে দাঁড়াল। ব্রাউন দেখল, সঙ্গী যুবকটি যেভাবে সতর্ক হল তাতে বোঝা যায় ওর রীতিমত প্রশিক্ষণ নেওয়া আছে। হঠাৎ প্রৌঢ় চিৎকার করে উঠল। তারপর দু’হাত বাড়িয়ে ছুটে এল। ব্রাউন কিছু বোঝার আগেই তাকে দুহাতে জড়িয়ে প্রায় নাচতে লাগল লোকটা, “ও আমার মাথামোটা, ও আমার ছাগলদাড়ি, শেষ পর্যন্ত এখানে আসার সময় হল তোমার? উঃ, কী যে ভাল লাগছে। আমি কবে থেকে তোমাকে আশা করে আছি।
আদরের বহর দেখে পেছনের লোকটা তার কাঁধ ছেড়ে দিয়েছিল। ব্রাউন হতভম্ব। লোকটা করছে কী! উচ্ছ্বাস কমে এলে লোকটা ব্রাউনের হাত জড়িয়ে ধরল, “কিন্তু তুমি এখানে এলে কী করে? মোটরবোটে? আহা, আগে জানলে আমিই তোমার আসার ব্যবস্থা করতাম।”
ততক্ষণে মাথায় ভাবনাটা এসেছে। এই লোকটা তাকে মেজরের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে না তো! সে কিছু বলার আগেই লোকটা তার হাত ধরে হাঁটতে লাগল। পেছন থেকে সেই স্বাস্থ্যবান লোকটি বলে উঠল, “সার, ক্যাম্পে আরও দু’জন আছে।”
“আরও দু’জন? মেজর, তোমার সঙ্গে আর কারা এসেছে?”
এবার ব্রাউন মাথা নাড়ল, “আমি এতক্ষণ আপনকে বলতে পারছিলাম না সার, আমি মেজর নই। তিনি ভেতরে গেছেন। মানে তাঁকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
“অ্যাঁ!” লোকটা ব্রাউনের হাত ছেড়ে ছিটকে সরে গেল, “তা হলে তুমি কে?”
“আমি ব্রাউন। মেজরের সঙ্গে এসেছি।”
মুখে হাত দিল লোকটা, “তাই তো। আমার যেন কেমন সন্দেহ হচ্ছিল। মেজর হলে এতক্ষণ মেশিনগান চালাত। ওকে ধরে নিয়ে এসো। যদি জালিয়াতি হয় তা হলে ওর ব্যবস্থা তোমরা করবে।” কথা শেষ করে লোকটা দ্রুত পা চালাল। ব্রাউনের কনুই খপ করে ধরল সেই স্বাস্থ্যবান। প্রায় ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে চলল তাকে।
দরজার দিকে তাকিয়ে মেজর বিকট শব্দ করে উঠলেন। যেহেতু মুখ বন্ধ, নাক দিয়ে ছাড়া আওয়াজ করা সম্ভব নয়, তাই সেটা খুব করুণ শোনাল। দরজা দিয়ে ছুটে এসে আচমকা থমকে দাঁড়াল মার্শাল। সন্দেহের চোখে মেজরকে দেখতে লাগল। মেজর তখন ছটফট করছেন। মার্শালের ইঙ্গিতে ওর সঙ্গে তাঁবুতে ঢোকা একটা লোক মেজরের মুখ থেকে প্লাস্টার সরিয়ে নেওয়ামাত্র চিৎকার শুরু করল, “বদমাশ, জলদস্যু, নচ্ছার, নেমন্তন্ন করে আমাকে এভাবে অপমান করা?”
সঙ্গে-সঙ্গে দু’হাত তুলে চিৎকার করে উঠল মার্শাল, “আর ভুল হয়নি। এ একেবারে সেন্ট পার্সেন্ট মেজর।” বলে নিজেই ওঁর বাঁধন খুলে জড়িয়ে ধরলেন। মেজর তখনও চিৎকার করে যাচ্ছিলেন। তাঁর রাগ কমছিল না। মার্শাল সেই অবস্থায় বললেন, “আমার জায়গায় থাকলে তুমিও এই কাণ্ড করতে। ঠাণ্ডা হয়ে বোসো, তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।”
মেজর অর্জুনের দিকে তাকালেন। চোখ বন্ধ করে আছে অর্জুন, ব্যথাটা তখনও মালুম দিচ্ছে।
মেজর চিৎকার করে বললেন, “তুমি, তুমি জানো এই ছেলেটার হাল কী করেছে তোমার লোকজন? মেরেই ফেলত বোধ হয়! মার্শাল, তুমি না বিজ্ঞানী? রিসার্চ করছ? ছি, ছি, ছি। কে ভেবেছিল তুমি কতগুলো গুণ্ডা নিয়ে এখানে রিসার্চ চালাচ্ছ! না, না, তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই আমার।”
মার্শাল দাড়িতে হাত বোলাল কয়েক সেকেন্ড। তারপর অর্জুনের কাছে এসে বলল, “সরি ব্রাদার। আমার মনে হচ্ছে তুমিই সেই প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর, যার কথা মেজর আমায় লিখেছিল। আমি সত্যি দুঃখিত। ব্যাপারটা মনে না রাখলেই খুশি হব।” অপরাধীর মতো ভঙ্গি ছিল কথাগুলো বলার সময়। হঠাৎ সচেতন হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তা হলে ওই ভদ্রলোক কে? ওকে তো আমি মেজর বলেই মনে করেছিলাম।”
সঙ্গে-সঙ্গে মেজরের গলা থেকে ব্যঙ্গ ছিটকে উঠল, “মনে করেছিলে? আহা, আর তুমি নিজেকে আমার বন্ধু বলে দাবি কোরো না। ওই বদমাশ আর আমি এক হয়ে গেলাম?”
“বদমাশ?” মার্শাল যেন হতভম্ব, “কী আশ্চর্য? এই লোকটা তো ঠিক তোমার কার্বনকপি। ও কি তোমাদের সঙ্গে আসেনি?”
মেজর কিছু বলার আগেই অর্জুন জবাবটা দিল, “মিস্টার ব্রাউন আমাদের সঙ্গে এসেছেন।”
“মিস্টার ব্রাউন তোমাদের বন্ধু?”
মেজর মাথা নেড়ে তাড়াতাড়ি বললেন, “নো, নেভার। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।”
“তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ব্রাউনকে তুমি পছন্দ করছ না!”
‘একশোবার। যেমন এই মুহূর্তে পৃথিবীতে যদি সবচেয়ে অসহ্য বলে কাউকে মনে হয়, সে হল তুমি? উঃ, আমি ভাবতেই পারছি না এমন অভ্যর্থনা।
মার্শাল পকেট থেকে একটা দামি চুরুট বের করে সামনে ধরল, “টানো “এটা কী?”
“তুমি এককালে এই চুরুট খুব পছন্দ করতে। মেজর শান্ত হও। আমি ক্ষমা চাইছি। কী অবস্থায় পড়ে এমন ব্যবস্থা নিয়ে থাকতে হচ্ছে তা যদি জানতে, তা হলে আমার ওপর এত রাগ করতে না।” মার্শালের মুখে আবার বিমর্ষ ছাপ এল।”
সেটা বলে ফেললেই হয়। দ্যাখো মার্শাল, যতদিন তুমি আমার সঙ্গে বা নিজে পৃথিবীর চারপাশে কোনও কিছু আবিষ্কারের নেশায় অভিযানে বের হতে ততদিন তুমি ছিলে আমার চেনা। এই বড়লোক হবার নেশায় মুক্তোর ব্যবসায় নেমে সর্বনাশ হয়েছে তোমার।’ মেজর চুরুট ধরিয়ে একটা আরামের টান দিলেন।
মার্শাল একজন সহকারীকে চটপট কফি বানাতে হুকুম দিয়ে বললেন, “সব বলব তোমাদের। আমি খুব উত্তেজনায় রয়েছি। যে-কোনও মুহূর্তে আমার প্রাণসংশয় হতে পারে। এখানে যারা রয়েছে তারা আমার কর্মচারী। মাইনে পায়। এদের কাছ থেকে সবসময় সততা আশা করা যায় না। তোমরা এসে পড়লে যেশাসের দয়ায়। কিন্তু ওই লোকটা, যার নাম ব্রাউন, তাকে নিয়ে কী করবে? ওকে ফেরত পাঠিয়ে দেব?”
মেজর মুখ খোলার আগেই অর্জুন জবাব দিল, “উনি খুব খারাপ লোক নন। থাকুন না, অবশ্য যদি আপনার কিছু আপত্তি না থাকে।”
“তোমাদের সঙ্গে এসেছে। আমি ততক্ষণই আপত্তি করব না, যতক্ষণ সে আমাদের ব্যাপারে নাক গলাবে না।” এইসময় কেউ একজন ডাকতেই মার্শালসাহেব দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল।
এখানে সারাদিন খুব হাওয়া বইল। যাকে বলে সামুদ্রিক বাতাস, তাই। তাঁবু কাঁপিয়ে দিচ্ছিল বারংবার। অর্জুনদের জন্যে আর-একটি তাঁবু পাতা হয়েছে। সেটিতে রয়েছে অর্জুনের সঙ্গে ব্রাউন। মেজর আছেন তাঁর পুরনো বন্ধু মার্শালের তাঁবুতে। অভিমানের পালা চুকে যাওয়ার পর দুই বন্ধু এখন এক। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরেও অর্জুনের শরীরে অস্বস্তি ছিল। ব্রাউন কিন্তু পড়ে-পড়ে ঘুমোচ্ছে। ঘুমন্ত মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে সত্যি অবাক হল অর্জুন। মেজরের সঙ্গে অন্তত ষাট ভাগ মিল রয়েছে। কোটি-কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে সৃষ্টির সময় ঈশ্বরেরও তো ভুলচুক হতে পারে। কত আর নতুন ছাঁচ পাবেন তিনি। কখনও-কখনও একই মুখ পৃথিবীর দুই প্রান্তে ছেড়ে দেন। যে ছেলেটি জলপাইগুড়ির জেলা স্কুলে পড়ে, তার মতো দেখতে অবিকল একজন হয়তো রয়েছে কোনও এস্কিমোদের ইগলুতে। জীবনে তাঁদের দেখাদেখি হওয়ার কোনও সম্ভাবনার কথা ঈশ্বর চিন্তা করেননি। কিন্তু কারও যদি পায়ের তলায় সরষে লাগানো থাকে তো এই মেজর-ব্রাউনের মতো কাণ্ড হয়ে যেতে পারে।
তিনটে নাগাদ অর্জুন তাঁবু থেকে বের হল। সামনেটা ফাঁকা। সমুদ্রের গর্জন কানে আসছে। ওপাশে মেজরদের তাঁবুর পাশাপাশি আরও কয়েকটা। অর্জুন স্থির দাঁড়িয়ে চারপাশ লক্ষ করছিল। এখনও মার্শাল বলেনি এমন কঠোর নিরাপত্তার কারণ কী! অতএব প্রহরী রয়েছে কাছেপিঠে। ওরা হয়তো অর্জুনকে স্বাধীনভাবে ঘুরতে দেবে না। কিন্তু কেন? অর্জুন বড়-বড় পা ফেলে মার্শালের তাঁবুতে ঢুকল। মার্শাল নেই। মেজরের নাক ডাকছে। তাঁবু থেকে বেরিয়ে সে চটপট পেছন দিকে চলে এল। চারপাশেই জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা। তবু প্রহরী বলে কাউকেই নজরে পড়ছে না। সমুদ্রের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ একটা শিষ বাজল। তারপরেই একটা লোক যেন ম্যাজিকের মতো উদয় হল, “সার, সমুদ্রের দিকে যাওয়াটা ঠিক হবে না।”
“কেন?” অর্জুনের চমক লাগল।
“মিস্টার মার্শাল আমাদের সেইরকম নির্দেশ দিয়েছেন।”
“ওদিকে গেলে কী হবে?”
“হয়তো আপনাদের নিরাপত্তার জন্যেই এই ব্যবস্থা।”
“কিন্তু ভাই, আমরাও তো সমুদ্র ডিঙিয়ে এখানে পৌঁছেছি। কোনও বিপদ হয়নি।” অর্জুন ইচ্ছে করেই কথা চালাতে চাইল। কিন্তু লোকটা যথেষ্ট বুদ্ধিমান, “এসব ব্যাপার নিয়ে আপনি বরং মিস্টার মার্শালের সঙ্গে আলোচনা করুন। আমাদের কর্তব্য করতে দিন।”
অতএব অর্জুনকে ফিরতে হল। মার্শালের তাঁবুতে ঢুকে সে মেজরকে জাগাল। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে মেজর ছোট চোখে ওকে দেখলেন। তারপর নিশ্বাস ফেলে বললেন, “আহা, তোমার জন্যে বড় কষ্ট হচ্ছে। একটু আরাম করে ঘুমোতেও পারো না।”
“এই দ্বীপে এখন আপনি আর মিস্টার ব্রাউন ঘুমোচ্ছেন। দু’জনের মিল খুব।”
“সে ঘুমোচ্ছে কেন?” মেজাজ চড়ে গেল মেজরের, “এতে ঘুমোবার কী আছে। আচ্ছা অর্জুন, এই উটকো লোকটাকে খামোকা আমার সঙ্গে রাখছ কেন? ওকে দেখলেই আমার কেমন একটা অস্বস্তি হয়। তা ছাড়া মার্শালের এখানে পৌঁছে যাওয়ার পর আর আমাদের ওকে কোনও দরকার নেই। বউ যাকে ঢুকতে দেয় না বাড়িতে তাকে তুমি আদর করছ।”
“মিস্টার মার্শালের কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর আমরা কি নিশ্চিন্ত?” অর্জুন নিচু গলায় প্রশ্ন করল। যদিও তার কোনও দরকার ছিল না। এই তল্লাটে বাংলা বোঝার মতো মানুষ খুঁজলেও পাওয়া যাবে না।
মেজর বললেন, “কী বলছ তুমি? মার্শাল আমার কত দিনের বন্ধু। তার নিয়ন্ত্রণে আমি তোমায় নিয়ে এখানে এসেছি। এখানে আমাদের ভয় কী?”
“সেটা এখনও বুঝতে পারছি না। কিন্তু এই তাঁবু থেকে বেশি দূরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।”
“কে নিষেধ করেছে?” মেজর ততক্ষণে তাঁবুতে রাখা বালতির জলে মুখ ধুয়ে নিচ্ছেন।
“মিস্টার মার্শালের নির্দেশে তাঁর কর্মচারীরা।”
তোয়ালেটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে মেজর গলা তুলে বললেন, “দেখি, কে আমাদের আটকায়? চলো আমার সঙ্গে।”
প্রায় ঘোঁত-ঘোঁত করেই মেজর তাঁবু থেকে বের হলেন। বেশি দূর যেতে হল না। প্রহরী ওই একই গলায় মনে করিয়ে দিল ব্যাপারটা। মেজর শূন্যে হাত ছুঁড়লেন, “ডেকে নিয়ে এসো মার্শালকে। কোথায় স্ ে?”
“সার, উনি এখন সমুদ্রের তলায়।”
“আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। হয় তাকে এখনই চাই, নয় আমাদের যেতে দিতে হবে।”
“কিন্তু সার, আপনি তো একটু আগে একই কথা বলে সমুদ্রের ধারে গেলেন!”
“আমি? একটু আগে? তুমি একটি বোকা। একটু আগে আমি ঘুমোচ্ছিলাম।”
“সে কী! মিনিশ-দশেক আগে আপনি এদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি আপত্তি করতেই ঠিক এইভাবে মার্শালসাহেবের নাম করে গালাগালি করলেন। বাধ্য হয়ে আমি আপনাকে ছেড়ে দিলাম। আপনি বলেছিলেন সমুদ্রের জল মুখে না দিলে আপনার গলায় ব্যথা হয়।” প্রহরীটি নিবেদন করল।
“সমুদ্রের জল মুখে…পাগল। দেওয়া যায় নাকি? ওই নুন-জল? গুল মারার জায়গা পাওনি? তোমার নাম কী হে? মার্শালের কাছে তোমার নামে রিপোর্ট করব আমি।” গর্জে উঠলেন মেজর।
অর্জুন তাঁর হাত ধরল, “মাথা ঠাণ্ডা করে শুনুন।”
“মাথা আর ঠাণ্ডা রাখা যাচ্ছে না অর্জুন। আমাদের এখনই এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত।”
“এখনই গিয়ে লাভ হবে না। মিস্টার ব্রাউন ফিরে আসুন আগে।
“মিস্টার ব্রাউন?”
“মনে হয় তিনিই সমুদ্রের জল দেখতে গিয়েছেন। লোকটা তাকে ‘আপনি’ বলে ভুল করছে।”
সঙ্গে-সঙ্গে লাফিয়ে উঠলে মেজর, “আমি তোমাকে বলেছিলাম, ওকে বিদায় করো। শুনলে না। এখন দেখেছ কাণ্ড। সব জায়গায় আমার চেহারার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে।”
“সব জায়গায় নেননি। ব্ল্যাকপুলে ব্রাউন না থাকলে প্রতিপক্ষ আপনাকেই জিপে তুলে নিয়ে যেত। আপনার জন্যেও ওঁকে বিপদে পড়তে হয়েছে।”
“কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল সঙ্গে ঘুরতে!” মেজর গলা নামালেন, “ঠিক আছে, এখন তুমি আমাদের কী করতে বলো?”
“আপাতত চলুন, তাঁবুতে ফিরে যাই। মার্শালসাহেব এলে তাঁর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা যাবে।” অর্জুন আর ঝামেলা বাড়াতে চাইল না।
মেজরকে তাঁর তাঁবুতে রেখে অর্জুন নিজেরটায় ফিরে এল। এত সতর্কতার কোনও কারণ সে খুঁজে পাচ্ছিল না। মার্শালসাসেব কী বলে দেখে তবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হ্যাঁ, ওর আমন্ত্রণ রাখতেই মেজর আমেরিকা থেকে এখানে এসেছেন। কিন্তু সেইসঙ্গে লকারের সাঙ্কেতিক ব্যাপারটাও তো রয়ে গেছে। সেটাকে শেষ অবধি না জেনে চলে যাওয়া চলবে না। এইসময় দরজায় শব্দ হল।
এখন ঘন বিকেল। মিস্টার ব্রাউন চোরের মতো তাঁবুতে ঢুকছিল, কিন্তু ধাক্কা লেগেছে দরজায়।
“কোথায় গিয়েছিলেন?”
ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলল ব্রাউন। তারপর মুখ বের করে আশেপাশে দেখে নিল। শেষে প্রায় নিঃশব্দে এগিয়ে এসে অর্জুনের পাশে বসল, “এখানে তো ভয়াবহ ব্যাপার।
“কেন?”
“ওরা আমাকে সমুদ্রের ধারে যেতে দিচ্ছিল না। মার্শালের নাম করে চেঁচামেচি করতে অ্যালাউ করল। কিন্তু সঙ্গে একটা লোক ছিল।তাকে মিথ্যে বললাম, গলায় ব্যথা, সমুদ্রের জলে কুলকুচি করব, কিন্তু ডান দিকের সমুদ্রের ধারে সে কিছুতেই যেতে দেবে না। বাঁ দিকে কিছুটা যাওয়ার পর সে বলল, সোজা এগিয়ে যেতে, সেখানে সমুদ্র পাব। যত ইচ্ছে কুলকুচি করে যেন একঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসি। সে এখানে আমার জন্যে অপেক্ষা করবে। মানে ওর বাইরের জায়গাটায় কোনও কিছু লুকোবার নেই। তা আমিও প্রথমে শিস দিতে-দিতে এগিয়ে চুপ মেরে গেলাম। যখন বুঝলাম কেউ আর অনুসরণ করছে না, তখন গাছের আড়ালে-আড়ালে সমুদ্রের ধারে চলে গেলাম। অনেক ভেবেচিন্তে একটা লম্বা গাছে উঠে বসলাম। মিনিট তিরিশেক পর হঠাৎ দেখি সমুদ্রের জল তোলপাড় করে একটা ইয়া বড় হাঙর মুখ তুলেই নেমে গেল। অতবড় হাঙর আমি জীবনে দেখিনি। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল আমার। গাছের ডালে বসে থেকেও ভাবলাম এখান থেকে মোটরবোটে আর কিছুতেই ফিরে যাব না। আসার সময় বোধহয় হাঙরটা ধারেকাছে ছিল না। এইসব ভাবছি, হঠাৎ আমার পাশের ডালে খট করে শব্দ হল। চমকে তাকিয়ে দেখি ডালটা ভেঙে গেছে। কেউ কিছু ছুঁড়ে ডালটাকে ভেঙেছে। অথচ কাছেপিঠে মানুষ নেই। আমি প্রায় লাফিয়েই নীচে নেমে পড়ে যেতে লাগলাম।” ব্রাউন একটানা বলে গেল।
“প্রহরীটা যেখানে ছিল সেখান থেকে ওই জায়গাটা কত দূরে?”
“সিকি মাইল হবে।”
“সিকি মাইল আপনি দৌড়লেন?”
“হ্যাঁ। প্রাণের দায়ে। কারণ ততক্ষণে বুঝে গিয়েছি কেউ সাইলেন্সার লাগিয়ে গুলি ছুঁড়েছিল।”
“প্রহরীকে কিছু বললেন?”
“না। বললে কী থেকে কী হয়ে যায়! ব্যাটা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, অবশ্য ওদিকে আমি কিছু দেখেছি কি না, তা আমি স্রেফ মিথ্যে বললাম।”
“আপনি নিশ্চয়ই তখন হাঁপাচ্ছিলেন?”
“হ্যাঁ। তার কারণও জিজ্ঞেস করেছিল। বললাম, হার্টের ট্রাবল আছে। “আমাকে পথ চিনে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন?”
“হ্যাঁ।” বলেই দ্রুত মাথা নাড়ল ব্রাউন, “না।
“মানে?”
“বাবা, আমার একটাই প্রাণ। এটাকে খোয়াতে চাই না।”
“দেখুন মিস্টার ব্রাউন, আপনাকে এই দ্বীপে কেউ পছন্দ করছে না। আমরা মেজরের সঙ্গী হয়ে এসেছি, তিনি পর্যন্ত নন। এর ওপর যদি মার্শাল জানতে পারেন আপনি অত দূরে গিয়ে গুলি খেতে-খেতে বেঁচে গেছেন, তা হলে আর দেখতে হবে না। তার চেয়ে আমার সঙ্গে সহযোগিতা করুন।
“আমি তো করব না বলিনি। কিন্তু প্রাণের বিনিময়ে….!”
“ধরুন আপনাকে কেউ দেখতে পাবে না, রাতের অন্ধকারে যদি যাই?”
“সেটা হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা কী ঘটছে? আমি বুঝতেই পারছি না।”
“সেটা আমিও বোঝার চেষ্টা করছি। আপাতত আপনি তাঁবুতেই থাকুন। রাত নামলে আপনার সঙ্গে দেখা করব। মেজর বলে আপনাকে দ্বিতীয়বার ভুল করলে সেটা খারাপও হতে পারে। আচ্ছা, আপনি এর আগে শার্ক দেখেছেন?”
মাথা নাড়ল ব্রাউন, “প্রচুর।”
