চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোল – ১

।।এক।।

ঘন নীল জিনসের প্যান্ট আর কমলা রঙের পুলওভার পরে নতুন-কেনা সাইকেলটা নিয়ে যখন অর্জুন বাড়ি থেকে বের হল, তখনও সূর্যের অবস্থা জিরো পাওয়ারের বাবের মতো। রোদ আছে কি নেই সেটা বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু কনকনে বাতাস নেমে আসছে সরাসরি হিমালয় থেকে।

এবার জলপাইগুড়িতে জব্বর শীত পড়েছে। বৃদ্ধরা বলছেন, এরকম শীত নাকি গত পঞ্চাশ বছরেও পড়েনি। সকাল হয় দেরিতে, আর বিকেল শেষ হবার আগেই সন্ধে নামে ঝুপ করে। আর দিনরাত চলছে এই দাঁতকপাটি-লাগা হাওয়ার স্রোত।

গলির মুখেই বুড়িদিদের বাড়ি। বুড়িদির বাবা তুষের চাদরে মাথা ঢেকে রোদ পাবার চেষ্টা করছেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। অর্জুন সাইকেল থামাল, “জ্যাঠামশাই, বুড়িদির চিঠি পেয়েছেন?”

মুখের সামান্য অংশ চাদরের আড়াল থেকে সরিয়ে বুড়িদির বাবা যেভাবে মাথা নাড়লেন তাতে পরশুরামের বইয়ের দেখা সেই পেত্নির ছবিটা মনে এল। একটু খোনা গলা ওঁর। “না বাবা, দিন কুড়ি হল কোনও চিঠি নেই। যে মেয়ে প্রতি সপ্তাহে একটা করে চিঠি দিত, সে যে কেন চুপ করে বসে আছে তা বুঝতে পারছি না।

অর্জুন মাথা নেড়ে আবার প্যাডেলে চাপ দিল। বুড়িদির বর চণ্ডীগড়ের ইঞ্জিনিয়ার। খুঁটিমারির জঙ্গলের কোথায় যে শিকড়টা আছে, তা কে জানে। নেপালিরা পায়ের কালে। দাগ ওটা দিয়ে ঘষে ওঠাচ্ছে দেখে বুড়িদির জন্য চেয়ে এনেছিল সে। তার নিজের কোনও দিদি নেই। প্রতিবছর ভাইফোঁটায় বুড়িদির আঙুলের ফোঁটা কপালে নিতে নিতে ওর বুক টনটন করত। মেঘে ঢাকা আকাশের মতো বুড়িদির মুখ কালো দাগে কুৎসিত হয়ে যাচ্ছিল। ওই শেকড় ঘষতে ঘষতে একটু একটু করে মেঘ কাটল। বুড়িদির মুখ পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঢলঢলে হওয়ামাত্র বিয়ে হয়ে গেল চণ্ডীগড়ে। সেখানে গিয়ে একটা চিঠি লিখেছিল তাকে বুড়িদি। বিশাল বাগান, অঢেল জায়গা, সুন্দর শহর।

সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিলেই গতি বাড়াতে ইচ্ছে করে। অর্জুন মিনিট দুয়েকের মধ্যেই কদমতলার মোড়ে চলে এল। জায়গাটা রিকশা আর ট্যাক্সির টার্মিনাস। দূরপাল্লার মিনিবাস বাস এখান দিয়েই যায়। অর্জুন দেখল কালিম্পংয়ের একটা মিনিবাস সবে ছেড়ে গেল। ডুয়ার্সে যাওয়ার জন্য কন্ডাক্টররা হাঁকছে। ওপাশে রূপমায়া সিনেমার সামনে চোখ পড়তেই জগুদাকে দেখতে পেল। মালবাজারের মিনিবাস ধরবেন বলে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু হাতে চায়ের কাপ। সারাদিনে কত কাপ চা খান কেউ জানে না। রোগা খাটো মানুষটা পরের উপকার করতে না পেলে যেন ঘুমুতে পারেন না। কাপটা দোকানের ছেলেটিকে দিয়ে চিৎকার করলেন, “এই অর্জুন, একটা চাকরির খবর আছে। কাল সন্ধেবেলায় একবার দেখা করিস। আজ সময় নেই। বলতে-বলতে মালবাজারের মিনিবাস এসে দাঁড়াতেই তাতে উঠে জগুদা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললেন, “আসিস কিন্তু, মনে হয় হয়ে যাবে।”

সাইকেল থেকে না নেমেই উঁচু গলায় অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কী চাকরি?” উত্তরটা পাবার আগেই বাস ছেড়ে দিল। কালিম্পংয়ের খুন-খারাপি দেখার পর চাকরি করবে না বলে ঠিক করেছিল অর্জুন। চাকরির জন্য সে অনেক ঘুরেছে। এই সামান্য বিদ্যে নিয়ে কারও অনুগ্রহ ছাড়া কাজ পাওয়া যায় না। এখন সে রাতের কলেজে পড়ছে। সারাদিন দেশ-বিদেশের অপরাধীদের নিয়ে লেখা বইতে বুঁদ হয়ে থাকে। পৃথিবীর সভ্য-দেশগুলোয় যদি স্বাধীন অনুসন্ধানীদের ভাল রোজগার হয়ে থাকে, তা হলে তারই বা হবে না কেন? অমলদা, অমল সোমও আর চাকরি-বাকরি করেন না। অবশ্য একটা সম্পত্তি থেকে ওঁর আয়ের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ওকে যাঁরা ভালবাসেন, তাঁরা চেষ্টা করছেন চাকরির জন্য। এই যেমন জগুদা। ছোটখাটো রোগা মানুষ। জমিয়ে রাখেন। সব সময় অন্যের উপকার করে যাচ্ছেন। এ কথা ঠিক, জলপাইগুড়ির মতো শহরে ঘন-ঘন অনুসন্ধানের কাজ পাওয়া যায় না। তা ছাড়া, খুঁটিমারি এবং কালিম্পংয়ের ঘটনাটার পর যতই নাম হোক তার, বয়সটা যে কুড়ির এদিকে। মানুষের ঠিক ভরসা হয় না বোধহয়। তাই যদ্দিন না পরিচিতি আরও বাড়ছে, তদ্দিন অমল সোমের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে অর্জুনের। অমল সোমেরও তাই অভিমত। সে ঠিক করল, কাল সন্ধ্যায় জগুদার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেবে কী ধরনের চাকরি!

রূপমায়া সিনেমার সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা বাজারের দিকে চলে গিয়েছে সেইটেই এই শহরের একমাত্র রাজপথ। শীত হলেও রাস্তায় এখন সাইকেল-রিকশার ভিড় শুরু হয়ে গিয়েছে। বাবুরা সব অফিসে বের হচ্ছেন। রূপমায়ার সামনে জটলা করা বেকার ছেলেরা ওকে দেখতে পেয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করল। সাইকেল চালাতে চালাতে সেইটে লক্ষ করল অর্জুন আড়চোখে। নিজের পরিচিতি বাড়লে বেশ ভাল লাগে। সে প্যাডেলে আরও জোরে চাপ দিল।

করলা নদী পেরিয়ে হাকিমপাড়ায় ঢুকতেই মনে হল একটা নির্জনতা চারধারে থম মেরে আছে। এককালে এখানে রায়বাহাদুর রায়সাহেবরা থাকতেন। শীতের সকালে তাদের বিশাল বাগানওয়ালা বাড়িগুলো চুপ মেরে আছে।

তিস্তা নদীর শরীর এখন বাঁধে মোড়া। তার গায়ে ছোট্ট বাগান-ঘেরা কাঠের বাংলোটা অমল সোমের। অমলদা একাই থাকেন ওখানে। তিন ভুবনে ওঁর কোনও আত্মীয়স্বজন নেই। বাড়িটার দেখাশোনা এবং রান্নার ভার একটা চাকরের ওপর। লোকটা কথা বলতে পারে না। কিন্তু গায়ে ভীষণ শক্তি। নাম হাবু।

বাগানের গেটের কাছে সাইকেল থেকে নামতে নামতে হাবুকে দেখতে পেল অর্জুন। এই শীতে একটা ফতুয়া পরে কোদাল দিয়ে মাটি কোপাচ্ছে। ওকে দেখে একগাল হেসে ইশারায় দোতলাটা দেখিয়ে দিল হাবু। অর্থাৎ অমলদা এখন তাঁর সাধনার ঘরে। সেখানে যতক্ষণ থাকবেন ততক্ষণ ডাকাডাকি করা চলবে না। এই বাড়িতে প্রায় রোজই আসে অর্জুন, কিন্তু কখনও দোতলায় ওঠেনি, অমলদাও যেতে বলেননি।

গেট খুলে ভেতরে ঢুকে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, “কখন ঢুকেছেন?”

ঘাড় নাড়ল হাবু। একটু বেশি করে। তার মানে অনেকক্ষণ। এই শীতেও হাবুর স্বাস্থ্যবান শরীরে ঘাম জমেছে। ফতুয়াটায় ভেজা দাগ। কাঠের বারান্দায় সাইকেলটা ঠেকিয়ে রেখে সিঁড়ি ভেঙে একতলায় বসার ঘরে ঢুকল অর্জুন। একটা গোল টেবিলকে ঘিরে কয়েকটা চেয়ার ছাড়া এই ঘরে কোনও আসবাব নেই। দেওয়ালে কোনও ছবি নেই। অর্জুন একটা চেয়ারে বসে দু’বার টেবিলে তবলার বোল তোলার চেষ্টা করল। সে কখনও তবলা বাজায়নি। কিন্তু অভ্যেসে সে একটা শব্দ ঠিকঠাক তালে বাজাতে পারে। ঠিক তখনই একটা সাইকেল-রিকশা বাগানের গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। বসার এই ঘর থেকে গেটটা পরিষ্কার দেখা যায়। বাজনা থামিয়ে অর্জুন দেখল কমপ্লিট স্যুট পরা বেঁটেখাটো রোগা মানুষটি রিকশা থেকে নামছেন। মাথায় একটা ফেল্ট টুপি। বাড়ির দিকে পিছন ফেরা বলে মুখ দেখতে পাচ্ছে না অর্জুন। কিন্তু রিকশাওয়ালা সমানে প্রতিবাদে মাথা নেড়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বেচারা বাধ্য হয়ে রাজি হল। জলপাইগুড়ির রিকশাওয়ালারা কখনও বেশি পয়সা চায় না। অথচ সাহেব দরাদরি করছেন। লোকটা তো অদ্ভুত। রিকশার পাদানি থেকে একটা মাঝারি স্যুটকেস তুলে নিয়ে গেটের দিকে ফিরতেই লোকটির মুখ দেখতে পেল অর্জুন। আর দেখামাত্র তড়াক করে লাফিয়ে উঠল।

হাবু ততক্ষণে এগিয়ে গিয়েছে। গেট খুলে একগাল হেসে স্যুটকেসটা হাতবদল করিয়েছে। তারপর গেট বন্ধ করে পিছন পিছন হাসিমুখে এগিয়ে আসছে। মানুষটির তুলনায় ওকে প্রায় দৈত্য বলে মনে হচ্ছিল। অর্জুন একলাফে বারান্দায় চলে আসতেই লোকটি দাঁড়িয়ে গেলেন, “অ্যাঁ? বাঃ, খুব সুন্দর। তোমাকেও পেয়ে গেলাম।”

অর্জুন হেসে বলল, “আসুন, আসুন। আপনি আসবেন জানতাম না তো।”

“আমিও কি ছাই জানতাম।” বলতে বলতে দোতলায় উঠে এলেন কালিম্পংয়ের বিষ্টুসাহেব। “আচ্ছা অর্জুন, আমার প্রায়ই একটা কথা মনে হয়। পৃথিবীতে যা-যা ঘটবে, অর্থাৎ ঘটতে চলেছে তা যদি মানুষের আগে থেকেই জানা থাকত, তা হলে কেমন হত? তুমি বলবে মানুষ ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলত। আমি বলব, না, মানুষ বোকামি কম করত। যেমন ধরো দাবা খেলা। খানিকটা খেলার পর বোঝা যায় আমি হারছি না জিতছি। সেটা বুঝে খেলার কায়দা পাল্টানোতে মেজাজ আছে। ঠিক আছে?”

অর্জুন এইসব ভারী কথা শুনে মাথা নাড়ল, “বুঝলাম না।”

“বুঝলে না? এই সামান্য কথাটা! আচ্ছা ধরো, জন্মাবার পর থেকে যত মানুষের সংস্পর্শে এসেছ তাদের প্রত্যেকের নাম আর মুখ তোমার মনে আছে। কাউকেই ভুলে যাওনি। তা হলে তোমার কী অবস্থা হবে? তুমি বলবে পাগল হয়ে যাব। কিন্তু আমি বলব, না।”

অর্জুন এবার বিষ্টুসাহেবকে বাধা না দিয়ে পারল না, “আপনার কী হয়েছে বলুন তো?”

“কেন?”

এসব জটিল সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন যে?”

“মাথা যে আছে সেটা প্রমাণ করছিলুম। কালকেই একটা বইতে পড়েছি, যত ভাববে তত মাথার ভেতরটা সাফ হবে। তিনি কোথায়?” বিষ্টু সাহেব এদিক ওদিক তাকালেন।

“তিনি সাধনা গৃহে। “কোনও জটিল প্রবলেম?”

“আমি জানি না।”

“অ।” ঘরে ঢুকে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন বিষ্টুসাহেব। পাখির মতো পলকা শরীর। কালিম্পংয়ে সেই খুন-খারাপির সময় যখন এই মানুষটির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তখন থেকেই ওর ওঁকে খুব পছন্দ হয়েছিল। রিটায়ার্ড মানুষ। বছর বাষট্টি বয়স। কিন্তু এখনও বার্ধক্য ওঁকে স্পর্শ করেনি। অমলদার চেয়ে বয়সে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও উনি বেশ সম্মান করেন কনিষ্ঠকে। বিয়ে-থা করেননি, কোনও দায় নেই।

বিষ্টুসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “কোনও চাকরিবাকরি হল?”

অর্জুন ঘাড় নাড়ল, “নাঃ, রাত্রে পড়ছি আর দিনে…।”

“দূর দূর, চাকরি করে কী হবে? তোমাদের এতবার বললাম চলে এস কালিম্পংয়ে। সেখানে ক্রিমিন্যাল থিকথিক করছে। যাবে আর ধরবে। ক’দিনেই বড়লোক। তা তোমার দাদা তো আমার কথায় কানই দেন না। কখন নামবেন তিনি?”

“জানি না।”

“আমার চেহারা কেমন দেখছ? ঠিক আছে?”

“ভালই।”

“বড্ড গরম এখানে। কোটটা খুলি, তা হলে আর ভাল বলবে না। বিষ্টুসাহেব টানাটানি করে কোট খুলে ফেলতেই অর্জুন দেখল তার তলায় দুটো সোয়েটার দু’রকম রঙে উঁকি মারছে। অত মোটা গরমকাপড় শরীরে থাকায় ওঁর শরীর ভারী দেখাচ্ছে বটে, কিন্তু জলপাইগুড়ির এই ঠাণ্ডাকে গরম বলাটা বাড়াবাড়ি না? হয়তো বিষ্টুসাহেব যেখান থেকে এসেছেন সেই কালিম্পংয়ে এখন বেশি শীত। তাই বলে জলপাইগুড়িতে কম কি।

কোট খুলে বিষ্টুসাহেব করুণ গলায় বললেন, “শেষ বাঁধনটাও খুলে গেল ভাই। গত সপ্তাহে লিলিকে কবর দিলাম গ্লান্ডিফ্লোরা গাছের তলায়।” কথাটা বলে ফোঁত করে নিশ্বাস ফেললেন বিষ্টুসাহেব। পলকেই তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল। লিলির চেহারাটা মনে পড়ল অর্জুনের। গতবারে বিষ্টুসাহেবের বাড়িতে গিয়ে দেখে এসেছিল। ধবধবে ফর্সা ছোট্ট ল্যাপডগ। ওকে কুকুর বলে মোটেই ভাবতেন না উনি। একদম বুকের পাঁজর ছিল যেন। লিলিকে ছেড়ে থাকতে হবে বলে কালিম্পং থেকে কোথাও যেতে চাইতেন না।

রুমালে চোখ মুখে বিষ্টুসাহেব বললেন, “মৃত্যুসংবাদটা মিসেস গান্ধীকে জানিয়ে দিয়েছি টেলিগ্রাম করে। ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই কষ্ট পাবেন, দেখো।”

অনেক কষ্টে নিজেকে গম্ভীর দেখাতে পারল অর্জুন। অথচ পেটের ভেতরে হাসি গুড়গুড় করছে। অমলদাই কাহিনীটা শুনিয়েছিলেন। বিষ্টু সাহেবের কুকুরপ্রীতি অসাধারণ। বিয়ে-থা করেননি বলেই তাঁর সব স্নেহ ওই কুকুরের ওপর। লিলিকে তিনি অন্ধের মতো ভালবাসেন। বছর দেড়েক আগে মিসেস গান্ধী এসেছিলেন কালিম্পংয়ে। তাঁকে দেখতে এবং তাঁর কথা শুনতে শহরের মানুষ উপচে পড়েছিল। বিষ্টুসাহেব কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যেতে পারেননি। ভিড়ের মধ্যে লিলির অসুবিধে হবে। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলেন বাড়ির কাছাকাছি নির্জন রাস্তায় তিনি লিলিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী যখন ওই পথে সার্কিট হাউসে ফিরবেন তখন তিনি তাঁকে শ্রদ্ধা জানাবেন। জায়গাটা নির্জন। দু’ধারে ইউক্যালিপটাস আর দেওদারের সারি। এদিকে জনবসতি নেই। মিটিং সেরে মিসেস গান্ধী যখন গাড়ির পাহারা নিয়ে ফিরে আসছেন সার্কিট হাউসে, তখন উত্তেজিত বিষ্টুসাহেব একটা গ্রান্ডিফ্লোরা ফুল মাথার উপর তুলে ওঁর উদ্দেশে নাড়তে লাগলেন। পাহাড়ের গায়ে একটি মানুষ কুকুর কোলে নিয়ে ফুল নাড়ছে দেখে প্রধানমন্ত্রীর কৌতূহল বা মায়া হল। তিনি গাড়িটাকে থামাতে বলেই হাত বাড়িয়ে ফুলটাকে নিয়ে বললেন, “বিউটিফুল। থ্যাঙ্কস।”

গাড়িটা চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ঘোর কাটেনি বিষ্টুসাহেবের। তাঁর ধারণা প্রধানমন্ত্রী লিলির দিকে তাকিয়ে বিউটিফুল বলেছেন। ঘটনাটা যারা জানে, তারা ওঁকে নিয়ে রসিকতা করলেও অমলদা করেননি। বলেছিলেন, “জানো অর্জুন, ভালবাসা মানুষকে খুব সরল করে দেয়।” কিন্তু দৃশ্যটা কল্পনা করলেই হাসি পায় অর্জুনের। এইসময় বিষ্টুসাহেব বললেন, “ভালই হল। সংসারের সব বাঁধন ঘুচে গেল। ঠিক আছে।”

হাবু দু’কাপ গরম কফি দিয়ে গেল। বিষ্টুসাহেব বললেন, “চমৎকার। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে চুমুক দিয়ে হাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তা হ্যাঁ বাবা হাবু, তোমার বাবুর সাধনা কখন শেষ হবে?

হাবু হাসল। তারপর উৎকর্ণ হয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করল। এবং নিঃশব্দে প্রস্থান করল। মাথা নাড়লেন বিষ্টুসাহেব, “বেচারি! ঈশ্বরের বিচার ঠিক হয় না। উচিত ছিল আমার জিভ অসাড় করে দিয়ে হাবুর মুখে কথা ফোটানো। সারা জীবন তো অনেক বকবক করলাম। কী বলো?”

কথাটা এমন গলায় উনি বললেন যে, অর্জুনের মনে হল বিষ্টুসাহেব আলাদা জাতের মানুষ। খুব দুঃখিত না হলে এইভাবে কথা বলা অসম্ভব।

কফি খেতে খেতে বিষ্টুসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের হাতে এখন কেস আছে?”

মাথা নাড়ল অর্জুন। মাস দুয়েক কোনও নতুন কেস আসেনি। জলপাইগুড়িতে অপরাধের সংখ্যা কম, যা ঘটে তা খুব সাধারণ শ্রেণীর। বিষ্টুসাহেব হাসলেন, “প্রতিভার অপচয় বড় বেদনাদায়ক। জুতোর শব্দ পাচ্ছি, তিনি আসছেন। ঠিক আছে?”

দোতলা থেকে নামছিলেন অমলদা। অর্জুন ঘাড় নাড়ল।

শেষ চুমুক দিয়ে বিষ্টুসাহেব আঁতকে উঠলেন, “এই যাঃ। কফিতে চিনি ছিল? আমি যে চিনি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি তা বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম।

“একেবারে চিনি বর্জন করাটা উচিত কর্ম নয়। তা ছাড়া হাবুর আঙুলে মিষ্টি ওঠে না।” দরজায় দাঁড়িয়ে হাসলেন অমল সোম। লম্বা ছিপছিপে শরীর, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর সাদা শাল, মাথার চুল উশকোখুশকো।

বিষ্টুসাহেব শশব্যস্ত উঠে দাঁড়ালেন, “নমস্কার, নমস্কার।”

একটা চেয়ার টেনে বসে অমলদা বললেন, “অনেকক্ষণ অপেক্ষা করাইনি। তা হঠাৎ বিদেশ যাত্রা কেন? সেটা তো আপনার ধাতে নেই।”

“বিদেশ যাত্রা?” চমকে উঠলেন বিষ্টুসাহেব। তারপর সামলে নিয়ে বললেন, “কালিম্পং থেকে জলপাইগুড়ি আসা কি বিদেশ যাত্রা? ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করা যায়।”

“যায়। কিন্তু আপনি এবার তা করছেন না। লিলি কবে গেল?”

সঙ্গে-সঙ্গে মুখে ছায়া নামল বিষ্টুসাহেবের, “এক সপ্তাহ। ওফ্।” দু’ মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “আপনি জানলেন কী করে?”

“লিলি থাকলে আপনি বড়জোর একবেলার জন্য জলপাইগুড়িতে আসতে পারেন, কিন্তু বিদেশ যাত্রা কখনওই নয়। কালিম্পংয়ের বাইরে লিলির স্যুট করত না।”

রুমালে মুখ মুছলেন বিষ্টুসাহেব, “গুড গড। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে যে, আমি এবার অনেকদূর যাচ্ছি। আই টোল্ড নোবডি।”

“আপনার স্যুটকেসের গায়ে আজ সকালে নাম-ঠিকানা লেখা লেবেল সেঁটেছেন। জলপাইগুড়িতে আসতে নিশ্চয়ই স্যুটকেস হারাবার ভয় করতেন না। তাই না?”

বিষ্টুসাহেব এবার হাত বাড়িয়ে অমলদার হাত খপ করে ধরলেন, “ওফ। আপনার চোখ এবং বুদ্ধি অতুলনীয়। আই অ্যাম ইওর ফ্রেন্ড, এটা যে কত বড় গর্বের বিষয়…”

“ওসব কথা থাক। কত দূর যাচ্ছেন?”

বিষ্টুসাহেব একবার চারপাশে তাকিয়ে নিলেন। তারপর চেয়ারটাকে সামান্য এগিয়ে নিয়ে বললেন, “সেই ব্যাপারেই তো আপনার কাছে আসা। আপনাকে আমার একটা অনুরোধ রাখতেই হবে। না বললে আমি শুনছি না।” তারপর পকেট থেকে একটা টেলিগ্রাম বের করে অমল সোমের সামনে মেলে ধরলেন। অর্জুন এক ঝলকে অনেকগুলো ইংরেজি শব্দের মধ্যে একটি শব্দ আবিষ্কার করল, চণ্ডীগড়।