চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোল – ৭

॥ সাত।।

চণ্ডীগড়ের পুলিস-স্টেশন থেকে যখন ওরা ছাড়া পেল তখন প্রায় এগারোটা বাজে। বাসের ড্রাইভার কোনও যাত্রীকেই নামতে দেয়নি। মৃতদেহসমেত সোজা থানায় হাজির করেছিল। অমলদা অবশ্য পরিচয়পত্র দেখিয়ে অনেক আগেই ছাড়া পেতে পারত, কিন্তু স্বেচ্ছায় সেটা করেননি। থানায় বসে বিষ্টুসাহেব চাপা গলায় কয়েকবার অর্জুনকে শুনিয়েছেন, “আম্বালায় ট্রেন থেকে না নামলে এই ঝামেলায় জড়াতে হত না, ঠিক আছে?”

নিহত মানুষটির যে পরিচয় জানা গিয়েছে তাতে প্রমাণ হল, অমলদার ধারণা ঠিক। লোকটার নাম বিল গারট্রুড। বাড়ি আমেরিকার বাফেলো শহরে এবং যে খবরটা অমলদাকে সবচেয়ে বিস্মিত করেছে তা হল : বিল একজন শৌখিন গোয়েন্দা। বিলের ডায়েরি এবং আইডি থেকে এইসব তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ। ওর পাসপোর্ট ঠিকানাটাকে সমর্থন করলেও বিল কার হয়ে বা কী উদ্দেশ্যে পাঞ্জাবে আসছিল, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। ওর ব্যাগে কিছু জামাকাপড় আর ডায়েরিটা ছাড়া ছিল একটা কোল্ট রিভলভার। সেটি সঙ্গে রাখার কোনও কাগজপত্র পুলিশ পায়নি। এ ছাড়া দুটো ছবি পুলিশ পেয়েছে বিলের ডায়েরির মধ্যে। এরা কারা সেটা বোঝা যাচ্ছে না। কুড়ি-একুশ বছরের যমজ ছেলেমেয়ের ছবি, পোশাক ছাড়া সামান্য পার্থক্য নেই।

বাসের যাত্রীদের অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনও সূত্র পুলিশ খুঁজে পেল না। কয়েকজন যাত্রী বলেছেন, বাস ছাড়বার মিনিট দুয়েক আগে বিল বাসে ওঠে। তারপর বেছে নিয়ে পেছনের আসনে জানলার পাশে গিয়ে বসে। তখন এত ঠাণ্ডা যে, যাত্রীরা অন্য কাউকে ভাল করে নজর করেনি। কিন্তু আসনে বসেই বিল জানলা খুলে দেওয়ায় ঠাণ্ডা বাড়ে, ফলে অনেকেই মুখ ঘুরিয়ে বিলকে দেখেছিলেন। বিলের টুপি, পোশাক দেখে কেউ কিছু বলতে সাহস পায়নি। শুধু দু-একজন যারা ওই জানলার কাছাকাছি ছিল, তারা বাসের সামনের দিকে খালি আসনে উঠে এসেছিল। কেউ কোনও গুলির শব্দ পায়নি।

বিল গারট্রুড দিল্লিতে নেমেছে মাত্র একদিন আগে। দিল্লি থেকে চণ্ডীগড়ে পৌঁছবার নানান ধরনের দ্রুতগামী বাস থাকা সত্ত্বেও কেন সে দিল্লি-কালকা ট্রেন ধরতে গেল সেটাই রহস্য। এ ছাড়া বিল কোথায় কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।

অমলদা অর্জুনদের জানিয়েছিলেন, বিল সম্পর্কে ওঁর আগ্রহ হচ্ছে। তা ছাড়া একজন শৌখিন গোয়েন্দা কার হাতে নিহত হল, সেটা জানা দরকার। অমলদা চণ্ডীগড়ের পুলিশকে বিল সম্পর্কে যতটুকু তাঁর জানা ছিল তা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের কী উদ্দেশ্যে চণ্ডীগড়ে আসা, সেটা ব্যক্ত করেননি। তাঁরা টুরিস্ট, চণ্ডীগড় মানালিতে বেড়াতে এসেছেন, এটাই বলা হল।

থানা থেকে বেরিয়ে রোদ গায়ে পড়তেই বেশ আরাম লাগল অর্জুনের। কিন্তু সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। মুখে জল না দেওয়ায় বিশ্রী লাগছে। তাই ছিমছাম সুন্দর এই শহরটাকে উপভোগ করার মতো মন ছিল না। বিষ্টুসাহেব বললেন, “আর দেরি নয়, রায়সাহেবের ওখানে যাওয়া যাক।

অমলদা মাথা নাড়লেন। “তিনজন সরাসরি ওঁর কাছে না উঠে আপনি বরং একাই যান। আমরা এদিকে কোনও হোটেল খুঁজে নিচ্ছি!”

“আমি একা যাব কেন?” চোখ বড়-বড় হয়ে গেল বিষ্টুসাহেবের।”

ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে অমলদা হেসে ফেললেন, “একা যাবেন কেন, আমরা আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।”

“খেপেছেন? আমি সেখানে একা থাকব? শহরে পা দিতে-না-দিতেই একটা সাহেবের লাশ পড়ে গেল, আর আমি দলছাড়া হব! অসম্ভব! ঠিক আছে?” বিষ্টুসাহেব সজোরে মাথা নাড়লেন, “তার চেয়ে তিনজনেই প্রথমে ওখানে যাই, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা হবে।”

চণ্ডীগড় শহরটা যে কতখানি সুন্দর, তা বাসে বসে বোঝা যায়নি। তা ছাড়া সঙ্গে একটি মৃতদেহ থাকলে সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় না। রাস্তায় ভিড় নেই, মানুষজন বোধহয় বাজার-এলাকা ছাড়া পথে হাঁটে না। এক-একটা রাস্তা এমন চওড়া এবং ঝকঝকে যে, জলপাইগুড়ির জন্যে কষ্ট হচ্ছিল অর্জুনের। দু’পাশের বাড়িগুলির গড়ন খুবই আধুনিক। এবং এইসব বাড়ি বেশ কিছুটা জমি নিয়ে, ছাড়া-ছাড়া। পথে আধুনিক গাড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটছে অজস্র সাইকেল। এবং সাইকেলের আরোহীদের অধিকাংশই রংবেরঙের পোশাক পরা সুন্দরী মেয়ে।

ঠাণ্ডাটা এখন সয়ে গেলেও স্কুটারে বেশ হাওয়া লাগছে। একটা স্কুটার-ট্যাক্সিতে তিনজন বেশ ঠাসাঠাসি বসেছে। শীতকাল বলেই এটা সম্ভব হল। চণ্ডীগড়ের দিকে তাকিয়ে অর্জুনের কেবলই মনে হচ্ছিল, এ ভারতবর্ষ নয়। ভারতবর্ষের যে-কোনও শহরের যে ছবি সে দেখেছে, তার সঙ্গে কোনও মিল নেই। অমলদাকে কথাটা বলতেই তিনি সমর্থনে মাথা নাড়লেন, মুখে কিছুই বললেন না। থানা থেকে বের হবার পর থেকেই অমলদাকে বেশ অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। এই অবস্থাটাকে ভাল করে চেনে অর্জুন। নিশ্চয়ই বিলের ব্যাপারটা ওঁর মাথায় পাক খাচ্ছে। সে আর অমলদাকে বিরক্ত করল না।

স্কুটারের মাঝখানে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন বিষ্টুসাহেব। বোধহয় ঠাণ্ডা বাতাসে কথা বলার মতো ইচ্ছেও নেই। এই বৃদ্ধ মানুষটির পক্ষে পরিশ্রম একটু বেশি হয়ে গেলেও সেটা প্রকাশ করেননি। বিলের কথা আর-একবার মনে হল অর্জুনের। কে খুন করল লোকটাকে? অর্জুন ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করল। বিলকে প্রথম দ্যাখে সে ট্রেনের করিডরে। কুপের দরজা খুলে প্লাটফর্মে নেমে গেল। ওর মাথার টুপি এমন কায়দায় ছিল যে, মুখ দেখা যায়নি। দ্বিতীয়বার নজরে এল চায়ের দোকানে। অমলদা কথা বলতে চাইলে বিল বুঝিয়ে দিয়েছিল, সে ওটা পছন্দ করছে না। তৃতীয়বার নজরে আসে বাসে উঠে। তখন বিলের টুপি ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি। তা হলে বিল খুন হল কখন? চায়ের দোকান থেকে সরাসরি নিশ্চয়ই বাসে উঠেছিল। উঠে জানলা খুলেছিল। গুলিটা এসেছিল জানলা দিয়েই। বাসের ভেতর থেকে গুলি করলে ডান দিকের কানে লাগত না। তা ছাড়া সেটা করার সময় কারও না কারও নজরে পড়ত। অতএব বাইরে থেকেই গুলি করা হয়েছে। তখন এত কুয়াশা ছিল আম্বালায় যে, খুনি সুবিধে পেয়েছিল। কিন্তু খুনি জানল কী করে যে, বিল বাসের পেছনে এসে বসেছে। নিশ্চয়ই সে অনুসরণ করেছিল। আর সেটা শুরু করেছিল দিল্লি থেকেই। তার মানে খুনি দিল্লি-কালকায় উঠে বিলের উপর নজর রেখেছিল। কিন্তু অর্জুনের স্পষ্ট মনে আছে বিল ছাড়া অন্য কাউকে সে কামরা থেকে নামতে দ্যাখেনি। যদিও বিল নেমে যাওয়ার খানিক বাদেই সে কুপেতে ফিরে এসেছিল। বিল মাত্র একদিন হল আমেরকিা থেকে এ-দেশে এসেছে। খুনি তার কথা জানত। কে জানে হয়তো সে-ও বিলের পিছু পিছু এ-দেশে এসেছে। বিলকে ওরা কোনও বিশেষ কাজ করা থেকে থামিয়ে দিল। সেই কাজটা কী? অর্জুনের মনে পড়ল সেই যমজ ভাইবোনের ফোটোগ্রাফটির কথা। বিলের সঙ্গে ওই ছবিটার কী সম্পর্ক? ছবি দেখে কে ছেলে কে মেয়ে বোঝা মুশকিল! অর্জুনের খুব খারাপ লাগছিল। এই মুহূর্তে আমেরিকার বাফেলো শহরে বসে বিলের মা-বাবা কিংবা স্ত্রী জানতেও পারছেন না বিল নেই। সত্যি, গোয়েন্দাদের জীবনে বিপদের থাবা কখন পড়বে কেউ বলতে পারে না। সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে সংশোধন করে নিল অর্জুন। না, গোয়েন্দা নয়, সত্যসন্ধানী। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে মৃত্যু তো গৌরবের ব্যাপার। অবশ্য প্রতিষ্ঠিত হলে তবেই।

অর্জুন তাকিয়ে দেখল ওরা শহরের প্রায় প্রান্তে চলে এসেছে।

রাস্তাঘাট একই প্ল্যানমাফিক, কিন্তু বাড়িঘর এদিকে তেমন তৈরি হয়নি। স্কুটারওয়ালা ঠিকানা মিলিয়ে যে বাড়িটার সামনে দাঁড় করাল, সেটার দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। বিদেশি এবং আধুনিক কায়দায় বাড়িটা করা। শুধু ছ’ফুট পাঁচিলের ওপর এক-মানুষ পর্যন্ত কাঁটাতারের ফেন্সিং। লোহার গেট বন্ধ। প্রায় দুর্গের মতো এই বাড়িতে অনুমতি ছাড়া ঢোকা অসম্ভব।

অমল সোম মাটিতে পা দেওয়ার পর বিষ্টুসাহেব যে ভঙ্গিতে লাফিয়ে নামলেন, তা দেখার মতো। অমলদা বললেন, “সাবধান, বুড়ো বয়সে…।”

বিষ্টুসাহেব মাথা নেড়ে বললেন, “এককালে হাই জাম্প করতাম। ঠিক আছে? উঃ, কী দীর্ঘপথ জার্নি করলাম। তা গেট বন্ধ, লোকজন কোথায়? এখন একটু ফ্রেশ-ট্রেশ…।” বিষ্টুসাহেব খানিক হেঁটে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, “কোই হ্যায়? ইজ এনিবডি দেয়ার?”

স্কুটার চলে গেলে অমলদা বললেন, “রায়সাহেব দেখি এখানেও লোহার দুর্গ বানিয়েছিলেন। অথচ সাপের ঢোকা আটকাতে পারেননি।

অর্জুন বলল, “সাপ?”

অমলদা হাসলেন, “চাঁদসওদাগরের গল্পটা পড়োনি? লোহার বাসর আর একটি সাপ। বিষ্টুসাহেব, দেখুন, কেউ একজন আসছে।”

একজন নয়, দুজন। গেটের দিকে যে এগিয়ে আসছিল সেই প্রৌঢ়টি এই বাড়ির ভৃত্য সম্প্রদায়ের, তা চেহারাতেই মালুম হয়, কিন্তু পেছনে লনের যে চিলতে অংশটি দেখা যাচ্ছে, সেখানে এসে দাঁড়ালেন যিনি, তাঁর পরদে সাদা প্যান্ট, ওপরে কমলারঙের পুলওভার।

ভৃত্যটি সামনে আসতে বিষ্টুসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “রায়সাহেব হ্যায়?” লোকটি মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।

“গেট খোলো, হামলোক কলকাত্তাসে, নেহি, কালিম্পংসে আয়া”

লোকটি সন্দিগ্ধ চোখে এদের দিকে যখন তাকিয়ে আছে, তখন দ্বিতীয় ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। অর্জুন তাঁর বয়স আন্দাজ করতে পারল না। তবে তিনি যুবতীও নন, আবার প্রৌঢ়াও বলা যায় না। হাঁটার ভঙ্গি এবং তাকানো দেখে বোঝা যায়, ইনি বেশ ব্যক্তিত্ববতী মহিলা।

“আপনারা?”

বিটুসাহেব বললেন, “আমার নাম বিষ্ণুচরণ পত্রনবিশ, কালিম্পংয়ে থাকি। এঁরা আমার বন্ধু। রায়সাহেবের আমন্ত্রণে এখানে এসেছি। ঠিক আছে?”

ভদ্রমহিলা নীরবে ঘাড় নাড়লেন। তাতেই বোঝা গেল, তিনি ব্যাপারটা জানেন। তারপর ভৃত্যকে নির্দেশ দিলেন গেট খুলতে।

ওরা ভেতরে ঢুকতেই ভদ্রমহিলা বললেন, “আমি মিসেস রায়। আপনি অমল সোম?”

অমলদা স্যুটকেস নামিয়ে রেখে নমস্কার করলেন, “কবে এলেন?”

নমস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার সময় ভদ্রমহিলার কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল, “কয়েকমাস হয়ে গেল। আপনিই তো কালিম্পংয়ে ওঁকে সাহায্য করেছিলেন। থ্যাঙ্কস। বাট নাউ উই আর ইন গ্রেট ট্রাবল। আপনার নাম অর্জুন?”

অর্জুন নমস্কার করল। অতবড় একজন মহিলা তাকে আপনি বলছেন বলে বেশ গর্ব হল তার। হাত বাড়িয়ে কার্পেটের মতো লনে রাখা চেয়ারগুলো দেখিয়ে মিসেস রায় বললেন, “বসুন। আই নো য়ু আর টায়ার্ড।”

আরাম করে বসে বিষ্টুসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “রায়সাহেব কোথায়?”

“আছেন,” মিসেস রায় এক হাতে নিজের চুলের প্রান্ত ছুঁলেন, “কিন্তু অসুস্থ। দিন সাতেক আগে ওঁর হঠাৎ একটা মাইল্ড অ্যাটাক হয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছেন কমপ্লিট রেস্ট নিতে। উনি আপনাদের খুব এক্সপেক্ট করছিলেন। কিন্তু আপনার ফ্রেশ হয়ে নিয়ে তবে ওঁর সঙ্গে দেখা করুন। ব্যায়রা…” শেষ শব্দটা যে ভৃত্যের উদ্দেশে তা বোঝার আগেই লোকটি এগিয়ে এল চটপট। অর্জুন বুঝল বেয়ারাকে ‘ব্যায়রা’ বলে ডাকা হয়।

নির্দেশ নিয়ে বেয়ারা চলে গেলে মিসেস রায় জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারা কিসে এলেন? এখন কি কোনও ফ্লাইট আছে?”।

“বিষ্টুসাহেব মাথা নাড়লেন, “ট্রেনে। ট্রেন কাম বাস।”

“আই সি!” ভদ্রমহিলার মুখ দেখে মনে হল উনি বিশ্বাস করতে পারছেন না এতদূর পথ কেউ ট্রেনে যাওয়া-আসা করতে পারে।

অমলদা চেয়ারে বসার পর থেকে মিসেস রায়ের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নেননি। আচমকা প্রশ্ন করলেন, “আপনারা মেয়ের নাম সীতা রাখলেন কেন?”

কাঁধ নাচালেন মহিলা, “ওয়েল! ইউ নো, রামায়ণ আমার খুব প্রিয়। সানফ্রানসিস্কো শহরে ওই একটাই বাংলা বই ছিল আমার কাছে। মেয়ের বাঙালি নাম রাখব আর আমেরিকানরা সেটা স্পষ্ট উচ্চারণ করতে পারবে, এই সমস্যার সমাধান হল সীতা নামটাতে। নাথিং সিরিয়স।

“কিন্তু এবারও তো সীতাহরণ হল।”

মিসেস রায় গম্ভীর হলেন, কথাটার জবাব দিলেন না। অমলদা এবার বললেন, “ঠিক আছে, আমরা এবার উঠি, বিষ্টুসাহেব এখানে থাকলে কি আপনাদের অসুবিধে হবে?”

কথাটা শুনে বিষ্টুসাহেব এমন ভঙ্গিতে সোজা হয়ে বসলেন যেন বিদ্যুৎ ছুঁয়েছেন। মিসেস রায় অবাক গলায় বললেন, “তার মানে? আপনার কি এখানে থাকছেন না? মিস্টার রায় তো আপনাদের এখানে আসতে বলেছেন।

“বলেছেন। কিন্তু হোটেলে থাকলে আমার কাজকর্মের সুবিধে হবে। তার আগে আমি রায়সাহেবের সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।”

“বেশ। আপনি যা ভাল মনে করেন, করুন। অন্তত এখানে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ সেরে বিকেলে সিদ্ধান্তটা নিন। তার আগেই ওঁর সঙ্গে কথা হয়ে যাবে।”

এইসময় বেয়ারা কাছে এসে সসম্ভ্রমে মাথা নাড়তেই মিসেস রায় উঠে দাঁড়ালেন, “আসুন। আপনাদের ঘর প্রস্তুত।”

তিনজনে একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন অমলদা জিজ্ঞেস করলেন, “মিসেস রায়, আমরা কারা সেটা আমাদের মুখ থেকে শুনে বিশ্বাস করলেন কী করে? এই দুর্গে ঢোকার জন্যে বাহানা করেও তো কেউ আসতে পারত।

অদ্ভুত একটি হাসি খেলে গেল মিসেস রায়ের ঠোঁটে। “সীতা চলে যাওয়ার পর আমরা যদি খোলা মাঠেও থাকতাম, তাহলেও কেউ বিরক্ত করতে আসত না। যাদের এসব করার ইন্টারেস্ট ছিল, সীতা এখানে না থাকায় তা শেষ হয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া আপনাদের কথা এত শুনেছি যে, চিনতে অসুবিধে হয়নি।”

.

গরমজল-টবে শুয়ে স্নান অর্জুনের জীবনে এই প্রথম। পৃথিবীতে এত আরাম আছে, সেটা আগে জানা ছিল না। বাথরুমটা কত রকমের কায়দায় সাজানো। আট রকমের সাবান, পাঁচ রকমের স্প্রে, ছ’ রকমের শ্যাম্পু আর নানান সাইজের এক ডজন তোয়ালে। ফিটফাট হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে নিজেকে খুব তাজা লাগছিল ওর। আর তখনই বুড়িদির কথা মনে পড়ল।

বুড়িদি এই চণ্ডীগড়েই আছে। অথচ কোথায় আছে তা সে জানে না। ঠিকানাটা না নিয়ে আসার জন্যে খুব আক্ষেপ হচ্ছিল।

দুপুরে এ-বাড়িতে ভাত হয় না। লাঞ্চ নামক পর্বটা হেভি ব্রেকফাস্ট দিয়েই সারা হয়। ডাবল ডিমের অমলেট, টোস্ট, সঙ্গে বাটার ও জ্যাম, রোস্টেড চিকেনের ওপর সল্টেড পেঁয়াজ ছড়ানো, কর্নফ্লেক্স এবং এক গ্লাস দুধ অথবা কফি। খাওয়ার সময় মিসেস রায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। টুকিটাকি কথা সেরে চলে যান।

বিষ্টুসাহেব বললেন, “ফাইন। এই ধরনের খাবার আমার পছন্দ। বাঙালিরা কেন যে একগাদা ভাত খায়!”

কথাটা খুব খারাপ লাগল অর্জুনের। দুপুরে ভাত না হলে কি জমে? অমলদা হেসে বলেছিলেন, “আমেরিকায় আপনি ভাল থাকবেন। শুনেছি কাজের দিনে ওরা দুপুরে খুব সামান্য খায়। ডিনার সারে সন্ধেবেলায়, বেশ হেভি।”

অর্জুন জিজ্ঞেস করেছিল, “সারাদিন না খেয়ে থাকে?”

“তা কেন? ওখানকার খাবারে ক্যালরি এত বেশি পরিমাণে থাকে যে, বেশি খাওয়ার দরকার হয় না। এতে মানুষের কাজ করার সুবিধে হয়।”

বিটুসাহেব নিচু গলায় অর্জুনকে বললেন, “এবার কালিম্পংয়ে ফিরে এই ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করব। ভাল জিনিস শেখা উচিত। ঠিক আছে?”

.

রায়সাহেব ইজিচেয়ারে শুয়ে আছেন। ওরা তার সামনে বসে। এই বারান্দায় বসে দুপুরের মিঠে রোদ গায়ে মাখা যায়। অর্জুনের মনে হচ্ছিল এই ক’মাসে লোকটার চেহারা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে। প্রথম যখন সানফ্রানসিক্সো থেকে কালিম্পংয়ে উনি এসেছিলেন, তখন যে জৌলুস ছিল, সেটা হারিয়েছে। তা ছাড়া মেয়ের অন্তর্ধানের পর প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন। অমলদাকে দেখে খুব খুশি হলেও সেটা বোঝাতে শুধু হাত চেপে ধরলেন, “আপনারা এসেছেন বলে আমি কৃতজ্ঞ। ডাক্তার আমাকে শুয়ে থাকতে বলেছে। এ যে কী যন্ত্ৰণা!”

বিষ্টুসাহেব বললেন, “আপনি শান্ত হোন। অমলবাবু যখন এসে গেছেন তখন কোনও চিন্তা নেই। সীতাকে আমরা খুঁজে বের করবই।”

রায়সাহেব মাথা নাড়লেন, “কালিম্পংয়ে আপনি যা করেছেন, তার তুলনা নেই। কিন্তু এবার অন্য ব্যাপার। তা ছাড়া মেয়ের যদি ইচ্ছে না থাকত, তা হলে ওরা ওকে নিয়ে যেতে পারত না। পাঙ্কদের সঙ্গে থাকলে আমার মেয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। আমি এটা সহ্য করতে পারব না।”

অমলদা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, “আমরা চেষ্টা করব। কী করে সীতা গেল তা শুনব আপনার কাছে। তার আগে বলুন তো ওর কোনও ছবি আছে কি না আপনাদের কাছে?”

“আছে। ওর একটা অ্যালবাম আছে। ওই যে ওই টেবিলের ওপর রেখেছি।”

অমলদার নির্দেশে অর্জুন উঠে অ্যালবামটি এনে দিতে তিনি পাতা ওল্টাতে লাগলেন। মিষ্টি মেয়ে সীতা নানা পোশাকে। এসবই তার পাক্ হওয়ার আগের জীবনের ছবি। সীতা এবং তার বন্ধুদের ছবি দেখতে-দেখতে হঠাৎ অমলদা সোজা হয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “এদের আপনি চেনেন?”

অর্জুন মুখ বাড়িয়ে দেখল দুটো যমজ ছেলেমেয়ের মাঝখানে সীতার ছবি। এই যমজ ছেলেমেয়ের ছবি বিল গারট্রুডের ডায়েরিতে ছিল।